হারানো সুর (৩)

হারানো সুর (৩)
সানজিদা ইসলাম সেতু

সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বিন্দু তখনও বাসায় ফিরে নি। বিন্দুর বাড়ির সবাই চিন্তায় পরে গেছে। ফোনও বন্ধ। সাথে যে ছেলেটা গেছিল তারও কোনে খবর নেই। রাত ৮ টার দিকে দুজনেই বাড়ি ফিরে। দুজনেরই মুখ থমথমে। মেয়েকে দেখে যেন প্রান ফিরে পেল আহসান সাহেব।
‘তোরা এতক্ষণ কোথায় ছিলি?’
‘মামা আসলে ঘুরতে ঘুরতে দেরি হয়ে গেছে, সময় যে কোথা দিয়ে গেছে তাই বুঝতে পারি নি।’
[ছেলেটি আহসান সাহেবের বোন আসমা র ছেলে রিজভী। বিন্দুর সমবয়সী।]
‘একবার ফোন করে তো বলতে পারতি, জানিস কত টেনশনে ছিলাম।’
‘সরি মামা।’
‘যা তোরা ফ্রেশ হয়ে নে।’
বিন্দু নিজের রুমে গিয়ে সরাসরি বাথরুমে যায়। সাওয়ার ছেড়ে তার নিচে বসে পরে।
চোখের পানির সাথে সবটা মিলে একাকার হয়ে গেছে। নিজের রাগকে সামলাতে না পেরে বাথরুমের আয়নায় সাথে হাত বারি দেয়। আয়নার কাচে হাত কেটে যায়। ভাবতে থাকে সন্ধ্যা থেকে ঘটা কাহিনী গুলো।

বিন্দু আর ছেলেটিকে (রিজভী) হাত ঘরে ঘুরতে দেখে বৃত্তর মাথা গরম যায়। বিন্দুর পাশে বৃত্ত কাউকে সহ্য করতে পারে না। যবে থেকে ও বিন্দুর প্রতি ওর ভালোবাসা অনুভব করেছে, তবে থেকে ওর পাশে ওর বাবা আর ভাই ছাড়া কাউকে সহ্য করতে পারে না। যে যে বিন্দুর সাথে মিশতে চেষ্টা করত, বৃত্ত বা ওর লোকেরা তাকে মেরে যেখানে সেখানে উপর ফেলে রাখত।
যেখানে কোনো ছেলেকে টিকতে দেয় না, সেখানে রিজভী বিন্দুর হাত ধরে ঘুরছে। হাতে থাকা ফুলের তোড়া ফেলে পা দিয়ে পিশে দেয় বৃত্ত। এগিয়ে গিয়ে বিন্দু আর রিজভীর সামনে। রাগ সামলাতে না পেরে বিন্দুকে চর মেরে দেয়। আচমকা এমন হওয়াতে বিন্দু রিজভী দুজনেই শকড। বৃত্ত বিন্দুর হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়। রিজভী ঠায় দাড়িয়ে আছে। কিছু বুঝে আসার আগেই কয়েকজন একে ওকেও নিয়ে যায়।

মুখোমুখি বসে আছে বৃত্ত আর বিন্দু। রাগে বিন্দুর মুখ লাল হয়ে আছে। বাম গালে চার আঙুলের দাগ বসে গেছে। হাতে বরফের বাটি নিয়ে বসে আছে বৃত্ত। গালে চরের দাগ দেখে বৃত্তর নিজেই খারাপ লাগছিল, তাই বরফ এনেছিল। কিন্তু বিন্দু সে বরফ কিছুতেই গাল অবধি নিতে দিচ্ছিল না। অনেকটা সময় পেরিয়ে যাবার পরও কিছু জানতে না পারায় ওর রাগ বাড়ছে।
‘বরফ লাগাতে দিচ্ছ না কেন? পরে কিন্তু ব্যথা করবে। তখন অামার দোষ দিও না।’
‘কে আপনি?’
‘গুড কুয়েশ্চন। আমি প্রলয় মজুমদার বৃত্ত, তুমি আমাকে বৃত্ত নামে ডাকতে পার। প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছ, এবার বরফ লাগাতে দাও।’
‘আপনি তো সেই না, যে একদিন আমার বাসার সামনে এসেছিলেন আর কিছু না বলে চলও গিয়েছিলেন?’
‘ওয়াও! আ’ম সো ইমপ্রেজ ডিয়ার। হ্যাঁ আমিই সেই। আমার বোনকেই তুমি বাঁচিয়েছিলে।’
‘তার এই প্রতিদান দিলেন বুঝি? ছিঃ, আপনার বোনকে দেখে মনে হচ্ছিল যথেষ্ট ভালো কিন্তু আপনি যথেষ্ট খারাপ। একটা অচেনা মেয়েকে তুলে এনেছেন। ‘
‘ভুল বললে, তুমি মোটেও আমার অচেনা না। তুমি আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ, সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। ‘
‘আপনাকে ১ম দিন দেখেই মনে হচ্ছিল আপনি মেন্টাল। আজ সেটা প্রমান হয়ে।’
‘আমি তো তোমাতেই মেন্টাল বিন্দু। ‘
‘এক্সকিউজ মি, আমার নাম মৃত্তিকা। ‘
‘মৃত্তিকা আহসান বিন্দু, সবাই মৃত্তিকা নামে ডাকে। কিন্তু আমি বিন্দু নামেই ডাকব।’
‘আরে মশাই, আপনার এসব আজাইরা কথা শোনার কোনো ইচ্ছে নাই আমার।
ভালো কথা, রিজভী কই? কোথায় ও? রিজভী, রিজভী, রি…’
বিন্দুর মুখে রিজভীর না শুনে বৃত্তর রাগ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। রাগের বশে ও বিন্দুর গলা চেপে ধরে।
‘ রিজভী রিজভী রিজভী… আরেকবার ওর নাম নিলে রিজভীকে মেরে ফেলব। একটা কথা ভালো করে শুনে নাও, আজকের পর তুমি তোমার বাবা, ভাইয়া আর আমার নাম ছাড়া অন্য কোনো ছেলের নাম মুখে নিলে সেই ছেলেকে আমি মেরে ফেলব। আর.. আর এসব সাজগোছ একেবারে বন্ধ। তোমার সাজ শুধু আমি দেখব, শুধু আমি। অন্য কেউ যদি তোমার সাজ দেখতে পায় তবে আমি সবাইকে শেষ করে দেব।’
বৃত্ত এত জোর বিন্দুর গলা চেপে ধরে যে আর কিছুসময় ওমন থাকলে বেচারি মরেই যেত। বিন্দুকে ছেড়ে দিতেই ও যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। টেবিলের উপর থাকা পানি খেয়ে বড়বড় শ্বাস নিতে থাকে। হঠাৎ এমন হওয়ায় অনেক ভয় পায় বিন্দু, ভয়ে কাঁপছে ও।
হঠাৎই বৃত্ত এসে বিন্দুকে জরিয়ে ধরে।
‘সরি বিন্দু, সরি। অাসলে রেগে গেলে কি করি নিজেই জানি না। আর এমন হবে না। তাছাড়া তুমিই তো আমার রাগ বাড়িয়ে দিয়েছ। দেখ আমি যা যা বলছি তা প্লিজ মেনে চল। তুমি আমার কথাগুলো মেনে চললে তোমার উপর আমি একটুও রাগ করব না।’
নিজেকে সামলে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে বৃত্তকে ধাক্কা দেয় বিন্দু।
‘কে আপনি? কেনো শুনব আমি আপনার কথা? কি চান আপনি?’
‘আমি তোমাকে চাই, ভালোবাসি আমি তোমাকে আর তোমাকেও আমাকে ভালোবাসতে হবে।’
‘আই হেইট ইউ। আপনার মতো একটা মানুষকে ভালোবাসতেও আমার রুচিতে বাঁধবে।’
‘আমাকে তুমি লাভ করবে না হেইট না তাও আমি ডিসাইট করব। তুমি তোমার উপর থেকে তোমার সব অধিকার হারিয়েছ। তুমি শুধু আমার আর আমাকে তোমার ভালোবাসতে হবে।’
বিন্দুকে কোনো কথা বলতে না দিয়ে কাকে যেন ফোন দেয়।
‘আমি বাসায় যাব।’
‘সময় হলে আমি নিজেই পৌঁছে দেব।’
‘আমি এখনই যাব।’
‘ওকে, তবে তোমাকে প্রমিস করতে হবে আমি যা যা বলছি সব তুমি মানবে। ভেবে দেখ, তুমি যদি আমার সব কথা মানতে রাজি হও তবেই তুমি বাসায় যেতে পারবে।’
‘মানব, সব মানব।
আগে তো বাসায় যাই তার পর দেখা যাব।’
‘প্রমিস কর। আমি শুনেছি, মৃত্তিকা আহসান বিন্দু কখনো নিজের প্রমিস ব্রেক করে না।’
বিন্দু এবার বিপাকে পরে। কিছু বলে না, চুপ করে থাকে।
‘বেশ তোমাকে প্রমিস করতে হবে না। আমার কথা বাইরে চললে আমি নিজেই তোমাকে আমার কথার ভিতরে নিয়ে আসতে পারব।’

দরজায় নক হওয়ায় বৃত্ত উঠে দরজা খুলে দেয়। দরজার বাইরে রিজভীকে নিয়ে দাড়িয়ে আছে একজন গার্ড। বেচারর মুখ ভয়ে একটু হয়ে গেছে। বৃত্ত রিজভীর কাধে হাত দিয়ে ওকে ভিতরে নিয়ে আসে। বিন্দুকে দেখে রিজভী যেন শান্তি পেল। ওর কাছে যেতে নিলে বৃত্ত আটকে দেয়।
‘আরে কই যাচ্ছ?’
‘মৃত্তিকার কাছে।’
‘না, তুমি যাবে না।’
‘যাব না মানে? আমার বোনের কাছে আমি যাব।’
‘ভাই তুই যেখানে আছিস সেখানেই থাক। এই লোকটা তোকে মেরে পাটপাট করে দেবে।’
‘দেখেছ, তোমার বোন এত কম সময়ে আমাকে কত ভালোভাবে চিনে গেছে। তুমি এই সোফায় বসো শালাবাবু।’
রিজভী কারো কথার আগাগোড়া বুঝতে পারছে না। একবার বিন্দুর দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার বৃত্তর দিকে তাকাচ্ছে।
‘এখানে কি হচ্ছে, আমাকে বলবে কেউ?’
‘সবটা জেনে কাজ নেই তোমার। যতটা বলছি ততটাই শোনো। আমি বিন্দুকে ভালোবাসি।’
‘আর বিন্দু?’
‘আমি ভালোবাসি না।’
রিজভী বেচারার অবস্থা খারাপ। কোনো কথাই মাথায় ডুকছে না।
‘আপনি চাইছেনটা কি? মৃত্তিকাকে এখানে তুলে এনেছেন বলে কি ও অাপনাকে ভালোবাসবে? যত্তসব! মৃত্তিকা চল। প্রথমবার বলে কিছু বললাম না, দ্বিতীয়বার যেন আপনাকে মৃত্তিকার আশেপাশে না দেখি।’
রিজভী মৃত্তিকার হাত ধরে। বৃত্ত চুপচাপ তাকিয়ে দেখছে। রিজভীর কাজে বিন্দুও ভয় পায়, না জানি বৃত্ত কি করে বসে। রিজভীর নাম নিতে ওর সাথে যা করল!!
কিন্তু বিন্দুকে অবাক করে কিছু না বলে বৃত্ত বলে রিজভীর হাত থেকে বিন্দুর হাত ছাড়িয়ে বিন্দুকে নিয়ে যায় আর গার্ডকে বলে রিজভীকে নিয়ে আসতে। রিজভী যখন বিন্দুর হাত ধরে তখন বৃত্ত বিন্দুর চোখে ভয় দেখতে পেয়েছে। তাই আর ও কিছু বলে নি।
বাড়ির পথে যাওয়ার সময় রিজভী, বিন্দু বা বৃত্ত কেউই কোনো কথা বলে নি। তবে বিন্দুর চোখে মুখে খুবই অস্বস্তি প্রকাশ পাচ্ছিল। রাস্তার মোড়ে গাড়ি থামায় বৃত্ত। রিজভী বাইরে দাড়াতে বলে। বিন্দু নামতে নিলে বৃত্ত আটকে দেয়।
‘তোমাকে কি বলছিলাম তা মনে আছে?’
‘(চুপ)’
‘কিছু জিজ্ঞেস করছি তোমাকে?’
‘(চুপ)’
‘বেশ বলতে হবে না। তবে অামি যা বলছি তা মাথায় রেখ। যদি তুমি না মানো, তবে আমি কি করব তা জানি না। তোমার পরিবারের সবার ভালো কিন্তু তোমার হাতে। তুমি যেমন করবে, তোমার পরিবার তেমন থাকবে। এর বেশি কিছু বলব না।
আরেকটা কথা, আজকের এ কথা যেন আমাদের তিন জনের বাইরে না যায়।’

বিন্দু নামতে নিলে বৃত্ত আবার আটকে দেয়। গালের দাগটা অনেকটাই মিলিয়ে গেছে, সহজে কেউ ধরতে পারবে না। কপালে আর গালে চুমু দিয়ে সরি বলে বৃত্ত। বিন্দু বৃত্তের দিকে তাকিয়ে কিছু না বলে চলে আসে।

এই ছিল তখনকার কাহিনি।
দরজার বাইরে থেকে বীনার গলা শোনা যাচ্ছে।
‘ আপু তুই কি বের হবি, নাকি বাকি জীবন ওখানে থাকার প্লানিং করছিস?
‘বেরচ্ছি। তোর জন্য কোথাও শান্তি নেই।’
‘কি হয়েছে রে তোর? মুখটা শুকিয়ে গেছে কেন? রিজভী ভাইয়াও কেমন যেন চুপ করে আছে, কি হয়েছে রে তোদের?’
‘কিছু না। যা তো এখান থেকে, আমি ঘুমাব এখন।’
‘লেডি কুম্ভকর্ণ, হুহ।’

বীনা চলে যায়। কিছুক্ষণ পর রিজভী আসে বিন্দুর রুমে। বেচারর মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না।

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here