নিরব সে,৪র্থ পর্ব ,০৫

নিরব সে,৪র্থ পর্ব ,০৫
সাদিয়া_সৃষ্টি
৪র্থ পর্ব

সকালে বাড়ি ভর্তি আত্মীয়দের খাবারের ব্যবস্থা করেন ওয়াফিফের মা আফিয়া রহমান, আর তার সাথে আথার মতো লেগে ছিল জিনিয়া। কোন কাজ করুক না করুক, আফিয়ার পিছন পিছন ঘুরে বেড়িয়েছে। আবার একটু আধটু কাজে হাত ছুঁইয়ে দিয়েছে। একবার তো আফিয়ার পিছন পিছন যেতে যেতে বাথরুম অবধি ঢুকে পড়ার অবস্থা তৈরি হতে হতে হয় নি। এতে সে আফিয়া সহ বাড়ির বাকি কর্ত্রী বা মহিলাদের প্রিয় হয়ে উঠেছে। যাই হোক, আজ পর্যন্ত বিয়ের পর কোন নতুন বউ নিজের শাশুড়ির সাথে লেগে থেকেছে? তাদের ছেলের বউ তো এমন করে নি। অনেকে এ নিয়ে হাসি ঠাট্টা করছে তো অনেকে বলছে – ২ দিন পর এসব চলে যাবে। তখন তার ছেলেও তাকে ভুলে গিয়ে বউ এর আঁচল ধরে ঘুরে বেড়াবে। এসব শুনে আফিয়া রহমান বাইরে যাই প্রকাশ করুক, ভেতরে ভেতরে বেশ খুশি তিনি। নিজের পছন্দের মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে দিতে পেরেছেন। এখন শুধু ছেলে আর ছেলের বউ ২ জনেই মায়ের পিছন পিছন ঘুরলেই হল।

আফিয়া রহমানের সাথে জিনিয়ার দেখা সাধারনভাবে হয়েছে। জিনিয়া এক বৃদ্ধ মহিলাকে রাস্তা পার হতে সাহায্য করছিল, সেই সময় রাস্তার অপর পারে আফিয়া রহমান দাঁড়িয়ে খেয়াল করেছিলেন। কাছেই পার্ক ছিল। সেখানেই ঘুরতে গিয়েছিলেন পরিবার সমেত। সেখানে জিনিয়াকে দেখে মনে ধরেছিল। এরপর মাঝে মধ্যে তিনি ওই এলাকার ওই পার্কটাতে দুই মেয়ের সাথে বেড়াতে এসেছেন কয়েকবার। এসব সম্পর্কে জিনিয়া কিছুই জানত না। তিনি জিনিয়াকে খেয়াল করেন। আর জিনিয়ার শান্ত এবং সাহায্য করার স্বভাব বেশ মনে ধরে। আশেপাশের অন্য সব মহিলাদের কাছ থেকে খোঁজ করে জিনিয়ার সম্পর্কে সব জানতে পারেন আর নিজের ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক করে ফেলেন। নিজের পরিবারকেও তিনি রাজি করান। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল ওয়াফিফকে রাজি করান। গত ৩ কি সাড়ে ৩ বছর ধরে তিনি ওয়াফিফের বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ওয়াফিফকে রাজি করানো যায় নি। ওয়াফিফ নিজের সিদ্ধান্তে অটুট। সে কোনোদিন বিয়ে করবে না। কিন্তু আফিয়া রহমান চান নি ওয়াফিফ পুরনো কথা নিয়ে সারাজীবন পড়ে থাকুক। একা একা থাকুক। তাই তিনি অনেক কষ্টে ওয়াফিফকে বিয়ের জন্য রাজি করান। এতে ওয়াফিফ রাজি হওয়ার পর তিনি স্টার জলসা আর জি বাংলা কে ধন্যবাদ জানান। ছেলেকে ব্ল্যাকমেইল করে বিয়ে দেওয়ার আইডিয়া তো এরাই দিয়েছিল।

ওয়াফিফ সকালেই এই পণ করে রেখেছিল যে আজ সারাদিন সে ঘর থেকে বের হবে না। এমনকি খাবারের জন্যও না। কিন্তু সেটা আর হল কোথায়? সে যদি বের হয়, তাহলে তাকে সব আত্মীয়রা চেপে ধরত। তাদের নানান কথার বাহার নিয়ে বসত।

”কি শেষ পর্যন্ত বিয়ে করে ফেললে?”

”খুব তো বলতে বিয়ে করব না।”

”আমরা তো কত মেয়ে দেখলাম, তাদের থেকে একজনকে পছন্দ করলে কি হত?”

”আমাদের দেখা মেয়ে এই মেয়ের থেকেই শত গুন ভালো ছিল। একবার বলেই দেখতে।”

”তবে মেয়ে কেমন? সব খোঁজ খবর নিয়েছ তো?”

এসব প্রশ্ন তো শেষ হওয়ার নয়। এরপর শুরু হত সমবয়সী ভাই বোন দের প্রশ্ন।

”ভাইয়া, শেষেমেশ বুড়ো বয়সে এসে বিয়েটা করেই ফেললেন? আমি তো ভেবেছিলাম আপনার বিয়ে আর খাওয়া হল না।”

”কত কিছু ভেবে রেখেছিলাম, কিন্তু করব কি না সেটাই ভাবছি। ভাই যদি অনুমতি দিতেন?”

এই অনুমতি দেওয়া মানে এক এক টা শয়তান কে অনুমতি দেওয়া কি না কি করবে তার ঠিক নেই।

এর পাশাপাশি আছে কিছু চিপকু টাইপের মেয়ে আর তাদের মা। এরা আরেক পরীক্ষা ওয়াফিফের কাছে।

বিরক্তি চলে আসে এসবের মধ্যে থাকলে। আগে সাধারণত ঘরের কোন অনুষ্ঠান হলে সে সেদিন হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরত না। কিন্তু এখন বিয়ে উপলক্ষ্যে তার মা তাকে না জানিয়ে ছুটি নিয়ে নিয়েছেন তাও ২ সপ্তাহের। এর ১ দিন আগেও বাড়ির বাইরে পা রাখলে মা এর সেই বিখ্যাত লাঠি আলমারির পিছনে লুকানো আছে। নতুন বউএর সামনে সেই লাঠির বাড়ি খেয়ে নিজের মান সম্মান খোয়াতে হবে তাকে। সেটাও আরেক চিন্তা। তাই রুমের বাইরে বের হওয়া বাদ। একদিন না খেয়ে থাকলে কিছু হবে না।

সকাল টা ভালোই চলছিল। ওয়াফিফ তখনও রুম থেকে বের হয় নি। তবে তার পেটে ইঁদুর বিড়াল দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছে। না খেয়ে থাকার অভ্যাস আছে। তবে খুব কম। সে কিছু না কিছু খায় অল্প হলেও। কিন্তু কিছুই খায় নি। ঘরে পানিও ছিল না। বুক সেলফ থেকে নিজের ডাক্তারির একটা বই বের করে তাতে ডুবে যাওয়ার চেষ্টা করল সে। কিন্তু এটাও বৃথা গেল। এর বদলে তার আরও বেশি ক্ষুধা লাগল। বিছানার পাশের টেবিলের ড্রয়ারে হাত দিতে দিতে দিল না। একবার সেখানে হাত নিয়ে যাচ্ছে তো আবার পিছিয়ে নিচ্ছে। বাড়ি ভর্তি মেহমান। এখানে সিগারেট বের করা ঠিক হবে না। সে কিছু না করে এবার চোখ থেকে চশমা নামিয়ে টেবিলে বই রেখে তার উপর রাখল। আর দরজার দিকে তাকিয়ে থাকল। যদি কেউ আসে তাহলে তাকে দিয়ে খাবার পাঠাতে বলবে।

কিছুক্ষণ প রটার ভাবনা সত্য করে জিনিয়া ঘরে প্রবেশ করল। অবশ্য সে এখন নিজ ইচ্ছায় এখানে আসে নি। বাইরে সে সারা সকাল কারো না কারো সাথে সময় কাতাচ্ছিল। বেশির ভাগ সময় আফিয়া রহমানের সাথে। আর বাকিটা ওর বোনদের সাথে। ওয়াফিফের বোনেরা বেশ মিশুক। সহজেই জিনিয়ার সাথে মিশে গেল ওরা। জিনিয়া ওদের সাথে থাকলেও বেশি কথা বলে নি। চুপ করেই একজায়গায় বসে ছিল। ওকে এভাবে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে একজন তো বলেই উঠেছিল,

–ভাবি, আপনি এভাবে চুপ করে বসে আছেন কেন? কেউ তো বলতেই পারবে না যে আপনি এখানে আদৌ আছে কি না? কিছু কথা তো বলুন।

এর উত্তরেও জিনিয়া শুধু মুচকি হেসেছিল। এর মধ্যে জিনিয়া শুধু ওয়াফিফের বোন মিলা আর মিনা কে একবার জিজ্ঞেস করেছিল,

–আচ্ছা, এখানে বাড়ির সামনের তালগাছের নিচে কি কেউ পিঠা বিক্রি করে?

ওয়াফিফের বলা কাহিনী তখনও তার মনে আসছিল বারবার। এর উত্তরে মিলা বলল,

–হ্যাঁ ভাবি, শীত কালে বেশি আসে। তাছাড়া অন্য সময় মাঝে মাঝে আসে। অনেক আগের নাকি এক কাকু আসতো। তার পিঠা বেশি মজার ছিল। কিন্তু আমরা খাই নি।

এই কথা বলেই ওরা চলে যায়। মিলার কথা শুনে সে আবার গতরাতের কথা ভাবতে থাকে। কিন্তু তার আগেই ডাক পড়ে।

সেখানে পৌছুতেই বাড়ির বড়রা তাকে চেপে ধরে।

–কি ব্যাপার নতুন বউ? ঘর থেকে যে কেবার বের হয়েছ, আর ঢুকছ না। ঘরে বাঘ আছে না কি ভাল্লুক?

–হ্যাঁ তো, সারাদি শাশুড়ির সাথে থাকলেই হবে না কি? একটু সময় তো বরকেও দেও।

–কাল রাতে কি তোমাদের ঝগড়া হয়েছে না কি যে সেই সকাল থেকে এখনো এখানে আছো?

এমন নানা কথা তাকে লজ্জায় ফেলছিল। তখন আফিয়া রহমান ই বলে উঠলেন,

–জিনিয়া, যাও তো, গিয়ে দেখ ওয়াফিফের কিছু লাগে কি না?

এই কথা শুনে সে মুচকি হেসে সেখান থেকে চলে গেল। কিন্তু তখনও তার কানে ভেসে এলো কিছু কথা।

–কি ব্যাপার ভাবি? আমরা তো বিয়ের পর ছেলের বউকে ঘর থেকে বের করতেই সন্ধ্যা পেরিয়ে ফেলতাম। আর তুমি তাকে আরও ঘরের মধ্যে ঢোকাচ্ছ? নিজের ছেলের বউকে সামলে রাখো। আঁচলে বেঁধে রাখো এখন থেকেই , এতো আস্কারা দিও না।

এর উত্তরে আফিয়া রহমান কি বলেছিলেন সেটা জিনিয়ার জানা নেই। তার আগেই সে ঘরে ঢুকে দরজা চাপিয়ে দেয়। তার তখন কান লাল হয়ে এসেছে লজ্জায়। কি কি কথা বলছিল ওরা? বাবা রে বাবা!

ওয়াফিফ জিনিয়াকে ঘরে ঢুকতে দেখে যেন আশার আলো দেখতে পেল। তার চোখ জোড়া চকচক করে উঠল। সে এক সেকেন্ডও অপেক্ষা না করে বলে উঠল,

–কোথায় ছিলে এতক্ষণ?

–আপনার কথা মতো মায়ের সাথে ছিলাম।

–ওরে আমার পতীব্রতা স্ত্রী, পতীর আদেশ এর দিকে খেয়াল আছে, কিন্তু পতীর পেটের দিকে খেয়াল নেই।

–মানে?

–মানে, আমি বলেছিলাম ফেবিকলের মতো লেগে থাকতে, ঠিক আছে। কিন্তু আমি যখন থাকব না তখন। এখন তো নর্মাল আঠার মতো লেগে থাকতে পারো।

–বুঝলাম না আপনার কথা।

–এখন তো এই সদ্য বিবাহিত নতুন বরের দিকেও একটু খেয়াল রাখো। সকাল থেকে না খেয়ে আছি সেদিকে খেয়াল আছে তোমার? তোমার মনে কি এই প্রাণীর জন্য একটু দয়া মায়া নেই?

–এই কথা। সে তো আপনি বের হলেই খেয়ে নিতে পারতেন।

–বের হওয়া যাবে না।

–কেন?

–বাইরে বিপদ, একেবারে ১০ নং বিপদ সংকেত দেওয়া আছে। আমার মাথায় লাল সাইরেন বেজে চলেছে।

–আপনি সোজা কথা সোজা ভাবে বলতে পারেন না? একটু বুঝিয়ে বলবেন?

–বাইরে কারা আছে?

–আত্মীয়রা।

–ওরা হল এক বিরাট বড় বিপদ। ওদের সামলাতে পারলেও ওদের হাজারটা প্রশ্ন একেকটা তীরের মতো মাথায় লাগে। তার উত্তর আমি দিতে পারব না। তুমি বরং এক কাজ করো। আমার জন্য খাবার নিয়ে এসো ঘরে।

–শুনুন। আমি বলছিলাম কি…

এই কথা বলতে না বলতেই ঘরের মধ্যে বাচ্চারা খেলতে খেলতে ঢুকে পড়ল। ওয়াফিফের ডান হাত মাথায় চলে গেল। দুই আঙুল দিয়ে কপালে স্লাইড করতে করতে জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করল সে।

জিনিয়া এবার ওয়াফিফের রাগ দেখে কেটে পড়ার জন্য বলল,

–আমি আপনার খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি ততক্ষণ খেলা করুন।

বলেই দৌড় দিল জিনিয়া। ওয়াফিফ ও আর কোন উপায় না দেখে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

চলবে।

”নিরব সে”
#সাদিয়া_সৃষ্টি
৫ম পর্ব

–শুনুন।

এরপর বাকি কথা। জিনিয়ার কাছ থেকে এই ডাক ই শুনতে হচ্ছে ওয়াফিফকে। সে যে কাকে ”শুনুন” বলে ডাকছে সেটা দেখার জন্য বাকিরাও তার দিকে তাকায়। তাই প্রতিবার এমন হওয়ায় জিনিয়াও লজ্জায় লালে লাল হচ্ছে বার বার। জিনিয়া এই বাড়িতে সবার সাথে পরিচিত হলেও সবার সাথে এতোটা মিশে যায় নি যে নিজ থেকে সে কোন কথা বলবে। আর তাই সে এই বাড়িতে আসার পর থেকে কোন কিছু জিজ্ঞেস করার হলে ওয়াফিফকেই জিজ্ঞেস করে এসেছে। এমন কি সে আফিয়া রহমানের সাথেও এতো কথা বলে নি। কিছু করার হলে দেখে দেখে বুঝে নিয়েছে। কথা বললেও খুব কম। আর তাই সে এখনো বুঝতে পারছে না যে কি নামে ডাকলে শুধু ওয়াফিফ ওর দিকে তাকাবে। অন্যরা না। ওয়াফিফ ও কয়েকবার বলেছে তাকে নাম ধরে ডাকার জন্য।

ওয়াফিফ তখনই নিজের ঘর থেকে বাইরে চলে এসেছিল। কোলে দুইটা বাচ্চা। আর আশেপাশে বাচ্চার দল। কেউ কেউ ওয়াফিফের টিশার্ট খামচে ধরে ছিল। যেন ওয়াফিফ এই বাচ্চা টিমের লিডার। এভাবে দেখে সবাই হাসাহাসি করলেও এটা সত্য ওয়াফিফ এই পরিবারের সবচেয়ে বড় ছেলে। তাই ওকে সবাই যেমন ভয় পায়, তেমনি মেনেও চলে। ওয়াফিফের এক আলাদা সম্মান আছে এই বাড়িতে। নিজের ভাইবোন যেমন ওকে ভয় পায়, তেমনি ভাইবোনের বাচ্চারাও। কিংবা প্রতিবেশী বাচ্চারাও। তবে খুব ভালোও বাসে। আর ওয়াফিফ যেন সবার নেতা। হোক না এই বাচ্চা পার্টির ই নেতা। বাচ্চারা ওর পিছনে ঘুরে বেড়াত। প্রতিবেশী বাচ্চারা এমন বেশি করত। কারণ তাদের বাবা মা বলে দিয়েছেন –

”এই ভাইয়া ডাক্তার, সবসময় এর আশেপাশে থাকবে।”

বাচ্চারাও তাদের মাতার আদেশ মেনে নিয়েছে। কেউ এমনিই ঘুরে বেড়ায় পিছন পিছন তো কেউ টিশার্ট ধরে। ওয়াফিফেরও এইসবের অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। জিনিয়া এদের মাঝে ওয়াফিফের সাথে কথা কি করে বলবে সেটাই বুঝতে পারছে না। আগে তো তাও ঘরের মধ্যে ছিল, তখন যখন তখন ঢুকে কিছু জিজ্ঞেস করার থাকলে ওয়াফিফকে জিজ্ঞেস করা যেত। কিন্তু এখন সেটা সম্ভব না। এখন তার মনে হচ্ছে ওয়াফিফ ঘরে ছিল তখনই ভালো ছিল। একে তো ঘর ভর্তি মানুষ, তখন কার কি দরকার বা কার সাথে কেমন আচরণ করতে হবে কেমন না সেসব সম্পর্কে ওয়াফিফকে জিজ্ঞেস করতে পারছে না। কিংবা এই বাড়ির কোথায় কি আছে সেটাই জিজ্ঞেস করতে ডাকতে পারছে না। আর সে যদি অন্য কাউকেও জিজ্ঞেস করে তাহলে ”নিজে থেকে এইটুকুও খুঁজে নিতে পারছ না তো সংসার সামলাবে কি করে?” এই কথা শোনার ভয় আছে। আর বেশি কথা বললে ”নতুন বউ বাচাল” এই কথা কেই বা না শুনিয়ে থাকে।

এর মাঝে একবার ওয়াফিফকে ডেকেছিল তার খাবার কোথায় দিবে বা কখন দিবে এই কথা জানতে। তখন বলেছিল,

–ডাক্তার সাহেব?

ওয়াফিফ এই কথা শুনে যখন জিনিয়ার দিকে তাকায়, তখন অবাক হয়েছিল শেষ পর্যন্ত মেয়েটা ”শুনুন” কথাটা ছাড়তে পেরেছিল। সে হাসিমুখেই জবাব দিয়েছিল।

–হ্যাঁ?

তবে ওয়াফিফের অবাক হওয়ার কারণ সাধারণত মেয়েরা বিয়ের পর শুরুতেই এই নামে ডাকতে পারে সেটা তার জানা ছিল না। অন্যদিকে জিনিয়া তো এই নামে ডেকেছে কারণ তার মা শিখিয়ে দিয়েছি স্বামীর নাম ধরে ডাকতে নেই। আর তিনি আরও বলেছিলে ”ওগো” ”হ্যাঁ গো” এইভাবে ডাকতে। সরাসরি বলেন নি। শুধু বলেছিলেন- আমি তোর বাবা কে যেই ভাবে ডাকি সেইভাবেই ডাকবি।

জিনিয়া শুধু মাথা নাড়িয়েছিল। এই ওগো হ্যাঁ গো করার চেষ্টা সে হাজারবার করেও মুখ থেকে বের করতে পারে নি। কেমন এক অদ্ভুত অনুভূতি তাকে গ্রাস করেছিল। কান লাল হয়ে গরম হয়ে আসছিল। তাই ‘ডাক্তার সাহেব’ ডাকটাই তার কাছে বেশ সহজ মনে হয়েছিল। এটা বলা অপেক্ষাকৃত সহজ আর অন্যরাও কিছু মনে করবে না।


ওয়াফিফ নিজের ঘরের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। আর সাথে আছে চিরচেনা সাথী। সিগারেট। এটা খুব ভালো লাগে ওয়াফিফের। বিয়ে উপলক্ষ্যে সে এতদিন এই জিনিসটা থেকে দূরে ছিল। আজ বাড়িতে কোন মেহমান নেই। তাই তার এই সময়ে জ্বালাতন করার ও কেউ নেই। সিগারেট তার সাথী হয়েছে গত কয়েক বছরের। এখনও আছে। অন্তত মানুষগুলোর মতো ছেড়ে যায় না। শেষ হলেই আবার কিনে নিতে পারে। আর এইসব করে সে পরিবারের থেকে লুকিয়ে। নিজের সীমার মধ্যে থেকে। সে নিজে ডাক্তার। তবুও সিগারেট তার বন্ধু। সত্যিই পৃথিবী বড়ই অদ্ভুত।

ওয়াফিফের পরিবারে বিশেষ করে তার বাবা মা সিগারেট সহ্য করতে পারেন না। তাই ওয়াফিফ লুকিয়ে ধূমপান করে। প্রথমদিকে কষ্ট হলেও এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বাড়িতে থাকা হয় না তাই কেউ ঠিক জানেই না যে ওয়াফিফ সিগারেট ব্যবহাত করে। দিনের বেশিরভাগ সময় সে হাসপাতালে কাটায়। আর ফেরার পথে কোন এক ফাঁকা স্থানে এই সিগারেটের সাথে সময় কাটায়। বেশ ভালো কাটে এই সময় তার। সাথে থাকে সিগারেট আর কিছু স্মৃতি যেটা ভোলানোর জন্যই আফিয়া রহমান ওয়াফিফের বিয়ে দিয়েছেন।

তার সেই টানা টানা চোখ, লম্বা নাক আর পাতলা ঠোঁট, দেখলেই মনে হয় কত নাজুক। হালকা ছুঁয়ে দিলেও ক্ষত সৃষ্টি হবে। কত বছর দেখে নি তাকে ওয়াফিফ। তার ছবিও না। কোন যোগাযোগ রাখে নি। তবে যখন নিজেকে একেবারেই সামলাতে পারে না। তখন ১ টি বার দেখার জন্য ছুটে যায়। ঠিকানা জানা আছে। সে কোথায় থাকে সেটা জানে ওয়াফিফ। তার জন্য সে এতদিন বিয়ে করে নি। না, কোনো পিছুটান নেই। সে যাওয়ার আগে সব বন্ধন থেকে মুক্ত করে দিয়েছে ওয়াফিফকে। কিন্তু ওয়াফিফ এতদিন হয়তো নিজ ইচ্ছায় সেই বন্ধনে আটকে আছে। সম্পর্কের যেই জাল দিয়ে একেকটা স্বপ্ন বুনেছিল দুজনে মিলে, সেই জাল ছিঁড়ে দিয়েছে সে। ওয়াফিফ আর লাগাতে পারবে না চাইলেও। তবু সেই জাল ধরে রেখেছে সে। এই জালে কোন আশা নেই। সে ফিরে আসবে না। আছে হতাশা। কিন্তু সেই হতাশা নিয়েই আটকে আছি এতো বছর সে। কিছু তো ছিল। হোক সেটা হতাশা। কিন্তু তারী মা তাকে আটকে দিল।

ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল। মায়ের নাটক দেখা এজন্যই সে বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল।

এইতো গতকাল ঘরে আলোচনা চলছিল। সেটা বড়দের। গুরুজনরা জীবন নিয়ে বেশ কিছু মতবাদ দিচ্ছিলেন। আফিয়া বেগম যেই না বলতে শুরু করেছেন,

–জীবন মানে …

তার কথা শেষ করতে না দিয়ে ওয়াফিফ অন্যপাশে বসে থেকেই বলে উঠে,

–জীবন মানে জি বাংলা।

এতে সব ভাইবোনেরা হেসে ওঠে। তবে ওয়াফিফের এই রাগের ও কারণ আছে। এই জি বাংলাই তো যত কিছুর মূল। না এরা সব মায়েদের ব্ল্যাকমেইলের উপায় বলে দিত, আর না তার বিয়ে দেওয়ার জন্য আফিয়া বেগম সেই পন্থা অবলম্বন করতেন। ওয়াফিফের তো এখনো বিশ্বাস হয় না তার বিয়েতে রাজি হওয়ার বিষয়টা নাটকীয় হয়েছে, যেটা সে সহ্য পর্যন্ত করতে পারে না। আর এইসব নাটক দেখে দেখ তার মা বেশি বুদ্ধিমতী হয়ে উঠেছেন।

ওয়াফিফ কখনই এটা চায় নি। কিন্তু মায়ের কথা আর ফেলতে পারে নি। নাহলে আরও কি না কি বলে মগজ ধোলাই করতেন সেটা ওয়াফিফ ভালোই জানে।

সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে নিজের চিন্তা ভাবনা উড়িয়ে দিতে দিতে তার খেয়াল নেই কখন ঘরে জিনিয়া প্রবেশ করেছে আর তার পাশে এসেও দাঁড়িয়েছে।

জিনিয়া ওয়াফিফকে না দেখতে পেয়ে ঘরে এসে এক উটকো গন্ধ পায়। যেটা নাকে ভেসে আসতেই তার গা গুলিয়ে আসতে চায়। তাই সে ওয়াফিফের ঘরের বারান্দায় চলে আসে তাজা বাতাসের আশায়। কিন্তু এখানে এসে দেখে সেই উটকো গন্ধের সৃষ্টিকারী আর কেউ না বরং ওয়াফিফ নিজেই। তখন সে ওয়াফিফকে ডাক দেয়।

–শুনুন।

জিনিয়ার ডাকে সে চিন্তা ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে। অনেক রাত হয়েছিল আর জিনিয়া মায়ের সাথেই ছিল বলে সে বারান্দায় এসেছিল। সে তার মাকে চিনে। জিনিয়াকে দিয়ে বেশি কাজ করাবেন না তিনি। তাই জিনিয়ার মায়ের সাথে থাকা নিয়ে বেশি ভাবে নি ওয়াফিফ। বাকি ভাই ভাবি আর বোনেরা ঘুমিয়ে পড়েছে। আর বাবাও এই সময় ঘর থেকে বের হবে না দেখেই সে সিগারেট জ্বালিয়েছিল। কিন্তু জিনিয়ার কাছে এইভাবে ধরা পড়ে যাবে বুঝতে পারে নি সে। সাধারণত সে হাসপাতাল থেকে ফেরার পথেই একেবারে সিগারেট এর কাজ শেষ করে তারপর ভদ্র বাচ্চা হয়ে বাড়ি ফিরে। কিন্তু হাসপাতাল থেকে ছুটি নেওয়ায় আর মেহমানের চাপে এই কয়দিন একেবারে সিগারেট ধরে দেখা হয় নি। সেটাই ধরে দেখতে এসেছিল সে। ভেবেছিল জিনিয়া ফেরার আগেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু তার আগেই জিনিয়া চলে আসে। আবার জিনিয়া প্রেগন্যান্ট এই কথাটা মনে পড়তেই সে সিগারেট নিভিয়ে ফেলে। আর বলে,

–কিছু বলবে?

–আপনি সিগারেট খান?

–হ্যাঁ , মাঝে মাঝে। তবে বাসায় না। এই কয়দিন বাড়ির বাইরে বের হওয়া হয় না তাই আজ বাসায় এভাবে।

–ওহ।

ওয়াফিফ বিষয় ঘোরাতে বলে ওঠে,

–আচ্ছা জিনিয়া।

–জ্বি।

–তুমি আমাকে আবার ”শুনুন” বলে ডাকা শুরু করেছ? আমি তো তোমাকে বললাম আমার নাম ধরে ডাকতে। তুমি শুনুন বলে ডাকলে তোমার এই শুনুন এর উত্তরে কত মানুষ তোমার দিকে তাকাবে জানো? তার চেয়ে কত জন ছেলে তোমার দিকে তাকাবে? এটা কি ভালো?

–না।

–এটাই তো।

–তাহলে আমি আপনাকে কি বলে ডাকব?

–আমার নাম ধরে?

–না।

–কি না? পারবে না?

–না।

–তাহলে সেদিন ডাকলে না কি বলে যেন? হ্যাঁ, ডাক্তার সাহেব। এটা বলে ডেক। এছাড়া আমাদের বাড়ির কেউই ডাক্তার না। আমি তো জোর করে হয়েছিলাম। আর আমি সবার বড় দেখে আমাকে সবাই দেখত। ডাক্তার হতে গিয়ে অনেক পড়াশোনা করতে হয় এটা জানার পর আর কেউ ডাক্তার হতে চায় নি। তাই এই নামেই ডাকবে। ঠিক আছে?

–হুম।

–এখন যাও ঘুমিয়ে পড়।

জিনিয়া মাথা নেড়ে চলে গেল। ওয়াফিফ ও কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে ঘুমাতে চলে গেল।

চলবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here