আলো-৭,০৮

আলো-৭,০৮
রোকেয়া পপি
০৭

ওরা যখন খেতে বসছে, আলোর দেওয়া ফোনটা তখন বেজে উঠলো।
দুজনেই চমকে তাকালো ফোনের দিকে।

আলো দ্রুত খাওয়া রেখে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো কোন নাম আসেনি।
সে খুব দ্রুত সুইচ অফ করে সিমটা বের করে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেললো।

মন্টু মিয়া আলোর কাজ কর্ম দেখে অবাক হয়ে বললো, কি করছিস মা?
আমি তো বললাম আমার ফোনের দরকার নেই।
শুধু শুধু ঝামেলা করিস না তো।

আলো ফোনটা রেখে খুব স্বাভাবিক ভাবে আবার খেতে বসলো।
ভাবটা এমন যেন ও কোন কথা শুনতে পায়নি।
কিন্তু মনে মনে মামার ওপরে খুব বিরক্ত হলো।
দুই দিনেই এতো চেন্জ দেখে।

আলো বিদায় নেওয়ার আগে ব্যাগ থেকে বাবার দেওয়া টাকা গুলো বের করে বালিশের নিচে রেখে দিলো।

মন্টু মিয়া তার দূর্বল শরীরে চি চি করে বললো, আবার কি করছিস।

একদম চুপ।
তুমি বড্ডো বেশি কথা বলতে শিখেছো।

আমি এখন যাই।
ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করো।
আবার জ্বর বাড়লে অবহেলা করো না। একটু ডাক্তারের কাছে যেও।

কথাগুলো বলতে বলতে আলোর চোখে পানি চলে আসলো, গলার কাছে কেমন যেন একটা শক্ত কিছু দলা পাকিয়ে উঠলো।
সে অন্য দিকে ঘুরে চোখের পানি মুছে এক ছুটে বেরিয়ে গেল।

আলোর মনটা আজ খুব খারাপ। রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি। মন্টু মামাকে দেখে আসার পর থেকে বুকের মধ্যে কেমন যেন থম ধরে আছে।
অথচ হবার কথা ছিল উল্টো।
ওর ধারণা ছিল মামার সাথে দেখা করার পর ওর মনটা ফুরফুরে হয়ে যাবে।
ও নতুন পরিবেশটা সুন্দর ভাবে মানিয়ে নিবে।

তবে রাতে যখন রন্জু ভাইয়া ফোন করে কথা বললো, তখন কিছুটা সময়ের জন্য খুব ভালো লাগছিল।
ওর মন খারাপের কারণ জানতে চাইলো।
আলো তো খুবই অবাক!
একটা মানুষ ফোনের ওপর প্রান্ত থেকে মুখ না দেখে শুধু মাত্র কন্ঠ শুনে বুঝে ফেলতে পারে যে আমার মন খারাপ!

কি সুন্দর করে বললো, চলো কাল আমরা দেখা করি।
দেখো বাইরে ঘুরলে তোমার মন ভালো হয়ে যাবে।

আলো আর না করতে পারেনি।
কারণ আলোর খুব ইচ্ছে করছে তার রন্জু ভাইয়ার সাথে সময় কাটাতে।

ও আড়মোড়া ভেঙে বেলকোনিতে এসে দাঁড়ালো।
মাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
মিষ্টি একটা ঠান্ডা বাতাস বইছে।
সে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলো তার বাবা এই ভোর বেলা বাগানে বসে আছে।

আলো বাবা বলে চিৎকার দিয়ে এক ছুটে নিচে নেমে আসলো।
ছোট বাচ্চাদের মত পেছন থেকে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বললো, বাবা এতো সকালে তুমি বাগানে।
রাতে ঘুম হয়নি?

হয়েছে মা। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। এখন আর চাইলে ও ঘুম আসবে না। তাই নিচে নেমে আসলাম।

তোর ঘুম হয়নি?
তুই এতো সকালে উঠছিস কেন?

না বাবা আজ আমার ভালো ঘুম হয়নি।
একটা দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেলো।

কি দুঃস্বপ্ন?
একটা রাক্ষস তোকে তাড়া করছে?

আলো হালকা হাসলো।
কিছুই বললো না।

ও যে দুঃস্বপ্ন দেখে তা খুব গোপন।
এই স্বপ্ন কাউকে বলা যায় না।
মন্টু মামাকে না, মাকে না , বাবাকে তো নাই।
প্রিয় কোন বান্ধবীকে ও বলা যায় না।
ও যতো বড়ো হচ্ছে, ওর ততো গোপন কথা বাড়ছে।
যেমন ছোট বেলায় ও যখন প্রকৃতির ডাকে বাইরে বের হয়েছিল, তখন ওর মুখ চেপে ধরে টানতে টানতে
না ও এসব কথা মনে করতে চায় না।
ভুল করে ও না।
এসব কথা ভাবলেই ওর চোখে পানি চলে আসে।
যেমন এখন ওর চোখ ভিজে উঠতে চাইছে।

মবিনুর রহমান স্নেহের পরশ বুলিয়ে বললো, কি হয়েছে?
আমার রাজ কন্যার মনটা এতো খারাপ কেন?

কিছু হয়নি বাবা।
তুমি চা খাবে?

খাওয়া যায় এক কাপ চা।

বাবা চা খাবে শুনে আলো ছুটে ভেতরে চলে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই এক কাপ চা হাতে বাবার সামনে এসে হাজির।
বাবা তোমার চা।

মবিনুর রহমান খুব আগ্রহ করে চায়ে চুমুক দিলো।

বাবা চা কেমন হয়েছে?
লিকার বেশি হয়ে গেছে তাই না?

আমি চায়ে একটু বেশি লিকারই খাই।

আমি যদি কম লিকার দিতাম, তুমি বলতে আমি একটু কম লিকার খাই।
তাই না বাবা?

তা অবশ্য বলতাম।
বলেই দুজনে গলা ছেড়ে শব্দ করে হেসে উঠলো।

বাবা একটা কথা বলি?

একটা কেন মা?
হাজার টা কথা বলবি।
তোর মুখের কথা আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি সুর। বারবার শুনতে মন চায়।

আলো একটা কথা বলতে চেয়েও চুপ করে বসে আছে। ও বুঝতে পারছে না বাবাকে কথাটা বলবে কি বলবে না।

কি হলো মা।
চুপ করে আছিস কেন?
কি বলবি বল?

বাবা বিকেলে আমার একটু বের হতে হবে।
আমাকে ঘন্টা দুয়েকের জন্য গাড়িটা দেওয়া যাবে।

মেয়ের কথা শুনে মবিনুর রহমান আবারো শব্দ করে হেসে উঠলো।
তোর গাড়ি, তুই নিবি। পারমিশন লাগবে কেন?
তা কোথায় যাবি শুনি?

আলো একটু ইতস্তত করে বললো, রন্জু ভাইয়ার সাথে দেখা করতে।

মবিনুর রহমান পূর্ণ দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলেন রন্জু নামটা উচ্চারণ করতে যেয়ে মেয়ের গালটা লজ্জায় লাল হয়ে গেছে।

চলবে……

আলো-৮
রোকেয়া পপি

মেয়েটির মধ্যে এমন কিছু আছে, যা পুরুষদের পাগল করে দেয়। অসম্ভব রুপসী মেয়েদের ও কখনো কখনো খুব সাধারণ মনে হয়।
কিন্তু আলোর মধ্যে এমন কিছু আছে যা একজন পুরুষ কে বিমোহিত করে রাখে।

রন্জু প্রায় আধা ঘন্টা ধরে এখানে আলোর জন্য অপেক্ষা করছে।
রেস্টুরেন্ট টা প্রায় খালি। এখনো সেভাবে মানুষ জন আসতে শুরু করেনি।
অবশ্য এই রেস্টুরেন্ট টা একটু নিরিবিলি বিধায় আলোকে এখানে আসতে বলা।

কাউন্টারে অল্প বয়সী একজন ম্যানেজার বসে আছে।
আর এক কোনের একটা টেবিলে একটা মেয়ে বসে আছে।
মেয়েটিও হয়তো ওর মতো কারো জন্য অপেক্ষা করছে।
সে বার দরোজার দিকে তাকাচ্ছে আর ঘড়ি দেখছে।

এর মধ্যে আলো এসে ঢুকলো।

রন্জু মন্ত্র মুগ্ধের মতো আলোর পানে চেয়ে মিষ্টি একটা হাসি উপহার দিলো।
আলোও হাসির বিনিময়ে হাসি উপহার দিয়ে টেবিলে এসে বসলো।

সরি একটু দেরি করে ফেললাম।

না না ঠিক আছে।
আমিই একটু আগে চলে এসেছি।
আমার বাসার কাছেই তো। রাস্তায় ও জ্যাম ছিল না।
রন্জু কথা গুলো বলতে বলতে আলোকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলো।

নীল একটা টপস, জিন্স আর গোলাপী একটা স্কার্ফ গলায় জড়িয়েছে।
কি সুন্দর মানিয়ে গেছে আলোর গায়ের রঙের সাথে।
চোখ ফেরানো যায় না।
তারপরও ইচ্ছের বিরুদ্ধে রন্জু চোখ নামিয়ে নিলো।

নিচের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো কি খাবে আলো?
আজ সব কিছু তোমার পছন্দে অর্ডার হবে।

আলো তো ভেতরে ভেতরে ঘেমে অস্থির।
কি বলে এগুলো, আমি কি কখনো এসব জায়গায় এসে খাইছি নাকি পাগল!
নামই জানিনা, আবার অর্ডার!
এসব জায়গায় চামুচ দিয়ে টুং টুং করে খাওয়া কি আমার পোষায়?
আমি খাবো হাত দিয়ে মেখে, মুখের চারপাশ লাগিয়ে আরাম করে।
কেউ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবে, আর আমি ছোট ছোট টুকরো মুখে দিবো এমন ভাবে, যেন আমার মুখের বাইরে খাবার না লাগে!
উফ ভাবলেই হাঁফিয়ে উঠি।
আমি বাপু বাসা থেকে আরাম করে পেট ভরে খেয়ে এসেছি।
এখানে এসেছি শুধু তোমার সাথে একটু সময় কাটাতে, মন ভালো করতে।

আলো মনে মনে অনেক কিছু ভাবলেও, মুখে একটা বোকার হাসি ঝুলিয়ে মেনু ইটা নেরে চেরে রন্জু কে ফিরিয়ে দিয়ে বললো, তুমি যা খাবে আমি ও তাই খাবো রন্জু ভাইয়া।
আমার কোন পছন্দ নেই।

রন্জুদের টেবিল যখন ওয়েটার খাবার গুলো সাজিয়ে দিচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে একটা ছেলে দরোজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো।

দেখলেই বোঝা যায় বড়ো লোকের উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলে।
বিশাল বিশাল বাবড়ি চুল, পেছনে ঝুটি করা।
গলা ভর্তি বিভিন্ন ধরনের মালা।
এক হাতে পুতি, চেন বিভিন্ন ধরনের ব্রেসলেট।
আরেক হাতে দামী ঘড়ি।

ড্রিং করে স্বাভাবিক অবস্থায় নেই, হাঁটার ভঙ্গি বলে দেয় সেটা।
ঢুলতে ঢুলতে প্রথমে আলোদের টেবিলে এসে আলোর পাশে ধপাস করে বসলো।

আলো আর রন্জু দুজনেই খুব অবাক হয়ে চেয়ে রইলো ছেলেটির মুখের দিকে।

ছেলেটি আলোর সামনে রন্জু কে দেখে
ও সরি সরি বলে উঠে আবার ঢলতে ঢলতে সেই একা বসে থাকা মেয়েটার টেবিলের সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করল আমি কি এখানে বসতে পারি?

মেয়েটি ইতস্তত করে বললো, সরি আমি একজনের জন্য অপেক্ষা করছি।
আপনি অন্য টেবিলে গিয়ে বসুন।

সে তো এখনো আসেনি।
আসলে না হয় চলে যাবো।
বলতে বলতে ছলেটি মেয়েটির পাশের চেয়ারে বসে পড়লো।

মেয়েটা উঠে দাঁড়িয়েছে, চলে যাওয়ার জন্য।

ছেলেটি হাত টেনে ধরেছে, মেয়েটির।
আরে আরে উঠছো কেন?
আমার সাথে বসতে বুঝি খুব আপত্তি?

মেয়েটির মুখ লাল হয়ে গেছে, চোখে পানি চলে এসেছে। সে প্রাণপণ চেষ্টা করছে হাত ছাড়িয়ে নিতে, আর চোখের পানি আটকে রাখতে।
মেয়েটি ধরা গলায় বললো, আমার হাত ছাডুন প্লিজ।
আমি বাসায় যাবো।

আরে সুন্দরী আমি তোমাকে নিজে গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসবো।

আলো এতোক্ষণ ধরে চুপচাপ নাটক দেখছিলো।
ও দেখলো ম্যানেজার মাথা নিচু করে বসে আছে।
কিছুই বলছে না।
তারমানে ছেলেটাকে এরা আগে থেকেই চিনে, এবং ভয় পায়। ওর বেশ দাপট আছে এখানে।

ও রন্জুর দিকে তাকিয়ে দেখলো, সেও ভয়ে মুখ কাচুমাচু করে রাখছে।
চেহারা বলে দেয় রন্জু ভাইয়া কোন ঝামেলায় জড়াতে চায় না।

আলো আস্তে করে উঠে গিয়ে ছেলেটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
খুব দৃঢ়তার সাথে বললো, ওর হাতটা ছেড়ে দিন।

আলোর কন্ঠে এমন কিছু ছিল যে, শুধু ছেলেটি নয়। সবাই চমকে ঘুরে তাকালো আলোর দিকে।

ছেলেটি একটা ফিচেল হাসি দিয়ে বললো, তুমি যখন বলছো অবশ্যই ছেড়ে দিবো।
সাথে সাথে মেয়েটির হাত ছেড়ে দিয়ে আলোর হাত চেপে ধরলো।
আমার তো তোমাকেই বেশি পছন্দ হয়েছে সুন্দরী।

আলোর হাত ধরা মাত্র রন্জু সাথে সাথে উঠে আসলো।
কি করছেন আপনি?
ওর হাত ছেড়ে দিন।

ছেলেটি এক হাতে আলোর হাত ধরে রেখে অন্য হাতে চাবির রিং ঘুরতে ঘুরতে বললো, যদি না ছাড়ি কি করবি তুই?

আমি সারা রাত ওর হাত ধরে বসে থাকবো।
কি করবি তুই?

রন্জু দেখলো আলো হঠাৎ করে আরেক টা হাত পাকিয়ে উঁচু করছে।
রন্জু ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো।

ও যখন একটা বিশাল শব্দ শুনে চোখ খুললো, আর চোখ খুলে যা দেখলো তা দেখার জন্য ওর মানসিক কোন প্রিপারেশন ছিল না।

ও দেখলো চার পাঁচ হাত দূরে ছেলেটা চিৎ হয়ে পরে আছে।
নাকটা সম্ভবত থেতলে গেছে।
রক্তে ভেসে যাচ্ছে ফ্লোর।

রন্জু ভয়ে আলোর হাত চেপে ধরলো।
কি করেছো তুমি!
চলো চলো এখনি আমরা এখান থেকে বের হয়ে যাবো।
দাড়াও আগে খাবারের বিল গুলো দিয়ে আসি।

রন্জু খাবারের বিল দিতে যেয়ে দেখলো ওর পকেটে মানিব্যাগ নেই।
সে খুব অবাক হয়ে পকেট হাতড়ে বললো, আলো আমার মনে আছে আসার সময় আমি নিজ হাতে মানিব্যাগ ভরেছি পকেটে।
কিন্তু এখন তো পাচ্ছি না।

আলো মুখ বাঁকিয়ে দু হাত তুলে ঘাড় উঁচু করে এমন একটা ভঙ্গি করলো।
তাতে আমার কি?
আমি কি জানি?

ম্যানেজার সবকিছু দেখে এমনিতেই ঘাবড়ে গেছে।
সে বারবার বললো, টাকা দিতে হবে না স্যার।
এখনি পুলিশ চলে আসবে।
আপনারা চলে যান।

সেই মেয়েটি এতোক্ষণ ভয়ে জড়সড় হয়ে সবকিছু দেখছিলো। সে ছুটে এসে ওদের বিল দিয়ে দিলো।

রন্জু অবাক হয়ে বললো, আপনি বিল দিবেন কেন?
আমি পরে এসে দিয়ে যাবো।

কিছু মনে করবেন না ভাইয়া।
আজ যা কিছু হলো, সব আমার জন্য। আমার কাছে আপনাদের একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য।
এইটুকু করতে দিন প্লিজ।

মেয়েটি কাউকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বিল মিটিয়ে দিয়ে ছুটে বের হয়ে গেল।

ওরাও মেয়েটির পেছন পেছন বের হয়ে আসলো।

রন্জুর ভয় এখনো কাটেনি।
সে ফিসফিসিয়ে বললো, আলো চলো তোমাকে পৌঁছে দেই। চোখ নিচের দিকে নামিয়ে বললো, আজ যা কিছু ঘটলো তার জন্য আমি সরি।

আলো শব্দ করে হেসে উঠলো।
আলোকে কারো পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না রন্জু ভাইয়া।
আমার সাথে গাড়ি আছে।
আমি চলে যেতে পারবো।
আপনাকে পৌঁছে দিতে হবে কিনা বলেন?

আলোর এই কথাটা আবার রন্জুর খুব ইগোতে লাগলো।
সে কোন উত্তর না দিয়ে শুধু বললো, সাবধানে যেও।

আলো গাড়িতে উঠে বসা মাত্র ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিল।

কিছু দূর যাওয়ার পর আলো মানিব্যাগ থেকে টাকা গুলো বের করে একটা চুমু দিয়ে পকেটে পুরে গাড়ির গ্লাস একটু নামিয়ে মানিব্যাগ টা বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিলো বাইরে।

চলবে…….

আলো-৭
রোকেয়া পপি

ওরা যখন খেতে বসছে, আলোর দেওয়া ফোনটা তখন বেজে উঠলো।
দুজনেই চমকে তাকালো ফোনের দিকে।

আলো দ্রুত খাওয়া রেখে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো কোন নাম আসেনি।
সে খুব দ্রুত সুইচ অফ করে সিমটা বের করে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেললো।

মন্টু মিয়া আলোর কাজ কর্ম দেখে অবাক হয়ে বললো, কি করছিস মা?
আমি তো বললাম আমার ফোনের দরকার নেই।
শুধু শুধু ঝামেলা করিস না তো।

আলো ফোনটা রেখে খুব স্বাভাবিক ভাবে আবার খেতে বসলো।
ভাবটা এমন যেন ও কোন কথা শুনতে পায়নি।
কিন্তু মনে মনে মামার ওপরে খুব বিরক্ত হলো।
দুই দিনেই এতো চেন্জ দেখে।

আলো বিদায় নেওয়ার আগে ব্যাগ থেকে বাবার দেওয়া টাকা গুলো বের করে বালিশের নিচে রেখে দিলো।

মন্টু মিয়া তার দূর্বল শরীরে চি চি করে বললো, আবার কি করছিস।

একদম চুপ।
তুমি বড্ডো বেশি কথা বলতে শিখেছো।

আমি এখন যাই।
ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করো।
আবার জ্বর বাড়লে অবহেলা করো না। একটু ডাক্তারের কাছে যেও।

কথাগুলো বলতে বলতে আলোর চোখে পানি চলে আসলো, গলার কাছে কেমন যেন একটা শক্ত কিছু দলা পাকিয়ে উঠলো।
সে অন্য দিকে ঘুরে চোখের পানি মুছে এক ছুটে বেরিয়ে গেল।

আলোর মনটা আজ খুব খারাপ। রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি। মন্টু মামাকে দেখে আসার পর থেকে বুকের মধ্যে কেমন যেন থম ধরে আছে।
অথচ হবার কথা ছিল উল্টো।
ওর ধারণা ছিল মামার সাথে দেখা করার পর ওর মনটা ফুরফুরে হয়ে যাবে।
ও নতুন পরিবেশটা সুন্দর ভাবে মানিয়ে নিবে।

তবে রাতে যখন রন্জু ভাইয়া ফোন করে কথা বললো, তখন কিছুটা সময়ের জন্য খুব ভালো লাগছিল।
ওর মন খারাপের কারণ জানতে চাইলো।
আলো তো খুবই অবাক!
একটা মানুষ ফোনের ওপর প্রান্ত থেকে মুখ না দেখে শুধু মাত্র কন্ঠ শুনে বুঝে ফেলতে পারে যে আমার মন খারাপ!

কি সুন্দর করে বললো, চলো কাল আমরা দেখা করি।
দেখো বাইরে ঘুরলে তোমার মন ভালো হয়ে যাবে।

আলো আর না করতে পারেনি।
কারণ আলোর খুব ইচ্ছে করছে তার রন্জু ভাইয়ার সাথে সময় কাটাতে।

ও আড়মোড়া ভেঙে বেলকোনিতে এসে দাঁড়ালো।
মাত্র ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
মিষ্টি একটা ঠান্ডা বাতাস বইছে।
সে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলো তার বাবা এই ভোর বেলা বাগানে বসে আছে।

আলো বাবা বলে চিৎকার দিয়ে এক ছুটে নিচে নেমে আসলো।
ছোট বাচ্চাদের মত পেছন থেকে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বললো, বাবা এতো সকালে তুমি বাগানে।
রাতে ঘুম হয়নি?

হয়েছে মা। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। এখন আর চাইলে ও ঘুম আসবে না। তাই নিচে নেমে আসলাম।

তোর ঘুম হয়নি?
তুই এতো সকালে উঠছিস কেন?

না বাবা আজ আমার ভালো ঘুম হয়নি।
একটা দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেলো।

কি দুঃস্বপ্ন?
একটা রাক্ষস তোকে তাড়া করছে?

আলো হালকা হাসলো।
কিছুই বললো না।

ও যে দুঃস্বপ্ন দেখে তা খুব গোপন।
এই স্বপ্ন কাউকে বলা যায় না।
মন্টু মামাকে না, মাকে না , বাবাকে তো নাই।
প্রিয় কোন বান্ধবীকে ও বলা যায় না।
ও যতো বড়ো হচ্ছে, ওর ততো গোপন কথা বাড়ছে।
যেমন ছোট বেলায় ও যখন প্রকৃতির ডাকে বাইরে বের হয়েছিল, তখন ওর মুখ চেপে ধরে টানতে টানতে
না ও এসব কথা মনে করতে চায় না।
ভুল করে ও না।
এসব কথা ভাবলেই ওর চোখে পানি চলে আসে।
যেমন এখন ওর চোখ ভিজে উঠতে চাইছে।

মবিনুর রহমান স্নেহের পরশ বুলিয়ে বললো, কি হয়েছে?
আমার রাজ কন্যার মনটা এতো খারাপ কেন?

কিছু হয়নি বাবা।
তুমি চা খাবে?

খাওয়া যায় এক কাপ চা।

বাবা চা খাবে শুনে আলো ছুটে ভেতরে চলে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই এক কাপ চা হাতে বাবার সামনে এসে হাজির।
বাবা তোমার চা।

মবিনুর রহমান খুব আগ্রহ করে চায়ে চুমুক দিলো।

বাবা চা কেমন হয়েছে?
লিকার বেশি হয়ে গেছে তাই না?

আমি চায়ে একটু বেশি লিকারই খাই।

আমি যদি কম লিকার দিতাম, তুমি বলতে আমি একটু কম লিকার খাই।
তাই না বাবা?

তা অবশ্য বলতাম।
বলেই দুজনে গলা ছেড়ে শব্দ করে হেসে উঠলো।

বাবা একটা কথা বলি?

একটা কেন মা?
হাজার টা কথা বলবি।
তোর মুখের কথা আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি সুর। বারবার শুনতে মন চায়।

আলো একটা কথা বলতে চেয়েও চুপ করে বসে আছে। ও বুঝতে পারছে না বাবাকে কথাটা বলবে কি বলবে না।

কি হলো মা।
চুপ করে আছিস কেন?
কি বলবি বল?

বাবা বিকেলে আমার একটু বের হতে হবে।
আমাকে ঘন্টা দুয়েকের জন্য গাড়িটা দেওয়া যাবে।

মেয়ের কথা শুনে মবিনুর রহমান আবারো শব্দ করে হেসে উঠলো।
তোর গাড়ি, তুই নিবি। পারমিশন লাগবে কেন?
তা কোথায় যাবি শুনি?

আলো একটু ইতস্তত করে বললো, রন্জু ভাইয়ার সাথে দেখা করতে।

মবিনুর রহমান পূর্ণ দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলেন রন্জু নামটা উচ্চারণ করতে যেয়ে মেয়ের গালটা লজ্জায় লাল হয়ে গেছে।

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here