নিরব সে,২৫শ পর্ব শেষ

নিরব সে,২৫শ পর্ব শেষ
সাদিয়া_সৃষ্টি

হাসপাতালের বেঞ্চে বসে আছে ওয়াফিফ। তার পাশেই বসে আছে আফিয়া রহমান। অন্যদিকে ফারহান রহমান সব দিক খেয়াল রাখছেন। ওটি থেকে ডাক্তার নার্স রা বের হলে তাদের থেকে খবর নিচ্ছেন। কি লাগবে না লাগবে সেটা দেখছেন। ওয়াফিফ নিজে কি করবে সেটা আদৌ বুঝতে পারছে কি না জানা নেই । সে নিজেই দ্বিধায় পড়েছে যেন কি করবে সেটা তার জানা নেই। আফিয়া রহমান নিজেকে দোষ দিচ্ছেন মনে মনে। তার ধারণা তিনি যদি সেদিন রাগ না করতেন তাহলে আজ আর জিনিয়া পড়ে যেত না , তার আগেই তিনি ধরে ফেলতেন। আগেরবার যেভাবে সুফিয়ার খেয়াল রেখেছিলেন, সেভাবেই জিনিয়ার খেয়াল রাখতে পারতেন। অন্যদিকে আফরান অফিস থেকে বের হতে পারে নি তখনও, তবে বলে দিয়েছে যে কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই চলে আসবে। সুফিয়া ভাবি বাসায় আসফিকে সামলাচ্ছেন । আরিফ, মিনা মিলা তখন কলেজ আর ভার্সিটিতে। তাই তারা তখনও কিছু জানে না।

আফিয়া রহমান ফোনে তখন জিনিয়ার চিৎকার শোনার পর দেরি না করে সরাসরি ওয়াফিফের ওই বাড়ির প্রতিবেশীদের ফোন করে সাহায্য চান। তারপর তিনি সরাসরি ফারহান রহমানকে সবটা জানান। তারা দুজনে মিলে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বের হন। এর মধ্যে ফারহান রহমান ওয়াফিফকে ফোন করে সবটা জানালে ওয়াফিফ গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা হাসপাতালে চলে আসে। আর আসার পর ডাক্তারের সাথে কথা বলে সেই যে বসেছে, আর ওঠে নি। যেন পাথর হয়ে গিয়েছে। কিছু বুঝতে পারছে না। আফরান বাবার সাথে কথা বলতে ফোন করেছিল। তখন জানতে পারল কি হয়েছে। আর সুফিয়া আসফির সাথে বাসায় থেকে গেল।

জিনিয়াকে দেওয়ার সময় কেউ একজন তার ফোন ও নিয়ে এসেছিল, কারণ তখন সেই ফোনটা অনবরত বেজে চলেছিল। সে হাসপাতালে আফিয়া রহমানকে দেখে সেই ফোনটা দিয়ে দেন। সেটা হাতে ধরেই আফিয়া রহমান বসে আছে। ফারহান রহমান স্ত্রীর এই অবস্থা দেখে তার কাছে গিয়ে তাকে ওয়াশরুমে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে নিতে রাজি করান। আফিয়া রহমান ওয়াশরুমে গিয়ে হাত পানি দিয়ে ভেজানোর সময় খেয়াল করেন তার হাতে জিনিয়ার ফোন। তিনি কোথায় রাখবেন বুঝতে না পেরে এদিক ওদিক তাকান। শেষে বেসিনের পাশে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু হাতে চাপ লেগে ফোনের ভয়েস রেকর্ডার অন হয়ে যায়। যেটা জিনিয়া তখনও বন্ধ করে নি। তিনি অবাক হয়ে যান লিস্টে একেকটা নাম দেখে।

-ডে ওয়ান

-ডে টু

-ডে থ্রি

-ডে ফোর

………………

-ডে টুয়েন্টি থ্রি

এটা দেখে তিনি অবাক হন। শেষেরটা কয়েক ঘণ্টা আগেই সেভ করা হয়েছে। তিনি কৌতূহলবশত সেটা চালান। আর সেখানে প্লে হতে থাকে জিনিয়ার বলা কথা গুলো।

তিনি সেটা বন্ধ করে একেবারে প্রথমটা চালান। তার কানে ভেসে আসে জিনিয়ার আওয়াজ।

”আজ না মা আমার উপর রাগ করেছেন। কিনতি তাকে ছেড়ে এখানে আসার পর থেকে আমি ভীষণভাবে মিস করছি। কিন্তু এখানে আমার অনুভূতি বলার মতও কেউ নেই। কাউকে বলতে পারব না। অনেক আগে থেকেই ভয়ে ছিলাম। রোজ ভয় পেতাম। বেশ কয়েক বার সব বলার চেষ্টাও করেছিলাম। কিন্তু পারি নি। যেখানে এক গ্লাস পানি চাইতে গিয়েও আমি ১০ বার ভাবি সেখানে এসব বলতাম কি করে? খুব ইচ্ছে করছিল কথাগুলো বলার বা লেখার। কিন্তু ডাক্তার সাহেব এমনিই অনেক কষ্ট করছেন আমার জন্য, আমি তাকে আর কষ্ট দিতে পারব না। অন্যদিকে লেখার কিছুও নেই। কাল থেকে বরং উনাকে বলে একটা ডাইরি নিয়ে আসব, তারপর সেখানে লিখব। কিন্তু খুব খারাপ লাগছে। ………………”

পুরোটা শোনা শেষ করে তিনি আবার পরেরটা চালু করেন , আবার জিনিয়ার নতুন কথা শুরু হয়,

”উনাকে বলেছিলাম, কিন্তু উনি এনে দেন নি ডায়েরি, তাই আজ আবার সব রেকর্ড করছি। মাকে ফোন ও করতে পারছি না। তাই ভাবছি তাকে বলতে চাওয়া সব কথা এখন থেকে রেকর্ড করে রাখব। লিখতেও আলসেমি হয় অবশ্য। কিন্তু আমার না কেন জানি খুব ভ্য হচ্ছে, মনে হচ্ছে আমি আদৌ মায়ের সাথে আর দেখা করতে পারব কি না। একটা অন্যরকম অনুভূতি আসছে যে কিছু একটা হবে। জানি না।”

বলেই বোকার মতো হাসল জিনিয়া। সেটা শুনে আফিয়া বেগম আরও ভেঙে পড়লেন। এর পরের গুলো শুনলেন তিনি, সেগুলোতে সারাদিনে জিনিয়া কি কি করত, নিজের অনুভূতি এসবই রেকর্ড করে রেখেছে। সেসব শুনে আফিয়া রহমান কাঁদতে শুরু করলেন।

তিনি সত্যিই এমনটা চান নি। কিন্তু তিনি কি করবেন বুঝতে পারছিলেন না। প্রথমবার যখন তিনি এসব জানতে পারেন, তখন খুব রাগ হয়েছিল। মনে হয়েছিল জিনিয়া ভুল। কিন্তু ওয়াফিফের কথায় তার ধারণা বদলে যায়। তবুও এতো বছর ধরে এমন কাজকে ভুল বলে জেনে এসেছেন। তাই মানতে পারেন নি যে তার পরিবারে এমন কিছু হবে। তিনি তখন ভাবছিলেন যে এসব ভুল, এটা মেনে নেওয়া ঠিক না। অবশ্য অনেক বছরের চিন্তাধারা তো আর এক দিনে পরিবর্তন হওয়ার নয়। কিছুটা সেরকম ঘটে তার ক্ষেত্রে। তিনি ওয়াফিফের কথায় বুঝতে পারেন জিনিয়ার ভুল ছিল না কিন্তু নিজের এতদিনের চিন্তা ধারাকে প্রাধান্য দিলেন। কারণ তখন মন মানতে নারাজ। ধীরে ধীরে তাকে যখন সবাই মিলে বোঝাতে থাকে তখন তার রাগ ও আস্তে আস্তে কমে যায়। কিন্তু তখন মনে যোগ হয় এক আলাদা অনুভূতি। কি করে তিনি নিজের ছেলের সামনে দাঁড়াবেন সেটা বুঝতে পারছিলেন না। তার মনে হচ্ছিল তিনি একটা মস্ত বড় ভুল করেছেন, আর তাই তিনি অন্যের সামনে দাঁড়াতে পারবেন না। সেই চিন্তা থেকেই অনেক দোটানায় ভুগেছেন। জিনিয়ার সামনে দাঁড়ালেও কি দিয়ে কথা শুরু করবেন সেই নিয়েও ছিল আরেক চিন্তা। কিন্তু ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করছিলেন। প্রথমবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ায় কি প্রতিক্রিয়া দেওয়া উচিত সেটাই ভাবছিলেন। কিন্তু তিনি জিনিয়াকে ঘৃণা করেন নি। হয়তো একটু রাগ আর অভিমান করেছিলেন, তাকে না বলার জন্য। এর মাঝেই অনেকটা সময় কেটে যায়। তিনি যখন হাসপাতালে আসলেন তখন জিনিয়াকে ওটি তে ঢোকানো হচ্ছিল। তিনি জিনিয়ার হাত ধরলে জিনিয়া অনেক কষ্টে বলেছিল,

”আমার যাওয়ার পর উনার খেয়াল রাখবেন, মা। সাথে আমার বাচ্চাকেও মেনে নিয়েন।”

আফিয়া রহমান কোন জবাব দিবেন তার আগেই তাকে রুমে ঢোকান হয় আর বাকিদের আটকে দেওয়া হয় বাইরে। তিনি মনে মনে তখনও ভেবে জাচ্ছিলেন জিনিয়ার কথার উত্তরে কি বলতে হবে।

তবে তার বেশি খারাপ লাগছিল ওয়াফিফকে পাথরের মতো বসে থাকতে দেখে। আফিয়া রহমান হাত মুখ ধুয়ে শক্ত হয়ে বাইরে ফিরলেন আর ওয়াফিফের পাশে বসে তার মাথায় হাত রাখলেন। ওয়াফিফ তার দিকে তাকালে তিনি বললেন,

–কিছু হবে না, সব ঠিক হয়ে যাবে।

ওয়াফিফ তখন মাকে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে। সে কেন কাঁদছে, নিজেও জানে না, কিন্তু তার খুব ভয় করছে। জিনিয়াকে হারিয়ে ফেলার ভয়। সে জিনিয়াকে হারাতে চায় না। তাদের সম্পর্কটা হয়তো সত্যিই ভালোবাসার থেকেও বেশি কিছুর।

কয়েক ঘণ্টা পর ওয়াফিফ সুখবর পায়। তার মেয়ে হয়েছে। আর সেটা জানার পর থেকে আফিয়া রহমানের মুখ থেকে হাসি সরছেই না, যেন তার ছেলের বউয়ের না, তার মেয়ে হয়েছে। ওয়াফিফ বাচ্চার খোঁজ খবর নেওয়ার আগে তার মায়ের সম্পর্কে সম্পূর্ণ তথ্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। সবটা জানার পর বাচ্চার সব খবর নেয়। আফিয়া রহমানের কোল থেকে অন্য কেউ মেয়েকে নিতেই পারছে না। ততক্ষণে আফরান, আরিফ, মিলা আর মিনাও চলে আসে। মিলা আর মিনা মাকে অনেক বলেছে, তারা বাবুকে কোলে নিবে। কিন্তু তিনি দিলে তো। আরিফ ও যোগ দিয়েছে। আর উত্তরে তিনি একটা কথা বলে রেখে দিয়েছেন।

”মিলা আর মিনাকেই দেই নি, আর তোকে দেবো? তুই তো ধরতেও পারবি না, যাহ্‌, আগে ১ বছর বাচ্চাকে কোলে কিভাবে ধরে সেটার কোর্স করে আয়, তারপর আমি পরীক্ষা নিয়ে ভেবে দেখব। যা।”

বলেই তিনি আবার বাচ্কেক নিয়ে সারা হাসপাতাল হেঁটে বেড়ানো শুরু করলেন। মেয়ে চেহারা আর গুণ, দুই দিক থেকেই মায়ের মতো হয়েছে। শান্তশিষ্ট। ওয়াফিফ নিজের চোখে জিনিয়াকে দেখার পর শান্ত হয়ে মেয়েকে একবার কোলে নিয়েছিল। কিন্তু আফিয়া রহমান তার কাছ থেকে নিজে নিয়ে নেন। আর বলেন,

–তুই ধরতে পারবি নাকি? আমাকে দে, দরকার হলে তুই আরিফকে কোলে তোল। ও পড়ে গেলে সমস্যা নেই। কমন সেন্স এর ঘর তো তোর ফাঁকা। নাহলে ঘরে প্রেগন্যান্ট বউকে একা ফেলে যায় নাকি।

সেবার মায়ের কাছে প্রথমবার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল ওয়াফিফ, তাও মেয়ের সামনে। মেয়ে তাদের কথা না বুঝুক, কিন্তু শুনেছে তো।



২৫ বছর পর,

আজ ওয়াজদিয়ার বিয়ে, ওয়াফিফ আর জিনিয়ার ছোট মেয়ে। ওয়াজদিয়ার বড় বোন ওয়াসিফা আনিকা রহমান সেজন্য এদিক সেদিক ঘুরে ঘুরে ঘর সাজাচ্ছে। আর ওর পেছন পেছন ঘুরছে ওয়াসিফার বর রাহিত রাইহান আর ছেলে রাফিন রাইহান। রাফিন হাঁটতে শিখেছে দেখে বাব মায়ের পিছন পিছন দৌড়ে বেড়াচ্ছে। ওয়াজদিয়ার বিয়ে হওয়ায় আবার সবাই মিলে আনন্দ করছে। আফরান আর ওয়াফিফ বসে বসে গল্প করছে। আরিফ ও তাদের সাথে বসে আছে কাজ করবে না বলে। কিন্তু বাকি বাচ্চাদের কি করতে হবে না হবে নির্দেশনা দিচ্ছে। যদিও কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না তাতে। বাড়ির বউইয়েরা অন্য সব কাজ সামলাচ্ছে ঘরের ভিতর। সুফিয়া ভাবি আর আরিফের বউ সামান্তা দুজনেই রান্না ঘর সামলাচ্ছে। সাথে যোগ দিয়েছে মিনা আর মিলা। মিলার বর আসিফ আর তাদের মেয়ে ফিমা, মিনার ছেলে নাফি, আরিফের ছেলে সারিফ আর আসফি, সবাই মিলে বাড়ি সাজানো সহ অন্যসব দেখছে। আর অন্যদিকে ৩ ভাই মিলে ছাতার ইচে চেয়ারে বসে ম্যাঙ্গো জুস খাচ্ছে। কোক চেয়েছিল, কিন্তু কেউ কাজ করছে না বলে আর এনে দেয় নি। যেটা এনেছে সেটা জারিফ কে ঘুষ দিয়ে আনানো হয়েছে। জারিফের সাথে মিনার বিয়ে হয়ে গিয়েছে।

সব গুলো পিচ্চির নাম রেখেছেন আফিয়া রহমান। (ভুল কথা, আমি রাখছি – লেখিকা) আর সবার মধ্যে আসফি আর ওয়াসিফা এই দুজনে আফিয়া রহমানে সবচেয়ে আদরের। আজ পর্যন্ত পরিবারের সদস্য দের মধ্যে ওরা ছাড়া আর কেউ জানে না যে ওয়াসিফা ওয়াফিফের মেয়ে না। কিন্তু মেয়ে চরিত্রের দিক থেকে পুরোই ওয়াফিফের কার্বন কপি।

লেখা শেষ করে জিনিয়া ডায়েরি টা বন্ধ করল আর সেটা আলমারিতে রেখে দিল। নিজের চশমাটা ঠিক করে টেবিলে রাখতেই আসফির ডাক পড়ল,

–জিনি চাচি, মা ডাকছে।

জিনিয়াও হেসে কাজ করতে নেমে গেল।

বিকালে সব অতিথিদের সাথে কথা বলতে বলতে খেয়াল করল জাবির ও এসেছে। সাথে তার বউ আর ছেলে জিসান। ওয়াফিফ ওদের আমন্ত্রণ দিয়েছিল বুঝতে পারার পর জিনিয়ার মুখে হাসি ফুটে উঠল। জাবিরের সাথে আর অন্যদের সাথে কথা বলার সময় জিনিয়ার পাশ থেকে বলে উঠল একজন,

–জিনি আমি আজও ক্রাশিত।

সারিকা আপুর আওয়াজ পেয়ে জিনিয়া হেসে তার সাথে কুশলাদি বিনিময় করল। ওর পাশ থেকে শিশির বলে উঠল,

–তোমার এই দিয়ে কয়টা ক্রাশ হল বলতে পারবে?

–আমি তো গুনি নি, ওগো, তুমি গুনেছ?

পিছন থেকে তাদের ছেলে সীমান্ত এসে বলল,

–অনলি ৩০৭৮ বাবা। নোট মোর দ্যান দ্যাট।

জিনিয়া তাদের কথায় হেসে উঠল। সীমান্ত জিনিয়াকে জড়িয়ে ধরে সালাম দিয়ে বলল,

–হেই খালামনি, কেমন আছো? বলেছিলাম তো আমার জন্যও একটা মেয়ে খুঁজে দেও। বাট তার আগেই ডবিয়ে দিয়ে দিলে। এমনকি সিফা আপুরও বিয়ে হয়ে গেল। হোয়াই এম আই সিঙ্গেল ইয়েট? আই ওয়ানা ম্যারি টু। মম নিডস এ হেল্পিং হ্যান্ড। আর মায়ের ক্রাশ সংখ্যা গোনার দায়িত্ব ও তো কাউকে দিতে হবে।

জিনিয়া হেসেই জবাব দিল,

–ওকে বাবা, আমি তোমার খালুকে বলে দিব। ডান?

–ডান।

বলেই থাম্বস আপ দেখাল সীমান্ত। তারপর সেও চলে গেল ভাই বোনদের ভিড়ে।

রাতে,

নিজের ঘরে বসে সব গয়না খুলছে জিনিয়া। কিছুক্ষণ আগে ওয়াজদিয়ার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। তার চোখে পানির অস্তিত্ব তখনও পাওয়া যাচ্ছে। তবু নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করছে। তারপর সে আবার জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। কি সন্দর ভাবে জীবন চলছে তার! সাথে ওয়াফিফ তো আছেই। ২৫ বছরে কোন ফাটল ধরেনি তাদের সম্পর্কে। ওয়াফিফ সব সময় জিনিয়াকে আগলে রেখেছে। সাথে পুরো পরিবারকে। কোন সমস্যা হলে সমাধান করে দিয়েছে। মাও আর রাগ করে নি। আর এখন তার ২ মেয়ের বিয়েও হয়ে গিয়েছে। সে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকল।

ওয়াফিফ পিছন থেকে এসে জিনিয়ার দিকে কতক্ষণ তাকিয়ে থাকল। ৫০ বছর বয়সী এই মেয়েটাকে সে এখনো সবচেয়ে সুন্দরি মেয়ে হসেবেই গণ্য করে। চাঁদের আলোয় তার সেই প্রথম দিনের কথা মনে পড়ে গেল। সে জিনিয়াকে তুলে ধরতে গেলে নিজের কোমর ভাঙতে পারে এই ভেবে ভাবল সেদিনের মতো করে ভয় দেখাতে না পারলেও অন্য কিছু করবে। তাই জিনিয়ার পিছনে দাঁড়িয়ে জিনিয়ার পিঠের একটা খোঁচা দিল। তারপর এক হাত দিয়ে নিজের নাক চেপে ধরে বলল,

–এই মেয়ে, মনে আছে? আমি সবার পিঠা কাকু। আজ তোর জন্য পিঠা বানিয়েছি। খাবি নাকি? খেতে হলে এই তালগাছের একেবারে উপরে চলে আয়।

বলেই জিনিয়ার গলা জড়িয়ে ধরল ওয়াফিফ। ওয়াফিফ কিছুক্ষণ আগে হাত ধুয়ে এসেছিল। তাই ওর ঠাণ্ডা হাত জিনিয়ার গলায় পড়তেই সে কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠল,

–পিঠা কাকু, তুমি এই ২৫ বছর পর আবার সাপ হয়ে আমাকে ছোবল মারতে এসেছ? কিন্তু আমি তো খেয়েছি। আমার পেট ভরা। অন্য কোনোদিন পিঠা খাবো।

–আমি দেখেছি, তুই কিচ্ছু খাস নি। তাই এখন পিঠাই খাবি।

–না না

–হ্যাঁ হ্যাঁ

–না

–হ্যাঁ খাবি। আর শোন তোর পেছনে এখন তোর পিঠা কাকু না, তোর বুড়ো বর ডাক্তার সাহেব দাঁড়িয়ে আছে।

–ডাক্তার সাহেব? আপ্নিইইই?

–এতক্ষণে বুঝলে?

–আপনি আবার আমাকে বোকা বানিয়েছেন?

–নাহ, আমি তো এখন আসলাম। দেখলাম তুমি কার সাথে কথা বলছ। তাই তোমাকে ডিস্টার্ব না করে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম।

–যান, আপনার সাথে আমার কথা না।

–ওয়াও জিনিয়া, ফাইনালি তুমি আমাকে জান বলে ডেকেছ? আই এক সো হ্যাপি জানু, জিনিয়াজানু, আলাবু।

–সত্যিই বুড়ো হয়ে গিয়েছেন।

–ওয়েট, আমি জাস্ট ৫৭ অনলি। বুঝেছ? এখনো হাসপাতালে আমার উপর কত মেয়ে ক্রাশ খায় জানো?

–তাহলে যান না, ওদের কাছে।

–তুনি আবার আমাকে ‘জান’ বলে ডেকেছ? আলাবু আবার আমার দুই বাবুর আম্মু।

–আপনি আমাকে জ্বালানো ছাড়বেন না?

–না গো।

বলেই দুজনে কিছুক্ষণ চুপ থেকে একসাথে হেসে উঠল।

।।সমাপ্ত।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here