পরিবর্তন,পর্বঃ ৪ (শেষ)

#পরিবর্তন,পর্বঃ ৪ (শেষ)
লেখাঃ মান্নাত মিম

১৬.
রাত যত গভীর হচ্ছে কলির মা’য়ের ভয়ের প্রবণতা ততটাই বাড়ছে। বাড়ারই কথা মেয়ে গেল পড়তে রাত অত হয়ে এলো মেয়ের কোন খবর নেই। স্বামী করিম মিয়া-ও এখনো বাড়িতে আসেননি কাজ থেকে। এলে নাহয় তাঁকে পাঠাতেন মেয়ের খোঁজে। এখন মনে হচ্ছে স্বামীর আশায় না বসে থেকে নিজেই খোঁজ নিতে বের হয়ে যাওয়াই ভালো।

মাস্টার মশাইয়ের বাড়ি খুব বেশি একটা দূরে নয়। যেতে সময় লাগল না তাও আবার যেই দ্রুত গতিতে হেঁটে গিয়েছেন আধঘন্টার রাস্তা পনেরো মিনিটে শেষ। বাড়ি পৌঁছে কেমন নিরালা, নিস্তব্দতায় ছায়া পেলেন। কেউ কি নেই? ভয়ে কলিজা থেকে গলা পর্যন্ত শুঁকিয়ে। হাঁক ছাড়লেন মাস্টার মশাইয়ের নাম ধরে। ঘর থেকে বের হলেন মাস্টার মশাইয়ের স্ত্রী।

“মাস্টার মশাই বাইত নাই।”

“না, উনি তো মাত্রই বাইর হইলেন। কেন?”

“কলি যে বাইত ফিরে নাই।”

উদ্বিগ্ন হতে দেখা গেল মাস্টার মশাইয়ের স্ত্রীকে। তিনি চিন্তিত গলায় বললেন,

“কলিদের আজ তো বেশি পড়ান নাই। মাইয়া অসুস্থ গঞ্জের সরকারি হাসপাতালে নিয়া গেলেন তাই ওদের ছুটি দিয়া দিছেন।”

এবার কলির মা’য়ের কান্না দেখে কে। উন্মাদনা কাজ করছে তাঁর মাঝে। সেটা দেখে মাস্টার মশাইয়ের স্ত্রী এগিয়ে এসে ফের বললেন,

“দেখেন তো গিয়ে, ও কোন সখির বাসায় না কি। না পেলে জেলা থানায় যান তাড়াতাড়ি।”

মাস্টার মশাইয়ের স্ত্রী শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী। তাঁর কথায় সময় না ব্যয় করে ছুটলেন ফের কলির পরিচিত সকল বান্ধবীদের বাড়িতে।

১৭.
রাত হয়ে ভোর নামল। কলির কোন খবর পাওয়া গেল না। রাতেই থানায় গিয়ে পুলিশকে মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার খবর জানান করিম মিয়া ও তাঁর স্ত্রী। পুলিশ খোঁজ নিবে বলে জানায় এতটুকুই। গর্জ করে না তাছাড়া রিপোর্ট লেখারও একটা সময়সীমা আছে বলে নানাবিধ ব্যাখ্যা তুলে ধরেন, এতে খুব ভালো করেই তাঁদের অনিহা বোঝা যায়। কিন্তু বাবা-মা’র মন তো মানে না। গরীবদের হাহাকার শোনার মতো কেউ নেই। রাতটা যুবতি মেয়ে হারানোর শোকে কোনরকম কেটে যায়। গরীবের বন্ধু গরীব ছাড়া পাশে কাউকেই পাওয়া যায় না। ফের সকালে আরেকবার থানার উদ্দেশ্য রওনা দেয় করিম মিয়া। এবার স্ত্রীকে নেওয়ার মতো অবস্থা নেই। খানিক পর পর “মেয়েকে এনেও দেও, এনে দেও” বলে জ্ঞান হারাচ্ছেন কলির মা। উপায় না পেয়ে তাঁকে বাড়িতে প্রতিবেশী মহিলা’দেড কাছে রেখেই থানার উদ্দেশ্য হাঁটা দেন, এমন সময় মাঝ পথে থামতে হয় তাঁকে দেখা হয় মাস্টার মশাইয়ের সাথে। ভ্যানে করে চড়া মেয়ের লাশ পাশে তিনি বসে আছেন উদাসীন রক্তমাখা চক্ষু নিয়ে। বুঝাই যাচ্ছে তাঁর মতোও মেয়ে হারানোর শোকে শোকাহত মাস্টার মশাই। তবে মুখ পাংশুটে হয়ে আছে। করিম মিয়া নিজের মেয়ে হারানোর খবর কী দিবেন, মাস্টার মশাইয়ের মৃত মেয়েকে দেখে বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। যদিওবা রাতে কলির মা তাঁকে জানিয়েছিল, মাস্টার মশাই মেয়ে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছেন। তাই বলে… আর ভআতে পারছেন না। সম্বিত ফিরলে মাস্টার মশাইকে কলিকে না পাওয়ার ঘটনা জানান। কিন্তু অতি শোকে পাথর মাস্টার মশাই নির্বাক চাহনি ছাড়া কিছুই বলতে পারেন না।

১৮.
হতাশামূলক আশা নিয়ে ফিরতে হয়েছিল করিম মিয়াকে। বাড়ি ফিরে সেই খালি শূন্যতায় বিরাজিত পান আর কলির মায়ের জ্ঞান ফেরার পর চিৎকার চেঁচামেচি। সকাল গড়িয়ে দুপুরে হন্তদন্ত হয়ে লুৎফর আসে। ছেলেটা অল্প বয়সের, তবে এই গাঁয়ের না পাশের গাঁয়ের। ঘুরে বেড়ানো কাজ। এই গাঁয়ে, সেই গাঁয়ে ঘুরাঘুরি এর-ওর ফল গাছ থেকে ফল চুরি, পুকুর কিংবা খাল হতে মাছ হাতিয়ে নেওয়া ছাড়া এর আর কোনে কাজ নেই। লেখাপড়া তো কয়েক’শ মাইল দূরের বিষয়।

“খালু জলদি আমার লগে আহেন।”

“তুই এমুন হাঁপাইতাছস ক্যান? কী অইছে?”

“আগে আহেন তো।”

করিম মিয়া দ্রুত চলতে লাগলেন লুৎফরের সাথে। তাঁর মন বলছে, কলির কোন খোঁজ বোধহয় পাওয়া গেছে। অবশ্যই পাওয়া গেছে জনসম্মুখের এত ভিড়ে সাদা কাপড়ে ঢাকা আঁচড়ে যাওয়া সাদা ও ফ্যাকাশে কলিকে পাওয়া গেছে। পানিতে অনেকক্ষণ থাকলে যেমন দেখায় তেমন ফ্যাকাশে হয়ে ভয়ংকর দেখা যাচ্ছে। পেটে পানিতে ভরে ফোলে আছে। তরতাজা লাশ হলে মুখের এবড়োখেবড়ো আঁচড় জখমি রক্ত দেখা যেত, যেটা আপাতত নেই৷ এত ভয়ংকর দেখার মাঝেও করিম মিয়ার ভয় হচ্ছে না, অনুভূতি শূন্য লাগছে। আশেপাশে কতশত মানুষের ভিড় তবুও তারা দূরে দাঁড়িয়ে, কারণ হাসি-তামাশা দূর থেকে দেখেই মজা পায় তারা। পুলিশ ব্যস্ত ফোনে লাশ ফরেনসিকে নিতে। রিপোর্টার পৌঁছালো মাত্রই। দৃশ্য ও পুলিশের কাছ থেকে তথ্যাদি নিয়ে সংলাপ ধারণ করতে তাঁরা-ও ব্যস্ত। কেউ খবর নিলো না একজন সন্তান হারানো বাবার, পাশে এসে স্বান্তনার বাণী শুনিয়ে খানিকের জন্য স্থবির হওয়া থেকে রেহাই দিতে।

১৯.
“পরিবর্তন- সমাজ, রাষ্ট্র ব্যবস্থার কতটুকুই বা পরিবর্তন হয়েছে নিজ চোখে দেখলেন তো আপনারা? ‘ধর্ষণ’ নামক ব্যাধি এখনো ছড়িয়ে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র নষ্ট করছে। এই ব্যাধি থেকে আদৌও কি মুক্তি মিলবে? প্রশ্ন রইল জনগণের কাছে।”

রিপোর্টার শিমলা আমজনতার কাছে প্রশ্ন রেখে ক্যামেরা বন্ধ করে দিলেন। পুলিশের সাথে কিছু কথা বলতে চলে গেলেন। করিম মিয়া সেই যে পুকুরের পাশে বসে আছে, এখনো সেভাবেই বসে। মনমস্তিষ্ক শূন্য, কলির মা’কেও খবর পাঠাননি মেয়েকে একনজর দেখার জন্য। খানিক পর পুলিশ চলে যাবে তখন কিছু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এগিয়ে আসেন। কিন্তু করিম মিয়া শুধু বললেন,

“আসলেই কি ধর্ষণকারী গো বিচার করবেন?”

আচমকা এই কথায় হকচকিয়ে যান পুলিশ অফিসার। কোন কথার মাঝে কোন কথা বলছে লোকটা। বিরক্ত হতে দেখা যায় তাঁর মুখ। করিম মিয়ার বুঝেন সেসব বিরক্তিকর মুখের কারণ। যারা কাজটা করেছে, তদন্তের মাধ্যমে তাদের পর্যন্ত পুলিশ পৌঁছাবে। তবে সেখানে কথা হলো ফায়দা লুটতে না কি সঠিক বিচার করতে। মোটা অংকের টাকা সেসব ক্রিমিনাল’দের পকেট থেকে বের করাই পুলিশের মূল বিচারবিশ্লেষণের মিশনে নামা। গ্রামীণ সহজ-সরল মানুষ হলেও অতটুকু ধারণা আছে করিম মিয়ার। কারণ যুগ দেখছেন, পরিবর্তনের নামে শোষণ ক্ষমতা কায়েম হচ্ছে।

সমাপ্ত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here