অন্ধকারের_মানুষ (পর্ব৪)

#গল্প১৪১

১৮+ সতর্কতা

#অন্ধকারের_মানুষ (পর্ব৪)

দেশের সর্ব উত্তরের একটা জেলার বাজার, জালাসী বাজার। এখানে আজ পাকা লাল টুকটুকে সুপারি বিক্রির বাজার বসেছে। সুপারির মৌসুমে আশেপাশের সব গ্রাম থেকে সুপারি আসে। এবারের সুপারিগুলো আকারে বড়, তাই দামও বেশি। রইস ওর সৎ ভাই নিয়ামতের সাথে এসেছিল সুপারির বাজার দেখতে। দিন দিন এখানকার সুপারির কদর বাড়ছে। নিয়ামত দুই কাহন (এক বস্তা) সুপারি নিয়ে আসছে আজ বাজারে। লোকজন দাম দর করে যায়। শেষ পর্যন্ত দুই কাহন সুপারি সাড়ে চার হাজার টাকায় বিক্রি হয়। নিয়ামতকে বেজায় খুশি খুশি লাগে। আনন্দিত গলায় বলে, ‘চল ভাই, হোটেলে চা খামও।’

রইস মাথা নেড়ে সায় দিতেই ওরা বাজারের এককোনে একটা চা স্টলে বসে। আয়েশ করে চা খেতে খেতে রইস আগ্রহের সাথে জিজ্ঞেস করে, ‘নিয়ামত, এক কাহনে যেন কয় পন, ভুলে গেছি?’

নিয়ামত হাসে, ভাই শহরে থাইকা সব ভুইলা গেছে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলে, ‘এক পনে থাকে ৮০টা সুপারি, আর ১৬ পনে এক কাহন।’

রইস পকেট থেকে মোবাইল বের করে হিসেব করে, প্রতিটা সুপারি সাড়ে তিন টাকা করে। বাহ, ভালোই তো লাভজনক।

চা শেষ করে দু’জনে গ্রামে ফেরার পথ ধরে। এই গ্রামের প্রায় প্রতিটা বাড়িতেই সুপারি গাছের সারি। ধানের পাশাপাশি অনেক জমিতেই সুপারির বানিজ্যিক চাষ হয়। রইসের বাড়ি এই গ্রামেই। এখানে থাকার মধ্যে এখন ওর সৎ ভাই নিয়ামত আছে। প্রথম যেদিন আসলো তখন নিয়ামত খুব অবাক হয়েছে সেই সাথে একটা ভয়ও কাজ করেছে। রইস না আবার ওর ভাগের সম্পত্তি দাবি করে। কিন্তু রইস যখন জানাল যে ও এমনিই এসেছে তখন নিয়ামত যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে।

নিয়ামতের অবস্থা খুব একটা ভালো না, সুপারি বেচে কোনোমতে চলে। বাড়িঘর সেই আগেরমতোই আছে, নতুন একটা ঘর উঠেছে। রইস বাবার সাথে যে ঘরটায় থাকত সেটাতে ওর থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। রাতে খাবার খাওয়া শেষে দুই ভাই অনেকক্ষণ গল্প করে। রইস আগ্রহ দেখায় সুপারি চাষে বিনিয়োগ করার, নিয়ামত উৎসাহ দেয় ওকে।

রাত বাড়লে রইস যখন ঘুমোতে যায় তখন আড়চোখে পাশের সেই ছোট্ট ঘরটার দিকে তাকায়, কেমন একটা ভয় ভয় লাগে ওর। রাত যত বাড়ে ওর ভয়ের মাত্রা বাড়তে থাকে, সাথে ওই ঘরটাতে যাবার ইচ্ছেটা তীব্র হতে থাকে। একটা সময় ও আর পারে না, ধীরে ধীরে পাশের রুমটাতে ঢোকে, ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটা তক্তপোশে আচ্ছন্নের মতো বসে, তারপর শুয়ে পড়ে। মুহুর্তে রইস ওর সেই ফেলে আসা শৈশবে ফিরে যায়। হঠাৎ ও ঘোরের মাঝে পাশের রুমে ফিসফিস শব্দ পায়, মাঝে মাঝে চাপা খিলখিল হাসির। রইস দু’হাতে কান চাপা দেয়, কিন্তু শব্দটা আসছেই। একটু পর কেমন একটা অদ্ভুত শব্দ হতে থাকে সেই সাথে খাট নড়ার একটা বিশ্রী শব্দ। হঠাৎ করেই রইস নাকে একটা তীব্র পচা গন্ধ পায় যেটা ইদানীং ও খুব ঘন ঘন পাচ্ছে। রইস অসহায়ের মতো এদিক ওদিক তাকায়, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, আচ্ছনের মতো পাশের রুমে যায়।

রইস চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে, এখনই বাবা আসবে, ওর কান ধরে মারবে। ভয়ে রইসের পিঠটা কুঁকড়ে ওঠে। এমন যখন হচ্ছে ঠিক তখন ফজরের আজানটা দেয়, রইস সম্বিত ফিরে পায়। দেখে ও ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। চোখটা খুলে, কেউ নেই এই ঘরে। সেই ভুতুড়ে শব্দগুলো উধাও। রইস ক্লান্ত অবসন্ন পায়ে ঘুমোতে যায়।

পরদিন বেশ বেলা করে রইসের ঘুম ভাঙে, নিয়ামত হেসে বলে, ‘শহরে থাইকা এমনি অভ্যাস হইসে সকালে উঠতে পারো না,জোহরা তর তানে আন্দিসে, আর ডিম ভাজিসে, যা মুখ ধুইয়া আয়।’

রইস লজ্জিত মুখে হাসে, আসলেই অনেক দেরি করে ঘুম ভাঙল ওর আজ। মুখটা ধুয়ে খেতে বসে। খেতে খেতে রইস হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, ‘নিয়ামত, ওই ছোট ঘরটায় একটা পচা গন্ধ পাইলাম, ইঁদুর মরছে মনে হয়।’

নিয়ামত হাসে, বলে, ‘ভাই, তুই কি সব ভুলে গেসিস, তুই জানিস না ঐ ঘরে কাঁচা সুপারি ভিজে রাখি, কাঁচা সুপারি তো গন্ধ করবেই। এই সুপারি ভাদ্র আশ্বিনে খাইতে মজা করে, দামও অনেক।’

রইস একটা ধাক্কা খায়, হঠাৎ করেই একটা ধাঁধার উত্তর ও পেয়ে যায়। সেই ছোটবেলায় বাবাও এমন করত, সুপারি মাসের পর মাস ভিজিয়ে রাখত। তাতে কাচা সুপারির কষটা চলে যেত। রইস ভাবে, ও তাহলে এই পচা সুপারির গন্ধটা পায়? কিন্তু কেন? এই গন্ধের সাথে কী ওই বাজে স্মৃতিগুলো জড়িত?

এরপর আর বেশিদিন রইস গ্রামে থাকে না। ওর উত্তর ও পেয়ে গেছে। দু’দিন পরই ও ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
*******************

গ্রাম থেকে ফিরে আসার পর রইস খেয়াল করে রিতা খুব গম্ভীর, খুব দরকার ছাড়া কথাই বলে না। কী হলো আবার! একা একা ও এতদিন গ্রামে কাটিয়ে এল সেজন্য রাগ? ঠিক বুঝতে পারে না রইস। পরদিন বিকেলে ও যখন বলে একটু বাইরে যাচ্ছে সিগারেট কিনতে, তখন রিতা গম্ভীরমুখে বলে, ‘তাড়াতাড়ি ফিরে আসবা, কাজ আছে।’

রইস একটু ভ্রু কুঁচকে তাকায়, কিছু বলে না। রইস চলে যেতেই রিতা সেই ডাক্তার আপাকে ফোন দিয়ে জানে যে ওনারা কাছাকাছি চলে এসেছে, আধা ঘন্টা লাগবে। রিতার কেমন একটা অনুভূতি হচ্ছে, সাথের মানুষটা সত্যিই এমন অন্ধকারের মানুষ? সেদিন ডাক্তার আপা চলে যাবার পর ও একদিন গিয়েছিল ওনার কাছে। জোর করেই সেদিনের ভিডিওটা দেখেছিল, মনের মাঝে যে ক্ষীণ অবিশ্বাস ছিল তাও সেদিন দূর হয়ে গিয়েছিল। রিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে আজ ওর মুক্তি, এদের হাতে রইসকে তুলে দিতে হবে চিকিৎসার জন্য। কিন্তু পরিচিত মানুষকে ও কী বলবে? ওর স্বামী মানসিকভাবে অসুস্থ? ভেবে কোনো সমাধান পায় না রিতা।

দেবদ্যুতি আর পুলিশ অফিসার হাফিজ যখন আসে তখনও রইস ফেরেনি। রিতা এবার ফোন করতেই বলে ও একটু কলোনীর পাশের ফাঁকা মাঠটায় এসেছে। পাশের বাড়ির নীলা ভাবির ছোট্ট মেয়ে আলতা নাকি বায়না ধরেছিল মাঠে যাবে। কিন্তু ওর বাবা বাসায় নেই তাই ভবি ওকে অনুরোধ করেছে একটু বেড়িয়ে নিয়ে আসতে। কথাটা শুনেই দেবদ্যুতির চোখটা জ্বলে ওঠে। দ্রুত হাফিজকে ইশারা করে বলে, ‘সর্বনাশ, এখনই যেতে হবে পার্কে, মেয়েটা বিপদে আছে। না জানি এতক্ষণে কোনো বিপদ হয়ে গেল মেয়েটার। রিতা তুমিও চলো, আমাদের পথটা চিনিয়ে দাও।’

রিতার মুখ শুকিয়ে আসে, কী বলছে এই ডাক্তার! রিতা ছেলেকে পাশের বাসার ভাবির কাছে রেখে দ্রুত বের হয়ে যায় ওদের নিয়ে।

বেশিক্ষণ লাগে না জায়গাটায় পৌঁছাতে। রিতা আকুল হয়ে রইসকে খোঁজে, কোথাও নেই রইস। রিতাসহ সবাই উদভ্রান্তের মতো এদিক ওদিক ছুটে বেড়ায়। তারপর হঠাৎ করেই মাঠের যেদিকটায় ঝোপঝাড় সেদিকটায় রইসকে পেছন ফেরে দেখতে পায়। রইসের পরা নীল শার্টটা রিতা পেছন থেকে চিনতে পারে। এক ছুটে ও রইসের কাছে যায়, পেছন পেছন দেবদ্যুতি আর হাফিজও দৌড়ায়। রিতা কাছে এসে রইসের উপর ঝাপিয়ে পড়ে, পাগলের মতো বলে, ‘আলতা কই, বল শয়তান?’

হাফিজ দ্রুত চারপাশে চোখ বোলায়, কোথাও মেয়েটাকে দেখা যাচ্ছে না। একটা আতংক ভর করে হাফিজের মধ্য। দেবদ্যুতি শান্ত গলায় বলে, ‘রইস, আলতা তোমার মেয়ের মতো, ও কোথায় শীগগির বলো।’

রইস হঠাৎ করে রিতার আক্রমণে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। দেবদ্যুতিকে দেখে ও বুঝতে পারে রিতা সব জেনে গেছে। ওর ছেলে রঞ্জুও কী সব জানে? রইসের মাথার ভেতর কেমন একটা জট পাকিয়ে যেতে থাকে। এদিকে রইসকে কথা বলতে না দেখে হাফিজ আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারে না, রইসের কলার ধরে পাগলের মতো ঘুষি মারতে থাকে, আর হিসিয়ে বলতে থাকে, ‘বল হারামজাদা, আলতা কই?’

দেবদ্যুতি হঠাৎ চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘ওই যে আলতা, এদিকেই আসছে।’

ওর কথাতে সবাই ঘুরে তাকায়, দেখে ওদের পেছন থেকে একটা বছর পাঁচেকের মেয়ে হাতে বেলুন নিয়ে এদিকেই আসছে। কাছে আসতেই অবাক চোখে তাকিয়ে বলে, ‘তোমরা চাচুকে মারছ কেন?’

রিতা দৌড়ে আলতার কাছে যায়, দুই হাতে ওকে বুকে চেপে ধরে সারা গায়ে হাত বোলাতে থাকে।

দেবদ্যুতিও মেয়েটার কাছে যেয়ে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে, তারপর টুকটাক কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করে মেয়েটাকে। উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে ও মাথা নেড়ে বলে, ‘না, মেয়েটার সাথে খারাপ কিছুই করেনি রইস।’

হাফিজের হাতের মুঠোটা আলগা হয়ে যায়, রইস ওদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।
**********

সিলভার লাইন নামে একটা ছোট্ট পুনর্বাসন কেন্দ্রে রিতা বসে আছে। ডা. দেবদ্যুতি এটা নিজে তদারকি করেন। নিজের বাসার দোতলাতেই এটা করেছেন। এই পুনর্বাসন কেন্দ্রটায় ওর ধ্যানজ্ঞান। কী এক অজ্ঞাত কারণে বিয়েটাও করেননি। রিতা
ওনাদের পরামর্শেই আপাতত সাত দিনের জন্য এখানে নিয়ে এসেছে রইসকে। এরপর প্রতি সপ্তাহে একবার করে আসতে হবে। দেবদ্যুতি আশ্বাস দিয়েছে ওরা যথাসম্ভব চেষ্টা করবে রইসের অসুখটা সারিয়ে দিতে। রিতা মন খারাপ গলায় বলে, ‘তোমার অসুখ করেছে, এই ডাক্তার আপা যা বলে তা শুনবা।’

রইস মাথা নিচু করে বসে আছে। ভাবে, এটা একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। এখন আর লুকোছাপা নেই। ও শুধু মাথা নাড়ে রিতার কথায়। এরপর কিছুক্ষণ থাকে রিতা, তারপর চলে যায়।

বিকেলে দেবদ্যুতি আসে। রইসকে নিজের চেম্বারে নিয়ে আসতে বলে নির্মলাকে। রইস নত মুখে চেম্বারে ঢুকতেই দেবদ্যুতি ওকে চেয়ারে বসতে বলে। দেবদ্যুতি এক দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর বলে, ‘আপনি একজন মনোবিকারগ্রস্ত মানুষ, একজন সেক্সুয়াল সাইকোপ্যাথ। সেই যে প্রথম যেদিন বললেন আপনি নাকে পচা গন্ধ পান, এটা আসলে আপনার বানানো। আসলে আপনি যখন ওই খারাপ কাজটা করার তীব্র ইচ্ছা হয় তখন এই গন্ধটা পান। যাতে আপনি আপনার এই বাজে কাজটা পচা গন্ধের উপর চালিয়ে দিতে পারেন সেজন্যে।’

রইস একটু চুপ থাকে, তারপর বলে, ‘না আপা। গন্ধটা আমি কেন পাই তা এখন জানি।’

এরপর রইস গ্রামের পুরো গল্পটা বলার পর দেবদ্যুতি ভ্রু কুঁচকে তাকায়, হতে পারে এমন। লোকটার শৈশবের সেই দুঃসহ স্মৃতি হয়ত কোনোভাবে এর সাথে সম্পর্কিত।

দেবদ্যুতি মাথা নেড়ে বলে, ‘একটা ব্যাপার মাথায় ঢুকছে না, আপনি আলতা মেয়েটাকে ছেড়ে দিলেন কেন? আপনার মতো মানুষের সাথে তো এটা যায় না।’

রইস দূরে কোথাও তাকিয়ে থাকে, তারপর দূরাগত গলায় বলে, ‘আলতা বানু আমার মায়ের নাম ছিল।’

দেবদ্যুতি চমকে ওঠে, আচ্ছা, এজন্যই লোকটা এখানে দূর্বল। নিজেকে সামলাতে পেরেছে। যাক, এই তথ্যটা কাজে লাগবে।

আরো কিছু টুকটাক জিজ্ঞেস করে ওকে ওর রুমে নিয়ে যেতে বলে নির্মলাকে।
*************************

রাত বাড়ে, রইস নিজের রুমে লাইট নিভিয়ে একটা চেয়ারে বসে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ করেই দরজার তালা খোলার শব্দ হয়, অবাক হয়ে পেছনে তাকায়, কে এলো এই সময়?

রইস অন্ধকারে ঠাউর করে ওঠতে পারে না, আবছায়াতে বোঝা যায়, দু’জন মানুষ ঢুকেছে ওর রুমে। দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়। রইস উঠতে যেতেই কেউ একজন ওর কাঁধ চেপে বসিয়ে দেয়। রইসের এখন ভয় লাগছে। ভয়ার্ত গলায় বলে, ‘কে আপনারা?’

একটা পরিচিত গলা শোনা যায়, ‘আমরা তোর মতোই মানুষ।’

ডা. দেবদ্যুতির গলা এটা! বিস্ময়ে মুখ হা হয়ে যায় রইসের। ডাক্তার সাহেবের গলাটা এখন বিকেলের মতো নরম লাগছে না, বরং অনেকটাই কর্কশ।

দেবদ্যুতি ঠান্ডা গলায় বলে, ‘একটু পার্থক্য আছে। তুই যে ধরনের সাইকোপ্যাথ আমরা একটু অন্য রকমের। বলতে গেলে তোদের মতো পুরুষের জন্যই আমরা এমন। তোর মতো মানুষ আমার কাছে ধরা পড়বে এটা আমার বহুদিনের ইচ্ছা। সেই যখন কলেজ পেরিয়ে আমার রঙিন স্বপ্ন দেখার সময় ঠিক তখন তোর মতো একটা জঘন্য মানুষ আমার সব কেড়ে নিতে চেয়েছিল। তখন আমার সাহস ছিল কম, বাবা মাও মান সম্মান চলে যাবার ভয়ে চেপে গিয়েছিল। হ্যাঁ, মান সম্মান ঠিকঠাক ছিল, কিন্তু আমি আর ঠিক থাকতে পারিনি কখনো। আমার মনে তোদের মতো পুরুষদের উপর ঘৃণাটা শুধুই বেড়েছে। তাই তো আমি সারাজীবন একাই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আহ, কী শান্তি! তুই আমার জালেই এসে পড়েছিস। আমি মনে মনে কত অপেক্ষা করেছি তোর মতো একটা পুরুষকে আমি নিজ হাতে তিলে তিলে শাস্তি দেব। প্রথম যেদিন বুঝতে পারলাম তুই অমন একটা পচা মানুষ তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম মামলা করব না। আমি চাইলে সেদিনের সেই ভিডিওটা পুলিশকে দিয়ে দিতে পারতাম, রেপ এন্ড মার্ডারের কেস দিতে পারতাম। দেইনি, আমি চাইছি নিজ হাতে তোকে শাস্তি দেব। এজন্যই এত কষ্ট করলাম। নির্মলা প্লাসটা দে, এবার ওর একটা একটা করে আঙুল ভাঙব। তাড়াহুড়ো নেই আমার।’

শেষের কথাটা দেবদ্যুতি বরফ ঠান্ডা গলায় বলে,
ভয়ে রইসের সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। এরা কী বলছে!

ইতিমধ্যে নির্মলা নামের দশাসই মহিলাটা ওকে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলেছে। দেবদ্যুতি আরেকটা চেয়ার নিয়ে ওর মুখোমুখি বসে। হাতে একটা বড় প্লাস, সেটা দিয়ে রইসের গায়ে বুলিয়ে দেয়। রইস একটা ঠান্ডা ধাতব স্পর্শে কেঁপে ওঠে। এই নরম সরম ডাক্তারকে এখন দারুণ ভয় লাগছে। আতংকিত গলায় বলে, ‘আমি পুলিশকে সব বলে দেব।’

দেবদ্যুতি একটা ঠান্ডা হাসি হাসে, তারপর বলে, ‘পুলিশ তোর কথা বিশ্বাস করবে না। আর তুই ভুলে যাস কেন, তোর ভিডিও আছে আমার কাছে। এই কেসে তোর মিনিমাম দশ বছরের জেল তো হবেই, যাবজ্জীবনও হতে পারে। সবাই জেনে যাবে তখন তুই একটা জঘন্য মানুষ, তোর ছোট্ট ছেলেটাও জেনে যাবে। তাই আমি যখন যেমন চাইব তুই ঠিক তেমন এখানে চলে আসবি। তোর মতো মানুষদের তিলে তিলে শাস্তি দিতে আমার খুব ভালো লাগে।’

রইস আতংকিত চোখে সামনের দু’জনের দিকে তাকিয়ে থাকে। দেবদ্যুতি আর নির্মলাও চকচকে চোখে ওদের এই নতুন শিকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। রইস
হঠাৎ করেই বুঝতে পারে ওর আসলে এদের হাতে সমর্পণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। বিশেষ করে ছেলেটার মুখ মনে হতেই ও ভীষণ কুঁকড়ে যায়।

শহরের বেশিরভাগ মানুষ এখন ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু সিলভার লাইন পুনর্বাসন কেন্দ্রের এই অন্ধকার ঘরটায় কয়েকজন অন্ধকার মানুষের নিশ্বাসের শব্দের ওঠানামা শোনা যায়।

চলবে

মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সুবাস
শিমুলতলী, গাজীপুর
১৬/০৪/২০২২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here