অগত্যা_তুলকালাম,পর্ব ২১,২২

#অগত্যা_তুলকালাম,পর্ব ২১,২২
নাফীছাহ ইফফাত
পর্ব ২১

শাওন ততক্ষণে নাস্তা নিয়ে এসেছে। আমাকে হা করে জানালা ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললো,
“কিরে কি দেখছিস?”

আমি অস্ফুট স্বরে রাফিনকে দেখিয়ে বললাম,
“কে ওটা?”
“ফাইয়াজ। ক্যান তোর পছন্দ?”

আমি উপর-নীচ মাথা নাড়ালাম। পরক্ষণেই আবার ডানে-বায়ে।
আমার অবস্থা দেখে শাওন বললো, “কি সমস্যা তোর? আয় খেতে আয় তো। নাস্তা তো সব ঠান্ডা হয়ে গেল।”

আমি ওর কথায় কান না দিয়ে রাফিনকে ফোন দিলাম। আর তাকিয়ে রইলাম উঠানের দিকে। দেখলাম রাফিন বিরক্ত হয়ে একপাশে এসে ফোন রিসিভ করলো। একপাশে আসতে গিয়ে ও আমার জানালার একটু কাছেই এসে পড়েছে। ওর কথা আমি দু’বার করে শুনছি। রিয়েল ভয়েসটাও শোনা যাচ্ছে আবার ফোনেরটাও। আমি একটু পিছিয়ে এলাম।

ও হড়বড় করে বলে গেল,
“কি হয়েছে? একটু আগে না চ্যাট করলাম? এজন্যই আমার বিরক্ত লাগে। চ্যাট করলেও গেইমস খেলার টাইমে ফোন দেওয়া লাগবে।”

“গেইমস খেলছো?”
“খেলবো একটু পর।”
“মাঝে তো ডিস্টার্ব করিনি।”
“আচ্ছা কি বলবে বলো?”
“কি করছো?”
“ধুরর! মেজাজটা খারাপ হয় না? বললামই তো গেইমস খেলবো।”
“কোথায় খেলবে?”
“তোমার মাথায়।”
“রেগে উত্তর না দিয়ে শান্তভাবে জবাব দিয়ে দাও। আমি এক্ষুনি ফোন রেখে দিবো৷ অত টাইম নেই আমার৷ রাগ দেখাবা না একদম।”

তখনই একটা বাচ্চা ওকে ডাক দিলো। “এই ভাইয়া, আসো না গেইমস দেখবো।”

“উফ কি বলবা বলো তো? বাচ্চাগুলো সব ডাকছে আমাকে।”
“বাচ্চা? বাচ্চা কই থেকে এলো?”
“আরে আমার গেইমস খেলা দেখবে বলে বাচ্চাগুলো সব উঠোনে চেয়ার পেতে বসেছে। ওরা ওয়েট করছে। এখন বৃষ্টি নামলে আর খেলা দেখা হবে না ওদের।”

“ওহ অকে অকে যাও। স্যরি লেইট করিয়ে দেওয়ার জন্য।”
“ইট’স অকে।”

ফোন রাখতেই শাওন বললো, “এটা কি হলো?”
আমি ইশারায় বাইরে দেখিয়ে বললাম, “রাফিন।”
“ফাইয়াজ না ও?” অবাক হলো শাওন।
“ফাইয়াজ রাফিন।”
”ওওপস! আমার এত কাছে ছিল অথচ কোনোদিন টেরই পেলাম না। তুই কোত্থেকে ওকে পেয়ে গেলি?”

আমি মুচকি হাসলাম শুধু। নাস্তাগুলো জানালার পাশে নিয়ে এসে খেতে খেতে দেখতে লাগলাম ওরা কি করে। শাওন বললো, “এতদিন ধরে ওকে দেখছি কখনো তেমনভাবে খেয়াল করা হয়নি। ছেলেটা অনেক সুন্দর।”

আমি কড়া চোখে তাকালাম ওর দিকে। আবার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলাম। শাওন খেতে খেতে বললো, “এমনিই বললাম।”

জানালার বাইরে তাকিয়ে আছি। রাফিন মনোযোগ দিয়ে পাবজি খেলছে। সবাই চেয়ার পেতে বসেছে। উৎসুক বেশ কয়েক জোড়া চোখ চারকোণার মোবাইলটায় নিবদ্ধ। মানুষ কোপাকুপির এই খেলায় কি মজা আছে ওরাই বেশ ভালো জানে।
বেশ আয়েশ করেই গেইমস খেলছিলো আর উপভোগ করছিলো ওরা। হঠাৎ বলা নেই, কওয়া নেই ঝুম বৃষ্টি নামে। সবাই হুড়মুড়িয়ে চেয়ার টেনে দাওয়ায় তুলে দিয়ে যে যার বাসায় ছুট লাগায়। রাফিন কিছুক্ষণ হতাশ দৃষ্টিতে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইলো। এরপর মোবাইল রেখে চেয়ারগুলো টেনে টেনে ভেতরে ঢোকালো। সবশেষে একটা মোড়া নিয়ে এসে দাওয়ায় বসলো। ওদের বাড়ি পুরোটা পাকা হলেও সামনের বারান্দার কিছু অংশে টিনের ছাউনি দেওয়া। সে-ই ছাউনি দেওয়া জায়গাটাই আমার সবচেয়ে সুন্দর মনে হলো। বৃষ্টির দিনে অনায়াসে এখানে বসে সময় কাটিয়ে দেওয়া যাবে।

রাফিনের সামনে টিনের চালে বৃষ্টি গড়িয়ে পড়ছে। ঝুম বৃষ্টি। ও দাওয়ায় বসে অনেকক্ষণ উদাসীন হয়ে তাকিয়ে থাকলো। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো টিনের চাল থেকে গড়িয়ে পড়া পানিগুলো। এরপর হঠাৎ ডাক দিলো, “ভুউতুউউউ” বলে।

তখন থেকে কিছুক্ষণ পর পর হাঁক ছাড়তে থাকলো, “ভুউতুউউ” বলে।

মাগরিবের আযান হয়৷ রাফিন ঘরে ঢুকে। আমিও নামাজ সেরে ফেলি৷ কিছুক্ষণ পর ও আবার এসে বসে দাওয়ায়। তখনও অন্ধকার হয়নি। নাকীব আমাকে নিতে আসে আমার দেরী দেখে। আমার তো বিকেলেই চলে যাওয়ার কথা ছিল। বৃষ্টির জন্য হোক বা রাফিনের জন্য আমি আটকে গেছি। আমি তৈরী হয়ে নিলাম জানালায় চোখ রেখেই। অজ্ঞাত কারণবশত আমার যেতে ইচ্ছে করছে না রাফিনকে ছেড়ে। ওর সাধারণ চালচলন, সাধারণ জীবন দেখতে ইচ্ছে করছে লুকিয়ে। তবুও যেতে হলো আমাকে। কে জানতো এটাই ওর সাথে আমার শেষ দেখা হবে?

রাতে রাফিন টেক্সট করে জানায়, একটা কথা আছে। জবাবে আমিও পাঠাই,
“কথা আছে, কথা আছে করছো, বলছো তো না।”
“আচ্ছা পরে বলবো।”

‘ধ্যাৎ’ বলে ফোনটা বালিশে ছুঁড়ে মেরে ঘুমিয়ে পড়লাম। এরপর একসপ্তাহ ওর সাথে আমার কোনো যোগাযোগ হলো না। ইনফ্যাক্ট, আমি কোনো চেষ্টাই করলাম না যোগাযোগ করার৷ অবাক হয়ে দেখলাম, আমার তেমন খারাপ লাগছে না ওর সাথে কথা না বলে থাকতে। প্রথমে দুদিন বুকের ভেতর ফাঁকা ফাঁকা লাগছিলো। তৃতীয় দিন থেকে সবটা কেমন স্বাভাবিক হয়ে গেল। নিজেকে আরও স্বাভাবিক রাখতে ইসলামিক বইয়ের ভেতর নিজেকে সপে দিলাম।

ছোটফুফি চলে গিয়েছেন ইতিমধ্যেই। আমিও নামাজ-দোআ পড়ার চেষ্টা করছি। ইদানীং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সাথে তাহাজ্জুদও পড়ার চেষ্টা করছি। প্রতিদিন উঠতে না পারলেও সপ্তাহে তিনদিন অন্তত নামাজ পড়ি। কিন্তু আমার মন বলছে, এই নামাজ আমার ঠিকঠাক হচ্ছে না৷ আমি কিছুতেই পূর্ণ মনোযোগে নামাজ পড়তে পারি না। নামাজ পড়তে পড়তে কখন যে আমি রাফিনের ভাবনায় ডুবে যাই নিজেও জানি না। শত চেষ্টা করেও নামাজে কিছুতেই মন ফেরাতে পারছি না। আমার মনে হতে লাগলো আমার পিঠের ওপর বিশাল একটা বোঝা রয়ে গেছে। হারাম রিলেশনশিপের বোঝা। এই বোঝা যতক্ষণ নামাতে পারবো না ততক্ষণ আমি আল্লাহর প্রতিও মনোযোগী হতে পারবো না, নামাজের প্রতিও না। এদিকে মাত্র কয়েকদিন পর থেকে রোজা শুরু হবে। রোজার আগেই সব দায় মিটিয়ে ফেলা উচিত৷ সব হারামের সমাপ্তি ঘটানো উচিত। এবারের রমজান হবে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ রমজান।

অবশেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলাম, আজই সব শেষ হবে। তার আগে রাফিন কি বলতে চায় সেটা শুনবো আমি। সন্ধ্যায় ওকে টেক্সট করলাম,
“তোমার নাকি কি বলার ছিল?”

দু’ঘন্টা পর রিপ্লাই এলো, “পরে বলবো।”
“আজকে বললে হয় না?”
“আচ্ছা আজকেই বলবো।”
“কখন?”
“রাতে।”
“টাইমটা বলো?”
“বারোটা বা একটার দিকে।”
“ওকে।”

রাত ঠিক বারোটায় রাফিন আমাকে ফোন দেয়। ফোন দিয়ে প্রথম কথাটা বললো ও এভাবে,
“মানে কিছু না এমনিতেই।”
“এমনিতেই?”

“তোমার কি মনে আছে, যেদিন তোমার বারান্দায় বসে সারারাত তোমার সাথে কথা বললাম সেই রাতে আসার সময় আমি বলেছিলাম, তোমায় একটা কথা বলবো। তবে এখন না। যেদিন তুমি নিজেকে সামলাতে পারবে, নিজেকে শক্ত করতে পারবে, আমাকে ছাড়াও বেঁচে থাকতে পারবে বলে মনোবল তৈরী হবে তোমার মনে সেদিন আমি কথাটা বলবো। মনে আছে?”

“হ্যাঁ, অবশ্যই মনে আছে। আজ তাহলে কথাটা বলো?” দৃঢ়তার সাথে বললাম।
“আজই কথাটা বলার সময়৷ কারণ আমার মনে হচ্ছে আজ তুমি প্রস্তুত সবধরনের ধাক্কা মোকাবিলা করতে। এম আই রাইট মিস আরোহী?”
“এবসোলিউটলি।” গলার স্বর খানিকটা উঁচু করে বললাম।

“হ্যাঁ, বলছি তাহলে। মানে আমি কিছুদিন এই লাইফ থেকে সরে স্টাডি লাইফে ফিরে যাচ্ছি। ”
“আচ্ছা।”
“টু ইয়ার্স।”
“দুই মাস?”
“টু ইয়ার্স মানে ২ মাস?”
“টু ইয়ার্স?” খানিকটা জোরেই বললাম। প্রথমে ওর কথাটা বুঝতে পারিনি। পরে বুঝতে পেরে বেশ অবাক হলাম।
“হুম।”
“ভালো তো। কখন যাচ্ছো?”
“দেখি মাস দুয়েকের মধ্যে।”

আমার ভীষণ কান্না পেয়ে গেল। রাফিন চলে যাবে সেই কষ্টে না, আমার কান্না পাচ্ছে আনন্দে। দোয়া কবুল হওয়ার আনন্দে। মাত্র গতরাতেই তাহাজ্জুদে আমি দোআ করেছি আল্লাহ যেন ভালো কোনোকিছুতে রাফিনকে ব্যস্ত করে দেন। অন্তত এই পাবজিময় লাইফ থেকে ও বের হয়ে যাক৷ জাস্ট দু’বছরের জন্য হলেও চলবে৷ ওর নেশাটা কেটে যাক এটুকুই চেয়েছি আমি। অক্ষরে অক্ষরে আমার দোয়া কবুল করে নিয়েছেন আল্লাহ, আমার প্রিয় রব।

আমি বললাম, “বিশ্বাস করবে তুমি? আমি ঠিক এরকম কিছুই চাইছিলাম আল্লাহর কাছে৷ বারবার বলছিলাম, তুমি যেন কল করে এমনই কোনো একটা খবর দাও আমাকে। আল্লাহ যেন তোমাকে ভালো কোনো কাজে আটকে দেন।”
“যাক! তোমার দোআ কবুল হলো।”
“হু একদম অক্ষরে অক্ষরে।”
“স্টাডি শেষে বাবার বিজনেসে জয়েন করার ইচ্ছে আছে।”
“দ্যাট’স গ্রেট। কত ভালো ভালো নিউজ তুমি এতদিন আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলে?”
“আমি ভেবেছিলাম আমার চলে যাওয়াটা তুমি মেনে নিতে পারবে না।”
“কেন পারবো না? যদি তোমার উন্নতি হয় আমি আটকাবো কেন?”
”ওখানে কিন্তু ফোন এলাউড না বুঝেছো? মানে টু ইয়ার্স আমাকে ফোন ছাড়া থাকতে হবে। শুধু বাড়ি এলেই ফোন ধরতে পারবো। অনেক কষ্ট হয়ে যাবে আমার।”

#Be_Continued__In_Sha_Allah ❣️

#অগত্যা_তুলকালাম
নাফীছাহ ইফফাত

পর্ব ২২

ভেতরে ভেতরে এত খুশি লাগছে আমার৷ তাও নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বললাম,
“আর তোমার পাবজি?”
“হবে না। পাবজিও ছেড়ে দিতে হবে।”
“আলহামদুলিল্লাহ। সবচেয়ে বড় গুড নিউজ হচ্ছে এটাই।”
“আমি পাবজি ছাড়লে তুমি এত খুশি?”
“হ্যাঁ, আমি অনেক খুশি। কারণ এই পাবজিটাই তোমাকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। সারাক্ষণ যে বৃদ্ধাঙ্গুল দুটো দিয়ে ঠাস ঠাস মানুষ মারো এরা তো স্বাক্ষী দিবে হাশরের ময়দানে। তারপর চোখজোড়া যে সারাক্ষন ফোনের কার্টুনগুলোতে নিবদ্ধ রাখো তারা তো স্বাক্ষী দিবে। বলবে, হে আমার রব! আপনার অকৃতজ্ঞ বান্দা আপনার দেওয়া অমূল্য চোখ দুটোর যত্ন নেয়নি। সে এই চোখজোড়া দিয়ে আপনার সৃষ্টির দিকে নজর দেয়নি। এই চোখ দিয়ে আপনার জন্য একফোটা অশ্রু ঝরায়নি। অথচ চক্ষুদ্বয় কত বড়ই না নেয়ামত। অন্তর স্বাক্ষী দিবে, হে আমার রব! আপনার বান্দার অন্তর সদা গেইমস নিয়ে চিন্তিত ছিল। কবে সব কাজ শেষ করে গেইমস নিয়ে বসবে সেই চিন্তায় মশগুল ছিল। তার আপনাকে নিয়ে ভাবার ফুরসত ছিলো না। অথচ আপনিই তার অন্তর, চোখ এবং তার পুরো শরীরের স্রষ্টা। তখন কি তোমার আর কিছু বলার থাকবে?”

“বাহ! এত গুছিয়ে বইয়ের ভাষায় কথা বলা কবে শিখলে?”
আমি জবাব দিলাম না। রাফিন মৃদুস্বরে বললো,
“বললামই তো ছেড়ে দিবো। এতবড় লেকচারটা না দিলেও চলতো। জানোই তো, মাদরাসা লাইফ কেমন? ওখানে মোবাইল-ই ধরা নিষেধ, পাবজি তো দূরের কথা।”

“হুম৷”
“আচ্ছা তুমি কি যেন বলবে বলছিলে?”
”আমার না বলা কথাগুলো বলা হয়ে গেছে।”
“কি সেগুলো?”

বেশ কিছুটা সময় নিয়ে আমি বললাম,
“আমি চাইছিলাম আমরা আর চ্যাট না করি। এমনিতেই তো আমাদের তেমন কথা হচ্ছে না। এটা যদি একেবারেই না হয়… না মানে তুমি তো চলেই যাবে। তখন তো আর আমাদের কথা হবে না টানা দুই বছর। এরচেয়ে ভালো না আমরা নিজেরাই আল্লাহকে ভালোবেসে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই হারাম সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসি।”

রাফিন বোধহয় পানি খাচ্ছিলো। আমার কথা শুনে বিষম খেয়ে পানিগুলো মুখ থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলো। নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,
“কথাটা তুমি বলছো?”
“হু। কেন বলতে পারি না?”
“আমি আজ এই কথাটাই বলতে ফোন দিয়েছিলাম। অনেকদিন ধরে বলতে চাইছি। তুমি কিভাবে নাও ব্যাপারটা.. এজন্য বলিনি। ইনফ্যাক্ট, তুমি মানতে পারবে কিনা ভয় হচ্ছিল।”

“আমি মানতে পারবো৷ আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও ভরসা করে আমি তোমাকে ছাড়লাম। আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, কেউ যদি আল্লাহর জন্য কোনোকিছু ত্যাগ করে আল্লাহ তাকে তারচেয়েও উত্তম প্রতিদান দিবেন। তোমাকে যদি আমার জন্যই সৃষ্টি করা হয়ে থাকে, তুমি যদি আমার জন্য কল্যাণকর হও তবে তুমি আমারই হবে। আমি সেই দোয়াই করি।”

“না, তুমি সেই দোয়া করবে না। তুমি সরাসরি আমাকে চাইবে কেন? তুমি বলবে, যার সাথে থাকলে তোমার এবং তার কল্যাণ হবে তাকেই যেন তুমি পাও।”
“তোমাকে চাইলে ক্ষতি কি?”
“ক্ষতি আছে। ধরো, আমি তোমার জন্য না। তখন যাকে আল্লাহ তোমার জন্য ঠিক করে রেখেছেন তার কি হবে?”
“তার কি হবে সেটা আমি ভাববো কেন? সেটা আল্লাহর ভাবনা। আল্লাহ বলেছেন দোয়া করতে, দোয়া ভাগ্য বদলাতে পারে। সুতরাং, আমি দোয়া করে যাবো৷ বাকি সিদ্ধান্ত আল্লাহর। আল্লাহ আমার দোয়ায় আমার ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারলে তার ভাগ্যও পরিবর্তন করতে পারবে।”
রাফিন হো হো করে হাসলো খানিকক্ষণ। তারপর বললো,
“আচ্ছা ঠিক আছে দোয়া করো, যা ইচ্ছে করো। কিন্তু আরেকটা আমল তুমি করবে। সেটা হলো সূরা ফোরকানের ৭৪ নং আয়াত। ব্যস! এটুকু করলেই হবে।”
“কি আছে ঐ আয়াতে?” পাল্টা প্রশ্ন করলাম।

রাফিন আমাকে আয়াতটা পড়ে শোনালো।

وَ الَّذِیۡنَ یَقُوۡلُوۡنَ رَبَّنَا هَبۡ لَنَا مِنۡ اَزۡوَاجِنَا وَ ذُرِّیّٰتِنَا قُرَّۃَ اَعۡیُنٍ وَّ اجۡعَلۡنَا لِلۡمُتَّقِیۡنَ اِمَامًا ﴿۷۴﴾

“আর যারা প্রার্থনা করে, হে আমাদের রাব্ব! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করুন যারা আমাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ স্বরূপ করুন।”

“এটা পড়লেই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে।”
“আচ্ছা।”
“ঠিক আছে তাহলে রাখি? আর হ্যাঁ, তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। কখনো জেনে, কখনো না জেনে। ক্ষমা করে দিও কেমন?”
“ওসব আমি মাথায় রেখে বসে নেই। তুমি কথা বলার সাথে সাথেই সব ভুলে গিয়েছি। তুমি বরং আমাকে ক্ষমা করে দিও। তোমাকে অনেক বেশি জ্বালিয়েছি।”

“আরে না। তুমি অনেক শান্তশিষ্ট একটা মেয়ে। তুমি বলেই আমাকে এতকিছুর পরও সহ্য করেছো। অন্য কেউ হলে কবেই চলে যেত। দেখোনি কতজন ছেড়ে গেছে?”

আমি মৃদু কন্ঠে বললাম, “হু।”
“রাখছি তাহলে। অনেক রাত হলো তো। যাও ঘুমাও।”
”পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ো কিন্তু। নামাজ কখনো ছাড়বে না৷ ছাড়তে হলে গেইমস ছেড়ে দিবে, দুনিয়া ছেড়ে দিবে বুঝলে?”
“বুঝলাম ম্যাম। এখন ফোনটা রাখি?
“শিউর।”

ফোন রাখতে গিয়ে রাফিন আবার বললো,
“হেই শোনো, শোনো।”
“হু বলো।”
”তুমি কখনো আমার জন্য কাঁদবে না। কাঁদলে কিন্তু আমাকে ছেড়ে দিয়েও কোনো ফায়দা হবে না। যেই গুনাহ সেই গুনাহ-ই থেকে যাবে। বুঝলে?”
“হু।” আমার কন্ঠ ম্লান হয়ে এলো।
“কাঁদবে না প্রমিস করো?”
“কাঁদবো না তো। দেখছো না, আমি কত সাহসী হয়ে গেছি। গত পাঁচদিন তোমার সাথে কোনো যোগাযোগ না করে থাকতে পেরেছি, ফার্স্ট টাইম। এখনও ছেড়ে যাচ্ছি অথচ কত স্বাভাবিক আমি দেখো।” বলতেই টুপ করে একফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো চোখ দিয়ে।

“হুম গুড গার্ল। এবার মুচকি হেসে ফােন রাখো। মুচকি হাসা সুন্নাত।”
আমি চোখের পানিটাকে দূরে সরিয়ে মুচকি হাসলাম।

এরপর ফোন রেখে দিলাম। ফোন রাখতেই আমার বুকের ভেতর ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল। রাফিনের সাথে আর কোনোদিন কথা হবে না, কোনোদিন দেখা হবে না ভাবতেই ঢুকরে কান্না আসছে।

রাত দেড়টা বাজে। ওযু করে এসে জায়নামাজ বিছিয়ে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার সেন্সে কুলোচ্ছে না। অনেকটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছি আমি৷ জায়নামাজে দাঁড়িয়েই কেঁদে ফেললাম। কি আশ্চর্য! এখন কেন কষ্ট হচ্ছে? কথা বলার সময় তো কি সুন্দর করে সবকিছু সামাল দিলাম। এখন কেন বুক ফেটে কান্না আসছে? আমি হুট করে সিজদায় পড়ে গেলাম। দীর্ঘ সময় নিয়ে কাঁদলাম জায়নামাজে। একটাই চাওয়া, রাফিন। অনেকক্ষণ পর হঠাৎ মনে হলো আমি জায়নামাজ বিছিয়েছি আল্লাহর সাথে কথা বলবো বলে, আল্লাহর সামনে কাঁদবো বলে। এতদিনের করা পাপ মোছন করবো বলে। অথচ..অথচ আমি এ কি করছি? এই কান্না তো আল্লাহর জন্য না। জায়নামাজে দাঁড়িয়ে একজন পরপুরুষের জন্য চোখের জল ফেলছি? ছি!

তৎক্ষনাৎ দু’রাকাত তাওবার নামাজ পড়লাম। আল্লাহর কাছে প্রতিজ্ঞা করলাম, আর কখনো কাঁদবো না রাফিনের জন্য৷ রাফিনও তো তাই বলেছিলো। নামাজ শেষে খেয়াল করলাম, আমার আর একটুও কষ্ট হচ্ছে না৷ সব কষ্ট আল্লাহ লাঘব করে দিয়েছেন। সেই থেকে আল্লাহর প্রতি আমার প্রেমের শুরু৷ দুনিয়া ভুলে আমি লেগে পড়লাম সুন্দর আখেরাত গড়ার কাজে।

সকালে বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলাম। ঝুম বৃষ্টি নেমেছে পৃথিবীর কোলজুড়ে। অথচ আকাশ ফকফকা সাদা। গাছের পাতাগুলো মৃদু নড়ছে। সারারাত ধরে বৃষ্টি হয়েছে বোধহয়। রাস্তায় কিছু কিছু জায়গায় পানি জমে আছে। সেখানে কয়েকটা ছেলে দাঁড়িয়ে মনের আনন্দে বৃষ্টিতে ভিজছে। মাথায় কচুপাতার ছাতা। আশ্চর্য! এই মফস্বল শহরে ওরা কচু পাতা পেলো কোথায়? হয়তো কাশবনের ধারে কাছে কোথাও জন্মেছে। ছেলেগুলোকে দেখে আমারও কচু পাতার ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে। ইস!

নাকীব এসে কখন পেছনে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করিনি৷ রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
“অন্য জগতে চলে গিয়েছো মনে হচ্ছে?”

আমি ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলাম। এরপর আবার ছেলেগুলোর দিকে নজর দিলাম। আমার দিকে একবার তাকিয়ে পরক্ষনেই ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে নাকীব বললো,
“কচু পাতার ছাতা মাথায় ভিজতে ইচ্ছে করছে তাই না আপু?”

আমি চট করে ওর দিকে তাকালাম। তারপর উপর-নীচ মাথা নাড়ালাম। ও বললো,
“তোমার কি মন খারাপ আপু?”
“নাহ, মন ভালো বরং।”
“তাহলে চোখগুলো এমন দেখাচ্ছে কেন?”
“কেমন দেখাচ্ছে? দেখি আই টু আই তাকা। তাকিয়ে বলে ফেল তো দেখি কি হয়েছে আমার?”

নাকীব তাকালো না। না তাকিয়েই বললো,
“তোমার হারাম সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটেছে আপু।”
আমি ভীষণ চমকে ওর দিকে তাকালাম। ভ্রু কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে বললাম,
“তুই আগে আগে কিভাবে জানিস? আমি তো তোর কিচ্ছু জানি না৷ তুই কেন জানিস আমারগুলো?”
“কারণ আমি সামনের মানুষটা কি ভাবছে সেটা ঝট করে ধরে ফেলতে পারি। আগে থেকেই মানুষের মন বুঝে ফেলতে পারি।”
“ধুৎ! সবার মন বুঝে ফেলিস তো, দেখবি তোর মানুষের মনই তুই বুঝবি না।”
“আমার মনের মানুষের মন তো আমি ঝট করে বুঝে ফেলতে চাই না৷ আমি তো তাকে আজীবন অল্প অল্প করে বুঝতে চাই।”

“আহা! মানে তার কথা ভেবে এখন থেকেই আহ্লাদে আটখানা।”
“সত্যিটাই বলেছি। হুহ! এখন তোমার ঘটনা বিস্তারিত বলো।”
“কেন মন পড়ে নে আমার, নিজে নিজে বুঝে ফ্যাল কি হয়েছে?” ভেংচি দিয়ে সামনে তাকালাম।
“মন পড়া ব্যাপারটা হলো তোমার কি হয়েছে, মানে কি নিয়ে তোমার মনে উথাল-পাতাল হচ্ছে সেটা আমি আন্দাজ করতে পারি। তাই বলে তুমি সারারাত কি কথা বলেছো, কিভাবে সমাপ্তি ঘটিয়েছো সেটা তো আমি বলতে পারবো না৷ সেরকম হলে তো আমি মানুষের অতি গোপনীয় বিষয়ও মুহুর্তেই জেনে যেতাম। তখন তোমার মতো বোকা মেয়ের সাথে এই ঘরে থাকতাম না৷”
“আমি বোকা?”
“হু, বোকা বলেই এখন বোকা বলেছি বলে ক্ষেপে যাবে। অথচ আমাকে দেখো প্রথম থেকেই শান্ত আমি।”

ধুম করে একটা কিল দিলাম ওর পিঠে। কিল খেয়ে কিছুক্ষণ পিঠে হাত বুলিয়ে বললো, “এবার কি বিস্তারিত শুনতে পারি? নাকি পায়ে ধরা লাগবে?”
“ধর না, নিষেধ করছে কে?”

নাকীব কিছু বললো না। আমি নিজেকে কিছুটা সময় নিয়ে প্রস্তুত করলাম। এরপর রাফিনের সাথে বলা প্রতিটা কথা নাকীবকে বিস্তারিত বললাম। সব শোনার পর নাকীব বললো,
“এত সুন্দর সমাপ্তি যে সম্পর্কের সেটা ঠুনকো হতে পারে না আপু। তোমরা দুজনই দুজনকে অসম্ভব ভালো বুঝো। দুজনের আন্ডারস্ট্যান্ডিং আমাকে জাস্ট মুগ্ধ করেছে। তুমি ধৈর্য ধরো। ভরসা রাখো আল্লাহর ওপর। দেখবে সব ভালো হবে ইন শা আল্লাহ।”

“ইন শা আল্লাহ।”

#Be_Continued__In_Sha_Allah ❣️

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here