অগত্যা_তুলকালাম,পর্ব ৫৪

#অগত্যা_তুলকালাম,পর্ব ৫৪
নাফীছাহ ইফফাত

বাদ জুম’আ আজ আমার বিয়ে। সকাল থেকে ঘরময় তুমুল উত্তেজনা। সকালে ছোটফুফি এসেছেন। জুম’আর আগে খালামণি আমার বিয়ের পোশাক পাঠিয়ে দিলেন। যোহরের নামাজ শেষে আমাকে তৈরি করে দিলো শাওন ও সোহা। হালকা সাজ। খয়েরী রঙের শাড়ি পরেছি। ভোরে সোহা দু’হাত ভর্তি মেহেদী লাগিয়ে দিয়েছে। টকটকে লাল হয়ে আছে হাতজোড়া৷ টুকটুকে লাল হয়ে বসে আছি। জুম’আর পর আমাকে ডেকে নিলো ড্রইংরুমে। এবার সত্যিই বুক দুরুদুরু করছে। ড্রইংরুমে খালামণি, মা, বাবা, নাকীব, ছোটফুফি, কুলসুম, ঝিলি সবাই আছে। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে আছে। পাশের রুমে শাওন, সোহা, বড়আপু, ছোটআপুরা বসে আছে। আমাকে বসানো হলো মায়ের পাশে। আমার দিকে খাতা এগিয়ে দেওয়া হলো। কিছুক্ষণ আমার নামটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। হৃদিতা আরোহী আজ অন্য কারো হৃদয়ের আরোহী হতে চলেছে। বরের নামটার দিকে তাকাতে ইচ্ছে করলো না। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সাইন করে ফেললাম। শাওন এসে দাঁড়ালো আমার পাশে। কাঁধে হাত রাখলো। ফিসফিস করে বললো,
“শেষপর্যন্ত তুইও কারো মায়ার বাঁধনে আটকা পড়লি।”

তারপর যখন বাবা বললেন, ফাহিম হাসানের ছেলে ফাইয়াজ রাফিনের সাথে রাকিব হকের একমাত্র কন্যা হৃদিতা আরোহীর… এই বিয়েতে তুমি কি রাজি? রাজি থাকলে বলো, কবুল!

ফাহিম হাসানের ছেলের নাম শুনে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। বাবা কি নাম বললেন? আমি বাবার দিকে চট করে তাকালাম। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে ছোটফুফির দিকে তাকালাম একবার। ছোটফুফি মুচকি হাসলেন। ইশারায় বললেন, কবুল বলতে। আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোলো না৷ পাশ থেকে শাওন ধাক্কা দিয়ে বললো, “এত ঢং করিস না আর। সুড়সুড় করে সাইন তো করে দিলি তখন লজ্জা কই ছিলো? বিয়ে হয়ে গেছে তোর, আর ঢং দেখিয়ে লাভ নেই। কবুল বল।”

অনেকক্ষণ থম মেরে বসে রইলাম আমি। মুখ দিয়ে কোনো কথাই সরছিলো না৷ কিভাবে সম্ভব? আমার না তানভীর ভাইয়ার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল? ছোটফুফি ধাক্কা দিয়ে বললেন,
“হৃদিতা, যথেষ্ট হয়েছে, কবুল বল।”
আমি ঢোক গিলে বললাম, “কবুল।”
পরপর তিনবার। পরিপূর্ণরূপে বিয়ে সম্পন্ন হলো। একের পর এক মিষ্টি মুখে পুরতে থাকলো সবাই। আমাকেও গেলালো অনেক। অবশেষে রুমে এসে বসলাম। তখনও আমি ঘোরের মধ্যে। সত্যিই বিয়েটা রাফিনের সাথে হয়েছে? তাহলে তানভীর ভাইয়া? অনেক ভেবে বের করলাম, আসলে কেউ আমাকে একবারের জন্যও বলেনি তানভীর ভাইয়ার সাথে আমার বিয়ে। বরং সবাই বারবার রাফিনের কথা বলেছে আমার সামনে। আমিই বুঝতে ভুল করেছি। আমার বোঝায় এত বড় ভুল ছিল? এজন্যই রাফিনের বড় আপ্পিরা দেখতে এসেছিলো। কিন্তু সবাই এমন একটা ভাব করলো যেন রাফিনের সাথে আসলে আমার বিয়েই হচ্ছে না। আর শাওন? সে তাহলে কেন জিজ্ঞেস করলো রাফিনকে ছাড়া থাকতে পারবো কিনা? বাজিয়ে দেখছিলো আমায়? আর গতরাতে কি বললো? “তুই সব জেনে গেছিস?” তারমানে? ওরা আমাকে পরীক্ষা করছিলো সবাই মিলে? আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো।

এশার নামাজের পরপর আমাকে পুনরায় তৈরি করা হলো। এবার জমকালো সাজে সজ্জিত করা হয়েছে আমাকে। বিয়েটা জাঁকজমকপূর্ণ না হলেও সাজটা জাঁকজমকপূর্ণ হয়েছে। এটাই রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ ছিল। স্বামীর জন্য মন ভরে সাজগোজ করা যাবে। এত সাজ জীবনে সাজিনি বোধহয়। যার জন্য সাজার কথা মূলত তার জন্যই আজ সেজেছি। ধবধবে সাদা গাউন পরেছি। গাউনের উপরে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা কুটি। কুটির ভেতরের অংশটা হালকা নীলচে রংয়ের। তবে পুরো কুটি সাদা রংয়ের। সাদার ওপর নীলচে পাথর বসানো। পাড়ে হালকা ছাঁইরঙ্গা চুমকি বসানো লেইস। পুরো গাউন জুড়ে অজস্র সাদা পাথর, চুমকি, পুতি বসানো। পুতিগুলোর কারণে সাদা পোশাকটাকে অন্যরকম দেখাচ্ছে। কুটির নীচে অনেকটা নীলচে রঙ্গা হয়ে আছে। গলায়, কানে, মাথায় ধবধবে সাদা ডায়মন্ডের গয়না দিয়ে পুরোদমে সাজানো হয়েছে। দু’হাত ভর্তি নীল-সাদা চুড়ি৷ মেহেদী রাঙ্গা হাত৷ মাথায় সাদা রংয়ের হিজাব। সাজ কমপ্লিট হওয়ার পর আয়নার সামনে বসে আছি৷ এমন ধবধবে সাদা রঙের বিয়ের সাজ বাংলাদেশে আগে দেখিনি আমি। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদা পোশাক পছন্দ করতেন বিধায় আমিও নিজের পছন্দকে সাদা বানিয়েছিলাম। আমার প্রায় পোশাক সাদা রংয়ের। বিয়ের পোশাকটা সাদা দেখে আমার মনটা অদ্ভুত ভালোলাগায় ছেঁয়ে গিয়েছে। আমাদের পথ চলাটাও এই পোশাকের ন্যায় শুভ্র হোক সেই প্রত্যাশা করি।

অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে আমার। রাফিনের সাথেই আমার ভাগ্যটা জুড়ে দেওয়া ছিল? অযথা দীর্ঘদিন হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে এত কষ্ট কেন পেলাম? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা তো আমার জন্যই রাফিনকে সৃষ্টি করে রেখেছেন। তাকেই আমার জীবনসঙ্গী হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। অথচ আমি কিনা আল্লাহর ওপর ভরসা না করে নিজেই নিজের জীবনসঙ্গী ঠিক করতে গিয়েছিলাম। তারপর তাকে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা, উভয়পক্ষ কষ্টের মধ্যে দীর্ঘদিন দিনাতিপাত করা। কেন করেছি এসব? অযথা পাপের খাতায় কিছু পাপ জমা হয়েছে, আর কিছু না। সে-ই পাপের দায়ে আজীবন তওবা করে যেতে হবে। যাকে আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন সে দিনশেষে আমার-ই হবে তার যথোপযুক্ত প্রমাণ পেলাম আজ। ভালোই হয়েছে তখন বিয়েটা হয়নি। তাহলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হতেন আর আমাদের পরিবারও। আর আমাদেরও আল্লাহর জন্য বদলে যাওয়া হতো না। তবে আমার বিয়েটা রাফিনের সাথেই লেখা ছিল বিধায় ওর সাথেই হতো শেষমেশ।

আমাদের উচিত আল্লাহর ফয়সালার ওপর ভরসা করে, বিশ্বাস করে ধৈর্যধারণ করা। আমি তো বারবার আল্লাহকে বলেছি, যেন কল্যাণটাই আমার জীবনে রাখেন। আল্লাহ কল্যাণ রেখেছেন আমার জীবনে। আমাদের দুজনের অজান্তেই দু’পরিবার আমাদের বিয়ে ঠিক করে, উভয়ের সম্মতিতে আমাদের বিয়ে হয়েছে। আজ সবাই খুশি। অথচ দু’বছর আগে যদি বিয়েটা হতো, আমার কথা ভেবে হয়তো আমার পরিবার মেনে নিতো অবৈধ সম্পর্ক। কিন্তু রাফিনের পরিবার কখনোই মানতো না৷ আর তাতে কল্যাণের ছিটেফোঁটাও হয়তো থাকতো না। সংসারে অশান্তি-ই লেগে থাকতো। আজ অশান্তি হওয়ার কোনো সু্যোগ নেই৷

আল্লাহ যা পরিকল্পনা করে রেখেছেন, যা লিখে রেখেছেন তা-ই হবে। অযথা আমরা আগ বাড়িয়ে মাতব্বরি করতে না গিয়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকলেই হয়। আজ রাফিনের মায়ের বলা কথাটা মনে পড়ছে, যে আমার সে সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে হলেও আমার কাছে আসবে, আসবেই। হুম, তাই তো এসেছে। আমরা দুজন-ই সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে কোনো এক নদীর দেশে দেখা করলাম। ভাগ্য ভালো যে আমরা আগেই নিজেদের ভুল বুঝে সরে এসেছি। আল্লাহ আমাদের হেদায়েত দান করেছেন। আমি নফসের গোলামি করিনি। আজ আমার রূহ জিতে গেছে৷ রূহ-ই আজ সর্বেসর্বা। আজ থেকে আমার মনোবল দ্বিগুণ হলো। আল্লাহর প্রতি ভরসা বেড়ে গেল বহুগুণে। আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ সত্যিই মহান।

ঝিলি দৌড়ে এসে আমার কোলে একটা গিফট বক্স দিয়ে আবার ছুটে গেল। গিফটের সাথে একটা খাম লাগানো। উপরে রিয়াদের নাম লেখা। বক্স পাশে রেখে খামটা খুললাম। একটা চিঠি। চিঠি খুলে পড়া শুরু করলাম।

দোস্ত,

কোনো ভণিতা ছাড়াই কথা শুরু করি। ইসলামে অনর্থক কথা বলার কোনো হুকুম নেই। অনর্থক কথার মানেই হলো শয়তানের মারপ্যাঁচ। সোজাসুজি বলে নিই।

তুই আমার জীবনে কি সেটা তোকে বলে বোঝাতে পারবো না। তুই আমাকে ইসলামের পথে আহ্বান করেছিস বলেই আজ আমি এই অবস্থানে। তুই আহ্বান করেছিস, আল্লাহ আমাকে সেই আহ্বানে সাড়া দেওয়ার তাওফিক দান করেছেন আলহামদুলিল্লাহ। আমার খুব অবাক লেগেছে যখন তুই শুধুমাত্র আল্লাহর কথা ভেবে, তাঁকে সন্তুষ্ট করতে তোর প্রিয় মানুষটাকে ছেড়ে চলে এলি। বিষয়টা আমাকে খুব বেশি অবাক করেছে। আমি রাতের পর রাত ভেবেছি তোকে নিয়ে। কিভাবে পারলি তুই? কোনো নিশ্চয়তা ছিল না তাকে পাওয়ার। অথচ তুই অবলীলায় আল্লাহকে ভরসা করে ওকে ছেড়ে দিলি। এটাই তো মূলত ঈমান। সৃষ্টি আমাদেরকে কি দিয়েছে?জন্মের আগে থেকে তো সর্বদা মহান রব, আমাদের স্রষ্টা-ই আমাদের পাশে ছিলেন। তাহলে কেন তাঁর প্রেমে মশগুল না হয়ে সৃষ্টির প্রেমে মশগুল হবো? এটা আমি তোকে দেখে বুঝতে শিখেছি। আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস, অগাধ ভরসা করতে শিখেছি। সেদিনের পর থেকে আর কোনোকিছুতেই আমি হতাশ হইনি, প্রতিটি নিঃশ্বাসে ভরসা করেছি আল্লাহর ওপর। মনে গেঁথে নিয়েছি একটা শব্দ, “লা তাহযান”। হতাশ হওয়া চলবে না। তোর কথামতো সোহাকে বিয়ে করি। তারপর থেকে কোনো পরনারীর দিকে চোখ তুলে তাকাইনি। এমনকি কাজিনদের সাথে পর্যন্ত আমার সম্পর্ক শেষ। সোহাকেও আমি সেভাবে তৈরি করেছি। ও আমাকে ভালোবেসে সব ছেড়ে আল্লাহর দিকে ফিরেছে। তারপর তো মহান রবকেই ভালোবাসতে শুরু করেছে। একবার ভাব, তুই একজনের মাধ্যমে কতজন হেদায়েত পেলো! কতগুলো সওয়াবের ভাগীদার হলি তুই। আমি দ্বীন ইসলাম শিক্ষা করেছি৷ সাবজেক্ট বদলে ইসলামিক স্টাডিজ নিয়ে পড়াশোনা করেছি। তার পাশাপাশি কুরআন শিক্ষা করেছি, হাদীস অধ্যয়ন করেছি। আর অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি ইসলাম সম্পর্কে কত কি অজানা ছিল আমার। এখন মানুষকে ইসলামের দাওয়াহ দেওয়ার চেষ্টা করি। বখে যাওয়া যুব সমাজকে ইসলামের দিকে আহ্বান করি। সোহাও আমায় খুব সাহায্য করে। আমরা দুজনে কুরআন শিখেছি এবং অন্যকে শেখানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছি। এলাকার মহিলাদের সোহা কুরআন শিক্ষা দেয়। দোয়া করিস আমরা যেন সফল হই।

আজ তোর বিয়ের মাধ্যমে আবার প্রমাণ পেলাম, যাকে আল্লাহ তায়া’লা ঠিক করে রেখেছেন তাকে ছিনিয়ে নেয় সেই সাধ্য কার? আমরা অযথাই প/শ্চি/মা সং/স্কৃতির অনুসরণ করতে গিয়ে নিজেদের জীবনসঙ্গী নিজেরাই খুঁজে নিতে উদ্বুদ্ধ হই। আর এতে বেড়ে যায় দুঃখ, কষ্ট, হতাশা, মানসিক চাপ। তারপর ডি*প্রেশন, তারপর সু*ই/সা*ই/ড।

তোর সাথে এই জীবনে তো কথা হবে না। আশা রাখি, দোয়া করি জান্নাতে যেন আমাদের দেখা হয়৷ দুনিয়ার সুখ-দুঃখের আলাপগুলো জান্নাতের সাক্ষাৎ-এর জন্যই জমা রইলো। জান্নাতে গেলে অনেক আড্ডা হবে। দোয়া করি তুই সফলকাম হ। নতুন জীবনে অনেক অনেক সুখী হ৷ আজীবন আল্লাহর রজ্জু আঁকরে ধরে বাঁচার তাওফিক যেন আল্লাহ তায়া’লা তোকে দেন সেই কামনায়,

তোর একসময়ের খুব প্রিয় বন্ধু,
রিয়াদ।

চিঠিটা পড়ে মন ভরে গেল। আমারও ইচ্ছে ছিল দাওয়াহ দেওয়ার। কিন্তু সেই সু্যোগ মেলেনি। আমি নিজের ইবাদত নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। নিজের ইবাদত নিয়ে ব্যস্ত হলে চলবে না। তাহলে আল্লাহর কাছে প্রশ্নের সম্মুখীন হবো। আল্লাহ যদি জিজ্ঞেস করেন, “দ্বীন শিক্ষার তাওফিক যে তোমায় দিয়েছি কতজনকে তুমি দাওয়াত দিয়েছো? কতজনের কাছে পৌঁছে দিয়েছো আমার বাণী?” আজ খুব আফসোস হচ্ছে। সিদ্ধান্ত নিলাম, সুযোগ পেলে পরবর্তী জীবন দাওয়াহর কাজে ব্যয় করবো ইন শা আল্লাহ। গিফট বক্সটাও সাথে সাথেই খুলে ফেললাম। সুন্দর দুটো কুরআন শরীফ। সাথে আরও একটা ছোট চিরকুট।
“কুরআন দুটো আমার ও সোহার পক্ষ থেকে। এগুলো পড়িস। তুই পড়ার দরুণ আমাদের আমলনামায়ও যেন সওয়াব যুক্ত হয়। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।”

অজান্তেই ঠোঁট প্রশস্ত হয়ে এলো আমার। রিয়াদের ঈমানী লেভেল আমাকে ছাড়িয়ে অনেক দূর প্রশস্ত হয়েছে। ও আমাকে যতটুকু ঈমানদার ভাবছে আমি ততটা নই।নিজেকে সামলাতে আজও হিমশিম খেতে হয় আমার। নিজের নফসের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করে আমি বেঁচে আছি। আল্লাহ যেন আমাদের সবার সহায় হোন। সবাইকে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ঈমান নিয়ে দৃঢ়তার সাথে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করেন। আমিন।

রাত নয়টার দিকে ঝিলি আবার এলো। এবার একটা চিরকুট দিয়েই পালাতে গেল। আমি হাত ধরে আটকে বললাম,
“এটা কে দিয়েছে?”
“ভালো ভাইয়া।”
“তুমি কি পিয়নের ভূমিকা পালন করছো?”
“ভালো ভাইয়ার ডাকপিয়ন আমি। ভালো ভাইয়া বলেছে।”
“আর কি বলেছে তোমার ভালো ভাইয়া?”
“বলেছে, আজ থেকে তুমি আমার ভালো ভাবী।”
“আমি ভালো ভাবী?”
“হুম।”
“আমি তোমাদের আপু। ভালো ভাইয়া না, সে তোমাদের দুলাভাই। বলো, দুলাভাই।”
“না, তুমি ভাবী। ভাইয়া, ভাইয়া-ই।”
“আমি ভালো আপু।”
“ভালো ভাবী।”
“ভালো ভাইয়া আগে নাকি আমি আগে?”
“তুমি আগে, তবুও ভালো ভাইয়া আগে।”

ঝিলি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে পালালো। আমি চিরকুট খুললাম। ছোট্ট একটা লেখা।

“কবুল বলেছো? কই আমি তো শুনিনি। বর-ই যদি বউয়ের কবুল বলা না শুনলো তো সে আর কিসের বর হলো? বিয়ে-ও তো সঠিক হবে না। কবুল বলো। এক্ষুনি কবুল বলো।”

আমি ভেবে পেলাম না এমন ফাজলামোর মানে কি? ও তো আগে এত ফাযিল ছিল না! আমি এখন কবুল বললে কি সে শুনবে? সাথে সাথে আবির এলো আরেকটা চিরকুট নিয়ে।
“ভাবী, এটা তোমার।” বলেই ছুটে পালালো।

হচ্ছেটা কি? সবগুলো রাফিনকে পেয়ে আমাকে পর করে দিলো? এত স্বার্থপর এরা? একটার পর একটা চিরকুট? ফাজলামো হচ্ছে আমার সাথে?

এবারের চিরকুটে লেখা,
“০১*******৩৬ এই নাম্বারে কল করে এক্ষুনি বলো আফগানিস্তানের রাজধানীর নাম কি? নাহয় তুলে নিয়ে আসবো।”

আফগানিস্তানের রাজধানী? খানিকবাদে মনে পড়লো আফগানিস্তানের রাজধানীর নাম কাবুল। বলবো না কবুল। তিনবার কবুল বলে বিয়ে করেছি। এখন আবার আদিখ্যেতা হচ্ছে? মোটেও ফোন করবো না আমি।

এরপর ভীষণ ব্যস্ত ভঙ্গিতে মা এলেন। এসেই একগাদা কথা শুনিয়ে দিলেন।
“কিরে হৃদি? জামাই তোকে কি বলেছে কানে যায়নি? এক্ষুনি ওর কথার জবাব দে।”
“মা..মানে? কি বলেছে জামাই?”
“কি বলেছে আমাকে জিজ্ঞেস করছিস? আফগানিস্তানের রাজধানীর নাম জিজ্ঞেস করলো না? এত পড়ালেখা করে এটাও জানিস না? বুবু তো আমার সাথে ঝগড়া লাগায় অবস্থা। এক্ষুনি বলে বুঝিয়ে দে তুই পারিস।”
“মা, এখনই জামাইয়ের পক্ষে চলে গিয়েছো? আমি না একটু পর চলে যাবো?”
“হ্যাঁ যাবি, তো? সব মেয়েরাই তো বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি যায়, নতুন কি?”

মা চলে গেলেন হুমকি-ধামকি দিয়ে। যাওয়ার আগে হাতে ধরিয়ে দিলেন আরও একটি চিরকুট। আল্লাহ গো! মাকে দিয়েও চিরকুট পাঠিয়েছে। এ কেমন মানুষের পাল্লায় পড়লাম? আমি তো একদিনেই পাগল হয়ে যাবো।

“ফোন করেই তিনবার আফগানিস্তানের রাজধানীর নাম বলবে। বিয়ের সময় তো আমি শুনিনি। বরকে না শুনিয়ে সারা রাজ্যকে শোনালে কি আর বিয়ে হয়? কোনো কথা না, শুধু বলো।”

আমি চুপচাপ বসে রইলাম। বাবা এলেন ঘরে। ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়ালাম। বাবাকেও কি চিরকুট দিয়ে পাঠিয়েছে নাকি? বাবা এসে মাথায় হাত বুললেন। ভেজা গলায় বললেন,
“কত বড় হয়ে গেলি রে হৃদি! আমাদের ছেড়ে চলে যেতে হবে। ঘরটা পুরো খালি হয়ে যাবে।”
আমি নিশ্চুপ নিচে তাকিয়ে রইলাম।
“ঘর খালি হবে সেটা তো সবাই দেখবে। আমার হৃদয় যে পুরোটাই খালি হয়ে যাবে তোকে ছাড়া৷ বড্ড একা হয়ে যাবো রে মা।”

বাবাকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদলাম আমি। বাবারও চোখের কোণে জল। অনেকক্ষণ পর বাবা বললেন,
“শোন মা, জামাই তোকে একটা প্রশ্ন করেছে না? আফগানিস্তানের রাজধানীর নাম? তোর কি উত্তরটা জানা নেই? বলে দে না একটু। ছেলেটা একদম পাগল করে দিচ্ছে সবাইকে। সবাইকে বলে বেড়াচ্ছে তুই উত্তরটা পারবি না। বিয়ে করেই পাগলবনে গেছে। তোকে বিয়ে করে কি খুশিটাই না হয়েছে ছেলেটা।”

আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলাম বাবার দিকে। বাবা আমার দিকে ফোন এগিয়ে দিলেন। নাম্বারও নিজেই কি-প্যাডে তুলে ডায়াল করে দিলেন। আমি ফোন কানে ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। বাবা চলে যেতে পা বাড়ালেন। আমি পিছু ডেকে বললাম, “বাবা, তুমি কি জানো না আফগানিস্তানের রাজধানীর নাম?”
বাবা মুচকি হেসে বললেন, “নামমাত্র একটা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলাম। কোনোদিন মন টিকেনি সেখানে। মন পড়ে থাকতো ঘরের ছোট্ট লাইব্রেরীটায়। ব্যবসায় বাণিজ্য একপাশে রেখে তো ঐ ঘরেই দিনাতিপাত করেছি আজীবন। বইয়ে বুঁদ হয়ে কেটে গেছে জীবন। এটুকু প্রশ্নের উত্তর যদি না পারি?” বাবা চলে গেলেন সাথে সাথেই।

আমার ইচ্ছে করছে মাটি ফাঁক করে ঢুকে যাই। বাবার কোনোকিছু বুঝতে আর বাকি নেই। আসলে আমরা বাবা-মাকে যতটা ব্যাকডেটেড মনে করি বাবা-মা তারচেয়েও হাজারগুণ আপডেটেড। আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে এর ছিঁটেফোটাও বুঝবো না যতটা বাবা-মা আমাদের বোঝেন।

ফোন রিসিভ হলো সাথে সাথেই। ভাবনার সাগরে ডুবেছিলাম বলে খেয়াল করিনি। ফোন হাতে নিয়েই বসেছিলো। অসভ্য! আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।দু’পাশে নিঃশ্বাসের মৃদু শব্দ ছাড়া কিচ্ছু শোনা যাচ্ছে না। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছে। এই বুঝি শুনে ফেললো সেই ভয়ে তাড়াহুড়ো করে বলে ফেললাম,
“বকুল, বকুল, বকুল।” তারপর লাইন কেটে দিয়ে ঠাঁই বসে রইলাম।

#Be_Continued_In_Sha_Allah ❣️

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here