গল্প-পলাশ_ফুলের_বসন্ত💞💞,অন্তিম পর্ব

গল্প-পলাশ_ফুলের_বসন্ত💞💞,অন্তিম পর্ব
কলমে -দেবিকা_সাহা

সময় এগিয়েছে আরো একটা বছরকে পিছনে ফেলে। আর এর মাঝের সময়টা পৌষালি আর আকাশের জন্য ছিলো একেবারে স্বপ্নের মতোন।যে স্বপ্নটা এখন আর ওদের দুজনের জন্য আলাদা আলাদা ভাবে ব্যখ্যা করা যায়না।স্বপ্নটা যে আর আলাদা নেই।মিলেমিশে ওদের দুজনের জন্য একই সুরে আবহমান।
হ্যাঁ এই সাতটা মাসে ওরা একে অপরকে আরো ভালো ভাবে চিনতে শিখেছে।জানতে শিখেছে নিজেদের চাওয়া পাওয়া গুলোকে আরো বেশি করে।একটু আধটু মনোমালিন্য বা ভাবনার গড়মিল যে নেই,,তা কিন্তু একেবারেই নয়।অনুরাগ বা অভিমান-ও যে ভালোবাসার অঙ্গ।ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে একে অপরের সঙ্গে। তবে কি,, এতোকিছুর মধ্যেও ওরা নিজেদের বিপরীত দিকের মানুষটাকে বুঝতে পারে।অভিমান থাকলেও মানভঞ্জন পালাটা নিজেরাই গুছিয়ে নেয় নিজেদের মতোন করে। নাহ,, গাঁটছড়াতে বাঁধা পড়েনি দুজন এখনো। তবে খুব সামনেই আসন্ন সেই দিন।

আজ আরো একটা বসন্ত।বছর ঘুড়ে নতুন একটা বসন্ত এসে কড়া নাড়ছে দ্বারে দ্বারে। আজকের দিনটা পৌষালি আর আকাশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আজকের দিনে যে তারা একে অপরকে নিজেদের মনের কথা বলেছিলো,, এমনটা কিন্তু নয়। আজকের দিনেই যে পৌষালি আর আকাশের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিলো।তবে সেটা যেমন তেমন সাক্ষাৎ নয়।একেবারে ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ। সেদিনটাকে ভুলে গেলে কেমন করে চলবে। সেই দিনেই তো পৌষালি আকাশকে একেবারে সোজাসুজি ভাবে রান্না করা,ঘর গোছানো,, আরো কতো কতো দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছিলো।ওরে বাবা,,আরো কতো কতো ব্যপার ছিলো। সেই দিনটাকে এতো সহজে ভুলতে পারি নাকি!!! নাহ্,,ওরাও ভুলতে পারেনি ওদের প্রথম সাক্ষাতের সেই বিশেষ দিনটাকে।তাইতো আজকের এই স্পেশাল আয়োজন।

— আকাশ,, কোথায় যাচ্ছি বলোতো আমরা? সেই কখন থেকে তো ড্রাইভ করেই যাচ্ছো।কিছু তো বলো।আরে বাবা আমার তো আর তর সইছে না।

— সারপ্রাইজ!!!
ড্রাইভ করতে করতেই পৌষালির চোখের দিকে একদম স্থিরভাবে তাকিয়ে, মুখে একটা স্নিগ্ধ হাসির রেখা টেনে কথাটা বললো আকাশ।
— আবার সারপ্রাইজ? সকাল, বিকেল সবসময় শুধু সারপ্রাইজ-ই চলছে।
— এক্স্যাক্টলি।সন্ধ্যা রাত্রি সকাল দুপুর।শুধু আর শুধু সারপ্রাইজে ভরপুর।।
আপনিও বা কিসে কম যান ম্যাডাম।তবে আজকে আমার টার্ন।তাই আজকের সারপ্রাইজটা আমিই দেবো।
এবারে ওরা দুজনেই হেসে উঠলো কথাটার পরিপ্রেক্ষিতে। আর সময়ের সাথে সাথে ওরাও এগিয়ে চললো শহর পেড়িয়ে সেই লাল মাটির দেশে।।

আজ অনেকদিন পর প্রতিদিনের ওই একঘেয়ে রুটিন ছেড়ে বেড়িয়ে পড়তে ইচ্ছে করলো।কেনো জানিনা বারবার মনে হলো বেড়িয়ে পড়ি নিজের মতোন করে।কাউকে জানাতেও আর বিশেষ কোনো ইচ্ছে হলো না।হ্যাঁ,, হয়তো এভাবে বিনা নোটিশে ছুটি নেওয়াতে অফিস থেকে কথা শুনতে হবে।স্যালারিও কাটবে হয়তো খানিকটা। ওদিকে মা-ও হয়তো চিন্তা করবে।তবে ওইটুকুই। আর তো কোনো পিছুটান নেই।তবে ওইসব লোকদেখানো পিছুটান না থাকায় বেশ ভালোই হয়েছে। আর কতোদিন বাঁচবো এভাবে? অনেক তো হলো,, সবার হাতের পুতুল হয়ে বাঁচা।সংসারের ভয়,সমাজের ভয়, লোকে কি বলবে তার ভয়।ভয়ে ভয়ে তো বাঁচলাম এতোগুলো দিন।এবার নাহয় একটু নিজের জন্য বাঁচি। শুধুই নিজের জন্য। যেখানে দিনশেষে আমার কাছে আমিই থাকবো।আমার মনের কথাগুলো শোনার জন্য আমিই থাকবো।
কথাগুলো আপন মনে ভাবতে ভাবতেই গলাটা যেনো কেমন ভারী হয়ে এলো অনিন্দ্যর। অনেকগুলো না পাওয়া মনের মাঝে থাকলেও আজ তারা যেনো ওর মনটাকে সেভাবে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধতে পারছে না।

নিজের মনে এসব ভাবতে ভাবতেই অনিন্দ্যর চোখটা আটকে গেলো সামনের দিকে তাকিয়ে। পরিচিত দুজন মানুষকে দেখলো আজ এতোদিন পর।
আকাশ আর পৌষালি!! হ্যাঁ ওরাই তো।ঠিকই দেখছি আমি।কতো পরিতৃপ্ত আর সম্পূর্ণ দেখাচ্ছে ওদের দুজনকে একে অপরের সাথে। দুজনের মুখেই কি সুন্দর অমলিন হাসির রেখা ফুটে রয়েছে। ওদের দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে ওরা একে অপরের সাথে, অপরকে নিয়ে কতোটা খুশি। পৌষালির এই হাসি মুখটাই যে বরাবর দেখতে ভালো লাগে। ও আজ সত্যিকারের সুখী নিজের জীবনে।আকাশ পৌষালিকে খুব ভালো রাখবে,, এটা নিশ্চিত।
তবে আমি যে নিজেকে কথা দিয়েছিলাম যে আমি কোনো দিন আর পৌষালির সামনে গিয়ে দাঁড়াবো না। এই কথাটা যে আমাকে রাখতেই হবে। আমাকে এক্ষুনি এখান থেকে বেড়িয়ে যেতে হবে,, ওরা এখানে আসার আগেই।।

— আরে পৌষালি দেখো,, ওটা অনিন্দ্য না?
অনিন্দ্যর নামটা হঠাৎ করে শুনে পৌষালিও একটু অবাক হলো।।
— অনিন্দ্য? ও এখানে কিভাবে?
— আরে ওইতো দেখো সামনে।ও মনে হয় আমাদের দেখেনি।দাঁড়াও ডাকি একবার।

আকাশ অনিন্দ্যকে ডাকতে ডাকতে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো। ওদিকে পৌষালি ওখানেই স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে রইলো।
অনিন্দ্য এখানে কি করছে? ঘুড়তে এসেছে নিশ্চই।তবে ও একা কেনো? ওর সাথে তো সংযুক্তারও তো থাকার কথা? সংযুক্তা কোথায়? আর অনিন্দ্যকে এরকমই বা দেখাচ্ছে কেনো? চোখমুখ একেবারে শুকিয়ে গেছে।কেমন যেনো অন্যরকম দেখাচ্ছে ছেলেটাকে এতোদিন বাদে।

মনে মনে এইসব প্রশ্ন নিয়ে পৌষালিও সামনের দিকে এগিয়ে গেলো।
– আরে অনিন্দ্য!! তুই এখানে? তা বল কেমন আছিস ভাই?
— এইতো চলছে। তোরা কেমন আছিস বল।
— আমাদেরও চলছে রে। সুখে দুঃখে মিলেমিশে বেশ দিব্যি চলে যাচ্ছে।আচ্ছা সংযুক্তা কোথায় রে? ওকে তো দেখছি না।
— সংযুক্তা আমার আসেনি।যদিও আসার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই।ও চলে গেছে।
— চলে গেছে মানে? কি সব উল্টোপাল্টা বকছো।
বেশ উদ্বিগ্ন হয়েই অনিন্দ্যর দিকে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলো পৌষালি।
অনিন্দ্য এতোক্ষনে পৌষালিকে ভালোভাবে খেয়াল করলো।খোলা চুল আর কাজল চোখে কি মিষ্টি দেখাচ্ছে মেয়েটাকে। কি ভীষণ পরিতৃপ্ত দেখাচ্ছে।

— চলে গেছে মানে চলে গেছে।সংযুক্তা আর আমার ডিভোর্স হয়ে গেছে আজ প্রায় ছ’মাস হতে চললো।আসলে ভুলটা আমারই।আমিই পারিনি ওকে বুঝতে।ওর মতো করে ওর আবদারগুলো পূরন করতে কখনোই পারিনি।হয়তো সেভাবে কোনোদিন ভালোবাসতেই পারিনি ওকে। আসলে সব ভুল গুলো আমার।শুধুই আমার।তাই ভুলের মাশুলগুলো তো আমাকেই গুনতে হবে। সংযুক্তা বরাবরই খুব স্বাবলম্বী মেয়ে। নিজের খেয়ালে সবসময় চলে।মা ওকে পছন্দ করে আনলেও মায়ের সাথে ওর বরাবরই মতের কোনো মিল ছিলো না।মায়ের সংস্কার গুলোকে ওর সবসময়ের জন্যই অযৌক্তিক বলেই মনে হতো।আর আমার কথা তো বললামই।ওর পক্ষে হয়তো আর সম্ভব হচ্ছিলো না এই মিথ্যে সম্পর্কটাকে টেনে নিয়ে বেড়াতে।তাই ও চলে গেছে আমার জীবন থেকে।এটা তো হওয়ারই ছিলো।এটাই স্বাভাবিক। নিজের জগৎ নিয়ে হয়তো ভালোই আছে।
কথাগুলো এলোমেলো ভাবে বললেও খুব স্থির আর ধীর স্বরেই কথাগুলো বলছিলো অনিন্দ্য।

তবে অনিন্দ্যর মুখে এসব কথা শুনে পৌষালি আর আকাশ বেশ অবাকই হলো। ঠিক এই পরিস্থিতিতে কি বলে যে উলটো দিকের মানুষটাকে সান্ত্বনা দেওয়া যায়,,সেই হিসাব ওদের জানা নেই।

— আরে তোরা এভাবে চুপ করে গেলি কেনো আকাশ? আমার জীবনের ট্র‍্যাজিটি নিয়ে এতো ভাবিস না।সত্যি বলতে আমিও আর ভাবি না জানিস তো।এইসব ভাবতে ভাবতে বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম।তাইতো একটু মুক্ত বাতাসের খোঁজে এখানে চলে এলাম।বসন্তের সকালে এই শান্তিনিকেতনে।

একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে পরের প্রশ্নটা পৌষালিই করলো অনিন্দ্যকে।
— অনিন্দ্য মাসিমা কেমন আছে? না মানে এতোকিছুর পর….
— আছে একরকম নিজের মতো করে নিজের ভাবনাগুলোকে চিন্তাগুলোকে সঙ্গে নিয়ে।
তা পৌষালি তোমাদের বিয়েতে কবে যাচ্ছি শুনি?
এই যে আকাশ নিমন্ত্রন যদি না পাই,, তাহলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।
— আরে তোকে নিমন্ত্রণ করবো না,,এমনটা আবার হয় নাকি!!
— তা বিয়েটা কবে শুনি।
— এইতো সামনের মাসেই।
— বাহ্।কংগ্রাচুলেশনস টু বোথ অফ ইউ।নতুন জীবনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা।
— ধন্যবাদ।।
শান্তভাবেই উত্তরটা দিলো পৌষালি।
— ওকে আমি এবার আসছি কেমন!! ওদিকটাতে একটু দরকার আছে। ভালো থাকিস তোরা।

কথাটা বলে আর কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে অনিন্দ্য সামনের দিকে এগিয়ে গেলো।
আজ সত্যি বড্ড হালকা লাগছে। তোমাদের দুজনের সাথে এভাবে দেখা হওয়ার তো কোনো কথা ছিলো না।তবে দেখাটা হয়ে একদিকে ভালোই হলো।অনেকদিন পর যেনো একটা অন্যরকম মুক্তির স্বাদ নিতে পারছি। তোমরা ভালো থেকো,,আমি দূর থেকে এটাই চাইবো।আজ আর আমার কোনো আফসোস বা অনুতাপ নেই।ভালো থেকো পৌষালি নিজের ভালোবাসার সাথে। একবার পিছনের দিকে তাকিয়ে ওদেরকে দেখে মুখে আলতো হাসির রেখা টেনে আবার সামনে ফিরে নিজের গন্তব্যস্থলের দিকে এগিয়ে গেলো ছেলেটা।।

— অনিন্দ্য অনেকটা বদলে গেছে। তাইনা পৌষালি?
তবে ওর সাথে কি এটা ঠিক হলো? এতোটা শাস্তিও কি ওর প্রাপ্য ছিলো?
— ঠিকই বলেছো আকাশ।অনেকটা বদলে গেছে ছেলেটা।তবে তুমি শাস্তির কথা বলছো!!! আমার মনে হয় ও এখন অনেক ভালো আছে।
— এটা তুমি কি বলছো পৌষালি!!
— ঠিকই বলছি।সংযুক্তা ওর জায়গায় থেকে ঠিক করেছে না ভুল,, সেই বিচার আমি করতে যাবো না।তবে আমি এটা জানি,,সব ঘটনারই ফলাফল হিসেবে কোনো না কোনো ভালো দিক থাকে। সংযুক্তার থেকে এমন আঘাতটা না পেলে হয়তো অনিন্দ্য কখনোই ওর নিজের ভুলটা বুঝতে পারতো না।সর্বোপরি ও নিজেকে বুঝতে পারতো না।তাই যেটা হয়েছে তাতে খারাপ কিছু হবে না। ও ঠিক নিজের জীবনে আবার নতুন করে ভালো থাকার মানে খুঁজে পাবে। কয়েকদিন নাহয় নিজেকেই উপলব্ধি করুক।
কথাটা বলতে বলতেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো পৌষালির মুখ থেকে।

এই ঘটনার কিছুক্ষন পর ওরা পৌঁছোলো কাছেই একটা মাঠের দিকে।দোলের আয়োজন শুরু হয়েছে ওখানে।জীবন যে আজ আবিরের রঙে রঙিন হওয়ার দিন।পৌষালি চুপচাপ দাঁড়িয়ে এই আয়োজন গুলোই দেখছিলো।
হঠাৎ করে আচমকাই পরিচিত একটা হাত একমুঠো লাল আবিরে রাঙিয়ে দিলো ওর মুখটা।আর উপহার হিসেবে পৌষালির হাতে ধরিয়ে দিলো একমুঠো রঙিন পলাশ ফুল।
ঘটনার আকষ্মিকতায় পৌষালি বেশ অবাক হলেও একরাশ ভালোলাগা এসে ঘিরে ধরলো ওকে।সেও আবিরের রঙে রাঙিয়ে দিলো তার প্রিয়তমের মুখটা।
বসন্তের রঙিন ছোঁয়ায় ঘিরে গেলো,,রাঙিয়ে গেলো আজ দুজনের জীবন।মনের রঙ,প্রানের রঙ মিলেমিশে একাকার হয়ে জীবনটাকে ফের রঙিন করে তুললো। এ যেনো ভালোলাগার বসন্ত।ভালোবাসার বসন্ত।
ঠিক যেনো পলাশ ফুলের বসন্ত।। ❤️❤️💞💞

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here