অন্ধকারের_মানুষ (পর্ব ৩)

#গল্প১৪১

১৮+ সতর্কতা

#অন্ধকারের_মানুষ (পর্ব ৩)

গাজীপুর পরিবহনের একটা লোকাল বাসের শেষ সিটে রইস আধোঘুমে টের পায় একটা ঠান্ডা বাতাস চোখেমুখে লাগছে। কেমন একটা ঝিমঝিম করছে মাথাটা, চোখটা খুলতেই পারছে না। বাসের কন্ডাকটর দু’বার ভাড়া চেয়ে গেছে এর মধ্যে। বা পায়ের হাঁটুর উপরে একটা হালকা ব্যথা টের পায়। আন্দাজে জায়গাটায় হাত বোলাতে গিয়ে ঘুমের মাঝেই একটা গালি দেয়, ডাক্তার মহিলাটা শেষ মুহুর্তে টেবিলের ড্রয়ার থেকে কী যেন একটা বের করেছিল। শেষ মুহূর্তে রইস খেয়াল করেছিল, একটা ছোট্ট ইঞ্জেকশন যেটা আমূলে ওর পায়ে গেঁথে দিচ্ছিল। সিরিঞ্জে একটু চাপ দেবার সাথে সাথেই ও হাতটা চেপে ধরেছিল। ভাগ্যিস পুরো সিরিঞ্জটা চাপ দিতে পারেনি। একটানে সিরিঞ্জটা খুলে ফেলেছিল, ভীষণ ব্যথায় ককিয়ে ওঠতেই সেই দশাসই নির্মলা নামের মহিলাটা চেম্বারে ঢোকে। রইস এক ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে এসেছিল। রাস্তায় নেমে অনেকখানি শুধু দৌড়েছে ও। চোখের সামনে এই বাসটা পড়তেই উঠে পড়েছে। বাসের হেল্পার অদ্ভুত চোখে ওর দিকে তাকিয়েছিল, সাথে কিছু যাত্রীও। রইস কারও অবাক চোখকে পাত্তা না দিয়ে বাসের পেছনের দিকটায় শেষের এই সিটটা খালি পেয়ে কোনোমতে বসে পড়েছিল। তারপর কতক্ষণ যে ঘুমিয়েছে জানে না। তার মানে ওই সিরিঞ্জটাতে ঘুমের ওষুধ ছিল। অল্প একটু ওষুধ হয়ত গিয়েছে, তাতেই এই অবস্থা!

এই যখন ভাবছে ঠিক তখন কন্ডাকটর ছেলেটা আরেকজনকে সাথে নিয়ে আসে, কৌতুহলী গলায় বলে, ‘উস্তাদ, মনে হয় অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ছে। ওই মিয়া, আপনি কই যাইবেন, বাস তো লাস্ট স্টপে আইসা পড়ছে।’

রইস কোনোমতে চোখটা খুলে, বলে, ‘মহাখালি যাব ভাই।’

ছেলেটা দাঁত বের করে হাসে, বলে, ‘একদম উলটা পথে চইলা আসছেন। কেইসটা কী, অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ছিলেন না নিজেই ওই কামে আছিলেন? তখন যেমনে দৌড়াই ওঠলেন বাসে!
যাই হোক, টাকা থাকলে আমার ভাড়াটা দেন, আর ঢাকার লাস্ট টিপে আমি আপনারে ওঠাই দিমুনে।’

রইস ঘুম ঘুম চোখে ছেলেটার দিকে তাকায়, তারপর মানিব্যাগ থেকে ভাড়ার টাকাটা দেয়। ছেলেটা ওকে ধরে নামিয়ে ফিরতি গাড়িতে ওঠিয়ে দেয়। বাসের হেল্পারকে ভালো করে বলে দেয় ওর সম্পর্কে। রইস বাসের সিটে বসেই আবার ঝিমোতে থাকে। রিতা অনেকবার ফোন দিয়েছে। একবার শুধু বলেছে ওর আসতে রাত হবে। তারপর থেকে ফোনটা বন্ধ করে রেখেছে।

ফেরার পথে রইস ভাবতে থাকে, ওর এই অসুখটা সারবে না। এভাবেই ওকে বেঁচে থাকতে হবে। আসলে ও নিজেই হয়তে চায় না ও ভালো হোক। ছোটবেলার একটা ঘটনা মনে পড়ে যায়, পুকুর পারে এক গাদা মহিলার সামনে ওকে কান ধরে ওঠবস করাচ্ছিল রাবেয়া আপা। ও মেয়েদের ঘাটে লুকিয়ে গোসল করা দেখছিল, আর রাবেয়া আপা টের পেয়ে ওকে ধরে ফেলে। কী অপমান! ঘাটের সব মেয়েরা কেমন একটা চোখে ওর দিকে তাকাচ্ছিল আর বলছিল, ‘খারাপ পোলা, এখনই এই অবস্থা।’

তারপরও ও এই স্বভাব থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। ঝিমোতে ঝিমোতে রইস মাথার মাঝে হাজার হাজার কন্ঠের ফিসফিসানি শুনতে পায়, ‘খারাপ পোলা, খারাপ পোলা…’
*******************

দেবদ্যুতি চেম্বারে বসে আনমনে ওই অদ্ভুত লোকটার কথাই ভাবছিল। লোকটা যখন বলল পচা গন্ধ পাচ্ছে, ঠিক তখনই ওর চোখের দৃষ্টি পালটে গিয়েছিল। কেমন ঘোর লাগা চোখে ওর দিকে এগিয়ে আসছিল। প্রথমটায় ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছল দেবদ্যুতি, এমন পশুদের ও চেনে। প্রতিটা মেয়েই হয়ত চেনে। মেয়েদের জীবনে এমন ছোট বড় চুরি, ডাকাতি হয়েই যায়, কোনো না কোনোভাবে, কাছের মানুষ বা দূরের মানুষের দ্বারা। কিন্তু এই লোকটা ভয়ংকর, একদম ক্লাসিকাল সেক্সুয়াল সাইকোপ্যাথ। শেষ মুহূর্তে দেবদ্যুতি নিজেকে সামলে নিয়েছিল, ড্রয়ারে রাখা অজ্ঞান করার ইঞ্জেকশনটা সজোরে বিঁধিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু একটু চাপ দেবার পরই লোকটা পশুর মতো ছাড়িয়ে নিয়েছিল। ততক্ষণে নির্মলা চলে আসতেই লোকটা পালিয়ে গেল। দেবদ্যুতি শুধু ভাবে, লোকটা একবারও ভাবল না ধরা পড়লে ওর কী হাল হবে! এরা অবশ্য ভাবেও না, মানে ভাবতে পারে না। একদম ক্লাসিকাল কেস। শুধু একটা বিষয়েই খটকা, লোকটা ভালো হবার জন্য এসেছিল ওর কাছে, যেটা একদমই যায় না।

এই যখন ভাবছিল তখম নির্মলা এসে জানাল যে পুলিশ অফিসার হাফিজ এসেছে। দেবদ্যুতি ওকে ভেতরে নিয়ে আসতে বলে।

হাফিজ ভেতরে এসেই মুখ গোমড়া করে বলে, ‘আপা, এত্ত বড় একটা ঘটনা, আমারে সাথে সাথে একটা ফোন করবেন না? আমি কিছুই জানি না।’

দেবদ্যুতি মৃদু হাসে, এই পুলিশ অফিসার হাফিজ ওকে বেশ সম্মান করে। বছরখানেক আগে হাফিজের বড় মেয়েটাকে ওর কাছে নিয়ে এসেছিল, টিন এজ বয়সের। এই বয়সে যা হয়, অল্পতেই মরে যেতে ইচ্ছে করে। মেয়েটার সুইসাইডাল টেন্ডেসি ছিল। দেবদ্যুতি খুব যত্নের সাথে মেয়েটাকে কাউন্সেলিং করে সে পথ থেকে ফিরিয়ে এনেছিল। তখন থেকেই হাফিজ যেন ওর ভীষণ ভক্ত হয়ে গেছে।

দেবদ্যুতি হাসে, তারপর বলে, ‘এই তো, এখনই সব বলছি।’

পুরো ঘটনা শুনে হাফিজ তাজ্জব হয়ে যায়, অবাক গলায় বলে, ‘ম্যাডাম, আপনি এখনো কেস করছেন না কেন? আপনি সময়মতো ইঞ্জেকশনটা না দিলে তো ও আপনার সাথে খারাপ একটা কিছু করে ফেলত! আমার তো ইচ্ছে করতেছে ব্যাটারে এখনই ধরে নিয়া আসি, এমন প্যাঁদানি দেব। আর এটেম্পট টু রেপ এন্ড মার্ডারের চার্জ লাগিয়ে দেব।’

দেবদ্যুতি মন খারাপ গলায় বলে, ‘হ্যাঁ, ইঞ্জেকশনটা হাতের কাছে না থাকলে খারাপ একটা কিছু হতে পারত। আমি যেহেতু মানসিক রোগী দেখি তাই এই ব্যবস্থা। আসলে কে কেমন বাইরে থেকে তো তা চট করে তো বোঝা যায় না। অনেক রোগীকে বাইরে থেকে দেখে বেশ শান্তশিষ্ট মনে হলেও হঠাৎ করেই এরা ভায়োলেন্ট হয়ে ওঠে। তাই এমন একটা ইঞ্জেকশন আমি হাতের কাছেই রাখি। যাই হোক, বেঁচে গছি এ যাত্রায়।’

হাফিজ কঠিন গলায় বলে, ‘ম্যাডাম, ও নিশ্চয়ই নাম, মোবাইল নাম্বার লিখেছে রেজিস্টার বইয়ে। ওইটা দেন খালি আমারে, বাকিটা আমার কাজ।’

দেবদ্যুতি হতাশ ভাবে মাথা নাড়ে, তারপর বলে, ‘নাম, ঠিকানা আছে, মোবাইল নাম্বারও আছে। কিন্তু সব ভুয়া। আমি নিজেই চেক করেছি। আর, আমি কেস করব না। কারণ, আমি বুঝেছি লোকটা আসলে একজন মানসিক রোগী যার যথাযথ চিকিৎসা দরকার। কিন্তু লোকটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে এখন, যেকোনো মুহূর্তে যে কারও ভীষণ ক্ষতি করে ফেলতে পারে। তাই ওকে খুঁজে বের করা খুব জরুরি। সেজন্যই আপনাকে ডাকা।’

হাফিজ একটু অবাক হয়, তারপর মাথা নাড়ে। এই ডাক্তার একটু পাগলা কিসিমের। চিন্তিত গলায় বলে, ‘ম্যাডাম, ওই ইবলিশটা তো দেখি মহা ধড়িবাজ। ও তো একেবারে প্ল্যান করেই এখানে আসছিল। ওর চেহারার একটা বর্ণনা দেন, দেখি কিছু করতে পারি কি না। এমন করে তো খুঁজে পাওয়া মুশকিল। একটা ছবি হইলেও হইত।’

দেবদ্যুতি এবার একটা রহস্যময় হাসি হেসে বলে, ‘ছবি আছে, ভিডিও আছে।’

হাফিজের চোয়াল ঝুলে যায়, ‘মানে? ছবি কই পাইলেন আপা?’

দেবদ্যুতি ওর রুমের একটা কোণায় ইশারা করে বলে, ‘ওখানে একটা লুকানো ভিডিও ক্যামেরা আছে। সাধারণত আমি যখন আমার রোগীদের সাথে কথা বলি তখন ভিডিওটা চালু থাকে। কারণ, রোগীদের বলা সব তথ্য, তাদের বলার সময় চোখমুখের পরিবর্তন, এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে। দেখা গেল পুরোটা আমার মনে নেই, তাই ভিডিওটা আবার দেখি মন দিয়ে। রোগীর মূল সমস্যাটা বোঝার চেষ্টা করি। অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও ভিডিও অন করা ছিল। আমি আপনাকে ভিডিওটা থেকে ওর একটা ছবি দিচ্ছি, যত দ্রুত সম্ভব লোকটার ঠিকানা খুঁজে বার করুন।’

হাফিজ যেন এবার জ্বলে ওঠে, ‘ম্যাডাম, আপনি শুধু ওর ছবিটা দেন, আমি সাত দিনের মধ্যে ওরে আপনার সামনে হাজির করতেছি।’

দেবদ্যুতি হাফিজের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে বলে, ‘আপনি এই ভিডিওর ছবি দিয়ে ওকে কেমন করে খুঁজে বের করবেন?’

হাফিজ এবার একটু ভাব নিয়ে বলে, ‘ম্যাডাম, প্রথমেই আশেপাশের সব থানায় পাঠাই দিমু। আর লাগলে পেপারেও বিজ্ঞাপন দিমু, দেখি বেটা কয়দিন পালাই থাকতে পারে। আশেপাশের মানুষই ওরে ধরাই দিব।’

দেবদ্যুতি জোরে মাথা নাড়ে, দৃঢ় গলায় বলে, ‘না, সেটা করবেন না। তাতে হিতে বিপরীত হবে, লোকটা তাহলে আর কোনোদিন ওই কুপ্রবৃত্তি থেকে বের হয়ে আসতে পারবে না। দেখুন, আমি চাই ওনার চিকিৎসা করতে। লোকটা আমার কাছে সাহায্যের জন্যই এসেছিল, আপনি ব্যাপারটা গোপন রেখেই খুঁজে বার করুন। আপনার সুবিধের জন্য একটা জিনিস দিচ্ছি, এই নিন।’

কথাটা বলে দেবদ্যুতি ড্রয়ার থেকে একটা দুমড়ানো মোচড়ানো কাগজ বের করে হাফিজের হাতে দেয়। হাফিজ কাগজটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখে, তারপর বুঝতে না পেরে বলে, ‘এইটা তো একটা কম্পিউটারের দোকানের বিল ভাউচার। এইটা দিয়া কী হইব?’

দেবদ্যুতি ঠোঁট কামড়ে বলে, ‘ওইদিন ধস্তাধস্তির সময় এই কাগজটা লোকটার পকেট থেকে পড়ে গেছে। লোকটা বলছিল আইটি ডিপার্টমেন্টে কাজ করে। হয়ত বিলের এই কাগজে যে দোকানের ঠিকানা দেওয়া আছে সেখানে উনি গিয়েছিল কিছু কিনতে। এরা সাধারণত একটা নির্দিষ্ট দোকান থেকেই নিয়মিত কেনাকাটা করে। সেক্ষেত্রে ওদের ছবিটা দেখালেই বলতে পারবে লোকটার ঠিকানা। আর বিলে একটা অফিসের নাম দেওয়া আছে সেটা কোথায় আমি জানি না। আমার মনে হয় লোকটা এই অফিসেই চাকরি করে। ওকে খুব সহজেই আপনি খুঁজে পাবেন। শুধু একটা অনুরোধ, কাউকে বুঝতে দেবেন না। আমি আগে ওনার চিকিৎসা করে দেখতে চাই।’

হাফিজের চোখটা এবার চকচক করে ওঠে, আশ্বাসের সুরে বলে, ‘ম্যাডাম, কাজটা তো এখন একদম পানির মতো সোজা। আপনি চিন্তা করবেন না, আমি একদম মোলায়েমভাবে কেসটা হ্যান্ডেল করব। আর আপনার চিন্তাটা মহৎ, ভালো লাগল। যদিও শয়তানটার শাস্তি হওয়া উচিত।’

দেবদ্যুতি এবার উদাস চোখে তাকিয়ে বলে, ‘আসলে এরা আমাদের মতো মানুষ না। নিজেদের রিপু এরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এরা নিজেদের কাজের পরিণাম নিয়েও ভাবে না বা ভাবতে পারে না। তাদের এমন মনোবিকার যে তার সামাজিক সম্মান নষ্ট করবে কিংবা তার শাস্তি হতে পারে তা ভাবতেও পারে না। এদের সাধারণত কোনো অনুশোচনা থাকে না, কিন্তু এই লোকটাকে দেখে মনে হলো একটু ভিন্ন। এখনও হয়ত সময় আছে হাতে। তাই আপনাকে এমন অনুরোধ।’

হাফিজ এমন নতুন তথ্য শুনে দারুণ অবাক হয়। কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘ম্যাডাম, লোকটা যে পচা গন্ধ পাইত তার ব্যাখ্যা কী?’

দেবদ্যুতি একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলে, ‘এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো ব্যাখ্যা আছে। ওর সাথে আরো কথা বললে জানা যেত। যতদূর জেনেছি লোকটার শৈশব খুব ডিস্টার্বড ছিল। ও যখনই একটা খারাপ কাজ করে তার আগে এই গন্ধটা পায়। আসলে এটা একটা মানসিক সমস্যা, হয়তো ও নিজের মনের অজান্তেই এই যুক্তি দাঁড়া করিয়েছে যে দোষটা ওর না। ওই পচা গন্ধটার দোষ, যার জন্য ও কাজটা করতে বাধ্য হয়। লোকটাকে আগে এই ভুল ধারণা থেকে বের করে আনতে হবে। সেজন্য আপনার সাহায্য খুব দরকার। আপনি তো জানেন আমার এই বাড়ির দোতলাটা আমি একটা ছোট্ট পুনর্বাসন কেন্দ্র চালায়। আমার ইচ্ছে লোকটাকে এখানে এনেই রাখব, চিকিৎসা চালাব।’

হাফিজ আশ্বস্ত করে, দ্রুতই ও লোকটার নাম ঠিকানা যোগাড় করবে। দেবদ্যুতি অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে হাফিজকে বিদায় দেয়।

হাফিজ চলে যেতেই দেবদ্যুতি ভাবতে বসে, লোকটা এখন কী করছে? এর মাঝে অন্য কারও ক্ষতি করে ফেলেনি তো? ওর হিসেবে আগামি কিছুদিন হয়তো কিছু করবে না। না করলেই ভালো। লোকটাকে একবার হাতে পেলেই হয়, বাকিটা ওর ঠিক প্ল্যান করা আছে। কী ভেবে নির্মলাকে ডেকে পাঠায়। ও আসতেই দেবদ্যুতি চোখ তুলে তাকিয়ে বলে, ‘নির্মলা, আমাদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে খুব শীগগিরই আরেকটা রুম খালি করতে হবে। সেদিনের সেই সাইকোপ্যাথ লোকটা আশা করি দ্রুতই ধরা পড়বে। আমি চাই তুমি আগে থেকেই সব গুছিয়ে রাখো, যাতে পরে কোনো ঝামেলা না হয়।’

নির্মলা নিঃশব্দে মাথা নাড়ে, তারপর বলে, ‘আপা, আপনি চিন্তা করবেন না, আমি সব নিখুঁত ব্যবস্থা করে রাখব।’
***********

রিতা মন দিয়ে টিভিতে একটা সিরিয়াল দেখছিল। রঞ্জু পাশে বসেই স্কুলের হোমওয়ার্ক করছিল। রাত আটটা বাজে। ঠিক এসময় কলিং বেলটা বেজে ওঠতেই রিতা উঠে গিয়ে দরজা খুলে অবাক হয়ে দেখে একজন ভদ্রমহিলা সাথে আরেকজন লোক, অপরিচিত। লোকটা ওকে সালাম দিয়ে বলে, ‘এটা তো রইস উদ্দিনের বাসা? উনি আছেন?’

ক’দিন আগেই হাফিজ দেবদ্যুতিকে জানিয়েছিল যে লোকটার আসল নাম রইস উদ্দিন। কৌশলে ও অফিস থেকে লোকটার বাসার ঠিকানাও নিয়ে নিয়েছে। তাই আজ আসা।

রিতা মাথা নেড়ে বলে, ‘হ্যাঁ, কিন্তু উনি তো বাসায় নেই। গ্রামের বাড়ি গেছে একটা কাজে।’

দেবদ্যুতি এবার নরম গলায় বলে, ‘আচ্ছা। আপনি ওনার স্ত্রী তো? আপনার সাথে আমি একটু কথা বলতে চাই।’

রিতা একটা বিপদের ঘ্রাণ পায়, বুকটা দুরুদুরু করে ওঠে। রইস কোনো ঝামেলার কিছু করেনি তো? এরাই বা কী চায় ওর কাছে? সাথের লোকটা যেন কেমন রুক্ষ। মহিলাটা অবশ্য ভালো। রিতা একটু ঢোঁক গিলে ওদের বাসার ভেতরে আসতে বলে।

ওরা এসে ভেতরে বসে। রিতা উদবিঘ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘বলেন তো কী হয়েছে?’

দেবদ্যুতি আশ্বাসের সুরে বলে, ‘আপনি ভয় পাবেন না, তেমন কিছু হয়নি। তবে আপনার সাহায্য খুব দরকার যাতে আপনার স্বামী রইস ভালো হয়ে যায়। আপনি কী জানেন আপনার স্বামী ক’দিন আগে একজন মানসিক চিকিৎসক দেখিয়েছেন?’

রিতা যেন আকাশ থেকে পড়ে, মাথা নেড়ে বলে, ‘না তো। আমাকে তো কিছু বলেনি।’

দেবদ্যুতি ছোট্ট করে একটা নিশ্বাস ছাড়ে, তারপর বলে, ‘আমিই সেই ডাক্তার, ডা. দেবদ্যুতি। উনি আমার কাছেই এসেছিলেন সেদিন। আমি আপনাকে রইসের কিছু সমস্যার কথা বলব আপনি মন দিয়ে শুনবেন। তবে কারো সাথে আপাতত শেয়ার করবেন না।’

এরপর দেবদ্যুতি সহজ করে প্রথমে এই ধরনের মানুষ কারা তা বলে। তারপর যতটুকু না বললেই না তা বলে। দেবদ্যুতি খেয়াল করে রিতার মুখটা বিস্ময়ে হা হয়ে গেছে, অবিশ্বাসের সুরে বলে, ‘এমন হতেই পারে না, আমি বিশ্বাস করি না।’

দেবদ্যুতি একটা মন খারাপের হাসি হাসে, তারপর বলে, ‘আমার কাছে ভিডিও আছে, আপনি দেখলে সহ্য করতে পারবেন না। আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, আমি আপনার স্বামীর ভালো চাই। ওনাকে সুস্থ করে তুলতে চাই।’

রিতা পাথরের মূর্তির মতো বসে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর শুন্য চোখে তাকিয়ে বলে, ‘আমাকে কী করতে হবে?’

দেবদ্যুতি এবার রিতার হাতটা ধরে বলে, ‘উনি গ্রাম থেকে ফিরে এলে আমাদের একবার খবর দেবেন। তার আগে ওনাকে কোনোভাবেই কিছু বলবেন না, তাতে হিতে বিপরীত হবে।’

রিতা মাথা নেড়ে বলে, ‘আচ্ছা। আপা, আমার স্বামীরে ভালো করে দেন। এখন আমারও তাই মনে হচ্ছে, ওর কিছু কিছু জিনিস আমারও সন্দেহ হতো। এমন মানুষের সাথে থাকতেও ঘেন্না।’

কথাগুলো বলে রিতা কেঁদে ফেলে, দেবদ্যুতি পরম মায়ায় রিতাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে থাকে।

সেদিন বাসায় ফিরে রাতে যখন ঘুমোতে যায় তখন দেবদ্যুতি ভাবতে থাকে, লোকটা হঠাৎ গ্রামে কেন গেল? নিজের সেই কষ্টের শৈশব খুঁজে বেড়াতে?

(চলবে)

মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সুবাস
শিমুলতলী, গাজীপুর
১৪/০৪/২০২২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here