প্রার্থনায়_তুমি,১০.[অন্তিম]

#প্রার্থনায়_তুমি,১০.[অন্তিম]
#Tahmina_Akther

১০

আজ সাতদিন হলো ঢাকায় এসেছে আয়মান ও অরুণিমা। এই সাতদিনে কিছুই পরিবর্তন হয়নি আবার পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছু ।

-যেই অরুণিমা আমার সঙ্গে একমিনিট কথা না বলে থাকতে পারত না, সেই অরুণিমা আজ দুদিন আমার সাথে কোনো প্রকার কথা বলতে চাইছে না।এখানে আসার পর ওর চাচা-চাচী, অংকন, নিশু ও নিশুর পরিবারের সবার সাথে ওর ভালো সখ্যতা তৈরি হয়েছে। উনাদের সঙ্গে ওর যতই সখ্যতা বাড়ছে আমার সঙ্গে ঠিক ততটাই দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। তবে, গতকাল রাতে ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ওর পরিবারকে চিনতে পারছে কি না? প্রতিউত্তরে বলেছে, কেন, মনে না পড়লে কি বেশ খুশি হবে না কি? বল তো, আরিফ ওর এই কথা গুলো আমার কাছে ঠিক কতটা খারাপ লাগে?ও যদি সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে ওর পরিবারকে চিনতে পারে তাহলে ও বলুক সমস্যা কোথায়? কিন্তু, ও তো আমাকে বলতে চাইছে না।

এতক্ষণ,আয়মান মোবাইলে কথাগুলো বলছিলো ওর বন্ধু ডক্টর আরিফের সঙ্গে।

-আচ্ছা, অরুণিমার নিশুর সাথে আচরণ কেমন?
আরিফ প্রশ্ন করে আয়মানকে।

– আগের থেকে ভালোভাবে কথা বলছে।

– শুন দোস্ত একটা কথা বলি, মাইন্ড করিস না। হয়তো অরুণিমার সব স্মৃতি মনে পরেছে কিন্তু ও তোকে বলতে চাইছে না। হয়তোবা, নিশুর প্রতি ওর অনূভুতিরা বদলেছে। দেখ আয়মান, আমি কিন্তু ধারণা থেকে বলছি তারপরও তুই একবার অরুণিমাকে ঠান্ডা মাথায় জিজ্ঞেস কর, ওর কি হয়েছে? ঠিক আছে;আমি এখন রাখছি রোগী দেখার সময় হচ্ছে, আল্লাহ হাফেজ ;ভালো থাকিস।ওখানকার খবরাখবর জানাস আমাকে।

আরিফ কল কেটে দিয়েছে, আমার মস্তিষ্কে অন্য কথা ঘুরপাক খাচ্ছিলো।বসা থেকে জলদি উঠে বের হয়ে পরলাম রুম থেকে।

ড্রইংরুম থেকে হাসাহাসির শব্দ আসছে তাই সেখানে গেলাম। যেতেই দেখতে পেলাম অরুণিমা, নিশু,ও তার মা এবং অরুণিমার চাচী বসে কি নিয়ে হাসাহাসি করছে? আমিও সেদিকে এগিয়ে গেলাম।

অরুণিমা আমাকে দেখতে পেয়ে হাসি থামিয়ে ফেললো।আমি ওর এমন আচরণ দেখে কষ্ট পেলাম কিন্তু ওকে বুঝতে না দিয়ে ওর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিশুর মা’কে সালাম দিলাম। উনিও আমার সালামের উওর দিলেন ভালমন্দ জিজ্ঞেস করলেন। চাচী উঠে চলে গেলেন রান্নাঘরে। এরই মাঝে অরুণিমা উঠে রুমের দিকে চলে যাচ্ছে। আমাকে এখানে দেখে ওর চলে যাওয়ার দৃশ্য আমার মস্তিষ্কে মূর্হুতের মাঝে রাগ চেপে ধরলো, তাই ওর পিছু পিছু আমিও চললাম।

ও রুমে ঢুকে দরজা আটকাতে চাচ্ছিলো কিন্তু আমি হাত দিয়ে আটকে ফেলি। দরজা কাছ থেকে সরে গিয়ে অরুণিমা বসে পড়ে খাটের উপর। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর পাশে গিয়ে বসি। তারপর ওকে জিজ্ঞেস করি,

– কি হয়েছে তোমার, আমাকে বলবে? এরকম দূরে সরে থাকছো কেন আমার থেকে?

– কোথায় তোমার থেকে সরে থাকছি? বহুদিন পর পরিবারকে কাছে পেয়েছি তাই তোমাকে সময় দিতে পারছি না।

– কথাগুলো আমার চোখে চোখ রেখে বলো তো। কারন, যখনই তুমি আমার সঙ্গে মিথ্যে বলছো তখনই তুমি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা গুলো বলো নি।

– কিসের মিথ্যা কথা বলবো তোমার সঙ্গে? বেশি কথা ভালো লাগছে না আমার। জানালার পর্দাগুলো টেনে দাও রুমে, সূর্যের আলো আসছে। আমি এখন একটু ঘুমাবো।

অরুণিমা পা উঠিয়ে খাটের উপর গিয়ে সরে বালিশে শুয়ে পরলেও ওকে আবারও হেঁচকা টানে বসিয়ে দেয় আয়মান।

– আমার কথা শেষ না হওয়া অব্দি তুমি কিছু করতে পারবে না এমনকি ঘুমোতেও পারবে না, বুঝতে পেরেছো?

– তুমি কি আমার সঙ্গে জোরজবরদস্তি করতে চাইছো? যেখানে আমি বলছি কিছুই হয়নি তারপরও তুমি এরকম হাইপার আচরণ করছো, কেন?

– আমি হাইপার আচরণ করছি, তোমার জন্য। তুমি এখানে আসার পর থেকে আমার সাথে একবার ভালো ভাবে কথা বলেছো নাকি একবেলা জিজ্ঞেস করছো আমি খেয়েছি কি না? অথচ, বাসায় তো তুমি আমি না খাওয়া অব্দি কিছুই খেতে না?

-এখন কি তোমাকে বাচ্চাদের মতো আদর করে খাইয়ে দিতে হবে আমার।

– এসব তুমি কি বলছো অরুণিমা?অবাক কন্ঠে প্রশ্ন করলো আয়মান।

– আমার নাম মায়া অতএব আজকের পর থেকে আমাকে অরুনিমা নাম ধরে আর ডাকবে না?

– কিন্তু, আমি তো তোমাকে অরুণিমা নামেই ডাকবো।একমিনিট, তুমি কি সব কিছু মনে করতে পারছো?

– হ্যা,অস্পষ্ট স্মৃতিগুলো স্পষ্ট হয়ে গেছে আমার মস্তিষ্কে। তাই আমিও চাই না তুমি আমাকে আর অরুণিমা নামে ডাকো।

-তাহলে, নিশ্চয় নিশুর কথাও তোমার মনে পরেছে। এজন্যই, তুমি আমার থেকে এরকম দূরে সরে যাচ্ছো। তুমি কি কোনোভাবে আমার থেকে মুক্তি চাইছো? অরুণিমার কথায় কিছুটা দমে গিয়ে প্রশ্ন করে আয়মান।

-হ্যা হ্যা হ্যা, আমি তোমার থেকে মুক্তি চাইছি। কারণ, নিশুর সাথে কাটানো স্মৃতিগুলো কোনোভাবে আমি ভুলতে পারছি না। তোমার কাছাকাছি এলেই ওর স্মৃতি আমার চোখের ভেসে উঠছে।

– তুমি কি আমাকে আর ভালোবাসো না অরুণিমা?
বেশ করুন শোনালো কথাগুলো আয়মানের মুখে।

অরুণিমা,আয়মানের কথার উওর দিবে তার আগেই বাইরে থেকে কিছু ভাঙার শব্দ পেলাম। অরুণিমা এক দৌঁড়ে দরজার কাছে যেতেই দেখতে পেলো, একটি মগ ভেঙে পরে আছে হয়তো কেউ কফি নিয়ে যাচ্ছিলো, হাত থেকে পড়ে ভেঙে গিয়েছে!

অরুণিমা দরজা আটকে পিছনে ঘুরতেই দেখতে পেলো, আয়মান উপুড় হয়ে ফ্লোরে পরে আছে।

দৌঁড়ে ওর কাছে গেলাম গিয়ে দেখি ওর সারা শরীর ঘেমে জবজবে হয়ে যাচ্ছে। ওর ঘাড় কেমন বেকে যাচ্ছে?দেখে মনে হচ্ছে ওর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ওর এমন অবস্থা দেখে আমি ভয়ে চিৎকার দিলাম।

আইসিইউর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছি আমি। ভেতরে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে আয়মান।
চাচা-চাচী এবং নিশুর মা বসে আছেন সামনের চেয়ারগুলোতে।

এরইমধ্যে,ডাক্তার বের হয়ে এলেন আমি ডক্টরের সামনে যেতেই ডক্টর বললেন,

– উনার স্ট্রোক হয়েছে স্ট্রোক হলো মস্তিষ্কের রোগ। যদি কোনো কারণে মস্তিষ্কের কোনো অংশের রক্ত চলাচল বিঘ্নিত হয় এবং তা ২৪ ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হয় অথবা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রোগী মৃত্যুবরণ করে। ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই ইসকেমিক স্ট্রোক মস্তিষ্কে ও রক্তনালির রক্তে জমাট বেঁধে অথবা শরীরের অন্য কোনো স্থান থেকে বিশেষ করে হৃৎপিন্ড থেকে জমাট বাঁধা রক্ত মস্তিষ্কে নিয়ে রক্তনালির প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। আল্লাহর কাছে প্রাথর্না করুন যাতে ২৪ঘন্টার আগেই রোগী বিপদমুক্ত হয়। নয়তো, সামনে কি হতে পারে আপনাদের বলার প্রয়োজন নেই?আপনারা হয়তো বুঝতে পেরেছেন। আমরা আমাদের বেস্ট ট্রাই করবো।

বলেই চলে গেলেন ডাক্তার।মনে পড়ে গেলো সেদিনের কথা যেদিন আয়মানকে আমি বলেছিলাম,

-মনে করো আমি তোমার সাথে কাটানো সব স্মৃতি ভুলে গিয়ে আমার অতীতের সব স্মৃতি ফিরে পেলাম। তখন তুমি করবে আয়মান?

-সেদিন তোমার আয়মানের শেষদিন হবে এই পৃথিবীতে। কারন সব হারিয়ে যখন নিঃস্ব আমি ঠিক তখনি তোমায় পুঁজি করেই এই পৃথিবীতে বেৃচে আছি আমি।

আর কিছুই ভাবতে পারছিলাম না আমার শরীর অসার আসছে, চারপাশ কেমন ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে?

নিশু করিডরে দিয়ে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছিলো তখনই দেখতে পেলে মায়া ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলছে কিন্তু ডাক্তার চলে যাবার পরপরই মায়াকে কেমন যেন শক্তিহীন লাগছিলো, হুট করে ঢলে পড়লো ওর চাচীর পায়ের কাছে।

***********************

হেমন্তের শেষের দিকে ; হালকা ঠান্ডা বাতাস গায়ে ছোঁয়া পেলে শীত আসছে তার আগাম আভাস পাওয়া যায়। হেমন্ত আসে নীরবে আবার শীতের কুয়াশার আড়ালে গোপনে হারিয়ে যায়।

এরই মাঝে কেটে গেছে ছ’মাস। বিকেলে আগের মতো ছাঁদে যেয়ে সময় কাটাতে পারি না ওই যে দিনের শেষাংশের সময় ছোট হয়ে এসেছে তাই।একটু পর হয়তো চারদিক থেকে মাগরিবের আজান প্রতিধ্বনি শুনতে পাওয়া যাবে। তবুও আজ দাঁড়িয়ে আছি হাতে আমার আর আয়মানের একটি ছবি। ছবিটিতে বেশ হাসোজ্জল দেখাচ্ছে আয়মানকে।
যে মহীয়সী নারী আমায় চরম বিপদ থেকে রক্ষা করেছিলো তার বাড়িতে আমাকে কন্যার মতো করে রেখেছিলো বিনিময়ে সে আমার কাছে চেয়েছিলো তার ছেলে আয়মান যে কি না আমায় গোপনে নীরবে ভালোবাসে তাকে যেন চীরজীবনের জন্য আমার জীবনের অমূল্য স্থানে ঠাঁই দেই। তখনও, আমি তার এই সিদ্ধান্তে কোনো রূপ দ্বিমত পোষণ করিনি। বরং, হাসিমুখে মেনে নিয়ে সেই রাতে আয়মানকে আমার স্বামী রুপে গ্রহণ করলাম। সেই রাত আমাদের জন্য মধুর হয়নি হয়েছিল বিভীষিকাময়।
কারণ, আমাকে আশ্রয় দেয়া মমতাময়ী নারী দুনিয়ার পাঠ চুকিয়ে চলে যায় পরপারে অসীমযাত্রায়।
আয়মানের সাথে সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনের দূরত্ব কমে গিয়ে বেশ কাছাকাছি চলে এসেছিলাম।বেশ ভালো চলছিলো দিনগুলো।কিন্তু, আমার অতীত এসে আমার বর্তমানকে চ্যালেন্জ ছুড়ে দেয়। আমি কি করেছি জানেন? আমাকে সব কিছু দিয়ে সাহায্যে করা, ভালোবেসে আগলে রাখা মানুষটিকে অগাহ্য করে আপন করতে চেয়েছিলাম ফেলে আসে অতীতকে। সে আমার থেকে পাওয়া আঘাত সহ্য করতে পারেনি। কেননা, যাকে কেন্দ্র করে ওর দুনিয়া ছিলো, সে যদি চলে যায় তাহলে বেঁচে থেকে কি হবে? হয়তো বিধাতা চেয়েছিলেন সে এই পৃথিবীতে আর শ্বাস না নিয়ে বাঁচুক!

কাঁধে কারো তপ্ত নিশ্বাস অনুভব করলাম। পরম আবেশে আমার শরীরের ভারটুকু ছেড়ে দিলাম তার বুকের মাঝে। তার হাতদুটো দিয়ে আমায় জরিয়ে নিলো তার বুকের ডেরায়।ডান কানে বেশ শব্দ করে চুমু দিয়ে বলছে,

– ঘোর সন্ধায় ছাঁদে কেন এলে তুমি? প্রতিদিন বাড়িতে ফিরে এসে তোমার এই মনোহর চেহারা না দেখলে কেমন যেন বুকের ঠিক এপাশে (বা পাশ দেখিয়ে )শূন্যতা অনুভব হয়! কতবার বলি আমার ফিরে আসার সময় হলে অপেক্ষায় থাকবে, যেন দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলে তোমাকে দেখি।

আজ আয়মানের কথাগুলো শুনতে বেশ ভালো লাগছে। সে যদি এই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়ে চলে যেত তবে, কে বলতো আমার জন্য তুমি অপেক্ষায় থেকো?

সেদিন হাসপাতালে নেয়ার চব্বিশ ঘণ্টা পার হবার পরও যখন ওর চেতনা আসছিলো না তখন হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। বিধাতা যেন অন্যকিছু ভেবে রেখেছিলেন আয়মানের চেতনা ফিরে আসে আঠাশ ঘন্টা পর। ওর চেতনা ফিরে আসার পর সে আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইতো না। আমি জোর করে ওর সামনে যেয়ে বসে থাকতাম। ওর এই অভিমান কাটাতে আমাকে বেশ কাঠগড় পোহাতে হয়েছে। তবুও তো তার অভিমান ভেঙেছে এতেই আমি খুশি।

– অরুণিমা, আমাদের আজ একটু ঢাকায় যেতে হবে।

– হঠাৎ, ঢাকায় কেন যেতে হবে?

-নিশু কল করেছে যদি তুমি যেতে রাজি না হও তবুও যেন তোমায় জোর করে নিয়ে যাই।

-আজ ছ’মাস ধরে তো তার কোনো খোঁজ পেলাম না হঠাৎ করে কোত্থেকে উদয় হলো?

– তুমি তো নিশুর খোঁজ নাওনি বরং সে তোমার খোঁজ ঠিকই রেখেছে। আমি ল্যাগেজ গুছিয়ে রাখছি। তুমি তৈরি হয়ে নাও, আমরা একটু পর রওনা হবো।

– কিন্তু, রাতে কেন? সকালে গেলেই হতো।

-যা বলছি তা করো।

আমি আর কথা না বাড়িয়ে ছাঁদ থেকে নেমে আমাদের রুমে চলে এলাম। দুজনে খাওয়া-দাওয়া করে, তৈরি হয়ে বের হতেই রাত প্রায় দশটা বেজে গেলো।

ঢাকায় পৌঁছাতে প্রায় চারটা বেজে গেলো। কিন্তু, আয়মান আমাদের বাড়ির দিকে না যেয়ে অন্য পথে যাচ্ছে তাই ওকে জিজ্ঞেস করলাম,

– আমরা যাচ্ছি কোথায়?

– নিশুদের বাড়িতে।

নিশুদের বাড়িতে যাওয়ার কথা শুনে চুপ মেরে গেলাম। ভেতরে ভেতরে এখনই অস্বস্তি হচ্ছে।
নিশুদের বাড়ির গেটের কাছে পৌঁছাতেই দেখতে পেলাম গেইটের উপর ফুল দিয়ে সাজানো বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে বাড়ির ভিতরে লাইটিং করানো। আমি অবাক হয়ে আয়মানকে জিজ্ঞেস করলাম,

– আচ্ছা, নিশু কি বিয়ে করছে?

– কি জানি? বাড়ির সাজ দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।
চলো ভিতরে যাই। তাহলে বুঝতে পারব, কি হচ্ছে?

আমার হাত ধরে ধীরে ধীরে হেটে যাচ্ছে আয়মান। বাড়ির মূল ফটকের সামনে আসতেই আমার হাত ছেড়ে দিলো আয়মান। আমার থেকে সরে দ্রুত হেটে একপাশে যেয়ে দাঁড়ালো। আমি বোকার মতো তাকিয়ে আছি ওর দিকে।

আচমকা আমার শরীরের উপর কি যেন পরলো? আশপাশে তাকিয়ে দেখি কয়েকটি ছেলে মেয়ে মিলে গোলাপের পাপড়ি ছুঁড়ে দিচ্ছে আমার শরীরে ।আমার অবস্থা তখন অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে!

এরইমাঝে সেখানে উপস্থিত হলো নিশু বেশ শুকিয়ে গেছে আমার ওকে তো চিনতে কষ্ট হচ্ছিলো। আমি মুচকি হেঁসে নিশুকে জিজ্ঞেস করলাম,

– এবার তাহলে বিয়ের করছেন আপনি? আমি তো অনেক খুশি হয়েছি। কিন্তু, আমাকে ফুল ছিটিয়ে বরণ করার মানে বুঝলাম না?

– কারণ, কোনো একসময় তুমি এ বাড়িতে এলে তোমাকে ঠিক এইভাবে বরন করার ইচ্ছে ছিল আমার। আজ এই ইচ্ছে পূরণ করলাম। তুমি তো আজই আমাদের বাড়িতে প্রথম এলে। ভেতরে এসো আরো সাইপ্রাইজ আছে তোমার জন্য।

বলেই আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে নিশু আয়মান সবই দেখছে তবু্ও কিছু বলল না বরং মুচকি হেসে সে আমাদের পিছু পিছু বাড়িতে প্রবেশ করলো।

বাড়ির ভেতরে বেশ জাকজমকপূর্ণ আয়োজন। চারদিকে রকমারি ফুল দিয়ে সাজানো। আমি বিমুগ্ধ হয়ে চারপাশ দেখছিলাম। কিন্তু, নিশু আমাকে নিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে?সিঁড়ি বেয়ে দোতালায় উঠে ডানদিকের একটি রুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখতে পেলাম পরিপাটি সুন্দর গোছানো রুম। আমি একটু বসতে চেয়েছিলাম কিন্তু নিশু বসতে দেয়নি, সে আমাকে নিয়ে যায় ব্যালকনিতে।

ব্যালকনি এতটা সুন্দর ভাবে সাজানো হয়েছে যে আমি মুগ্ধ না হয়ে পারিনি কারন দোলনাটা লাল গোলাপ ফুল দিয়ে সাজানো। নিশু আমার হাত ধরে বসিয়ে দিলো দোলনায়।এরপর, আমার সামনে হাঁটু গেড়ে নিচে বসে পড়লো। আমার অস্বস্তি হচ্ছিল অনেক কিন্তু নিশুকে বারণ যে করব সেই ভাষা আমার মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না। এমন সময় শুনতে পেলাম নিশু আমাকে বলছে,

– মায়া, শুধু আজকের জন্য তোমার কোলে আমার মাথাটি রাখতে দিবে। আমার বেশ কিছু কথা জমে আছে, শুনবে তুমি?

আমার কি বলা উচিত আমি বুঝতে পারছিলাম না তাই আমি আয়মানের দিকে তাকালাম। দেখি সেও আমাকে ইশারা করছে যেন আমি নিশুর কথা মেনে নেই।আমার আর কি করার তাই আমি মাথা নাড়িয়ে সায় দিলাম!

নিশু আলতো করে ওর মাথাটি আমার কোলে রাখলো।এরপর, নীচু গলায় বললো,

– মায়া, তোমাকে কিছু প্রশ্ন করবো। আশা করি তুমি সব প্রশ্নের উত্তর দিবে ;কোনো মিথ্যে বলবে না, ঠিক আছে? আমিও আস্তে করে হু বলে সায় জানালাম।

– তুমি কি আজও আমার বা তোমার পরিবার কথা মনে করতে পারো নি?

আমি মাথা নিচু করেই মাথা না সূচক নাড়লাম।

-তুমি আবারও মিথ্যা বলছো মায়া।

এবার বেশ চিৎকার করে কথাটি বললো নিশু। এরইমাঝে আয়মানের পাশে এসে দাঁড়ালেন নিশুর মা। নিশুর চিৎকারের সাথে সাথেই ওর কাশি শুরু হলো, থামার নামই নিচ্ছে না।

আমি বেশ ঘাবড়ে গেলাম। আন্টি এগিয়ে এসে নিশুকে আগলে ধরলেন কিন্তু কাশি বন্ধ হচ্ছে না একপর্যায়ে দেখা গেলো মুখভর্তি রক্ত ফ্লোরে পরে গেলো। আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম। আন্টি কান্না শুরু করে দিলেন। আয়মান নিশুকে রুমের ভেতরে নিয়ে এলো এরপর খাটে বসিয়ে এক ঢোক পানি খাইয়ে দিলো। কিন্তু, এবারও নিশু ঠিকভাবে শ্বাস নিতে পারছিলো না। আন্টি এবার রুমের এককোণা থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডার বের করে এনে অক্সিজেন মাস্ক পরিয়ে দিলো নিশুর মুখে।

আমি হতবিহ্বল চোখে চেয়ে রইলাম নিশুর মুখের দিকে। বেশ খানিকটা সময় অতিক্রম হবার পর নিশু তার মুখ থেকে মাস্কটি সরিয়ে এনে আমাকে বললো,

– মায়া, তুমি কেন সত্য গোপন করছো? আমি জানি, তুমি তোমার পুরনো সব স্মৃতি মনে করতে পেরেছো।তুমি কেন এমনটা করছো?কিছুটা মলিন কন্ঠে প্রশ্ন করলো নিশু।

অরুণিমা মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছে আজ সব সত্য কথা নিশুকে জানিয়ে দেয়ার জন্য। দীর্ঘশ্বাস ফেলে অরুণিমা বলতে শুরু করেছে,

– কারণ, আমি চাইনি। আয়মান অসুস্থ হয়ে পরেছিলো আমার কারণে। ঢাকায় আসার পর থেকে আস্তে আস্তে করে সবই মনে পরেছে আমার। তোমার কথা, তোমার সাথে কাটানো কিছু মূহুর্ত।তখন, আয়মানকে কেন যেন সহ্য হতো না? একপর্যায়ে আমি ওকে ইগনোর করতে শুরু করি। তাই, ও আমাকে বেশ শক্ত ভাবে জিজ্ঞেস করে। আমি সব সত্য বলি তাকে। তাকে এটাও বলি তার সামনে গেলেই তোমার সাথে কাটানো মূহুর্ত গুলো আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে। তাই আমি ওর কাছ থেকে মুক্তি চাই। আমার বিষাক্ত কথাগুলো আয়মান সহ্য করতে পারে নি। ও স্ট্রোক করে এরপরের সব কিছুই তোমার চোখের দেখা। যখন দেখলাম ও আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে তখন আমি উন্মোচন করলাম আমি শুধুই আয়মানকে ভালোবেসেছি। নিশু নামক ব্যক্তি শুধুই আমার এককালীন পছন্দের মানুষ ছিল।তাই তো আমি আয়মান, আমার পরিবার, তোমার সাথে
মিথ্যে বলেছি,যেন আমার আয়মান এটা না ভাবে ওকে আমি ভুলে গেছি। আমি ওকে এই আশস্ত দিয়েছি আমি সব ভুলে তাকে আঁকড়ে ধরেছি।
বলেই হু হু করে কেঁদে উঠলো অরুণিমা।

নিশু শোয়া থেকে উঠে বসে অরুণিমার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে,

– তুমি কি জানো আমি এইসব আগে থেকেই জানতাম? সেদিন রুমে তুমি আয়মানের সঙ্গে যেই কথাগুলো বলছিলে আমি তা সবই শুনতে পেয়েছিলাম। সেদিন আমার হাত থেকেই মগটি পরে ভেঙে যায়। আয়মান সুস্থ হবার পর যখন দেখলাম তুমি ঠিক আগের মতো আচরণ করছো তখন বুঝতে পারলাম তুমি আয়মানকে বোঝাতে চেয়েছো, তুমি সেদিন তার সঙ্গে মজা ছাড়া আর কিছুই করোনি। কিন্তু, জানো মায়া আমার একটদ আফসোস ছিলো। কখনো কি জানতে পারবো না তোমার মুখ থেকে তুমি আমায় চিনতে পেরেছো?কিন্তু আজ আর আমার কোনো আফসোস নেই। আমি এখন চিরশান্তিতে মরতে পারবো। কারণ, আমি জানি আমার মায়া তার জীবনের কিছু অবিচ্ছেদ্য অংশে এই নিশু নামক মানুষটিকে ওর মনে রাখবে।
শুনছো মা, আমার আর কোনো কষ্ট নেই। মায়া জানো আমার খুব ইচ্ছে ছিলো তুমি যেদিন এই বাড়িতে আমার বঁধু হয়ে আসবে ঠিক আজ যেভাবে তোমায় আজ বরণ করলাম ঠিক সেভাবেই তোমাকে বরণ করার ইচ্ছে ছিলো। এই যে দোলনাটা দেখলে এই দোলানায় তোমার কোলে মাথা রেখে আকাশের চাঁদ আর তোমার এই চাঁদ মুখের পার্থক্যে খুঁজে বের করার দরুন ইচ্ছে ছিলো আমার, জানো? কিন্তু, বিধাতার বুঝি অন্য কিছু পরিকল্পনা ছিলো। তাই এত করে তোমাকে চাইবার পরও পেলাম না আমি।
আয়মানকে বলেছিলাম আজ তোমাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসতে, যেন আমার অপূর্ণ ইচ্ছেগুলো পূর্ণ হয়। ধন্যবাদ আয়মান, আমার ইচ্ছে গুলো পূর্ণ করতে সাহায্যে করার জন্য।

কথাগুলো বলতে বলতে নিশুর আবারও শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। ওর অনেক কষ্ট হচ্ছে তবুও আমাকে ইশারা করলো যেন ওর পাশে গিয়ে বসি। আমি নিশুর পাশে গিয়ে বসতেই ওর ডানহাতটি আমার পেটে উপরে রেখে বললো,

-মায়া, তোমার যদি মেয়ে হয় তবে নিশিতা রেখো। আমার ইচ্ছে ছিলো আমার মেয়ে হলে নিশিতা রাখার কিন্তু সে ইচ্ছে পূর্ন হবার নয়।

– কেন পূর্ণ হতে পারে না? আমাকে ভালোবেসেছেন বলে আরেকজনকে গ্রহন করতে পারবে না, এ কেমন কথা?

– অরুণিমা, কাকে তুমি বিয়ের কথা বলছো যে কি না মৃত্যুর পথযাত্রী। যেদিন তোমাকে চট্টগ্রামে যেয়ে খুঁজে পেলো কিন্তু দেখলো তুমি বিবাহিত এর পর থেকে আমার ছেলেটা কেমন মন মরা হয়ে গেছে।বহুবার বলেছি বিয়ে করে সংসারী হ কিন্তু ও আমার কথা শুনেনি?চারমাস আগে হুট করে আস্তে আস্তে ওর খাওয়ার পরিমাণ কমে আসতে লাগলো,সাথে গা কাঁপিয়ে জ্বর। চিকিৎসা করার পর ভালো হচ্ছিল না। একদিন, আমি আর ওর বাবা মিলে ওকে পিজি হসপিটালে নিয়ে যাই লক্ষণগুলো বলি ডক্টরকে। সব শুনে ডক্টর ওর শরীরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য টেস্ট দেয়। রিপোর্ট আসে ও মরণ পথে চলে গেছে মায়া। ওর ফুসফুসের ক্যান্সার হয়েছে ও আর বেশিদিন বাঁচবে না। মরার আগে নিশু একটিবারের জন্য তোমাকে দেখতে চেয়েছে, তাই তো আয়মান তোমাকে নিয়ে এসেছে। আমার ছেলেটা তোমাকে ভালোবেসে মরতে বসেছে, মায়া। বলেই বিলাপ করে কেঁদে উঠেন নিশুর মা।

পৃথিবীর কোনো মা চায় না তার সন্তান কষ্ট পাক। সন্তান মারা যাবে আগে থেকেই যদি কোনো মা জানতে পারে তাহলে কেমন অনূভুতি হয় সেই সন্তানের বাবা-মায়ের?

আমার দুচোখের পানি গড়িয়ে পরছিলো।নিশু দেখতে পেয়ে ওর হাত দিয়ে আমার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো,

– মায়া, তুমি আমার জীবনের প্রথম ও শেষ ভালোবাসা। তুমি আমার জীবনের প্রথম নারী যাকে দেখে আমার হৃদয়ে ভালোবাসা নামক অমূল্য অনুভূতি জন্মেছে। তোমাকে আমি কখনোই ভুলতে পারবো না। তোমার স্পর্শ,হাসি, কান্না, সেই শুভ্ররঙা থ্রী-পিছ পরনের মায়াকে অথবা লাল জামদানী শাড়ি পরিহিতা তোমার সেই রুপ । “আমার শুধুই মনে পড়ে তোমাকে”।

বলেই একগালে হাসে নিশু। আমিও ওর গালে লেপ্টে থাকা হাসি দেখছিলাম। কিন্তু খেয়াল করে দেখলাম ওর কোনো নড়চড় নেই কেমন অসার হয়ে আছে? আয়মানকে ডাক দিলাম, আয়মান কাছে এসে নিশুকে দেখে বললো,

– নিশু, এই পৃথিবী থেকে মুক্তি নিয়েছে অরুণিমা।এই পৃথিবীতে মায়া নামক মেয়ের ভালোবাসা থেকে মুক্তি নিয়েছে নিশু।

আমি শুধু আয়মানের কথাগুলো শুনছিলাম এরই মাঝেই ভেসে এলো আন্টির সন্তানহারা যন্ত্রণার বিলাপ।

তাকিয়ে আছি নিশুর নির্মল মুখটায় কি সুন্দর হাসি লেগে আছে! ওর হাতটা এখনো আমার কোলে।

কি সুন্দর ভাবে প্রতিশোধ নিলো নিশু আমার উপর! “আমায় ভালোবেসে অপরাধি বানিয়ে চলে গেলো সে”

কান্নারা চোখে ভিড় জমিয়েছে, ঝাপসা চোখে নিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে আমি বললাম,

“আমারও শুধু মনে পড়ে তোমাকে।আমার সকল প্রার্থনায় তুমি।”।

#সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here