একা_তারা_গুনতে_নেই — লামইয়া চৌধুরী। পর্ব: ৭০

#একা_তারা_গুনতে_নেই
— লামইয়া চৌধুরী।
পর্ব: ৭০
মুবিন একটু পর ডেকের চেয়ারেই বেহুঁশের মত ঘুমিয়ে পড়ল। ইমাদ অনেকক্ষণ ডাকল। মুবিন কিছুতেই চোখ খুলতে পারল না। কি হয়েছে ছেলেটার? জ্বরটর হয়নি তো। ইমাদ দেখল। না, জ্বর নেই। তটস্থ হয়ে আড্ডাটাড্ডা ভুলে গিয়ে মুবিনের পাশেই চিন্তিত মুখে আরেকটা চেয়ারে বসে রইল। তাকিয়ে দেখল রাতের আকাশ। কি বিশাল এই বিশ্বব্রহ্মান্ড! কত ক্ষুদ্র আমাদের জীবন। তারা আছে আকাশে? গুনতে বসল ইমাদ৷ যদি আকাশকে একসাথে ভাগ করে নেয়া যেত। মানুষ কেবল আলাদা হয়ে যাবার ভাগ করে। একসাথে ভাগ হোক না আকাশ। এটুকুর তারা আমি গুনব, তুমি গুনবে ওটুকু। সে বাকিটুকু। তাহলে যদি শেষ হয় এই তারা, জীবনের দুঃখগুলো। গহীনের যাতনা, ভেতরের যন্ত্রনা, নিরুপায় বেদনা। নিলয়ের হাঁক শুনে ইমাদ আকাশ থেকে মাটিতে নেমে এল, “বল।”
নিলয় খ্যাক করে উঠল, “এখানে একলা বসে পুত্র পাহারা দিচ্ছ নাকি বন্ধু?”
ইমাদ নিরস ভঙ্গিতে কথায় রস ঢেলে দিয়ে বলল, “মুবিনের চাচা, বসো। কথা বলি।”
নিলয় মুখ বিকৃত করে, কণ্ঠে বিষ ঢেলে দিয়ে বলল, “এই বিচ্ছু ছেলের চাচা ফাঁচা আমি হব না। পুত্র পাল্টা।”
ইমাদ আবার আকাশের দিকে তাকাল, “বস না।”
নিলয় পাশে বসল। দুজনেই বসে থাকল। ওরকমভাবে কথা বলল না কেউ’ই। নিলয় একটু পর অস্থির হয়ে বলল, “তুই সবসময় কথা বলব বলে কোনো কথা বলিস না।”
“বলি।”
“কবে? কখন? কোন জনমে?”
“আমি মনে মনে বলি।”
“কড়ির সাথে তো মনে মনে কথা বলো না। ঠিকই ফ্লার্ট করো। বন্ধুর বেলায় কেন এই অবহেলা?”
“কড়িকে না বললে ও বুঝবে!” ইমাদের কি হিম গলা!
“আর আমাকে না বললে আমি বুঝব?”
“হুম” ইমাদের ছোট্ট উত্তর। এই ছোট একটা উত্তরের ভেতর লুকিয়ে থাকা মহাবিশ্বের সমান ভালোবাসা, নির্ভরতা, বন্ধুত্ব নিলয়কে নাড়িয়ে দিলো। সে বলল, “আমি কি বুঝি না জানিস?”
“কি?”
“তোর মত দুর্বোধ্য কাউকে আমি কি করে এত ভালো বুঝতে পারি আমি এটাই বুঝি না।”
ইমাদ তখন ঘুমন্ত মুবিনের দিকে তাকিয়ে, “বন্ধু কখনো দুর্বোধ্য হয় না। যে বন্ধু দুর্বোধ্য সে বন্ধু, বন্ধু নয়। বন্ধুর কাছে কেউ’ই দুর্বোধ্য না। বড়জোর নির্বাক হতে পারে।”
“তুই কি আমার কাছে পানির মত স্বচ্ছ, ইমাদ?”
“না, কিন্তু পরিচিত অন্ধকার। যে অন্ধকারে হাতড়ে তুই সবকিছু বের করে ফেলতে পারিস।”
নিলয় হাসল, “কড়িও তোকে বুঝে। আমি চাইনকড়ির সাথে তোর কিছু একটা হোক।”
“কড়ি আমাকে বুঝে। কিন্তু যতটুকু বুঝে তারচেয়ে বেশি বুঝে বলে মনে করে। আর তুইও আমাকে বুঝিস। কিন্তু যতটুকু বুঝিস তারচেয়ে কম বুঝিস বলে মনে করিস।”
ইমাদের নির্বাক বন্ধুত্বে নিলয় কতক্ষণ আবেগে ইমাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর পিঠ চাপড়ে বলল, “দোস্ত, এই কথা শোনার পর আজ রাতে আমাকে সুন্দরবনের বাঘে খেয়ে ফেললেও আমি খুশি।”
ইমাদ চেয়ারে হেলান দিয়ে চুপ হয়ে কি যেন ভেবেই চলেছে। নিলয় বলল, “ধুর এখানে বসে বসে ডিম পারছিস কেন? উঠ। রানা ভাইরা তোকে খুঁজতে পাঠিয়েছে। আড্ডার জন্য ডাকতে এসে নিজেরা আড্ডা পাতিয়ে বসে আছি।”
“না তুই যা। আমি এখানে থাকি।”
“কেন? তুই এখানে একা বসে থাকবি কেন? বউয়ের সাথে হানিমুনে তো আসিসনি। এসেছিস ইয়ার বন্ধুদের সাথে। একা থাকাটাকা অ্যালাউ করি না।”
“আচ্ছা।”
আচ্ছা বলেও ইমাদ বসে রইল। নিলয় ইমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “ধুর এই বিচ্ছুর জন্য টেনশন করিস না তো। এই বিচ্ছুর কিছু হয়নি।”
তারপর চেয়ারটা আরেকটু কাছে টেনে গলারস্বর খাদে নামিয়ে সাবধানী গলায় ফিসফিস করে বলল, “কিচ্ছু হয়নি ওর। টেনশন নিস না। ওর চায়ে ঘুমের ঔষুধ দিয়েছি।”
“আচ্ছা।”
“তুই কি রাগ করেছিস?”
ইমাদ কোনো উত্তর দিলো না। নিলয় বলল, “খুব জ্বালায়। আজকে সবাই মিলে আড্ডা দিব। ও নির্ঘাত গ্যাঞ্জাম একটা বাধাবে এজন্য সাইজ করলাম।”
“আচ্ছা।”
ইমাদ উঠল না। নিলয় বলল, “ভুল হয়েছে। মাফ কর না।”
“আচ্ছা।”
“তোর পালক পুত্রকে তো ঘুমই পারিয়েছি। আফিম তো দিইনি।”
“আচ্ছা।”
“কড়িকে বলব তোর যে নতুন ছেলে হয়েছে?”
“আচ্ছা।”
“আমাকে মার।”
“আচ্ছা।”
“লাথি দিয়ে ফেলে দে শিপ থেকে।”
“আচ্ছা।”
“মুবিন যে আমায় ল্যাং মারল। তখন কেন ওর সাথে রাগ করিসনি?”
“আচ্ছা।”
“আরে ভাই তুই চুপ থাক।”
“আচ্ছা।”
নিলয় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ইমাদের পাশে বসে রইল। ইমাদকে শেষ পর্যন্ত নিতে পারল না আড্ডা দিতে। তাই নিজেও গেল না। একটু পর হেলান দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমালো নিলয়। ইমাদ ঘুমন্ত নিলয়, মুবিনের দিকে তাকিয়ে ভাবল দুজনকে একসাথে সামাল দিবে কি করে সে? একজন তার পালক পুত্র অন্যজন পালক বন্ধু!
.
ক্লাসে বসে অঙ্ক নোট করছিল মিলা। অভ্র বেঞ্চের পাশে এসে দাঁড়াল, “গত ক্লাসে এসেছিলে?”
মিলা বলল, “হ্যাঁ, এসেছি।”
“তোমার খাতাটা একটু দিও তো। আমি আসতে পারিনি।”
মিলা বলল, “ওহহো স্যরি। খাতা আনতে ভুলে গেছি।”
“ঠিক আছে পরের দিন নিয়ে এসো।”
অভ্র ফিরে গেল নিজের জায়গায়। ছুটির সময় মিলা ব্যাগ গোছাচ্ছিল তখনই ব্যাগ থেকে ফিজিক্স খাতাটা পড়ল। অভ্র অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মিলার দিকে। মিলার এত মেজাজ খারাপ হলো। খাতাটাকে কেন এখনই পড়তে হলো! তবু নিজেকে শান্ত রাখল। অপ্রস্তুতভাবে খাতাটা অভ্রর দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল, “খাতা তো ব্যাগেই ছিল। খেয়াল করিনি।”
অভ্র খাতাটা নিয়ে বলল, “ইটস ওকে, দোস্ত।”
মিলা মনে মনে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “তুই আমার দোস্ত কবে থেকেরে? তুই তো আমার শত্রু।”
চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here