মায়াবিনী মানবী,পর্ব_০৯,বোনাস পর্ব

মায়াবিনী মানবী,পর্ব_০৯,বোনাস পর্ব
হুমাশা_এহতেশাম
পর্ব_০৯

জুইঁ নিজের হাসি কিছুতেই বন্ধ করতে পারছে না।পেট ধরে হাসছে। জুইঁর সাথে থাকা সাদুও ফোনের ওপাশ থেকে জুইঁর সঙ্গে তাল মিলিয়ে হেঁসে যাচ্ছে। তাদের হাসির মধ্যমনি হলো আলআবি।

কালরাতে…

জুইঁ আর আলআবি একে ওপরের চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছে। আলআবি জুইঁর কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে বারবার ভ্রুযুগল নাচানাচি করছে।জুইঁর চোখে চোখ রেখে ই জুইঁ কে হাসানোর চেষ্টা করছে। জুইঁ হাসি চেপে রাখছে।ঠিক এমন সময় আলআবির হাঁচি এসে পড়ে।জুইঁ আলআবি কে হাঁচি দিতে দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে সেখানে ই লাফালাফি শুরু করে দেয়।

জুইঁ গলা ঝেড়ে আলআবি কে উদ্দেশ্যে করে বলল…

–এইযে মিস্টার মাশরুখ সাহেব কালকের সকালের নাস্তা বানানোর জন্য রেডি তো?

আলআবি খুব ভাবের সহিত বলল…

–আমি কিচেনে ঢুকলে খাবার এমনি এমনি তৈরি হয়ে যায়।কালকে এমন নাস্তা খাওয়াব যে প্লেট সুদ্ধ খেয়ে ফেলবে।

–দেখব নে কোন দেশের নাস্তা বানান।(জুইঁ)

–এই দেশের টাই বানিয়ে দেখাব।(আলআবি)

কিছু সময় পরেই জুইঁ আর আলআবি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো।রাত তখন এগারোটা। জুইঁ নিজের রুমে ঢুকে দরজা টা যখন লাগাতে যাবে তখনি আলআবি এসে বাঁধা দিল।জুইঁ “কি হয়েছে” এমন একটা ভাব চোখে মুখে এনে আলআবির দিকে তাকালো। আলআবি বলল…

–সকালে কিন্তু ঠিক ৭ টায় হাঁটতে যাব।

জুইঁ দরজা টা আর একটু ফাঁকা করে বলল…

–হ্যাঁ,প্রতিদিনই তো যাই।এ আবার বলার কি হলো?

–না মানে,তাও বললাম আরকি।(আলআবি)

আলআবি কথাটা বলে পিছনে ঘুরে নিজের রুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে ই জুইঁ দরজা আটকাতে নেয় তখন আলআবি আবার তড়িৎ গতিতে এসে পূর্বের ন্যায় বাঁধা দেয়।জুইঁ কিছু টা বিরক্তি নিয়ে ই বলল…

–আবার কি?

আলআবি জুইঁ কে উদ্দেশ্য করে বলল…

–গুড নাইট। হ্যাভ অ্যা সুইট ড্রিম।

–এখান থেকে এখানে আবার গুড নাইট বলা লাগে?(জুইঁ)

–আমার ইচ্ছে। আমার মুখ। আমি বলেছি। তোমার কোন সমস্যা? (আলআবি)

–উফ! যান তো। গিয়ে ঘুমান। (জুইঁ)

–সে গুড নাইট! (আলআবি)

–গু নাইট। হয়েছে? (জুইঁ)

আলআবি কিছু টা তেড়ে এসে জুইঁকে বলল…

–এই কি বললে?

জুইঁ ঠাস করে দরজা টা বন্ধ করে দরজার সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়াতেই ঠোঁটের কোণে বিস্তর এক হাসি বিরাজমান হলো।খুশি খুশি মনে জুইঁ গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল।চোখজোড়া বন্ধ করে পারি জমালো ঘুমের দেশে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে বাইরে থেকে হেঁটে এসে জুইঁ মিসেস পারভীন এর কাছ থেকে ফোন নিয়ে নিজের রুমে এসে ই সাদুকে কল করল।

সাদুর সঙ্গে এর মধ্যে মাত্র দুদিন কথা হয়েছিল। আলআবির সঙ্গে কি কি করে সব সাদুকে বলা হয়ে গিয়েছে। কালরাতে জুইঁ যে জিতেছে সেটা এখনো বলা হয়নি।আর এই কথাটা না বললে হয়তো জুইঁর পেটের খাবার হজম না হয়ে বদহজম হয়ে যাবে।

কালরাতের ঘটনা বলছে আর দুজন হাসছে। মূলত সাদু ই বেশি হাসছে।আলআবি কে গু নাইট বলার জন্য। হাসি থামিয়ে সাদু বলে উঠলো…

–তা তোর বাপ জানে যে তার মেয়ে প্রেমে পড়ে দ্বিতীয় লায়লি হতে চলেছে।

–যার প্রেমে পরছি তার খবর নাই এদিকে পাড়াপড়শির ঘুম নাই।(জুইঁ)

–আরে ছাগল তোর কি মনে হয় একটা পোলা এমনে এমনেই তোর লগে আইয়া পিরিতের আলাপ করে।(সাদু)

–ওই ছ্যামরি পিরিতের আলাপ করলাম কখন আমরা? (জুইঁ)

–তোমরা যা করো ওডিরে পিরিতের আলাপই কয়।ছাঁদে যাইয়া তাঁরা গুনো।একজন আরেক জনের চোখে চোখ রাইখা তাকায়া থাকো।ফুচকা খাও। কফি খাও।সকালে হাঁটতে বের হও।এগুলা পিরিত ছাড়া আর কি?(সাদু)

–আমাদের মইধ্যে তো আর প্রপোজ ট্রপোজ কিছু হয় নাই।তাইলে? (জুইঁ)

–হইতে কতখন?দেখিছ আ কয়দিন পরে আইয়া ওয়ান ফোর থ্রী কইয়া দিব।(সাদু)

জুইঁ অবাক হয়ে বলল…

–ওয়ান ফোর থ্রী কইব ক্যান?

–আরে বেআক্কেল ওয়ান ফোর থ্রী মানে আই লাভ ইউ।(সাদু)

–অশিক্ষিত মহিলা! ঠিক মতো কইলে তো বুজতামই।(জুইঁ)

সাদু কন্ঠ স্বর কিছু টা মোটা করে বলতে লাগলো…

–হে বালিকা! আমি দেখিতে পাইতেছি তুমি কিছুদিন পর তোমার গুরুচন্ডালী পিতার হইতে গোপনে এক যুবকের সহিত প্রেমে লিপ্ত হইবে।এবং পিতা হইতে গোপনে ফুসুরফাসুর করিয়া ফোনালাপ করিবে।

সাদুর কথায় জুইঁ অট্টহাসিতে ফেটে পরলো।জুইঁ সাদুকে হাসি থামিয়ে বলল…

–আচ্ছা শোন রাইখা দেই।আজকে আমাদের এলাকীয় ক্রাশ সকালের নাস্তা বানাইবো। গিয়া দেইখা আসি নাস্তার কয়টা বানাইছে।

–হ! না দেইখা থাকতে পারো না হেইডা কও।(সাদু)

–ওই যা তো।কাম নাই কোন?যাইয়া সাদমান ভাইর লগে প্রেম কর।রাখলাম বায়।

ওপাশ থেকে সাদুর বায় শব্দ টা শুনতে ই জুইঁ ফোন কেটে দিল।ফোনটা মিসেস পারভীন এর রুমে রাখতে গিয়ে দেখল তিনি শুয়ে আছেন।সকালের নাস্তা মূলত লিপি আন্টি ই বানিয়ে থাকেন।তাই মিসেস পারভীন সকালে আর কিচেনের দিকে পা বাড়ান না।

জুইঁ কিচেনে গিয়ে দেখে আলআবি একটা বাটিতে তেল ঢালছে।জুইঁ আরেক টু ঝুঁকে গিয়ে দেখতে পায় আলআবি বাটিতে ডিম নিয়ে তাতে তেল ঢালছে।দরজার কাছেই লিপি আন্টি আর দুজন সার্ভেন্ট দাঁড়িয়ে আছে। জুইঁ কে দেখা মাত্র ই লিপি ফিসফিসে আওয়াজ করে বলে উঠলো…

–দেখছ নি কারবার?যে একখান ডিম ভাজে কেমতে এইডা কইতে ফারে না হেয় আইছে রাইনতে।দেহ যাইয়া রুডি এহেকখান এহেক দেশের মানচিত্র বানাইয়া থুইছে।হের পর আবার রুডির ভিতার দুইডা কইরা চোখ গজাইছে।

লিপি আন্টি একটু থেমে আবার বললেন…

–দেহ কেউ বলে ডিম ভাজার তেল ফেরাইপেনে না দিয়া ডিমের লগেই গুইল্লা দেয়।বাহের জন্মেও তো এমন ডিম ভাজা দেহি নাই।এতো কইরা কইলাম যে দেও আমি নাস্তা বানাইয়া দেই।কেডা শুনে কার কতা। আমারে কি কয় জানো?হের কাছে নাকি কোন তোতাপাখি নাস্তা খাইতে চাইছে।পাখিও যে নাস্তা খাইতে চায় এডি এই জন্মে এই পরথম হুনলাম।

চলবে………….

মায়াবিনী_মানবী
হুমাশা_এহতেশাম
বোনাস পর্ব

“তোতাপাখি” নামটা আজকাল জুইঁর কাছে অসম্ভব রকমের ভালো লাগে।সেই সাথে লিপির বলা কথা টাও কর্ণপাত হতে ই শীতলতা ছেয়ে গেল জুইঁর মাঝে।আলআবি তার তোতাপাখির জন্য অপটু আর অদক্ষ হাতে নাস্তা বানাচ্ছে। এই কথা ভাবতেই জুইঁর ঠোঁটে হাসি স্পষ্ট হতে লাগলো।সাথে চোখের কার্নিশেও জমেছে কিঞ্চিৎ জল।

জুইঁ কিচেনের ভিতরে পা বাড়িয়ে আলআবির পাশে এসে দাঁড়িয়ে পরলো। একটা রুটি হাতে নিয়ে উঁচু করে ধরলো। রুটি পুরে একেবারে যাচ্ছে তাই অবস্থা।মাঝখান থেকে একটু উপরে পুড়ে গিয়ে দুটো ফুটোর মতো হয়ে গিয়েছে।লিপির ভাষায় বলতে গেলে দুটো চোখ গজিয়েছে।

জুইঁর চোখ পরলো আলআবির দিকে। বেচারা মুখ টাকে অংকের চার পাঁচ ছয় বানিয়ে রেখে খুন্তি দিয়ে ডিম উল্টানোর চেষ্টায় আছে। চেহারার বেহাল অবস্থা দেখে জুইঁ খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। এতখন আলআবির নজরের বাইরে ছিল জুইঁ। জুইঁ কে দেখে আলআবি ডিম ভাজা রেখে জুইঁর দিকে আরও গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।মেয়েটা হাসলে সাথে তার গজদাঁত ও হাসে।এমন টাই মনে হচ্ছে আলআবির।মনে হচ্ছে গজদাঁত টা বুঝি আলআবি কে বলছে সুন্দর জিনিস দেখলে মাশাল্লাহ বলতে হয়।এমন চিন্তা ভাবনা মাথায় আসতেই আলআবি অস্পষ্ট কন্ঠে বলে উঠলো…

–মাশাল্লাহ!

আলআবির কথাটা আলআবির কান ছাড়া অন্যের কান অব্দি পৌঁছাতে পারেনি।জুইঁর হাসি কিছুটা থামলে আলআবি বলে…

–এতো হাসার কি হলো?এটা নতুন স্টাইলে রুটি বানানো।

জুইঁ আলআবির কথায় আবার হাসতে হাসতে বলল…

–কাঁচা ডিমের মধ্যে ই তেল দিয়ে সেটা ফ্রাইপেনে দেয়াও কি নতুন স্টাইল?

আলআবি তার ফ্রাইপেনে লেগে যাওয়া ডিম টাকে উঠাতে না পেরে চরম বিরক্তের সহিত বলে উঠলো…

–ধুর,ছাতার মাথা।

জুইঁ আলআবির অবস্থা দেখে অনেক কষ্টে হাসি দমিয়ে রেখে বলল…

–দিন।আমি করে দেই।সাথে আপনাকে ও শিখিয়ে দেই।

আলআবি হাল ছেড়ে দিয়ে বলল…

–ঠিক আছে। বাট সাবধানে কাজ করো।

আলআবি জুইঁ কে এপ্রোন পড়িয়ে দিতে চাইলে জুইঁ পড়লো না।তার বদলে তার ওড়না টা সুন্দর করে বেধে নিল।জুইঁ নতুন করে আবার আটা নিল।আলআবি কে দেখিয়ে দেখিয়ে রুটি বানালো।কালকের রেখে দেয়া গরুর গোসত গরম করল।

আলআবির কাছে জুইঁ কে বউ বউ লাগছে।মনে হচ্ছে পাক্কা গিন্নি।আলআবি ধীরে ধীরে জুইঁর কিছু টা কাছাকাছি গিয়ে কপালে লেগে থাকা আটা হাত দিয়ে পরিষ্কার করে দিয়ে আবার নিজের জাগায় এসে পড়ে।জুইঁ আলআবির এমন কান্ডে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পরে।আর তখনই মিসেস পারভীন কিচেন প্রবেশ করেন।মিসেস পারভীনও ছেলের কান্ড শুনে একদফা হেসে নেন।

জুইঁ ভেবেছিল কিচেনে আলআবি আসার জন্য হয়তো আদর মাখা একটু আকটু বকা দিবে।এই যেমন – তুই কেন এখানে আসলি?কিছু পারিস?হাত টাত পুড়ে গেলে কি করতি?আসলি কেন এখানে?
তবে মিসেস পারভীন এরূপ কিছু ই বলেন নি।তিনি আরও জুইঁ কে বাহবা দিয়েছেন আলআবি কে শেখানোর জন্য।

মিসেস পারভীন এর ভাষ্যমতে,

ছেলে মেয়ে বলে কোন ভেদাভেদ নেই। ছেলে বলেই যে রান্না করা লাগবে না এমনটা ভাবা নিতান্তই বোকামি। টুকটাক শিখে রাখা ভালো। এতে করে বিপদের সময় নিজের রান্না টুকু অন্তত নিজে করে নেয়া যায়।আর তাছাড়া বিয়ের পর স্ত্রী কেও হেল্প করা যায়। আমাদের নবিজীও তার স্ত্রী কে রান্নার কাজে সাহায্য করতেন। প্রত্যেকটা মানুষেরই এই রান্না বিষয় টা সম্পর্কে একটু হলেও অবগত থাকা উচিৎ।

দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পরে যে যে যার যার রুমে বিশ্রাম করছিল। এসময় টা জুইঁ একটু ঘুমায় তবে আজ ঘুম আসছে না।কিছু নিয়ে খুব চিন্তা ভাবনা করছে।জুইঁর চিন্তা ভাবনার মূলেই রয়েছে আলআবি। জুইঁ ভাবছে – “আচ্ছা আমি যেমন তার জন্য কিছু একটা অনুভব করি সেও কি আমার জন্য কিছু অনুভব করে?সেকি আমাকে শুধু ই বন্ধু হিসেবে ভাবে? আমাকে নিয়ে সে কি অন্য কিছু ভাবে না?আচ্ছা তার কি গার্লফ্রেন্ড আছে? না না।গার্লফ্রেন্ড থাকলে নিশ্চয় ই আমি এ কয়দিনে সেটা জানতে পারতাম। এর থেকেও তো বড় একটা কথা আমার জানা হয়নি।সে কেন তার বাবার সঙ্গে ওমন আচরণ করে?

আজ সকালে ও অফিসে যাওয়া নিয়ে আলআবি আর সিরাজ সাহেব এর মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়েছে।জুইঁ কাল বা পরশু যশোর চলে যাবে।তাই কিছু একটা ভেবে নিজের রুম থেকে লিপির রুমের দিকে পা বাড়াল।

চলবে………….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here