হারানো সুর (১০)

হারানো সুর (১০)
সানজিদা ইসলাম সেতু

‘কি বলছিস রিধি, বৃত্ত ওখানে?’
‘হ্যাঁ ভাইয়া। কয়েকটা বাচ্চা এসেছিল, ওরা মৃত্তিকা অার বৃত্ত দুজনকেই চেনে। ওই বাচ্চা গুলোই বলল বৃত্ত এখানে। আর ওরা বৃত্তকেই আনতে গেছে।’
‘মৃত্তিকার রিয়েকশন কেমন?’
‘ও তে হোটেলে ব্যাক করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। কিন্তু আমি আটকে দিয়েছি। ভাইয়া মৃত্তিকার মুখটা না দেখার মতো।’
‘তুই এখন মজা নিচ্ছিস পাজি। শোন ৫ দিনের ট্যুর তোদের। এই পাঁচ দিনে মৃত্তিকার মুখ থেকে বের করতে হবে যে, ও বৃ্ত্তকে ভালোবাসে আর ওদের মধ্যের সব ঝামেলা মিটাতে হবে। ‘
‘হুম, আগে বৃত্ত ভাইয়া আসুক। তারপর সব দেখা যাবে।’

‘রিধি তুই কেনো আটকে রাখছিস আমায়? আমার কিছু ভালো লাগছে না, প্লিজ অামাকে যেতে দে।’
‘তুই কতদিন বৃত্ত ভাইয়ার থেকে পালাবি? এবার তো সামনাসামনি হও। যদি কোনো বাঁধা ছাড়া জীবনে এগিয়ে যেতে চাস তাহলে আজ আমার এই বাধায় আটকে থাক।
একবার বৃত্ত ভাইয়ার সামনে দাড়া। মানুষটা তোকে খুব ভালোবাসে মৃত্তিকা।’
‘উনি আমাকে ভালোবাসে না, যদি আমায় ভালোবাসত তাহলে এতোবছরে কেন একবারের জন্য আমার সামনে আসে নি? কেন একবার হাতটা ধরে বলেনি, বিন্দু যা হয়েছে সবটা ভুলে যাও? কেন বলেনি, আমি তোমার পাশে আছি?
এতোগুলা দিন আমি কি পরিমান কষ্ট পেয়েছি তা শুধু আমি জানি। আমাকে উনি ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। জীবন্ত লাশ করে দিয়েছে। মরেও বেঁচে আছি আমি।
একবারের জন্য উনি খোঁজ নেয়নি, আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি। তুই বলছিস, উনি নাকি আমাকে ভালোবাসে। তাহলে তুই বল, এই ওনার ভালোবাসার নমুনা?
উনি আমাকে ভালোবাসেন না রিধি। উনি আমাকে টিস্যু পেপারের মতো ব্যবহার করেছে। প্রয়োজন শেষ তো ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। জানিস রিধি আমি মনকে সব সময় এটা বুঝিয়েছি যে, বৃত্ত আমার অতীত, একটা দুঃস্বপ্ন। যার কাছে অামার কোনো মূল্য নেই তার জন্য নিজেকে শেষ করার কোনো মানেই হয় না। কিন্তু পারিনি আমি। কি করে পারব বল, আমি যে ভালোবাসি বৃত্তকে, বৃত্তর বিন্দু আমি।
এই সাগর পাড়ে ওনার সাথে অামার প্রথম দেখা হয়েছিল আর এখানেই শেষবারের মতো দেখেছিলাম আমার বৃত্তকে। আমি আমার মনের বোঝা আর বয়ে বেড়াতে পারছি না। জানিস আমার এখন কি ইচ্ছে করছে, ইচ্ছে করছে এই সাগড়েই নিজেকে শেষ করে দেই, আর বাঁচতে ইচ্ছে করছে না। বিশ্বাস কর, এই যন্ত্রণা নিয়ে বাঁচে থাকার চেয়ে মররে যাওয়া আমার কাছে অনেক সুখের। আমি..’
কথা শেষ করার আগেই হেচকা টান অনুভব করে বিন্দু। টানটা সামলে ওঠার আগেই বাম গালে ব্যথা অনুভব করে। নিজেকে সামলাতে না পেরে পরে যেতে নিলে কেউ একজন ধরে ফেলে, সেই ওকে সোজা করে দাড় করায়। সামনে দাড়ানো লোকটাকে দেখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
‘তোমাকে আগেও বলেছিলাম, আমার পারমিশন ছাড়া তুমি মরতে পারবে না। তোমর সাহস কি করে হয় মরে যাওয়ার কথা বলার?’
‘বৃত্ত…’
হ্যাঁ সামনে দাড়িয়ে যে লোকটা বিন্দুকে চড় মেরেছে সে বৃত্ত। বিন্দুর বলা সব কথা বৃত্ত শুনেছে। বৃত্তর বলা কথা গুলো বিন্দুর মাথায় চাপ সৃষ্টি করে। কারন, বৃত্তর চেহারা পাল্টে গেছে, তাই ও কথা আর চেহারা মিলাতে পারে নি। ওখানেই জ্ঞান হারায়।
‘বিন্দু, বিন্দু এই বিন্দু চোখ খোল। দেখ তোমার বৃত্ত এসেছে।’

রিধি সবটা তাকিয়ে দেখছে। কি করবে কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না।
‘রিধি তুমি চল আমাদের সাথে। ওকে আমি আমাদের রিসোর্টে নিয়ে যাচ্ছি।’
রিধি কিছু না বলে বৃত্তর পিছন পিছন যায়। বেচারি ভয় পেয়েছে। আচমকা বিন্দুকে চড় মারায় ও তো পুরো শকড। বৃত্তর দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়।

বিছানায় অজ্ঞান হয়ে শুয়ে আছে । কিছুক্ষণ আগে ডক্টর এসে চেকাপ করে দেখে। বলেছে অনিয়মিত খাওয়ার জন্য বিন্দু অনেকটাই দূর্বল গেছে আর বেশ কয়েকদিন ধরে ও অতিরিক্ত মানুষিক চাপের মধ্যে আছে। ডাক্তারের কথা শুনে বৃত্ত রাগে কাপতে থাকে।
কিছুক্ষণের মধ্যে বিন্দুর জ্ঞান ফিরে আসে। তখন বৃত্ত রুমে ছিল না। রিধি ওকে উঠে বসতে সাহায্য করে। খাবারের ট্রে নিয়ে রুমে আসে বৃত্ত। ট্রে নিয়ে বিন্দুর সামনে বসে পরে।

‘হা করো। এই ট্রেরের সব খাবার তোমাকে খেতে হবে। নইলে কিন্তু মাইর একটাও নিচে পরবে না।’
বিন্দু এক ধ্যান এ বৃত্তর দিকে তাকিয়ে আছে।
‘কি হলো হা কর, এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?’
‘কে আপনি?’
‘আমি বৃত্ত, তোমার বৃত্ত।’
‘অসম্ভব, আপনি বৃত্ত হতে পারেন না। বৃত্তর মতে কথা বললেই বৃত্ত হওয়া যায় না। আপনি বহুরূপী, কে আপনি?’
এতোক্ষণে বৃত্তর মনে পরে, ও আর আগের চেহারায় নেই, ওর চেহারা বদলে গেছে।
‘তোমার অজানা অনেক কিছু আছে বিন্দু, সবটা বলব তোমায় আগে প্লিজ খাবারটা খেয়ে নাও। তুমি অনেক দূর্বল, প্লিজ বিন্দু।’
‘হ্যাঁ মৃত্তিকা খেয়ে নে। উনি যা বলছে তা শোন।’
‘আচ্ছা, আমি খাব। খেতে খেকে সবটা শুনব।’
‘তবে একটা কথা, আমার কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ কোনো কথা বলতে পারবে না।
‘আচ্ছা, আমরা রাজি।’
‘সেদিন মানে শুক্রবার সন্ধ্যায় তোমাকে বাড়ি ছেড়ে আমি ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা দেই। তোমার সাথে আমার শেষ কথা গাড়িতে হয়। তার পরই তোমার বাবা এসে তোমার বিয়ের কথা বলে। সবটাই আমি ক্যামেরা ফুটেজ এ দেখি। আফসোসটা এখানেই, ফুটেজটা আমি পরেরদিন মানে শনিবার বিকালে দেখি। ততক্ষণে আমার অজান্তেই আমাকে ঘরবন্দি করা হয়। কোনো উপায়েই আমি বেরতে পারছিলাম না। পরেরদিন সকালে আমার ছোটবোন মম আমার রুমের লক খুলে দেয়। আমাকে বলে ফ্লাইটের টিকিট পায় নি, গাড়িতেই যেতে হবে। তখনই বেরিয়ে পরে। তোমার বাড়িতে যা যা ঘটেছে তা তো তুমি জানোই।
১৩ দিন পর আমাকে কোট থেকে ছাড়ানো হয়। তখনই আমি কক্সবাজার তোমার বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হই। তোমাদের পাই না। আঙ্কেল এর অফিসে গিয়ে দেখা করি, কিন্তু সে তোমার ঠিকানা দেয় না। ফিরে যাই। এর পরই আমার মাথায় আসে সিসিক্যামেরার কথা। ফুটেজ দেখতে বসি। সেখান থেকেই তোমার শারীরিক আর মানুষিক অবস্থা জানতে পারি। নিজেকে যে কতটা অসহায় লাগছিল তা তোমাকে বলে বুঝাতে পারব না। ফুটেজ দেখতে দেখতে কেমন যেন খটকা লাগে, রিওয়াইন্ড করে শুক্রবার বিকালের ফুটেজ দেখি। বলতে দ্বিধা নেই। সেদিন বিকালে আমার দাদু ইখতিয়ার মজুমদার তোমাদের বাড়িতে যায়। তোমার বাবাকে অনেক খারাপ কথা বলে। যার কারনেই তোমার বাবা রেগে তোমার বিয়ে অর্পনের সাথে ঠিক করে। দাদুর সাথে এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য আমি আবার ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা হই। কুমিল্লা আসতেই একটা তেলের ট্রাকের সাথে আমি গাড়ির অ্যাকসিডেন্ট হয়। গাড়িতে আগুন লাগে আর আমার শরীরের ফোরটি পারসেন্ট পুড়ে যায়। আমার চেহারা এত খারাপ ভাবে পুড়ে যায় যে প্লাস্টিক সার্জারি করে আমার পুরো চেহারাটাই বদলে দিতে হয়। সুস্থ হতে ২ মাসেরও বেশি সময় লাগে। আমার বড় ভাই চিত্ত তোমার সব খবর রাখছিল। তার থেকেই জানতে পারি তোমার তখনকার অবস্থা। আমি তোমার সামনে গেছিলাম। তখন বুঝলাম তুমি আমার সম্বন্ধে কি ভাব? তুমি ভয় পাও আমাকে। তাই তখনই ঠিক করি তোমার সামনে আসব না, আড়াল থেকেই কোমার খেয়াল রাখতে শুরু করি আর তোমার ভয় কাটানোর চেষ্টা করি।’
‘আপনি ছাড়া পেলেন কি করে?’
‘জানি না।’
‘এমনই হয়। বড়লোকদের সাত খুন মাফ। একটা খুনিকে এমনি ছেড়ে দিল।’
‘তোমার এ কথার উত্তর আমি আগামীকাল দেব।
রিধি তোমার ভাইয়াদের ফোন করে বল আগামীকাল যেন তারা এখানে আসে।
আর বিন্দু তোমাকে শুধু একটা কথা বলব, আমি কাউকে খুন করি নি।
তোমরা দুজন এবার রেষ্ট নাও।’
‘বৃত্ত ভাইয়া বলছিলাম যে আমরা হোটেলে ফিরে যাই, আমরা তো টিচারদের সাথে এসেছি ওনারা চিন্তা করবে।’
‘তারা চিন্তা করবে না। তোমাদের কক্সবাজার ট্যুর এর প্লান আমার ছিল। আর ওনারা জানে তোমরা আমার সাথে আছ। তুমি ভাইয়াদের এখনই ফোন করে জানিয়ে দাও।’
‘আচ্ছা। ‘

রিধি সমানে পায়চারি করে যাচ্ছে। বিন্দু চুপ করে বসে আছে। রিধি একটু পরপর বিন্দুকে প্রশ্ন করে যাচ্ছে আর বিন্দু মাঝে মাঝে হু হা করে যাচ্ছে।
‘মৃত্তিকা বৃত্ত ভাইয়ার মাথায় কি চলছে বলতো? কাল হঠাৎ ভাইয়াদের আসতে বলল কেন?’
‘(চুপ)’
‘এই কিছু জিজ্ঞেস করছি তোকে, বিন্দু?’
‘হ্যাঁ। ‘
‘কি হয়েছে তোর বিন্দু?’
‘কিছু না।’
‘আমার থেকে লুকাবি?’
‘আমি কিছু বুঝতে পারছি না রিধি। যতবার নিজেকে সামলে সামনে আগাতে চাই, ততবার বৃত্ত নামটা এসে সবটা এলোমেলো করে দেয়।
আমি আজও সেই দিনটা ভুলতে পারিনি। আমার চোখের সামনে ও একটা মানুষকে খুন করল।’
‘বৃত্ত ভাইয়া তো বলল সে খুন করিনি।’
‘আমি কোনো হিসাব মিলাতে পারছি না।’
‘কাল অবধি ওয়েট কর, সবটা বুঝতে পারবি। তোর সমস্ত বাঁধা কাল শেষ হবে।’

কি হবে কাল? বিন্দু কি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকবে নাকি বিন্দু নিজের ভুল ভাঙে বৃত্তর সাথে নতুন জীবন শুরু করবে?

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here