প্রেম_ফাল্গুন #পর্ব_৩৮

#প্রেম_ফাল্গুন
#পর্ব_৩৮
#নিশাত_জাহান_নিশি

“স্যরি লিলি।”

হতভম্ব হয়ে লিলি হেমার দিকে চেয়ে আছে। বুঝে উঠতে পারছে না আসলে হেমা হঠাৎ করে কেনো স্যরি চাইতে এলো। অদ্ভুত কৌতুহলী দৃষ্টিতে হেমাকে পর্যবেক্ষন করছে লিলি। মৌণ হেসে ল্যাপটপটা উচ্চ শব্দে বন্ধ করে ববি বসা থেকে উঠে হেমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিদ্রুপের স্বরে বলল,,

“স্যরি? কিন্তু কেনো?”

হেমা মাথা নিচু করে অপরাধী স্বরে বলল,,

“লিলির সাথে আমি অনেক অন্যায় করেছি তাই!”

অট্ট হেসে ববি হেয়ালী স্বরে হেমাকে বলল,,

“সিরিয়াসলি আপু? তুমি এতো শতো অন্যায় করার পর ও আমার ওয়াইফের কাছে স্যরি চাইতে এসেছ? মানে তোমার বিবেকে বিন্দুমাএ বাঁধে নি?”

হেমা করুন দৃষ্টিতে ববির দিকে চেয়ে দেখল। তার চোখে অপরাধ বোধের কালিমা স্পষ্টত। ববি সে দিকে কোনো রূপ ভ্রুক্ষেপ না করে অন্য পাশ ফিরে ঝাঁঝালো স্বরে হেমাকে উদ্দেশ্য করে বলল,,

“আপু তুমি যাও প্লিজ। তোমার হুট করে এই অপরাধ বোধের কারণ আমার ভালো করে বুঝা হয়ে গেছে। দয়া করে নিজেকে আর নিচে নামিও না প্লিজ। তোমার স্বভাব যেমন তুমি ঠিক তেমনই থাকো। ভালো সাজার কোনো রূপ চেষ্টা করো না। আমার ওয়াইফ যেহেতু বিগত ছয় বছর ধরে তোমাকে সহ্য করে আসছে, আশা করি আগামী বছর গুলোতে ও একই ভাবে তোমাকে সহ্য করে যাবে। উপর ওয়ালা আমার ওয়াইফের সহ্য ক্ষমতা দ্বিগুন বাড়িয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। কারণ, আল্লাহ্ তো জানত তোমার মতো একজন কুচুকে ননাশ অভেয়েসলি তার ভাগ্যে থাকবে।”

হেমা ক্রন্দনরত অবস্থায় ববির ডান হাতটা চেঁপে ধরে বলল,,

“বিশ্বাস কর ভাই, আমি মন থেকে আমার ভুল গুলো বুঝতে পেরেছি। মোটে ও তোর ফ্ল্যাট পাবার আশায় আমার মধ্যে হুট করেই অপরাধবোধের উদ্ভব ঘটে নি। আকস্মিক কোনো পরিবর্তন ও ঘটে নি। ভেবেছিলাম, তুই হয়তো আমাদের জন্য ভাবিস না। আম্মু, আমি এবং আমার শ্বশুড় বাড়ি নিয়ে ও তোর কোনো মাথাব্যাথা নেই। আমি ও তো একটা পরের ছেলের সংসার করি ভাই। আমাকে ও প্রতিনিয়ত সংসারের বিভিন্ন কুটনীতির স্বীকার হতে হয়, অনেক খোঁটা ও শুনতে হয়। বিশ্বাস কর, তোর বিয়ের পর থেকে এই পর্যন্ত আতিক আমাকে নানান ভাবে খোঁটা দিয়ে আসছে। তোর চাকরী হওয়ার পর থেকে তো আরো বেশি অপদস্ত করছে আমায়। আকার ইঙ্গিতে আমাকে দিয়ে তোকে ও যা নয় তা বলে অপমান করছে। টাকার খোঁটা দিচ্ছে তোর থেকে টাকা আদায় করতে বলছে। এসব আমি নিতে পারছিলাম না বিশ্বাস কর। তাই বাধ্য হয়ে আমি তোর সাথে এবং লিলির সাথে খারাপ ব্যবহার করতে বাধ্য হই। পর্যাপ্ত রাগ এবং জেদ থেকেই আমি আম্মুকে যা নয় তা বলে লিলির বিরুদ্ধে আম্মুর কান ভাঙ্গিয়েছি, উসকেছি, লিলিকে দিয়ে অনেক ভারী কাজ ও করিয়েছি, অপমানের কথা না হয় বাদ ই দিলাম। একটু আগে যখন জানতে পারলাম, শুধু তুই না লিলি ও আমার জন্য এবং আমার হাজবেন্ডের জন্য এতোটা ভাবে, আমাদের এতোটা আপন মনে করে। বিশ্বাস কর তখন আমার রাগ, জেদ, প্রতিহিংসা এবং ভুল ধারণা গুলো ও মন থেকে দূর হয়ে গেছে। মন থেকে বলছি ববি তোর দেওয়া ফ্ল্যাট আমার চাই না, আমি এমনিতেই খুশি। যেখানে আমার ভাই এবং ভাইয়ের বউ আমার জন্য এতো ভাবে, আমার সুখের কথা এতোটা ভাবে সেখানে আতিকের দু, একটা কটু কথা সহ্য করার ক্ষমতা আমি নিঃসংকোচে রাখি।”

ববির মন গলল না। মুখের আদলে এক ফোঁটা ও মায়া ভাব জন্ম নিলো না। কুঁচকে আসা ভ্রু জোড়া ও বিন্দু পরিমাণ ঋজু হলো না। কর্কশ কন্ঠে ববি কিছু বলার পূর্বেই লিলি পড়ার টেবিল ছেড়ে উঠে হেমার সম্মুখস্ত হয়ে ক্ষীণ স্বরে বলল,,

“আপু, আমার এটা দেখে খুব ভালো লাগছে যে, তুমি তোমার ভুল গুলো নিজেই হাইলাইন করে সেই ভুল গুলো রিয়েলাইজ করে নিজ থেকেই আমার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছ। তবে আপু, আমি তোমার সমস্ত ভুল গুলো ক্ষমা করতে পারলে ও একটা ভুল না এই জন্মে ক্ষমা করতে পারব না। আর সেটা হলো আমার মা না হওয়ার অক্ষমতা নিয়ে আমাকে খোঁটা দেওয়া, বিষাক্ত কতোগুলো শব্দ প্রয়োগ করা। তুমি এবং আম্মু মিলে যখন আমাকে “বাজা” বলে ডাকতে না? খুব কষ্ট হতো আমার। মনে হতো এই অভিশপ্ত জীবন নিয়ে আমি বেঁচে আছি কেনো? মরে যাচ্ছি না কেনো আমি? এমনকি তখন এটা ও মনে হতো, আমার উপরিভাগের চামড়া যুক্ত মিছে হাসি মাখা বেহায়া দেহটা একটা মুর্ছে যাওয়া মানুষের রিপ্রেজেন্টেটিভ হয়ে থাকলে ও, বিষাদে জর্জরিত থাকা আমার ভেতরের আত্নাটা নেই, মরে গেছে। তোমরা যতো বার আমাকে “বাজা” বলে ডেকেছ মনে হয়েছে প্রতি বার আমার ভেতরের আত্নাটা হু হু করে কেঁদে বুক ভরা নীরব আকুতি নিয়ে আমার দেহ বের হয়ে গেছে। উপরের খাঁচাটা নিয়ে নিষ্প্রাণ একটা মানুষ হয়ে বেঁচে আছি আমি। বেঁচে থাকার তাগিদে হয়তো বেঁচে আছি। উপর ওয়ালার ডাক ছাড়া তো আর স্বদিচ্ছায় মাটিতে মিশতে পারি না! যখন উপর ওয়ালা আমার ভাগ্য নির্ধারণ করেছিলেন তখন সেই ভাগ্যে ববির মতো একজন আদর্শ স্বামীর সাথে একটা সন্তানের যোগসাযোগ রাখলেন না কেনো? কেনো মা হওয়ার সুখটা আমার ভাগ্যে রাখলেন না উনি? কেনোই বা আমাকে “বাজা” করে এই দুনিয়াতে পাঠালেন? এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর আমি খুঁজি। খুব অভিমান, অভিযোগ জমে আছে উপর ওয়ালার উপর, খুব!”

লিলি অঝোর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। ববি গলাজড়ানো স্বরে হেমাকে উদ্দেশ্য করে বলল,,

“আপু তুমি যাও প্লিজ। আমি চাই না, তোমার জন্য আমার ওয়াইফ বিশেষ করে আর কোনো কষ্ট পাক। আল্লাহ্ তোমাকে দু সন্তানের মা করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, হয়তো ভবিষ্যতে আরো যোগ হতে পারে। তুমি তাদের নিয়ে ভালো থাকো, খুব সুখে থাকো। আসলে “বাজা” শব্দটা তোমাকে কখনো শুনতে হয় নি তো, তাই তুমি এই শব্দটার বিষাক্ত দিক গুলো বুঝতে পারবে না। হয়তো বুঝার চেষ্টা ও করবে না।”

হেমা ফুঁফিয়ে কেঁদে তার গর্ভে ডান হাতটা রেখে লিলির দুচোখে তাকিয়ে কাতর স্বরে বলল,,

“আমি আমার গর্ভের সন্তানকে ছুঁয়ে বলছি লিলি, ঘোর অন্যায় করেছি আমি। দীর্ঘ ৬ বছর ধরে তোমার সাথে প্রতিনিয়ত অন্যায় করে আসছি আমি। না জানি কতো খারাপ খারাপ কথা উচ্চারণ করেছি। তোমাকে পর্যাপ্ত পরিমান হার্ট ও করেছি। এসব অন্যায়ের উর্ধ্বে গিয়ে ও আমি তোমার কাছে মন থেকে ক্ষমা চাইছি লিলি৷ আর মাএ দেড় বা দু মাস বাকি আছে আমার ডেলিভারির। মরণ পথে পড়েছি আমি৷ আল্লাহ্ না করুক হয়তো এই পথ থেকে ফিরে না ও আসতে পারি৷ যদি আমার কিছু হয়ে যায়, তখন শেষ বিচারের দিন উপর ওয়ালার কাছে আমি কি জবাব দিবো লিলি? কিভাবে নিজের পাপ মোচন করব? এই ঘোর অন্যায়ের মাফ তো উপর ওয়ালা আমাকে এক তরফা দিবেন না! তুমি ক্ষমা করার পর হয়তো উপর ওয়ালা আমাকে ক্ষমা করবেন। তাই এই মুহূর্তে তোমার কাছ থেকে আমার ক্ষমা চেয়ে নেওয়াটা ভীষণ জরুরি। আমাকে ক্ষমা করে দাও লিলি৷ প্লিজ ফরগিভ মি! প্লিজ।”

হেমা ঠোঁট ভেঙ্গে কাঁদছে। গর্ভে তার ডান হাতটা এখনো ছুঁয়ে আছে। ববি ব্যতিব্যস্ত হয়ে আলতো ভাবে হেমাকে ঝাপটে ধরে কান্নাজড়িত স্বরে বলল,,

“চুপ করো আপু৷ প্লিজ চুপ করো। কিচ্ছু হবে না তোমার। তুমি সুস্থভাবেই আমার ভাগনীকে নিয়ে বেঁচে ফিরবে৷ আর কখনো মুখ থেকে অসব অলক্ষুনে কথা উচ্চারণ করবে না তুমি। একদম না।”

হেমার গর্ভ থেকে হাতটা সরিয়ে লিলি হেমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় পুড়ে গলা জড়ানো স্বরে বলল,,

“আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি আপু। একদম মন থেকে ক্ষমা করে দিয়েছি। আল্লাহ্ র মেহেরবানীতে তোমার কিছু হবে না আপু। তোমার ডেলিভারী ঠিক সুস্থভাবেই হবে। যাই হয়ে যাক আপু, তুমি নেক্সট টাইম অসব অলক্ষুনে কথা বলবে না প্লিজ। তোমাকে মন থেকে ক্ষমা করে দেওয়াটা মৃত্যুর মতো অতো ভয়ঙ্কর শাস্তির তুলনায় কিছুই না!”

হেমা হেচকি তুলে কেঁদে লিলির মুখ পানে চেয়ে বলল,,

“লিলি আম্মুকে একটু রুমে দেখে এসো প্লিজ। আম্মু খুব কাঁদছে। প্রেসার মেপে দেখলাম ১৫০ ছাড়িয়েছে। বুকটা ও নাকি ব্যাথা করছে খুব। আম্মু এতোদিন তোমার সাথে যতো খারাপ ব্যবহার করেছিলো সব আমার কথাতেই করেছিলো। আম্মু মন থেকে কিছু করে নি লিলি৷ আম্মুকে ও তুমি মাফ করে দিও প্লিজ।”

লিলি প্রতিত্তুর না করেই দৌঁড়ে রুম থেকে প্রস্থান নিয়ে সোজা সাহেরা খাতুনের রুমে প্রবেশ করলো। হেমাকে পাশ কাটিয়ে ববি ও ভৌঁ দৌঁড়ে রুম থেকে বের হয়ে সাহেরা খাতুনের রুমে প্রবেশ করতেই সাহেরা খাতুনকে দেখল সোফায় সেন্সলেস হয়ে পড়ে থাকতে। লিলি পাশে বসে শুকনো কন্ঠে সাহেরা খাতুনকে ডেকে হালকা ঝাঁকিয়ে বলছে,,

“আম্মু, এই আম্মু, শুনছেন? কি হয়েছে আপনার?”

ববি দ্রুত বেগে সাহেরা খাতুনের অপর পাশে বসে ব্যতিব্যস্ত স্বরে সাহেরা খাতুনের ডান গালে হালকা চাপড় মেরে বলল,,

“আম্মু, এই আম্মু শুনছ?”

সাহেরা খাতুন কোনো রেসপন্স করছেন না। কেবল হার্ট থেমে থেমে ধুকপুক ধুকপুক করছে। নাক থেকে গরম নিশ্বাস নিঃসৃত হলে ও শরীরের কোনো অঙ্গ প্রত্যঙ্গই উনার প্রতিক্রিয়া করছে না। কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম গুলো মুছে ববি জিভ দিয়ে ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে লিলির দিকে চেয়ে বলল,,

“আই থিংক আম্মুকে এক্ষনি হসপিটালাইজড করতে হবে!”

লিলি উত্তেজিত স্বরে বলল,,

“বসে আছেন কেনো তাহলে? যা করার তাড়াতাড়ি করুন। মামু, মামানীকে ডাকুন।”

ববি সোফা ছেড়ে উঠতেই খায়রুল আহমেদ এবং জিনিয়া আহমেদকে নিয়ে হেমা কাঁদতে কাঁদতে রুমে প্রবেশ করল। সাহেরা খাতুনের শুকনো মুখটায় একবার তাকিয়ে খায়রুল আহমেদ গলা জড়ানো স্বরে ববির দিকে চেয়ে বললেন,,

“সাহেরাকে জলদি গাড়িতে উঠাও ববি। আমার লক্ষণ বেশি সুবিধের ঠেকছে না। প্রেসার মাএাতিরিক্ত বেড়ে গেছে। হেমা বলল, প্রখর বুক ব্যাথা ও ছিলো। আমার মনে হয়, যা করার এক্ষনি করতে হবে। পরে হয়তো বিষয়টা সাংঘাতিক রিস্কি হয়ে যেতে পারে।”

দীর্ঘ একটা ভয়ার্ত ঢোক গিলে ববি সাহেরা খাতুনকে এক পাশ থেকে ধরে দাঁড় করাতেই লিলি অন্য পাশ থেকে সাহেরা খাতুনকে আঁকড়ে ধরল। সাহেরা খাতুনের নিথর দেহটা ববি এবং লিলির বুকের পাজরের সাথে মিশে আছে। হেমা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে মুখ চেঁপে কাঁদছে। হেমার সাথে রাগারাগি করতে গিয়েই খুব বেশি হাইপার হয়ে সাহেরা খাতুনের আজ এই আকস্মিক মর্মান্তিক অবস্থা। হেমার এতো সমস্ত পাপের ফল এখন সাহেরা খাতুনকে ভোগ করতে হচ্ছে। পাপ তো অবশ্য উনার ও ছিলো! নিজের মেয়ের কথা শুনে অন্যের মেয়েকে লাঞ্চিত করা, অপমান, অপদস্ত করা, সব’চে নিকৃষ্ট কাজ তো ছিলো একটা মেয়েকে “বাজা” বলে ডাকা। যে ডাকটা হয়তো পৃথিবীর সকল মেয়েদের কাছে সব’চে নিকৃষ্ট শব্দ। যার সাথে সভ্য কোনো শব্দের তুলনাই হয় না। মনে হয় যেনো এই শব্দটা তাদের কাছে মৃত্যুস্বরূপ যন্ত্রণার সমান। আমার ভাবনাতেই আসে না, নিজে একজন মেয়ে বা মহিলা হয়ে নিজের সমজাতীয় মেয়ে বা মহিলাদের তারা কিভাবে পারে এতোটা ছোট করতে? এতোটা নিচু করতে? ঐ নিকৃষ্ট শব্দটার প্রয়োগ করতে? তখন কি তাদের একবার ও মনে হয় না, এই শব্দটা প্রয়োগ করে আমি নিজেকে ও কতোটা ছোট করছি? কতোটা হীন মন মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছি? কারণ, উপর ওয়ালা চাইলে হয়তো আমি নিজে ও তার মতোই “বাজা” হতে পারতাম। তখন আমি ঐ জায়গায় দাঁড়িয়ে পারতাম তো নিজেকে ঠিক রাখতে? ধৈর্য্য, সহ্য নিয়ে মুখ বুজে সব সহ্য করতে?

রাত ১২ঃ৫০ বাজতেই সাহেরা খাতুনকে হসপিটালে ভর্তি করানো হলো। ডক্টররা ইসিজি করে জানতে পারলেন সাহেরা খাতুনের মিনি হার্ট এ্যাটাক হয়েছে। সঠিক সময়ে হসপিটালাইজড না করা হলে হয়তো এর’চে সাংঘাতিক বেশি কিছু ঘটতে পারত! ববি, লিলি এবং খায়রুল আহমেদ ইমার্জেন্সি রুমের সামনাটায় খুব পেরেশান হয়ে পায়চারী করছে। ববি কিছুক্ষন পর পর চোখের কোণে জমাট বাঁধা অশ্রু কণা গুলো ডান হাতের কনুই দিয়ে মুছে নিচ্ছে। সাহেরা খাতুনের আকস্মিক এই দুর্ঘটনায় ববি কোথাও না কোথাও নিজেকে ও খানিকটা দোষী ভাবছে। ঐ সময়টায় ববি না চাইতে ও লিলির হয়ে সাহেরা খাতুনের সাথে খুব উত্তেজিত ভাষায় কথা বলেছে, অনেক বেফাঁস কথা বলেছে, উঁচু গলায় ধমকেছে পর্যন্ত। মূলত এই কারণটাতে ববি ভীষণ ফেড আপ হয়ে আছে। নিজেকে অপরাধী ভাবছে। অন্যদিকে, লিলি শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালে এবং নাকে উদিত হওয়া বিন্দু বিন্দু ঘাম গুলো মুছে নিচ্ছে। টেনশান এবং অস্থিরতায় লিলির দমটা মনে বের হয়ে আসছে। খায়রুল আহমেদ বেশিক্ষন হাঁটাহাঁটি করতে পারলেন না। খানিকটা ক্লান্ত হয়ে উনি ওয়েটিং লনে থাকা চেয়ারটায় থম মেরে বসে পড়লেন। ঐদিকে হেমা এবং জিনিয়া আহমেদ বাড়িতে বসে কান্নাকাটি করছেন এবং এই খারাপ অবস্থা থেকে পরিএানের জন্য আল্লাহ্ র কাছে দো’আ চাইছেন। হেমা খুব বেশি কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছে। মানসিক চাপে সে জর্জরিত। আজ যদি সাহেরা খাতুনের এর চে খারাপ কোনো অঘটন ঘটে যেতো তার সম্পূর্ণ দায়ভার নির্ঘাত হেমার উপর বর্তাতো। কারণ, আজকের এই মর্মান্তিক পরিস্থিতিটা একান্ত হেমার জন্য তৈরী হয়েছে। হেমা ই এই সব কিছুর জন্য দায়ী!

ভোরের দিকে সাহেরা খাতুনের সেন্স ফিরে এলো। ববি এবং লিলি সারা রাত ধরে সাহেরা খাতুনের দু পাশ ধরে বসে ছিলো। দুজনই গোঁটা একটা রাত নির্ঘুম কাটিয়েছে। মিইয়ে আসা শরীর নিয়ে দুজনই একাগ্রচিত্তে সাহেরা খাতুনের দিকে খুব সূক্ষ্মভাবে নজর রেখেছে। কারণ, ডক্টররা কেবিন থেকে বের হওয়ার পূর্বে তাদের দুজনকেই অবগত করে গিয়েছিলেন, ভোরের দিকে যেকোনো মুহূর্তে সাহেরা খাতুনের সেন্স ফিরতে পারে। দুজনকেই অধিক তৎপর থাকতে। তাদের অনুমান অনুযায়ী ঠিক ভোরের দিকেই সাহেরা খাতুনের সেন্স ফিরে এলো। অর্ধ চোখ খোলা অবস্থায় সাহেরা খাতুনকে দেখা মাএই ববি দু চোখে জল নিয়ে সাহেরা খাতুনকে ঝাপটে ধরে কান্নাজড়িত স্বরে বলল,,

“আ’ম স্যরি আম্মু। রিয়েলি ভেরি স্যরি। আমি একদম বুঝতে পারি নি, হঠাৎের মধ্যে এই দুর্ঘটনাটা ঘটে যাবে। যদি ঘুনাক্ষরে ও বুঝতে পারতাম না? তাহলে বিশ্বাস করো আমি কখনোই তোমার সাথে উঁচু গলায় কথা বলতাম না আম্মু, তোমাকে এতোটা হার্ট ও করতাম না। সম্ভবত এই প্রথম আমি তোমার সাথে এতো উঁচু গলায় কথা বলেছি। যা তুমি সহ্য করতে পারো নি আম্মু। তুমি ছাড়া তো আমার নিজের বলতে আর কোনো ছায়া নেই বলো! তোমাকে হারিয়ে বসলে আমি তো এবার সত্যিকার অর্থেই এতিম হয়ে যেতাম আম্মু।”

সাহেরা খাতুনের দু চোখের কোটর বেয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। ববির থেকে চোখ ঘুড়িয়ে উনি অন্য পাশ ফিরে লিলির দিকে তাকালেন। লিলি মাথা নিচু করে নাক টেনে কাঁদছে। সাহেরা খাতুন লিলির দিকে চেয়ে কান্নাজড়িত স্বরে ছোট আওয়াজে বললেন,,

“লিলি?”

লিলি অতিশয় আশ্চর্যিত হয়ে চোখ ঘুড়িয়ে সাহেরা খাতুনের দিকে তাকালা। সাহেরা খাতুন কম্পিত স্বরে পুনরায় বললেন,,

“আআআমাকে মামাফ কককরে দিও।”

লিলি ফ্যালফ্যালিয়ে কেঁদে সাহেরা খাতুনের ডান হাতের তালুটায় দীর্ঘ একটা চুমো খেয়ে বলল,,

“আপনি তো আমার মা। মা রা কখনো তাদের সন্তানদের কাছে ক্ষমা চায় নাকি? মা রা তাদের সন্তানদের যতোই আঘাত করুক না কেনো, যতোই বকাঝকা করুক, ঝগড়া বিবাধ করুক “মা রা মা ই হয়।” তাদের কখনো ক্ষমা চাইতে নেই। তারা সর্বদা নিষ্পাপ এবং নিষ্কলঙ্ক হয়, তাদের কোথাও কোনো কালিমা নেই।”

সাহেরা খাতুন চোখ বুজে মিহি স্বরে বললেন,,

“তুমি আমাকে মা ভাবলে ও আমি হয়তো তোমাকে কখনো মেয়ে ভাবতে পারি নি। তাই হয়তো তোমার উপর এতো নির্মম অত্যাচার করতে পেরেছি। বিশ্বাস করো একটু ও বুক কাঁপে নি আমার। আমিই হয়তো পৃথিবীর সব’চে নিকৃষ্ট মা! যার মধ্যে কালিমায় ভরা!”

সাহেরা খাতুনকে থামিয়ে লিলি রূঢ় স্বরে বলল,,

“কে বলল আপনি পৃথিবীর নিকৃষ্ট মা হুম? আপনি হচ্ছেন পৃথিবীর সব’চে ভালো মা! যে মা অন্যায় করে তার সন্তানদের কাছে নির্দ্বিধায় ক্ষমা চায় সে মা কখনো নিকৃষ্ট হতে পারে না। বরং তিনি হলেন নিষ্কলুষ সু হৃদয়ের অধিকারী। যার দেহে একটা সুন্দর হৃদয় আছে!”

সাহেরা খাতুন ক্রন্দররত অবস্থায় ববির মাথায় অসংখ্য চুমো খেয়ে বললেন,,

“আমাকে একটা নাতি বা নাতনী এনে দে বাপ। তাকে পেলে আমি একদম শান্ত হয়ে যাবো। দত্তক নিলে ও আমার কোনো সমস্যা নেই। তাকে আমার নিজের নাতি/নাতনীর মতোই মানুষ করব, স্নেহে, আদরে তাকে গড়ে তুলব।”

ববি চোখ তুলে সাহেরা খাতুনের দিকে তাকিয়ে বলল,,

“তুমি আগে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরো আম্মু। আমি ব্যবস্থা করছি কি করা যায়।”

সাহেরা খাতুন হাসিমুখে এবার লিলির দিকে চেয়ে বললেন,,

“সত্যি বলছি লিলি, নিজের নাতি/নাতনীর মতোই তাকে মানুষ করব, খুব আদর করব, সবসময় তার আশেপাশে থাকব। তুমি ও কিন্তু তাকে কোনো হেলা করবে না। নিজের সন্তানের মতো মানুষ করবে।”

লিলি মৃদ্যু হেসে হ্যাঁ সূচক মাথা নাঁড়ালো। সাহেরা খাতুন ক্লান্ত হয়ে চোখ বুজে পুনরায় ঘুমিয়ে পড়লেন। সকাল আটটা বাজতেই জিনিয়া আহমেদ হসপিটালে ছুটে এলেন। লিলি এবং ববিকে উনি জোর পূর্বক বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন। একে তো লিলির পরীক্ষার প্রিপারেশন নেওয়ার বাকি আছে, দ্বিতীয়ত গর্ভবতী হেমা বাড়িতে। যেকোনো সময় যেকোনো কিছুর প্রয়োজন পড়তে পারে। ববির ও অফিস টাইম ১০ টা থেকে। যদি ও ববি আজ অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে তবু ও তার একটু বিশ্রামের দরকার!

বাড়িতে ফিরতেই হেমাকে কান্নারত অবস্থায় ড্রইং রুমের সোফায় দেখা গেলো। গতকাল রাত থেকেই হেমা অবিরামহীন কেঁদে চলছে। নাক, মুখ, চোখ ফুলে একাকার অবস্থা। ববি ব্যতিব্যস্ত হয়ে হেমার পাশে বসে উত্তেজিত স্বরে বলল,,

“কি হয়েছে আপু? তুমি কাঁদছ কেনো?”

ববির বুকে মাথা ঠেকিয়ে হেমা কান্নাজড়িত স্বরে বলল,,

“আমার জন্য আম্মুর আজ এই অবস্থা ববি। আমি যেনো নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছি না। নিজেকে বড্ড বেশি অপরাধী মনে হচ্ছে। উপর ওয়ালা আমাকে ক্ষমা করতে পারবেন তো ববি? আমি যে নিজের মায়ের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছি! মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছি!”

হেমার মাথায় হাত বুলিয়ে ববি শান্ত স্বরে বলল,,

“শান্ত হও আপু। এই সময়ে তোমার এতো হাইপার হওয়াটা ঠিক না। আম্মু এখন যথেষ্ট ভালো আছে আপু৷ আজ বা কালকের মধ্যে রিলিজ করে আনা হবে। তুমি অযথা নিজেকে এতোটা দোষী ভেবো না। যা হয়ে গেছে ভুলে যাও। ভবিষ্যতে যেনো একই ভুল আবার রিপিট না হয় সেদিকে সোচ্চার হও।”

লিলি ম্যাংগো জুস হাতে নিয়ে রান্না ঘর থেকে বের হয়ে এলো। জুসের গ্লাসটা হেমার দিকে এগিয়ে লিলি নরম কন্ঠে হেমাকে বলল,,

“জুস টা খেয়ে নাও আপু। এই সময়ে তোমার এতো উত্তেজিত হওয়াটা মোটে ও ঠিক না। মানসিক সমস্যার পাশাপাশি শারীরিক সমস্যা ও দেখা দিতে পারে। ভুলবশত হঠাৎ যদি পেটে চাপ পড়ে তখন কি করবে? আমাদের ভাগনীর যদি কোনো অসুবিধে হয়?”

হেমা চোখের জল মুছে জুসের গ্লাসটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে লিলির দিকে চেয়ে বলল,,

“ঠিক আছে। আমি আর উত্তেজিত হবো না, কাঁদব ও না। তোমরা শুধু আমার পাশে থেকো লিলি। এই মুহূর্তে তোমাদের খুব প্রয়োজন আমার।”

লিলি এবং ববি ম্লান হেসে হ্যাঁ সূচক মাথা নাঁড়ালো। কিছুক্ষন হেমার সাথে কথা বলে লিলি এবং ববি রুমে প্রবেশ করে প্রথমে ফ্রেশ হয়ে হেমাকে নিয়ে সকালের ব্রেকফাস্ট কমপ্লিট করল। সাথে অবশ্য আদিল ও ছিলো। আদিলের সাথে কিছুক্ষন খুনঁসুটি করে ববি পুনরায় রুমে প্রবেশ করল। লিলি অলরেডি ব্যালকনীর দরজা, জানালা, লাইট বন্ধ করে রুমে আরামচে ঘুমানোর একটা পরিবেশ তৈরী করে নিলো। দীর্ঘ একটা ঘুমের পর লিলির পড়ায় মনোনিবেশ করতে হবে। এমনিতেই অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে গেছে তার। গত এক সপ্তাহ ধরে তো সে এক ঘন্টা ও ভালো করে পড়তে বসতে পারে নি। সে ক্ষতিটাই এখন তাকে পুষিয়ে নিতে হবে।

ঘুমের এতো মনোরম পরিবেশ পেয়ে ববি ও তার মিহি চোখ দুটোকে সামলে রাখতে পারল না। লিলিকে ঝাপটে ধরে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। লিলি বিরক্তি নিয়ে ববিকে কনুই দিয়ে ঠেলে বলল,,

“ইসসস গরম লাগছে তো। ছাড়ুন।”

ববি মিনমিনে স্বরে বলল,,

“উহুহু কোনো ছাড়াছাড়ি নেই। তোমার গরম লাগলে ও আমার বেশ আরাম লাগছে!”

লিলি তের্জশিনী রূপ নিয়ে ববির দিকে ঘুড়ে তাকাতেই ববি বাঁকা হেসে লিলির শাড়ির আঁচলটা একটানে খুলে নিলো। চট জলদি লিলির ঘাঁড়ে মুখ ডুবিয়ে ববি ঘোর লাগা স্বরে বলল,,

“কোনো কথা হবে না। যা হচ্ছে হতে দাও।”

লিলি অপারগ হয়ে পরম আবেশে চোখ জোড়া বুজে নিলো। ববি মৌণ স্বরে পুনরায় বলল,,

“ভাবছি তোমার এক্সামের পর পরই বেবি এডপ্ট নিতে হবে। এর পূর্বে নিলে হয়তো তোমার পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে।”

লিলি ফট করে চোখ জোড়া খুলে ক্ষীণ স্বরে বলল,,

“না। আম্মু সুস্থ হওয়ার পর পরই এডপ্ট নিতে হবে। সত্যি বলছি, তাকে পেলে আমার পড়ায় কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না ববি। উল্টো প্রফুল্ল মনে আমার সবক’টা এক্সাম পাড় হয়ে যাবে।”

“সত্যি তো?”

“তিন সত্যি।”

“ঠিক আছে। তাহলে আমি সিদ্দিক ভাইয়ের সাথে কথা বলছি।”

“সিদ্দিক কে?”

“আমার অফিসের কলিগ। উনার পরিচিত একজন অসহায় লোক আছে যিনি তার মেয়ে সন্তানকে দত্তক দিতে চাইছেন। গতকালই কথার প্রসঙ্গে কলিগ থেকে জানতে পারলাম!”

“দত্তক নেওয়ার পর লোকটা যদি আবার অধিকার খাটাতে আসেন? যদি বাচ্চাটাকে আবার নিজের বলে দাবি করেন?”

“সেই বন্দোবস্ত করেই তো বাচ্চাটা আমরা দত্তক নিবো। অনেক ফরমালিটিস পূরণ করতে হবে লোকটাকে। তুমি এসব বিষয় নিয়ে এতো টেনশান করো না তো। এই বিষয়টা আমি দায়িত্বের সাথে দেখে নিবো।”

লিলি নিশ্চুপ হয়ে গেলো। ববি উত্তেজিত হয়ে লিলিকে আপন করে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

_______________________________________________

মাঝখানে কেটে গেলো ১৫ দিন। আজ দুপুর ১ টা থেকে লিলির ফাইনাল এক্সামের ফার্স্ট এক্সাম শুরু। ববি এবং লিলির ৩ মাসের দত্তক নেওয়া ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে “ইলমা” মনিটা লিলির কোলে শুয়ে সেই সকাল থেকে ফ্যাঁস ফ্যাঁস করে অবিরত কেঁদেই চলছে৷

#চলবে….?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here