পরিবর্তন,পর্বঃ ৩

#পরিবর্তন,পর্বঃ ৩
লেখাঃ মান্নাত মিম

১১.
সময় সুযোগের অপেক্ষায় যে সকলেই কলি বুঝতে পারে। আত্মহত্যার চিন্তা করেও পিছিয়ে পড়ে। মুখে বলা সহজ, “জ্বালা যন্ত্রণায় আত্মহত্যা করব”। কিন্তু যখন হাতে বিষ বা ব্লেড কিংবা গলায় ফাঁস, ব্রিজে দাঁড়িয়ে নিম্নে তাকাতে গেলেই বুক কাঁপে, হাঁটু কাঁপে, হাত কাঁপে। এত সহজ নয় আত্মহনন। উপরন্তু মা-বাবার মায়াভরা মুখ তো রয়েছেই। তখন তুচ্ছ হয়ে যায় মরে যাওয়া ভাবনাগুলো। তবে ক’জনই বা পিছাতে পারে সেসব চিন্তাধারা থেকে। কলি-ই বা কতক্ষণ টিকিয়ে রাখতে পারবে এমন মনোভাব।

” কি রে কলি অংক করছ না কেন? ধ্যান কই?”

কলি কিছু বলল না মাস্টার মশাইয়ের কথায়। নিচের দিকে তাকিয়ে অংক কষায় মন দিলো। এদিকে মাস্টার মশাই অপেক্ষায় আছেন আজ। ক’দিন যাবৎ পাখিটাকে একটুও ছুঁয়ে দেখেননি। বশে আনার জন্য রয়েসয়ে থেকেছেন। কিন্তু বাঘা মুখ ভুখা কতক্ষণ রাখা যায়। সে-তো ফণা তুলে দংশনের চেষ্টায়। আজ সন্ধ্যা হয়ে যাবে পড়াতে পড়াতে। সময় বাড়িয়েছেন মাস্টার মশাই। কারণ সমুখেই আসন্ন দশম শ্রেণির নির্বাচনী পরীক্ষা। এজন্য একটু বেশি বেশি পড়াচ্ছেন না কি। সেই সময়ের তালে বেসামাল হওয়ার পরিকল্পনা এঁটেছেন সাথে করে।

১২.
রান্নাঘরটা চৌচালা ঘরের ভেতর। দু’টো রুম বড়ো বড়ো। আর বাদ বাকি দুটো মধ্যম সাইজের। সেগুলো মেহমানদের জন্য। আরেকটা ছোট্ট রুম একেবারেই ছোট্ট, সেখানে অসুস্থ বৃদ্ধা থাকেন। যিনি মাস্টার মশাইয়ের মা। মাঝে বিশাল উঠোন তো রয়েছেই। রান্নাঘরে লাকড়ি জ্বালিয়ে চা বসিয়েছে কলি। মাস্টার মশাইয়ের আবদার। কেমনতর আবদার যে তাকেই পাঠাতে হলো, জানা আছে কলির। আনমনা হতে বাদ দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাজে মন দিলো। কয়েক পল কাটার পর হঠাৎই ঘাড়ে ভেজা স্পর্শ আঁতকে উঠল ফলে গরম পানি নামাতে গিয়ে পাতিলের ছ্যাকা লেগে গেল হাতে। চিৎকার জুড়ে দিলো কলি। এখন আগন্তুক ভাবল, তার উপস্থিতিতে এই চিৎকার। তাই হন্তদন্ত হয়ে বাইরে ছুটে গেল। বাইরের খোলা হাওয়ায় হাঁপ ছাড়ল। ভাগ্যিস সকল ছাত্র-ছাত্রীদের ইতোমধ্যে ছুটি দেওয়া হয়েছে বিধায় বেঁচে গেলেন মাস্টার মশাই। নাহলে যে কী হতো।

কলি বাইরে বেরিয়ে এলো। উঠোনে চাঁদের আলোর সাথে টিনের চালার কোণে জ্বালিয়ে রাখা আলোতে অন্ধকারেও মাস্টার মশাইকে দেখা যাচ্ছে। এগিয়ে গিয়ে মিনমিনিয়ে বলল,

“আমি যাই স্যার। আন্ধার নামছে।”

বলে বইখাতা নিয়ে চলে গেল কলি। পরিচিত গ্রাম হেসেখেলে বড়ো হয়েছে। তাই রাতের৷ আঁধারে চলতে ভয় করে না। ভয় তো অমানুষ’দের নিয়ে। মাস্টার মশাই ছেড়ে দিলো। আজকের মতো আরো সন্ধ্যার আশায় না কি রাতের আশায়?

১৩.
মোড়ল রফিক মিয়ার দেখা মিলছে না আজকাল। কারণ সামনেই ইলেকশন। তাই ব্যস্ততার চাপে কলির কথা মাথা থেকে বের করে দিয়েছে। তবে যে, একেবারেই ছেড়েছে এমনটা নয়। নজরবন্দি বলেও একটা কথা রয়েছে। সেই নজরবন্দি কলির চোখে পড়ে মাঝেসাঝে। এসব পরিস্থিতি তাকে মানসিকভাবে বিপর্যয় করে তুলছে। স্কুলে যাওয়ার পথে পিছে কারো অস্তিত্বের টের পাওয়া আবার স্কুলে গিয়ে আরেকজনের কাছে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া। সবকিছু কুলিয়ে সে মানসিক বিকারগস্ত হয়ে পড়ছে দিনকে দিন।

মোড়ল রফিক মিয়ার চামচা কদম আলি পিছু পিছু আসছে কলির। কলি বুঝতে পারে সেটা। তবুও কিছু বলে না। বলেও লাভ নেই ক্ষতি ছাড়া। এই শয়তানটাও যে সুযোগসন্ধানী বোঝার মতো বয়স হয়েছে তার। ক্ষমতাবানেরা এমনই হয় গরীব তাদের কাছে স্রেফ ভোগ্যপণ্য।

১৪.
গ্রাম্য সংস্কৃতিতে বড়ো হওয়া কলি। বয়স্ক মোড়ল আর স্কুল শিক্ষক দ্বারা যে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে সেটা প্রকাশ করাকে লজ্জাশরম মনে করে। গ্রামের লোকজন কুসংস্কারাচ্ছন্ন যুক্তিবোধহীন। তাদের কাছে এসব বলা মানে নিজের আত্মাভিমানকে নিলামে তোলা। আর বাবা-মা’কে বলতেও একপ্রকার অস্বস্তি ভর করে। উপরন্তু যদি বলেও তাঁরা তাকে বিশ্বাস করবে বলে মনে হয় না কলির। মাস্টার মশাইকে তো ফেরেশতা তুল্য মনে করেন (নাউজুবিল্লাহ)। আর গ্রামের মোড়ল রফিক মিয়ার কথা বলতে গেলে উলটো নিজ মেয়েকে গলা টিপে হত্যা করতে পিছ পা হবেন না তাঁরা। ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের ওপর আঙুল তুলতে নেই। তাহলে এক আঙুল তাদের ওপর তুললে বাকি আঙুল ভুক্তভোগীর দিকে ওঠাতে সক্ষম তারা।

“কলি ভাত বাড়ছি। খাইতে আয়।”

“খামু না।”

বিছানায় শোয়া অবস্থায় জবাব দিলো কলি। মেয়ের অস্বাভাবিক আচরণ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। কলির মা নিজের বাড়ির কাজের সাথে জমিদার বাড়িতেও হালকা পাতলা কাজ করেন বাড়তি আয়ের উদ্দেশ্য। তাই সময় হয়ে ওঠে না মেয়ের দিকে ধ্যান দেওয়ার। খাবার প্লেট হাতে নিয়ে মেয়ের ঘরে গেলেন। বিছানায় বসে প্লেটে ভাত মাখতে মাখতে বললেন,

“কী হইছে ক তো দেহি? খালি খালি মুখ কালা কইরা ঘরে বইয়া থাকছ। মা’রে কবি না তো কারে কবি?”

“কিছু হয় নাই তো কইলাম।”

কলির গোঁয়ারের মতো জবাব। সত্য বলতে ভয় পাচ্ছে। পাছে যদি তাকে মা ভুল বুঝে বিশ্বাস না করে। বিশ্বাস না করার সম্ভাবনাই বেশি দেখতে পাচ্ছে কলি।

“আমি জানি কিছু হইছে। মা না তোর ক আমারতে।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মা’য়ের দিকে পিঠ ঘুরিয়ে কলি শুয়ে রইল। কলির মা বুঝলেন মেয়ে তাঁর এখন হাজারো প্রচেষ্টা করলেও মনের কথা বলবে না। ভারাক্রান্ত হলো তাঁর মন। আসলে দোষটা তাঁদেরই। সন্তানের সাথে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক না গড়ে বন্দি-কয়েদির মতো আচরণে তারা বাবা-মা’কে ঠিক ভরসা করে উঠতে পারে না। তাই তো হাজারো দুঃখকষ্টের পরও বাবা-মা’কে আপন ভেবে উঠতে পারে না বিধায় নিভৃতে কেঁদে কেটে সকল যন্ত্রণা কামড়ে সহ্য করে।

১৫.
গত তিনদিন যাবৎ কলির নিজেকে মুক্ত পাখি মনে হচ্ছে। কারণ রয়েছে অবশ্য। মাস্টার মশাই নিজ শ্বশুর বাড়িতে জামাই অতিথি হয়ে গিয়েছেন বিধায় প্রাইভেট বন্ধ। স্কুলেও তাঁর উত্ত্যক্ত সহ্য করতে হয় না। তবে কদম আলির নজর থেকে হটতে পারেনি এখনো।

আজ সন্ধ্যার পর পড়াবেন মাস্টার মশাই। না যাওয়ার ইচ্ছাই জোরালো বেশি। কিন্তু উপায়হীন কলি। কলির মা সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দেখেন মেয়ে এখনো পড়তে যায়নি। রাগান্বিত হয়ে কয়েক পল বকাঝকা করেন। তাও মেয়ের একগুঁয়ের মতো গো ধরা দেখে হাত লাগাতে পিছ পা হন না। অতঃপর লেখাপড়া না করলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য বলেন, যা কলির আত্মে গিয়ে লাগে। সেই বের হওয়া শেষ বের হওয়া হয় কলির জন্য।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here