মায়াবিনী মানবী,পর্ব_২০ শেষ

মায়াবিনী মানবী,পর্ব_২০ শেষ
হুমাশা_এহতেশাম

জুইঁ বাসায় ঢুকতে না ঢুকতেই জুইঁর খালামনি জুইঁর খালুর উপরে চেঁচিয়ে উঠলেন।চেঁচানোর প্রধাণ কারণ হলো জুইঁর মোর্শেদ খালুর ফোন আর ফোনের রিংটোন। সোফায় জুইঁর মোর্শেদ খালু বসা ছিলেন। টি টেবিলেই তার ফোনটা একাধারে বেজে যাচ্ছিল।রিংটোনে সেট করা গানে কেউ বলে যাচ্ছিলেন:

“তুমি হলে বাবু
আমি তোমার হিরো, ওহোহোহো”

জুইঁর যতদূর মনে পড়ে গান টা হিরো আলম নামেরই কেউ গেয়েছেন। মোর্শেদ সাহেব এর এই হলো এক সমস্যা। আজব আজব রকমের রিংটোন সেট করে রাখেন তিনি।তার ভাষ্যমতে, কল আসলে তিনি টের পান না।তাই আনকমন ধরনের রিংটোন সেট করে রাখেন।এতে করে হঠাৎ করেই যখন তার ফোন বেজে ওঠে তখন রিংটোন এর জায়গায় গান বাজে বলে তিনি নাকি খুব সহজেই টের পান।

জুইঁর মা কিচেন থেকে বের হয়ে আসলেন কে এসেছে দেখার জন্য। জুইঁ কে দেখে তাড়া দিয়ে বললেন…

–যা যা তারাতাড়ি ফ্রেশ হয়েনে।তোর মামা মামিও আসছে। ফোন দিয়েছিলাম।

দ্রুততার সহিত কথা গুলো বলে আবার ব্যস্ত পায় কিচেনের দিকে চলে গেলেন জুইঁর মা।বাসায় জুইঁর সাথে সকলেই উচ্চ আওয়াজে কথা বলে।প্রথম প্রথম জুইঁর মানিয়ে নিতে যেমন অসুবিধা হতো তেমন পরিবারের অন্য সদস্যদেরও মানিয়ে নিতে অসুবিধা হতো।

জুইঁ নিজের রুমে এসে ফ্রেশ হতে চলে যায়। ফ্রেশ হওয়ার সময় জুইঁর মাথায় একটা বিষয় এসে হানা দেয়।–” আজ এতো তাড়াতাড়ি কেন আসতে বলল মা?আরও তো কতো দিনই খালামনিরা বাসায় এসেছে। কই এমন তো কোনদিন বলেনি। আর তার চেয়ে বড় কথা খালামনি,খালু,মামা মামি সবাই তো আসলে আগে থেকে জানিয়েই আসে। তাহলে গতকাল মা আমাকে বলল না কেন? ”

জুই আর বেশি কিছু না ভেবে নিজের রুম থেকে বের হয়ে সোজা ড্রইংরুমে এর দিকে পা বাড়ালো। প্রায় তিনটার দিকে জমির মামা মামি বাসায় আসে। অবাক করা বিষয় হলো আজ জুইঁর বড় ভাই অর্থাৎ নিয়াজ ও ভার্সিটি যায়নি। কারণ জুইঁ তার মাস্টার্সে পড়ুয়া ভাইকে এ পর্যন্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় ছাড়া ভার্সিটি মিস দিতে দেখে নি।

আসরের আযানের ধ্বনি কানে এসে পৌঁছাতেই জুইঁ বারান্দা থেকে রুমে এসে পড়ে। নামাজ পড়া শেষ হলে জায়নামাজ টা রেখে যখন গুছিয়ে রাখতে যায় ঠিক তখন রুমে প্রবেশ করে জুইঁর মা। জুইঁ কে উদ্দেশ্য করে বলেন…

–জুইঁ তোর সাথে জরুরি একটা কথা বলার আছে।

জুইঁ হাসি মুখে জবাব দেয়…

–কি বলবা মা? বলো।

জুইঁর মা জুইঁর কাছে এসে দুই বাজু ধরে বিছানার উপর বসিয়ে দেয়। এরপর জুইঁ দুই হাত ধরে অনেকটা আবেগী হয়ে বলে…

— তোকে সবচেয়ে কে বেশি ভালোবাসে বলতো? আমি না তোর বাবা?

হঠাৎ করে মায়ের এমন প্রশ্নে জুইঁর ভ্রুযুগল কিঞ্চিত পরিমাণে সংকুচিত হয়ে আসে। আর মুখ দিয়ে বের হয়…

–এটা কেমন প্রশ্ন মা?দুজনেই আমাকে অনেক ভালোবাসো।হ্যাঁ হয়তো বাবা একটু কঠোর কিন্তু বাবার কঠোরতার মধ্যে ই ভালোবাসা আছে।

— তাহলে বল ভালোবাসলে কি কখনো তোর খারাপ চাইবো?(মা)

— খারাপ কেন চাইবে?

এরপরেই জুইঁ কিছুটা সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করে বসল…

–তুমি আসলে কি বলবে বলো তো?

জুইঁরমা একাধারে বলতে লাগলেন…

–শোন আমি আর তোর বাবা চাই তুই সেদিনের ওই ছেলেটাকে ই বিয়ে কর। মানে আলআবি কে।ছেলেও রাজি আর ছেলের পরিবারের সবাই ই রাজি। আজকে সন্ধ্যায় ওরা এসে তোকে আংটি পড়িয়ে যাবে আর বিয়ের ডেট ফিক্স করে যাবে।

মায়ের কথা জুইঁর কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই চরমমাত্রায় অবাক হল। তাকে না জানিয়েই যে তার মা-বাবা এত কিছু করে ফেলেছে সেজন্য সাথে কিছুটা রাগও হলো।জুইঁর এখন আলআবির উপরেও রাগ হচ্ছে। জুইঁ তো এটাই ভেবে পাচ্ছেনা যে, বিয়ে না করার কথা সরাসরি আলআবিকে বলেই দিয়েছে তাহলে আবার বিয়ের কথা আসে কোত্থেকে।জুইঁ একটু জোর গলায় বলে উঠলো…

— আমাকে না জিজ্ঞেস করে তোমরা এমন একটা ডিসিশন কিভাবে নিলে? আর ওই লোকটাই বা কেমন? তাকে তো আমি না বলেই দিয়েছি তাহলে আবার বিয়ের কথা কেন আসছে।

জুইঁর কথা শেষ হতেই রুমে জুইঁর বাবা ওলিদূন আজাদ প্রবেশ করেন। মেয়ের সব কথাই তিনি শুনে নিয়েছেন। তাই রুমে প্রবেশ করেই বলতে লাগলেন…

— তুমি এখনো এতটা বড় হয়ে যাও নি যে তোমাকে জিজ্ঞেস করে তারপর আমরা কোনো ডিসিশন নেব। আজ পর্যন্ত তোমার জন্য যে ডিসিশন গুলো নিয়েছি তা ভেবে চিন্তেই নিয়েছি আর আজও ভেবেচিন্তেই নিচ্ছি। আশা করি তুমি আমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করবে।

জুঁই নিচুস্বরে তার বাবাকে বললো…

–কিন্তু বাবা তুমি তো জানো আমি কিসের জন্য….

জুঁইকে থামিয়ে ওলিদূন আজাদ আবার বলতে লাগলেন…

–আলআবি সব জেনেই রাজি হয়েছে।ওর যেহেতু সমস্যা নেই সেহেতু তোমারও সমস্যা হওয়ার কোনো কারণ আমি দেখছি না।

ওলিদূন আজাদ কোন উত্তরের আশায় আর দাঁড়িয়ে রইলেন না পিছন ঘুরে ব্যস্ত পায়ে রুম ত্যাগ করলেন।

সময়টা ঠিক ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। শীত ঋতু আরো অনেক আগেই আগমন ঘটিয়ে তার শীতল অস্তিত্বের জানান দিয়েছে। পৃথিবীর বুকে আধার নামিয়ে সেকেন্ডের কাটা টিক টিক করে ঘুরতে ঘুরতে ঘন্টা আর মিনিটের কাটা কে একত্রে মিলিয়ে দিয়ে ঠিক বারোতে পৌঁছে দিয়েছে।

জুইঁ গায়ে জড়ানো চাদর টাকে খুলে রেখে গুটি গুটি পায়ে বেডের কাছে এসে দাঁড়িয়ে পরলো। বেডের ঠিক মাঝখানে গুটিশুটি মেরে গায়ে ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে চার বছর এর আফরা ঘুমিয়ে আছে। জুইঁ কালক্ষেপণ না করে নিজেও আফরার একপাশ দিয়ে ব্ল্যাঙ্কেটের ভিতর ঢুকে গেলো। আফরার কালো কুচকুচে বর্ণের চুলে হাত বুলাতে লাগল।চোখে ঘুম ঘুম ভাব চলে আসতেই জুইঁর চোখ জোড়া বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু তা বেশি সময় স্থায়ী হলো না।

হঠাৎ করেই পেটে ভাড়ী কোন জিনিসের অস্তিত্ব টের পেতে ই জুইঁর ঘুমন্ত মস্তিষ্কের জাগরণ ঘটল।ঘাড়ে কারো ঈষৎ তপ্ত শ্বাস প্রশ্বাস অনুভব করতে ই জুইঁ বুঝতে পারলো এটা অনাকাঙ্ক্ষিত কেউ নয়।

জুইঁ কিছু টা পিছনে ফিরতেই চিৎকার করে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে আলআবি জুইঁর মুখ তার বলিষ্ঠ হাত দিয়ে চেপে ধরলো। জুইঁ চোখ জোড়া বড় বড় করে
মুখ দিয়ে কিছু টা “উম উম” শব্দ বের করছে। আলআবি হাত সরাচ্ছে না বলে জুইঁ নিজের দুহাত দিয়ে খুব কষ্টে আলআবির হাত সরাল।হাত সরিয়ে বলতে লাগলো…

–আপনার লজ্জা শরম নেই। কতবার বলেছি খালি গায়ে একদম আমার সাথে ঘুমাতে আসবেন না।

আলআবি জুইঁ কে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে বলল…

–পাঁচ বছর হয়ে গিয়েছে বিয়ের আর আমাদের আফরার চার বছর। এখন আবার লজ্জা কিসের?

বলে ই জুইঁর নরম গালে আলআবি নিজের ঠোঁটের ছোঁয়া দিল।জুই লাজুক হেসে আলআবির বুকে নিজের মুখ লুকিয়ে ফেলল।আলআবির হৃৎস্পন্দন শান্তির এক সুর তুললো যা জুইঁ চোখ বুঁজে অনুভব করতে লাগলো।

তখনি হঠাৎ করে একটা বাচ্চা কন্ঠ বলে উঠলো…

–আব্বি তুমি পঁচা পঁচা পঁচা। তিন পঁচা।

আফরার এমন কথায় দুজনেই আফরার দিকে তাকালো। আফরা ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে। আলআবি মুচকি হেসে বলল…

–কেন মামনি!আফরার আব্বিটা কি করেছে?

–আফরার আব্বি প্রতিদিন রাতে চুপি চুপি আফরাকে ফাকি দিয়ে আম্মির কাছে চলে যায় আর জড়িয়ে ধরে ঘুমায়।আফরাকে একটু ও ভালোবাসে না।(আফরা)

জুইঁ আফরাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো আফরা বলে উঠলো…

–আমার আম্মি বেস্ট আম্মি।

আলআবি ও এসে জুইঁর উপর দিয়ে হাত দিয়ে একহাতে জড়িয়ে ধরলো।

সেদিন আলআবি আর জুইঁর আংটি বদল হয়।তার ঠিক একমাস পরে পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হয় জুইঁ আলআবি।জুইঁ প্রথমে বিয়েতে রাজি না থাকলেও পরে রাজি হয়ে যায়। আলআবি নামক প্রেমিক পুরুষের ভালোবাসা জুইঁর চোখে ধরা পড়েছিল।বর্তমানে জুইঁর কানের ও কোন সমস্যা নেই। অন্যদের মতো জুইঁ ও এখন শুনতে পারে। আলআবি তার #মায়াবিনী_মানবীর সাথে দীর্ঘ পাঁচ বছর অতিক্রম করেছে। চার বছর ধরে জুইঁ তাকে আরেক নতুন সম্পর্কের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।তা হলো বাবা।জুইঁ তাকে আব্বি ডাক শুনিয়েছে।

আফরা হুট করেই আলআবি কে প্রশ্ন করে বসলো…

— আব্বি তুমি কাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো?আফরাকে না কি আম্মি কে?

আফরার প্রশ্নে জুইঁ আর আলআবি উভয়ই অবাক হলো।এটুকু বাচ্চা এমন একটা প্রশ্ন করবে তা ভাবতে পারে নি।আলআবি আরেকটু শক্ত করে দুজনকে জড়িয়ে ধরে বলল…

–জুইঁ যদি আলআবির প্রাণ হয় তাহলে আফরা তার নয়নমনি।

সমাপ্তি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here