শিউলিবেলা,পর্বঃ ১

শিউলিবেলা,পর্বঃ ১
খাদিজা আরুশি আরু


পিথিউশা, ছাইরঙা গভীর চোখের গম্ভীর এক পুরুষ। গায়ের রঙটা আরেকটু উজ্জ্বল হলে নিঃসন্দেহে বিদেশী বলে চালিয়ে দেয়া যেতো। তার চোখে যেনো বিধাতা এ পৃথিবীর সব মায়া ঢেলে দিয়েছেন, একবার তাকালে বারংবার তাকাতে মন চায়। পেশায় সে ফটোজার্নালিস্ট, একটা কাজ শেষ করে ঝিনাইদহ থেকে ফিরেছে আজ। এতোটা পথ জার্নি করে আসার পর এখন জ্যামে বসে থাকার কারনে মাথাটা ব্যাথায় টনটন করছিলো পিথিউশার, প্রাইভেট কারের এসির হাওয়াটা অসহ্যকর লাগছিলো, পেট গুলিয়ে বমি পাচ্ছিলো। ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা ঈশানের উপর ভীষণ রাগ হচ্ছে তার এ মুহূর্তে। ঈশানকে এ মুহূর্তে লাথি দিয়ে ড্রাইভিং সিট থেকে ফেলে দিতে মন চাচ্ছে তার, বিরক্তিতে তিতে হয়ে আসা মুখটাকে কোনো রকম নাড়িয়ে সে বললো,

-“তোকে কে বলেছিলো আমাকে আনতে যেতে? আনতেই যখন যাবি তখন আমার বাইক না নিয়ে বাবার গাড়ী নিয়ে বের হলি কেনো? ঢাকা শহরে নতুন এসেছিস? জানিস না, বৃহস্পতিবার দিন কতো জ্যাম পড়ে?”

পিথিউশার ফ্যাকাশে চেহারা দেখে ঈশান বেশি কিছু বলার সাহস পেলো না, উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

-“ভাইয়া, তোর কি শরীর খারাপ লাগছে? হাসপাতালে যাবি?”

পিথিউশা এতোক্ষণে সিটে মাথাটা এলিয়ে দিয়েছে, কোনোরকমে বিড়বিড় করে বললো,

-“তেমন কিছু না, রেস্ট করলে ঠিক হয়ে যাবে। তুই এসিটা বন্ধ করে জানলাটা খুলে দে, অনেকক্ষণ জ্যামে বসে থাকায় দম বন্ধ লাগছে।”

ঈশান দেরি না করে দ্রুত গাড়ির কাঁচ নামিয়ে দিলো। কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়ী তার নিজ গতিতে ছুটতে শুরু করলো। এ পথ, এ ব্যস্ত রাস্তায় ছুটতে থাকা মানুষজন, ফুটপাতের দোকানগুলো এ চিত্র পিথিউশার পূর্ব পরিচিত। তবুও যতোবার এ শহরে ফিরে আসে ততোবার এ দৃশ্য তাকে মুগ্ধ করে। গাড়ীর গতিবৃদ্ধির সঙ্গে পেছনে ফেলে আসা রাস্তাগুলোকে তার কাছে জীবনের প্রতিবিম্ব মনে হয়। যেনো পেছনে ফেলে আসা রাস্তা অতীতের ম্মৃতির মতো। মানুষ কতো সহজে অতীতকে পেছনে ফেলে ছুটে চলেছে ভবিষ্যতের পথে! সত্যিই তো, পিথিউশাও তো তাদের ব্যতীক্রম নয়, তার ছোটার গতি যে অন্যদের তুলনায় শতগুণ বেশি! একদৃষ্টিতে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলো সে, প্রকৃতির হাওয়া গায়ে লাগতেই শরীর খারাপটা কেটে গেলো তার। হঠাৎ চোখ আটকে গেলো একটা আইসক্রিমের গাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বেগুণী শাড়ী পরা মেয়ের দিকে। হুকুম দেয়ার স্বরে ঈশানকে বললো,

-“গাড়ী থামা ঈশান।”

মিনিট না গড়াতেই ঈশান গাড়ী থামালো, ও কিছু বুঝে ওঠার আগেই পিথিউশা দ্রুত গাড়ী থেকে নেমে ছুটে গেলো আইসক্রিমের গাড়ীটার দিকে। কিন্তু হঠাৎ থমকে গেলো, আইসক্রিমের গাড়ীটার থেকে কয়েক কদম দুরত্বে মুর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো। ঈশান ততোক্ষণে ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সে তখন ছবি তোলায় ব্যস্ত…

একটা বেগুনী শাড়ি পরা তরুণী কয়েকটা পথশিশুকে আইসক্রিম কিনে দিচ্ছে। বাচ্চাদের উৎফুল্ল চেহারা, আইস্ক্রিম ক্রেতা মেয়েটির ঠোঁটের কোণে উঁকি দেয়া মৃদু হাসি, তার চোখের কোণে লেপ্টে থাকা কাজল, তার দীঘল কালো চুল সবটা যেনো পিথিউশাকে মোহগ্রস্তের মতো আকর্ষণ করছে। এইতো কয়েক পা এগুলেই সে মেয়েটার কাছে যেতে পারি, তার দিকে হাত বাড়িয়ে বলতে পারি, “ওগো সুখ ফেরিওয়ালী, তোমার ভাণ্ডার থেকে এ অধমকে একটু সুখ দেবে?” কিন্তু তার পা চলল না, মনের মাঝে এই ক্ষণিকের ভালোলাগা মানবীকে এক মুহূর্তের জন্য ছুঁয়ে দেবার বাসনা জাগলো না, কিছু বলাও হলো না। একসময় একটা রিকশা ডেকে মেয়েটা তাতে চড়ে বসলো। পিথিউশা ভুতগ্রস্তের মতো চলন্ত রিকশার দিকে তাকিয়ে রইলো। হঠাৎ ফ্লাশের আলো চোখে পড়তেই তার ধ্যান ভাঙলো, ঈশানের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

-“দিন দুপুরে ফ্লাশ দিয়ে কেউ ছবি তুলে? বেক্কেলের মতো কাজ করিস কেনো?”
-“তুমি বেক্কেলের মতো রাস্তায় দাঁড়িয়ে মেয়ে দেখবা আর আমি ছবি তুললেই দোষ!”

ঈশান আকাশের দিকে দু’হাত তুলে বললো,

-“হায় আল্লাহ, এ নাদান বাচ্চাটার উপর এরা সবাই জুলুম করছে। আমাকে তুমি এদের হাত থেকে রক্ষা করো… আমার কপালে একটা সুন্দরী বউ জুটাই দাও।”

ঈশান সদ্য এম.বি.এ শেষ করেছে। পাশ করার পর সে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, চাকরি খোঁজার বা করার কোনো লক্ষণ তার মাঝে দৃশ্যমান হয় নি আজ অবধি। তাদের পরিবারের রিতী অনুযায়ী বাড়ির ছেলেদের চাকরি পাবার পূর্বে বিয়ে করার অনুমতি দেয়া হয় না। তার দাদুর নিজস্ব কাপড়ের ব্যবসা ছিলো, গুলিস্তানে দু’চারটা দোকানও আছে, যা বর্তমানে ভাড়া দিয়ে রেখেছে। বাবা একটা বেসরকারি ব্যাংকের বড় পদে চাকরিরত, পিথিউশা ফটোজার্নালিস্ট। যে পরিবারের সবাই প্রতিষ্ঠিত সে পরিবারের ছেলে হয়ে ঈশানের মাঝে কোনো হেলদোল নেই। সে যেনো সব ছেড়ে তার পরিবারের বহুকাল অবধি চলিত রীতি ভাঙার পণ করেছে। কথায় কথায় সে বিয়ে, বউ, বাচ্চা টেনে আনে, পিথিউশা বিরক্তিতে মুখ বাঁকিয়ে বললো,

-“তোর প্রিয় শব্দ কি বিয়ে?”

ঈশান আহ্লাদে আটখানা হয়ে বললো,

-“আমার প্রিয় শব্দ বিয়ে, আমার প্রিয় সম্বোধন বউ, আমার প্রিয় জিনিস বাচ্চা…”

পিথিউশা কিছু বললো না, রাগে এবং বিরক্তিতে তার গলা বন্ধ হয়ে আসছে। সে নিজেকে দেখে নিজেই অবাক হচ্ছে, মাঝ রাস্তায় একটা মেয়েকে দেখার জন্য গাড়ী থামানো কি তার মতো বুদ্ধিদীপ্ত মানুষের কাজ হতে পারে! নিশ্চিত ঈশানের সঙ্গে থেকে তার বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। ঈশান এগিয়ে এসে পিথিউশার কাঁধে হাত রাখলো, হাসি হাসি মুখ করে বললো,

-“একটা নামকরা মডেল রাস্তায় দাঁড়িয়ে আইসক্রিম কিনছে, কি অদ্ভুত তাই না ভাইয়া? কেউ বলবে, ম্যাগাজিনের প্রথম পাতায় যার রঙিন ছবি ছাপানো হয় সে এমন সুতি শাড়ী পরে রাস্তার বাচ্চাদের মাঝে আইসক্রিম বিলাবে!”

একটু থামলো ঈশান, আবার বললো,

-“ভাইয়া, তুই কি ওকে দেখে গাড়ী থামাতে বললি? বাই এনি চান্স, লাভ এট ফাস্ট সাইট নয় তো?”

ঈশানকে বেশ উৎফুল্ল দেখালো, পিথিউশা কোনো কথা না বলে গাড়ীর দিকে পা বাড়ালো। মাঝ রাস্তায় পাগল ক্ষেপানোর ইচ্ছে নেই তার, দেখা যাবে বাড়ি গিয়ে তিলকে তাল বানিয়ে সবার কানে তুলছে। পরে তো তাকে বিপদে পড়তে হবে, কি জবার দেবে সবাইকে! ঈশানও তার পিছু পিছু এগিয়ে এলো, সে গুন গুন করে গাইছে, “পেহলি নাজার মে, কেসা জাদু কারদিয়া…, তেরা বান বেঠা হে, মেরা জিয়া…।” ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ী স্টার্ট দিয়ে রসিয়ে রসিয়ে বললো,

-“আজকের তাজা খবর, বাংলাদেশের স্বনামধন্য ফটোজার্নালিস্ট পিথিউশা হক প্রেমে পড়েছেন। গোপন সূত্রে জানা গেছে, এ তরুণ ফটোগ্রাফারের মন চুরি করা মানুষটিও খুব সাধারণ কোনো মানুষ নন। তিনি বর্তমান সময়ের মডেলিং স্টার অতসী রহমান। তো দর্শক, আপনাদের মতামত কি? কেমন জমবে এই ফটোগ্রাফার-মডেল জুটি?”

ঈশানের আর কোনো কথাই তখন পিথিউশার কানে যাচ্ছিলো না, মনের মধ্যে কেবল বীণার ধ্বনির মতো একটাই নাম বাজছিলো, অতসী রহমান! সারাটা রাস্তা ও আর কোনো কথা বললো না, গাড়ীর সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে কেবল ভাবছিলো, হঠাৎ কি থেকে কি হয়ে গেলো তার! কেনো এমন দিশেহারা হয়ে ছুটে গেলো সে মেয়েটিকে একবার দেখার জন্য, এতো বছরে যে অনুভূতি কখনো পিথিউশাকে স্পর্শ করতে পারে নি আজ কেনো সে অনুভূতির অস্তিত্ব নিজের মাঝে টের পাচ্ছে সে! এমনটা তো হবার কথা ছিলো না…


রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়েই বাড়ির পেছনের শিউলি গাছতলায় ছুটে গেলো অরিত্রী। এ গাছটা তার অনেক প্রিয়, স্কুলে পড়াকালীণ এক শিক্ষককে অনেক অনুরোধ করে চারাটা এনেছিলো। তারপর কতো বছর কেটে গেলো, গাছটাও যেনো দু’হাত ভরে অরিত্রীকে তার পরিশ্রমের ফল দিয়ে যাচ্ছে। শরৎকাল চলে এসেছে প্রায়, প্রতিদিন বাড়ি ফিরে অরিত্রী একবার গাছটার কাছে আসে, ভাবে এই বুঝি শিউলি কলি বের হলো… তবে আজও তার আশা পূরণ হলো না। অরিত্রীদের বাড়িটা তার দাদুর তৈরি, বাড়ির চারপাশে তার মা মিনতি রহমান নানান ফল গাছ লাগিয়েছেন, কতোবার এ গাছটা উপড়ে একটা আমগাছ লাগাতে চেয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু অরিত্রীর বারনে পারেন নি। তিনি কি করে বুঝবেন এ গাছের মর্ম! এইতো কিছুদিন পর এ গাছে ফুল ফুটবে, অরিত্রী নিজের ঘরে বসে রাতভর ফুলের সুবাস পাবে। জানলার ধারে বসে বই পড়ার সময় তখন যে তার মন ষোলো বছরের কিশোরীর মতো তাথই তাথই নৃত্য করে তা কি তার মা জানে, জানে না। জানলে নিশ্চয়ই এ গাছটাকে উপড়াতে চাইতো না! শরৎ এর সকালে শিউলি ফুলের চাদর বিছানো থাকে গাছতলায়, কেউ মাড়াবে সে ভয়ে অরিত্রী কতোবার আঁচলে ফুল কুড়িয়ে নিয়েছে তার হিসেব নেই। শিউলি ফুলটা যে তা বড্ড প্রিয়…

অরিত্রীরা দুই বোন, এক ভাই। অতসী আর অরিত্রী জমজ হলেও অতসীর জন্ম অরিত্রীর পাঁচ মিনিট আগে। সে সুবাদে অরিত্রী অতসীকে আপু বলে ডাকে। বাবা-মা, ছোটভাই অমিত আর অতসীকে ঘিরে অরিত্রীর ছোট্ট পৃথিবী। ছিমছাম, সাদামাটা জীবনটা কতোই না নির্বিঘ্নে কেটে যাচ্ছে, প্রাণভরে স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ে অরিত্রী…

বাড়িতে প্রবেশ করেই বাবা-মায়ের ঘরে উঁকি দিলো অরিত্রী, গতকাল রাত থেকে আতিকুর রহমানের শরীরটা ভালো নেই। অতসীর সঙ্গে আবার ওনার বাকবিতণ্ডা হয়েছে গতরাতে। মেয়েটা যে কি, সবসময় নিজেকে নিয়ে মেতে থাকে। বর্তমানে আতিকুর রহমানের সব চিন্তা তো তাকে ঘিরে। মেয়ের মডেলিং করায় তার আপত্তি না থাকলেও, রাত করে বাড়ি ফেরায় আছে। তাছাড়া আজকাল অতসী এ বাড়িতে থাকতে চায় না, সে চায় গুলশানে তার কেনা ফ্লাটে সপরিবারে থাকতে। মাঝে মাঝে অরিত্রী ভাবে, এতো এতো প্রজেক্ট হাতে না নিলে কি হয়। মডেলিং করার ইচ্ছে ছিলো করছে, তাদের তো আর অভাবের সংসার না। তবে এতো টাকা দিয়ে হবে টা কি! তার থেকে পরিবারকে একটু সময় দিক… পুরোনো দিনগুলো খুব মনে পড়ে তার, তাদের তিন ভাইবোনের খুনশুটি, মায়ের বিরক্তি, বাবার শাসন, সব যেনো সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেলো! আজকাল স্মৃতিগুলোকেও কেমন ঝাপসা লাগে।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here