প্রার্থনায়_তুমি #পর্ব-০৩,০৪

#প্রার্থনায়_তুমি
#পর্ব-০৩,০৪
#Tahmina_Akther

৩.

-এই যে লাল রঙা জামদানী শাড়িতে কি অপরুপ সুন্দর লাগছে তোমাকে তুমি নিজেও জানো না?
তোমার নাকের এই নাকফুল, কানের দুল, হাতের চুড়ি, চুলের খোপায় গুঁজানো এই বেলি ফুল। সবই যেন আগে থেকে জানতো, ওরা তোমার অঙ্গে জড়িয়ে থাকবে।
“মায়া,
তোমার প্রেমে পড়েছি আমি,ভীষণ কঠিনতম প্রেম।এই প্রেমের অনলেই আমি আজীবন পুড়তে চাই”

আমি মায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো অনর্গল বলে যাচ্ছি।আমাদের এই স্বল্প সময়ের সাক্ষাতে মায়ার চোখে আমি দেখতে পাচ্ছি,
আমার জন্য ওর চোখে জন্ম নিয়েছে একরাশ মুগ্ধতা।

আমার হাতের মুষ্ঠিতে আবদ্ধ করে রাখা আরও একটি আংটি পরিয়ে দিলাম মায়ার বাম হাতের কনিষ্ঠা আঙুলে।কারন, অনামিকা আঙুলে আমাদের এনগেজমেন্ট রিং।আংটি পরিয়ে দিয়ে আমি উবু হয়ে মায়ার কনিষ্ঠা আঙ্গুলে চুমু খেলাম। মূর্হুতের মধ্যে আমি স্পষ্ট টের পাচ্ছি মায়ার হাত কাঁপছে তাই ওকে আর বিব্রত না করে আলতো করে ওর হাত ছেড়ে দিলাম।

মায়া লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেললো, আর ওর দেয়া সেই মুচকি হাসি আমি চোরা চাহনিতে দেখে ফেলেছি।মায়াকে আর লজ্জা দিতে চাচ্ছি না তাই আর বললাম না ওর হাসি আমি দেখতে পেয়েছি।

দরজায় নক পরলো,তাড়াতাড়ি বের হতে বলেছে আমাকে। নয়তো আমাদের যেতে দেরি হয়ে যাবে।
আমি যাওয়ার জন্য রুম থেকে বের হয়ে এলাম, সাথে মায়াও আমার সঙ্গে বের হয়ে এলো।

সদর দরজা দিয়ে বের হবার আগে মায়ার গালে হাত রেখে বললাম,

– মায়া, আমার এখন যেতে হবে।মন দিয়ে পড়াশোনা করো। আমি চেষ্টা করবো খুব দ্রুত যেন তোমাকে আমার বৌ বানিয়ে নিয়ে যেতে পারি। আমি সবসময়,তোমাকে আমার বুকের মধ্যেখানে রাখবো। আজ আসি, আমার আমানত এখন তুমি।তাই আমার আমানত তোমার কাছে জমা দিলাম, যত্নে রেখো।ভালো থেকো মায়া, আল্লাহ হাফেজ।

কথাগুলো বলে আমি সদর দরজা দিয়ে বের হয়ে পরলাম।রাস্তায় এসে দেখি বাইরে বাবা-মা,আসিফ অপেক্ষা করছে।আমি গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

হঠাৎ করে মায়ার কন্ঠ শুনে আমার হাঁটার গতি কমে গেলো।পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখি।মায়া আমার দিকে এগিয়ে আসছে।দ্রুতপায়ে হেটে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বললো,

– আমার আমানত ও আপনার কাছে দিলাম। যত্নে রাখবেন এবং খুব শীঘ্রই এসে আমাকে আপনার বৌ বানিয়ে নিয়ে যাবেন। বাড়িতে পৌঁছেতে আমাকে কল করে জানাবেন, কিন্তু?

আমি মায়ার আদেশ শুনে হ্যা সূচক মাথা নাড়িয়ে মুচকি হেসে গাড়িতে গিয়ে উঠে বসলাম। মায়া আমাকে উদ্দেশ্য করে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানালো।

চলন্ত গাড়িতে বসে বসে ভাবছি এইতো,
আসার সময় কত হালকা ছিলাম আমি!কিন্তু, এখন মনে হচ্ছে আমার বুক অনেকখানি ভারী হয়ে গেছে।হয়তো, মায়াকে রেখে যাচ্ছি বলে।
এইজন্যই বুঝি ভালোবাসা নামক শব্দের এত শক্তি। যা কয়েক মিনিটে জীবনের সকল অনুভূতিকে বদলে দিতে পারে।

বাড়িতে পৌঁছানোর পর মায়াকে কল দিয়ে বললাম ,

-মায়া,আমরা পৌঁছে গিয়েছি।

-আলহামদুলিল্লাহ। খাওয়া-দাওয়া করেছেন?

-না।

মায়া আমার উত্তর শোনার পর চুপ করে আছে তাই আমিও চুপ করে আছি। নীরবতা কাটিয়ে মায়া আমাকে প্রশ্ন বললো,

– আপনাকে কিছু বলার ছিলো।

– বলো কি বলবে?নিশু সারারাত
তোমার কথা শুনতে এক পায়ে রাজী। তাড়াতাড়ি বলো। কি বলতে চাও, আমাকে?

– আমার মা-বাবা নেই। আপনি তো জানেন?
চাচা চাচির কাছে বড় হয়েছি।উনারা দু’জন কখনো আমাকে এতিম ভাবেনি, আমাকে উনাদের মেয়ে হিসেবে বড় করেছে। এসএসসি পরীক্ষার পর থেকে আমার জন্য বিয়ের সম্বন্ধ আসতে লাগলো।যদিও আমার চাচা আমাকে তখন বিয়ে দিতে রাজি হয়নি। কিন্তু, যখনি কেউ আমার বিয়ের প্রস্তাব আসত এবং জানতে পারত আমি এতিম তবে উনাদের নাক সিটকানো শুরু হতো। কেউ কেউ বলে ফেলত,”এই মেয়ের সাথে আমার ছেলের বিয়ে হলে শ্বশুরবাড়ির আদর পাবে না।
না বাবা, এমন এতিম মেয়ে আমরা নেব না”বলেই চলে যেতো আমাকে না দেখেই।
এই প্রথম আপনার পরিবার আমার সব কিছু জেনে শুনে আমাকে দেখতে আসলো। আমাকে আপনাদের পছন্দ হলো। অতঃপর, আংটিবদল হলো আমার আর আপনার। কিন্তু, আমার মনে একটি কথা কুট কুট করছে। আপনি কি আমাকে এতিম ভেবে করুনা করছেন?

ব্যস, মায়ার শেষের কথাটি আমার মেজাজ খারাপ করার জন্য যথেষ্ট ছিলো। আমি নিজের রাগের উপর নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে মায়াকে ধমক দিয়ে বললাম,

– তোমাকে আমি বলেছি না, তোমার কেউ নেই এই কথাটি আজ থেকে বলার প্রয়োজন নেই। কারণ,
তোমার জীবনে এখন আমি আছি। তোমাকে আমার বাবা-মা মেয়ের মতো আদরে করে রাখবে।এই বাড়িতে আসার পর তুমিও কখনো ভাবতে চাইবে না যে তুমি এই বাড়ির বৌ নাকি মেয়ে?
আর কখনো যেন তোমার মুখ থেকে এই কথাটি না শুনি যে, আমি তোমার উপর করুনা করেছি।
মায়া তুমি আমার জীবনের একাংশ হয়ে গেছো সেখানে তোমাকে আমি করুণা করছি এই কথাটি কতটুকু বেমানান, তুমি বুঝতে পারছো?

– বাব্বাহ,আমি তো ভেবেছি আপনি শান্ত কিন্তু আমার ধারনা ভুল আপনার যেই রাগ! না জানি,আমি আপনার সামনে থাকলে আপনি আমাকে কি বকা-টাই না দিতেন?

– মায়া,তোমার ওই কথাটি শুনে মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল তাই ওমন উচ্চস্বরে কথা বলে ফেলেছি।
আ’ম সরি, মায়া।আর আজ থেকে এবং এই মূহুর্ত থেকে এই কথাটি জেনে রেখো আমাদের বিয়ের পর কখনো যদি আমি কোনো কারণে রেগে যাই তখন, তুমি যদি আমার হাতটি ধরে বলো, “ভালোবাসি”।তাহলেই, দেখবে তোমার প্রতি জমা করে রাখা আমার সকল রাগ কমে যাবে, বুঝলে?

-” ভালোবাসি ” শব্দটি ছোট হলেও এর মর্ম বেশি।
ধরুন, আমি আপনাকে ভালোবাসি না তবুও যদি আপনার মন রক্ষার্থে আমি “ভালোবাসি” বলি তাহলে কিন্তু আমি আপনার সঙ্গে মিথ্যে বললাম,তাই না?আর শুনুন আমি আপনাকে কখনোই ভালোবাসি বলবো না যতদিন আমি আপনার প্রতি ভালোবাসা উপলব্ধি না করতে পারছি।এবং, এই ব্যাপারটা নিয়ে যদি আপনার মন খারাপ বা রাগ হলেও আমার কিছু করার নেই।

– আচ্ছা, যেদিন তুমি মনে করবে আমাকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসতে পেরেছো,সেদিন আমাকে “ভালোবাসি” বলবে। ঠিক ততদিন, পর্যন্ত আমার ভালোবাসাই যথেষ্ট আমাদের দু’জনের জন্য।

আমার কথাগুলো শুনে সেদিন মায়া অনেক খুশি হয়েছিল কারণ তার উপর কোনো রকম জোর করিনি তাই।

পুরনো স্মৃতিচারণে আবারও চোখ দুটো অশ্রুসিক্ত হয়ে এলো নিশুর।

– কোথায় তুমি মায়া? তোমাকে ছাড়া এই পৃথিবীতে আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে। কখনও কি তোমার দেখা পাবো না আমি ?

******************

দরজায় কে যেন বারবার নক করছে? উফফ একটু শান্তি মতো ঘুমোতে পারছি না। কিছু একটা মনে পড়তেই শোয়া থেকে লাফ দিয়ে উঠে বসলাম এরপর তড়িঘড়ি করে খাট থেকে নেমে পরলাম।ওড়না হাতে নিয়ে খুব ভালো করে গায়ে জড়িয়ে দরজাটা খুলে দিয়ে বলছি,

– সরি,মামনি আর কখনো এমন করবো না।সময় মতো সকালের নাশতা করবো।আমি এক চিমটু বিছানায় শুয়ে ছিলাম কিন্তু কখন যে ঘুমিয়ে গেছি বলতে পারছি না?

কথাগুলো এক নিশ্বাসে বলে অরুণিমা মাথা উচু করে দেখলো ওর সামনে স্বয়ং আয়মান দাঁড়িয়ে আছে।

– হায় আল্লাহ; এতক্ষণ আমি কার সঙ্গে কথা বলছিলাম?আতংকিত হয়ে কথাটি মনে মনে বললো অরুণিমা।

– তো, মিস অরুণিমা এবার আপনি বলুন, ঠিক কোন বেলার খাবার সঠিক নিয়মে খান?গতকাল রাতে দেখলাম আপনি ১২টায় খাবার খাচ্ছেন। আর,আজ এখন পর্যন্ত সকালের নাশতা খাওয়ার নাম গন্ধও নেই। আপনি কি সবাইকে চিন্তা দিয়ে রাখতে ভালোবাসেন?

– আমি আবার কাকে চিন্তা দেখালাম। হয়তো,মামনি আমার জন্য চিন্তা করে আর কেউ তো নেই?শুধুমাত্র, আমার রাতের খাবারের সময়টা এদিক সেদিক হয়। কিন্তু, সকালের খাবার আমি ঠিক সময়ে খাই।কিন্তু, আজ কিভাবে যেন দেরী হয়ে গিয়েছে ?

“হুহু,যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর। মামনি আর উনি যেন বিরক্ত না হয় সেজন্য আমি গেলাম না।সুযোগ পেয়ে উনি এখন ভাষন দেয়া শুরু করেছে, মনে মনে বলছে অরুণিমা “।

আয়মান খেয়াল করে দেখলো, অরুণিমা আনমনা হয়ে, কি যেন বিড়বিড় করে বলছে?হয়তো, আয়মানকে মনে মনে উদ্ধার করে ফেলছে। আয়মান হালকা গলা ঝেড়ে বললো,

– ম্যাডাম,আপনার ভাবনা গুলো আপাতত এক সাইডে রেখে নাশতা খেতে আসুন।আপনার ঔষধ খাওয়ার সময় হয়েছে। মা, আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। কথাটি বলেই নিচে চলে গেল আয়মান।

এই ফাঁকে অরুণিমা তাড়াতাড়ি ওয়াসরুমে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নিচে চলে গেলো ।অরুণিমা একটি চেয়ার টেনে বসে পড়লো। অরণিমা, এবার মামনির দিকে তাকিয়ে দেখলো,উনি বেখেয়ালি হয়ে বসে বসে কি যেন ভাবছে?অরুণিমা চেয়ার ছেড়ে মামনির সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো ,

– কি চিন্তা করছো মামনি?আর এখনো সকালের নাশতা খাওনি কেন?

-আয়মানকে নাশতা দিয়েছিলাম কিন্তু দেখ ও নাশতা না খেয়ে উঠে কোথাও যেন চলে গিয়েছে?

-মা, আমার নাশতা দাও বলেই চেয়ার টেনে বস পড়লো আয়মান।
আয়মানের কন্ঠ পেয়ে আয়মানের মা এবং অরুণিমা দু’জনে তাকালো আয়মানের দিকে।

আয়মানের দিকে তাকিয়ে অরুণিমা ভাবছে, “তাহলে কি নাশতা না করেই আমাকে ডাকতে গিয়েছিলে উনি?”

এদিকে, আয়মানের মা ভাবছে,
“আরুর সঙ্গে নাশতা করবে পাগল ছেলে বললেই হতো, এভাবে উঠে যাওয়ার কি প্রয়োজন ছিলো ওর”?

– কি হয়েছে?তোমরা দুজন এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছো কেন? আমি কোনো অপরাধ করেছি নাকি?

– না,এমনিতেই।

মামনি ও অরুণিমা একসঙ্গে বলে উঠলো। তাদের একসাথে একি কথা বলতে দেখে হেসে ফেললো আয়মান। আয়মান কে হাসতে দেখে মামনি ও হেসে ফেললো।নিজের সামনে দু’জন মানুষ হাসছে আমি কি আর না হেসে পারি। তাই আমিও হেসে ফেললাম।

অরুণিমাকে হাসতে দেখে আয়মান হাসি থামিয়ে তাকিয়ে রইলো অরুনিমার হাসির দিকে।অরুণিমার হাসি দেখাতে মগ্নরত আয়মান ভাবছে,

-খুব কি বেশি চাওয়া হতো যদি তুমি আমার হতে? কিন্তু, আফসোস আমি কখনোই তোমাকে চাইতে পারবো না। খুব বেশিদিন নেই তোমার সুস্থ হতে। তখন,হয়তো আমাদের স্মৃতিও তোমার মনে থাকবে না। কিন্তু, আমি খুব করে বিধাতার কাছে চাই তুমি যেন তোমার আসল অস্তিত্ব খুজে পাও।

-আয়মান,নাশতা সামনে নিয়ে বসে থাকলে নিশ্চয়ই পেট ভরবে না? তাড়াতাড়ি নাশতা শেষ কর। ও হ্যা,আরেকটা কথা মনে পড়েছে। অরুণিমার আজ রেগুলার চেক-আপ ডেট।আজ তুই আরুকে নিয়ে যা।আমার শরীরটা ভালো লাগছে না। তুই কষ্ট করে নিয়ে যাস আরুকে।

-তোমার কি হয়েছে মামনি? তুমি না সকালেও দিব্যি সুস্থ ছিলে?আজ আমার ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন নেই। আমি তোমার সাথেই থাকব।

– আমি কি বলেছি শুনতে পেয়েছিস? তাহলে, কথা না বাড়িয়ে নাশতা শেষ করে তৈরি হয়ে নে।
আয়মান নিয়ে যাবে তোকে। আর একটাও কথা বলবি না।

মামনির ধমক শুনে আর কিছু বলার সাহস পেলাম না আমি।

– ওকে নাহয় নিয়ে যাবো। কিন্তু, তোমাকে দেখতে এইরকম লাগছে, কেন মা?তুমি কি কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তা করছো, মা ?

– না, আমি ঠিক আছি। তুই আরুকে নিয়ে যা। আর শোন, আরু ডাক্তারের সাথে সব কথা খুলে বলবি। তোর এখন আগের থেকে কেমন ফিল হচ্ছে,ঠিক আছে?

আমি মাথা নাড়িয়ে সায় জানালাম। তাড়াতাড়ি নাশতা খেয়ে রুমে এসে বোরকা নিকাব পড়ে তৈরি হয়ে নিলাম। নিচ থেকে আয়মান ডাকছে তাড়াতাড়ি নিচে চলে গেলাম।

আমি অনেকক্ষণ ধরে অরুণিমার অপেক্ষা করছি। কিন্তু, তার আসার কোনো নামই নেই। ওকে ডাক দিলাম পরপর দু’বার।

কারো জুতা পায়ে হাঁটার শব্দ শুনে সিঁড়ির দিকে তাকালাম। দেখি মহারাণী এসেছেন তাও আবার ইরানি মেয়েদের বেশে।কালো বোরকা-নিকাবে আপাদমস্তক শরীর ঘেরা। শুধুমাত্র, ওর চোখগুলো দেখা যাচ্ছিল।ওর সৌন্দর্য বিন্দুমাত্র দেখা যাচ্ছিল না তবু্ও যেন এক অনন্য সৌন্দর্য ওর পুরো শরীরে বিরাজ করছে।

আয়মান এতক্ষণ যে অরুণিমার দিকে চেয়েছিল। তা সবই দেখতে পেয়েছে আয়মানের মা। সন্তানের চেহারার অভিব্যক্তি দেখে তিনিও আল্লাহর কাছে দোয়া করছেন। তার সন্তান যেন অরুনিমা নামক মেয়েকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পায়। ছেলের হাহাকার নিজ চোখে দেখার পর থেকে কেন যেন শরীরটা ভালো লাগছে না। একটু পর পর বুকে ব্যাথা অনুভব হচ্ছে। ছেলেকে বা আরুকে বলে টেনশন দিতে চাইছে না। ওরা বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেই ঔষধ খেয়ে একটু বিশ্রাম নেবেন। তখন ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।

আয়মানের কাছে অরুণিমা এগিয়ে গেলো। আয়মান অরুণিমার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ওর মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অরুণিমাকে নিয়ে বের হয়ে গেলো হাসপিটালের উদ্দেশ্য।

#চলবে

#প্রার্থনায়_তুমি,পর্ব-০৪
#Tahmina_Akther

৪.

শহরের ব্যস্তময় এলাকা টাইগার পাস মোড়। চট্টগ্রামের এই জায়গাটা পাহাড় বেষ্টিত। এই সড়কের মাঝে আছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ভাস্কর্য এবং কৃত্রিম ঝর্ণা। শহরের এই মোড়টি চার জায়গার সংযোগস্থল,তাই বেশিরভাগ সময়ে এই মোড়ে জ্যাম থাকে।

জ্যামে আটকে আছি প্রায় দশ মিনিট। কাচের জানালা ভেদ করে সবুজ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছি।নির্মল এক পরিবেশ, চারদিকে সবুজে ঘেরা,কি অপরুপ সৌন্দর্য! পাহাড়ের দিকে তাকালেই যেন চোখের মাঝে শান্তি বিরাজ করে।
তবে পাহাড় কেটে অনেকেই আবাসস্থল বানাচ্ছে আর এতেই দিন দিন পাহাড়ের সৌন্দর্য নষ্ট হয় যাচ্ছে।

জ্যাম ছুটে গেছে বেশ কিছুক্ষণ সময় অতিক্রম হলো। গাড়ি চলছে ফুল স্পিডে। আয়মান একবার আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলো গাড়ীর কাচ নামিয়ে দিতে। কিন্তু, আমি মানা করে দিয়েছি। ভীষণ ভালো লাগছে প্রকৃতির বিশুদ্ধ বাতাসে প্রাণ ভরে শ্বাস নিতে।উনি কি বুঝবে এই সবের? খালি আছে নিয়ম মেনে সব কিছু কিভাবে করাবে আর হুকুম দিবে। এই লোক অফিসিয়াল কাজ কেন করে ? তার তো উচিত ছিলো আর্মি ফোর্সে চাকরি করার। তাহলেই তো চব্বিশ ঘণ্টা নিয়মের ভিতরে থাকতো।উফফ,এত নিয়ম মেনে কি চলা যায়!

গাড়ির হঠাৎ ব্রেকে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। আয়মানকে কিছু বলব তার আগে আমি খেয়াল করলাম আমরা হসপিটালে চলে এসেছি। আয়মান গাড়ি থেকে নেমে ঘুরে এসে আমার সাইডের দরজা খুলে দিলেন।

আমি তখন অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে। না হওয়া আর্মি খাটাশ আমার জন্য দরজা খুলেছে! বাব্বাহ,আরু তোর আজ কার মুখ দেখে ঘুম ভাঙলো!আমি তো মনে মনে এইসব ভেবে নিজেই নিজের উপর গর্ববোধ করছিলাম। কিন্তু, বেশিক্ষণ এই গর্ববোধ টিকলো না।

কারণ, তার আগেই আয়মান দাঁত দাঁতে চেপে ধমক দিয়ে বলছে,

– কি হয়েছে তোমার? গাড়িতে উঠার পর থেকেই দেখছি কি যেন ভাবছো? আমি কখন থেকে দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছি আর কি না নামছো?

– আমি কানে কালা না ঠিক আছে? আস্তে কথা বললে শুনতে পারি আমি। আপনি জোরে গাড়ি ব্রেক করার কারণে আমি ভয় পেলাম। এখন ভয়ে আমার শরীর কাঁপছে দেখুন বিশ্বাস না হলে?

– আমি গাড়ি আস্তে ব্রেক করেছি। কেউ যদি ভাবনার দেশে থাকে তাহলে আস্তে নড়লে বলবে ভূমিকম্প এসেছে।

– আপনি কি আমাকে ইনডিরেক্টলি অপমান করছেন?

– না, সেই সাহস কি আমার আছে না-কি? কথা না বাড়িয়ে এখন গাড়ি থেকে নেমে পরো । আজ ডক্টরের সাথে দেখা করবে না?

আয়মানের কথাগুলো শুনে রাগ দেখিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পরলাম। আমি একপাশে দাঁড়িয়ে আয়মানের জন্য অপেক্ষা করছি। আয়মান গাড়ি পার্কিং করে এসে আমার হাত ধরে হসপিটালের ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে।হঠাৎ, উনার আচরণের পরিবর্তন দেখে আমি কিছু সময়ের জন্য বিস্মিত হয়ে পরলাম। আমার হাঁটার গতি হুট করে বন্ধ হয়ে যায় । আমাকে হাঁটতে না দেখে আয়মান পেছনে ফিরে তাকায় আমার দিকে। আয়মানের প্রশ্নসূচক দৃষ্টি আমার চোখের দিকে তাক করা। উনাকে বোঝানোর জন্য আমি আমার হাতের দিকে তাকাতে উনাকে চোখের ইশারায় দেখালাম। আয়মান আমার দেখানো দৃষ্টিতে অনুকরণ করলো।উনি বুঝতে পেরেছেন তাই এবার আমার হাত ছেড়ে দিয়ে আগে আগে হাঁটছে আর আমি উনার পেছনে পেছনে।

-আমি কেন বারবার নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি?কেন,আমি অরুণিমার হাত ধরতে গেলাম? যেই মানুষটা আমার নয় তার হাত ধরার অধিকারও তো আমার নেই। উফফ, পাগল হয়ে যাব আমি।

মনে মনে কথাগুলো বলে আয়মান ওর কপালে ছড়িয়ে থাকা এলোমেলো চুল গুলো হাতের সাহায্যে পেছনের দিকে ঠেলে দিলো।

অতঃপর, আমরা রিসেপশন থেকে সিরিয়াল নাম্বার জেনে ওয়েটিং রুমে বসে আছি। আয়মানকে কোনো এক অজানা কারণে খুবই চিন্তিত দেখাচ্ছে।উনি সেই হাত ধরার ঘটনার পর থেকে চুপচাপ হয়ে আছে। হয়তো, উনি নিজের করা কাজে অনুতপ্ত?

উনাকে কিছু জিজ্ঞেস করব, তার আগেই আমার ডাক পড়লো, ডক্টরের কেবিনে যাবার জন্য।
আমি উঠে আয়মানকে বলে চলে গেলাম ডক্টরের কেবিনে। পেছনে তাকালে হয়তো আয়মানের চিন্তিত মুখখানি দেখতে পেতাম।

-তো মিস অরুণিমা কেমন আছেন?

– জি, আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন?

– তুমি জিজ্ঞাসা করেছো, তারমানে আমি এখন ভালো অনুভব করছি।এতক্ষণ, আমি ভালো ছিলাম না।

-এই ডাক্তার হচ্ছে আরেক মাথা খারাপ লোক। একে যে মানসিক ডাক্তার বানিয়েছে সে ও নিশ্চয় পাগল। আমাকে দেখলেই তার নানা উদ্ভট কথা শুরু হয়। তুই ডাক্তার তুই রোগীর চিকিৎসা করবি। তা না করে তুই আমি জিজ্ঞাসা করাতে ভালো অনুভব করছিস তা কেন আমাকে বলছিস? হাঁদারাম একটা!

মনে মনে কথাগুলো বলে বিরক্তিকর চাহনি নিয়ে ডক্টরের নেমপ্লেটের দিকে তাকিয়ে আছে অরুণিমা।

-তো এখন কাজের কথায় আসি। আপনার কি কোনো রকম সমস্যা হচ্ছে আগের থেকে?

– না, আগের থেকে অনেকটাই ভালো আছি। তবে মাঝে মাঝে ঘুমের ঘোরে কারো অস্পষ্ট অবয়ব দেখতে পাই। তাকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাচ্ছি বা তার সাথে কথা বলছি। কিন্তু, তার চেহারা আমি স্পষ্ট ভাবে দেখতে পাই না। হয়তো, সে আমার পরিচিতি কেউ?

-হতে পারে। আগের ঔষধ গুলো ঠিক মতো খাবেন । হয়তো, কিছু মাসের মধ্যে আপনি সব কিছু মনে করতে পারবেন ইনশাআল্লাহ। হয়তো,তখন এই আরিফকে আপনি ভুলে যাবেন, মিস অরুণিমা।

– কিন্তু, এই আরিফ আবার কে?

– কেন, আমার নাম আরিফ ;আপনি জানেন না? এখনই দেখছি কিছু জানেন না। তাহলে আমার কথা সত্যি হলো। আপনি আর কিছুমাস পর আমাকে মনে রাখবেন না।

– কোনো রুগি তার চিকিৎসা শেষ হলে তার ডাক্তারের নাম মনে রাখে?আর সেখানে আপনাকে মনে রাখবার বিশেষ কোনো কারণ ও আমি দেখছি না!

অরুণিমার কথায় এবার ডক্টর আরিফ বেশ বিব্রতবোধ করলো। তাই অস্বস্তি কাটাতে অরুণিমাকে জিজ্ঞেস করলো,

– আন্টি,আজ আসেনি আপনার সাথে? উনাকে দেখছি না যে?

– মামনি, আজ সকাল থেকে অসুস্থবোধ করছে তাই আসেনি। তবে আমার সাথে অন্য একজন এসেছে।

– যে এসেছে তাকে ভিতরে ডাকুন।

আমি এবার উঠে গিয়ে আয়মানকে ডেকে নিয়ে এলাম। আয়মান ডাক্তারের সাথে হাত মিলিয়ে কুশলাদি বিনিময় করলেন।পরিচয় পর্ব শেষ হলে আয়মান জানালেন সে রোকেয়া অর্থাৎ মামনির ছেলে। কিন্তু, এবার ডাক্তার যা বলল এতে আমার এক্সপ্রেশন যেমন তেমন , আয়মান সাহেবের এক্সপ্রেশন ছিলো দেখার মতো।

ডাক্তার আরিফ আয়মানকে বলেছে,

-ও,তাহলে আপনি মিস অরুণিমার ভাই?

আয়মান নিজেকে সংযত রেখে বলল,

– আসলে কি মিষ্টার আরিফ আপনি আসলে কিভাবে ডাক্তার হয়েছেন আমার সন্দেহ হচ্ছে? মিস অরুণিমা আপনার কাছে ঠিক কি কারণে চিকিৎসা নিচ্ছে তা কি আপনার জানা নেই?সে কোনো এক ইন্সিডেন্টের কারনে আমাদের কাছে আছে। আর তাকে কি না আপনি আমার বোন বানিয়ে দিলেন। রিডিকিউলাস!

– আসলে আমি খুবই দুঃখিত এই ব্যাপারটা নিয়ে মিস্টার আয়মান। কিন্তু, মিস অরুণিমা আপনার মা’কে মামনি বলেই সম্বোধন করে তাই আমারই একটু ভুল হয়েছে।

– ঠিক আছে সমস্যা নেই। অরুনিমা গাড়িতে যেয়ে বসো, আমি আসছি।

অরুণিমা ডক্টরের কেবিন থেকে বের হয়ে চলে গেল।অরুণিমা চলে যেতেই আয়মান ডক্টর আরিফের দিকে তাকিয়ে বললো,

-তুই কি সব জেনেও না জানার ভান করছিস, শালা?

– এই তোর বৌ কি আমার বোন হয় না-কি? তাকে তো আমি শুধুমাত্র তোর জন্য আমার করতে পারছি না।

-কোনোদিনও পারবিও না। যেভাবে ভাব নিয়েছিস অরুণিমার সামনে, মনে হয়েছে তোর সাথে আমার জীবনেও কোনোদিন দেখা অব্দি হয় নি?

– আরে বুঝিস না বেটা, তোকে একটু জ্বালাতে চেয়ে ছিলাম এবং আমি সফল হয়েছি কি বলিস দোস্ত? তখন, তোর চেহারাটা দেখার মতো ছিলো।

– আমি পকে ভালোবাসি আর তুই কিনা আমাকে ওর ভাই বানিয়ে দিলি। আমার যা রাগ উঠেছিল তোর উপর। ভাগ্যিস নিজের রাগ সামলে নিয়েছি নয়তো আজই অরুণিমার কাছে ধরা খেয়ে যেতাম।

– ভাই, তুই যেহেতু ওকে এতই ভালোবাসিস তবে অরুণিমাকে বলছিস না কেন?

– তুই আমাকে এই কথা বলছিস!তুই কিন্তু ওর ট্রিটমেন্ট করছিস তারপরও কী করে সব জেনেও এই কথা বলছিস?

– আল্লাহ চাইলে সবই সম্ভব। দেখা গেলো ওর অতীত বর্তমান সবই ওর স্মরণে থাকবে। অযথাই, তুই টেনশন করছিস।

-একেবারে গ্যারান্টিও তো নেই। এখন, আমি ওকে শুধু ভালোবাসি আর যদি ওকে নিজের ভালোবাসা জাহির করি ধর সে রাজিও হলো।কিন্তু, ওর যদি পুরোনো সব মনে পড়ে এবং আমার কোনো স্মৃতি ওর মনে না থাকে তখন আমার কি অবস্থা হবে ভেবে দেখেছিস?
আমি এখন যে অবস্থায় আছি ঠিক আছি এর চেয়ে বেশি চাওয়া আমার চাহিদায় নেই,বুঝলি দোস্ত?

-হুম, সবই বুঝলাম। তবে কখনও যদি সুযোগ পাস তাহলে অরুণিমাকে তোর অনুভূতির কথা জানিয়ে দিস। ও বুদ্ধিমতি মেয়ে আশা করি সব বুঝতে পারবে।

– আচ্ছা, বলে দেখব। এখন চলি; অরুণিমা গাড়িতে একা বসে আছে।

– আচ্ছা, তাহলে ভালো থাকিস। অরুণিমাকে ঔষধ গুলো ঠিক ভাবে খেতে বলিস। আল্লাহ হাফেজ।

বলেই দুই বন্ধু একে অপরকে জড়িয়ে ধরলো।
বিদায় জানিয়ে চলে আসে আয়মান আর আরিফ সে আল্লাহর কাছে দোয়া করে যেন তার এই ভালো বন্ধুটি সব সময় হাসিখুশিতে থাকে ওর কোনো চাওয়াই যেন অর্পূণ না থাকে।

আয়মান কেবিন থেকে বের হতেই ওর মোবাইলে কল এলো। মোবাইল বের করে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কারো ভারি আর্তনাদ শুনতে পেলো আয়মান। আয়মানের পুরো শরীর অজানা ভয়ে কাপতে শুরু করলো।
এক দৌঁড়ে গাড়ির কাছে চলে গেলো এবং জলদি গাড়িতে বসে ফুল স্পিডে গাড়ী চালানো শুরু করে দিয়েছে ।

আয়মানের এমন হুটহাট কাজে বিরক্ত বোধ করলো অরুণিমা।অরুণিমা মুখ ফুটে কিছু বলবে তার আগেই আয়মানের চেহারার দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো, আয়মানের পুরো শরীর ঘামছে আর ওকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে। অজানা ভয়ে অরুণিমা এবার না পেরে আয়মানকে জিজ্ঞেস করলো,

-কি হয়েছে? আপনাকে এরকম চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন? ডাক্তার আরিফ কিছু বলেছে আমার সমস্যা সম্পর্কে? বলুন না কি হয়েছে আমার না খুব ভয় করছে?

-একদম চুপ, আর একটা কথা বলবে না। একটু পর নিজ চোখে দেখতে পারবে। এখন চুপ থাকো টেনশনে আমার মাথা কাজ করছে না।

উনার ধমক শুনে আমি আর কথা বললাম না। তবে কি এমন হয়েছে যে উনি এরকম আচরণ করছেন?

বাড়িতে খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেলাম। রাস্তায় তেমন জ্যাম ছিলো না।গাড়ি কোনোরকম গেটে ভিতরে ঢুকিয়ে আয়মান দৌঁড়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো।আর আমি উনাকে এভাবে দৌঁড়াতে দেখে পায়ের গতি বাড়িয়ে বাড়িতে ঢুকে পরলাম।
কিন্তু, ভেতরে ঢুকতেই শুনতে পেলাম আয়মান জোরে জোরে মামনিকে ডাকছে।

আমার হাতের পার্স সোফায় উপরে রেখে দৌঁড়ে মামনির রুমে ঢুকলাম। কিন্তু, ভেতরে ঢুকতে দেখতে পেলাম, মামনি খাটে শুয়ে আছে। তাকে যে এতবার আয়মান ডাকছে কিন্তু,কোনা সাড়াই দিচ্ছে না। এবার আমি বুঝতে পারলাম, আয়মান কেন গাড়িতে ওমন ব্যবহার করেছিল।
আমি তাড়াতাড়ি মামনির কাছে সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম,খুব ভালো করে তাকিয়ে দেখি, মামনি অচেতন হয়ে আছে।

আমি রুম থেকে বের হয়ে দারোয়ানকে অনুরোধ করলাম,যেন ডক্টরকে কল করে বাড়িতে আসতে বললে। দারোয়ান জানালেন উনি নাকি কল করেছেন ডক্টরের কাছে, কিছুক্ষণের মাঝে চলে আসবেন।

আবারও রুমের ভেতরে ঢুকে বাসার বুয়ার কাছ থেকে জানতে চাইলাম কিভাবে হলো এইসব? তখন বুয়া বলল,

– আফামনি, আমি আইজকা একটু দেরিতে আইছি আমার মাইয়াডার শরীর ভালা না দেইখা। বাড়ির ভিতরে ঢুকলে অন্যান্য দিন তো খালায় আমারে এইডা হেইডা করতে কয়। কিন্তু, আইজকা তারে দেহি নাই দেইকা আমি এই রুমে আইছি তারে দেহনের লাইগা । কিন্তু, আফামনি আমি এনো আইয়া দেহি খালায় নিচে ফইরা রয়েছে। তারে আমি গায়ে ধাক্কাইছি কয়বার ডাকও দিছি হেয় সাড়া দেয় না। তহন,আমি দারোয়ান ভাইরে ডাক দিয়া আইনা, দুইজনে মিইল্লা পালঙ্কে হোয়াইছি।এরপরই, তো ভাইরে ফোন দিয়া কইলাম তাড়াতাড়ি বাইত আইতে।

বুয়ার কথা শেষ হতেই ডাক্তার এসে পরলেন। ডাক্তার মামনিকে চেকআপ করছেন। চেকআপ শেষ হলে তিনি একটি ইনজেকশন মামনির ডানহাতে পুশ করে দিলেন। ডাক্তার উঠে দাঁড়ালেন এরপর আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন,

– রোগী হয়তো কোনো বিষয় নিয়ে বেশ টেনশনে ছিলেন। তিনি অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন নয়তো বড় ধরনের বিপদ হয়ে যেতে পারত।উনাকে ইনজেকশন দিয়েছি হয়তো এক দু’ঘন্টা পর জ্ঞান ফিরে আসবে। উনাকে কোনোপ্রকার টেনশনে রাখা যাবে না।আমি আসছি তাহলে, উনার কোনোপ্রকার সমস্যা দেখা দিলে আমাকে কল করবেন, আমি চলে আসব।

কথাগুলো বলে ডাক্তার চলে গেলো।আয়মান ও অরুণিমা বসে অপেক্ষা করছে মামনির জ্ঞান ফিরে আসার।

অপরদিকে, আজ নিশুদের বাড়িতে মায়ার চাচাতো ভাই অংকন এসেছে। নিশুর মা তাকে আপ্যায়নে ব্যস্ত। কিন্তু, অংকন এখানে এসেছে একটি কাজে, তার নিশুর সঙ্গে দেখা করাটা খুবই জরুরি।

তাই সে নিশুর মা’কে জিজ্ঞেস করলো,

– আন্টি নিশু ভাই কোথায় আছে? তার সাথে আমার কিছু জরুরি কথা আছে।

– সে বাড়িতেই আছে। আসো তোমাকে নিয়ে যাই নিশুর ঘরে।

অন্ধকার কালো নিকষ আঁধারে ছেয়ে আছে পুরো ঘর জুড়ে। বাইরে তখন ঝকঝকে সূর্যের আলো। চারদিকে পাখিদের কলরব, রাস্তায় অসংখ্য যানবাহনের আনাগোনা।

হঠাৎ, কেউ দরজা খুলে ঘরের ভেতরে করেছে। এসে সর্বপ্রথম জানালার পর্দা টেনে একপাশে সরিয়ে দিলো।ঘরের নিকষ কালো আঁধার হারিয়ে গেলো সূর্যের দ্যুতি জানালা দিয়ে প্রবেশ করতেই।

নিশু মাথা উচু করে দেখলো, কে এসেছে? দেখলো ওর মা সাথে আরও একজন আছে। কিন্তু, পরিচিত মনে হলো না,কখনো দেখেছে বলেও মনে হয় না। মনে মনে নিজের মায়ের প্রতি বিরক্তবোধ করলো নিশু। হুটহাট কাউকে এভাবে রুমে নিয়ে আসা নিশুর পছন্দ না।

– আসসালামু আলাইকুম নিশু ভাই। ভালো আছেন?

– ওয়ালাইকুম আসসালাম, আমি ভালো আছি। তবে, আপনি কে?

– ও হচ্ছে মায়ার চাচাতো ভাই অংকন। তোর সাথে আগে ওর কখনো দেখা হয়নি তো তাই ওকে তুই চিনতে পারছিস না। বাবা অংকন, তোমরা কথা বলো। আমি আসছি আর তুমি আজ থেকে যেও, নিশুর ভালো লাগবে?

– আচ্ছা, আন্টি থাকব।

– কিছু কথা আছে যেগুলো শুনলে হয়তো।আপনারা আমাকে নিজ দায়িত্বে এই বাড়ি থেকে বের করে দিবেন। মনে মনে বললো অংকন।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here