অন্ধকারের_মানুষ (পর্ব ৬)

#গল্প১৪১

১৮+ সতর্কতা

#অন্ধকারের_মানুষ (পর্ব ৬)

কালাম আজ কয়েকদিন ধরেই সিলভার লাইন পুনর্বাসন কেন্দ্রের উপর নজর রেখেছে, কিন্তু তেমন কিছুই চোখে পড়ে নাই। রাহাত স্যার এইটা কী কাজ দিল! একবার ভেতরে ঢুকছিল, রোগী ভর্তির নিয়ম জানতে। সেই ফাঁকে ডাক্তার আপাকে একবার দেখেছে, সহজেই চেনা গেছে ওনাকে। অন্য সবার থেকে আলাদা। নির্মলাকে অবশ্য চোখে পড়েনি। স্যার বলছিলেন বেশ লম্বা চওড়া একজন।

সেদিন বিকেলে অবশ্য একটা ঘটনা ঘটে। কালাম আশার আলো দেখে, যাক, এতদিনে একটা কাজ পাওয়া গেল। সেই ডাক্তার আপা গেট দিয়ে বের হয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে একটা সিএনজি নিতেই কালাম মোটরবাইকটা স্টার্ট করে। কাউকে লুকিয়ে অনুসরণ করাতে ওর জুড়ি মেলা ভার। আর কাজটা করতে ওর ভালোই লাগে।

প্রায় মিনিট চল্লিশ পর সিএনজিটা একটা তিন তলা বাড়ির সামনে এসে থামে। কালাম দূরত্ব বজায় রেখেই মোটরবাইকটা পার্ক করে। দূর থেকে দেখতে পায় ডাক্তার আপা সিনজি থেকে নেমে বাড়িটার ভেতর ঢুকল। কালাম পায়ে পায়ে বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ায়, গেটের উপর একটা সাইনবোর্ডে বড় বড় করে লেখা, ‘ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, মনোচিকিৎসক’।

কালাম একটু চিন্তা করে, কী করবে এখন? বাড়ির ভেতর ঢুকবে কী করে? ওকে এমন গেটের কাছে ঘোরাঘুরি করতে দেখে দারোয়ানটা বলে, ‘কী ডাক্তার দেখাইবেন?’

কালাম একটু থতমত খেয়ে বলে, ‘হ, সিরিয়াল দিতে আসছিলাম।’

দারোয়ানটা গেট খুলে বলে, ‘ভেতরে চইলা যান, নিচতালতে চেম্বার। লিটন নামে একজন আছে, ওই সিরিয়াল নেয়।’

কালাম এবার ভেতরে ঢোকে। দেখে, কিছু মানুষ ডাক্তার দেখানোর অপেক্ষায় বসে আছে। কালামও এক কোণে যেয়ে বসে অপেক্ষা করতে থাকে। প্রায় পনের মিনিট পর সেই ডাক্তার আপাটা বের হয়। কালাম অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে আড়চোখে দেখে দেবদ্যুতি কোনোদিকে না তাকিয়ে বের হয়ে গেল।

কালাম ঠিক তিন মিনিট পর বের হয়ে দেখে রাস্তায় কেউ নেই। আহা, চলে গেছে তাহলে। আচ্ছা যাক, অন্তত আজকের এই খবরটা রাহাত স্যারকে দিতে পারবে।
******************

রাহাত মন দিয়ে কালামের কথা শুনছিল। একটু আগেই ও ফোনটা করেছে। রাহাত ভ্রু কুঁচকে ভাবে দেবদ্যুতি আরেকজন মনোচিকিৎসকের কাছে কেন গেল? নিজের কোনো প্রয়োজনে নাকি ওনার রোগীদের প্রয়োজনে? নাহ, ব্যাপারটা জানা দরকার, কিন্তু কী করে? ডাক্তার মোস্তাফিজ তো ওনার রোগীর সমস্যা সম্পর্কে কিছুই বলবেন না, তাহলে উপায়? ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটা কথা মনে হতেই ও কালামকে আবার ফোন দেয়, তারপর বলে, ‘কালাম, ডাক্তার সাহেবের সিরিয়াল নেয় যে লোকটা, লিটন, তার কাছ থেকে তুই একটা তথ্য বের করে দিবি। সেটা হলো দেবদ্যুতি কেন ওই ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল। পারবি না?’

ওপাশ থেকে কালাম হাসে, তারপর বলে, ‘এইটা স্যার কোনো কাম হইল? কিছু টেকা পয়সা খরচ হইব দিয়া দিয়েন।’

এর ঠিক তিনদিন পর রাহাত বিকেলে বসে বসে চা খাচ্ছিল আর ভাবছিল রইস কী ভালো আছে? ওর উপর নতুন করে কিছু হয়নি তো? এই যখন ভাবছে ঠিক তখন কালামকে দরজায় উঁকি দিতে দেখেই ইশারা করে ভেতরে আসতে। তারপর বলে, ‘কি রে, কিছু পেলি।’

কালাম হেসে বলে, ‘স্যার আমি কি কখনো কোনো কামে ফেইল মারছি? ওই মহিলা নাকি অনেক আগে প্রায়ই যাইত চিকিৎসার জন্য। মাঝখানে অনেক দিন যায় নায়। এখন থেকে নাকি আবার নিয়মিত সপ্তাহে একবার যাইব।’

রাহাত ভ্রু কুঁচকে তাকায়, ‘কী বলিস! তারমানে দেবদ্যুতি মানসিকভাবে অসুস্থ? ইশ, যদি জানা যেত কী সমস্যা!’

কালাম এবার মোবাইলটা বের করে একটা ছবি রাহাতের মোবাইলে ফরোয়ার্ড করে, বলে, ‘স্যার, আমি তো ইংরেজি অতটা বুঝি না। ওই লিটনরে ঘুষ দিয়া ওই মহিলার ফাইলের একটা ছবি নিয়া আসছি। লিটন কইল ওইটাতে নাকি কি কেস হিসটোরি লেখা আছে।’

রাহাত অবাক চোখে তাকায়, তারপর রাগের গলায় বলে, ‘এইটা কে করতে বলছে তোরে? খুব খারাপ কাজ করছিস।’

কালামের হাসিমুখটা কালো হয়ে যায়, আমতা আমতা করে বলে, ‘স্যার, আমি ভাবছি আপনি খুশি হবেন। আর লিটনও কইল এইখানে নাকি অসুখটার কারণ লেখা আছে।’

রাহাত বিরক্ত গলায় বলে, ‘আচ্ছা তুই এখন যা। আপাতত ওই সিলভার লাইনে নজর রাখ।’

কালাম চলে যেতেই রাহাত ইতস্ততভাব নিয়ে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকে। কালামের পাঠানো ছবিটা ডিলিট করে দিতে হবে। ছবিটা বের করে ডিলিট করতে যেয়েও করে না, একটা শব্দে চোখ আটকে যায়, sexual harrasment at adolescent. রাহাত এবার পুরো কেস হিস্ট্রিটা পড়ে। পড়তে পড়তে ওর চোখ বড় হয়ে যায়, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ও খেয়াল করে এই দেবদ্যুতি রইসের মতো লোকের দ্বারাই যৌন হয়রানির শিকার! এর জন্য ওনার মনে একটা ট্রমা সৃষ্টি হয়েছে। দেবদ্যুতির জন্য মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়, কিন্তু এর পাশাপাশি এটাও ভাবে, একজন এমন মানুষের কাছে রইসের মতো লোক নিরাপদ থাকে কী করে? রইসকে দেখে নিশ্চয়ই পুরনো বাজে স্মৃতিটা ফিরে এসেছে। দেবদ্যুতি তাই বুঝি এতদিন পর আবার ডাক্তারের শরাপন্ন হয়েছে?

নাহ, ডাক্তার মোস্তাফিজের সাথে এবার নিজেই ও দেখা করবে।
**************

ডা. মোস্তাফিজ মন দিয়ে একটা রোগীর কেস হিস্ট্রি দেখছিলেন। ঠিক এমন সময় লিটন উঁকি দেয়, বলে, ‘স্যার, এক পুলিশ অফিসার আপনার সাথে দেখা করতে চায়।’

মোস্তাফিজ চোখ কুঁচকে তাকায়, বলে, ‘আমার কাছে! সে কী পেশেন্ট?’

লিটন না সূচক মাথা নাড়তেই মোস্তাফিজ বলে, ‘আচ্ছা, নিয়ে আয়।’

রাহাত ভেতরে ঢুকেই সালাম দিয়ে বলে, ‘স্যার, একটা জরুরি কাজে আসতেই হলো।’

মোস্তাফিজ গম্ভীরমুখে বলে, ‘অসুবিধে নেই, বলুন।’

রাহাত একটু গুছিয়ে নিয়ে বলে, ‘স্যার, আমি একটা কেস নিয়ে তদন্ত করছি। আসলে কেস বলা ঠিক হবে না। একটা ছোট্ট সন্দেহ সেখান থেকে কিছু প্রশ্ন এসেছে যার উত্তর কেবল আপনিই দিতে পারবেন।’

মোস্তাফিজ মাথা নাড়ে, বলে, ‘কী প্রশ্ন, শুনি।’

রাহাত ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে বলে, ‘স্যার, একজন মানুষ যে কিনা নিজেই সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের শিকার সে কী আরেকজন মানুষ যে এই জঘন্য কাজটা করে তার চিকিৎসা করতে পারে? সেখানে কী হ্যারাসমেন্টের শিকার মানুষটা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠতে পারে না?’

ডা. মোস্তাফিজ একটু ভেবে বলে, ‘তা হতেই পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে মনের ক্ষতটা সারে না। সেক্ষেত্রে অমন মানুষকে কাছে পেলে সেই ব্যক্তি প্রতিশোধপরায়ণ হতেই পারে। কিন্তু এটা জানতে আমার কাছে কেন, বলুন তো?’

রাহাত কিছুক্ষণ চুপ থাকে, তারপর বলে, ‘যে দু’জন মানুষের কথা বলছি তার একজন দেবদ্যুতি আরেকজন রইস উদ্দিন যে কিনা ওনার পেশেন্ট।’

মোস্তাফিজ এবার সোজা হয়ে বসেন, ভ্রু কুঁচকে বলেন, ‘সিলভার লাইনের ডা. দেবদ্যুতি! কী বলছেন আপনি? আপনি ওর ব্যাপারে জানলেনই বা কী করে!’

রাহাত একটু হেসে বলে, ‘স্যার পুলিশকে অনেককিছু জানতে হয়।’

মোস্তাফিজ গম্ভীরমুখে বলে, ‘হুম। তাহলে আপনার ভাষ্যমতে রইস একজন সেক্সুয়াল সাইকোপ্যাথ যে দেবদ্যুতির ওখানে ভর্তি। তাহলে তো কিছুটা চিন্তারই ব্যাপার। কিন্তু দেবদ্যুতি এমন কিছু করার কথা না, ও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।’

রাহাত মাথা নাড়ে, বলে, ‘স্যার, ইতিমধ্যে রইসের একটা আঙুল ভেঙেছে। আমার ধারণা এটা ওখানকার কারোরই কাজ।’

মোস্তাফিজ অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে বলেন, ‘আপনার কাছে কোনো প্রমাণ আছে? কী আবোলতাবোল বলছেন।’

রাহাত মাথা নাড়ে, ‘তেমন শক্তপোক্ত প্রমাণ অবশ্য নেই। কিন্তু খুব শীগগিরই আমি প্রমাণের ব্যবস্থা করব। তখন আপনার সাহায্য আমার লাগবে।’

মোস্তাফিজ আনমনে মাথা নাড়েন। দেবদ্যুতি তো এটা বলেনি ও এমন একটা সেক্সুয়্যাল সাইকপ্যাথের চিকিৎসা করছে। নাহ, বড্ড চিন্তার ব্যাপার।

এরপর আর কথা তেমন এগোয় না। রাহাত ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নেয়।

সেদিন অফিসে ফিরেই রাহাত ভীষণ চিন্তায় পড়ে যায়। ডাক্তার সাহেবের কথাতে মনে হলো রইস ওখানে নিরাপদ থাকার কথা না যদিও উনি দেবদ্যুতির জড়িত থাকার কথাটা সরাসরি বললেন না। নাহ, কিছু শক্তপোক্ত প্রমাণ দরকার, সেটা কী করে? ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটা কথা মনে হতেই মুখটা উজ্জ্বল হয়ে যায়। দ্রুত ও হাফিজকে ডাকে, তারপর এতদিনের পুরো ব্যপারটা খুলে বলতেই হাফিজ যেন একটা ধাক্কা খায়। দেবদ্যুতি ম্যাডাম! বিশ্বাসই হয় না,কী বলছে স্যার এটা। ওর মুখের ভাব দেখে রাহাত বলে, ‘হাফিজ, এমন অনেক কেস দেখেছি যেখানে সবচেয়ে শান্ত নিরীহ লোকটাই ভয়ংকর খুনী। তুমি শুধু একটা কাজ করবে, এই যে ছোট্ট একটা অডিও ট্রান্সমিটার এটা তুমি ওই রইসের ঘরে যে চেয়ারটা আছে তার তলায় কৌশলে লাগিয়ে দিয়ে আসবে। এই যে দেখো, এই দিকটা চেপে ধরলেই লেগে যাবে কাঠের সাথে। আর কাজটা তোমাকে দিলাম কারণ দেবদ্যুতি তোমাকে বিশ্বাস করে। আমার কেন জানি মনে হয় রইসের সাথে কিছু উলটাপালটা হলে এই অডিও ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে ঠিক তা জেনে যাব।’

হাফিজ তখনও অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে আছে রাহাতের দিকে। তারপর মাথা নেড়ে নিঃশব্দে চলে যায়।
***********

দেবদ্যুতির মনটা বিপর্যস্ত হয়ে আছে আজ। এতদিন ও মোটামুটি ভালোই ছিল, কিন্তু এই রইস যেদিন আসলো সেদিন থেকেই ওর মনটা আবার সেই আগের দিনের মতো পাগলাটে হয়ে যাচ্ছে, বার বার বিক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। মোস্তাফিজ স্যারের সাথে সেদিন কথা হয়েছে, নতুন করে কাউন্সেলিং এর তারিখ দিয়েছেন। এখন থেকে ওকে নিয়মিত যেতে হবে। কিন্তু মাঝে মাঝেই ও মনটা ঠিক নিয়ন্ত্রণ করে উঠতে পারে না। এই যেমন আজ পহেলা মে। এই দিনটার কথা ও কিছুতেই ভুলতে পারে না। ওই দিন সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই বিদ্যুৎ চলে যায়। লোডশেডিং এর সুযোগে ওই জানোয়ারটা ওর শ্লীলতাহানি করতে চেয়েছিল। দেবদ্যুতির গাল বেয়ে চোখের জল বেয়ে পড়ে।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, রাতের আঁধার নেমেছে সিলভার লাইন পুনর্বাসন কেন্দ্রে। রইস টিভিতে খবর দেখছিল। হঠাৎ করেই বিদ্যুৎ চলে গিয়ে চারপাশটা অন্ধকার হয়ে যায়। মন খারাপ করে রইস জানালার কাছে এসে দাঁড়ায়, অবাক হয়ে খেয়াল করে দূরের বাসাগুলোতে আলো জ্বলছে। শুধু এই সিলভার লাইনেই আলো নেই, লোডশেডিং। নাহ, কেমন একটা গরম পড়েছে আজ। রইস পরনের জামা খুলে বাতাস করতে থাকে। হঠাৎ করেই দরজা খোলার শব্দে ওর হাত থেমে যায়। ভয়ে ভয়ে তাকায়, দেখে দু’জন মানুষ ভেতরে ঢুকছে। আবার ওরা! এতদিন তো কিছু বলেনি। আজ আবার কেন এসেছে! ভয়ে মুখটা শুকিয়ে যায় রইসের।

দেবদ্যুতি একটা ঘোরের মাঝে রইসের রুমে ঢোকে। নির্মলাকে ইশারা করে দরজা বন্ধ করে দিতে। পায়ে পায়ে চেয়ারের কাছে এসে দাঁড়ায়, তারপর বলে, ‘তোর কাছে সেদিন হাফিজ আসছিল, কী বলে ও? তুই কিছু বলেছিস?’

রইস ভীত গলায় বলে, ‘না আপা, আমি কাউরেই কিছু কই নাই।’

দেবদ্যুতি নির্মলার হাত থেকে সেদিনের সেই প্লায়ার্সটা নিয়ে ওর দিকে তাকায়, আনমনে প্লায়ার্সটা নাড়তে নাড়তে বলে, ‘খুব ভালো করেছিস। আচ্ছা, তুই কি সেদিন বাসে একটা মেয়ের গায়ে হাত দিয়েছিলি?’

রইস মাটির সাথে মিশে যেতে চায়, নিচু গলায় বলে, ‘হ্যাঁ।’

নির্মলা উত্তেজিত গলায় বলে, ‘আপা, দেখছেন কত্ত বড় শয়তান। দেই ওর আরেকটা আঙুল ভাইংগা।’

দেবদ্যুতি কড়া গলায় বলে, ‘না এখন না। কিন্তু তুই আমারে বল তো তুই এখন আর সেই পচা গন্ধ পাস না?’

রইস ভয়ে ভয়ে বলে, ‘না,আপা। আর পাই নাই।’

দেবদ্যুতি ঘোলাটে চোখে বলে, ‘তুই পাস না, কিন্তু আমি তো পাই। এই এত দিনেও আমি সেই জানোয়ারটার পচা গন্ধ পাই। এমন এক অন্ধকার রাতেই আমার জীবনে অন্ধকার নেমে এসেছিল তোর মতোই একটা পচা মানুষের কারণে।’

নির্মলা উত্তেজিত গলায় বলে, ‘আপা, প্লায়ার্সটা আমার হাতে দেন, ওর শাস্তিটা শুরু করি।’

এদিকে যখন দেবদ্যুতি আর নির্মলা রইসের ঘরে ঢুকে কথা শুরু করেছিল ঠিক তখনই রাহাত ওদের কথা প্রথম শুনতে পায়। রাহাত দ্রুতই হাফিজকে গাড়ি বের করতে বলে। ভীষণ টেনশনে বলে, ‘হাফিজ, রইসের ভীষণ বিপদ। দেবদ্যুতি আর নির্মলা এখন রইসের ঘরে। ওদের কথাতে বুঝতে পারলাম ওর আঙুলটা সেদিন নির্মলাই ভেঙেছিল। আজ ওরা আবার ঢুকেছে, কী যে করে ফেলে কখন! আমাদের এখনই সিলভার লাইনে যেতে হবে। কিন্তু কতক্ষণ লাগবে ওখানে পৌঁছাতে, বলো তো।’

হাফিজ বড় করে একটা নিশ্বাস নেয়, তারপর বলে, ‘স্যার, আধাঘন্টা লাগব।’

রাহাত চিন্তিত গলায় বলে, ‘নাহ, অনেক দেরি হয়ে যাবে। এর মধ্যেই যদি ওরা কিছু করে ফেলে? দেবদ্যুতিকে এখনই থামাতে হবে। কিন্তু কি করে?’

রাহাত জোরে ঠোঁট কামড়ে ভাবতে বসে। মাথায় চিন্তার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। বুকটা কেমন ধকধক করছে। হঠাৎ একটা কথা মনে হতেই ও দ্রুত মোবাইল বের করে। এখন একজন মানুষই দেবদ্যুতিকে থামাতে পারে, ডা. মোস্তাফিজ।

মোস্তাফিজ একজন রোগী দেখছিলেন। ঠিক এমন সময় ফোনটা বেজে উঠতেই বিরক্ত হয়ে কেটে দিতে যেয়েও কাটেন না, সেই পুলিশ অফিসারের ফোন! কী ভেবে ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে রাহাত জরুরি গলায় বলে, ‘স্যার, খুব বিপদ। আপনার সাহায্য দরকার।’

এরপর রাহাত সংক্ষেপে সব খুলে বলতেই মোস্তাফিজ বুঝতে পারে রইসের ভীষণ বিপদ। আশ্বাসের সুরে বলে, ‘আমি এখনই দেবদ্যুতিকে ফোন দিচ্ছি। ওকে আমি ফোনে ব্যস্ত রাখব, আশা করি এর মাঝে তোমরা পৌঁছে যাবে। আর আমিও বের হচ্ছি, আশা করি একসাথেই পৌঁছে যাব।’

দেবদ্যুতির যখন ধীরে ধীরে রাগটা উঠছিল ঠিক তখনই ফোনটা আসে, ডা. মোস্তাফিজ! এই সময়ে ওনার ফোন। দেবদ্যুতি একটু সামলে নিয়ে ফোনটা ধরে সালাম দিতেই মোস্তাফিজ হালকা গলায় বলে, ‘দেবদ্যুতি, তোমার সাথে একটা জরুরি কথা ছিল, তুমি একটু সময় দিতে পারবে আমাকে?’

দেবদ্যুতি একটু বিরক্ত হয়, সেটা প্রকাশ করে না, বলে, ‘স্যার, অসুবিধে নেই, বলেন।’

মোস্তাফিজ এবার ওর চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে কথা বলা শুরু করেন। ভায়োলেন্ট রোগীকে কী করে সামলাতে হয় এসব। দেবদ্যুতি ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না স্যার এই অসময়ে কেন এমন অগোছালো কথা বলছেন যার কোনো মাথামুণ্ডুই নেই।

রাহাতের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থায় রাস্তা ক্লিয়ার করে ওরা বিশ মিনিটেই পৌঁছে যায় সিলভার লাইনে। দ্রুত পায়ে হাফিজকে নিয়ে পুনর্বাসন কেন্দ্রে ঢোকে। তারপর দৌড়ে দোতলার একদম কোণার ঘরটাতে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে।

ঘরের ভেতর ওরা তিনজন চমকে তাকায়, রাহাত কঠিন গলায় বলে, ‘নির্মলা, তোমার হাতের প্লায়ার্সটা ফেলে দাও। আর দেবদ্যুতি ম্যাডাম, আপনি ফোনটা এখন রাখতে পারেন। মোস্তাফিজ স্যারকে আমিই ফোন করতে বলেছিলাম আপনাকে ব্যস্ত রাখতে যাতে রইসের কোনো ক্ষতি করতে না পারেন। আর হ্যাঁ, আপনাদের দু’জনের কথোপকথন পুরোটাই আমি শুনেছি। হাফিজ সেদিন এই চেয়ারের নিচে ছোট্ট একটা অডিও ট্রান্সমিটার লাগিয়ে দিয়ে গিয়েছিল।’

দেবদ্যুতির মুখ থেকে রক্ত সরে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। এই পুলিশটা কী বলছে! তারমানে সেই প্রথম থেকেই ইনি ওকে সন্দেহ করত! ধরা পড়ে যাওয়ায় ও মুখ চেপে বসে পড়ে, ভীষণ অসহায় লাগে নিজেকে।

রাহাত নরম গলায় বলে, ‘প্লিজ, আপনি উঠে দাঁড়ান। মোস্তাফিজ স্যার আসছে এখনই। আপনি ভেঙে পড়বেন না, আপনার চিকিৎসা দরকার।’
*************

রাহাত, দেবদ্যুতি, ডা. মোস্তাফিজ নিচ তলায় চেম্বারে বসে আছে। হাফিজকে রইসের সাথে রাখা হয়েছে। আর নির্মলাকে আপাতত তার রুমেই পাঠানো হয়েছে।

দেবদ্যুতি মুখ নিচু করে বসে আছে। এই মাত্রই রইসের পুরো ঘটনাটা ডা. মোস্তাফিজকে ও বলেছে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোস্তাফিজ বলে, ‘দেবদ্যুতি, তোমার সবই ঠিক ছিল। কিন্তু যখন দেখলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছ না তখন তোমার উচিত ছিল রইসকে অন্য কোনো ডাক্তারের কাছে দিয়ে দেওয়া। এইখানে মারাত্মক ভুল করেছ। ওকে তুমি যতবার দেখেছ ততবার তোমার পুরনো স্মৃতি মনে হয়েছে আর সেখান থেকে এমন অবস্থার সৃষ্টি। তোমার কাউন্সেলিংটা আবার দরকার যেটা সামনেই শুরু হবার কথা।’

দেবদ্যুতি নীরবে মাথা নাড়ে।

এবার ডা. মোস্তাফিজ রাহাতের দিকে ফিরে নরম গলায় বলে, ‘ভাই দেখুন, পুরোটা একটা সাইকোলজিক্যাল কেস। আপনি ইচ্ছে করলে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন, কিন্তু সেক্ষেত্রে আসল কাজটা হবে না। আমি নিজে ওদের তিনজনের দায়িত্ব নিতে চাই।’

রাহাত একটু ভাবে, তারপর বলে, ‘আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু একটা প্রশ্ন, এই পুনর্বাসন কেন্দ্রে আর কারো সাথে এমন হয়নি তো?’

ডা. মোস্তাফিজ দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়ে, বলে, ‘আসলে ওরা রইসের মতো লোকদের ক্ষেত্রেই এমন নৃশংস। অন্য কারও ক্ষেত্রে এমন হয়নি আমি নিশ্চিত।’

রাহাত সন্তুষ্ট গলায় বলে, ‘আচ্ছা স্যার, ঠিক আছে। রইসকে কী আর পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকতে হবে?’

ডা. মোস্তাফিজ একটু ভেবে বলেন, ‘আপাতত ও বাসায় যাক। আমি ওর সাথে কয়েকটা সিটিং দেই, তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেব।’

সেদিন রাতেই রইসকে যখন পুলিশ ওর বাসায় পৌঁছে দেয়, ও বিশ্বাসই করতে পারছিল না কোথা দিয়ে কী হলো। এই পুলিশ দু’জন কী করে জানল যে ওর উপর হামলা হতে পারে? রইসের কিছুই মাথায় ঢুকছে না। বাসার কাছে আসতেই রইস বলে, ‘স্যার, আমাকে কিছু চকলেট কিনে দিতে পারবেন, ছেলেটা খুব পছন্দ করে।’

রাহাত ওর দিকে তাকায়, একটা ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বলে, ‘অবশ্যই।’

রিতা মন খারাপ করে রঞ্জুকে নিয়ে শুয়ে ছিল। রাত এগারোটা বেজে গেছে। রইস আজ কতদিন নেই, এর মাঝে কয়েকবার গিয়েছিল। মানুষটা যেন কেমন হয়ে গেছে, চুপচাপ, বিষন্ন। এমন যখন ভাবছে ঠিক তখন দরজায় কেউ কলিং বেল চাপে। এই সময়ে আবার কে এল?

রিতা উঠে দরজা খুলতেই বিস্মিত হয়ে চেয়ে দেখে রইস দাঁড়িয়ে আছে! নিজের চোখকে বিশ্বাস হতে চায় না। কাছে এসে ওর হাত ধরে বলে, তুমি!

রইস একটা ক্লান্ত হাসি হেসে বলে, ‘ওরা আমাকে আজ ছেড়ে দিল, বলল এরপর সপ্তাহে একবার করে গেলেই হবে। তবে এবার নতুন ডাক্তার। রঞ্জু কই?’

রিতা শুকরিয়া আদায় করে, তারপর বলে, ‘ঘুমিয়ে পড়েছে কখন। তুমি গোসল করে নাও, আমি ভাত চড়াচ্ছি।’

রইস পকেট থেকে চকলেটের বাক্সটা রিতার হাতে দেয়। পুলিশ অফিসারটা অদ্ভুত, এমন ভালো পুলিশ ও দেখেনি।

সেদিন রাতে বহুদিন পর রইস আরাম করে খেতে বসে।

এদিকে হাফিজ বারবার একই কথা বলে যাচ্ছে, ‘স্যার, আপনার এত বুদ্ধি। কেমন কেঁচো খুঁড়ে সাপ বের করে ফেললেন। সেই জাদুকর চিত্রকরের মতো।’

রাহাত হাসে, তারপর বলে, ‘শোনো, একটু খেয়াল করে সব দেখলে আর শুনলে তুমিও ব্যাপারটা ধরতে পারতে।’

রাহাত মনে একটা তৃপ্তি নিয়ে সে রাতে বাড়ি ফিরে।

আর এদিকে দেবদ্যুতির চোখে ঘুম নেই। পুলিশ অফিসারটা নেহাৎ ভালো, তাই হয়তো মোস্তাফিজ স্যারের অনুরোধটুকু রাখলেন। নাহ, এবার থেকে নিয়ম করে স্যারের কাছে যেতে হবে সাথে নির্মলাকেও। ওদের মনের ক্ষতটা যে আজও ঠিক হয়নি!
*******-*****

আজ শুক্রবার, রইস দুপুরের খাবার খেয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। রঞ্জু ওর পিঠের উপর বসে ঘোড়া ঘোড়া খেলছে। রিতা এখনও ঘর পরিস্কারের কাজ করছে। কাজের মেয়ে কুলসুম গোসলে গেছে। রইস ডাক্তার মোস্তাফিজের উপদেশ অনুযায়ী মনটাকে অন্য চিন্তায় ডুবিয়ে রেখেছে। ওর মা আলতা বানুর কথা ভাবছে। ঠিক তখন একটা পচা গন্ধ পায়। রইসের বুক কেঁপে ওঠে! আবার? রইস নিশ্বাস বন্ধ করে, তারপর শ্বাস ছাড়তেই আবার সেই গন্ধটা পায়। রইসের মাথাটা এবার এলোমেলো হয়ে যায়। ঠিক এমন সময় রিতার গলা পায়, ‘এই, একটু ওঠ তো। ইচ্ছি, একটা ইঁদুর মরে আছে খাটের নিচে। কী পচা গন্ধ! মাগো, ওয়াক।’

রইস এবার রঞ্জুকে সরিয়ে দ্রুত ওঠে বসে। বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে দেখে রিতা একটা কাগজ দিয়ে একটা ইঁদুরের লেজ ঝুলিয়ে ধরে আছে। রইস আস্তে আস্তে চেপে রাখা নিশ্বাসটা ছাড়ে। তারমানে এটা সেই পচ গন্ধ না যার জন্য ও অন্ধকারের মানুষে বদলে যেত। রইস একটা সুখ নিয়ে ভাবে ওর সেই অসুখটা নিশ্চয়ই ভালো হয়ে যাবে একদিন। আর ও সেদিন আর অন্ধকারের মানুষ থাকবে না, আলোর মানুষ হবে।

(সমাপ্ত)

মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সুবাস
শিমুলতলী, গাজীপুর
১৯/০৪/২০২২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here