আলো -৫,০৬

আলো -৫,০৬
রোকেয়া পপি
০৫

কিরে মা রাতে ভালো ঘুম হয়নি?
এতো সকালে ছাদে কি করছিস? সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। কেমন ঠান্ডা বাতাস ছেড়েছে দেখেছিস?
তোর শীত করছে না?

আলো ভোরের আজান দেওয়া মাত্র ছাদে চলে এসেছে। এ বাড়ির ছাদটা খুব সুন্দর।
তার ওপরে বৃষ্টি থেমে গিয়ে হিম হিম বাতাস ছেড়েছে।
আলোর খুব ভালো লাগছে সকাল হওয়া দেখতে।
একটু একটু করে মিষ্টি রঙ ছড়াচ্ছে আকাশে।
কি মায়াবী একটা পরিবেশ।

ঠিক সেই মুহূর্তে বাবার কন্ঠস্বর শুনে আলো ফিরে তাকালো। মিষ্টি করে হেসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো, বাবা তোমার আলোর এতো অল্পতে শীত করে না।

না না। তারপরও এটা ঠিক হয়নি মা।
তোর মায়ের কাছ থেকে একটা চাদর নিয়ে ছাদে ওঠা দরকার ছিল। যদি ঠান্ডা লেগে যায়!

উফ বাবা আমার কিচ্ছু হবে না।
মা কি করছে বাবা?

এই তো একসাথে নামাজ পড়ে উঠলাম। তোর মা চা বানাতে গেলো।
আর আমি ছাদে আসলাম।
সকালের এই সময়টা ছাদে হাঁটতে খুব ভালো লাগে।
তারপর বুড়ো বুড়ি দুই জন একসাথে বসে চা খেয়ে আবার ঘুমাতে যাই।

আর আজকের দিনটা আমাদের কাছে অনেক বেশি সুন্দর।
আজ আমাদের অনেক দিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।
আজ আমরা তিনজন এক সাথে বসে চা খাবো।

চায়ের ট্রে হাতে সায়মা বগম পেছন থেকে এসে বললো, বাবা মেয়ের কি এতো গল্প চলছে আমাকে রেখে।

কথা বলতে বলতে সায়মা বেগম টেবিলে চায়ের ট্রে রেখে তার পটু হাতে চা ঢেলে তুলে দিলো আলো ও মবিনুর রহমানের হাতে।

আলো চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বললো, তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম মা। তোমাকে ছাড়া কি গল্প জমে।
চা টা কিন্তু অসাধারন হয়েছে মা।

বুঝলি মা, তোর মায়ের হাতের চা খেয়ে এখন আর কারো বাসায় গিয়ে চা খেতে পারি না।
তোর মা আসলেই খুব ভালো চা বানায়।

আলো বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে বাবার দিকে চেয়ে বললো, মা ভালো চা বানানোর সাথে অন্য কোথাও চা না খেতে পারার সম্পর্ক কি বুঝলাম না।

আরে বুঝলি না।
অন্যদের হাতের চা পানছে লাগে।

বাবার কথা শুনে আলো শব্দ করে হেসে উঠলো।

মবিনুর রহমান কথা না থামিয়ে বলে যাচ্ছে।
তবে বড়োপার চা বাদে।
বড়োপার চা হয় অসাধারণ।
তোর মা আর ফুপির চা খেয়ে তুই আলাদা করে নাম্বার দিতে পারবি না, কারটা বেশি মজা।
দুজনেই ফাস্ট ক্লাস চা বানায়।

ও ভালো কথা।
বড়োপা কাল থেকে বারবার ফোন দিচ্ছে তোকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
আজকে তো বড়োপার বাসায় আমাদের সবার দাওয়াত।
বড়োপা তো কালকেই আসতো তোকে দেখতে।
কাল আবার দুলাভাই বিজনেসের কাজ শেষ করে সুইডেন থেকে ফিরছে।
তাই আসতে পারেনি।

চল সবাই মিলে আজ বড়োপার বাসায় কাটিয়ে আসি।

আলো মুখ কাচুমাচু করে বললো, বাবা তুমি আর মা যাও। আমি তো চিনি না ওদের।
আমার ভালো লাগবে না।
তার চাইতে আমি বরং মন্টু মামাকে দেখে আসি এই ফাঁকে। আর তোমরাও ফুপির বাসায় ঘুরে আসো।

সায়মা বেগম চোখ কপালে তুলে অবাক হয়ে বললো, সে কি কথা মা!
তোর জন্যে তো আজকের আয়োজন।
তুই না গেলে কিভাবে হবে।

তাছাড়া ওখানে তোর ভালোই লাগবে মা।
অহনা আর তুই তো সমবয়সী।
ছোট বেলায় কতো খেলতি অহনার সাথে।
তবে অহনার চাইতে রন্জুর সাথে তোর খাতির বেশি ছিল।

তুই তো তোর ফুপিকে সবসময় বলতি আমি বরো হয়ে রন্জু ভাইয়া কে বিয়ে খকরবো।
মনে পরে এগুলো।
বলেই সায়মা আর মবিনুর রহমান হো হো করে হেসে উঠলো।

আলো লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে রাখলো।

আলো বসে আছে অহনার রুমে। রুমটা খুব সুন্দর।
ওর খুব ভালো লাগছে। ও মনে মনে ঠিক করে ফেললো,ওর নিজের রুমটাও ঠিক এমন সুন্দর করে সাজাবে।

ঘন্টা খানেকের মধ্যে অহনার সাথে আলোর খুব ভাব হয়ে গেছে। খাওয়া দাওয়া শেষ করে অহনা সব কিছু বের করে বসেছে আলোকে দেখাতে।

এই দেখ আলো পাপা আমার জন্য কতো কিছু এনেছে।
মোবাইল, কসমেটিকস, মেকআপ কিট, ঘড়ি।
খুব সুন্দর হয়েছে না সবকিছু?
যদিও এগুলো আমার সবকিছু আছে।
তারপরও বাবা যতোবার ট্যুরে যায়, আমার জন্য এগুলো নিয়ে আসে।
বাইরের দেশের কসমেটিকস আমার খুব পছন্দ তো তাই।

আলো সবকিছু নেড়েচেড়ে দেখছে। ও এগুলো কখনোই ব্যাবহার করেনি।

ও আমতা আমতা করে বললো, হুম সবকিছু খুব ভালো হয়েছে।
একটা প্যাকেট হাতে নিয়ে বললো, এটা কি রে অহনা।
এমন আলকাতরার মতো কালো জিনিস মুখে দিয়ে রাখছে।
এগুলো আবার কি সাজ? দেখতে ঠিক ভুতের মতো লাগছে।

আলোর কথা শুনে অহনা কিছুতেই হাসি থামাতে পারে না।

উফ আলো তুই যে কি না।
এতো মজার কথা আমি আমার জীবনে ও শুনিনি।
শোন এটার নাম ব্লাক মাক্স।
সপ্তাহে একদিন মুখে মাস্ক ব্যবহার করলে, সারা মুখে যতো ধুলোবালি জমে থাকে তা বের হয়ে মুখকে অনেক বেশি সফট আরর গ্লো করে।

আয় তোকে দেখাই, কিভাবে ব্যবহার করতে হয়।

অহনার কান্ড কারখানা দেখে আলো যারপর নাই অবাক।
মাক্স তুলে ফেলার পর সত্যিই অহনাকে অনেক বেশি কিউট লাগছে।
ওর ও ইচ্ছে করছে মাক্স ব্যাবহার করতে।
কিন্তু প্রথম দিন, তাই লজ্জায় চেপে গেছে।

ওদের যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। আলোর ফুপি এসে ডেকে গেল আলো ডাইনিং এ আসো মা।
একসাথে সবাই মিলে চা খাই।
অহনা আলোকে নিয়ে আসো।

আচ্ছা মামনি আসছি। তুমি যাও।
চল আলো সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

তুই যা অহনা। আমি একটু ওয়াশ রুম হয়ে আসছি।

চায়ের টেবিলে সবাই আছে।
রন্জকে দেখে আলো খুব আন ইজি ফিল করছে।
রন্জু যথেষ্ট হ্যান্ডসাম, সুপুরুষ। যে কোন মেয়ে একবার দেখলে বারবার ফিরে তাকাবে।

আলোর ও খুব পছন্দ হয়েছে রন্জুকে। কিন্তু হায় বলার পর এই যে আলো মাথা নিচু করেছে।
আর ভুল করে ও রন্জুর দিকে তাকায়নি।

আলোর ফুপি ব্যাপারটা খেয়াল করে মজা করে বললো, কি ব্যাপার আমার বৌমা এতো লজ্জা পাচ্ছে কেন?

অনেক দিন পর তোমার রন্জু জামাইকে দেখে কি লজ্জা বেশি লাগছে?

আলোর মুখ লজ্জায় টমেটোর মতো লাল হয়ে গেছে।
সবাই মজা পেয়ে হাসছে।
শুধু আলো আর রন্জু বাদে।

রন্জু গলা খাঁকারি দিয়ে বললো, কেন মেয়েটাকে ছোট বেলার কথা তুলে লজ্জা দিচ্ছো মামনি?
ও কি তখন বুঝে বলতো রন্জু জামাই।

আলো ছোট বেলায় কখনো রন্জুকে ভাইয়া বলতো না। সবসময় রন্জু জামাই রন্জু জামাই বলে কথা বলতো।
অথচ বয়সে রন্জু আলোর চাইতে পাঁচ বছরের বড়ো।

চা পর্ব শেষ করে ওরা উঠলো যাওয়ার জন্য।
সবাই যখন বিদায় নিতে ব্যাস্ত।
আলো তখন টুপ করে ছাইদানিটা ওর ব্যাগে পুরে ফেললো।
এটা অবশ্য ওর পুরনো রোগ। কোন কিছু ভালো লাগলেই সে হাতের ইশারায় সরিয়ে ফেলে।

আলোরা বাসায় আসার ঘন্টা খানেক পর অহনা ফোন দিলো আলোকে।

হড়বড় করে অহনা যে কি বললো, আলো তার অধিকাংশ কথাই বুঝলো না।

আলো কপট রাগ দেখিয়ে বললো, ঐ অহনা তুই এতো ছিচ কাঁদুনে কেন রে?
কান্নার দমকে তো তোর কোন কথাই বুঝতে পারছি না।
কান্না বন্ধ কর বলছি।
কান্না বন্ধ করে সুন্দর করে গুছিয়ে না বললে আমি এখনি ফোন রেখে দিব।
তোর কোন কথাই শুনবো না।

অহনা চোখের পানি মুছে হেঁচকি দিতে দিতে বললো, শোন আলো আমার ব্লাক মাক্স আর মোবাইলটা খুঁজে পাচ্ছি না।
সাথে আমার কানের দুল টাও।
কানের দুল টা আমার খুব প্রিয়। বাবা দুবাই থেকে আনছিলো। কান ব্যাথা করছিলো জন্য তোর সামনেই তো খুলে রাখলাম সাইড টেবিলে।

হুম বুঝলাম।
তো পাচ্ছিস না যখন ভালো করে খুঁজে দেখ। ঘরেই আছে। যাবে কোথায়?

আরে না সব জায়গায় খুঁজছি। নেই তো নেই। হাওয়া হয়ে গেছে যেন।

তাহলে এক কাজ কর, তোদের বাসায় যারা কাজ করে তাদের ডেকে শক্ত করে ধমক দে।
দেখবি বাপ বাপ করে বের করে দিবে।

আলো তুই বুঝতে পারছিস না।
তখন তো কোন কাজের লোক আমার রুমে আসেনি।
তাছাড়া ওরা খুব বিশ্বস্ত। আমার রুমে আমি কতো দামি দামি ডায়মন্ডের সেট ফেলে রাখি।
ওরা ছুঁয়ে ও দেখে না।

আলো হাই তুলতে তুলতে বললো, তাহলে আর কি।
আমার মনে হয় তোর রুমে ভুত আছে।
ভুত নিয়ে গেছে।

আলো এসব কি কথা?
ভুত বলে পৃথিবীতে কিছুই নেই।
যা বলছিস, বলছিস।
আর কখনো এমন কথা বলবি না আমাকে।

আলো বিস্ময় প্রকাশ করে বললো, কি বলিস ভুত নেই মানে। অবশ্যই ভুত আছে। তোর রুমে তো অবশ্যই আছে। আমি যখন খাটে বসে ছিলাম, তখন খাটের নিচে শব্দ হচ্ছিল। আমার গা কেমন যেন ছমছম করছিল।

আচ্ছা অহনা এখন রাখি কেমন। আসার সময় দুই ঘণ্টা জ্যামে বসে ছিলাম। এখন খুব ঘুম পাচ্ছে।
তাছাড়া কাল রাতে একটুও ঘুম হয়নি।
আমি এখন ঘুমাবো।

অহনা আৎকে উঠে বললো, এই এই খবরদার ফোন রাখবি না।
রাত দশটায় ভুতের ভয় দেখিয়ে এখন উনি ঘুমাবে।
একদম ফোন রাখবি না বলছি।

তোর সাথে কথা বলার টাইম শেষ। রাখছি।
অহনাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ফোন কেটে সুইচ অফ করে দিয়ে শুয়ে পড়ল আলো।

এদিকে আলোর সাথে কথা বলার পর অহনার পুরো শরীর ভয়ে ঠান্ডা হয়ে গেছে।
ওর কেমন যেন গা ছমছম করছে। ওর মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি খাটের নিচে কেউ আছে।
একটু পর পর টুকটুক করে শব্দ ও হচ্ছে।
কিন্তু শব্দের উৎস কোথায় সেটা সে বুঝতে পারছে না।
তার ধারনা আলো ভুল বলেনি।খাটের নিচে অবশ্যই কিছু আছে।
ও ভয়ে বিছানা থেকে নামতে পারছে না।
এর মধ্যে চারদিক অন্ধকার করে ঝড় উঠলো। আর সাথে সাথে ইলেকট্রিসিটি চলে গিয়ে ঘর একদম অন্ধকারে ছেয়ে গেলো।

চলবে……..

আলো-৬
রোকেয়া পপি

অহনা ভয়ে বিছানা থেকে নামতে পারছে না।
এর মধ্যে চারদিক অন্ধকার করে ঝড় উঠলো। আর সাথে সাথে ইলেকট্রিসিটি চলে গিয়ে ঘর একদম অন্ধকারে ছেয়ে গেলো।

সে কিছুতেই বিছানা থেকে নামতে পারছে না।
ভয়ে পুরো শরীর জমে হিম হয়ে গেছে। আলো জ্বলছে না কেন?
সেটাও একটা রহস্য! যেহেতু আই পি এস। একাই আলো জ্বলার কথা কারেন্ট চলে গেলেও।

সে ভয়ে ভয়ে ফুলিকে ডাকলো, ফুলি ফুলি তুই কোথায়?
মামনি তুমি কোথায়?
অহনা দেখলো ও ডাকছে ঠিকই। কিন্তু গলা দিয়ে কোন স্বর বের হচ্ছে না।

এদিকে বাহিরে প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মাঝে মাঝে খুব জোরে বাজ পড়ার শব্দ হচ্ছে।
হঠাৎ করে পুরো রুমটা বিদ্যুৎ চমকানোর আলোতে একটু আলোকিত হয়েই অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে।
সেই আলোতে অহনা খেয়াল করলো কেউ একজন লম্বা মতো ওর খাটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

ভয়ে ওর যখন আত্মা বের হয়ে আসার যোগাড়, ঠিক সেই মুহূর্তে ফুলিকে দেখা গেলো একটা মোমবাতি নিয়ে ঘরে ঢুকতে।

ফুলি ঘরে ঢোকা মাত্র অহনা চিৎকার দিয়ে উঠলো কে কে?

আফা আমি ফুলি।
ভয় পাইছুন?

ভয় পাবো কেন?
তোর আসতে এতো দেরি কেন?
আর আই পি এসের কি হয়েছে? তোর হাতে মোম কেন?

মেশিনে কি জানি হইছে গো আফা। মিস্ত্রিকে ফোন দিছে। কিন্তু ঝড়টা কেমুন উঠছে দেখছুন?
আইজকা আর আসতে পারবো বইলা মনে হয় না।

আই পি এসের সমস্যা হতেই পারে। কিন্তু আমি যে অন্ধকারে বসে আছি সে খেয়াল আছে?
তুই কেন সাথে সাথে আসলি না আলো নিয়ে?

আফাগো কি যে কইছুন না। মোম খুঁজতে তো সময় লাগে।

মোম খুঁজতে সময় লাগে তাই না?
তোর চাকরি নট।
কাল সকালে বেতন নিয়ে তুই বিদায় হবি।
তোকে আর দেখতে চাই না।

চাকরি নট শুনে ফুলিকে তেমন চিন্তিত মনে হচ্ছে না।
কারণ মাসের মধ্যে এই আফা দুই বার তার চাকরি নট করে।

সে আইচ্ছা আফা। সকালে যামু গা বাড়িতে। বলতে বলতে ফুলি বের হয়ে যাচ্ছে।

অহনা চিৎকার দিয়ে উঠলো। এই এই তুই কোথায় যাচ্ছিস?
খবরদার এক পাও আগাবি না। কারেন্ট না আসা পর্যন্ত এখানে বসে থাকবি।

কি যে কন না আফা।
আমার ব্যাগ গোছানো লাগবো না? এইখানে বইসে থাকলে চলবো?

এই তোকে না বললাম এক পাও বের হবি না।
কথা কানে যায় না।

আইচ্ছা আফা বসলাম।

কি করতে হইবো কন?

ফুলি শোন আলোটা নিয়ে একটু খাটের নিচে উঁকি দিয়ে দেখতো কিছু আছে কিনা।

আফাগো কি কন গো আফা।
এতো রাইতে আমি খাটের নিচে উঁকি দিমু না, আমার ভয় করে।
রাইতের অন্ধকারে ভুতরা সব খাটের নিচে থাকে।

এই চুপ।
ভুত বলে কিছু নেই।
আর একবার যদি ভুতের কথা বলিস না।
একটা থাপ্পড় দিয়ে তোর দাঁত ফেলে দিব।

ফুলি গালে হাত দিয়ে চেহারা এমন একটা ভাব করলো, যেন সত্যি সত্যি ওর গালে থাপ্পড় দেওয়া হয়েছে।
আফা আমি যাই। আপনারে বিশ্বাস নাই। কখন থাপ্পড় দিয়া সত্যিই আমার দাঁত না ফেইলা দেন।
আমরা গরীব মানুষ হইতে পারি কিন্তু আমাগো দাঁতের মূল্য অনেক। বুঝছুন আফা।

ফুলি তুই বড্ডো বেশি কথা বলিস। মামনি কোথায় রে?

খালাম্মা তো সামনের রুমে ভাইজানের লগে কথা কইতে দেখলাম।
আফাগো কাম একখান ছাড়ছে।

ফুলি তোকে বলছি এভাবে কথা বলবি না।
কি হয়েছে বল?

খালাম্মা তো ভাইজানের বিয়ার আলোচনা করতাছে। আইজকা যে আলো আফা আইছিলো, হেই আফার লগে।

আফা গো দেখছুন। আলো আফা কি সুন্দর!
ঠিক যেন একখান পরি।

আলোকে সুন্দরী বলাতে অহনার মেজাজ গরম হয়ে গেছে। সে দাঁত কিড়মিড় করে বললো, ফুলি আমার চোখের সামনে থেকে দূর হ।

আইচ্ছা যাইতাছি। তয় খাটের নিচে ভুত শব্দ করলে আবার ভয় পাইয়েন না বুজছুন।

ফুলি আবার!
অহনার ধমকের সাথে সাথে ইলেকট্রিসিটি এসে পুরো রুম আলোয় ঝলমল করে উঠল।
অহনার গলার জোর ও বেড়ে গেল বহুগুণ।

সে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো। সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি তোর চেহারা দেখি না, তাহলে তোর খবর আছে।

আলো এসেছে আজ তার মন্টু মামাকে দেখতে।
সাথে করে ফলমুল আর বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে এসেছে। উদ্দেশ্য মামার সাথে বসে একসাথে খাওয়া।

আলোর মা কিছুতেই আলোকে একা ছাড়বে না।
কিন্তু আলোর এক কথা। সে একাই যাবে।
শেষ পর্যন্ত আলোর বাবার মধ্যস্থতায় ঠিক হয়েছে, আলো একাই যাবে।
তবে গাড়ি নিয়ে যাবে।
হাতে বেশ কিছু টাকাও দিয়ে দিয়েছে।
ড্রাইভারকে বারবার বলে দিয়েছে আলো যা যা কিনতে চায় সে যেন ভালো কোন জায়গা থেকে সেগুলো কিনে দেয়।

আলো দেখলো ঘরের দরোজা চাপানো। সে আস্তে করে দরোজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখলো ঘর অন্ধকার করে পুরো শরীর কাঁথা দিয়ে ঢেকে মামা শুয়ে আছে। সে আগে লাইট জ্বালালো।

চোখে হঠাৎ করে আলো পরাতে মন্টু চোখ মেলে চাইলো। সে বিশ্বাস করতে পারছে না আলো তার চোখের সামনে।
সে উঠে বসার চেষ্টা করলো।

আলো গিয়ে জড়িয়ে ধরলো। কি হয়েছে মামু। কথাটা বলা মাত্রই সে আৎকে উঠলো।
সে কি তোমার তো শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।

সেই মুহুর্তে ড্রাইভার ভেতরে ঢুকলো, হাতে খাবার দাবারের প্যাকেট নিয়ে।

আলো উদ্বিগ্ন হয়ে ড্রাইভারকে বললো রফিক ভাই একজন ডাক্তার নিয়ে আসতে পারো?

মন্টু আলোকে বাঁধা দিয়ে বললো, কি শুরু করলি মা, আসতে না আসতেই।
কোন ডাক্তার লাগবে না। আপনি গাড়িতে গিয়ে বসেন ভাই।
আমি একটু মেয়েটার সাথে সুখ দুঃখের কথা বলি।

আচ্ছা ঠিক আছে।
আমি গাড়িতে অপেক্ষা করছি,বলেই রফিক বের হয়ে গেল।

আলো কপট রাগ দেখিয়ে বললো এটা কিন্তু ঠিক না মামু। ডাক্তার দেখানো উচিত ছিল।

আরে বাদ দে তো। একটু বৃষ্টির পানি গায়ে লেগে গা গরম হয়েছে। একাই সেরে যাবে।
তুই কেমন আছিস বল?

খুব ভালো আছি মামা। শুধু তোমার জন্য খুব খারাপ লাগে।
কথা বলতে বলতে আলো তার ব্যাগ থেকে একটার পর একটা জিনিস বের করে সামনে রাখছে আর বলছে, দেখছো মামু এই ছাইদানি টা খুব সুন্দর না?

হা অনেক সুন্দর। কিন্তু তুই তো আমার সিগারেট খাওয়া বন্ধ করছিস। এটা দিয়ে আমি কি করব?

কি আবার করবে, সাজিয়ে রাখবে। টাকার দরকার হলে বিক্রি করে দিবে।

এই ঝুমকাটা রাখো। বাইরের। পিওর গোল্ড। সুযোগ বুঝে বিক্রি করে দিও।
আলো একটার পর একটা জিনিস বের করছে।
মন্টু আলোর হাতটা চেপে ধরলো।
থাম মা। এগুলো তুই কোথায় পেয়েছিস?

তোমার তো তার দরকার নেই।
দিয়েছি রেখে দাও। এখন আমরা দুজন মিলে আরাম করে বিরিয়ানি খাবো গরম গরম।

মন্টু মিয়া স্নেহের পরশ বুলিয়ে বললো, মারে এখন আর তোর এই কাজ করার দরকার নেই। তুই কতো বড়ো ঘরের মেয়ে। তোর তো কোন অভাব নেই। তুই কেন চুরি করবি।
সবই তো এখন তোর।

আলো মুখ কঠিন করে বললো, কে বলেছে আমি চুরি করেছি?
এগুলো সব আমার জিনিস। আমি তোমাকে দিছি।

মারে পাগলামী করিস না মা।
আর আমার জন্য কিছু আনতেও হবে না।
আমাকে দেখতেও আসতে হবে না। সুযোগ পেলে আমি নিজেই গিয়ে তোকে দেখে আসবো।

মামু চুপ করোতো। আমার এতো দিনের অভ্যাস। এটা চেন্জ হতে সময় লাগবে।
এই মোবাইল টা রাখো।
আর এখন খেতে বসো।
আমার খুব খিদে পেয়েছে।

ওরা যখন খেতে বসছে, আলোর দেওয়া ফোনটা তখন বেজে উঠলো।
দুজনেই চমকে তাকালো ফোনের দিকে।

চলবে…….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here