পলাশ_ফুলের_বসন্ত,পর্ব-১০,১১

পলাশ_ফুলের_বসন্ত,পর্ব-১০,১১
কলমে -দেবিকা_সাহা
পর্ব-১০

— একি আপনি দাঁড়িয়ে আছেন যে এখনো!! বসুন। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে কি ভালো দেখায় বলুন।আমার ঘরে এই প্রথম এলেন,,আর হয়তো বা শেষও।।
শেষের কথাটা আকাশ বেশ আস্তে আস্তেই বললো।তবুও কথাটা পৌষালির কর্নগোচর হলো না।এরকম একটা অপ্রত্যাশিত কথা শুনে কেমন যেনো চমকে উঠলো মেয়েটা।

আকাশ আপনার কি হয়েছে একটু বলবেন? আপনাকে বড্ড অচেনা লাগছে আমার।আপনি এরকম অচেনা মানুষের মতো ব্যবহার করছেন কেনো আমার সাথে?

— পৌষালি আমরা কি সত্যিই চেনাজানা হতে পেরেছি দুজন দুজনের কাছে? হয়তো পারিনি। তাই ওই কথা নাহয় তোলাই থাকলো।

আর আমার কিছু হয়নি বিশ্বাস করুন।আসলে কাছের কিছু জিনিস হারিয়ে গেলে হয়তো প্রথম প্রথম একটু একাকীত্ব এসে ঘিরে ধরে আমাদেরকে।
তবে সেটাও আমি হয়তো সামলে নিতে পারবো আস্তে আস্তে।আপনি চিন্তা করবেন না।

— কাছের জিনিস হারিয়ে যাচ্ছে মানে??
— সব মানের উত্তর হয় না পৌষালি।যাই হোক আপনি কফিটা ধরুন। আসলে আমার একটা আর্জেন্ট কাজ পড়ে গেছে।আমাকে এক্ষুনি একটু বেড়োতে হবে।আমি আসছি।।

কথাটা বলে উল্টোদিকের মানুষটার থেকে কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে পৌষালিকে একলা ঘরে একা ফেলে ওখান থেকে বেড়িয়ে এলো আকাশ।

আজ অনেকগুলো নিস্তব্ধতা ঘিরে ধরেছে মেয়েটাকে।সব চেনাজানা হিসেব আবার যেনো গুলিয়ে যাচ্ছে। ভালোবাসা হারানোর কষ্টটা বুঝি এমনই হয়।
হঠাৎ করে ফোনের রিংটোন শুনে পৌষালি ঘুরে দেখলো সোফাটার এককোনে আকাশের ফোনটা রাখা আছে।
আকাশ মনে হয় ফোনটা ভুল করে ফেলে গেছে। কিছুক্ষন আগেই তো ঘর থেকে বেড়োলো।এইটুকু সময়ের মধ্যে নিশ্চই ও বেড়িয়ে যাইনি।ফোনটা ওকে বরং দিয়েই আসি।নিশ্চই কোনো জরুরি ফোনই হবে।
এইসব ভাবতে ভাবতেই ফোনের স্ক্রিনের দিকে চোখ যেতেই খানিকটা অবাক আর আশ্চর্য হয়ে গেলো মেয়েটা।
স্ক্রিনের উপর ভেসে উঠেছে অনিন্দ্যর নাম। অনিন্দ্য আকাশকে ফোন করেছে!! কিন্তু কেনো? ওর সাথে কি আকাশের এখনো যোগাযোগ আছে? কই সেদিন তো আকাশ আমায় তেমন কিছু বললো না।ও তো বললো অনিন্দ্যর সাথে নাকি ওর নমাস ছমাসে কথা হয়।তবে কি…
এসব ভাবতে ভাবতেই ফোনটা আবার বেজে উঠলো। পৌষালি এবার খানিকটা উৎসাহের সাথেই ফোনটা ফোনটা রিসিভ করলো। অন্য কারোর ফোন এভাবে না বলে রিসিভ করা উঁচিত নয় জেনেও খানিকটা কৌতুহলের সাথেই ফোনটা রিসিভ করলো।আমাকে জানতেই হবে আকাশের এই অদ্ভুত ব্যবহারের কারনটা কোনোভাবে অনিন্দ্য নয় তো??

— আকাশ,, থ্যাংকস এ লট রে।জানিস তো পৌষালি আজ আমার সাথে নিজে থেকে দেখা করতে চেয়েছে।জানিস আকাশ আজ আমি খুব খুশি।আমি ঠিক জানতাম পৌষালি আমায় কোনোদিন ভুলতে পারে না।আর আমার সেই ভাবনাটা একেবারে মিলে গেলো দেখ। আমি জানি আমি ভুল করেছি।খুব বড়ো ভুল করেছি।তবে আমি এও জানি আমি পৌষালিকে ঠিক মানিয়ে নিতে পারবো।ও ঠিক আমায় ক্ষমা করে দেবে।ভুল করে যদি আমরা সেই ভুলটা শুধরে নিতে চাই,,তার তো কোনো অন্যায় নেই। আর এই সব কিছু হয়েছে শুধুমাত্র তোর জন্য।তুই যদি পৌষালির জীবন থেকে সরে না যেতিস,,তবে আমি কোনদিন আমার পৌষালিকে ফিরে পেতাম না রে।

না এরপর আর চুপচাপ থেকে অনিন্দ্যর বলে যাওয়া কথাগুলো শুনতে পারছিলো না পৌষালি।আর নতুন করে কিছু ভাবতেও পারছিলো না মেয়েটা।

ফোনটা কেটে দিয়ে অনিন্দ্যর নাম্বারটা কললিস্ট থেকে ডিলিট করে ফোনটাকে ওই জায়গাতেই রেখে চুপচাপ ওই ঘর থেকে বেড়িয়ে এলো মেয়েটা।

— আন্টি আমি আসছি।
— একি মা তুমি এক্ষুনি চলে যাচ্ছো!!! এই তো সবে এলে।
— না আন্টি আজ আর বসা হবে না।আমার একটা জরুরি কাজ আছে।অন্য একদিন আসবো।
— কাজ থাকলে তাহলে আর আটকাবো না।তবে তুমি আকাশের সাথেই তাহলে বেড়িয়ে যাও।সেও তো বেড়োবে বললো।
পৌষালি একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলো ছেলেটা কেমন একটা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
— না আন্টি তার কোনো দরকার হবে না। আসলে আকাশ তো এখন একটা কাজে বেড়োচ্ছে।সেখানে আমি গেলে ওর হয়তো আবার সমস্যা হতে পারে।আর আমার জন্য কারোর সমস্যা হবে,,সেটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারবো না। আমি একাই চলে যেতে পারবো ঠিকঠাক ভাবে।আপনি চিন্তা করবেন না।আর তাছাড়া একাই তো এসছিলাম।একা ফিরতেও পারবো।

কথাটা বলে আর বিশেষ কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে ওই বাড়িটা থেকে বেড়িয়ে এলো মেয়েটা।

— কি হলো বলতো মেয়েটার? মুখটা কেমন একটা থমথমে লাগলো।এই তো যখন এলো,,তখন কি সুন্দর প্রানস্ফূর্তিতে ভরপুর ছিলো।তাহলে হঠাৎ করে হলোটাই বা কি??

— কি আবার হবে মা? দেখো হয়তো কোনো জরুরি কাজ পড়ে গেছে,,তাই ওরকম হন্তদন্ত হয়ে ছুটলো।

— কি জানি বাবা!! তোদের দুজনের ব্যাপারই আমার ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না।যাই হোক তুই তো বেড়োবি।আমিও যাই রান্নাঘরে। অনেক কাজ পড়ে আছে।

মায়ের কথার ঠিক যুক্তিসম্মত কোনো উত্তর আকাশ ঠিক খুঁজে পেলো না।তাই ও মাথা নেড়ে আলতো হেসে মায়ের কথায় সন্মতি জানালো।
পৌষালির মধ্যে কোনো পরিবর্তন আমিও যে লক্ষ্য করিনি এমনটা নয়।সত্যিই ওর ওই হাসিখুশি মুখটা কেমন একটা গাম্ভীর্য আর থমথম আবেশে ভরে ছিলো।হয়তো আমার থেকে অপ্রত্যাশিত ভাবে কথাগুলো শুনেই মেয়েটা ওরকম চুপ হয়ে গেলো।বিশ্বাস করো পৌষালি,,আমি কখনোই তোমাকে ওই শক্ত শক্ত কথাগুলো বলতে চাইনি।আমি তো তোমার কাছে সবসময়ই খোলা বইয়ের মতো হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু…..
যাই হোক,,আমার কথা নাহয় বাদ-ই দিলাম। আমি জানি একটু পর অনিন্দ্যর সাথে দেখা হওয়ার পর,ওর সাথে কথা হওয়ার পর তোমার মনটা একেবারে হালকা হয়ে যাবে। আর এটাই তো স্বাভাবিক। ও যে তোমার ভালোবাসা।। ও যখন নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে,,তুমিও নিশ্চই ওকে আর বেশিদিন দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে না।তুমি ওকে ঠিক ক্ষমা করে দেবে।আমি বেশ জানি।
আর আমি নাহয় দূর থেকেই তোমাকে ভালো থাকতে দেখবো।তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী হয়েই নাহয় থাকলাম।সবার সব চাওয়া তো আর একজীবনে পূর্ণ হয় না।তোমাকে চাওয়ার,তোমাকে পাওয়ার ইচ্ছেটে নাহয় আমার জীবনে অপূর্ণতার খাতাতেই যত্ন করে তোলা রইলো।

চারদিকটা বড্ড নিস্তব্ধ লাগছে।নিজেকে কেমন একটা হালকা লাগছে। আর নতুন করে ভাবার কিচ্ছু অবকাশ নেই।সব ভাবনাগুলোই থমকে গেছে।
আচ্ছা,,এরা আমাকে এতোটাই সহজলভ্য ভাবে?এতোটাই শস্তা ভাবে?? আমার চাওয়া-পাওয়াগুলো কেউ কোনোদিন বুঝতে পারলো না? অবশ্য কেউ কোনোদিন বোঝার চেষ্টাই করেনি আমাকে।সবাই নিজের মতো করে যুক্তি সাজিয়ে আমার জীবনের অঙ্কগুলো মিলিয়ে দিচ্ছে।আমার মতামতের কোনো মূল্যই নেই কারোর কাছে।
আকাশ আপনি তো নিজেকে মহান প্রমান করার খেলায় নেমেছেন।সত্যি কতো মহান আপনি!! অনিন্দ্যর জীবনে আমাকে ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন।সে কি কম মহানুভবতার পরিচয়?
আর অনিন্দ্যর কথা তো আমি ছেড়েই দিলাম।আপনারা আসলে সবাই সমান।বড্ড বেশি নিজের কথা ভাবেন।আর এই নিজের কথা ভাবতে গিয়ে উল্টো দিকের মানুষটার মধ্যেও যে একটা আমিত্ব আছে,,সেটাই ভুলে যান আপনারা।

ঠিক আছে,, আপনি মহান হতে চান তো? হোন আপনি মহান।আমার আপনাকে বাঁধা দেওয়ার মতো কোনো অযুহাতই নিজের কাছে অবশিষ্ট নেই।
তবে হ্যাঁ,, একজনের সাথে বোঝাপড়াটা আজ আমায় করতেই হবে।

বসন্তের রঙিন শহরটাতে আজ যেনো বিনা নোটিশেই মেঘের রাজত্ব শুরু হয়েছে।শহরটা চুপচাপ হলেও,,তার প্রতিটা প্রান্তের কোন না কোন মানুষের জীবনে ভাঙাগড়ার খেলাটা বেশ চলছে।

কফিশপের কোনার দিকটাতে একটা চেয়ারে অনিন্দ্য বসে।ঘড়ির কাটায় এখন বিকেল পাঁচটা।
অনিন্দ্য চুপচাপ বসে নিজের হাতে থাকা মোবাইলটা নিয়ে কিছু মুহুর্ত অতিবাহিত করার একটা বৃথাই চেষ্টা করছিলো।হঠাৎ করে সামনের দিকে পরিচিত কারোর একটা কন্ঠস্বর শুনে ফোনটা থেকে চোখ তুলে ও সামনের দিকে তাকালো।

পৌষালি চুপচাপ সামনের চেয়ারটাকে টেনে নিয়ে বসলো।
— পৌষালি কেমন আছো? আমি জানতাম তুমি ঠিক…..
— কোনটা শুনলে তুমি খুশি হবে? যেটা শুনলে তুমি খুশি হবে,,ধরে নাও আমি তেমনটাই আছি।
–পৌষালি,,, আমি আসলে……

— কি ভাবো নিজেকে? মহাপুরুষ? আচ্ছা সেসব বাদ দাও।আগে বলো,,তুমি যে এখানে আমার সাথে দেখা করতে এসেছো,,সেটা সংযুক্তা জানে?
— না মানে….
— ফোনটা ধরো।আর ওকে জানিয়ে দাও প্লিজ।যে তুমি তোমার বিবাহিত স্ত্রীকে ভুলে নিজের প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে দেখা করতে এসেছো নতুন করে আবার সবকিছু শুরু করবে ভুলে।না মানে তুমি আবার আমাকে একটা মেয়ের সংসার ভাঙার কারন বানাতে চাইছো,,এটা তাকে না জানালে চলে নাকি?? হাজার হোক বরটা তো তার।।

— পৌষালি!!!!!
— চুপ।একদম চুপ। সবকিছুর একটা লিমিট থাকে।সব নাটকেরও একটা অন্তিম লগ্ন থাকে।।আর একটাও মিথ্যে আর সাজানো গল্প বলবে না আমাকে…. হতে পারে আমার ধৈর্য্যটা একটু বেশি।কিন্তু বিশ্বাস করো সেটা সীমাহীন নয়।তারও একটা নিজস্ব সীমা পরিসীমা আছে।।

পৌষালির এই রূপ অনিন্দ্যর কাছে একদম অচেনা।পৌষালিকে এরকম রূপে দেখে অনিন্দ্য কেমন একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে।।

দেবিকা..

……….( চলবে )………

#গল্প- #পলাশ_ফুলের_বসন্ত( পর্ব-১১ )
#কলমে- #দেবিকা_সাহা

পৌষালির এই রূপ অনিন্দ্যর কাছে একদম অচেনা।পৌষালিকে এরকম রূপে দেখে অনিন্দ্য কেমন একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে।।

— পৌষালি তুমি ঠিক কি বলতে চাইছো? বিশ্বাস করো আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।
— ওহো রিয়েলি!! তা তোমার বোধশক্তি আর বোধগম্যতা এতোটা কম হয়ে গেলো কবে থেকে শুনি। আমি তো জানতাম তুমি সব জানো,সব বোঝো।এমনকি সবার থেকে একটু বেশিই বোঝো তুমি।তা নিজের এই প্রতিভাটা এতো তাড়াতাড়ি দমে যেতে দিলে চলবে কেনো!!

— আমি জানি পৌষালি আমার উপর তোমার অনেক অভিযোগ,, অনেক অভিমান।কিন্তু বিশ্বাস করো সবকিছু আমার হাতে ছিলো না।আমি সেদিন পরিস্থিতির স্বীকার ছিলাম মাত্র।আমি তোমাকে সবটা বুঝিয়ে বলছি।তুমি আমাকে একটু সময় দাও।আই ওয়ান্ট টু এক্সপ্লেইন মাইসেল্ফ।।

— প্লিজ আই নিড নট এনি এক্সপ্ল্যানেশন।আর তুমি ভাবো কি নিজেকে? ওকে ওকে ওয়েট।আমারই বলতে একটু ভুল হয়ে গেলো।তোমার কথা বাদ দাও।তুমি নিজেকে নিয়ে যা খুশি ভাবতে পারো,,দ্যাট ইজ নট মাই পয়েন্ট অফ ভিউ।আমি শুধু জানতে চাই, তুমি আমাকে কি ভাবো? যখন খুশি আমাকে যা খুশি বলা যায়,যখন খুশি আমাকে ছেড়ে দেওয়া যায় আবার তোমার যখন ইচ্ছে তখনই আমাকে নিজের জীবনে ফিরিয়ে নেওয়া যায়?? এতোটা শস্তা ভাবো তুমি আমাকে? আরে আমি তোমার সাথে আজ দেখা করতে রাজি হয়েছিলাম,,তার কারনটা বোঝার মতো ক্ষমতা তোমার নেই।তাই সেই কারনটা আমি তোমাকে বলবোও না। শুধু একটা কথাই বলবো,,আমাকে নিয়ে এসব অলীক কল্পনা বন্ধ করো।আই ওয়ার্ন ইউ।এই ব্যপারটা যেনো আর রিপিড না হয়।তাহলে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না তোমার জন্য।
ওকে,, আমার যা বলার ছিলো বলা হয়ে গেছে।আমি আসছি।আর হ্যাঁ,, দুকাপ কফি অর্ডার করে এসেছিলাম আসার সময়।ওরা হয়তো একটু পরেই কফি দুটো সার্ভ করে দিয়ে যাবে।একটু পরেই সংযুক্তা আসছে।ওর সাথে কফিটা খেয়ে লক্ষী ছেলের মতো বাড়ি চলে যাও।আর আমাকে নিয়ে ইদানিং যেসব ভূত তোমার মাথা চাড়া দিয়েছে,,তাদেরকে এখানেই ক্ষান্ত হতে দাও প্লিজ।

— সংযুক্তা? ও কোথা থেকে এলো?না মানে….
— আমি ফোন করে আসতে বলেছি।ওই যে আগেই বললাম কারোর সংসার ভাঙার কারন হতে চাই না।

কথাটা বলেই ব্যাগটা টেবিল থেকে তুলে নিয়ে বাইরের উদ্দেশ্যে পা বাড়াতে প্রস্তুত হলো পৌষালি।
হঠাৎ করে কিছু একটা ভেবে নিয়ে অনিন্দ্যর উদ্দেশ্যে আবার কিছু কথা সাজিয়ে বললো মেয়েটা–

— আর হ্যাঁ শোনো,, তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধুটিকে বলে দিও উনি যে মহান হওয়ার ব্রতটা নিয়েছিলেন,,সেটাতে এই যাত্রায় ঠিক সাফল্যলাভ করতে পারলেন না।ভবিষ্যতে তিনি যেনো মহান হওয়ার জন্য একটু প্ল্যানমাফিক ব্রত নেয়।তাতে হয়তো সাফল্যলাভ করলেও করতে পারে।

কথাটা বলে পৌষালি আর এক মুহূর্তও ওখানে দাঁড়ালো না।কফিশপ থেকে বেড়িয়ে শহরের ভিড়ে মিলিয়ে গেলো আস্তে আস্তে।

ওদিকে পৌষালির এমন অনাকাঙ্ক্ষিত রূপ দেখে অনিন্দ্য আপনা আপনিই বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ঠিক এই মুহূর্তে কি করে নিজের মনকে সান্ত্বনা দেওয়া যায় সেটাই এখন ওর কাছে ভাবনার বিষয়।

বাড়িতে ফিরে কারোর সাথে কোনো কথা না বলেই চুপচাপ নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলো পৌষালি।
মেয়ের হঠাৎ করে আচমকা এমন ব্যবহারের কোনো কারন খুঁজে পেলেন না পৌষালির মা।

— কি রে কি হলো বলতো তোর?খাবি আয়।দুপুর তো গড়িয়ে যাচ্ছে।একঘন্টা হয়ে গেলো ফিরেছিস।এখনো তোর কোনো পাত্তা নেই।কি ব্যপার বলতো?গেলি তো বেশ হাসিখুশি মুখে।হঠাৎ এমন হলোই বা কি যে মুখের অভিব্যক্তি একেবারে পরিবর্তন হয়ে গেলো। কি রে কখন থেকে ডাকছি তো।কথা কি কানে যাচ্ছে না নাকি??

— মা প্লিজ।এখন আমি খেতে পারবো না।আর আমাকে একটু একা থাকতে দাও।কাজ আছে আমার।

— খেতে পারবি না মানেটা কি রে?
— ক্ষিদে নেই মা।আর প্লিজ এখন আমাকে একটু একা থাকতে দাও।
— যা পারিস কর।কি যে হয় তোর মাঝে মাঝে,,তা সাক্ষাৎ ভগবানও জানেন না।মুড তো নয়।যেনো মনে হচ্ছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস।এই ঝলমলে রোদ তো এই বৃষ্টি।

আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা। তারপর একেবারেই তোমার জীবন থেকে দূরে চলে যাবো পৌষালি। তোমার নিশ্চই প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হবে আমার জন্য।আদৌ আমার জন্য তোমার কি কোনো কষ্ট হবে পৌষালি? কি জানি…
আর যদিও হয়,, আমি এটাও জানি সেটা ক্ষনিকের।কয়েকদিনের মধ্যেই সবটা ঠিক হয়ে যাবে। আচ্ছা অনিন্দ্যর সাথে পৌষালির আজ নিশ্চই দেখা হয়েছে।অবশ্য সেটাই তো হওয়ার কথা।

— আচ্ছা বাবু,একটা সোজা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছি। সোজাসুজিই উত্তরটা দিবি।
— একি মা তুমি এখন এখানে? এতো রাতে? তুমি ঘুমোওনি এখনো?
— আমার ঘুম নিয়ে তোকে চিন্তা করতে হবে না।এমন একটাও কাজ তুই এই কয়েকদিনে করিসনি,,যাতে আমি শান্তিতে দু-চোখের পাতা এক করতে পারি।তাই আমার কথা বাদ দে।যে প্রশ্নটা করতে এসেছি সেটার উত্তর দিলেই চলবে।
— কি প্রশ্ন মা?
— হ্যাঁ রে পৌষালির সাথে কি তোর কোনো কারনে ঝামেলা হয়েছে?
— মা!!! তু..তুমি হঠাৎ এরম প্রশ্ন কেনো করছো?কি হবে আমাদের মধ্যে? কই কিচ্ছু হয়নি তো।
— আরে বলিস না।একটু আগে পৌষালির মায়ের কাছে ফোন করেছিলাম।তখন উনিই কথায় কথায় বললেন যে পৌষালি নাকি আজ সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে থেকে একদম চুপচাপ হয়ে গেছে।এমনকি কারোর সাথে কোনো কথাই বলছে না।নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে আছে মেয়েটা।এমনকি এখন পর্যন্ত কিছু খায়নি।কিছু জিজ্ঞেস করলে বলছে নাকি তার কাজ আছে।কি হলো বলতো মেয়েটার?
ওদিকে পৌষালির বাবাও বাড়ি নেই।দিদি একা আছেন বাড়িতে মেয়েটাকে নিয়ে।দিদি সত্যি বড্ড চিন্তার মধ্যে আছে জানিস তো।আর চিন্তারই তো বিষয় বল।সত্যি তোরা যে কি করিস না!! বাবা মায়ের দিকটা একবার ভেবে দেখবি না বল। উফ্,,চিন্তায় চিন্তায় তো আমারই দুচোখের পাতা এক হতে চাইছে না।কি হলো মেয়েটার কে জানে।।

মায়ের মুখ থেকে কথাগুলো শুনে আকাশ কেমন যেনো ঘাবড়ে গেলো।কি হলো মেয়েটার? এভাবে চুপচাপ হয়ে যাওয়ার কারনটা কি? আজ তো ওর খুশিতে থাকার দিন।তবে….
আচ্ছা আমার কি বুঝতে কোথাও ভুল হচ্ছে। আমি কি এই কয়েকদিন ধরে ভুল ভেবে এসেছি।কিন্তু…
না না তা কেমন করে হয়।আমি কিছুই ভুল বুঝিনি।নাকি আমি ভুল?? উফফ্ আর ভাবতে পারছি না আমি।কি হলো পৌষালির?আমাকে জানতেই হবে।

— মা তুমি কোনো চিন্তা কোরো না।আমি দেখছি।কি হবে পৌষালির? নিশ্চই সত্যি কোনো কাজেরই প্রেশার আছে।তোমরা হয়তো একটু বেশি ভাবছো। ঠিক আছে,,তুমি ঘুমোতে যাও।আমি ওর সাথে কথা বলছি।

— হ্যাঁ তাই কর বরং।

মাকে তো কথাটা সহজ ভাবে বুঝিয়ে দিলাম।কিন্তু আমার মন যে এতো সহজ ভাবে ব্যপারটাকে মানতে পারছে না।পৌষালি কি সত্যিই কাজের প্রেশারে চুপচাপ? নাকি অন্য কোনো ব্যাপার?

কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই পকেট থেকে ফোনটা বের করে পৌষালির নাম্বারে ফোন করলো আকাশ।
পরপর দুবার রিং হয়েই ফোনটা কেটে গেলো।উলটো দিক থেকে কোনো উত্তর পাওয়া গেলো না।তৃতীয় বারের বার ফোনটা রিসিভ করলো মেয়েটা।

— হ্যালো.. হ্যালো পৌষালি,, তুমি ফোন ধরছিলে না কেনো বলোতো? তুমি ঠিক আছো তো?
উল্টো দিক থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে আকাশ আবারো বললো–
— পৌষালি উত্তর দিচ্ছো না কেনো?প্লিজ স্পিক পৌষালি।
— কাজ ছিলো।কিন্তু এতো রাতে আপনার ঠিক কি দরকার আমার সাথে বলুন তো,,যার জন্য এতোবার আমাকে ফোন করছেন।
পৌষালির মুখ থেকে এরকম একটা উত্তর শুনে কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো ছেলেটা।

— পৌষালি… তুমি এমন ভাবে কথা বলছো…..
— আমি এমনই জানেন তো।তাই তো এমন ভাবে কথা বলছি।আর আমার মতো একটা মেয়ের জন্য আপনাকে মহান হওয়ার ব্রতে নামতে হবে না।কারন,,সেই মহানত্বটা আমি ঠিক নিতে পারবো না।তাই যেখানে আপনার মহান হওয়ার ব্রতটা কাজে লাগবে,,সেখানেই বরং কাজে লাগান।
আকাশ আমি এখন ফোনটা রাখছি।আমার মাথাটা বড্ড ধরেছে।

— হ্যালো পৌষালি… প্লিজ আমার কথাটা শোনো…

নাহ্,,ততোক্ষনে উল্টো দিকের ব্যক্তিটি ফোনটা কেটে দিয়েছে।
পৌষালি এসব কি বলে গেলো?? মহান হওয়ার ব্রত মানে? ও কি সবটা জেনে গেছে? কিন্তু আমি তো ওর ভালোর জন্যই সবটা…
আমি কি সত্যিই কোনো ভুল করে ফেললাম?যার মাশুল দেওয়াটা হয়তো আমার পক্ষে আর সম্ভব হবে না কোনোদিনও।। না না এসব কি ভাবছি আমি? ভুল যদি করেই থাকি তবে আমিই তাকে শুধরে নেবো।।

আকাশটা আজকে বড্ড বেশি নিস্তব্ধ। আচ্ছা এটা কি ঝড়ের পূর্ব লক্ষন? নাকি বৃষ্টির ?
অবশ্য আমার জীবনটা তো কেমন ঝোড়ো হাওয়ার মতো উথাল-পাতাল হয়ে গেছে।কোনো স্থিরতা নেই।সবটাই যেনো খড়কুটোকে আগলে ধরে বেঁচে থাকার অবলম্বন খোঁজা।ভরসা আর বিশ্বাস শব্দদুটো হয়তো আমার জন্য নয়।আমার ভরসা আর বিশ্বাসের জায়গাটা এতো নড়বড়ে কেনো ঠাকুর? আমি কি কারোর বিশ্বাসের একটুও যোগ্য নই? তোমার মহাবিশ্বে আমার আশ্রয়স্থলটা এতো আলগা কেনো ঠাকুর? আমি যে আর পারছি না ঠাকুর। ভরসা, বিশ্বাস হারাতে হারাতে আজ আমি বড্ড ক্লান্ত।

মেঘলা দিনের নিস্তব্ধ আকাশটা দুটো মানুষের আত্মগ্লানিতে পরিপূর্ণ হয়ে নিস্তব্ধই থেকে গেলো আজকের মতোন ।দেখা যাক,, পরবর্তী সকালটা ঝড় বয়ে আনে? নাকি বৃষ্টির মতো আবেগ হয়ে ভালোবাসা নিয়ে ঝড়ে পড়ে ??

দেবিকা..

………….( চলবে )………….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here