দোলনচাঁপার_টানে,দ্বিতীয়_পর্ব

দোলনচাঁপার_টানে,দ্বিতীয়_পর্ব
দেবারতি_ধাড়া

-ঘরটা একেবারে ফাঁকা হয়ে গেলো আমাদের! সারাদিন কোকো আর কিঙ্কুকে নিয়ে আমাদের বেশ ভালোই সময় কেটে যেতো, এখন যে কী করে এই ফাঁকা বাড়িটায় আমরা থাকবো কে জানে! বড্ড মনটা খারাপ লাগছে গো..
-তুমি এত মন খারাপ কোরোনা তো সুমিতা। মেয়েকে তো একদিন না একদিন বিয়েও দিতে হবে। এখনই যদি এত মন খারাপ করো, তাহলে তখন কী করে থাকবে?
-সেটা আলাদা ব্যাপার, তখন তো ওর শ্বশুর বাড়ির সবাই থাকবে। ওকে তো আর একা থাকতে হবেনা!
-আহ! এত ভেবোনা তো সুমি.. তুমি বরং আদা দিয়ে কড়া করে এক কাপ চা করো তো দেখি! সকালে যেনো চা-টা খেয়ে ঠিক পোষালোনা..
-হ্যাঁ সেই তো! তোমার তো শুধু চা খাওয়ার জন্য এসব অজুহাত! দাঁড়াও করে আনছি এক্ষুণি..

-শোনো কিঙ্কি আঙ্কেল আন্টির চিন্তা হওয়াটা কিন্তু খুব একটা ভুল কিছু নয়। ওনারা তো তোমাকে ছেড়ে কখনো থাকেননি.. আমারও কিন্তু খুব চিন্তা হচ্ছে!

ড্রাইভ করতে করতে কুশল কথা গুলো বললো কিঙ্কিণীকে। কিঙ্কিণী ওর পাশের সিটেই বসেছে, আর কোকো পিছনের সিটে।

-প্লিজ কুশ! তুমিও আর এরকম কোরোনা.. কোকো তো থাকবে আমার সাথে..
-হ্যাঁ এই যে কোকো বাবু একটু দেখে রাখবেন কিন্তু আমার হবু বৌটাকে। তোর ভরসাতেই কিন্তু আমার কিঙ্কিকে রেখে আসছি ওখানে..

পিছনের সিটের দিকে তাকিয়ে কুশ কথা গুলো বলতেই কয়েকবার ঘেউ ঘেউ করে উঠলো কোকো। বেশ কয়েক ঘন্টা ড্রাইভ করে ফুলতলি গ্রামে এসে পৌঁছলো ওরা। তারপর ওখানেরই একটা চায়ের দোকানে নেমে স্কুলটা কোনদিকে জিজ্ঞেস করলো কুশ। গাড়িতে বসেই কিঙ্কি চা আর কোকো চারটে বিস্কুট খেলো। তারপরই আবার কুশ গাড়িতে উঠে বেরিয়ে গেলো রেণুবালা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যানিকেতনের উদ্দেশ্যে। বেশ কিছুক্ষণ ড্রাইভ করার পর প্রায় সাড়ে দশটা নাগাদ ওরা স্কুলে এসে পৌঁছালো। ওখানের যিনি কেয়ারটেকার তার সাথে আগেই ফোনে কথা হয়েছে কিঙ্কিণীর। তাই গাড়ি থেকে নেমে স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোকটিকে দেখে বুঝতে ভুল হলোনা যে ইনিই হলেন দুলাল বাবু। গাড়ি থেকে নেমে কিঙ্কি লোকটার উদ্দেশ্যেই বললো,

-আপনিই কী দুলাল বাবু?
-হ্যাঁ হ্যাঁ আমিই দুলাল সাঁতরা। এই স্কুল আর এই বাড়ির কেয়ারটেকার। আপনিই কিঙ্কিণী ম্যাডাম তো?
-হ্যাঁ আমিই কিঙ্কিণী, কিঙ্কিণী সেন! আমার ঘরটা কোনদিকে যদি একটু দেখিয়ে দেন..

ততক্ষণে গাড়িটা একটা সাইডে পার্কিং করে গাড়ি থেকে নেমে কুশ এদিকেই আসছে। কুশের দিকে আঙুল দেখিয়ে দুলাল বাবু বললেন,

-হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই.. আপনার সাথে আপনার ভাই থাকবেন শুনেছি, তাহলে উনিই কী আপনার ভাই?

ওদের কাছে এগিয়ে এসে কুশ বললো,

-না না আমি ওর ভাই নই, আমি হলাম ওর বন্ধু!
-কিন্তু আমাকে যে হেড স্যার বললেন কিঙ্কিণী ম্যডামের সাথে ওনার ভাই থাকবেন?
-হ্যাঁ থাকবে তো!
-কই উনি এলেননা যে?
-কে বলেছে আসেনি? ওই যে ওইদিকে দেখুন.. ওটাই আমার ভাই.. কোকো একটু এদিকে আয় তো..

দূরে আঙুল দেখিয়ে কোকোকে দেখালো কিঙ্কিণী। কোকো গাড়ি থেকে নেমে স্কুলটার চারপাশে ঘুরছিলো। কিঙ্কিণীর ডাকে দৌড়ে এগিয়ে এলো ওদের দিকে। এসেই কিঙ্কিণীর পায়ের কাছে চুপ করে বসে পড়লো।

-কিন্তু এটা তো একটা কুকুর! আপনি তো বলেননি যে আপনার সাথে একটা কুকুর থাকবে? আপনি যদি আগে বলতেন তাহলে হেড স্যার কখনোই আপনাকে এখানে থাকার জন্য অ্যালাও করতেননা। আর তাছাড়া আপনাকে স্যার এটা বলেননি যে এই স্কুল বাড়িতে কাউকে একা থাকতে দেওয়া হয়না?

পাশ থেকে প্রশ্ন করলো কুশ,

-মানে? কেন একাকে থাকতে দেওয়া হয়না? কই কিঙ্কি, তুমি তো আমাকে এটা বলোনি? তুমি জানতে এটা?

যদিও কিঙ্কিণী ফোনে কথা বলার সময় হেড স্যারের মুখে শুনেছিলো যে এখানে একাকে অ্যালাও করা হয়না। তার কারণ অবশ্য কিঙ্কিণী সেভাবে জানতে চায়নি। আর স্যার ও বলেননি। স্যার রাজি না হলেও জোর করে রাজি করিয়েছিলো কিঙ্কিণী। বলেছিলো কোকো থাকলে তো আর ও একা হচ্ছেনা! তাই স্যার প্রথমে অমত করলেও পরে রাজি হয়ে যান। কিঙ্কিণী সেভাবে একা থাকার বিষয়টা গুরুত্ব দেয়নি কারণ ও ভেবেছিলো কিঙ্কিণী একা মেয়ে বলে হয়তো আপত্তি করছিলেন এখানে থাকতে দেওয়ার জন্য। তাই ও আর কুশ বা মা-বাবা কাউকেই সেসব বলেনি। আর এমনিতেই তো ওর একা থাকার অভ্যাস আছে। হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করার সময় তো ওকে একাকেই থাকতে হতো!

-না না আমিও সেরকম কিছু জানিনা। স্যার তো প্রথমে একটু আপত্তি করেছিলেন আমি একা মেয়ে তাই। কিন্তু আমি যখন বললাম যে আমার একা থাকা অভ্যাস আছে, তখন তো উনি রাজি হয়ে গেলেন। আর আমি কোকোর কথাও বলেছি..
-কিন্তু..
-আর কোনো কিন্তু নয় দুলাল বাবু! আপনি প্লিজ আমার ঘরটা দেখিয়ে দেবেন চলুন! লাগেজ গুলো নিয়ে আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিনা..
-হ্যাঁ হ্যাঁ আসুন ম্যাডাম..

দুলাল বাবু ওদের নিয়ে গিয়ে বাড়ির গেটের তালাটা খুলে দিলেন। তিনটে ঘর আছে বাড়িটায়। তার মধ্যে দুটো ঘর খুলে দিলেন দুলাল বাবু। চারপাশের পরিবেশটা ভীষণ শান্ত.. কিঙ্কিণীর খুবই ভালো লাগলো বাড়িটা। কিন্তু বাড়িতে ঢোকার সময় একটা গগনবিদারী চিৎকার করে উঠলো কোকো। দুলাল বাবু কোকোর ভয়ে সিঁটিয়ে গেলেন..

-কী হলো কোকো? কেন এত চেঁচাচ্ছিস তুই? চুপ কর!

কিঙ্কিনী একটু ধমক দিতেও থামলোনা কোকো। তাও চিৎকার করেই যাচ্ছে! তাই কুশল বললো,

-কী হলো কোকো বাবু? বাড়ি পছন্দ হয়নি বুঝি? তাই এত চেঁচাচ্ছ?
-কে বলেছে পছন্দ হয়নি? একটু আগে তুমি দেখলেনা কুশ, কেমন বাড়ির চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলো কোকো! ওর ভালোই লেগেছে বাড়িটা। মনে হয় দূরে কোথাও ওর অন্য বন্ধুদের দেখেছে, তাই এমন চিৎকার করছে! কোকো! চুপ করো! দেখছোনা এই নতুন আঙ্কেলটা ভয় পাচ্ছেন! একদমম চুপ করো! আপনি একদম ভয় পাবেননা দুলাল বাবু.. ও কিচ্ছু করবেনা.. আমার কোকো খুব ভালো.. আসলে আপনাকে নতুন দেখেছে তো, তাই একটু চেঁচামেচি করছে। আপনাকে দুদিন দেখলেই চিনে যাবে। তখন আর চেঁচাবেনা..

বেশ জোরে ধমক দেওয়ায পর একটু শান্ত হল কোকো। দুলাল বাবু ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন কোকোর চিৎকারে। কিন্তু যখন ও একটু চুপ করলো, দুলাল বাবুর ভয়টাও একটু যেন কমলো। তবে কোকোর থেকে দূরে দূরেই থাকছিলেন উনি।

-ওকে ম্যাডাম অামি তাহলে এখন আসছি। আমি একটু পরে আপনাদের ব্রেকফাস্ট নিয়ে আসছি। আর একটা কথা বলবো যদি কিছু মনে না করেন?
-না না কিছু মনে করবো কেন? আপনি বলুন না..
-আসলে একটু পরে আমি যখন আপনাদের ব্রেকফাস্ট-টা দিতে আসবো তখন যদি আপনার কুকুরটাকে ওহ সরি আপনার কোকোকে একটু বেঁধে রাখেন.. আসলে আমার কুকুরকে খুব ভয় লাগে..
-আচ্ছা আচ্ছা আমি কোকোকে বেঁধেই রাখবো, আপনি ভয় পাবেননা.. আপনি এখন আসুন..

দুলাল বাবু বেরিয়ে যাওয়ার পর কিঙ্কিণী আর কুশল মিলে সব জিনিসপত্র জায়গা মতো গুছিয়ে রাখলো কিঙ্কিণীর ঘরে। কিঙ্কিণী একা থাকবে তাই পাশের ঘর দুটো আর দরকার নেই ওর। একটা ঘরই অনেক। তাই পাশের ঘর দুটো তালা দিয়ে দিলো আবার..

দুলাল বাবু ব্রেকফাস্ট নিয়ে আসার আগে মোটামুটি অনেকটাই গোছানো হয়ে গিয়েছিলো জিনিসপত্র। তারপর উনি ব্রেকফাস্ট দিয়ে চলে যাওয়ার পর ব্রেকফাস্ট সেরে ঘরে বাকি যা যা জিনিস গুছিয়ে রাখার ছিলো সেগুলো সব গুছিয়ে নিলো ওরা দুজন মিলে। কোকো ব্রেকফাস্ট করে একটু ঘুমিয়ে পড়েছে।

-আজ আমি এখানেই থেকে যাইনা কিঙ্কি? প্লিজ..
-ধ্যাৎ তুমি আজ থাকলে কী করে হবে? আর দুলাল বাবুই বা কী ভাববেন?
-কিন্তু আমার তো তোমাকে ছেড়ে যেতেই ইচ্ছা করছেনা! আর এই জায়গাটাও বেশ সুন্দর, এখানে শুধু তুমি আর আমি.. কী যে ভালো লাগবে..
-সে তো বুঝলাম কুশ.. কিন্তু মা-বাবা যে অপেক্ষা করে বসে থাকবে তুমি কখন গিয়ে ওদেরকে বলবে যে আমি এখানে ঠিক মতো থাকতে পারবো কিনা, জায়গাটা কেমন এসব!
-হ্যাঁ তা ঠিক! তবে তুমি এখানে থেকে সত্যিই আমাকে ভুলে যাবেনা তো কিঙ্কি?
-উফ আবার এসব কথা! তুমি না এখনো বাচ্চাদের মতোই আছো কুশ! এভাবে বোলোনা সোনা.. আর তো একটা বছর, তার পরই তো আমরা লিগ্যালি হাসব্যান্ড-ওয়াইফ হয়ে যাবো, তখন তুমিও তোমার অফিসের ট্রান্সফার নিয়ে এখানেই চলে আসবে! দুজনে একসাথে থাকবো!
-হ্যাঁ! এটা কিন্তু খুব একটা খারাপ বলোনি কিঙ্কি! যাওয়ার সময় এখানের ব্রাঞ্চটা দেখে যাবো! পরের বছর আসতে হবে তো এখানেই!

কুশের এই কথাটা শুনেই সশব্দে হা হা করে হেসে উঠলো কিঙ্কিণী..

-কী হল তুমি হাসছো যে?
-আরে আমি তো এমনিই মজা করে বললাম.. তুমি সেটা সত্যি ভেবে নিলে?
-সত্যি না ভাবার কী আছে কিঙ্কি? তুমি তো কথাটা খারাপ কিছু বলোনি.. আমি এখানে থাকলে আমরা দুজনে একসাথে থাকতেও পারবো, আবার তোমার মা-বাবারও তোমাকে নিয়ে চিন্তা হবেনা!
-আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। সেসব নাহয় পরে ভাবা যাবে। এখন তুমি যাও তো স্নানটা করে নাও.. তুমি বেরোলে তারপর আমি যাবো স্নানে..
-চলোনা কিঙ্কি.. আমারা একসাথে স্নানে যাই.. এখন তো এখানে তুমি, আমি আর কোকো ছাড়া কেউ নেই! কোকো তো আর কাউকে বলতেও পারবেনা! চলোনা..

কিঙ্কিণীর পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় কথাটা বললো কুশ। তখনই কিঙ্কিণী ওর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো,

-অভদ্র ছেলে একটা! স্নানে যাও তাড়াতাড়ি! নাহলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে! খুব মারবো আমি!
-আচ্ছা! না না থাক! মারতে হবেনা! যাচ্ছি আমি.. এত মারো কেন বলো তো আমায়?!

কুশ স্নান করার জন্য বাথরুমে ঢুকে যাওয়ার পর কিঙ্কি ঘর থেকে বেরিয়ে একাই বাড়িটা একটু ঘুরে ঘুরে দেখছে। বেশ সুন্দর বাড়িটা। তিনটে ঘর হলে কী হবে, বাড়িটা বেশ বড়। বাড়িটা থেকে স্কুলটা দেখা যায়। কিন্তু আর সেরকম কোনো ঘর-বাড়ি নেই এদিকে। যদিও কয়েকটা বাড়ি আছে সেগুলো বেশ কিছুটা দূরে। কিঙ্কিণী ছোট থেকেই একদম নিরিবিলি পরিবেশ পছন্দ করতোনা। ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে হই-হুল্লোড়, মজা-ঠাট্টা এসব ভীষণ পছন্দ করে ও। কিন্তু এখানে এসে এই পরিবেশটা ওর খুবই ভালো লাগছে। কাল থেকে স্কুলে পড়ানোর স্বপ্নটা সত্যি হবে সেটা ভেবেই ওর মনের মধ্যে ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। ওর খুব ইচ্ছা ছিলো সরকারি স্কুলের বাচ্চাদের পড়ানোর। ছোট থেকে শুনে এসেছে সরকারি স্কুলে নাকি সেভাবে পড়াশোনা হয়না। মাস্টার-দিদিমণিরাও নাকি সেভাবে পড়াননা। কিন্তু কিঙ্কিণী সেটা মনে করেনা। ও মনে করে কে বলেছে সরকারি স্কুলে পড়াশোনা হয়না? সরকারি স্কুলের বাচ্চাদের পড়িয়ে ওদের ভালো মতো শিক্ষা দিয়ে ও প্রমাণ করে দেবে যে সরকারি স্কুলেও পড়াশোনা হয়। এবং সেটা ভালো ভাবেই হয়। এসব ভাবতে ভাবতেই কুশ স্নান করে বেরিয়ে পড়েছে বাথরুম থেকে। তারপর কিঙ্কিণীও স্নান সেরে নিয়ে অন্য একটা কুর্তি আর লেগিন্স পরে ভিজে জামা প্যান্ট আর তোয়ালেটা নিয়ে শুকনো করতে দিতে গেলো ছাদে..

ক্রমশ…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here