শিউলিবেলা,পর্বঃ ১৮ শেষ

শিউলিবেলা,পর্বঃ ১৮ শেষ
খাদিজা আরুশি আরু

২৪
অতসীর পাশে শুয়ে স্বাভাবিক হতে পারছে না অরিত্রী, এপাশ ওপাশ করছে বারংবার। তার অনেক কিছু জানার আছে কিন্তু প্রশ্ন করবার সাহস পাচ্ছে না। অমিতটা থাকলে বেশ হতো, অন্তত সবটা তার থেকে জানা তো যেতো… অরিত্রীর ছটফটানি হয়তো অতসী বুঝলো, অরিত্রীর দিকে ফিরে শুয়ে প্রশ্ন করলো,

-“তোর কি কোনো প্রশ্ন নেই অরিত্রী?”

এ সুযোগটাই এতোক্ষণ খুঁজছিলো অরিত্রী, পেয়ে গিয়ে আর হাতছাড়া করলো না। বালিশে হেলান দিয়ে বসে বললো,

-“তুই ওনাকে বিয়ে করলি না কেনো? মানে কি হলো আমার অনুপস্থিতিতে যে তোরা বিয়ে না করে এখানে চলে এলি?”

অতসী চোখ, মুখ কুঁচকে বললো,

-“এতো ন্যাকামি করিস কেনো? বিয়ে হলো না তার আগেই উনি… হুহ!”

অতসীও অরিত্রীর পাশে বালিশে হেলান দিয়ে বসে, শান্তস্বরে বলে,

-“তুই আমাকে এতোটা স্বার্থপর ভাবিস জানতাম না। আমি বরাবরই নিজের কাছে পরিষ্কার থাকতে পছন্দ করি, যা আমার তা বরাবরই আমার। আমার জিনিস আমি কাউকে দেবো না, কারন আমি তোর মতো উদার নই। কিন্তু যা আমার নয় তা আমি কেনো অন্যের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবো? আমি পিথিউশাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলাম কারন মা বলেছিলো পিথিউশা সবসময়ই আমাকে ভালোবেসেছে, তার মনে আমার একান্ত আধিপত্য। কিন্তু এ তথ্যটা তো মিথ্যে… ও সবসময় তোকে ভালোবেসেছে, ও তোকে দেখে মুগ্ধ হয়েছে। এ কনফিউশনটা তৈরি হয়েছে তোর সত্য লুকানোর জন্য আর ঈশান গাধাটার বেশি বোঝার জন্য…”

অরিত্রী সবিস্ময়ে প্রশ্ন করলো,

-“সে কি, তুই ঈশানকে গাধা বলছিস কেনো? ও কি করলো?”

অতসী এ পর্যায়ে এসে রেগে গেলো, গলার স্বরে ক্রোধের রেশ স্পষ্ট, বললো,

-“ওটা শুধু গাধা নয়, জন্মগাধা… ও বলেছে বলেই তো পিথিউশা আমার নামে বাড়িতে উপহার পাঠিয়েছিলো, নতুবা তো ও তোর নামেই পাঠাতো। তোকে প্রথমবার দেখেই তো সে প্রেমে পড়েছিলো… তোর মতো জনদরদী মেয়েই তো তার পছন্দ!”

অরিত্রীর বিস্ময় এখন সীমানার বাহিরে, সবিস্ময়ে সে প্রশ্ন করে,

-“আমাকে দেখে পিথিউশা প্রেমে পড়েছিলো?”
-“হ্যাঁ, ওই যে তুই রাস্তার বাচ্চাদের আইসক্রিম কিনে দিচ্ছিলি তা দেখেই তো সে পটে গেলো। সত্য জানলে এতোদিনে তোদের বিয়ে হয়ে ক’জোড়া বাচ্চাও হয়ে যেতো।”

এ পর্যায়ে অরিত্রীর ভীষণ লজ্জা হয়, আবার ভালোও লাগে। মন মন্দিরে সুখ ঘন্টা ঢং ঢং করে বেজে উঠে, মানুষটা তাহলে শুরু থেকেই তার ছিলো! তবুও অতসীর কথার প্রত্যুত্তরে বলে,

-“ধুর আপু, কি যে বলিস। ঘুমা তো…”

মুখে ঘুমা বললেও অরিত্রী জানে অতি সুখের দমকে তার চক্ষুদ্বারে আজ আর ঘুমকুমার ধরা দেবেন না। বিনিদ্র রজনীই কাটাতে হবে তাকে, তবুও এ যেনো সুখের নিদ্রহরণ…

অতসী আবার বললো,

-“অমিত না বললে তো আমি ওই স্টেপটা নিতাম না। একবার মনে হলো যা হয় হোক, পিথিউশাকে আমার চাই। কিন্তু পরে মনে হলো যা আমার নয় তা কখনোই আমার হবে না। তাই তো ওকে সবটা বুঝিয়ে বললাম, তোর উদারতা আর নির্বুদ্ধিতার কথা, তখনই তো জানলাম ঈশানের গাধামীর কথা…”

অতসী কথা বলে যাচ্ছে, তার কথা অরিত্রীর কান অবধি পৌঁছালো কিনা বুঝা গেলো না, সে তো তখন অনাবিল সুখের সমুদ্রে সাঁতরে বেড়াচ্ছে দিগ্বিদিক শূণ্য হয়ে…

পরিশিষ্টঃ
এক মাস আগে সিঙ্গাপুর থেকে সার্জারি সম্পন্ন করে ফিরেছে অতসী, তার চেহারা বর্তমানে আগের থেকেও বেশি লাবণ্যময়। গত একমাসে সে নতুন নতুন অনেক শো এর অফার পেয়েছে। কয়েকজন ডিরেক্টরতো তাদের সিনেমার মেইন লিডে তাকে নিতে চাচ্ছে। পিথিউশা আর অরিত্রীর ব্যাপারটাও গত একমাসে বেশ মাখোমাখো পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। দু’বাড়িতেই তাদের বিয়ের তোড়জোড় চলছিলো তড়িৎ গতিতে…

আজ অরিত্রী আর পিথিউশার বিয়ে, বিয়ের খুটিনাটি আয়োজন অতসী, অমিত আর ঈশানের তদারকিতেই হয়েছে। বিয়ের পুরোটা সময় অতসী উঠতে বসতে ঈশানকে গাধা, গরু, শেয়াল, ভাল্লুক, উল্লুক যা তা ডেকে গেছে। এক সময় বিরক্ত হয়ে ঈশান জিজ্ঞেস করেছে,

-“সত্যি করে বলুন তো, আমাকে কি আপনার পছন্দ অতসী?”

প্রশ্ন শুনে অতসী কিছুটা বিচলিত হয়, পর মুহূর্তে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলে,

-“আপনার মতো উল্লুককে পছন্দ করতে আমার বয়েই গেছে। আয়নায় নিজেকে দেখেছেন? আমার সামনে কতো ব্রাইট ফিউচার আর আপনার? নিজ শিক্ষাকে কাজে না লাগিয়ে বাপ-ভাইয়ের ঘাড়ে বসে অন্ন ধ্বংস করছেন, আপনি তো আমাদের অমিতের থেকেও অপরিপক্ক। আপনাকে পছন্দ করে কি উচ্ছন্নে যেতে বলছেন আমাকে?”

অপমানে ঈশানের কপালের রগ দপদপ করে, ভারী গলায় বলে,

-“তাহলে আমাকে উঠতে বসতে ধমকাচ্ছেন কেনো? আমাকে যে বিয়ে করবে একমাত্র সে’ই পারবে আমাকে ধমকাতে। তার একটুখানি ধমক শোনার জন্য আমি পায়ের কাছে বসে থাকবো বুঝলেন। আমি হবো পৃথিবীর শ্রেষ্ট বর, যাকে বউ মারলেও দূরে যাবে না। সারাদিন ফেবিকলের মতো বউয়ের সঙ্গে সেঁটে থাকবে… আপনি আপনার ইন্ডাস্ট্রির কাউকে বিয়ে করলে সে কি আপনাকে এভাবে প্রায়রিটি দেবে?”

একটু থেমে ঈশান আবার বলে,

-“আচ্ছা আমি যদি একটা চাকরি করি তবে কি আপনি আমাকে পছন্দ করবেন? বেশি না, একটুখানি পছন্দ… এই ধরুন এক কণা লবনের সমপরিমাণ? কথা দিচ্ছি, আপনাকে কখনো আমার বা আমার পরিবারের জন্য নিজের ক্যারিয়ার ছাড়তে হবে না।”

অতসী ক্ষণিকের নিরবতা পালন করে, তারপর গম্ভীরস্বরে বলে,

-“আসলে ঈশান আমি এ মুহূর্তে বিয়ের কথা ভাবছি না। একটা দুর্ঘটনার কারনে আমি বেশ কিছুটা সময় আমার ক্যারিয়ার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম, বর্তমানে আমি আবার নতুন করে সবটা শুরু করেছি। এ মুহূর্তে বিয়ে করা মানে পুনরায় ক্যারিয়ার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। আপনি জানেন না, এ জায়গায় আসতে আমাকে কতোটা কাঠখড় পোঁড়াতে হয়েছে। এমনকি আমার প্রথম প্রেম পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হয়েছে…”

ঈশান অবাক হয়ে প্রশ্ন করে,

-“মানে?”
-“আয়ান, আমার প্রথম প্রেম। তাকে সত্যিই ভালোবেসেছিলাম। তখন আমি সবে দু-চারটা মডেলিং এর অফার পাচ্ছি, এ পেশাটা আমার স্বপ্ন… আমি তো আনন্দে আত্মহারা। কিন্তু হঠাৎ একদিন আয়ান বললো, “তুমি এসব করবে না আর কখনো। সব ছাড়ো… এসব যারা করে তাদের চরিত্রের ঠিক নেই। আমি ভেবে পাই না, একজন ভদ্র ঘরের মেয়ে হয়ে তুমি এসব কেনো করছো?” সেদিনের পর আমি আর কখনো আয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করি নি। কারন সে আমাকে, আমার পেশাকে হেয় করেছে। আমার পেশার কারনে কি আমার আমি টা বদলেছি বলুন? বদলাই নি। তার পরিবারে ক্রাইসিস এসেছে, সে তখন আমারই বোনের কাছ থেকে সাহায্য নিয়েছে। আমি জানতাম অরিত্রীর ওর প্রতি একটা দুর্বলতা আছে, কিন্তু যে মানুষটার চিন্তাধারা এতোটা নিচ আমি না নিজে তার সান্নিধ্য চাই, না আমার বোনকে তার সান্নিধ্যে থাকতে দিতে চাই। এ কারনেই মাঝখানে বেশ কিছু বছর যাবত অরিত্রী আর আমার মাঝে একটা কনফ্লিক্ট চলছিলো। আমি কখনো আগ বাড়িয়ে ঘটনার ক্লারিফিকেশন দিতে যাই নি কারন আমি নিজের কাছে স্বচ্ছ কাঁচের মতো পরিষ্কার ছিলাম। আমার কোনো বন্ধু হয় নি এতো বছরেও, কাউকে ততোটা কাছে আসতে দেইনি যতোটা কাছে আসলে নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায়। কেনো জানেন? কারন আমি নিজের কাছে পরিষ্কার থাকতে পছন্দ করি। ব্যক্তিজীবন আর কর্মজীবনকে মিলিয়ে ফেলতে চাই না। বুঝতে পারছেন, এই ক্যারিয়ারের জন্য আমি কতোটা স্যাকরিফাইস করেছি?”

ঈশান কিছু বলতে পারে না, অপলক তাকিয়ে থাকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অতসীর দিকে। এ মানুষটাকে কম বেশি সবাই চেনে, কিন্তু আজ ঈশান ওকে যেভাবে চিনলো সেভাবে কি কেউ চেনে? তৎক্ষণাৎ ঈশান ঠিক করলো, যা হয় হোক, বিয়ে করলে সে অতসীকেই করবে। এই যে এ মুহূর্তে সে মোবাইলে অতসীর এ্যাসিসট্যান্টের পোস্টের জন্য সিভিও ড্রপ করে দিয়েছে। ই-মেইল পেয়ে চোখ বড় বড় করে ঈশানের দিকে তাকালো অতসী, ঈশান স্বভাবসুলভ হেসে বললো,

-“এভাবে তাকাচ্ছেন কেনো ম্যাম? আপনিই তো কিছুক্ষণ আগে বললেন, আমি বেকার। বসে বসে বাপ-ভাইয়ের টাকায় কেনা অন্ন ধ্বংস করছি… এখন কাজ করতে চাইছি তাতেও রিয়েক্ট করছেন? আপনি কি চান বলুন তো?”

অতসী রাগে দাঁত কটমট করে বলে,

-“কাজ করতে বললাম বলেই আমার সঙ্গে কাজ করতে হবে? দুনিয়াতে আর কোনো কাজ নেই?”
-“কাজ তো অনেক আছে তবে আপনার সঙ্গে কাজ করে যে আনন্দ তা তো অন্য কারো সঙ্গে কাজ করে নেই… আজ থেকে আমার অপেক্ষার আর আপনার ধৈর্য্যের পরিক্ষা শুরু ম্যাডাম। বিয়ে করলে আপনাকেই করবো, মার খেলে আপনার হাতেই খাবো, যা তা কথা শুনলে আপনার থেকেই শুনবো। আজ থেকে অনন্তকালের জন্য আমি আপনার অধিনস্ত…”

কথা শেষ করেই উল্টো ঘুরে হাঁটতে শুরু করে ঈশান। তার যাবার পথে দৃষ্টিপাত করে মুচকি হাসে অতসী। কেনো যেনো ঈশানকে মনের কথা বলতে পেরে তার ভালো লাগছে। ঈশানের শিষ বাজানোর শব্দ অতসীর কানে আসছে, মনে হচ্ছে এ কোনো শ্রুতিমধুর বাদ্য ধ্বনি। হঠাৎ অতসীর মনে হলো, যে কথা কোনোদিন সে কাউকে বলে নি বা বলতে পারে নি, সে কথা আজ ঈশানকে অকপটে বলে দিয়েছে। তবে কি তার ধৈর্য্যের বাধ ভেঙে সেখানে প্রণয় বন্যা সৃষ্টি করতেই ঈশানের আগমন ঘটেছে! ইশ, শেষমেশ কিনা অতসীকে এই জন্মগাধাটার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে হবে…

অরিত্রী-পিথিউশার বাসর ঘরে ঘটলো নতুন বিপত্তি। বাচ্চাদের মতো খাটের পায়া ধরে বসে আছে ঈশান, সবাই বলেও তাকে ঘর থেকে বের করতে পারলো না। এ বাড়িতে অমিত এসেছে অরিত্রীর সঙ্গে, শেষমেশ এতো রাতে অমিতের ফোন পেয়ে পিথিউশাদের বাড়িতে আসতে হলো অতসীকে। সবাইকে চমকে দিয়ে অতসীর একবার বলাতেই খাটের পা ছেড়ে দিলো ঈশান, এমনকি অতসীর পেছন পেছন ঘর থেকেও বেরিয়ে এলো। অতসী অরিত্রী-পিথিউশার ঘর থেকে বের হয়ে লজ্জায় কিছু না বলেই নিজ বাড়ির পথে রওনা দিলো। এখনই এ দশা, ঈশানটা তাকে ভবিষ্যতে আর কতো অপদস্ত করবে কে জানে…

অরিত্রীকে একটা কমলা পাড়, সাদা বেনারসি পরানো হয়েছে। গা ভর্তি ফুলের গয়না… তাকে দেখে পিথিউশার সদ্য ফোঁটা শিউলি ফুল মনে হলো। পিথিউশা এগিয়ে এসে বসলো অরিত্রীর পাশে, একহাতে অরিত্রীকে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়ে কানের কাছে মুখ নামিয়ে বললো,

-“আজকের এই চন্দ্রীমা রাতে তোমায় দেখে শিউলি ফুলরা হিংসায় জ্বলে যাবে অরিত্রী।”

অরিত্রী মুখ তুলে পিথিউশাকে দেখার চেষ্টা করে, তার চেষ্টাকে সফল হতে না দিয়ে পিথিউশা আরো শক্ত করে তাকে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নেয়। ফিসফিস করে বলে,

-“একদম চুপ করে আমার বুকের মাঝে লুকিয়ে থাকো তো অরিত্রী। তুমি নড়লে তো আমার শিউলি ফুলে নজর লেগে যাবে…”

অরিত্রী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

-“শিউলি ফুল!”

পিথিউশা ক্ষীণস্বরে বলে,

-“তুমিই তো আমার শিউলি ফুল…”

পিথিউশার কথার প্রত্যুত্তরে কিছু বলতে পারে না অরিত্রী, চুপ করে মুখ গুজে রাখে পিথিউশার বুকে। একসময় দুজন মানব-মানবী মত্ত হয় পরস্পরকে আবিষ্কারের নেশায়! পূর্ণতা পায় তাদের ভালোবাসা, সূচনা ঘটে নব জীবনের পথচলার…

“শেষ”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here