একা_তারা_গুনতে_নেই — লামইয়া চৌধুরী। পর্বঃ ১৯

#একা_তারা_গুনতে_নেই
— লামইয়া চৌধুরী।
পর্বঃ ১৯
মঈনকে রিলিজ দেয়া হয়েছে। সে আপাতত বাসায়’ই আছে। ডান হাতে আঘাত পাওয়ায় নিজে নিজে খেতে পারে না সে। শিল্পী’ই খাইয়ে দেয়। খাওয়ানোর সময়টায় শিল্পীর চেহারা দেখে মঈনের মনে হয় প্রতি লোকমায় সে এক ফোঁটা করে বিষ মিশিয়ে দিচ্ছে। কারণও আছে। সেদিন সে মঈনকে কলে কথা বলতে শুনে ফেলেছিল। ডিভোর্স এর বিষয়াদি নিয়ে উকিলের সাথে কথা হচ্ছিল। শুনে সে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। চুপ করেছিল। মঈন তা দেখে ভেবেছিল শিল্পী বুঝি তাদের আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা এতদিনে মেনে নিতে পেরেছে। কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। সেদিনের পর থেকে শিল্পী মঈন ছাড়া আর বাদদবাকি সবার প্রতি, সবকিছুর প্রতি খুব বেশি ক্রুদ্ধ আর নির্মম। যা সচরাচর ঘটে না, কয়দিন ধরে তাই ঘটছে। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে শিল্পী মুবিন, মিলা দুজনকেই ধরে ধরে মারছে। বাসার এটাসেটা ইচ্ছে করে ভাঙছে। এ যেন মঈনকে আর নিজেকে আঘাত করার এক নান্দনিক উপায়। তবে এতকিছুর পরও মঈনের দেখাশুনায় কোনো ঘাটতি নেই। সে যখন রাতে পাশ ফিরতে ব্যথায় গোঙিয়ে উঠে, কাতরায় তখন শিল্পী’ই অস্থির হয়ে উঠে। উঠে বসে ব্যাকুল হয়ে। মঈনের হাত চেপে ধরে বলে, “বেশি কষ্ট হচ্ছে না তো? কোথায় কষ্ট হচ্ছে বলো তো।”
সম্পর্কগুলো কত দুর্বল আবার দৃঢ়ও। চাইলেও ধরে বেঁধে রাখা যায় না তা যেমন সত্য, ইচ্ছে হলেই সম্পর্ক ছিন্নও করা যায় না। এ এক অদ্ভুত সুঁতোর খেলা।
থালার শেষ লোকমাটা মাখতে মাখতে শিল্পী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মঈন হঠাৎ বলে উঠল, “আমার খাবারে বিষ মিশিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে যে তোমার হয় তা আমি জানি। নিজের উপর মানসিক অত্যাচার করে আমার সেবা করার কোনো দরকার নেই। আমি দেখি একটা লোক রাখব কদিনের জন্য।”
শিল্পী খুব স্বাভাবিকভাবে বলল, “মেয়েলোক রেখো। তোমার সুবিধা হবে।”
শেষ লোকমাটা হাতে নিয়েই প্লেট সহ শিল্পী ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
.
মিলার পরীক্ষা ভালো হয়েছে। ২ ঘণ্টার পরীক্ষা ছিল। সকাল আটটা থেকে দশটা পর্যন্ত। সুহার পরীক্ষা মোটামুটি হয়েছে। অত ভালো না। তা নিয়ে অবশ্য সুহার কোনো মাথাব্যথা নেই। সুহা বলল, “মিলা, চল না, ডিএসপি দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাই।”
ডিএসপি মানে ধর্মসাগরপার। লোকজন পণ্ডিতী করে ইংরেজী বানানের প্রথম অক্ষরগুলি নিয়ে ধর্মসাগর পাড়কে ডিএসপি বানিয়ে ফেলেছে। মিলা বলল, “না আজ না। আরেকদিন। আজ হাতে ভালো সময় আছে। দুই তিন ঘণ্টা পড়লেও এক, দুইটা চ্যাপ্টার রিভাইস দেয়া যাবে। স্কুলে যেহেতু যাওয়াই হয়নি সময়টা নষ্ট করা যাবে না।”
সুহা বিরক্ত হলো খুব। মিলা তবুও গেল না। গলি থেকে বেরিয়ে মূল রাস্তায় এসে দুজনই অটোতে উঠে বসল। সুহা সামনেই নেমে যাবে। তার বাসা কাছাকাছি। অটোটা একটু চলেই সুহার বাসার কাছে যাওয়ার আগে আগেই একবার থামল। অটোচালকের পাশের সিট খালি না হওয়ার তখনি অটোতে তাদের সিটের ঠিক উল্টোপাশে চিত্তগ্রাহী এক পরিণত যুবক উঠে বসল। দোহারা গড়নের লম্বাটে চেহারার ছেলে। উচ্চতায়ও বেশ। মেদহীন চিবুকের প্রশস্ততা এবং দৈর্ঘ্য চোখে পড়ার মত। পোশাকআশাক মলিন। সাদা শার্ট, কালো জিন্সের প্যান্ট। পায়ের গোড়ালির কাছে প্যান্ট ফেঁসে আছে। পায়ে বাটার স্যান্ডেল। সুহা খেয়াল করল মিলা সাথে সাথে কেমন জড়সড় হয়ে গেছে। হাত পা আরো গুটিয়ে বিনম্র ভঙ্গিতে বসার চেষ্টা করছে। নত গলায় সালামও দিলো। পরিচিত নাকি? ছেলেটি সালামের উত্তর দিয়ে জানতে চাইল, “স্কুলে যাওনি আজ?”
মিলা বিনয়ের সাথে বলল, “স্যার, প্রাইভেটে আজ মডেল টেস্ট ছিল।”
“আচ্ছা।”
এরপর আর কোনো কথা হয়নি। নেমে যাওয়ার আগে ইমাদ শুধু বলে গেল, “ভালো করে পড়ো। ইউ আর আ জিনিয়াস।”
মিলা একবার ভাবল বলবে, স্যার, আপনার কাছে আবার পড়তে চাই। কিন্তু সাহসে কোলায়নি। তাই বলল, “দোয়া করবেন, স্যার।”
ইমাদ মিলার মাথায় হাত রেখে চলে গেল। অটো আবার চলতে শুরু করেছে। সুহা প্রায় লাফিয়ে উঠে মিলার হাত চেপে ধরল, “এটা তোর স্যার? মাই গশ! আ’ম ডেড। দোস্ত মারাত্মক লেভেলের ক্রাশিত আমি।”
মিলা বিরক্তিতে চোখ উল্টে বলল, “শিক্ষকরা পিতা সমতুল্য হয় মেয়ে।”
“রাখ তোর পিতা সমতুল্য। ওসব বাপের বয়সী স্যারদের জন্য বলা কথা। উনি কি আমার বাপের বয়সী? তাছাড়া, উনি তোর স্যার। আমার না।” মিলা অবাক হয়ে সুহার দিকে তাকিয়ে রইল। সুহার চোখেমুখে অস্থিরতা।
.
কাদিন বারান্দায় উদাস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দীপার কেন যেন খুব মায়া হয় লোকটার জন্য। বারবার মনে হয় ইশ উনার প্রেমটা কেন টেকেনি? সে নাহয় পোড়াকপালী। কিন্তু কাদিনের প্রেমটাও রক্ষা হলো না? কড়িরও ত সেই একই কষ্ট। আচ্ছা সব প্রেম শুধু ভেঙে যায় কেন? প্রেম বোধহয় কাঁচের শিশিতে রাখা বিষ। শিশি ভেঙে হয় টুকরো টুকরো, আর আকণ্ঠ বিষের জ্বালা। দীপার কাদিনের সাথে গল্প করতে ইচ্ছে হলো। লোকটা এত কম কথা বলে! সে পায়ে পায়ে গিয়ে কাদিনের পেছনে দাঁড়াল। কাদিন বারান্দার রেলিং এ দুহাতের কনুই রেখে ঝুঁকে ছিল বাইরের দিকে। দীপা বলল, “আপনার বন্ধুবান্ধব খুব কম, তাইনা?”
কাদিন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “বোধ হয়।”
“আপনি কি সবসময় এত কম কথা বলেন?”
কাদিন উত্তর করল না। দীপা বলল, “আপনার বোধহয় মন খারাপ। কেন বলুন তো?”
কাদিন দীপার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। চোখে চোখ পড়ে গেল দুজনের। দীপা চোখ সরিয়ে নিলো। তবে থামল না। সে আজ জেনেই ছাড়বে কাদিন সাহেবের কাহিনী কি! তাই বলল, “আচ্ছা আপনার কোনো মেয়ে বন্ধু নেই?”
“মানে?” কাদিন একটু অবাক। তার ভ্রুজোড়া বেঁকে গেছে।
দীপা কথা ঘুরিয়ে ফেলল, “না, বিয়েতে শুধু আপনার বন্ধুদের দেখেছি। কোনো বান্ধবীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেননি তাই বলছিলাম আরকি।”
কাদিন আবার সামনের দিকে তাকাল। মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে। সে বলল, “কোনো বান্ধবী নেই আমার।”
দীপা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে ফেলল, “বলেন কি! স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি কোথাও কোনো মেয়ে বন্ধু হয়নি আপনার?”
“না।”
“কলিগদের মাঝেও কেউ না?”
“না।”
“আমি কিন্তু আপনার প্রেমিকা টেমিকার কথা জানতে চাইনি। অমনি বান্ধবীর কথা জানতে চেয়েছি। আমার সাদা মনে কাদা নেই।”
কাদিন ছোট করে বলল, “জি, বুঝতে পেরেছি।”
দীপা নিজের গালে হাত রেখে বলল, “অবাককাণ্ড! আপনার সাথে আমার এত মিল কি করে!”
“মিল?” কাদিন এবার রেলিং ছেড়ে পুরোপুরি ঘুরে তাকাল।
“হ্যাঁ।”
“মিল কি করে হয়? বিয়েতেই তো তোমার বন্ধুদের দেখলাম।”
“হ্যাঁ মিল’ই তো। আপনারো এ জীবনে কোনো মেয়ে বন্ধু নেই, আর আমারো।”
কাদিন হতাশায় ডানেবায়ে মাথা নাড়তে নাড়তে আবার বারান্দার রেলিং ধরে বাইরের দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
.
নাঈমের জন্য নিজের টিউশনিটা ছেড়ে দিয়ে ইমাদ একটু বিপাকেই আছে। একটামাত্র টিউশনীতে ওর হয়না। অন্তত দুইটা না হলে না’ই হয়। আগে তিন জায়গায় পড়াত সে। মিলা, মুবিনেরটা ছেড়ে দেওয়ার পর হাতে ছিল দুটো টিউশনী। নাঈমের জন্য একটা ছেড়ে দিয়ে এখন কি করবে তাই ভাবছে। সরু, অন্ধকার গলির ভেতর দিয়ে হেঁটে মেসে ফিরছিল সে। পাশেই একটা ডাস্টবিন। দুটো ছোট কুকুরছানা ডাস্টবিনের ময়লায় খেলা করছে। একটা বাদামী রঙের, অন্যটা সাদার মাঝে কালো কালো ছোপ। আহ্লাদে ঘেউ ঘেউ করতে করতে গড়িয়ে পড়ছে একটা অারেকটার উপর। বলা হয় নিঃশ্বাস আটকে মানুষ মরে! কিন্তু ইমাদ জানে এখান দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ভুলেও কেউ নিঃশ্বাস ফেললে নিশ্চিত তার মৃত্যু হবে। হাতের পাঁচ আঙুলে নাক চেপে ধরে ইমাদ দ্রুত পা ফেলল সামনের দিকে। পকেটে মোবাইল বাজছে। মোবাইল হাতে নিয়েও রিসিভ করল না সে। অচেনা নাম্বার। গলিটা পেরিয়ে তারপর নাহয় কলব্যাক করা যাবে। এখানে কথা বলতে গেলে শহীদ হতে হবে! কিন্তু, মোবাইল বেজেই চলেছে। বারবার কল আসছে। অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু হতে পারে ভেবে ইমাদ হাঁটা বাদ দিয়ে দৌড়ে গলি থেকে বের হয়ে এল। নাক থেকে হাত সরিয়ে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে কল রিসিভ করল সে, “হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম।”
ওপাশ থেকে রিনরিনে একটা মেয়েলী গলা ভেসে এল, “ইমাদ বলছেন?”
“জি, ইমাদ বলছি। স্যরি, আপনি কে বলছেন?”
সুহা নিজের পরিচয় লুকিয়ে বলল, “আমার নাম নেই। আমি অনামিকা।”
চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here