কিছু_মেঘ_কিছু_বৃষ্টি,পর্ব-০৩

কিছু_মেঘ_কিছু_বৃষ্টি,পর্ব-০৩
কাহিনী ও লেখা : প্রদীপ চন্দ্র তিয়াশ

–এটা চোখের সামনে কাকে দেখছি আমি।একে দেখতে তো হুবহু প্রশংসার মতো…কিন্তু ও এখানে এলো কিকরে….??
মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বেকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিলো,সেটা আমাকে আরো হতবাক করে দিলো…কারণ এমন হাসি আমি শুধু একটা মানুষকেই দিতে দেখেছি আর সে হলো আমার মৃত স্ত্রী প্রশংসা…..

আমার অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণে সবাই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।

—কি হলো বাবা,ঠিক আছো তো তুমি…
(মেয়েটার মা আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে)

—না না আমি ঠিক আছি,আসলে একটু অন্যমনস্ক ছিলাম তাই হাত থেকে গ্লাসটা পড়ে গিয়েছে।এক্সট্রেমলি সরি…প্লিজ কিছু মনে করবেন না।

—না,কোনো ব্যপার না।তুমি আরাম করে বসো…আচ্ছা তোমরা দুজন চাইলে কিন্তু বাইরে গিয়ে কথা বলতে পারো।

ভদ্রমহিলা ঠিক কথাই বলেছেন।এটা আমার জন্য আরো অনেক বেশী দরকার।এই মেয়েটার সাথে প্রশংসার এতো মিল কিকরে হয় এটা জানতে হবে আমাকে।আর তার জন্য এর থেকে একান্তে কথা বলা একান্ত আবশ্যক।

—আচ্ছা,ঠিক আছে।আমার মনে হয় সেটাই ভালো হবে….

—-তোমরা তাহলে ছাদের বাগানে গিয়ে কথা বলো।দেখবে মনটাও ফ্রেশ হয়ে যাবে।

আমি মেয়েটার সাথে ওদের ছাদের বাগানে গেলাম।নানা রকম ফুল আর ফল গাছ দিয়ে ছাদটা বেশ সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। প্রথমেই আমি মেয়েটাকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করি….

—-আচ্ছা আপনার নামটা কিন্তু এখনো জানা হলো না,,

—আপনিও কিন্তু আপনার নাম বলেননি আমায়,যদিও আমি জানি আপনার নাম…

আমার নাম জানে মানে,ইনি কিকরে আমার নাম জানেন।আর সবথেকে বড় কথা এর কন্ঠস্বর অবাক করে দিলো আমায়।হুবহু প্রশংসার কন্ঠস্বর।দুটো মানুষকে দেখতে এক রকম হতেই পারে,কিন্তু তাই বলে তাদের কন্ঠস্বর।হাসির ধরন,এতো মিল কিকরে থাকতে পারে।

—কি হলো এতো কি ভাবছেন সংকেত সাহেব…?

—আমার নাম সংকেত আপনি জানলেন কিকরে!

—মায়ের কাছে শুনেছি।আপনারই তো আগেই আমাদের এখানে আসার কথা ছিলো,তাই না।

(মেয়েটার উত্তর টা কেমন জানি মনে ধরলো না আমার)

—আচ্ছা,এবার আপনার নাম বলুন,

—আমার নাম প্রকৃতি!!

—শুধুই প্রকৃতি,আর কোনো নাম আছে কি…?

—নাহ,এই একটাই নাম আমার।বাই দ্যা ওয়ে আপনার নামটা ভীষণ সুন্দর,আর আনকমনও বটে।

আমি জানি না এই মেয়েটা সত্যি বলছে নাকি মিথ্যে বলছে।তবে এই মূহুর্তে একে শুধু চেহারা আর কন্ঠস্বরের ভিত্তিতে সন্দেহ করতে পারি না আমি।তাছাড়া আমি প্রশংসাকে সেদিন রাতে নিজের হাতে খুন করেছি।পরেরদিন সকালে ওর লাশ দেখেছি নিজের চোখে।এতকিছুর পরে কোনো মানুষের ফিরে আসা সত্যিই অসম্ভব।হয়তো আমার সাথে যা ঘটছে সবটাই কাকতালীয়।আর আমি যা ভাবছি আমার মনের ভুল ছাড়া কিছু নয়।

—-আপনি কি এতো ভাবছেন বলুন তো,তখন থেকে লক্ষ্য করছি।

—না,তেমন কিছু ভাবছি না।

—দেখো….তোমার চেহারা কিন্তু সেই কথা বলছে না।আমাকে মিথ্যে বলে কোনো লাভ নেই…

মেয়েটার কথা শুনে আমি ওর দিকে হা করে তাকিয়ে রইলাম।সে আমাকে তুমি করে সম্বোধন করাতে বেশ লজ্জিত হয়ে পড়লো।

—সরি,আপনাকে তুমি করে বলে ফেললাম….কিছু মনে করবেন না।

—নাহ!সব ঠিকঠাক থাকলে আপনি ওয়াইফ হতে চলছেন আমার।এইটুকু রাইট আছে আপনার।

প্রকৃতির সাথে যতো বেশী কথা বলছি ততই অবাক হচ্ছি…মনে হচ্ছে এর সাথে আগেও বহুবার কথা হয়েছে আমার।যাই হোক,সেদিনের মো ঐ বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসলাম।তারপর সোজা নিজের বাসায়….দীর্ঘপথ জার্নি করার কারণে বেশ ক্লান্ত লাগছে।তাই আর চেঞ্জ না করেই বিছানার ওপরে হাত পা ছড়িয়ে দিলাম।মাথার ওপরে পাখাটা ঘুরছে….
একদৃষ্টিতে সেই দিকে তাকিয়ে আছি আমি…

হঠাৎ এর দিকে চোখ পড়লো আমার।ওপরেই একটা ডায়েরী রাখা।প্রশংসা অবসর সময় পেলেই ডায়েরী লিখতো।যদিও আমি কখনো দেখিনি ওর লেখা।আর সেটা উচিতও হতো না।আজকে যেহেতু প্রশংসা আর এই পৃথিবীতে বেঁচে নেই,তাই ওর ব্যক্তিগত জিনিসে হাত দিতেও বাঁধা নেই আমার।বিছানা থেকে উঠে ডায়েরীটা দিকে এগিয়ে গেলাম।তারপর হাতে নিয়ে একে একে পৃষ্ঠাগুলো উল্টিয়ে দেখতে লাগলাম।

ভেতরে কয়েকটা স্মৃতিচারণ আর কবিতা ছাড়া আর কিছুই লেখা নেই।হঠাৎ একটা অদ্ভুত বিষয় প্রত্যক্ষ করি আমি।ডায়েরীর শেষের পৃষ্ঠায় একটা তারিখ লিখে রাখা হয়েছে।”২০-১০-২১ ইং রাত ১১ টা।”!!

এটা তো সেই তারিখ যে তারিখে প্রশংসাকে খুন করেছিলাম আমি।আশ্চর্য ব্যপার!ও ঠিক এই তারিখটার কথাই বা কেন লিখে রেখেছিলো ডায়েরীতে।মাথাটা যেন ভন ভন করে ঘুরতে লাগলো আমার।বুঝে উঠতে পারছি না কিছুই।আচ্ছা কোথাও এমনটা নয় তো,প্রশংসা যেন গিয়েছিলো আমি মার্ডার করতে চলেছি ওকে?কিন্তু সেটা কিকরে সম্ভব।যদি তা হয়েও থাকে রাত এগারোটার কথা কেন লিখলো,আর ওকে খুন করার সুযোগই বা কেন দিলো আমায়, যদি সব জেনেই থাকবে।ঐ রাতে এগারোটার সময়ে কি এমন ঘটার কথা ছিলো….?কিন্তু তার আগেই আমি প্রশংসাকে শেষ করে দিয়েছিলাম।তবে কি ও অন্য কিছু ভেবে রেখেছিলো সেইরাত নিয়ে।আর ঠিক সেই কারণে আমাকেই যেচে বলেছিলো ওকে বাইরে নিয়ে যাবার বার জন্য।একটা কাজ করি বরং গাড়ির ভেতরে গিয়ে দেখি যদি কোনো ক্লু পেয়ে যাই…শেষবারের মতো আমাদের গাড়িতেই সময় কেটেছিলো।হয়তো গাড়িতে এমন কিছু আছে যা ঐ রাতে ও ব্যবহার করতে চেয়েও করতে পারে নি।যদি তাই হয়ে থাকে তবে সেই জিনিসটা গাড়িতেই থাকার কথা।ডায়েরীটা হাতে নিয়ে গ্রাউন্ড ফ্লোরের দিকে ছুটে গেলাম।ওর সিটের আশেপাশে খুঁজতে থাকি…

খুঁজতে খুঁজতে কিছুক্ষণ পরে যে দৃশ্য দেখলাম নিজের চোখে পুরো তাজ্জব করে দিলো আমায়।ওর সিটের ফাঁকা জায়গার ভেতরের দিকে একটা পিস্তল লুকিয়ে রাখা।পিস্তলের সাথে একটা মোটা কাগজ।কাগজটায় লাল কালি দিয়ে লেখা :

“বাই বাই,মিস্টার সংকেত চৌধুরী।আজ স্ত্রী হয়ে তোমাকে খুন করতে হচ্ছে আমায়,যেটা আরো দশ বছর আগে করা উচিত ছিলো।পারলে ক্ষমা করে দিও!”

তার মানে সেদিন রাতে প্রশংসা খুন করতে চেয়েছিলো আমায়!!!😱আর সেটা ওর পূর্বপরিকল্পনা ছিলো।সেই কারণে ডায়েরী রাত এগারোটার কথা উল্লেখ করা আছে,আর এখানে লুকিয়ে রাখা পিস্তল আর চিরকুট!কিন্তু আমাকে খুন করতে চাওয়ার কি এমন কারণ থাকতে পারে প্রশংসার কাছে…রাগ তো ওর ওপরে ছিলো আমার আমাকে সন্তান না দিতে পারায়,যা আমি কখনোই ওকে আমার আচরণে বুঝতে দেইনি।আমার সাথে কি এমন শত্রুতা ছিলো ওর,যার সূত্রপাত দশ বছর অর্থাৎ আমাদের বিয়েরও আগের।তাহলে কি প্রশংসা সত্যিই মরে নি,প্রকৃতি নামের মেয়েটাই….??

কথাগুলো ভাবতেই যেন বুঁকটা কেপে উঠলো আমার।এক অজানা ভয়ে হাত পা ক্রমশ ঠান্ডা হয়ে যেতে লাগলো….এ কোন রহস্যের জালে জড়িয়ে গেলাম আমি….

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here