ভুলে_থাকা_গল্প,১৪,১৫ শেষ

#ভুলে_থাকা_গল্প,১৪,১৫ শেষ
#লেখা__ইয়ানা_রহমান
#পর্ব_১৪

ইমন প্রতিদিন প্রিয়ার অপেক্ষা করে বসে থাকে, প্রিয়া কখন আসবে। দু চোখ ভরে কখন সে তার মানস প্রিয়াকে দেখবে। ছটফট করে মনটা। হৃদয় ভেঙ্গে খান খান হয়। প্রিয়া কি কখনোই বুঝবে না আমায়। এমন ভুল বুঝেই থাকবে সারাজীবন? ভালোবাসার এই টানাপোড়েন কি শেষ হবে না কখনো। খুব কথা বলতে ইচ্ছে করে ওর সাথে, যদিও প্রিয়া ইমনের শারীরিক অবস্থা কেমন আছে, এই কথা, ছাড়া আর কোন কথাই বলে না। তারপরও ইমনের খুব ভালো লাগে অন্তত ওর প্রেয়সীকে চোখের সামনে তো দেখতে পাচ্ছে। এটাই বা কম কিসে। এই সাত বছর যে প্রিয়াকে হারিয়েই ফেলেছিল, আর দেখা হবে সে আশা টাও তো ছিলো না।

খুব উসখুস করছে বারবার ওয়ার্ডের দরজার দিকে তাকাচ্ছে।

রাশেদ বললো ইমন তোকে খুব অস্থির লাগছে, তুই এমন করছিস কেন? শরীর কি খারাপ লাগছে? ডাক্তারকে ডাকবো?

হুম ডাক, ডক্টর প্রিয়াকে ডাক। অন্য কোন ডাক্তার আমার রোগ ভালো করতে পারবে না।

শা/লা ঠ্যা/ঙ ভে/ঙ্গে হসপিটালের বেডে পরে আছিস তাও প্রিয়া প্রিয়া জপে যাচ্ছিস। বাদ দে না ভাই এবার। ওই মেয়ে আর ফিরবে না। সে যা দেখেছে সেটাই সত্যি বলে মেনে নিয়েছে। তুই কম কিসে দেখতে শুনতে ভালো, পড়ালেখায় সেরা, পিএইচডি করা সুশিক্ষিত ছেলে টাকা পয়সার দিক থেকেও স্টাবলিস্ট। যে কোন মেয়ের বাপ তার মেয়েকে তোর কাছে বিয়ে দিতে দ্বিতীয়বার ভাববে না। ভালো একটা মেয়ে দেখে বিয়ে করে নে। আর যাকে নিয়ে সমস্যা সেই চম্পাও তো আন ম্যারেড আছে এখনও। ওকেই না হয় বিয়ে করে নে। সে ও তো দেখতে শুনতে ভালোই। তোর সাথে মানাবেও ভালো?

কি বলছিস আবোল তাবোল, তোর মাথা ঠিক আছে তো?
চম্পাকে বোনের মত বান্ধবী ছাড়া আর কিছুই ভাবিনি কখনো। ভালোবেসেছি শুধুই প্রিয়াকে। ওকে না পেলে আর কাউকেই চাই না এ জীবনে। যেভাবে আছি এভাবেই ভালো আছি।

রোগী রোগীর ভিজিটর, নার্স ডিউটি ডাক্তার আর মেডিকেল স্টুডেন্ট দিয়ে ওয়ার্ড পরিপূর্ন। সবাই আছে কিন্তু আমার চোখ যাকে দেখতে চায় সে কোথাও নেই।

পরিচিত নার্সদের কাউকেই দেখছি না যে প্রিয়ার কথা জিজ্ঞেস করবো। আজকে যারা ডিউটি করছে তাদের আগে এই ওয়ার্ডে দেখিনি। যার জন্য এতো কষ্ট করে এই সরকারি হসপিটালে পরে আছি সে কোথায়? তাকে ছাড়া যে কিছুই ভালো লাগছে না। এতো বছর দেখিনি সে হিসেব আলাদা। বিভিন্ন ভাবে অনেক খুঁজেছি কিন্তু কোনভাবে খোঁজ পাইনি। আজ যখন পেয়েছি আর চোখের আড়াল হতে দিবো না।

আজকে ইমনের পায়ের প্লাস্টার খুলে দিয়েছে। ধরে ধরে একটু হাঁটতে বলেছে। রাশেদ একটা ওয়াকার কিনে নিয়ে এলো, সেটা ধরে ইমন একটু একটু হাঁটছে, আর চারদিকে তাকিয়ে দেখছে কোথাও প্রিয়াকে দেখা যায় কিনা? অন্য কোন ওয়ার্ডে ডিউটি করছে কিনা। কিন্তু না আশপাশের কোন ওয়ার্ডের ভিতর প্রিয়া নেই।

তাহলে কি আজ প্রিয়া আসবে না।
শুনেছি তো ওর বাসা কাছেই। কিন্তু কোথায়? ঐতো সিস্টার রশ্মি আসছে। সিস্টার রশ্মিকে দেখে ইমন খুশি হয়ে গেলো। ভাবলো তাকে জিজ্ঞেস করে দেখি সে কিছু জানে কি না।

সিস্টার রশ্মি বললো, আজকে কেমন আছেন?

ভালো আছি দিদি।

প্লাস্টার খোলা হয়ে গেছে, শরীরের যখম শুকিয়ে গেছে আর দুই একদিনের মধ্যেই হয়তো রিলিজ দিয়ে দিবে।

দিদি ডক্টর প্রিয়া কোথায়? তাকে যে দেখছিনা? সে কি ডিউটিতে আসছেনা?

না প্রিয়া ম্যাডাম আসেনি সে ছুটি নিয়েছে, কয়েকদিন পর পরীক্ষা তাই। শুনছি পরীক্ষা শেষ হলেই লন্ডন চলে যাবে তার মায়ের কাছে।

ডক্টর প্রিয়ার মা লন্ডনে থাকেন?

এখন লন্ডনে আছেন। তার মাও একজন ডক্টর। সেখানে একটা কোর্স করতে গেছেন। প্রিয়া ম্যাডামকে ও যেতে বলছেন। শুনেছি ম্যাডাম যেতে রাজি হয়েছে।

কবে যাচ্ছেন?
সেটা তো বলতে পারবো না। পরীক্ষা দিয়েই হয়তো চলে যাবে। আপনি বেডে গিয়ে শুয়ে পড়েন। একবারে অনেকক্ষণ হাটা যাবে না। একটু একটু করে হাঁটতে হবে।

ইমন বেডে চলে এলো। মন খারাপ হয়ে গেলো ওর।
তাহলে কি প্রিয়া আমার জীবন থেকে একেবারেই হারিয়ে যাবে? আর ভাবতে পারছি না।

রাশেদ হাসি মুখে ইমনের কাছে এসে বসলো। কি তোর মন খারাপ কেনো? কিছু হয়েছে নাকি?

আমার আর কি হবে, আমার জীবনের অন্ধকার রাত পেরিয়ে আলোর দেখা আর পাবো কি না জানি না। এখন তুই বল এমন দাত ক্যালাচ্ছিস কেন? কোথা থেকে এলি?

একটা কাগজ এগিয়ে দিলো ইমনের দিকে।

কি এটা? কিসের কাগজ?

তোর জন্য নিদ্রা কুসুম তেল। এটাতে তোর শান্তির ঘুমের ব্যবস্থা করে এসেছি।

ইমন কাগজটা হাতে নিয়ে দেখলো, কিছুই বুঝলো না। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
এটা তো একটা মোবাইল নাম্বার? কার নাম্বার এটা?

গেস কর,

উহু পারছি না অনুমান করতে।

ব্যাটা তোর পেয়ারীর নাম্বার। যার জন্য দেবদাস হয়ে যাচ্ছিস। তার সেল ফোনের নাম্বার।

ইমন খুশিতে জড়িয়ে ধরলো রাশেদকে। সত্যি বলছিস দোস্ত? আমার তো এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না।

ভাই এত খুশি হসনে। এটা শুধু নাম্বার জোগাড় করে এনেছি। প্রিয়াকে তোর কাছে এনে দিতে পারিনি। এখনও অনেক পথ বাকি।

চেঞ্জ করে নে। তোকে নিয়ে এক জায়গায় যাবো। বললো রাশেদ।

কোথায় যাবো, বলবি তো।

বলছি তুই চেঞ্জ কর। ইমন ট্রাউজার আর টিশার্ট পরে নিলো।

ইমন ওয়াকার নিলো না, হাতের ভর দেয়ার ক্রাচ নিলো। হাঁটতে কষ্ট হলেও এতদিন পরে বাইরে আসতে পেরে ওর ভালো লাগছে।

ইমন রাশেদ আর একজন ওয়ার্ড বয় হেঁটে চলেছে। রাশেদ ওয়ার্ড বয়কে টাকা খাইয়ে প্রিয়ার ফোন নাম্বার নিয়েছে আর ওর বাসা চিনিয়ে দিতে বলেছে। তাই সে সাথে যাচ্ছে।
প্রিয়ার বাসায় পৌছে দিয়ে ছেলেটা চলে গেলো।

ইমন বাইরে থেকে বাসাটা দেখলো, পাঁচ তলা বাড়ির দোতলায় প্রিয়া থাকে। বাসার দরজার সামনে গিয়ে কলিং বেল টিপে দিলো।

গেট খুলে দিলো একজন মাঝ বয়সী মহিলা। কে আপনেরা? কারে চান?

ডক্টর ম্যাডাম আছে? জিজ্ঞেস করলো রাশেদ।

আছে, তয় কোন রুগীর বাসায় আওয়া নিষেধ। বাসায় কোন রুগী দেহে না ম্যাডাম। আর ম্যাডাম কোন অপরিচিত কাউর লগে বাসায় দেহাও করে না।

আমরা তার অপরিচিত না। খুব পরিচিত জন তার। আপনি তাকে ডাকেন খালা, আমরা তার সাথে কথা বলতে এসেছি। বললো রাশেদ।

না ডাক দেওন যাইবো না অখন, ম্যাডাম পড়তাছে। পড়ার সময় ডাকলে ডিস্টাব অইবো। আপনেরা পরে আইয়েন।

আমার তার সাথে দেখা করা খুব জরুরী। দেখা না করে আমি যাবো না খালা। আপনি দয়া করে ডাকেন তাকে। বললো ইমন।

বাইরে কারো কথা কাটাকাটি শুনে প্রিয়া নিজেই পড়া ছেড়ে সামনে এগিয়ে এলো।
কে এসেছে খালা? কার সাথে কথা বলছো? দরজার কাছে আসতেই প্রিয়া বললো,
একি আপনারা এখানে? কোন সমস্যা?

কি সমস্যা বলেন, সমস্যা দেখার জন্য অন্য ডিউটি ডক্টর ছিলো না? তাদের নিজের শারীরিক সমস্যার কথা বলতেন। তারা দেখে আপনার সমস্যা সমাধান করে দিতো।
আমি তো আগেই বলেছি আপনারা এভাবে চিকিৎসা নিয়ে অভ্যস্ত না, যদিও এখানে চিকিৎসার কোন ত্রুটি হয় না। এটা যার যার ইচ্ছার আর ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। ঢাকায় গিয়ে প্রাইভেট হসপিটালে ভর্তি হন। আর আমার বাসা চিনলেন কিভাবে? কে চিনিয়ে দিল।

ইমন বললো প্রিয়া আমরা ভিতরে বসে কথা বলি, আমি বেশিক্ষণ দাড়িয়ে থাকতে পারছি না। খুব কষ্ট হচ্ছে।

প্রিয়া সামনে থেকে সরে গিয়ে ইমন আর রাশেদের ঢোকার জায়গা করে দিলো।

রাশেদ ইমনকে ধরে ঘরের ভিতর নিয়ে একটা সোফায় বসিয়ে দিলো। রাশেদ বললো
তোরা কথা বল, আমি একটু ঘুরে আসি। কথা শেষ হলে কল করিস এসে নিয়ে যাবো।

প্রিয়া বললো কথা বলবে, কিসের কথা, আমাদের মাঝে ব্যক্তিগত কোন কথা নেই ভাইয়া। আপনি ওনাকে এখান থেকে নিয়ে যান।

রাশেদ বললো প্রিয়া আপু ইমন কি বলতে চায় সেটা একটু শোন প্লিজ। এতে তোমার ভালোই হবে। সামনাসামনি বসে নিজেদের সব রাগ অভিমান ঝেড়ে ফেলে দাও। ইমন খুব কষ্ট পাচ্ছে। ওর কথাগুলি মন দিয়ে শোন, আমি তোমার কাছে হাত জোড় করে অনুরোধ করছি।

রাশেদ আর সেখানে দাড়ালো না সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলো।

প্রিয়া ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো, কি শুরু করেছেন এসব? আপনার সাথে আমার কোন কথা নেই,থাকতে পারে না। সেদিন সব কথা সব সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছি। আমাকে আর বিরক্ত করবেন না। আমি আপনার কোন কথা শুনতে ইচ্ছুক না। কোন দু/শ্চ/রিত্র ল/ম্প/টের সাথে আমার কোন কথা থাকতে পারে না।

চলবে……

#ভুলে_থাকা_গল্প
#লেখনী__ইয়ানা_রহমান
#পর্ব_১৫ (শেষ পর্ব)

আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি প্রিয়া। ভালোবাসার চাইতেও বেশি ভালোবাসি। আমার ভালোবাসায় কোন মিথ্যে নেই। কোন প্রতারনা প্রবঞ্চনা ছিলো না। তুমি যা দেখেছো যা বুঝেছো সব ভুল। সেই ভুল বুঝা থেকে তুমিও কষ্ট পাচ্ছো, আমিও কষ্ট পাচ্ছি। আমি জানি তুমি আমাকে খুব ভালোবাসো। সেই ভালোবাসার দোহাই দিয়ে বলছি আমাকে একটু বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে ঠকাইনি। তুমি এমনভাবে হারিয়ে গেলে আমার জীবন থেকে তোমার ভুল ভাঙিয়ে দেয়ার সুযোগটাও এই পাইনি। কতভাবে তোমাকে খুঁজেছি। কতজনকে দিয়ে তোমার খবর নেয়ার চেষ্টা করেছি কিন্তু আমি ব্যর্থ হয়েছি। অসহায়ের মত নিজের ভিতর গু*ম*রে ম*রে*ছি। আজ এভাবে তোমার সাথে দেখা হবে বলেই হয়তো আমার এই অ্যা*ক*সিডেন্ট টা হয়েছে। নাহলে হয়তো আর কোনদিন তোমার দেখা পেতাম না।

,
প্রিয়া বললো, হ্যা আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম। মন থেকেই তোমার হতে চেয়েছিলাম। আর সেই চাওয়াতেই আমার সর্বনাশ হয়েছে। সব হারিয়ে ফেলেছি। জীবনের আনন্দ বলতে কিছু নেই। ঘটে গেছে জীবনের ছন্দপতন। বুকের ভিতর ঘর করেছে একরাশ হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাস।সেখানে কান্না ছাড়া আর কিছুই নেই।
এতো কিছুর পরও তুমি নামক মানুষটা বুকের ঠিক মাঝে বসে থাকতে আ*গু*নের ম*শাল জ্বা*লিয়ে। তোমার সেই আ*গুনে আমি দ*গ্ধ হতাম প্রতি মুহূর্তে। আমাকে পো*ড়াতে তোমার জুড়ি নেই। তোমার দহনে পু*ড়ে যেতে থাকতাম অহর্নিশি। ছাই হয়ে যেতাম তোমার দহনে। তখন কোথায় ছিলো তোমার এত ভালোবাসা? কোথায় ছিলে তুমি? আজ হঠাৎ আমার জন্য তোমার মনে এতো প্রেম জেগে ওঠার কারণ কি? যার জন্য আমাকে ঠকালে সে কি তোমাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে? নাকি তার প্রতি তোমার মন ভরে গেছে? কোনটা?

তোমার সাথে সুখের সংসার সাজানোর কল্পনা করা সেই প্রিয়া আজ ভীষন নিঃসঙ্গ। তুমি তাকে ভে”ঙ্গে গু*ড়ি*য়ে দিয়েছো। তার এই নিঃসঙ্গতাকে মেনে নিয়ে জীবনের চরম বাস্তবতার সাথে প্রতি নিয়ত লড়াই করে চলেছে। খুব অল্পতেই কেঁদে ফেলা সেই আবেগপ্রবণ প্রিয়া আজ পাহাড় সম কষ্ট বুকে নিয়ে গু*মরে ম*রে। বুকের ভিতর জমিয়ে রেখেছে তার সবচেয়ে কাছের মানুষটির দেয়া ক্ষত। আশেপাশের মানুষগুলোকে কখনো বুঝতে দেয় না তার ভিতরে জমিয়ে রাখা কতটা গভীর ক্ষত চাপা পরে আছে। তার চোখের ভিতর লুকিয়ে আছে কষ্টের এক সমুদ্র লোনা জল।

,
প্রিয়া তুমি আমাকে ভুল বুঝছো। আমি কক্ষনো তোমাকে ঠকাইনি। তুমি একটা বাজে ধারণাকে নিজের ভিতর বন্দী করে রেখেছ, যেটা সম্পূর্ন ভিত্তিহীন। যার কোন সত্যতা নেই।

তাহলে তুমি বলতে চাইছো আমি নিজের চোখে যা দেখেছি সেটা ভুল?

তুমি যেটা দেখেছো সেটা ভুল না কিন্তু যা ভেবেছো সেটা ভুল। সব সময় আমরা চোখের সামনে যা দেখি তার অর্থ সবসময় এক হয় না।

আমার কোন বোন নেই। আমরা দুই ভাই। বাবা মাকে হারিয়েছি সেই ছোট বেলায়। ভাইয়া ছোট বয়স থেকেই আমার বাবা মা হয়ে আমাকে বড় করেছেন। তারপর ভাবীমা আমাকে অনেক যত্নে ভালোবাসায় নিজের ছেলের মত মানুষ করে গেছে।

ভাবিমার বোন চম্পা। ভাবিমা চম্পাকে খুব পছন্দ করেন। সেই সূত্রেই চম্পা আমাদের বাসায় থেকে পড়াশোনা করে। আমি তো তোমাকে একথা আগেই বলেছিলাম। আমি চম্পাকে বোনের চোখেই দেখতাম অন্য কিছু না। একই বাসায় থাকি ফ্যামিলি মেম্বারের মত। তাই ওর সাথে বন্ধুত্বও হয়েছিলো।

তুমি যখন আমার সাথে দেখা করতে আমাদের বাসায় এসেছিলে তখন চম্পার ফোনে ওর বাড়ি থেকে একটা দুঃসংবাদ আসে। চম্পা তখন আমাকে জড়িয়ে ধরে কাদছিল। সহানুভূতি জানাতে আমিও ওকে জড়িয়ে ধরেছিলাম,সেখানে কোন প্রেম কোন নোংরামী ছিলো না। আমি আমার ভালোবাসার কসম করে বলছি আমাকে একটু বিশ্বাস করো। অবিশ্বাস করে দূরে ঠেলে দিও না। তারচেয়ে তুমি আমার গলা টিপে মে*রে ফেলো বলেই ইমন কাদতে লাগলো। আমি তোমাকে ছাড়া ভালো নেই। আমার ভালো থাকতে হলে তোমাকে আমার জীবনে চাই। খুব করে চাই।

প্রিয়া আমাকে বিশ্বাস করো আমি এক বিন্দুও মিথ্যে বলছি না।

,
প্রিয়া বললো এটাই যদি সত্যি হবে তাহলে সাথে সাথে কেনো আমার ভুল ভাঙিয়ে দাওনি?

আমি তোমার পিছু পিছু তোমার বাসা পর্যন্ত এসেছিলাম প্রিয়া কিন্তু তোমার সমস্যা হতে পারে ভেবে ভিতরে যাই নি। একদিন তুমি বলেছিলে আমাদের পড়াশুনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সম্পর্কের কথা গোপন রাখতে। তাই আমি তোমাকে কোন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে চাইনি। ভেবেছি অন্য সময় তোমার সাথে দেখা হলে বা ফোনে কথা বলে তোমার সব অভিযোগ দুর করবো।
তারপর কয়েকদিন কেটে যাওয়ার পরও যখন তোমার দেখা কোনভাবেই পাচ্ছিলাম না তখন মানসিকভাবে খুব ভেঙ্গে পড়েছিলাম।
পাগলপ্রায় অবস্থা আমার। ভাইয়া ভাবি যেনো আমার এই অবস্থার কথা জানতে না পারে তাই আমি রাশেদের বাসায় থাকতে লাগলাম। ভাবলাম নীপার মাধ্যমে তোমার খোঁজ পাবো।
খাওয়া দাওয়া নেই, ঘুম নেই দুচোখের পাতায়। ছন্নছাড়া আমার জীবন।

একদিন আর থাকতে না পেরে আমি খুব সাহস করে তোমাদের বাসায় গেলাম, যে করেই হোক তোমার সাথে আমার কথা বলতেই হবে। গিয়ে দেখলাম বাসায় তালা ঝুলছে। পাশের ফ্ল্যাটে নক করে জিজ্ঞেস করলে ওরা বলে বাইরে গেছে বোধয়। আমি মন খারাপের পাহাড় বুকে করে বাসায় ফিরে এলাম।

চম্পা আমাকে দেখে ভীষন কাদলো। বারবার নিজেকে দায়ী করে দেয়ালে মাথা ঠু*কতে লাগলো। আমি ওকে থামাই। এখানে তোমার কোন দোষ নেই। দোষ সব আমার ভাগ্যের।

চম্পা বললো, ভাইয়া আপনি বলেন আমি কি করলে আপনার সব ঠিক হবে আগের মত। আপনার এই অবস্থা আমি মেনে নিতে পারছি না। আমি নিজেকেও আর সামলাতে পারছি না। আমার জন্য সব এলোমেলো হয়ে গেলো। এই অপরাধবোধ নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই না।

আমি কালই প্রিয়ার কাছে গিয়ে সব খুলে বলবো। আমি আপনার ভালোবাসার মানুষকে ফিরিয়ে আনবোই সেটা যে করেই হোক।

.
ইমন বললো,আমি এতটাই খুশি হয়েছিলাম যে এর চাইতে ভালো আর কোন সলিউশন হতে পারে না।
পরদিন সকালে চম্পা তোমাদের বাসায় গেলে আমি চম্পার ফেরার অপেক্ষায় থাকলাম আর ভাবলাম এক্ষুনি তোমার কল আসবে। কিন্তু তোমার কোন কল আসেনি, উল্টো চম্পাকে চরমভাবে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছো। আমাকে আর চম্পাকে জড়িয়ে অনেক অনেক বাজে কথা বলেছো। তারপর আমিও আর তোমার খোঁজ নেইনি। মনের কষ্টে জর্জরিত ছিলাম। কেঁদেছি আর ভেবেছি এই তুমি আমাকে চিনলে, এই তোমার ভালোবাসা? যাকে তুমি না জেনেই দুশ্চরিত্র সার্টিফিকেট দিয়ে দিলে। এক তরফা প্রেমের গ্লানি নিয়ে পারি জমালাম অস্ট্রেলিয়ায়,
পিএইচডি করার জন্য। সেখানে গিয়েও আমার মনে কোন শান্তি ছিলো না। শুধু তোমাকেই মনে পড়তো। কিছুই ভালো লাগতো না।

কেনো করেছিলে চম্পাকে অপমান? আরেকটু কি যাচাই করতে পারতে না? হতে পারতে না আমার মুখোমুখি? তাহলে হয়তো এতো কষ্ট পেতাম না। দুদিক থেকে দুজনে বছরের পর বিরহ ব্যথা সয়ে গেলাম।

.
ওয়েট ওয়েট কি বলছো এসব? চম্পা আমার কাছে একটা নাম মাত্র। আমি তাকে কখনো দেখিনি। ঘটনার দিন শুধু পিছনটাই দেখেছিলাম, যে তোমার সাথে লেপ্টে ছিল। কোন চম্পা আমার কাছে যায় নি।

ইমন ভীষন অবাক হয়, প্রিয়া মিথ্যে কেনো বলছে? নাকি চম্পা মিথ্যে বলেছে? কেমন গোলকধাঁধায় পরে গেলো ইমন। চোখ মুছে নিজেকে শান্ত করে নিলো।
তারপর প্রিয়াকে বললো,

তোমার মোবাইল ফোনটা দাও। আমার ফোন অ্যাক্সিডেন্টের সময় হারিয়ে গেছে।

প্রিয়া অবাক চোখে চেয়ে বললো, আমার মোবাইল তোমাকে দিবো কেনো? যথেষ্ট হয়েছে এবার তুমি যাও। তোমাকে জাস্ট অসহ্য লাগছে আমার।

ইমন ভীষন ক্ষেপে গেলো ধমকে উঠে প্রিয়াকে বললো ফোনটা দাও আমাকে। আমার এক্ষুনি একটা ফোন লাগবে। তোমারটা না দিলে রাশেদকে কল করে ওর ফোন দিয়ে যেতে বোলো।

প্রিয়া বেডরুমে গিয়ে ফোন এনে ইমনের হাতে দিলো।

ইমন বললো, ফোনের পাসওয়ার্ড বলো।

আমার কাছে দাও আমি খুলে দিচ্ছি।

আমিই খুলে নিতে পারবো, পাসওয়ার্ড বলো।

বেঈমান__

ইমন রাগী চোখে প্রিয়ার দিকে তাকাতেই প্রিয়া বললো ওটাই লক খোলার পাসওয়ার্ড।

ফোনের লক খুলে ইমন নিজের ফেসবুক আইডি তে লগ ইন করে। সেখানে ফ্রেন্ড লিস্টে গিয়ে চম্পার ফেসবুক আইডি বের করে। সেখানে চম্পার অনেক ছবি আছে। ইমন প্রিয়ার দিকে ফোন এগিয়ে দিয়ে বলে দেখতো এই মেয়েকে চিনো কি না।

প্রিয়া অনেকগুলি ছবি দেখে চম্পার, জুম করেও দেখে কয়েকটা। তারপর বলে না এই মেয়েকে আমি কখনো দেখিনি।

আর আমার কাছে কেউ যাবে কিভাবে আমি ওই দিনের পর আর বাসায় ফিরিনি। আমি জানতাম তুমি আমার খোজ করবে। মনের কষ্টে মামার বাসায় চলে গেছিলাম। সেখান থেকে সোজা এখানে চলে এসেছি। এতো বছরে আর ঢাকা মুখী হইনি।

ইমনকে কেমন অস্থির দেখাচ্ছিলো। সে নিজের চুল দুহাতে খামচে ধরে টেনে যাচ্ছে।

প্রিয়া ভিতরে গেলো ইমনের জন্য পানি আনতে।

খালা বললো, তহন থিক্কা কইতাছি আমার বাজারে যাইতে হইবো। টেহা দেন। মাসের বাজার আনতে যামু। সন্ধ্যার আগেই ফিরতে অইবো। আইয়া আবার রাইতের লাইগ্গা রান্ধন লাগবো।

প্রিয়া খালাকে বললো, খালা আপনি তাহলে বাজার করে নিয়ে আসেন, এই নেন টাকা। আর দেরি হলে ফিরতে দেরি হয়ে যাবে।

আপনে রে একা রাইখ্যা বাইরে যামু?

কোন অসুবিধে নেই। উনি আমার পরিচিত। আপনি যান।

খালা চলে গেলে প্রিয়া দরজা বন্ধ করে ইমনের জন্য একগ্লাস পানি নিয়ে এলো।

ইমন পানি খেলো কিন্তু ওর রাগ কমছে না। কি করবে সেটা ভাবছে।

চম্পাকে ফোন করলো, রিং হচ্ছে।
ইমন প্রিয়ার হাত ধরে টেনে ওর পাশে বসালো। প্রিয়া উঠে যেতে চাইলে ইমন জোর করে বসায় আর ইশারায় চুপ থাকতে বলে।

ইমন ফোন স্পিকারে দেয়। চম্পা কল রিসিভ করে জিজ্ঞেস করে, কে আপনি, কাকে চাচ্ছেন।

আমি ইমন।
চম্পা কেমন আছো তুমি?

ইমন ভাইয়া আপনি! এটা তো আমার জন্য বিরাট সারপ্রাইজ! কেমন আছেন আপনি? কবে ফিরেছেন দেশে? ফিরে এসে তো একটা ফোনও করলেন না। ভুলে গেছেন আমায়? এই নাম্বার কবে নিলেন? এই নাম্বার আমার কাছে নেই। তাই চিনতে পারিনি।

না না তোমায় ভুলবো কেমন করে। বোনকে কি ভোলা যায়? তোমাকে যে নিজের বোন ভেবে এসেছি শুরু থেকে।

আচ্ছা চম্পা আমি দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর আর কখনো তোমার প্রিয়ার সাথে দেখা হয়েছিলো? তুমি কি ওকে বলেছিলে আমাদের মাঝে কিছুই ছিল না। আমাদের সম্পর্ক ছিল ভাই বোনের।

চম্পা বললো, বলিনি আবার! আপনি দেশে থাকতে গিয়েছি তখন কতটা অপমানিত হয়েছি সেটা তো আপনি জানেন সে তো কোন কথাই শুনতে নারাজ। আপনি চলে যাবার কয়েকদিন পরেই শপিং মলে একবার দেখা হয়েছিল তার সাথে। আমি কত ইনিয়ে বিনিয়ে বললাম আপনার কথা, আপনার সেল নাম্বার দিতে চাইলাম। সে আমাকে চরম অপমান করে চলে গেছে।

প্রিয়া বিস্ময়ে হতবাক। ফিসফিস করে বললো, কি বলছে এই মেয়ে। কবে দেখা হলো আমার সাথে? এতো চরম মিথ্যেবাদী।

ইমন প্রিয়ার হাত চেপে ধরে চুপ থাকতে ইশারা করে।

,
ইমন রেগে গিয়ে বললো, চম্পা তুই মিথ্যে কেনো বলছিস? আমি তো জেনেছি প্রিয়ার সাথে তো তোর কখনো দেখাই হয়নি। তাহলে বোন হয়ে আমাকে এতগুলি মিথ্যে কথা কেনো বলেছিস? কি স্বার্থ ছিলো তোর এতে?

,
চম্পা একটু বিরক্ত হয়ে বললো, হ্যা আমি মিথ্যে বলেছি কারণ আমি আপনাকে ভালোবাসি। কখনোই আমার ভাই মনে করি নাই।

আমি আপনাকে ভীষন ভীষন ভালোবাসি। সেটা আপনি বুঝেও না বুঝার ভান কেনো করছেন?

দিনের পর দিন আমি ভালোবাসার আবেদন নিয়ে আপনার পিছনে পিছনে ঘুরেছি আর আপনি প্রিয়া প্রিয়া জপে গেছেন। আমার কি তখন ভালো লাগতো এগুলি শুনতে আপনিই বলুন।
আমি যাকে ভালোবাসি তার মুখে অন্যের গুণগান শুনতে কতক্ষন ভালো লাগে। আমি সবসময় চাইতাম আপনাদের ব্রেকআপ হয়ে যাক। এই দোয়াই করতাম। আপনাদের শেষ পর্যন্ত ব্রেকআপ করাতে পেরেছি, তাতেই আমি মহাখুশি।

তাহলে তুই সেদিন প্ল্যান করে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলি?

হুম সব আমার প্ল্যান ছিল। আমি সেদিন প্রিয়াকে বাসায় ঢুকতে দেখেছিলাম।
প্রিয়ার সাথে প্রেম করেছেন এক কিংবা দেড় বছর। আর আমি আপনাকে ভালোবাসি সাত বছর ধরে। ভেবেছি প্রিয়াকে আপনার জীবন থেকে সরাতে পারলেই একদিন না একদিন আপনি আমার ভালোবাসা বুঝবেন। তখন আমার কাছে ফিরবেন। আমাকে গ্রহণ করে নিজের করে নিবেন। কিন্তু আপনি বড়ই অবুঝ। অথবা আমি আমার ভালোবাসা বোঝাতে ব্যর্থ। এখন তো আমি ক্লিয়ার করেই বলছি আমি আপনাকে ভালোবাসি। এখন তো আমাকে আপন করে নেন। কি নেই আমার মাঝে। আমি কি সুন্দরী না? শিক্ষিতা না?আমার পরিবারও তো স্টাবলিস্ট। আমি কম কিসে? আমি আপনাকে প্রিয়ার চেয়েও বেশি ভালোবাসবো। আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করতে করতে হাপিয়ে উঠেছি। বাড়িতে অনেক বলে বিয়ে ঠেকিয়ে রেখেছি। বলেছি আপনি ফিরে এলেই আমাদের বিয়ে হবে। এবার তো আমাকে একটু ভালোবাসুন। আপনার বুকে একটু ঠাঁই দেন। বেশি কিছু চাই না আমার শুধু একটু ভালোবাসা দিলেই হবে।

ইমন একটা খারাপ গালি দিয়ে বলে গো টু হেল।
চম্পা চিৎকার করে কাদছে। ইমন ফোন কেটে দিলো।

,
প্রিয়া মাথা নিচু করে মুখের ওপর দুহাত চেপে বসে আছে। অঝোর ধারায় চোখের পানি বয়ে চলেছে ওর।
এতবড় স্বরযন্ত্রের শিকার ও। ঘুণাক্ষরেও টের পেলো না কোন কিছুর।

ইমন প্রিয়াকে নিজের দিকে ফিরিয়ে ওর মুখ ঢেকে রাখা হাতের ওপর চুমু খেল। তারপর হাত সরিয়ে প্রিয়ার কপালে গভীরভাবে নিজের ঠোট ছোঁয়ায়। ভালোবাসার পরশ দিয়ে যায়।

প্রিয়া ইমনকে জড়িয়ে ধরে। আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি তোমার কাছে দোষী। আমার তোমাকে বিশ্বাস করা উচিত ছিলো।

ইমন বললো আমিও দোষী তোমার কাছে। আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি তখন রাগ করে বিদেশ না গিয়ে তোমাকে আরো ভালোভাবে খুঁজলে হয়তো পেয়ে যেতাম। ভুল বোঝাবুঝির অবসান করতে পারতাম।

আসলে দোষ আমাদের কারোই না। ওই সময়টা আমাদের জন্য ছিলো না তাই দুজন দুদিকে ছিটকে পরেছিলাম।

আর হারাতে দিবো না তোমাকে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি তোমাকে বিয়ে করে আমার ঘরে তুলবো।

দুজন দুজনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রইলো। আর কেউ কাউকে হারাতে দিবে না। বেধে রাখবে একে অপরকে।

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here