প্রার্থনায়_তুমি,পর্ব-০২

#প্রার্থনায়_তুমি,পর্ব-০২
#Tahmina_Akther

২.

-মা, তুমি যেদিন আমাকে কল করে বললে, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ইমার্জেন্সি ফিরে আসতে।ভাবতেও পারবে না তখন আমি কি পরিমাণ চিন্তায় পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম এই ভয়ে তোমার কিছু হলো কি না? বললেযাতেযাতে
চট্টগ্রামে পৌঁছে তোমাকে জানানোর পর তুমি আমি চট্টগ্রামের (ছদ্মনাম)হসপিটালে খুব দ্রুত চলে আসতে।মাথায় একঝাঁক দুশ্চিন্তা , ক্লান্ত শরীর নিয়ে গেলাম হসপিটালে।কিন্ত, মা আমি যখন পৌঁছালাম তখন দেখতে পেলাম একটি মেয়েকে আই সি ইউ তে নেয়া হচ্ছে আর তুমি ইশারায় আমাকে ওই মেয়েটিকে দেখাচ্ছো।
তখন আমি বুঝলাম এই মেয়েটাকে তুমিই হসপিটালে নিয়ে এসেছ।তখন ওর অবস্থা ছিল খুবই খারাপ, কিন্তু আল্লাহ ওকে শঙ্কামুক্ত করলেন।

– কিন্তু, আয়মান তুই একবার আমায় বলেছিলি তুই ওকে দেখেছিস?কিন্তু, হসপিটালের ডাক্তার তো তোকে ওর সাথে দেখা করতে দেয় নি।
তাহলে কিভাবে দেখলি ওকে? নাকি তুই আগে থেকেই আরুকে চিনতি?

আয়মান মাথা নিচু করে রেখেছে কারন তার মা’র কাছে সে কখনও কোনো কথা লুকিয়ে রাখেনি।তাই আজ আর মায়ের চোখে নজর মেলাতে পারছে না আয়মান ।
সেদিন অরুণিমাকে যখন আই সি ইউতে নিয়ে যাচ্ছিলো। হঠাৎ করে ওর মনে হলো এই মেয়েটির কিছু হলে সে মানতে পারবে না।

আয়মানের মা দেখলেন আয়মান কি যেন ভাবছে তাই ওকে ডাকে দিলো

– আয়মান??

-জি, মা।

ভাবনার জগত থেকে বের হয়ে উত্তর দেয় আয়মান।

– কি ভাবা হচ্ছে শুনি ? বলছো না কেন তুমি অরুনিমাকে আগে থেকে চেনো?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়মান বলতে শুরু করল,

– মা, তুমি জানো সেদিন অরুণিমাকে দেখার পর বাড়িতে এসেও আমার মনে হয়েছে এই বুঝি তুমি কল করে বলবে, মেয়েটি মারা গেছে। মনে আছে, ওইদিন রাতে আমি হসপিটালে গিয়ে তোমাকে জোর করে বাড়িতে পাঠিয়েছিলাম।
তোমাকে ফেরত পাঠানোর পর, ডাক্তারকে অনেক অনুরোধ করে ভিতরে যেতে পেরেছিলাম মাত্র ৫ মিনিটের জন্য।
ভেতরে গিয়ে দেখেছিলাম ছিপছিপে গড়নের সুন্দর একটি মেয়ে আইসিইউর বেডে শুয়ে আছে। মুখে ছিল অক্সিজেন মাস্ক, মাথায় ছিল ব্যান্ডেজ।আর ওই চাদঁ মুখটায় ছিলো এক রাজ্যের মলিনতা। আমি ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো বুঝতে পারিনি।
এরপরে বের হয়ে আসি আমি। ডাক্তারের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম ও ভালো আছে ধীরে ধীরে সুস্থ হবে। পরদিন, তুমি হসপিটালে ফিরে এলে আমি বাড়িতে ফিরে যাই এবং ঠান্ডা মাথায় ভাবলাম আমার ওর জন্য কেন এই রকম লাগছে?
আমি নিজেকে বুঝ দিলাম, হয়তো মানবতার কারণেই আমার এই অস্থিরতা। আমার এই অস্থিরতা নামক অসুখ থেকে বাঁচতে আমি আবার ঢাকায় ব্যাক করি। দিন দুয়েক বাদে তুমি যখন কল করে বললে, এই মেয়েটির শর্ট টাইম মেমোরি লস হয়েছে।তার নাম, পরিবার, পরিচয় কিছু মনে নেই।তাই মেয়েটিকে তুমি তোমার কাছে রাখতে চাইছো জেনে আমি অনেক খুশি হয়েছি। আর, ওর এই নাম আমি রাখতে বলেছি তোমাকে।

“অরুণিমা, আমার আরু
আমার হৃদয়ের অংশ”

আয়মান তার কথাগুলো শেষ করে ওর মায়ের দিকে চোখে তুলে তাকাতে দেখতে পেলো ওর মা ওর দিকে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছে।

আয়মানের মা বিশ্বাস করতে পারছে না তার ছেলে? তবুও,নিজেকে সামলে বললেন,

– বাবা, তুই কি অরুণিমাকে ভালেবাসিস? আর যদি ভালোবাসিস তাহলে এতদিন আমাকে বলিসনি কেন?

– মা, আমি জানি না ঠিক কি করা উচিত?
অরুণিমার যদি কখনো সব মনে পড়ে। তাহলে তো ও আমাকে ভুলে যাবে। তাই এই বিষয় নিয়ে তোমার সাথে কথা বলতে চাইনি।আমি যেভাবে আছি ভালো আছি।
“তাকে পাবার চাহিদাও নেই, হারাবার ভয়ও নেই”

এই কথাটি বলে ডাইনিংটেবিল ছেড়ে উঠে চলে যায় আয়মান। আর আয়মানের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে তার মা নিঃশব্দে কেঁদে উঠেন। কারন,সন্তানের কষ্টে মায়েরা বুঝি বেশিই কষ্ট পায়।

****************

চারদিকে রাতের আঁধার নেমে আছে, নিঃশব্দ চারদিকে,মাঝে মাঝে ঝি ঝি পোকার শব্দ ভেসে আসছে।

কালো রঙের টিশার্ট পরনে, মাথায় একঝাঁক এলোমেলো ছোট চুল।
চোখগুলোর দৃষ্টি আকাশপানে, চোখের মাঝে যেন হাজারো নির্ঘুম রাতের বিষন্নতার ছায়া।

হাতের আঙুলের ফাকে থাকা সিগারেট থেকে কিছুক্ষন পরপর ঠোঁটের মাঝে নিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া গুলো উড়িয়ে দিচ্ছে। আর অন্যহাতে আছে একটি ছবি। সেই ছবিতে আছে হাসোজ্বল এক জোড়া দম্পতি।

ছবির মেয়েটির উপর হাত বুলিয়ে ছেলেটি বলছে,

-আমাকে ছাড়া নাকি তুমি একমুহূর্তও থাকতে পারো না। কিন্তু আজ কতদিন তুমি আমায় ছেড়ে চলে গেলে।তুমি মিথ্যে বলছে আমার সাথে। তুমি দিব্যি ভালো আছো আমায় ছেড়ে। আমি যে তোমায় ছাড়া একমুহূর্ত ভালো থাকতে পারছি না।
বলো আমি কিভাবে থাকবো তোমাকে ছাড়া, মায়া?

বলেই ঘরের প্রতিটি জিনিস একমুহূর্তে ভেঙে তছনছ করে ফেলেছে।

উপরের ঘরে কিছু ভাঙার শব্দ শুনে এগিয়ে যান জাহানারা।
ছেলের রুম থেকে ভাঙার শব্দ আসছে, তাই দ্রতপায়ে হেঁটে রুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখেলেন। ছেলে ঘরের এমন একটাও জিনিস বাদ রাখেনি যে সেগুলো ভাঙেনি জাহানারা দ্রুত ছেলের কাছে গিয়ে বলছে,

– কি হয়েছে তোর? এরকম করছিস কেন?

– মা, তুমি আমার মায়াকে আমার কাছে এনে দাও না। ওকে ছাড়া আমি বাঁচবো না মা। ও কী ভালো আছে আমাকে ছাড়া? আমার মায়া কোথায় আছে?

কথাগুলো বলতে বলতে মায়ের পায়ের কাছে পড়ে কাঁদছে নিশু ।

কান্নারত ছেলেটার নাম ইশফাক রহমান নিশু। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। সরকারী প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক।

নিশু কাঁদতে কাঁদতে সেই স্মৃতিগুলো মনে করছে,যেখান থেকে শুরু হয় তার আর মায়ার প্রেমময়ী দিনগুলো।

মায়া নামক মেয়েটি হচ্ছে নিশুর হবু স্ত্রী।মায়ার সাথে নিশুর গত দু’বছর আগে আংটিবদল হয় দুই পরিবারের স্ব-ইচ্ছায়।

নিশু তখন কলেজে জয়েন করেছিল মাত্র,নিশুর মা জাহানারা উতলা হয়ে গিয়েছেন পুত্রবধু ঘরে আনার জন্য। উপায়ন্তর না পেয়ে নিশু ওর মায়ের কথায় সম্মতি প্রদান করে।

অতঃপর নিজের পুত্রের কাছ থেকে সম্মতি পেয়ে নিশুর মা যুদ্ধের ময়দানে মানে পুত্রবধু খুঁজতে নেমে পড়লেন।

প্রায় মাসখানেক পরের কথা,

নিশুর মা একদিন রাতে নিশুর রুমে এসে খাটের উপর চুপ করে বসে পড়লেন।নিশু ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে আবারও কাজে মনোনিবেশ করলো। এমন সময় ওর মা ওর দিলে একটি ছবি এগিয়ে দিয়ে বললো,

– নিশু,দেখ তো বাবা মেয়েটা কেমন? যদি তোর পছন্দ হয় তবেই মেয়েটিকে সরাসরি আমরা তাদের বাড়িতে যাব।যদি তোর পছন্দ না হয় মানা করে দেব।
বলেই নিশুর মা নিশুর চুলে হাত বুলিয়ে চলে গেলেন।

নিশুর কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকার কারণে ছবি না দেখে কাজ শেষ করতে শুরু করেছে।কাজ শেষ করতে প্রায় ১২ টা বেজে গেল। তাই নিশু উঠে পরলো কারণ এখন না ঘুমাতে পারলে সকাল ঘুম থেকে জেগে উঠতে দেরি হয়ে যাবে।

খাট থেকে নেমে কাগজপত্র গোছানোর সময় নিশুর আমার চোখ আঁটকে গেল হাসোজ্জ্বল একটি রমনীর মুখখানায়।

নিশু কাঁপা কাঁপা হাতে ছবিটি নিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।নিশু খেয়াল করে দেখলো,মেয়েটি এককথায় পরমা সুন্দরী, তার হাসিতে বুঝি তার চোখদুটোও হাসে।

পরদিন সকাল নাশতা খাওয়ার সময় নিশু ওর মা’কে বললো,

– মা, তোমার যদি মেয়েটিকে পছন্দ হয়, তাহলে আমরা মেয়েটিকে দেখতে যেতে পারি।

– তুই সরাসরি বললেই পারতি, যে মেয়ে তোর পছন্দ হয়েছে, পাঁজী ছেলে।

আমি মায়ের কথার প্রতিউত্তরে মাথা চুলকিয়ে হেসে দিলাম।

ঠিক একসপ্তাহ পর আমরা যাচ্ছি ছবির সেই মেয়েটিকে দেখতে। এতদিন হয়ে গেল অথচ ওর নামটুকু জানতে পারলাম না। মাকে জিজ্ঞেস করতেও লজ্জা লাগছে। কিছু সময়য়ের মধ্যে ওদের বাড়িতে পৌঁছে গেলাম।বাড়ির লোকেরা আমাদের গেট থেকে বাড়ির ভেতরে নেয়ার জন্য এগিয়ে এসেছেন।

বাড়ির সবার সাথে কুশল বিনিময় করে মা,আমি,বাবা এবং আমার বন্ধু আসিফ সোফায় বসে পরলাম। উনারা আমাদের আপ্যায়নের কোনো ত্রুটি রাখেনি। খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হতেই মা বললেন,

– মেয়ে কোথায়? নিয়ে আসেন আমরা ওর সাথে একটু কথা বলি।

– আপা, মায়া এখানে নিয়ে আসতে চাইছে না। মেয়ে একটু সংকোচবোধ করছে হয়তো।
আপনি আসেন আমার সাথে মায়ার রুমে নিয়ে যাই।

যিনি কথাটি বললেন সম্ভবত, উনি মেয়ের চাচি হয়।নিশুর মা হাসিমুখে মেয়েটির চাচীর সাথে চলে গেলেন।

মা কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো হাসিমুখে। বাবা মাকে জিজ্ঞেস করছে,

-কেমন দেখলে?
নিশু কি দেখবে না, মায়াকে? তোমার পছন্দ হয়েছে?

– আরে এত প্রশ্ন একসাথে করলে কোন প্রশ্নের জবাব দিব?মায়াকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে।মেয়েটা বোধহয় ভেতরে ভেতরে ভয় পাচ্ছে,আমাদের সামনে আসতে চাইছে না। আগে নিশু মায়াকে দেখুক ওর পছন্দ হোক পরে দেখা যাবে কি করা যায়? তাছাড়া, তোমার আমার দেখাতে কি আসে যায়,বলো? ছেলের জীবনসঙ্গী কেমন হবে তা ছেলেকে পছন্দ করতে দাও।
কিন্তু,একটা সমস্যা আছে ? কি করব ভেবে পাচ্ছি না।

-কি সমস্যা?জিজ্ঞেস করলো নিশুর বাবা সাইদুল ইসলাম ।

-ওদের সাথে নাকি আমাকেও থাকতে হবে কারণ মায়া নিশুর সাথে একাকী দেখা করতে রাজী হচ্ছে না।তাই আমারও যেতে হবে তা না হলে কে যায় বলো তো ছেলের সাথে মেয়েকে দেখা করানোর জন্য ?

-মা,তুমি সাথে গেলে বরং ভালোই হবে। আমার নিজেরও কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে!

-তাহলে, চল তোকে দেখা করিয়ে নিয়ে আসি মায়ার সঙ্গে।

আমি আর মা হেঁটে যাচ্ছি মায়ার রুমের উদ্দেশ্য।কিন্তু, আমি বোধহয় হার্ট অ্যাটাকে মরে যাব। যেভাবে হৃদস্পন্দনের গতি বেড়েছে,তাতে আমার নিশ্বাস আঁটকে আসছে।
বুকে হাত দিয়ে নিজেকে নিজে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি।

অবশেষে চলে এলাম একটি রুমের সামনে হয়তো এটিই মায়ার রুম।মা আমার আগে আগে চলে গেলেন রুমের ভেতরে।
আমি জোরে শ্বাস ফেলে রুমের ভিতরে প্রবেশ করলাম।চোখ তুলে সামনে তাকাতেই আমার দুটো হার্ট বিট মিস হলো।
ধুকপুক করে কাঁপছে আমার হৃদপিন্ড।

সাদা রঙের একটি থ্রীপিছ পরা একটি মেয়ে। মাথায় হিজাব পরিধান করা আর কি স্নিগ্ধ সেই মুখ!মায়ার সৌন্দর্য এবং সাদা জামার সংমিশ্রণে ওর চারপাশে সাদা রঙের ঝলমলে আলোর বিকিরণ ছড়িয়ে পরছে।

মায়ার থেকে নজর সরিয়ে এগিয়ে গেলাম। যেখানটায় মা, মায়ার চাচী এবং মায়া বসে আছে।

আমাকে উনাদের কাছে আসতে দেখে মা এবং চাচী উঠে গেলেন এবং বলে গেছেন উনারা বারান্দায় আছে, আমরা যেন নিজেদের মাঝে কথা বলি।

আমাকে দেখেই মায়া নিম্নস্বরে সালাম দিল। আমিও সালামের উত্তর দিলাম। এরপর, থেকে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছি, কি বলব ভেবে পাচ্ছি না?
আর, মায়াও ওই যে সালাম দিয়েছে এরপর থেকেই চুপ করে বসে আছে। মায়াও হয়তো আমার মতো সংকোচবোধ করছে।

এভাবে চুপ থাকলে কিছুই বলা হবে না তাই আমি নিরবতা ভেঙে বললাম,

-আপনি ভালো আছেন, মায়া?

– হুম,আমি ভালো আছি।আপনি ভালো আছেন?

-আলহামদুলিল্লাহ, আমিও ভালো আছি।
মায়া আমি আপনাকে একটি প্রশ্ন করব,যদি আপনার উত্তর দিতে আপত্তি না থাকে।

মায়া আস্তে করে হু বলে উঠলো।

-মায়া,আমি একজন শিক্ষক। তাই সবার আগে আমি আপনার শিক্ষাকে প্রাধান্য দিব। তো বলুন আপনার পড়ালেখার কি অবস্থা? বিয়ের পরও কি পড়তে চান?

– এইতো, এবার অনার্স প্রথম বর্ষে। আমারও ইচ্ছে আছে মাস্টার্স শেষ করে কিছু একটা করার। কিন্তু, চাচা চাচীকে বলার সাহসটুকু পাচ্ছি না যে আমি এখন বিয়ে করব না পরে করবো?
মা-বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে চাচা চাচীর কাছে বড়ো হয়েছি। উনারা নিজের মেয়ের মতোই আমাকে লালন পালন করেছে। তাই নিজের স্বপ্নকে ভুলে তাদের ইচ্ছাকে গুরত্ব দিচ্ছি। তাছাড়া, বিয়ের পর কয়টা মেয়ে পড়াশোনা করতে পেরেছে,বলুন তো ?

মায়া তাহলে এতিম, ওর আপন বলতে কেউ নেই।
মনে মনে কথাটি বললো, নিশু।

– ধরুন কেউ আপনার ইচ্ছে পূরণ করবে তখনও কি আপনি পড়াশোনা করবেন না?

– এই যে আপনি বললেন কেউ আমার ইচ্ছে পূরণ করবে কি-না? বাস্তবে কিন্তু তা কখনোই সম্ভব নয়? কারণ, আমার কেউই নেই? তাহলে কিভাবে হবে বলুন?

– মায়া,তোমাকে আমার জীবনসঙ্গী হিসেবে আমি পছন্দ করেছি. তোমার সকল দায়িত্ব আমি নিতে চাই, তুমি হবে কি আমার জীবনসঙ্গী? বিশ্বাস করো, তোমাকে আমি কখনোই ভাবতে দেব না যে তোমার কেউ নেই।

এই রুমে আসার পর থেকে এতটুকু সময়ের মধ্যে মায়া আমার দিকে একবারও চোখ তুলে তাকায়নি।
কিন্তু এই প্রথম সে আমার দিকে তাকিয়েছে।ওর চোখে একরাশ বিস্ময়।

মায়া আমার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ওর চাচিকে ডাক দিলো।মায়ার চাচী এবং আমার মা মায়ার ডাক শুনতে পেয়ে রুমে চলে এলো।

মায়া উঠে ওর চাচীর হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল বারান্দার এককোনায়।ওর চাচীর কানে কিছু একটা বললো হয়তো!

হঠাৎ,ওর চাচী উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললো, মায়ার এই বিয়েতে কোনো আপত্তি নেই।

কথাটি শুনতে আমার এতক্ষণ ধরে চেপে রাখা নিশ্বাসটুকু ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম।

সবাই মিলে আজই আংটিবদলের সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু, আমার জানতে ইচ্ছে হচ্ছিল! মায়া কি আজকের এনগেজমেন্টের ব্যাপারে রাজি হয়েছে নাকি ওর আরও কিছুদিন সময়ের প্রয়োজন?

যথারীতি রাতেই নির্বিঘ্নে আমাদের আংটিবদল হলো । মায়াকে দেখে মনে হয়নি যে, আজ এই আংটিবদলের জন্য সে প্রস্তুত ছিল না ।

লাল জামদানী শাড়িতে মায়াকে দেখে মনে হচ্ছিল আজই তার বিয়ে। ওর এই রুপ দেখে মনে মনে আমি যে কতবার খুন হচ্ছি তা এই মূহর্ত্বে আমি ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারছে না।
আমি ঠিক এই মূহুর্ত থেকে বুঝতে পারলাম এই জীবনে যদি কখনো মায়া আমার অর্ধাঙ্গীনি না হয় তবে আমার এই জীবনের প্রাপ্তির খাতা টুকু থাকবে শূন্য।

চলে যাবার সময় হয়ে যাচ্ছে আমাদের।তাই মায়ার চাচী আমাকে মায়ার সঙ্গে দেখা করিয়ে দেবার জন্য ব্যবস্থা করলেন।

চাচী,মায়ার রুমের সামনে এসে আমাকে রেখে চলে গেলেন। হয়তো আমাদের কিছু মূহুর্তের জন্য একাকী থাকার সুযোগ করে দিলেন। আবার কবে না কবে মায়ার দেখা পাবো তা-ও জানা নেই?

রুমের দরজায় নক করতেই ওপাশ থেকে মায়া বলে উঠলো,

-আসুন, দরজা খোলা আছে।

হয়তো মায়া বুঝতে পারেনি আমি এসেছি। রুমে প্রবেশ করতেই, মায়াকে দেখতে পেলাম।

সেই সাদা থ্রীপিছ পরিহিতা তরুনি আর এই শাড়ি পরিহিতা নারীর মাঝে যেন এক আকাশ-পাতাল পার্থক্যে। মায়াকে দেখে শুধু একটি কথা আমার অন্তরে বারবার প্রতিধ্বনি হচ্ছে,

-নিশু, মায়া নামক এই মেয়েটি শুধুমাত্র তোমার, তাকে তুমি পেয়েছ বিধাতা চেয়েছেন বলে। তাকে আগলে রেখো হৃদয় দিয়ে, তোমার মায়াজালে আটকে রেখো ভালোবাসা দিয়ে।

আমার ভাবনারা ছুটি পেলো মায়ার কন্ঠের সুমধুর সালামে। তাকিয়ে দেখি মায়া মাথা নিচু করে আছে। লজ্জায় নাকি সংকোচে বুঝতে পারছি না আমি তবুও মায়াকে জিজ্ঞেস করলাম,

– মায়া, আপনি কি আমার সাথে সাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন না?নাকি, রাগ করলেন এত তাড়াতাড়ি আংটিবদল হয়ে যাওয়াতে?

– না, তা হতে যাবে কেন? বরং নিজেকে গুছিয়ে নিতে কিছুটা দিন সময় পেলাম।

মায়াকে আস্থাশীল কন্ঠে বললাম,

– ভয় পাবার কিছু নেই। আমি আপনার বাগদত্তা হলেও আগে আপনার বন্ধু তারপর প্রেমিক হতে চাই।কারণ আমার প্রেমের সাধ জেগেছে আপনাকে দেখার পর থেকে। আপনাকে চিরদিনের জন্য আমার সম্পদ করার এত তাড়া, বুঝলেন ?

মায়া আমার দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে, আমি কি সত্যি তাকে এগুলো বলছি নাকি মজা করছি?

আমি মায়াকে আশ্বস্ত করার জন্য ওর হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললাম,

– মায়া, আপনার ছবি যেদিন দেখলাম না সেদিন আপনার সৌন্দর্যের দিকে আমার নজর পরেনি।
নজর পড়েছিল আপনার ভুবন ভুলানো হাসিতে।
তাই তো আজ আমার এখানে আসা। কিন্তু,এখানে আসার পরে যখন আপনাকে দেখলাম,তাতে আমি আরও একটু মুগ্ধতার নজর নিহিত করলাম আপনার মাঝে। মায়া শুনো?
সৌন্দর্য সবসময় থাকে না।থাকে মায়া, স্নেহ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা,ভরসা, বিশ্বাস।তোমাকে দেখার পর আমার মনে হয়েছে,তুমি আমার জীবনসঙ্গী হবার যোগ্যতা রাখো আর কারো না ।
তোমাকে আমি খুব ভালোবেসে ফেলেছি মায়া। খুব শীঘ্রই তোমাকে আমার কাছে নিয়ে আসব।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here