আকাশ_ছোঁয়া_ভালোবাসা♥,পর্ব_২০,২১

আকাশ_ছোঁয়া_ভালোবাসা♥,পর্ব_২০,২১
সাহেদা_আক্তার
পর্ব_২০

সেই ছয় বছর আগের ব্যাঙটা আবার ফেরত চইলা আসছে বুকের ভেতর। আইসাই তিরিং বিরিং লাফাইতেসে। গাজররে!!! Crush is coming back……
.
.
.
.
প্রত্যেক বছর আব্বা আম্মাকে এই দিনে একবার দেইখা আসি। আজকে যাইতে পারতেসি না। ইচ্ছা করতেসে ছুইটা যাই। আসতে ইচ্ছা করতেছিলো না কিন্তু মিষ্টি খালার কথা ফেলতে পারি নাই। এখন মন খারাপ হইতেসে। আব্বা আম্মা আমার ভীষণ অভিমানী। নিশ্চয়ই আমার পথ চেয়ে বইসা আছে। আমি মন খারাপ কইরা সাগর পাড়ে হাঁটতেসি। বাপ রে!!!!! কত মানুষ!!!!! একটু শান্তি কইরা কোথাও বসমু তার উপায় নাই। আমি ভেজা বালিতে হাঁটতেসি। একটু পর পর সাগরের পানি পায়ে এসে আছড়ে পড়তেসে। সে এক অন্য ভালো লাগা। আমি ব্যাপারটা উপভোগ করতেসি এমন সময় মনে হইল কেউ আমারে ফলো করতেসে। আমি শিউর হওয়ার জন্য সাগর ছাইড়া পাহাড়ের দিকে রওনা দিলাম। দুইটা পাও আমার সাথে রওনা দিল। আমি বুঝতে পারতেসি কিন্তু দেখতে পাইতেসি না। দাঁড়া ব্যাটারে হাতে নাতে ধরমু। আমি পাহাড়ে উঠা শুরু করলাম। সেও ওঠা শুরু করল। একটা সময় আমি দ্রুত উইঠা লুকাই পড়লাম। পা দুইটা আমারে খুঁজতেসে আর আমি লুকাই মিটিমিটি চিনা হাসি দিয়া বলতেসি এইবার বাছাধন যাইবা কই? তুমি চলো পিছে পিছে, আমি চলি লুকাই লুকাই।

আমি যেখানটাই লুকাইসি সেই জায়গাটা বিপদজনক। একটু থেকে একটু হইলেই খাঁড়া গর্তে। আমি যখনই ধরতে যামু হঠাৎ পা পিছলাই গেল। পড়তে লাগছিলাম গর্তে। কিন্তু একটা হাত পড়তে দিল না। টান দিয়া আমারে বুকের সাথে মিশাই ফেলল। আমারে জড়াই ধইরা আছে তো আছেই। ছাড়ে না ক্যান? গায়ের পারফিউমটা চেনা চেনা লাগতেসে। আরে, আজকে সকালেই তো চেরি ফল যখন আমার কাছে আসছিল তখন এই গন্ধটা নাকে লাগছিল। তাহলে এটা চেরি ফল? কেমন একটা মাতাল করা গন্ধ। সেই ছয় বছর আগে এই মাতাল করা গন্ধে আমি ঘায়েল হই গেসিলাম। আজ আবার হইলাম। না না… এ কি করতেছিস ছোঁয়া!? ঘায়েল হইলে হবে না। এখন রিভেঞ্জ টাইম। আমি ধাক্কা দিয়া তারে সরাই দিলাম। কইলাম, এভাবে জড়িয়ে ধরে আছো কেন? নিঃশ্বাস বন্ধ করিয়ে মেরে ফেলবে নাকি? চেরি আমার দিকে আগাইতে লাগল, আমি তো ভয়ে শ্যাষ। পেছনে গর্ত, সামনে চেরি। কোন দিকে যাই। সে আচমকা আমারে টাইনা হাঁটা ধরল। যাইতে যাইতে কইল, গর্তে পড়ে মরার শখ হয়েছে, তাই না? আমি মুখ ভার কইরা কইলাম, আপনি আমার পিছু নিসেন কেন? নইলে তো আমি এদিকে আসতামই না।

– আমি পিছু না নিলে তো গর্তে পড়ে ঘাড় বাঁকা হয়ে থাকতে এতক্ষণে।

আমি আর কিসু কইলাম না। সে আমারে হাত ধইরা সোজা বাংলোতে নিয়া আসলো। আজকে আমার সমুদ্র স্নান একেবারে মাটি।
.
.
.
.
আমি বিছানায় গড়াগড়ি যাইতেসি আর ভাবতেসি সবাই এত স্বার্থপর ক্যান? দুপুরের খাবার খাইয়া মুন আবার রেদোয়ানরে নিয়া হাওয়া হই গেসে। রেদোয়ানের বাবা মাও নাই। মিষ্টি খালা, সানজিদা আপু আর সারা সায়েমকে নিয়া ঘুরতে গেসে। যাওয়ার আগে একটু বইলাও যায় নাই। তাহলে হয়ত বাইর হইতাম। ধুর কিচ্ছু ভালা লাগের না। কালকে এত কাঁদলাম কেউ একটু দেখতেও আসে নাই। ইচ্ছা করতেসে চোখের কল ছাইড়া আবার কাঁদি। দাঁড়া, রিদিরে ফোন করি। ফোন খুঁইজা বাইর করলাম বালিশের তলা থেইকা। এই দুঃখের সময় মেয়েটারে বহুত মিস করতেসি। ডায়াল করলাম ওর নাম্বারে। প্রথমবারে ধরল না। আজকে যে সবার কি হইল!? কেউ আমারে মিস করে না। কেউ আমারে ভালোবাসে না। হঠাৎ ফোনের রিংটোন বাইজা উঠল। আমি না দেইখাই খুশিতে গদগদ হইয়া ফোন রিসিভ করে কইলাম, হ্যালো, রিদুকি বাচ্চি, কই তুই?

– রিদির বাচ্চা হল কবে?

এ্যাঁ!!!! ছেলের গলা ক্যান!? রিদি আবার ছেলে হইল কেমনে!? ফোন নামাই দেখি ভ্যাম্পায়ারের ফোন। আল্লাহ গো!!!! একদিন অফ ছিল। আজকে আবার ফোন করসে। আর ভালা লাগে না। এমনেতে মন মেজাজ ভালো নাই, তার উপর এই ব্যাটা বাটপারটা ফোন করসে। সে ওপাশ থেইকা ভাঙ্গা ট্যাপ রেকর্ডারের মতো হ্যালো হ্যালো করতেসে। ইচ্ছা করতেসে রেকর্ডারটা আছাড় মাইরা ভাইঙ্গা ফেলি। আমি ফোন কানে লাগাই বললাম, হ্যাঁ শুনছি।

– ব্যস্ত থাকায় ফোন করতে পারি নি। কেমন আছো?

– ভালো ছিলাম। এখন নেই। (মনে মনে) আরও ব্যস্ত থাক। তাইলে একটু রেহাই পামু। এই ছয় বছরে তো আমার পিছে কত সময় ব্যয় করো নাই।

– কেন?

– সেটা জেনে আপনি কি করবেন?

– জানলে বউকে একটু সঙ্গ দিতাম।

ভ্যাম্পায়ার ব্যাটা, সামনে থাকলে তোরে বেল কইরা সেখানে ডুগডুগি বাজাইতাম। একবার শুধু হাতের কাছে পাই। আমারে বউ করার সাধ জন্মের মতো ঘুইচ্চা যাইতো।

– কি হল? কথা বলছো না যে?

– আমার কিছু বলার নেই। আপনার আর কিছু বলার আছে?

– হুম।

– বলে ফেলেন। আমি ব্যস্ত।

– ভালোবাসি। লাভ ইউ, লাভ ইউ, লাভ ইউ…

তোর লেবু তোর কাছে রাখ। আমি কিনমু না। এমনিতে তোর চুকা লেবুর জ্বালায় আমার দাঁত কিড়মিড় করতেসে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেইলা ফোনটা কাইটা বিছানায় ছুইড়া রাখলাম। বিছানায় চিৎ হইয়া শুয়ে গেলাম। আগে আমি চেরির পিছে ঘুরতাম আর এখন ভ্যাম্পায়ারটা আমার পিছে ঘুরে। হায়রে দুনিয়া! সবাইরে লাভ ট্রায়াঙ্গেলে ফালাইয়া কি যে মজা পাও কে জানে।

আবার ফোন বাইজা উঠল। এবার আর রিস্ক নিলাম না। ফোনটা হাতে নিয়া তাকাই দেখলাম রিদি ফোন করসে। আমি রিসিভ করতেই শুনলাম ও নাক টাইনা বলতেসে, হ্যালো…।

– কিরে!? কাঁদিস ক্যান?

– আরে ঝালে নাক দিয়ে পানি পড়ছে।

– অ।

– কেন ফোন দিয়েছিস?

– তোর সাথে কতদিন কথা হয় নাই। তাই ভাবলাম একটু কথা কই।

– তাই? লাস্ট কবে কথা হয়েছে?

আমি অনেক ভাইবা দেয়াল ঘড়ি দেইখা কইলাম, একদিন সাত ঘন্টা সাইত্রিশ মিনিট পনের সেকেন্ড …… ও আমারে থামাইয়া কইল, তোর ঘন্টা মিনিট কে চায়? কি হইসে বল তো? আমি কাঁদো কাঁদো গলায় ইমোশান ঢাইলা বললাম, সবাই আমারে ফেলে ঘুরতে গেসে। আমি একলা বাসিন্দা ঘরে পইড়া আছি।

– তোকে কি শিকল পরাই গেছে?

– এহ্, শিকল পরাইতে যাবে ক্যান?

– তাহলে তুইও ঘুরে আয়।

– একলা ঘুরতে মন চাইছে না। তুই কি করিস?

– বি এফের সাথে বের হয়েছি। ফুসকা খাচ্ছি। আচ্ছা এখন রাখি। বাইরে থেকে ঘুরে আয়। বাই।

– এই……হ্যালো……টুট টুট…… রিদুকি বাচ্চি……সামনে পেলে তোর বফরে আমি আচ্ছা মতো কেলাইতাম। হায়রে……একজন ঘুরে বর নিয়া ঘুরতে যায় আরেকজন বি এফ নিয়া ফুসকা খাইয়া নাক টানে। মাঝে আমি বেকার মানুষ।

এমন সময় দরজা নক করল কেউ। আমি জিগাইলাম, কে? উত্তর নাই। বিছানা ছাইড়া উঠতে ইচ্ছা করতেসে না। কে যে আইলো। ধুর। গিয়া দরজা খুইলা দেখি আমার এক্স মানে চেরি ফল দাঁড়াই দাঁড়াই হাসতেছে। আমি জিগাইলাম, কোনো দরকার? সে একই ভাবে হাঁস ছাইড়া কইল, হুম। তোমাকে। আমি শুইনা ঢোক গিললাম। বাড়িতে কেউ নাই। এখন উল্টাপাল্টা কিসু কইরা বসলে! শুনসি বিদেশে নাকি এসব কমন ব্যাপার। সকালে যেভাবে টিজ করসে…… যদি ওইসব কিছু শিইখা আসে তো…… ও আমার অতি রঞ্জিত ভাবনায় ছেদ ঘটাইয়া বলল, কি ভাবছো? আমি আমতা আমতা করে কইলাম, ইয়ে মানে…। ও বলল, আরে বাবা, রুমে একলা ভালো লাগছে না। তাই ভাবলাম তোমাকে বলি। চল, বের হবো।

যামু না। তখন আমার সমুদ্র স্নান মাটি কইরা এখন বলতেসে ঘুরতে যাবে। আমি মুখে হাসি টাইনা বললাম, আমি একটু ব্যস্ত। আরেক সময়। বইলাই দরজা মাইরা দিলাম। দরজা মাইরা নিজের চুল টানতে লাগলাম। কি করলাম ইডা আমি! এতদিন যারে নিয়া খালি ভাবতেসি আজকে তারসাথে বাইর হওয়ার সুযোগটা নিজের হাতে বন্ধ কইরা দিসি। আবার যামু? না না, মান সম্মান বইলা একটা জিনিস আছে। থাক। আরেকবার ডাকলে তখন রাজি হইয়া যামু। আমি অপেক্ষা করতেসি ডাক শোনার। সে তো আর ডাকে না। চইলা গেল নাকি! আমি দরজা খুইলা উঁকি দিয়া দেখি কেউ নাই। সবাই আমারে একলা রাইখা চইলা গেসে। আমি নাক টানতে টানতে বাইর হইলাম। সাগরের দিকে রওনা দিলাম আর মাথা চাপড়াইতে চাপড়াইতে কইলাম, ছোঁয়া তোরে দিয়া কিচ্ছু হইব না।
.
.
.
.
আমি মুখ গোমড়া কইরা দাঁড়াই আছি মাইক্রোর পাশে। সবাই তাদের বোঁচকা বুঁচকি গাড়িতে তুলতে ব্যস্ত। আমারটা সবার আগে তুইলা দিসি। আমি দাঁড়াই আছি, আমার গোমড়া মুখের কারণ আমার দিকে মুচকি হাইসা তাকাই আছে। আজকে কতো শখ কইরা সাগর পাড়ে গেসিলাম বিকালে। পিসলা খাইয়া পড়তাম সাগরে তখন আইসা হিরোর মতো ধরল চেরিটা। আমি একটু লজ্জায় লাল হইয়া অভিমানের সুরে কইলাম, আমাকে ধরসো কেন? সাথে সাথে ছাইড়া দিলো একগাদা পানিতে!? একটু মায়াও দেখাইলো না। গোসলের পানি এখনো আমার চুল থেকে পড়তেসে। একেবারে ভালো কইরা সমুদ্র স্নান করাই দিসে। এখন ভেটকাইতেসে দাঁড়াই দাঁড়াই। চেরি রে!!!!! দাঁড়া একবার পাই, তোরে কাইটা লবন মরিচ দিয়া খামু। আচ্ছা চেরি ফল তো মিষ্টি, লবন মরিচ কি লাগবে? আমি ভাবতেসি, মুন এসে কইল, এতো কি ভাবিস বল তো? উঠ। আমি নাকি নাকি গলায় বললাম, আমার পেছনে বসলে বমি পায়। আমি সামনে বসবো। মুন সাফ জানাই দিল সব সিট ব্লক। বলল, তোকে পেছনের সিটেই বসতে হবে। বমি পেলে সমস্যা নাই৷ পেছনের পুরা সিট খালি। তুই শুয়ে বসে ইচ্ছা মতো বমি কতে পারবি। ধর পলিথিন। ও আমারে এক প্যাকেট পলিথিন ধরাই দিল। এই পৃথিবী নিষ্ঠুর!!!!! আমি মনের দুঃখে পেছনের সিটে যাই লম্বা হই শুয়ে পড়লাম। সামনের সিটে রেদোয়ানের মা, মিষ্টি খালা আর সানজিদা আপু। মাঝের ডান সিটে সারা সায়েম আর বাম সিটে রেদোয়ান মুন। আমি মাত্র চোখটা বন্ধ করসি হঠাৎ চেরি ফল এসে বলল, এযে গাজরের হালুয়া। হালুয়ার মতো ছড়িয়ে না থেকে জায়গা দাও। আমি পিট পিট কইরা ওর দিকে তাকাইতেই বলল, নিজে জায়গা দিবে না জোর করে নিবো? ইস্ রে!!!! ক্যান যে বিদেশ থেকে আইলো। তাইলে একটা লম্বা ঘুম দিতে পারতাম শুয়ে শুয়ে। আমি উঠে ডান পাশে জানালার কাছে চইলা গেলাম। চেরি বাম জানালার কাছে গিয়ে বসল। রেদোয়ানের বাবা ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে বললেন, এসি ছাড়বো না জানালা খোলা রাখবে? আমি পিছন থেকে বললাম, আঙ্কেল জানালা খোলা থাক। গাড়ি চলতে শুরু করল। এই সন্ধ্যেবেলায় গোসল করায় শরীরটা কেমন হালকা লাগতেসে। ঘুমও পাইতেসে। বাইরে অন্ধকার। জানালার কাচে মাথা রেখে চোখ বুজতেই কখন ঘুমাই গেলাম টের পাইলাম না।

সকালে চোখ মেইলা দেখি আমি বিছানায় শুয়ে আছি। মাথাটা কারো বুকে। সে আমাকে জাপটে ধইরা আছে। আমি পিট পিট কইরা তার দিকে তাকাইলাম। সেও পিট পিট কইরা আমার দিকে তাকাইলো। তারপর যেই না চিক্কুর দিমু ওমনি সে আমার মুখ চেপে ধরে বলল, শসসসসসস্।

চলবে…

#আকাশ_ছোঁয়া_ভালোবাসা♥
#পর্ব_২১
#সাহেদা_আক্তার

আমি পিট পিট কইরা তার দিকে তাকাইলাম। সেও পিট পিট কইরা আমার দিকে তাকাইলো। তারপর যেই না চিক্কুর দিমু ওমনি সে মুখ চেপে ধরে বলল, শসসসসসস্।

ও আমার দিকে কেমন কইরা তাকাই আছে। চোখ গুলো আমারে তার কাছে টানতেসে। আমার অস্বস্তি লাইগা উঠল। ও আমার এলোমেলো চুলগুলা হাত দিয়ে কানের পাশে গুইজা দিয়ে আবার জাপটে ধরে চোখ বন্ধ করল। কি মুসিবত!!!! এখন কেউ চলে আসলে। আমি মনে মনে চিক্কুর দিতেসি, চেরি ফল…… ছাড় আমারে। কিন্তু কেন জানি এই বুকটাতে ইচ্ছা করতেসে সারা জীবন এভাবে রয়ে যাই। চেরি তোমার গায়ের গন্ধটা এত ভালো লাগে কেন? ইচ্ছা করতেসে জড়াই ধরে থাকি। না না, কি করতেসি আমি? এত দিন পর হঠাৎ এসে আমারে এত ভালো মানুষী দেখানোর কারন জানা লাগবো। চাঁদনির সাথে এতদিন থাইকা আমার কাছে আসছে। এত্ত সহজে আমি গলছি না বাছাধন। আমি তারে ঠেইলা উইঠা বসলাম। ও জিগাইল, কি হল? আমি রাগ দেখাইয়া কইলাম, আপনার সাহস তো কম না। আপনি আমার রুমে এসে আমার সাথে এক বিছানায় শুয়েছেন। তার উপর ঘুমের সুযোগ নিয়ে জাপটে ধরেছেন। সে আমার কথায় একটু ভ্রূক্ষেপও করল না। বলল, চাইলে আরো কিছু করতে পারি। দেখতে চাও? আমি তার থেইকা একশ হাত দূরে সইরা বললাম, কিছু করতে গেলে ঠেলে বিছানা থেকে ফেলে দিবো।

– সে তুমি যা ইচ্ছা করতে পারো।

সে আমার দিকে আগাইতেই আমি চিক্কুর দিয়া বিছানা থেকে নাইমা দরজা খুলে এক দৌঁড়ে পালাইলাম। তখনো সে রুমে বিছানায় শুয়ে শুয়ে হাসতেসে। বজ্জাত একটা।
.
.
.
.
খাবার টেবিলে সে সরাসরি আমার সামনে বসল। আমি না দেখার ভান কইরা নিজের পেয়ালায় তরকারি বাড়তে লাগলাম। খালু বলল, আচ্ছা, তোমাদের কি মার্কেটিং করা শেষ?

– না খালু।

– তাহলে তোমরা মার্কেটিং সেরে ফেলো। আমি বাকি কাজগুলো মোটামুটি সেরে ফেলেছি। নিমন্ত্রণও প্রায় হয়ে গেছে।

– আচ্ছা।

আমি খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে চেরির দিকে তাকাইতেসি। হঠাৎ তার সাথে চোখাচোখি হইয়া গেল। আমি নিচের দিকে তাকাই খাইতে লাগলাম। চেরি কইল, আন্টি, ছোঁয়ার মনে হয় বেশি খিদে পেয়েছে। আমি চোখ সরু করে তার দিকে তাকাইলাম। মিষ্টি খালা হেসে বলল, তুমি বুঝলে কি করে? সে মুখের খাবার শেষ কইরা বলল, তখন থেকে আমার খাবারের দিকে বার বার তাকাচ্ছে তো তাই বললাম। আমার পাশ থেকে মুন কইল, আরে, ভাইয়া আপনার বেশি করে খাওয়া দরকার। কালকে কত কষ্ট করে চালের বস্তা কোলে নিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কয়দিন আগেই তো চালের বস্তা এনেছে। কালকে আবার নতুন চালের বস্তা আনল কেন?

– এই চালের বস্তা সেই চালের বস্তা না।

মুন তাড়াতাড়ি খাবার শেষ কইরা কইল, কালকে গাড়িতে তো ভাইয়ার কোলে সেই আরামে ঘুম দিসো। তাতে ভাইয়ার পায়ের অবস্থা টাইট। তার উপর তোমারে কোলে নিয়ে রুমে দিয়ে আসছে। আমি ঐটার কথা বলতেছিলাম। আমি রাগে লজ্জায় লাল হই গেলাম। মুন এজন্যই বলার আগে আমার থেকে কয়েক হাত দূরে দাঁড়াই কথাটা বলতেছিল। বইলাই কাইটা পড়ল। আমি কারো দিকে না তাকাইয়া চুপচাপ খাইয়া উঠে গেলাম। মুন বইনা, আমার ইজ্জত রাখলো না।

আমি রুমে গিয়া চিৎপটাং হইয়া শুয়ে পড়লাম। মুন দরজায় নক কইরা বলল, আসতে পারি? আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কইলাম, এত ঢঙ না করে ভেতরে আয়। মুন ঢুকতেই বললাম, কালকে কি হইসে বল তো। তোর জামাইর বন্ধু কালকে এখানে ছিল কেন? মুন চেয়ার টেনে আমার সামনে বসে বলল, কালকে তুই যে ঘুম দিছিস। আমরা কতো ডাকলাম। তুই তো ভাইয়ার কোল থেকে মাথাই সরাইতে চাইছিলি না। তারপর ভাইয়া তোকে কোলে করে রুমে এনে শুইয়ে দিল। উনি চলে যেতে লাগলে তুই হাত ধরে তাকে আর যেতে দিলি না। সে চলে যাওয়ার জন্য জোর করতেই তুই ঘুমের মধ্যে বাচ্চাদের মতো কেঁদে দিয়ে বললি, সবাই আমাকে ফেলে চলে যায়। তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না। তাই বাধ্য হয়ে উনি তোর কাছে বসল আর তুই আবার তার কোল দখল করে ঘুমিয়ে গেলি।

– আ আ আ আমি এগুলা বলসি?

আমার গলায় কথা আটকাই যাইতেসি। আমি দেয়ালে মাথা পিটমু না দেয়ালটাকে কমু আজকে এই মাথা তোর সেটাই বুঝতেসি না। ঘুমের মধ্যে এত কাহিনী করে ফেলসি! ইস্! নিজেরে মনে হইতেসে একটা রাম ছাগল। নাহ্, তাতেও লিঙ্গ ভুল। আচ্ছা রাম ছাগলের স্ত্রী লিঙ্গ কি!? রাম ছাগলী না মহিলা রাম ছাগল। ভাব্বার বিষয়। ধুর ছাতা। এই চেরি আসতেই আমার সব ঘোলাই গেল। নাহ্, একে ভাগাইতে হবে, না হইলে আমি আগের মতো পাগল হই যামু।
.
.
.
.
.
দুপুরে সবাই মিইলা শপিংয়ে বাইর হইলাম। কত কি কেনা বাকি। বিয়ের শাড়ি গয়না। মুনের না আমার। ওর তো চিন্তা নাই। ওর সবকিছু রেদোয়ান ভাইরা আগেই কিনে ফেলসে। বিয়েতে কি পরমু সেটা এখনো ঠিক করি নাই। ভাবতেসি লেহেঙ্গা পরমু। আমি মুন রে নিয়া লেহেঙ্গার দোকানে গেলাম। সেখানে গিয়াই আমার মন লাফাইতে লাগল। এটা কিনমু না ঐটা কিনমু! আল্লাহ এতো সুন্দর ক্যান! ব্যস, পরীক্ষায় সব প্রশ্ন কমন পড়লে যেমন জগা খিচুড়ি পাকাই যাই, আমারও সেই অবস্থা হইল। কোনটা কিনমু ঠিকই করতে পারলাম না। তাই মুখ কালো কইরা খালি হাতে বাইর হই আসলাম দোকান থেকে। আজকের দিনটাই মাটি হই গেল। সানজিদা আপুর সাথে জুয়েলারির দোকানে গেলাম। আমি কিচ্ছু কিনতে পারলাম না। শেষে আমি খালি হাতেই বাড়ি ফিরলাম। ফ্রেশ হয়ে এসে দেখি একটা প্যাকেট বিছানায়। আমি গিয়া খুলে দেখলাম একটা খয়রী রঙের ভারি সোনালী সুতায় কাজ করা লেহেঙ্গা। ঐ লেহেঙ্গা গুলা থেকেও সুন্দর। সাথে ম্যাচিং জুয়েলারিও আছে। এগুলা কার? কে দিল? মুন এসে বলল, কি রে নাস্তা করতে আয়।

– মুন, এগুলা কার?

– আমার তো না। তাহলে তোর হবে।

– কিন্তু কে রাখল?

– আম্মু হয়তো। তোর জন্য কিনেছে। খেয়াল করিসনি।

– হবে হয়ত। ( মনে মনে) যেদিন দোকান তেকে ওয়াশরুমে যাই তখনই বাির হইয়া বিছানায় প্যাকেট দেখি। উফ্, ম্যাজিক ম্যাজিক লাগতেসে। এবার থেইকা দোকান থেকে আইসা ওয়াশরুমে বইসা থাকমু।

– কিরে, আবার কি বাবতে বসলি? ছাদে আয়। আজকে ওখানে খাবে সবাই।

– হুম।

আমি সব গুছিয়ে ছাদে আইসা দেখলাম সেখানে সবাই আছে। চেরি ফলটাও যায়নি দেখছি। কেন যে এখানে পইড়া আছে। ইচ্ছে করতেসে ঘুষি মাইরা উগান্ডায় পাঠাই দি। আমি গিয়া বসলাম একপাশে। আকাশের দিকে তাকাইলে আব্বা আম্মার কথা মনে পড়ে। মুন কইল, তুই আকাশের দিকে এমন ড্যাব ড্যাব করে তাকাই আছিস কেন? ওর কথায় সবাই কথা বন্ধ কইরা আমার দিকে তাকাই। আমি জিগাইলাম, কি হইসে? সবাই আমার দিকে এভাবে তাকাই আছো কেন? সায়েম বলল, খালামনি, তুমি খালুর দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকাই ছিলা তাই সবাই তোমার দিকে তাকাই আছে। আমি ভ্রূ কুঁচকায় কইলাম, তোর খালু কই থেকে আসলো? সে চেরি ফলের দিকে ইশারা করল। আমি মনে মনে দাঁত কিড়মিড় করে কইলাম, বেকুব, ও কি আমার জামাই নাকি যে খালু ডাকতেছিস? মামা ডাক। মামা। আমি বললাম, আমি ওর দিকে তাকাবো কেন? সানজিদা আপু বলল, মুন যে বলল, তুই আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলি।

– হ্যাঁ, আমি তো আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা দেখছিলাম। এমন করে বলছো যেন আমি আকাশ নামের কারো দিকে তাকাই ছিলাম।

– আমরা তো তাই ভেবেছিলাম।

– এখানে আকাশ নামের কেউ আছে নাকি!

সারা বলল, খালামনি তুমি খালুর নাম যে আকাশ জানো না? ফের খালু। এই দুইটারে শিখাইতে হইবো ও খালু না ও …… ওয়েট এ মিনিট। খালুর নাম আকাশ মানে? আমি চেরি ফলের দিকে তাকাইলাম। সে আমার দিকে কেমন কইরা তাকাই আছে। অন্যদের অবস্থাও একই। আমি মেকি হাসি দিয়া কইলাম, ইয়ে মানে… চা ঠান্ডা হয়ে গেছে। আমি গরম করে আনি। ঠান্ডা চা আমি একদম খেতে পারি না। মুন পেঁচা মুখ করে বলল, এই জন্যইতো সব সময় তোকে চা দিলে তুই শরবত বানিয়ে খাস। এইরে… আমি এক দৌঁড়ে নিচে চলে এলাম। এই ছয় বছরে প্রথম জানলাম, চেরি ফলের নাম আকাশ। কেউ আমারে টুকা দাও, আমি বেঁহুশ হই।
.
.
.
.
.
আমি চেরির ছবির দিকে তাকাই আছি। পুরান বাক্সটা আজকে ছয় বছর পর বাইর করলাম। চেরির স্মৃতি গুলা সব এখানে। আমার ডায়রীটা বাইর করলাম। খুলে পইড়া নিজেই হাসতে হাসতে শ্যাষ। তখন বাচ্চাদের মতো কত কিছুই না লিখসি ওরে নিয়া। কই না পাগল আসিলাম। ডায়রীটা থেকে একটা শুকনা গোলাপ পড়ল। আমি গোলাপটা হাতে নিয়া স্মৃতিতে ডুইবা গেলাম। চেরি গাছের প্রথম গোলাপ। চাঁদনির সাথে চেরিকে দেইখা রাগে গোলাপটা কাইটা নিয়া আসছিলাম। কি সুন্দর রঙ ছিল গোলাপটার! আমি ডায়রীটা একপাশে রাখতে একটা চাবির রিং চোখ পড়লো। চাবির রিংটা চোখের সামনে ধইরা ঘুরাইতে লাগলাম। নিজের হাতে লাল পুঁতি দিয়া একটা লাভ বানাইছিলাম। তার সাথে পাঁচটা রঙ বেরঙের ক্রিস্টাল টাইপ ঝুমকা। প্রত্যেকটাতে একটা করে অক্ষর খোদাই করে ‘CHOYA’ লেখা। ও যাতে বুঝতে না পারে তাই প্রত্যেকটা ক্রিস্টালে একটা করে অক্ষর। এটাকে দেইখা চোখ থেকে একটা ফোঁটা গড়ায় গিয়া চিবুকে জমলো। ওরে বার্থডে গিফট দিতে পারি নাই তাই সেদিন ওকে কলেজে এটা দিতে চাইছিলাম। কিন্তু কিন্তু …… আমি চাবির রিংটা হাতের মুঠোয় নিয়া বুকে জড়াই কানতেসি। ওখান থেকে চইলা আসার পর একবার ওরে দেখতে গেসিলাম। সিঁড়ি দিয়া উঠার সময় শুনতেছিলাম চাঁদনির সাথে চেরিফল তােদর বাসার দরজায় দাঁড়িয়ে কথা বলতেছিল। তখন শুনছিলাম ও চেরির সাথে লন্ডন যাবে। আমি উঁকি মারতেই দেখলাম চাঁদনি ওকে জড়াই ধরে দাঁড়াই আছে। আমি সহ্য করতে না পাইরা দৌঁড়ে চলে আসছিলাম। সেই কান্নার প্রতিটা ফোঁটা শুধু চেরির নাম বলতেছিল। কিন্তু সে তো অন্য কারো। তবে আবার কেন মায়া বাড়াতে আসছে? আমি যে আর নিজেকে সামলাতে পারছি না।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here