শেষ_বিকালের_আলো (৫ম পর্ব)

#শেষ_বিকালের_আলো (৫ম পর্ব)

অবনী উপরতলায় উঠে ভিতর থেকে দরজা লক করে দিলো। ওয়াশরুমে গিয়ে বাচ্চাদেরকে হাত মুখ ধুয়ে, নিজেও ফ্রেশ হয়ে বের হলো। ট্রাভেল ব্যাগ খুলে একটা বিছানার চাদর বের করলো।

অবনীর এটা একটা অভ্যাস,বাইরে কোথাও বেড়াতে গেলে একটা বিছানার চাদর আর ৪ টা বালিশের কাভার পার্মানেন্টলি ট্রাভেল ব্যাগে থাকে।

কিচেনে গিয়ে ঝাড়ু দেখতে পেলো আরও টুকটাক ব্যবহার্য জিনিসপত্র কিচেনে দেখতে পেলো।ঝাড়ু দিয়ে রুম গুলো পরিস্কার করে ফেলল।

শোবার ঘরের খাটের উপরে বিছানার চাদর বিছিয়ে সেখানে ২ মেয়েকে নিয়ে বসলো অবনী। জানালা দিয়ে খুব সুন্দর বাতাস এসে অবনীর চুল উড়িয়ে দিচ্ছে। অবনীর মনে হচ্ছে তারা কোন রিসোর্টে বেড়াতে এসেছে যেখানে শুধু অরণ্য নেই।

লিনসা আর লিনিয়া মিনিট দশেকের মাথায় অবনীর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে গিয়েছে,খুব সকালে উঠেছে। আবার পরিশ্রমও হয়েছে ওদের।

অবনী তার আনা ড্রেসের ওড়না গুলো পেঁচিয়ে বালিশের মত করে বাচ্চাদের মাথার নিচে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো।
জানালার গ্রীল ধরে এক দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আছে অবনী।মাধবীলতার ফুলের মৃদু সুবাস তার নাকে এসে লাগছে। কিন্তু অবনীর তাতে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। অন্য সময় হলে বা সাথে অরণ্য থাকলে এই এত সুন্দর স্বর্গীয় প্রকৃতিকে খুব উপভোগ করতো।

নিচে দেখতে পেলো বাড়িওয়ালী ভদ্রমহিলা পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে তেলাপিয়া মাছদের খাবার দিচ্ছে আর মাছগুলো পানির উপরে ভেসে উঠে খাবারগুলো কাড়াকাড়ি করে খাচ্ছে।

অবনীর তার নানুবাড়ির কথা মনে পড়ে গেলো…অবনী আর তার খালাতো ভাইবোনেরা মিলে নানুবাড়ির শান বাঁধানো ঘাটে পা ডুবিয়ে তেলাপিয়া মাছদের এভাবে খাবার দিতো।ঝাঁকে ঝাঁকে তেলাপিয়া মাছ তাদের পায়ের কাছে এসে খাবার খেতো। কত সুন্দর আর ভালোলাগার ছিলো সেই সময়গুলো।

অবনীর কিছু ভালো লাগছেনা।এখন সে কি করবে নিজেই তা বুঝতে পারছেনা।অতিরিক্ত টেনশনে এত বাতাসের মধ্যেও অবনী ঘামছে। অবনীর মনে হচ্ছে তার বুকের মধ্যে যেন বিশাল এক ভারি পাথর আটকে আছে।অবনী আর তার কান্না আটকে রাখতে পারলো না। সে কাঁদলো অঝোরে কাঁদলো।

বহুদিন পরে এভাবে কাঁদতে পারলো অবনী।এতদিন মনে হয় তার কান্নার স্বাধীনতাও ছিলোনা। বুকের মধ্যে চেপে থাকা ভারি পাথরটা একটু হলেও হালকা হয়ে গেলো।

অরণ্যকে ভালোবেসে নিজের পছন্দে বিয়ে করেছিলো অবনী। দুই ফ্যামিলির সম্মতিতেই বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছিলো।অবনী প্রচন্ডভাবে অরণ্যকে ভালোবাসে বলেই এতদিন এত অবহেলা আর বিভিন্নভাবে অপমান করার পরেও অবনী তার মেয়ে দুটোর কথা চিন্তা করে সংসার নামক নাটক করে গেছে দিনের পর দিন।

অরণ্যের সংসারে অবনী এতদিন ছিলো শুধুমাত্র দায়িত্বের বোঝা নিয়ে যেখানে কোন ভালোবাসার ছোঁয়া আর সম্মানের জায়গা ছিলোনা।

সবকিছুর পরেও অবনী ছিলো…মায়ায় জড়িয়ে ছিলো,তাদের সংসার, অরণ্য সবকিছুতেই অবনী মোহাচ্ছন্ন ছিলো।

কিন্তু অরণ্যের ভালোবাসায় কোথায় যেন ছেদ পড়েছে,মায়া আছে কিনা অবনী সন্দিহান আর মোহ তো কবেই কেটেকুটে ঘুটে গেছে।

অবনী তার বাসা ছেড়ে চলে আসার সময়টার কথা ভাবলেই বুকের মধ্যে কান্না দলা পাকিয়ে আসছে বার বার।বেশিদূর ভাবতে গেলেই অস্থির লাগছে।মাথা থেকে মনে হয় গরম ধোয়া বের হচ্ছে!

সে ভাবতে লাগলো…এই সাদিয়াটা কে! যাকে অরণ্য এত ভালো করে চেনে অথচ অবনী চেনাজানা তো দূরে থাক কখনো নামটাই শোনেনি।অরণ্যের অভিব্যক্তি তার কথা বলার ধরনেই বোঝা গিয়েছে অরণ্য অনেক দিন থেকে এই মেয়েকে চেনে।অরণ্যের অফিসে সাদিয়া নামে কোন মেয়ে নেই তার জানামতে।তাহলে কি অন্য কিছু!!! নাহ্ অবনী আর ভাবতে পারছেনা…

অবনী কি অরণ্যের কাছে এতই নগণ্য হয়ে গিয়েছে যে বাইরের একটা অপিরিচিত মেয়ে ঘরে ঢুকে গেলো আর তার সাথে অরণ্য একটা মিটিং এ বসে গেলো কিন্তু একবারও অবনীকে পরিচয় পর্যন্ত করিয়ে দিলোনা।

অরণ্য আর ওই মেয়েটা দুজনেই অবনীকে তার নিজের বাসায় বসে অপমান করেছে। কেউ অবনীকে পাত্তা দেয়নি।অবশ্য অরণ্য যেখানে অবনীকে সম্মান দেয়না সেখানে তার কাছে আসা মানুষজন কি আর অবনীকে সম্মান দেবে!

এসব কথা চিন্তা করতে করতে অরণ্যের উপরে অবনীর চাপা অভিমান এখন তীব্র ক্ষোভে পরিণত হয়েছে কিন্তু কেন যেন এই অরণ্যকে সে কখনও ঘৃণা করতে পারেনা।

হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে অবনীর নিস্তব্ধতা ভাঙলো।
হাতঘড়িতে সময় দেখলো দুপুর ১ টা বাজে। সামনে গিয়ে দরজা খুলে দেখলো বাড়িওয়ালী ভদ্রমহিলা একটা ট্রেতে খাবার নিয়ে এসেছেন।

অবনী কিছু না বলে ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে আছে।ভদ্রমহিলা নিস্তব্ধতা ভাঙলেন…
ওভাবে তাকিয়ে আছো কেন মেয়ে! অবনী ইতস্তত বোধ করতে লাগলো….
অবনী: কাকিমা এগুলো….!

কাকিমা: তুমি কি ভেবেছো রোজ তোমাকে খাবার দেবো! আজ নতুন এসেছো! রান্নাবান্না হয়নি।তাই আজকের দিনটা নাহয় আমি খাবার দিলাম এরপর তুমি রান্না করলে শোধ করে দিও।

অবনী: এত কস্টের মাঝেও হেসে ফেলল।কাকিমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ভিতরে ঢুকে আবার দরজা বন্ধ করে দিলো।

অবনী খাবারের ট্রে নিয়ে কিচেনে চলে গেলো। খাবারের ঢাকনা উঠিয়ে দেখলো একটা বাটিতে গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত।অন্য দু’টি ছোট বাটিতে দেশী মুরগির আলুর ঝোল আর মিক্সড সবজি।
অবনীর দেখেই ক্ষুধা লেগে গেলো।তার মনে হলো সে কতদিন যেন ভাত খায়নি কিন্তু তার খেতে ইচ্ছে করছে না।

অবনী কিচেনে খাবার রেখে শোবার ঘরে চলে গেলো।লিনসা আর লিনিয়া এখনও অঘোরে ঘুমাচ্ছে।ওদের ঘুমন্ত মুখটা দেখতে একদম অরণ্যের মত লাগছে।অবনী আসলে কাকে ছেড়ে এসেছে! সাথে করেই নিয়ে এসেছে ছোট ছোট ২ টা অরণ্য।

অবনী আবার চিন্তার সাগরে ডুব দিলো,তার মনে হতে লাগলো অরণ্য কে ছাড়া যেন কতগুলো দিন কাটিয়ে ফেলেছে।অথচ ১ টি দিনও এখনো পেরোয়নি।

অরণ্য কি তাদেরকে অনেক খুঁজে বেড়াচ্ছে! অবশ্য অফিস রেখে নাও খুঁজতে পারে।অরণ্য তো! অরণ্যের মনের গভীরতা অবনী আজকাল আর বুঝতে পারেনা বা বোঝার চেষ্টা করেনা।

একটা সময় অরণ্য ছিলো অবনীর কাছে স্বচ্ছ কাঁচের মত।সেখানে সে সব দেখতে পারতো।অরণ্যের চাওয়া পাওয়া বুঝতে পারতো।

অবনী যত বারই চাচ্ছে অরণ্যের কথা আর ভাববে না ততবারই নিরিবিলি স্পেস পেলেই অবনীর মাথা অরণ্যকে নিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করে দিচ্ছে!

অবনী উঠে দাঁড়ালো।ব্যাগ থেকে জামা কাপড় তোয়ালে বের করে শাওয়ারে চলে গেলো।

ওয়াশরুমে গিয়ে ঝড়নার নিচে দাঁড়ালো।অবনীর শরীর এই ওয়াশরুমের ঝড়নার নিচে কিন্তু মাথাকেন্দ্রিক মন চলে গেলো অবনীর বাসার ঝড়নার নিচে।

অবনী আবার ভাবতে লাগলো,অবনীর এই একটা মাত্র জায়গা ছিলো যেখানে অবনী নিজের মত করে একটু কাঁদতে পারতো।তার চোখের নোনা জল কৃত্রিম ঝড়নার সাথে মিলিয়ে যেতো কিন্তু সে সুযোগও সে খুব বেশি পেতোনা।
অবনীর নিজের জন্য খুব বেশি সময় তার কাছে থাকতো না।

আম্মু….আম্মু…হঠাৎ অবনী টের পেলো লিনসা ডাকছে আর ওয়াশরুমের দরজা ধাক্কা দিচ্ছে।

অবনী: লিনসা মামনি লিনিয়াও কি উঠে গিয়েছে ঘুম থেকে?

লিনসা: না,আম্মু।

অবনী: তুমি কি ভয় পাচ্ছো মামনি?

লিনসা: হুম আম্মু।

অবনী: “আমার সাহসী মেয়ে” লিনসা মামনি তুমি লিনিয়ার কাছে গিয়ে বসো,কোন ভয় নেই। আমি ৫ মিনিটের মধ্যেই বের হচ্ছি।

লিনসা: ওকে আম্মু।

অবনী ঝটপট বের হয়ে গেলো।বের হয়ে লিনসা কে গোসল করতে দিয়ে কিচেনে গেলো। লিনসার জন্য ভাত বেড়ে নিলো। এর মধ্যেই লিনিয়ার কান্না শুনতে পেলো।

দৌড়ে গিয়ে লিনিয়াকে কোলে তুলে নিলো অবনী। লিনসা গোসল করে বের হলে অবনী লিনিয়াকে গোসল করিয়ে দিলো।

কিচেন থেকে খাবার নিয়ে শোবার ঘরে চলে গেলো অবনী। লিনসাকে খেতে দিয়ে আর একটা প্লেটে অবনী নিজের জন্য আর লিনিয়ার জন্য নিয়ে নিলো।লিনিয়াকে খাইয়ে দিলো।

খেতে খেতে লিনসা হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলো….আম্মু বাবা কি এখানে আসবে?

অবনী : কি বলবে বুঝতে পারছেনা। সে কোন উত্তর দিলোনা।

লিনসা: আম্মু…বাবা কখন আসবে?

অবনী: এবার একটু রেগে গিয়ে লিনসা কে বলল জানিনা।কিচ্ছু জানিনা আমি তোমার বাবার ব্যাপারে।

লিনসা: খুব করুণ দৃষ্টিতে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো।

খাওয়া শেষ করে অবনী সব কিছু নিয়ে কিচেনে চলে গেলো।রাতের খাবার ভালো করে ঢেকে রুমে ঢুকতে গিয়ে দেখতে পেলো লিনসা লিনিয়াকে কোলে নিয়ে জানালা ধরে দাঁড়িয়ে আছে!

লিনসা কে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবনী যেন একটা ইলেক্ট্রিক শক খেলো।অবনী বুঝতে পারলো লিনসার সাথে এভাবে ব্যবহার করা উচিৎ হয়নি।

লিনসার ছোট মনে হয়তো আজকের ঘটনা নিয়ে একটা যুদ্ধ চলছে। লিনসা হয়তো মনে মনে ইনসিকিউরিটি ফিল করছে…

অবনী কখনও চায়নি এই বাবা না থাকার কষ্ট তার আদরের সন্তানরা কখনো ফিল করুক।যেই ছোট মন দুটোর জন্য এত গুলো বছর ভেবে ভেবে নিজেকে শাস্তি দিয়েছে আজ সেই ছোট মনকেই কষ্ট দিয়ে ফেলল।

অবনী ধীরে ধীরে গিয়ে পেছন থেকে লিনসাকে জড়িয়ে ধরলো।লিনসা ঝট করে ঘুরেই অবনীকে জড়িয়ে ধরে ভেউ ভেউ করে কান্না শুরু করে দিলো।
লিনসার কান্না শুনে লিনিয়াও কান্না জুড়ে দিলো।অবনীও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না…..

চলবে….
লেখনী #নুসু

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here