ভালোবাসি_তাই❤,পর্ব:০৩

ভালোবাসি_তাই❤,পর্ব:০৩
মাহিয়া_মেরিন

আশ্বিন অধরাকে নিয়ে রুম থেকে বের হতেই দেখে রকি আর তার কিছু সহযোগীরা দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।। আশ্বিন কিছু না বলে অধরার হাত ধরে চলে আসতে নিতেই….

— রকি আশ্বিনের সামনে এসে,,,””দাঁড়া আশ্বিন।। সাহিল ভাই তোর সাথে কথা বলবে।।””

সাহিলের নাম শুনেই অধরার গলা শুকিয়ে গিয়েছে।। এই সাহিল ছেলেটার উপর তার কোন বিশ্বাস নেই।। সকল ধরনের অন্যায় কাজ সে বিনা দ্বিধায় করে ফেলে,,,,আর তার বিপক্ষে গিয়ে কেউ কথাও বলতে পারে না।। শুধু মাত্র আশ্বিন ছাড়া,,তাই তো দুজন দুজনের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ।।

অধরা তাকিয়ে দেখে সাহিল ফোনে কথা বলতে বলতে এদিকেই আসছে।। অধরা সাহিলকে দেখে ভয়ে আশ্বিনের পিছনে লুকিয়ে পড়ে।।
— অধরা মনে মনে,,,,””ওইযে আসছে আফ্রিকার এনাকন্ডা।। হুহহ,,বড়লোক বাবার বিগড়ে যাওয়া ছেলে।। কি মনে করিস তুই নিজেকে?? আমার আশ্বিন ভাইয়ার সামনে তো তুই কিছুই না।। এখন দেখবি ভাইয়া কিভাবে তোকে ঢিসুম ঢিসুম দিবে।।। এহহহ,,,আবার স্টাইল করে এদিকে হেঁটে আসা হচ্ছে!! একটু পরেই তো এম্বুলেন্স দিয়ে হাসপাতালে যাবি।। তুই তো জানিস না আমি কার বোন।।””
অনেকটা ভাব নিয়ে মনে মনে কথাগুলো ভাবছে অধরা।।

সাহিল এসে আশ্বিনের সামনে দাঁড়ালো।। আশ্বিন স্বাভাবিক ভাবেই সাহিলের দিকে তাকিয়ে আছে।। সাহিল অধরাকে আশ্বিনের পিছনে লুকিয়ে থাকতে দেখে হালকা হেসে,,,
— “”আশ্বিন!! তোর সাথে তো আমি পরে হিসাব নিকাশ করবো।। কিন্তু এখন আমি এসেছি আমার অধরা জানুর সাথে কথা বলতে।।””

— আশ্বিন অধরার দিকে একবার তাকিয়ে সাহিলকে বললো,,,””অধরা জানু?? এমন ভাবে বললি যেন তোর গার্লফ্রেন্ড হয়।।
যাই হোক….কথা বলবি বল,,আমার কি?? আমি গেলাম।।””

আশ্বিন কথাটা বলেই যাওয়া শুরু করলো।। এদিকে অধরা এতোক্ষণ ধরে আশ্বিনের পিছনে লুকিয়ে ছিলো। ভাবছিলো সিনেমার হিরোদের মতো আশ্বিন গিয়ে সাহিলকে মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবে।।
আর এখন উল্টো তাকেই এই বিপদে ফেলে চলে যাচ্ছে?? অধরা দৌড়ে এসে আশ্বিনকে ধরে….
— “”এই ভাইয়া আমাকে এই এনাকন্ডার কাছে রেখে তুমি কোথায় যাচ্ছো?? তোমার মনে কি একটুও দয়া মায়া নাই?? এই ছিলো তোমার মনে?? আমার প্রতি…..””

— বাকি কথা বলতে না দিয়ে,,,””এই,,,তোর সিনেমার ডায়লগ বন্ধ কর।। তোকে কি আমি বলেছিলাম রকির গায়ে হাত তুলতে?? সব সময় নিজে আগ বাড়িয়ে বিপদে পড়ে তারপর এসে আশ্বিন ভাইয়া..আশ্বিন ভাইয়া করে।। এইবার আমি আর তোর সাথে নাই।।
তাছাড়া ভার্সিটির ফাংশনের আগে আমি সাহিলের সাথে কোন প্রকার ঝামেলায় জড়াতে চাই না।। সো,,,তোর বিপদ,,,তুই সামলা।।”

কথাটা বলেই আশ্বিন চলে গেলো।। এদিকে অধরা দাঁত কটমট করে আশ্বিনের যাওয়ার দিকেই তাকিয়ে আছে।।
— “”ইচ্ছা করছে এখনি একটা পচা ডিম নিয়ে তোর মাথায় ফাটিয়ে দেই।। অসভ্য ভাই!! আমিও দেখে নিবো।।”” মনে মনে ভাবছে অধরা।।

— সাহিল অধরার কাছে এসে,,,”” অধরা জানু!! রকির এই অবস্থা নাকি তুমি করেছো?? কথাটা কি সত্যি।।””

— চুপচাপ সাহিলের দিকে তাকিয়ে মনে মনে,,,,””হ্যা রে হ্যা।। আমিই মেরেছি ওই ছিঁলা মুরগীকে ,,,তোরও লাগবে নাকি কিছু?? কি ভেবেছিলি,,,আমি মেয়ে বলে তোদের ছেড়ে কথা বলবো?? Don’t underestimate Adhora,,,,তোর বাপ দাদার জন্মেও আমার মতো এমন বাঘিনী খুঁজে পাবি না।। হুহহ।।””

— “”কি হলো জানু?? কি এতো ভাবছো?? শুনো আমি তাদের বলে দিয়েছি তারা আর কখনোই তোমাকে বিরক্ত করবে না।। আফটার অল,,,,হবু ভাবি হয় তাদের।।””

— সাহিলের কথায় অধরা বিরক্ত প্রকাশ করে মনে মনে,,,,”””এহহহ,,,সখ কতো।। তোর বউ হতে আমার বয়েই গেছে।। তোকে তো শাকচুন্নিও পছন্দ করবে না।। আর সেখানে আমি তো এন্জেল অধরা 🥴”””

— সাহিল অধরার হাতের দিকে তাকিয়ে,,,”””এখানে কি হয়েছে?? দেখি দেখি…।।””
কথাটা বলেই অধরার দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই অর্ণব এসে সাহিলের হাত ধরে ফেলে।। তারপর অধরাকে নিজের কাছে টেনে…

— “”খবরদার।। আমার বোনকে স্পর্শ করা তো দূর তোর ছাঁয়াও যেন অধরার আশেপাশে না দেখি সাহিল।। কথাটা মনে রাখিস।। চল অধরা।।””
অর্ণব অধরাকে নিয়ে সেখান থেকে চলে আসে।। এদিকে সাহিল তাদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দেয়।।

অর্ণব অধরাকে নিয়ে ক্যান্টিনে বসে আছে। পাশে বসে আছে নিধি আর তিশা।। অধরার রাগে দুইগাল লাল হয়ে আছে,,,,অর্ণব জোর করে তাকে খাইয়ে দিচ্ছে।। আর অধরা খেতে খেতে আশ্বিনের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করে ফেলছে।।
— “”আজ এই দিন দেখার জন্য এতোগুলো বছর ধরে ওই পচা ডিম আশ্বিনকে..ভাইয়া ডেকে এসেছি?? আর সে কি করলো?? বিপদে আমাকে একা ফেলে চলে গেলো!! ইচ্ছা তো করছিলো ওই ধলা চিকাকে….””

— অর্ণব অধরাকে থামিয়ে দিয়ে,,,””অধরা।। এসব কি ধরনের ভাষা???? আচ্ছা যাই হোক,,,আশ্বিন তোকে সেখানে ফেলে রেখে আসেনি।। সে এসে আমাকে পাঠিয়েছে তোকে সাহিলের কাছ থেকে নিয়ে আসতে।। প্রিন্সিনাল স্যার আমাদেরকে ফাংশনের আগে কোন ঝামেলায় জড়াতে নিষেধ করেছে।। এখন যদি আশ্বিন কিছু একটা করতো তাহলে আমাদের এতদিনের চেষ্টা সব বিফলে যেতো।। অবশ্য তুই এসব বুঝবি না।। এখন ক্লাসে যাও।।””
অধরা কিছু না বলে নিধি আর তিশাকে নিয়ে ক্লাসে চলে আসে।। সে অবশ্য মনে মনে খুশিই হয়েছে অর্ণবের কথা শুনে।।

🍁🍁

কলেজ থেকে ফিরে অধরা ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া করে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে আশ্বিনের বাসায় চলে আসে।। আশ্বিনের মা তখন রান্নাঘরে কিছু একটা করছিলো।।
— “”মামুনি””,,,বলেই অধরা দৌড়ে গিয়ে আশ্বিনের মাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে।

— “”আরে আমার মেয়েটা চলে এসেছে।। দেখ তোর প্রিয় পিঠা বানিয়েছি,,,স্পশালি তোর জন্য।। খেয়ে বল কেমন হয়েছে??””

— “”আমি জানি ভালোই হবে।। আমার মামুনির রান্না বেস্ট।। জানো মামুনি আজ আমি ক্লাস টেস্টে অনেক ভালো মার্কস পেয়েছি??””

— “”তাই নাকি?? আমি জানতাম আমার মেয়েটা একটু চেষ্টা করলেই সব পারবে।। আমার লক্ষি মেয়ে।। এখন এই পিঠাগুলো নিয়ে আশ্বিনের রুমে যেয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করবি।। ঠিক আছে?””
অধরা মাথা নাড়িয়ে আশ্বিনের রুমে চলে আসে।।

বেশ কিছুক্ষণ ধরেই অধরা আশ্বিনের রুমে বসে বসে পিঠা খাচ্ছে আর আশ্বিনের জন্য অপেক্ষা করছে।।
— “”ভাইয়া আর কতক্ষণ ধরে শাওয়ার করবে তুমি?? মামুনি পিঠা পাঠিয়েছে,,,ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।। আমি কিন্তু পরে সবগুলো খেয়ে ফেলবো।।””
ওপাশ থেকে কোন উত্তর না আসায় অধরা বাকি পিঠাও খেতে শুরু করে।।

— “”এই রাক্ষস।। সবগুলো খেয়ে ফেললি?? আমার জন্য একটাও রাখলি না??””
পিঠার শেষ অংশটুকু মুখে পুরে পিছনে ফিরে তাকিয়ে হা হয়ে যায় অধরা।। সাদা টি শার্ট আর ব্লেক টাউজার পরে হাতে থাকা টাওয়াল নিয়ে মাথা মুছতে মুছতে এসে অধরার সামনে বসে পড়ে আশ্বিন।। ভেজা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কয়েকটা চুল কপালের উপর পরে আছে।। অধরা অবাক নয়নে আশ্বিনের এই স্নিগ্ধ সৌন্দর্য উপভোগ করছে।।

— অধরার সামনে তুড়ি বাজিয়ে,,,,”””ওই!! কোথায় হারিয়ে গেলি? আর এতগুলো পিঠা একা একাই খেয়ে ফেললি?? এইজন্যই তো বলি দিন দিন এমন হাতির মতো ফুলে যাচ্ছিস কিভাবে।। কোথায় তোর বয়সী মেয়েরা ডায়েট করে স্লিম থাকার জন্য।। আর তুই,,,মটু একটা??””

— আশ্বিনের কথায় পাত্তা না দিয়ে,,,,””ভাইয়া আমি মোটা না,,,যাস্ট একটু গলুমলু আরকি।। আর কথায় আছে না,,,স্বাস্থ্যই আসল সম্পত্তি।। এটা আমার সম্পত্তি।।””

—অধরার কথা শুনে আশ্বিন ফিক করে হেসে ওঠে,,,”””আরে মাথা মোটা।। তোর মতো এমন মোটা স্বাস্থ্য সম্পত্তি না।। যাই হোক,,,বই বের কর।।””
অধরা মুচকি হেসে পড়া শুরু করে।। আর মাঝে মাঝে আঁড় চোখে আশ্বিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।।
অধরা যখন থেকে বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই আশ্বিনের প্রতি তার এক বিশেষ অনুভূতি ছিলো।। সিনেমার শাহরুখ খানের মতোই তার জীবনের শাহরুখ খান হিসেবে সে আশ্বিনকেই ভেবে এসেছে।।

টানা দুই ঘন্টা পড়ার পর….

— “”ভাইয়া আজকের মতো ছুটি।। আমার অনেক ঘুম ধরেছে।””

— “”পড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন ছুটি নেই।। তুই পড়তে থাক।। আমি একটা কল ধরে আসছি।।””
আশ্বিন কথা বলতে বারান্দায় চলে যায়।। এদিকে অধরা ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে বইয়ের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে।।

— আশ্বিন ফোন রেখে রুমে প্রবেশ করতে করতে,,,””অধরা তোর জন্য গুড নিউজ আছে।। দাদু,,আব্বু আর ছোট আব্বু ফিরে আসছে।। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাবে।। তুই…””

কথাটা বলেই অধরার দিকে তাকিয়ে দেখে সে টেবিলে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছে।। ঘুমন্ত অবস্থায় একদম বাচ্চাদের মতো লাগছে অধরাকে।। আশ্বিন ধীরে ধীরে অধরার খুব কাছে এসে অধরার দিকে মুখ করে টেবিলে মাথা রেখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।। গলুমলু গালগুলো হালকা লাল হয়ে আছে,,,ডান গালের উপর টোল তার সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দেয়।। কাধ পর্যন্ত সিল্কি চুল হওয়ায় কয়েকটা চুল তার মুখের উপর এসে পড়ছে।। আশ্বিন আলতো হাতে সেই চুল তার কানের পিঠে গুজে দিলো।। তারপর ধীরে ধীরে অধরার খুব কাছে চলে এসে তার কপালে একটা গভীর চুমু এঁটে দেয়।।

আধরা এক লাফ দিয়ে ঘুম থেকে উঠে বসে।।
— “”হায় হায়।। পড়া বাদ দিয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।। আশ্বিন ভাইয়া দেখলে তো আমি শেষ।””
কথাটা বলে আশেপাশে তাকিয়ে দেখে এটা তো তার রুম।। এখানে কিভাবে আসলো সে?? সে তো আশ্বিন ভাইয়ার রুমে ছিলো।। তাহলে??

অধরা এক দৌড়ে হল রুমে এসে দেখে তার দাদি আর শ্রাবণ গল্প করছে।।
— “”দাদু মনি,,,,,তুমি কি জানো?? আমি এখানে কিভাবে এসেছি??””

— শ্রাবণ বোকার মতো অধরার দিকে তাকিয়ে,,,””তোর কি মনে হয় দাদু অন্ধ?? মানছি চোখে একটু কম দেখে তাই বলে তো অন্ধ না।। এখনি না দৌড়ে দৌড়ে হল রুমে আসলি।।””

— “”উফফ।। আমি এটা জিজ্ঞেস করিনি ভাইয়া।। আমি তো আশ্বিন ভাইয়ের কাছে পড়তে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।। উঠে দেখি আমি রুমে শুয়ে আছি।। কিভাবে?? আমি কি উড়ে উড়ে এসেছি??””

— দাদি অধরার মাথায় আলতো করে বারি দিয়ে,,,””আরে বোকা মেয়ে।। কিছুক্ষণ আগে আশ্বিনকে দেখলাম তোকে কোলে নিয়ে এসে রুমে শুইয়ে রেখে চলে গেলো।। আর তুইও কি সুন্দর করে আশ্বিনের গলা জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে ছিলি।।””

— শ্রাবণ দুষ্টুমি করে,,,,””ও হো হো।।। ভালোই তো অধরা।। ভালোভাবেই লেগেছো আশ্বিনের উপর।। কিন্তু আমার বন্ধুকে হাত করা এতো সোজা না।। তবে যাই বলিস,,,তোর মতো এমন আটার বস্তাকে আশ্বিন কোলে নিয়ে আসলো কিভাবে??””
কথাটা বলে দাদি আর শ্রাবণ হেসে যাচ্ছে।।

অধরার অবশ্য সেদিকে খেয়াল নেই।। সে এক মনে আশ্বিনের কথাই ভেবে যাচ্ছে।। মুহূর্তেই গাল দুটো লাল হয়ে গিয়েছে তার।। আশ্বিন তাকে কোলে করে নিয়ে এসেছে মনে হতেই লজ্জা মিশ্রিত একটা হাসি দেয় সে।।

—চলবে❤

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here