প্রেম_ফাল্গুন #পর্ব_১৫

#প্রেম_ফাল্গুন
#পর্ব_১৫
#Nishat_Jahan_Raat (ছদ্মনাম)

“ধরে। সব হাজবেন্ডরাই তার ওয়াইফকে এভাবে ঝাপটে ধরে৷ এভাবে বুকে নিয়েই ঘুমায়। অভেস্য করে নিতে হবে তোমার।

“এভাবে ঝাপটে ধরলে আমি সত্যিই দম আটকে মরে যাবো। এটুকু মেয়ে আমি। আপনার শরীরের ভার নিতে পারি?”

ববি দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,,

“ওহ্ হো, আমি তো ভুলেই গেছিলাম। তুমি আমার “বালিকা বধূ।” বাল্য বিবাহ করেছি আমি। মাএ ১৭ বছরের মেয়েকে।”

লিলি মৌণ হেসে বলল,,

“দেখলেন তো, কতোটা ঠকেছেন আমাকে বিয়ে করে? আয়রা আপুকে বিয়ে করলে তো খুব খুব খুব জিতে যেতেন আপনি!”

ববি ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে বলল,,,

“আয়রার নামটা এখানে আসল কেনো? কাম অন, লেট মি আনসার। আয়রার নামটা এখানে আসল কেনো?”

লিলি কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল,,

“দুভাগ্যবশত, আমার সাথে বিয়েটা না হলে তো আয়রা আপুর সাথেই আপনার বিয়েটা হতো। তাই বললাম।”

“এক চামচ বেশি বুঝো তুমি। অযথা তোমার সাথে রুড বিহেভ করি না আমি। রেড্ডিকিউলেস।”

“হুম তাই তো। আমি তো রেড্ডিকিউলেস ই। ছাড়ুন বলছি। আমাকে জড়িয়ে ধরতে হবে না আপনার।”

ববি কিছুটা শান্ত হয়ে লিলিকে আরো টাইট করে ঝাপটে ধরে বলল,,

“ছাড়ার জন্য ধরি নি। বুকে আগলে রাখার জন্যই ধরেছি৷ নেক্সট টাইম আয়রা সম্পর্কে কোনো কথা বলবে না। ওকে?”

লিলি হ্যাঁ সূচক মাথা নাঁড়ালো। ববি ছোট আওয়াজে বলল,,

“আমার রেড্ডিকিউলেস লিলিকেই পছন্দ।”

লিলি কৌতুহলী দৃষ্টিতে ববির দিকে তাকিয়ে বলল,,

“আমাকে আপনার পছন্দ ববি?”

ববি থতমত খেয়ে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,,

“নো মোর ওয়ার্ডস লিলি। স্লিপ কোয়াইটলি।”

লিলি মুখটা কালো করে বলল,,

“কেউ আমার গাঁয়ে এভাবে লেগে থাকলে আমার ঘুম হয় না। অস্বস্তি লাগে।”

“ওকে ফাইন। আমি তোমাকে ছেড়ে দিলাম।বাট, আমাকে তোমার জড়িয়ে ধরতে হবে।”

লিলি খানিক লজ্জা পেয়ে ছোট আওয়াজে বলল,,

“ধ্যাত৷ আমি পারব না।”

ববি প্রচন্ড রেগে লিলিকে ছেড়ে অন্য পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমানোর পূর্বে ববি চোয়াল শক্ত করে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,,

“আনরোমান্টিক একটা মেয়ে। এই মেয়ের সাথে চুটিয়ে প্রেম ও করা যাবে না। রোমান্সের “র” ও হয়তো জানে না৷ সব শেখাতে হবে এই মেয়েকে সব। আদারওয়াইজ, বিবাহিত জীবনটা আমার তেজপাতা হয়ে যাবে। একদম নিরামিষ হয়ে যাবে।”

ঐ দিকে লিলি ববির থেকে ছাড়া পেয়ে স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে নিশ্চিন্তে চোখ জোড়া বুজে নিলো। সেই ঘুম ভাঙ্গল লিলির সন্ধ্যে সাতাটায়। পিটপিট চোখে লিলি পুরো রুমটায় চোখ বুলাতেই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল সন্ধ্যে সাতটা বাজছে। চোখ জোড়া প্রকান্ড করে লিলি হুড়মুড়িয়ে শোয়া থেকে উঠে পাশ ফিরে তাকাতেই ববির জায়গাটা ফাঁকা দেখল। শাড়িটা ঠিক করে লিলি মাথায় হাত দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,,

“ইসসস। কতোটা লেইট হয়ে গেলো ঘুম থেকে উঠতে। উনি কোথায় চলে গেলেন কি জানি।”

অমনি ওয়াশরুমের দরজা ঠেলে ববি টাওয়াল হাতে নিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বেশ ব্যতিব্যস্ত হয়ে রুমে প্রবেশ করল। ববিকে দেখা মাএই লিলি স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে বলল,,

“থ্যাংকস গড। উনি কোথাও যান নি।”

তন্মধ্যেই ববির চোখ পড়ল লিলির দিকে। তোয়ালেটা লিলির গাঁয়ে ছুড়ে মেরে ববি এ্যাশ কালার একটা টি শার্ট গাঁয়ে জড়িয়ে ব্যস্ত স্বরে লিলিকে বলল,,

“ফ্রেশ হয়ে নাও৷ মামানী একটু পরে হালকা নাশতা দিয়ে যাবেন। খেয়ে নিও।”

লিলি প্রশ্নবিদ্ধ চোখে ববির দিকে তাকিয়ে বলল,,

“কোথায় যাচ্ছেন আপনি?”

ববি ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুলটা সেট করছে আর বেশ ভাব নিয়ে বলছে,,

“আপুর শ্বশুড় বাড়িতে। ডিনারের আগেই ব্যাক করব।”

লিলি বেশ উত্তেজিত হয়ে বলল,,

“ঐ আয়রা আপুর বাড়িতে?”

ববি পিছু ফিরে লিলির দিকে তাকিয়ে শুকনো স্বরে বলল,,

“হুম। আয়রার বাড়িতে!”

লিলি মাথাটা নিচু করে তোয়ালেটা হাতে নিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে ওয়াশরুমে প্রবেশ করার পূর্বেই ববি পেছন থেকে লিলির হাতটা টেনে ধরে বলল,,

“আর ইউ এংরি উইথ মি?”

লিলি পিছু ফিরে ববির দিকে তাকিয়ে ক্ষীন হেসে বলল,,

“অভেয়েসলি নট। আমি কেনো রাগ করব? আয়রা আপু আপনার রিলেটিভস হয়। উনার বাড়িতে যাওয়াটা একদমই নরমাল।”

ববি লিলির হাতটা ছেড়ে ব্ল্যাক কালার ওয়াচটা হাতে পড়ছে আর গম্ভীর স্বরে বলছে,,

“রুম থেকে কোথাও বের হবে না। আমি আসার পর, আমার সাথে বের হবে।”

“আমার একলা একা রুমে ভালো লাগছে না ববি৷ কেউ আমার সাথে কথা বলতে ও আসছে না। দম বন্ধ লাগছে।”

“কয়েকটা দিন এভাবেই ম্যানেজ করে নাও। আই হোপ, সবার রাগ পড়লে সবাই তোমার সাথে মিশবে, কথা বলবে, তোমাকে মেনে ও নিবে।”

তন্মধ্যেই রুমের দরজা ঠেলে জিনিয়া আহমেদ রুমে প্রবেশ করলেন। জিনিয়া আহমেদকে দেখা মাএই ববি শুড়শুড়িয়ে উনার মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। লিলি ওয়াশরুমের দরজা থেকে সরে এসে ববির পেছনটায় দাঁড়ালো। জিনিয়া আহমেদ প্রশ্নবিদ্ধ চোখে ববির দিকে তাকিয়ে বললেন,,

“কোথাও যাচ্ছ ববি?

“হুম মামানী। আপুর শ্বশুড় বাড়িতে।”

“অদ্ভুত। তুমি নতুন বউ ঘরে রেখে হেমার শ্বশুড় বাড়ি যাচ্ছ?”

ববি মাথা নিচু করে পেছনের চুল গুলো টেনে বলল,,

“কিছুক্ষনের ই তো ব্যাপার মামানী। ডিনারের আগেই ব্যাক করব।”

“আজ তোমাদের ফুলসজ্জা ববি। কিছুতেই আজ বাড়ি থেকে বের হওয়া যাবে না। কাল সকালের দিকে না হয় হেমার শ্বশুড় বাড়ি যেও। হেমাকে ঐ বাড়ি দিয়ে এসো।”

ববি আমতা আমতা করে বলল,,

“মামানী। একচুয়েলি আজ আমাদের ফুলসজ্জাটা হবে না। যতোদিন না আমার পরিবার লিলিকে মেনে নিচ্ছে ততোদিন তো একদমই না।”

“ঠিক আছে। বাট দুটো ভালোবাসার মানুষ কতো ঝড়, ঝঞ্ঝা পাড় হয়ে আজ এক হলে সেই দিনটা একটু স্মরনীয় করে রাখতে চাও না?”

ববি কিছু বলার পূর্বেই লিলি ছোট আওয়াজে জিনিয়া আহমেদকে উদ্দেশ্য করে বলল,,

“থাক না মামানী। উনি যেহেতু চাইছেন না।”

ববি বেশ রাগান্বিত হয়ে ঝাঁঝালো স্বরে লিলিকে বলল,,

“বড়দের মাঝখানে এসে কথা বললে কেনো? এই সাহস তোমাকে কে দিয়েছে? যাও বলছি, এখনি ওয়াশরুমে যাও। নেক্সট টাইম যেনো এসব বেয়াদবি চোখে না পড়ে। ওয়ার্ণ করলাম।”

চোখের জল ছেড়ে লিলি দৌঁড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। জিনিয়া আহমেদ বিরক্তি নিয়ে ববির দিকে তাকিয়ে বললেন,,

“মেয়েটাকে এভাবে ধমকালে কেনো? ভালো করে বুঝালেই তো মেয়েটা বুঝত। আমার সামনে এভাবে মেয়েটাকে ইনসাল্ট করাটা তোমার ঠিক হয় নি।”

ববি নিজেকে কিছুটা শান্ত করে বলল,,

“ভদ্রভাবে বুঝিয়ে এই মেয়েকে ঠিক করা যাবে না মামানী। এভাবে ধমকেই একে ঠিক করতে। মাথায় কোনো ঘিলুই নেই। চূড়ান্ত গম্ভাট এই মেয়ে।”

ববি নিজেকে কিছুটা শান্ত করে বলল,,

“বাদ দাও ওর কথা। আমি বলতে চাইছি, আজ ফুলসজ্জাটা হবে না। আগামী দু বছরের আগে তো একদমই না। আপুকে নিয়ে আজই আমি জিজুর বাড়ি যাচ্ছি। ঐদিকটা সামলে আসছি। একসাথে এতো প্যারা নিতে পারছিনা আসলে। একটা একটা করে ছাটাই করতে চাই।”

জিনিয়া আহমেদ দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললেন,,

“তোমার ইচ্ছে ববি। তোমার যা ভালো মনে হয়!”

ববি কিছুটা সংকোচবোধ করে জিনিয়া আহমেদকে বলল,,

“মামানী। তোমার কোনো সুতি বা জামদানি কাপড় আছে?”

“কেনো ববি? লিলির জন্য?”

“আসলে লিলি জর্জেট শাড়ি সামলাতে পারছে না। তাই বলছিলাম।”

“বাহ্ বউয়ের খুব খেয়াল রাখছ দেখছি!”

ববি ভীষণ লজ্জা পেয়ে জিনিয়া আহমেদকে পাশ কাটিয়ে রুম থেকে প্রস্থান নিচ্ছে আর পেছন থেকে জিনিয়া আহমেদকে উদ্দেশ্য করে বলছে,,

“লিলিকে একটু দেখে রেখো মামানী। রুম থেকে যেনো কোনো মতেই বের না হয়।”

“ঠিক আছে ববি। তুমি যাও। আমি আছি।”

হেমার রুমে প্রবেশ করতেই ববি মাথা নিচু করে বিছানায় বসে থাকা হেমাকে উদ্দেশ্য করে বলল,,

“আপু রেডি হয়ে নাও৷ তোমার শ্বশুড় বাড়ি যাবো।”

হেমা চোখ তুলে ববির দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,,

“কোন মুখে তুই আমাকে ঐ বাড়ি নিয়ে যাবি ববি? তুই তো হাতে ধরে আমার সাজানো সংসারটা শেষ করে দিয়েছিস।”

ববি উদ্বিগ্ন হয়ে হেমার পাশে বসে মাথা নিচু করে বলল,,

“একবার ট্রাই তো করতে দাও আপু। দেখি না কি হয়!”

“আমি এই মুখ নিয়ে ঐ বাড়ি যেতে পারব না ববি। যেতে হলে তুই যা। যদি কোনো মতে ওদের মানাতে পারিস, আমাকে খবর দিস। আমি চলে যাবো!”

ববি বসা থেকে উঠে হেমার দিকে তাকিয়ে বলল,,

“ওকে, আমি একাই যাচ্ছি। তোমাকে যেতে হবে না।”

হেমা ফ্যাস ফ্যাস করে কান্না জুড়ে দিলো। ববি হম্বিতস্বি হয়ে বাড়ি থেকে প্রস্থান নিয়ে রিকশা করে পাশের পাড়ায় হেমার শ্বশুড় বাড়ির মেইন গেইটের সামনে এসে দাঁড়ালো। দীর্ঘ একটা শ্বাস ছেড়ে ববি এক ছুটে দুতলায় চলে এলো। পেরেশান হয়ে কলিং বেল চাঁপতেই আয়রা সদর দরজাটা খুলে দিলো। ববিকে দেখা মাএই আয়রা আচমকা বুক ভাসিয়ে কেঁদে ববিকে ঝাপটে ধরে বলল,,

“আমি জানতাম ববি, তুমি আসবে। তুমি ঠিক আসবে!”

ববি এক ঝটকায় আয়রাকে নিজের থেকে দূরে ঠেলে বেশ ক্ষীপ্ত স্বরে বলল,,

“এসব কোন ধরনের নোংরামো আয়রা? আপনি আমাকে এভাবে ঝাপটে ধরলেন কেনো? আপনার থেকে অন্তত এই অসভ্যতামোটা এক্সপেক্ট করি নি আমি।”

আয়রা ঢুকড়ে কেঁদে বেশ রূঢ় স্বরে বলল,,

“আমার ছোঁয়া তোমার অসভ্যতামো মনে হয়, নোংরামো মনে হয় তাই না ববি? অথচ ঐ গ্রাম্য মেয়েটার ছোঁয়া তোমার খুব ভালো লাগে, পবিএ লাগে? লেট মি আনসার ববি। কেনো তুমি আমার ভালোবাসাকে এভাবে পায়ে ঠেলে দিলে? কেনো তুমি ঐ গ্রাম্য মেয়েটাকে বিয়ে করলে? দীর্ঘ দুই বছর ধরে আমি তোমাকে আড়াল থেকে ভালোবেসে গেছি। কখনো মুখ ফুটে ভালোবাসার কথাটা বলতে পারি নি। তোমার মুখোমুখি হলেই আমি সব ভুলে যেতাম। নিজের ফিলিংস গুলো লুকিয়ে নিতাম। শেষে যখন ভাইয়া আমার মনের কথাটা বুঝে তোমার সাথেই আমার বিয়েটা ঠিক করল তখনই তুমি ঐ ননসেন্স মেয়েটাকে বিয়ে করে ঘরে তুললে? আমার ফিলিংসের কোনো দামই দিলে না? আমার ক্ষেএেই কেনো তোমাকে এতো নিষ্ঠুর হলে ববি? বলো কেনো?”

“জাস্ট শাট আপ আয়রা। জাস্ট শাট আপ৷ লিলির সম্পর্কে আর একটা বাজে মন্তব্য আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই না। আমি এসেছিলাম তোমাকে বুঝাতে, আমাকে ভুলে যেতে, সব ভুলে নতুন করে সব শুরু করতে। আমি অনেক আগেই আঁচ করতে পেরেছিলাম তুমি আমাকে ভালোবাসো। তোমার চোখ, মুখ দেখলেই স্পষ্ট বুঝা যেতো। কিন্তু আমি তোমাকে ইচ্ছে করেই কখনো প্রশয় দেই নি। কেনো জানো? কারণ তোমার প্রতি আমার কোনো ফিলিংস ই ছিলো না। মনে থেকে তোমার প্রতি কোনো ফিলিংস ই আসত না। লিলিকে প্রথম দেখায় আমি খুব ভালোবেসে ফেলেছিলাম। মন থেকে আপনা আপনি পজেটিভ ফিলিংস চলে এসেছিলো। সারা ক্ষণ মনে হতো লিলিকে ছাড়া আমার একটা দিন ও চলবে না। লিলিকেই আমার জীবন সঙ্গিনী হিসবে চাই। নিজের পরিবারের সাথে যুদ্ধ করে হোক বা পুরো পৃথিবীর সাথে যুদ্ধ করে হোক যে কোনো মূল্যেই লিলিকে আমার চাই ই চাই। আমার এই অদম্য চাওয়াকে আমি বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছি আয়রা। লিলিকে আমি সারা জীবনের জন্য পেয়ে গেছি। আমার ওয়াইফ হিসেবে লিলিই বেস্ট। পুরো পৃথিবী আমার ওয়াইফকে যতোই হেয় করুক, “আমি জানি, আমি কি পেয়েছি।”

আয়রা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ চোখ থেকে তার টলটলিয়ে পানি পড়ছে। ববি অল্প সময় দম নিয়ে শান্ত স্বরে আয়রাকে বলল,,

“দেখো আয়রা, তোমার সাথে যা হয়েছে খুব খারাপ হয়েছে। বিয়েতে মত দিয়ে ও আমি তোমাকে বিয়েটা করি নি। এর জন্য আমি ভীষণ দুঃখিত, লজ্জিত, অনুতপ্ত। ভুলটা যেহেতু হয়েই গেছে হাজার চাইলে ও আর শুধরানো যাবে না। আবার এই ভুলটাকে ধরেই বর্তমানটাকে নষ্ট করা যাবে না। তুমি এনাফ গ্রেজুয়েট, সুন্দুরী, স্মার্ট, অনেক ভালো গুন ও আছে তোমার মধ্যে। সর্বোপরি তুমি খুব ভালো মনের একটা মেয়ে। আই হোপ, তুমি চাইলে আমার চেয়ে ও বেস্ট কাউকে পাবে। ঠিক তোমার মনমতো। যে তোমাকে খুব ভালোবাসবে, খেয়াল রাখবে, যত্ন নিবে, তোমাকে বুঝবে, আজীবন ছায়া হয়ে তোমার পাশে থাকবে। আমাকে বিয়ে করলে হয়তো তুমি এসবের কিছুই পেতে না। কারণ, আমার মন তোমার মধ্যে থাকত না। মনহীন একটা মানুষের সাথে সংসার করা যায় না৷ সংসার করার মেইন প্রায়োরিটিই হলো “ভালোবাসা।” সেই ভালোবাসাটাই তুমি আমার থেকে কখনো পেতে না৷”

আয়রা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ববির দিকে তাকিয়ে চোখের জল ছেড়ে বলল,,

“আমার প্রতি কখনো তোমার কোনো ফিলিংসই কাজ করে নি ববি? আমার মাঝে তুমি কখনো ভালোবাসা খুঁজে পাও নি?”

“না আয়রা পাই নি। আমি শুধু লিলিকে ভালোবেসেছি, শুধু লিলিকে!”

আয়রা মুখ চেঁপে কেঁদে এক ছুটে নিজের রুমের দরজা আটকে দিলো। ববি মাথায় হাত দিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তন্মধ্যেই আতিক কোথা থেকে ধেঁয়ে এসে চোয়াল শক্ত করে ববির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল,,

“কেনো এলে তুমি এখানে আবার? আয়রাকে আবারো কাঁদাতে?”

ববি মাথা নিচু করে ছোট আওয়াজে বলল,,

“আ’ম স্যরি জিজু। আয়রাকে হার্ট করার কোনো উদ্দেশ্যই ছিলো না আমার৷ আমি তো আয়রাকে বুঝাতে এসেছিলাম। যা হয়েছে ভুলে যেতে৷ নতুন করে সব শুরু করতে।”

“তুমি না বললে ও আয়রা সব নতুন করে শুরু করবে ওকে? একদম আমাদের জ্ঞান দিতে আসবে না। তোমার মতো বেঈমানের মুখে এতো জ্ঞানী কথা মানায় না। বুঝতে পেরেছ আমি কি বলতে চাইছি?”

ববি ম্লান হেসে বলল,,

“যদি কখনো সামর্থ্য হয়, কথা দিচ্ছি আপনার সমস্ত লেনা দেনা আমি মিটিয়ে দিবো। বেঈমানের তকমা নিয়ে আমি আর কখনো আপনার মুখোমুখি দাঁড়াব না। আর একটা কথা, “উপকার করার পর কাউকে খোঁটা দিতে নেই। তাহলে সেই উপকারের কোনো গুন ই থাকে না!”

চোখে জল নিয়ে ববি সদর দরজা থেকে বের হতেই আতিক পেছন থেকে ববিকে ডেকে বলল,,

“হেমাকে পাঠিয়ে দিও। তোমার মুখটা আমি নেক্সট টাইম এই বাড়িতে দেখতে চাই না।”

“আপুর জন্যই এই বাড়িতে আসা। আয়রাকে আমি পরে ও ফোন করে ক্ষমা চেয়ে নিতে পারতাম৷ যাই হোক, কাল সকালেই আপু এই বাড়িতে ফিরে আসবে।”

“তুমি হয়েছ হেমার পুরো উল্টো। ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে ভাই-বোন!”

“সংসারটা আপনি আপুকে নিয়ে করবেন। আমাকে নিয়ে নয়। সো আপু ভালো হলেই সব ভালো।”

রাগে গজগজ করে ববি বাড়ি থেকে প্রস্থান নিলো। আধ ঘন্টার মধ্যে ববি বাড়ি ফিরে হেমার রুমে প্রবেশ করে ব্যালকনীতে দাঁড়িয়ে থাকা হেমাকে উদ্দেশ্য করে নিচু আওয়াজে বলল,,

“আপু। জিজু তোমাকে কালই ঐ বাড়ি ফিরে যেতে বলেছে।”

হেমা পিছু না ফিরেই ববিকে উদ্দেশ্য করে মলিন স্বরে বলল,,

“জানি। আতিক একটু আগেই আমাকে কল জানিয়েছে!”

“নিশ্চয়ই এটা ও জানিয়েছে, তোমার ভাই বেঈমান?”

“বলবে বাই না কেনো? তুই তো বেঈমানের মতোই কাজ করেছিস। আতিকের করা এতোদিনের সব উপকার এক নিমিষেই ভুলে গেলি। বিয়ে করে আনলি একটা গেঁয়ো মেয়েকে। যার সাথে তোর একদমই যায় না।”

“জিজু বেঈমান বলাতে একটু ও কষ্ট হয় নি আমার, বিলিভ মি৷ যখন তুমি বললে, মনে হলো আকাশটা আমার উপর ভেঙ্গে পড়েছে। তুমি ও আমাকে বুঝলে না আপু। তুমি ও না।”

চোখের জল আড়াল করে ববি সাহেরা খাতুনের রুমের দরজার কাছে দাঁড়ালো। ইতস্ততবোধ করে রুমের দরজায় দুটো টোকা দিতেই সাহেরা খাতুন রুমের দরজাটা খুলে ববির মুখোমুখি দাঁড়ালেন৷ ববি অশ্রুসিক্ত চোখে সাহেরা খাতুনের দিকে তাকিয়ে বলল,,

“আই মিস ইউ আম্মু।”

সাহেরা খাতুন চোখের জল ছেড়ে মাথা নিচু করে বললেন,,

“হেমার শ্বশুড় বাড়ি গিয়েছিলি?”

“হুম!”

“আতিক নিশ্চয়ই অপমান করতে ছাড়ে নি?”

ববি গলা জড়ানো স্বরে বলল,,

“একটু, আধটু।”

“আড়াল করছিস আমার কাছে? মায়ের কাছে আড়াল করছিস? অবশ্য আতিক তোকে অপমান করেছে খুব ভালো করেছে। এটাই তোর প্রাপ্য।”

ঠাস করে রুমের দরজাটা আটকে দিলেন সাহেরা খাতুন। চোখের কোটর বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়তেই ববি জলটা তাড়াহুড়ো করে মুছে নিলো। নিজেকে কিছুটা শান্ত করে ববি ডাইনিং টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে ঢকঢক করে পুরো গ্লাস পানিটা শেষ করল। কয়েকটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে ববি নিজের রুমের দরজার কাছে দাঁড়ালো। দরজায় কয়েকটা টোকা দিতেই লিলি তাড়াহুড়ো করে রুমের দরজাটা খুলে দিলো। লিলির দিকে না তাকিয়েই ববি রুমে ঢুকল। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখল ঘড়িতে রাত ৯ঃ৩০ বাজছে। ক্লান্ত হয়ে ববি গাঁয়ের টি শার্ট টা খুলে সোজা ব্যালকনীতে পাতা সোফাগুলোতে বসল। সোফায় চোখ বুজে মাথা ঠেকাতেই লিলি চাঁপা স্বরে ববির পাশে দাঁড়িয়ে বলল,,,

“কি হয়েছে ববি? আপনাকে এতো ডিস্টার্বড লাগছে কেনো? কিছু হয়েছে?”

ববি এবার চোখ খুলে লিলির দিকে তাকালো। ব্যালকনীর গ্রিল বেয়ে ঠিকরে পড়া গোল থালার মতো চাঁদের শুভ্রতা জড়ানো আলোটা লিলির সুসজ্জিত মুখমন্ডলে উপছে পড়ছে। হীরের মতো ঝিকঝিক করছে লিলির সর্বাঙ্গ। চোখের মণি দুটো তাঁরার মতো জ্বল জ্বল করছে। লিলিকে অপরূপ এক সৌন্দর্যের আঁধার মনে হচ্ছে। নিমিষের মধ্যেই ববির সমস্ত ক্লান্তি, বিষন্নতা, দুঃশ্চিন্তা উধাও হয়ে চোখ দুটো মুগ্ধতায় ভরে উঠল৷ লিলি আজ খুব সেজেছে। নীল রঙ্গের জামদানী কাপড় পড়েছে। মোটা করে চোখে কাজল পড়েছে, হরিনীর মতো টানা টানা চোখ দুটো ববির দৃষ্টি হরণ করছে। গোলাপী ওষ্ঠদ্বয়ে লাল লিপস্টিক ববিকে মাতাল করে তুলছে। নাকে পাথরের বড় নাকফুল, গলায় স্বর্ণের প্রেমপাসা চেইন, হাতে গোল্ডেন দুটো চিকন চুড়ি, কানে স্বর্ণের সুই সুতো দুল। সব মিলিয়ে আজ লিলিকে ববির “বালিকা বধূ” লাগছে।

ববির এহেন নেশাক্ত চাহনীতে লিলির দৃষ্টি সংকুচিত হয়ে এলো। ববির থেকে চোখ ফিরিয়ে লিলি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে পড়ল। ববি ঘোর কাটিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে ছোট আওয়াজে বলল,,

“কে সাজিয়েছে এভাবে? মামানী?”

“হুমম। আমি সাজতে চাইছিলাম না। মামানী জোর করে সাজিয়ে দিলেন।”

ববি স্থির দৃষ্টিতে লিলিকে তার দিকে আহ্বান করে বলল,,

“এদিকে এসো।”

লিলি চোখ তুলে ববির দিকে তাকিয়ে বলল,,

“আগে বলুন আপনার কি হয়েছে? মন খারাপ কেনো?”

ববি হেচকা টান দিয়ে লিলিকে তার অস্থিমজ্জায় বসিয়ে লিলির কাঁপা কাঁপা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,,

“কিছু হয় নি। আমার সমস্ত মন খারাপ তোমার একটু চাহনীতেই কোথাও একটা বিলীণ হয়ে গেছে।”

লিলি ফ্যাল ফ্যাল চোখে ববির দিকে তাকিয়ে বলল,,

“তাই? আমার চাহনীতে কি এমন বিশেষত্ব আছে ববি?”

“তুমি বুঝবে না!”

লিলি নিশ্চুপ হয়ে গেলো। ববি আচমকা লিলির কপালে দীর্ঘ একটা চুমো খেয়ে বলল,,

“স্যরি পুতুল বউ!”

লিলি বিস্মিত চোখে ববির দিকে তাকিয়ে বলল,,

“স্যরি কেনো?”

“ঐ সময় তোমার সাথে খুব রাগারাগি করেছিলাম। তাই!”

লিলি মুখটা কালো করে বলল,,

“আমি ভুল করেছি, আপনি শাসন করেছেন। এতে স্যরি বলার কি আছে?”

“আছে৷ অভেয়েসলি আছে৷ আই নো, তুমি অনেক হার্ট হয়েছ!”

“উহু৷ মোটে ও না!”

“তাহলে কাঁদছিলে কেনো?”

লিলি থতমত খেয়ে বলল,,

“কোকোথায় কাঁদছিলাম?”

ববি বাঁকা হেসে বলল,,

“ওকে ফাইন। তখন যেহেতু কাঁদো নি, এখন একটু কাঁদাই?”

লিলি চোখে, মুখে ভয় নিয়ে বলল,,,

“কেকেকনো? এএএখন আমি কি করেছি?”

“এই যে, আমার মনকে ডিস্টার্ব করলে!”

“কোথায় আমি কি ডিস্টার্ব করলাম?”

ববি হঠাৎ লিলির ডান হাতটা তার বুকের বাঁ পাশটায় চেঁপে ধরে বলল,,

“কি? কম্পিত হচ্ছে?

“হুম হচ্ছে তো। কিন্তু কেনো ববি? আপনার কি ভয় লাগছে? আকস্মিক ভয় পেলে আমার বুকটা ও এভাবে ধড়ফড় ধড়ফড় করে কম্পিত হয়। বিশেষ করে আপনি যখন আমাকে বকেন, উঁচু গলায় কথা বলেন তখন।”

“ভয় পেলেই হার্টবিট কম্পিত হয় না লিলি। অন্য আরেকটা কারণে ও হার্টবিট কম্পিত হয়। একদিন তুমি ঠিক বুঝবে সেই কারণটা।”

লিলি খানিক হাঁসফাঁস করে বলল,,

“ছাড়ুন এবার। আমি রুমে যাবো।”

“কেনো? এখানে কি প্রবলেম?”

“জানি না। তবে কেনো যেনো শরীরটা শিউরে উঠছে। ভালো লাগছে না এখানে।”

ববি বাঁকা হেসে বলল,,

“শিউরে উঠার কারণটা আমি জানি!”

লিলি কৌতুহলী হয়ে বলল,,

“কি কারণ? প্লিজ বলুন না।”

ববি সোফায় মাথা এলিয়ে মন খারাপ করে বলল,,

“এখন বলা যাবে না।”

লিলির কৌতুহল যেনো দ্বিগুন বেড়ে গেলো৷ লিলি অস্থির হয়ে ববির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,,

“এখনি বলুন না প্লিজ।”

ববি আচমকা সোফা থেকে মাথা উঠিয়ে লিলির ঠোঁটে দীর্ঘ একটা চুমো খেয়ে বলল,,

“এটাই হলো কারণ।”

লিলি বেকুব হয়ে মুখটা হা করে ববির দিকে তাকিয়ে আছে। ববি বাঁকা হেসে পালাক্রমে লিলির কপালে, দু গালে, চোখে, থুতনীতে চুমো খেয়ে বলল,,,

“আরো জানতে চাও কারণ?”

লিলি মুখে হাত দিয়ে হুড়মুড়িয়ে ববির কোল থেকে উঠে এক দৌঁড়ে রুমের ভেতর ঢুকে কাঁথা মুড়ি দিয়ে সোজা বিছানায় শুয়ে পড়ল। ববি ব্যালকনী থেকে সবটা দেখছে আর হু হা করে হেসে বলল,,

“সি ইজ টোটালি ক্রেজি!”

লিলি কাঁথার নিচে শুয়ে অবিরত কাঁপছে আর বিড়বিড় করে বলছে,,

“ছি ছি। এসবের জন্য আমার অমন অদ্ভুত শিহরণ হচ্ছিলো? কি ভাবছেন উনি আমাকে গড নৌজ! ভীষষষণ লজ্জা করছে আমার। এখন আমি উনার মুখোমুখি দাঁড়াবো কি করে?”

তন্মধ্যেই ববি ব্যালকনী থেকে উঠে এসে বাঁকা হেসে লিলির গাঁয়ের উপর থেকে কাঁথাটা সরিয়ে লজ্জায় মুখ লুকিয়ে রাখা লিলির দিকে ঝুঁকে বলল,,

“মামানীকে বলি ফুলসজ্জার খাটটা সাজাতে?”

লিলি মুখ থেকে হাত সরিয়ে চোখ জোড়া প্রকান্ড করে ববির দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত হয়ে বলল,,

“না না। একদমই না। কোনো ফুলসজ্জা হবে না আমাদের। আপনি একদম আমার ধারে কাছে ঘেঁষবেন না। চাচী এবং মামানী দুজনই আমাকে বারণ করে দিয়েছেন।”

পরক্ষনেই লিলি মুখ চেঁপে ধরে বিড়বিড় করে বলল,,

“ইসসস মুখ ফসকে কিসব বলে ফেললাম আমি। এখন যদি উনি জিগ্যেস করেন মামানী এবং চাচী আমাকে কি বলেছেন? তখন কি জবাব দিবো আমি?”

#চলবে…?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here