মায়াবন_বিহারিনী 🖤 #পর্ব_০৭,০৮

#মায়াবন_বিহারিনী 🖤
#পর্ব_০৭,০৮
#আফিয়া_আফরিন
০৭

এই ফুটবল টুর্নামেন্টের জন্য অনেক দিন যাবত প্র্যাকটিস করছিলো ইমন। তাই জিততে না পেরে, মনটা একটু খারাপই হয়ে গেছে।

নীলাকে আনন্দে লাফালাফি করতে দেখে ইমন তাকে ডাক দিল, “এই নীলা।”

নীলা এগিয়ে এসে বলল, “হ্যাঁ বলো।”

“তোর নাকি পরীক্ষা? কই তোদের ব্যাচেরটা পরীক্ষা ছিল না এবং আগামী দুই মাসেও কোনো পরীক্ষা নাই। মিথ্যা বললি কেন?”

নীলা থতমত খেয়ে গেল। এই ব্যাপারটা তো সে রীতিমত ভুলেই গিয়েছিল।
আমতা আমতা করে বলল, “না মানে!”

“কি মানে?”

“আমি জানতাম পরীক্ষা, কিন্তু আসলে পরীক্ষা ছিল না। শ্রাবণী আমার সাথে প্রাঙ্ক করেছিলো। আমিও সেটাকে সিরিয়াসলি ভেবেছিলাম।”

“এতো বেখেয়ালি স্টুডেন্ট তুই?”

“ছাড়ো তো এসব কথা। আমাকে কংগ্র্যাচুলেট করবে না? আমরা জিতলাম যে!”

ইমন হেসে বলল, “কংগ্রাচুলেশন!”

লীলা হুট করে দুহাতে ইমনের গলা পেঁচিয়ে আদুরে গলায় বলল, “থ্যাংক ইউ সো মাচ।”

এই দৃশ্যটা চোখে পড়ে গেল মায়ার। ইমন নিজেও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে।
নীলার হাত সরিয়ে ‘ওয়েলকাম’ বলে ওখান থেকে চলে আসলো।
মায়া দূর থেকে দেখছিল সবকিছু। নীলা মেয়েটার উপর তার ভীষণ রাগ হচ্ছে, বিরক্তিকর!

নীলা মুখে বক্র হাসি ফুটিয়ে মনে মনে বলল, “হা, হা। আজ যেমন আমরা জিতে গেছি, সেই রকম আমিও একদিন জিতে যাব। মায়ের সাথে লড়াই হবে এইবার ইমনকে নিয়ে। ইমন হবে শুধুমাত্র আমার।”

দুপুরের খাবারটা তারা বাইরেই খেয়ে নিলো। বাড়ি ফেরার সময় দুটো রিক্সা নিলো।

নীলা বলল, “কাকি, মায়া আর মিমো তোমরা একসাথে যাও। আমি আর ইমন একসাথে আসছি।”

মায়া আড়চোখে তাকালো। তার ভালো লাগছে না এসব কিছু।

মিমো বলল, “নীলা আপু তোমার সাথে আমার কথা আছে। তুমি আমার সাথে আসো প্লিজ। মায়া আর ভাইয়া যাক একসাথে।”

মায়া বাধা দিয়ে বলল, “কি দরকার? নীলা আপুর সাথে কথা তো বাসায় গিয়েই বলতে পারবি। আর রাস্তার মধ্যে এত কথা কিসের? যাওয়া নিয়ে যখন এত ঝামেলাই হচ্ছে, তখন ফুপি আর ইমন একসাথে যাক। আমি, তুই আর নীলা আপু একসাথে যাই। রিক্সায় তোরা কথাও বলে নিতে পারবি।”

এই প্রস্তাবে ইমনের মুখে লম্বা হাসির রেখা ফুটে উঠলো। সে মাকে নিয়ে রিকশায় বসলো।

মায়ের এমন টোপ দেওয়াতে নীলা ভিতরে ভিতরে ভীষণ রেগে গিয়েছে। মায়াকে যেভাবেই হোক শায়েস্তা করতেই হবে।
.
.
.
.
বিকেলবেলা গল্প করতে করতে গল্পের মাঝেই নীলা হঠাৎ এসে বলে উঠলো, “মায়া, তুমি হঠাৎ ঢাকা এলে যে?”

“ঘুরতে এলাম। তোমরা তো গিয়ে থাকলে না, তাই আমি চলে গেলাম।”

নিলা হেসে বলল, “ঘোরাঘুরির জন্য আসছো নাকি ইমনের জন্য আসছো? আমার তো মনে হয় ইমনের জন্য এখানে আসা তোমার।”

মায়া হতবাক হয়ে বলল, “মানে?”

নীলা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “মানেটা কি তুমি নিজেই বুঝতে পারছ না? আমাকে জিজ্ঞাসা করার কি আছে?”

তারপর নীলা চলে গেল। ভাইয়া আর কিছুই বলল না।
.
.
মায়া নীলার কথাটা নিয়ে একটু টেনশনে আছে, এই মেয়ের কর্মকাহিনীর তো আবার ঠিক ঠিকানা নাই। ইমন আর মায়ের সম্পর্কের ব্যাপারে সে নিশ্চয়ই কিছু আন্দাজ করেছে বলেই, এত কনফিডেন্টলি মায়াকে কথাগুলো বলল।
ইমনের সাথে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। মায়া আপাতত চায় না তাদের সম্পর্কের কথাটা কেউ জানুক। ইমন বললেই ব্যাপারটা নীলা চেপে রাখবে, নয়তো এই খবর ছাড়াতে তার এক ন্যানো সেকেন্ডও লাগবে না। এত পেট পাতলা মেয়েটা!
.
.
নীলা সুযোগ বুঝে ইমনের কাছে গেল। গিয়ে বলল, “কংগ্রাচুলেশন ইমন!”

“কেন? হঠাৎ আমায় কংগ্রাচুলেশন কেন করছিস?”

“তোমার আর মায়ার সম্পর্কের জন্য।”

ইমন প্রচন্ড অবাক হলো। তার আর মায়ার সম্পর্কের কথা নীলা জানলো কিভাবে?
সেও বললো, “মানে?”

“কি মানে মানে করছো? মানে আবার কি? তোমার আর মায়ার সম্পর্ক মানে বুঝলানা? তোমরা যে রিলেশনে আছো।”

“তোকে কে বললো?” কড়া গলায় বলল ইমন।

“মায়া নিজেই বলেছে। তারমানে আমি ঠিক তাই না? সিরিয়াসলি তোমরা রিলেশন করো? মায়া যখন আমায় কথাটা বলেছিল আমি তো মজা ভেবে, উড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন তো দেখছি কাহিনী অন্য!” মিথ্যে কথা বলল নীলা।

এমন এবার আরও অবাক হলো।
বললো, “কে বলেছে? মায়া?”

“হ্যাঁ। ওই তো বলল।”

“নিজের মুখে বলেছে?”

“হ্যাঁ।”

“আচ্ছা যা তুই।”

নীলা চলে গেল। ইমনের সামান্য খটকা লাগলো এই ভেবে যে, যে মেয়ে নিজেই তাদের সম্পর্কের কথা গোপন রাখতে বলেছে। সে নিজেই কিনা বলে দিলো! তাও আবার নীলাকে।
হতেই পারে, নীলার প্রতি তো মায়ার আগে থেকেই একটা সন্দেহবাদিক স্বভাব রয়েছে। হয়তো সেই জন্যই নীলাকে বলে দিয়েছে।

মায়া যখন ইমনকে নীলার ব্যাপারটা বলতে এলো, তার আগেই ইমন প্রশ্ন ছুড়ে দিলো, “তুই নীলাকে কি বলেছিস?”

“মানে? আমি কি বলবো? নীলা আপু তো বললো।”

“থাম তুই। নীলাকে যে এসব কথা বলেছিস, তুই জানিস না ও কেমন? রং মশলা লাগিয়ে আরো বহু কথা ছড়াবে দেখিস!”

“বিশ্বাস করো, আমি কিছু বলি নাই। নীলা আপু নিজেই বলেছে।”

“আচ্ছা মানলাম নীলা নিজেই বলেছে। কিন্তু ও জানলো কিভাবে? তুই নিশ্চয়ই কোন হিন্টস দিয়েছিস?”

“তুমি আমায় ভুল বুঝতেছ?”

“আমি ভুল বুঝতেছি না তোকে। জাস্ট কথার উত্তরটা চাচ্ছি। সব সময় এত সন্দেহ বা ঠিক স্বভাব কিসের জন্য তোর? এর জন্যই দেখিস ডুববি একদিন।”

মায়ার চোখ ছল ছল করে উঠলো।
কোনমতে নিজেকে সামলে বলল, “এখন আমায় সন্দেহবাদিক মনে হচ্ছে তোমার? আমি অকারণে সন্দেহ করি, তাই ধারনা তোমার?”

“তাছাড়া কি?”

“হ্যাঁ তাইতো। নীলা আপু হুট করে বান্দরের মত তোমার গলা ধরে এসে যখন তখন ঝুলে পড়বে, এসব তো অকারণ। যখন তখন গায়ে হাত দিবে, সবই তো অকারনে করা। আমিই শুধু সন্দেহ করি। ঠিকই বলছো। আসলে আমি মানুষটাই খারাপ। ক্ষমা করে দিও আমাকে।”

বলেই মায়া চলে গেল।

ইমন তৎক্ষণাৎ ফোন হাতে নিয়ে মায়াকে মেসেজ পাঠালো, “তুই উল্টো আমাকে ভুল বুঝলি। আমি তোর ভালোর কথা ভেবেই বলছি। তুই তো বলেছিস আপাতত আমাদের সম্পর্কের কথা কাউকে না জানাতে। আমার দিক থেকে তো কোন সমস্যা নাই। জানুক সবাই। চুরি তো আর করছি না। তুই দেখিস আমি কালকেই মাকে আমাদের ব্যাপারে জানিয়ে দেবো।”

মায়া মেসেজটা পড়লো ঠিকই, কিন্তু তার বিনিময়ে কোন উত্তর দিল না। মুখ গোমড়া করে বসে রইল। ঘর থেকে বের হলো না। ইমনের সাথে কথাও বলল না, দেখা করা তো দূরেই থাক।

ইমন মিমোকে দিয়ে ডাক পাঠালেও এলোনা। বলল, “মাথা ব্যথা করতেছে। একটু সময় একা থাকতে চাই। তোর ভাইয়া অকারণে ডাকছে। সমস্যা নাই, নীলা আপু আছে তো। কিছু লাগলে ওকে বলতে বলিস।”

মায়ার এমন উত্তর শুনে মিমো থো মেরে গেলো। তারমানে ইমন আর মায়ার মধ্যে কোন ঝামেলা হয়েছে, যার মূল কেন্দ্র নীলা।
মিমো ইমনকে গিয়ে বলল, মায়ার বলা কথাগুলো।
শুনে ইমনের রাগ হলো ভীষণ। মিমোর সাথে একদফা চিৎকার চেঁচামেচি করে ফেললো।

মিমো বললো, “সম্পর্কের মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তিকে পাত্তা দিও না ভাইয়া। মায়া আপু বা তুমি দুজনেই দুজনকে কতটা ভালোবাসো, সেটা আমি ভালো করেই জানি।”
.
.
.
.
সকাল থেকেই কেমন জানি ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যে নীলা বাচ্চাদের মত বায়না ধরেছে, বাসায় যাবে বলে।

সুহাদা জামান বিরক্ত হয়ে বললেন, “আসছিস থাক দুটো দিন। এই বৃষ্টি বাদলার দিনে এমন করছিস কি জন্য?”

নীলা মুখ করুন করে ফেলল। সুহাদা জামান ছেলেকে ডেকে বললেন, “যা,
নীলাকে মোড় পর্যন্ত এগিয়ে গাড়িতে তুলে দিয়ে আয়।”

ইমন বিরক্ত হয়ে বলল, “কি মা, ও যেতে পারে না একা একা? এখন আমার যাওয়া লাগবে কেন?”

“বৃষ্টির মধ্যে কিভাবে যাবে মেয়েটা?”

“আমি পারবো না।”

“ইমন, কথা শোন।” কড়া গলায় বললেন তিনি।
অগত্যা ইমন বেরিয়ে গেলো নীলাকে নিয়ে।
মায়া দেখে একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

ওরা বের হয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর সুহাদা জামান দেখলেন, ইমন ওর ওয়ালেট ফেলে গেছে।

তৎক্ষণাৎ মিমোকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “যাহ তো। ইমন বেশি দূর যায় নাই। এটা দিয়ে আয় ওকে।”

“আমি পারবো না মা। বাইরে অনেক বৃষ্টি।”

“তোরা দুই ভাই বোন‌ই ইদানিং ত্যাছরা হয়ে গেছিস। একটা কথাও গায়ে লাগাস না।”

মায়া এসে বলল, “দাও ফুপি আমাকে দাও। আমি দিয়ে আসি।”

“যাবি তুই? লক্ষী মেয়ে আমার! ছাতা নিয়ে যা।”
.
.
.
ইমন আর নীলা বাইরে বের হওয়ার পরই বৃষ্টি আরো বেড়েছে। মোড়ের অনেকটা আগে ইমন আর নীলা একটা দোকানের পাশে ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে আছে।
হঠাৎ নীলা কি মনে করে ইমনের হাত ধরে টেনে রাস্তার সাইডে বৃষ্টির মধ্যে নিয়ে এসে দাঁড়ালো।

ইমন কড়া করে ধমক দিয়ে বললো, “কি শুরু করছিস তুই? এসব পাগলামির মানে কি?”

“মাঝে মাঝে একটু পাগলামি করে দেখোই না, কেমন মজা লাগে।”

ইমন বেশ বিরক্ত বোধ করল। কিন্তু মুখে আর কিছু বলল না। এদিকে নিলা তার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
ইমনের হঠাৎ মনে হলো, সে যেন মায়ার হাতের ছোঁয়া পেয়েছে। মেয়েটা কাল থেকে একটুও কথা বলেনি। ইমন ভয়ংকর রকমের মিস করছিল তাকে। নীলার এমন হাত ধরে থাকাতে বারবার মনে হচ্ছে, মায়ের গায়ের সেই গন্ধ; সে তার হাতের স্পর্শ!
ইমন মোহবিষ্ট হলো।
সে এগিয়ে এলো নীলার দিকে।
.
.
.
.
.

চলবে……

[কার্টেসী ছাড়া কপি করা নিষেধ]

#মায়াবন_বিহারিনী🖤
#পর্ব_০৮
#আফিয়া_আফরিন

মায়া হেলতে দুলতে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে এই দিকেই আসছিলো। রাস্তার মধ্যে তার চোখ আটকে গেলো। থো মেরে রইলো কিছুক্ষণের জন্য। নিঃশ্বাসটাও বোধহয় আটকে আসছে। বৃষ্টির পানির সাথে, চোখের পানিও মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

ইমন আর নীলা দাঁড়িয়ে আছে, কাছাকাছি। শুধু কাছাকাছি বললে ভুল হবে, খুব কাছাকাছি। ইমনের এক হাত নীলার গালে। নীলার চোখ বন্ধ, চোখের পাপড়ি তিরতির করে কাঁপতেছে। ইমনের দু’চোখে ভর করেছে নেশা।

যা দেখে ফেলেছে সেটাই অনেক। এটা সহ্য করা মায়ার জন্য খুব কঠিন। তার মানে ইমনকে আর নীলাকে নিয়ে সে যে আশঙ্কা করেছে সেটা সত্যি হতে যাচ্ছে। মায়া চুপি চুপি চলে এলো ওখান থেকে। ওর উচিত ছিল নীলাকে গিয়ে ঠাটিয়ে দুটো চড় মারা। কিন্তু সেটা না করে চোরের মত পালিয়ে চলে এলো। জীবনটা তার কাছে দুর্বিষসহ লাগছে। বারবার মনে হচ্ছে, ইমন কে সে হারাতে চলেছে। ইমন নামক এই মানুষটা না থাকলে, মায়ার অস্তিত্ব কি থাকবে?
.
.
.
ইমনের রাগ জেদ বরাবরই বেশি। তবে সেটা সবার সাথে দেখাতে পারেনা। মায়ার সাথে তো একদমই না।
মায়া রাগ করে থাকলে, সে নিজে থেকে রাগ ভাঙ্গায়। এখন, এখানে দোষ যেই করুক না কেন!
কিন্তু আজকে যে ঘটনাটা ঘটলো, তার জন্য দোষ কাকে দেবে? নীলাকে?
নাহ, নীলার তো কোন দোষ সে দেখতে পারছে না। তবে কি নিজেকে দোষ দেবে? হ্যাঁ, তা দেওয়া যেতেই পারে। সব দোষ তো তারই।
মায়া তো আগে থেকেই নীলাকে নিয়ে ইমনকে সন্দেহ করতো। কিন্তু এতদিন তো যা ছিল, তার সব ভিত্তিহীন। আজকে যা ঘটেছে সবকিছুই ইমনের দিক থেকে হয়েছে।
ইমন হঠাৎ করে তালগোল হারিয়ে নীলার মধ্যে মায়ার প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছিলো। এটাই তো কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই মুখ এখন কি করে দেখাবে সে তার মায়াকে?

সেদিন রাতের নীলাকে কেন্দ্র করে ওই ঘটনার পর, ইমন বা মায়া কেউ কারো সাথে কথাও বলে নাই।
মায়া তো ওই দৃশ্য দেখার পর ইমনের দিকে যায় নি আর। এরপর কিভাবে কিভাবে জানি, দুটো দিন কেটে গেল। ইমন এলো না মায়ার সাথে কথা বলতে। সে তো বাসায় থাকেই না। বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা কি একটা বাজে।

অভিমান আর এক বুক চাপা কষ্টে মায়ার দিন কেটে যাচ্ছে। তার আশংকা যে কখনো সত্যি হবে কল্পনাও করতে পারে নাই। এমনকি ইমনও এলোনা তার সাথে কথা বলতে।
এত অরুচি ধরে গেছে মায়ার উপর ইমনের?

ইমন এই কয়েকটা দিন মায়ার থেকে চোরের মত পালিয়ে বেড়াচ্ছে। বারবার মনে হচ্ছে, মায়ার সামনে গেলে গেলে মায়ার সব ধরে ফেলবে। এক প্রকার লজ্জায় সে তার সামনে যেতে পারছে না।
কিন্তু আর কত দিন দূরে দূরে থাকবে এভাবে? প্রায় চার দিন হয়ে গেছে, কেউ কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলে নাই। এই রাধা কৃষ্ণের বিরহ আর কতদিন থাকবে?
.
.
সেদিন দশটা নাগাদ এমন বাড়ি ফিরলো। তাড়াতাড়ি ফেরার কারণ হলো মায়া। আজকে যে করে হোক মায়ার সাথে একটু কথা বলতেই হবে।
সে সোজা চলে গেলো মায়ার ঘরে। যেয়েই কোন কিছু না ভেবে থাকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
মায়া আচমকা অবাক হয়ে গেলো। কিন্তু সে জড়িয়ে ধরল না। অনেকদিন পর সে সেই জায়গাটা ফিরে পেয়েছে। এই মানুষটা তো তার একান্তই নিজের। কেন জানি মনে হচ্ছে, অনেকদিন পর আবার নিজের জায়গাটা সে ফিরে পেয়েছে।

মলিন কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলো মায়া, “কি হয়েছে?”

“কিছু না। ভালো লাগতেছে না।”

“তো আমি কি করতে পারি?”

“কিছু করতে হবে না তোকে। শুধুমাত্র কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরে থাক। আজ অনেকদিন পর মনে হয় শান্তি পেলাম।”

মায়ার চোখ ছলছল করে উঠলো। এভাবে বলা কথাগুলো কি কখনোই অভিনয় হতে পারে?
ইমন নিজেই মায়ার দুই হাত এগিয়ে আনলো।

ইমন বললো, “আর রাগ করে থাকিস না প্লিজ। আমাকে একেবারে শেষ করে দে, দরকার হলে। তবুও দূরে সরে থাকিস না।”

মায়া সেদিনের প্রসঙ্গে গেল না। ইমনকে বললো, “দূরে কই আছি? তোমার বাসাতেই তো আছি।”

“বাসায় আছিস। কিন্তু আমার থেকে মনে হচ্ছে, ক্রোম ক্রোম দূরত্বে অবস্থান করছিস।”

“এমন কোন ব্যাপার না।”

“আচ্ছা, তাহলে একটা কথা বলতাম তোকে?”

“বলো।”

ইমন কিছু বলার আগেই দরজার সামনে থেকে ইমনের মা সুহাদা অবিশ্বাসের কণ্ঠে বলে উঠলেন, “ইমন, মায়া!”

চকিত নয়নে তাকালো তারা দুজন।
তিনি আবারও বললেন, “তোরা দুইজন?”
মায়া মাথা নিচু করে ফেলেছে।
মায়ের কথার আওয়াজে মিমো ও পাশের রুম থেকে চলে এসেছে।

এসেই জিজ্ঞাসা করলো, “কি হয়েছে মা? এত চেঁচামেচি করছো কিসের জন্য?”

“কি হয়েছে সেটা আমাকে জিজ্ঞাসা না করে, ওদের দুজনকে কর।”

“কেন কি করছে ওরা?”

ইমন মাঝখান থেকে বলে উঠলো, “আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসি!”

মায়া তাকালো ইমনের দিকে। কি সুন্দর অবলীলায় সে বলে দিল ভালোবাসি। আসলেই কি ভালোবাসে? ভালো তো বাসতোই, সেটা কোন এক কালে। এখন বোধ হয় আর ভালোবাসে না।

সুহাদা জামান জিজ্ঞাসা করলেন, “কবে থেকে?”

“গত ছয় সাত বছর আগে থেকে।” সোজাসাপটা উত্তর দিল ইমন।

তিনি অবাক বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে পৌঁছালেন বোধ হয়।
আমতা আমতা করে বললেন, “তখন তোরা প্রেম ভালোবাসার কি বুঝতি? আর আমাকে জানাস নি কেন এসব?”

মিমো বলল, “আমি আর মহুয়া আপু ছাড়া কেউ জানে না। এখন অবশ্য নীলা আপু আর তুমিও জেনে গেলা।”

সুহাদা জামান আর কথা বাড়ালেন না। নিজের ঘরে চলে গেলেন।

ইমন মিমোর দিকে তাকিয়ে বললো, “কি হলো মায়ের? ব্যাপারটা বুঝলাম না। মা যে কিছু বলল না।”

“কি জানে মায়ের মনের মধ্যে কি আছে? যাই হোক, মা জানলো কি করে?”

ইমন তাকালো মায়ার দিকে।
মিমো হেসে বলল, “বুঝেছি আমি। আর বলতে হবে না।”

“হ্যাঁ, সবই তো বুঝিস তুই। পাখনা গজিয়েছে তোর।”

“নাহ, নাহ ভাইয়া।”

মায়া বলে উঠলো, “কিছু না মনে করলে, তোমরা একটু পাশের রুমে যাবা প্লিজ! আমি একটু একা থাকতে চাই অর্থাৎ একটু রেস্ট নিতে চাচ্ছি।”

এমন কথা না বলে বের হলো। মায়ার আচার-আচরণ তার কাছে অদ্ভুত ঠেকতেছে, কেমন!

বের হয়ে মীমোকে জিজ্ঞাসা করলো, “মায়ার কি হয়েছে বলতে পারিস?”

“কিছু না তো। এমনিতেই বোধহয় মুড অফ।”

“আচ্ছা!”
.
.
.
পরদিন সকাল-সকাল মায়া এলো তার ফুপির কাছে। সকালের নাস্তা রেডি করছিলেন তখন তিনি।

মায়া এসে বললো, “ফুপি আমি কি বাড়ি ফিরে যাব?”

সুহাদা অবাক হয়ে বললেন, “এমা কেন?”

মায়া কিছু বলল না। দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে রইলো।

তিনি পুনরায় বললেন, “তুই কি কালকের ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছিস? মানে, ইমন আর তোর সম্পর্কের ব্যাপারটা। দেখ, তোরা দুজন দুজনকে ভালোবাসিস। সেখানে তো আমরা ঠেকাতে পারবো না। আর ঠেকাবো কি জন্য? আমি বা তোর ফুফা কেউ কোন আপত্তি করব না। আমার মনে হয়, তোর মা বাবাও এ নিয়ে কোন আপত্তি করবে না। তাই বলি, এসব নিয়ে এত টেনশন নিস না। দেখিস, কিছুদিন পর আমার ঘরের বউ করে নিয়ে আসবো তোকে। আর এত যাই যাই কেন করছিস? ভালো লাগছে না এখানে?”

মায়া হাসলো। মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো, অর্থাৎ তার এখানে ভালো লাগছে।
অন্য সময় ফুপির মুখে এই কথা শুনলে হয়তো খুশিতে, নাচানাচি করে ফেলতো। কিন্তু এখন সেরকম আগ্রহ পাচ্ছে না।
বারবার অজানা আশঙ্কা বুকে বিঁধছে।

একটা কথাই ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে, “ইমন সত্যিই তাকে ভালবাসে তো?”
.
.
.
.

চলবে…..

[আজকে গল্প সম্পর্কে কয়েকটা কথা বলি। এতদিন যে কয়েকটা পর্ব গেছে, ওখানে গল্পের চরিত্র গুলো সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে।আর বর্তমানে যে পর্বগুলো আসবে, তাতে গল্পের মূল কাহিনীটা বর্ণনা করা হবে। গত পর্বে, অনেকেই অনেক কিছু বলেছেন। পাঠক হিসেবে আপনারা এসব বলতেই পারেন, এটা কোন ব্যাপার না। কিন্তু একটা গল্প বুঝতে হলে সে গল্প পুরোটা পড়তে হয়। তার আগে গল্পের মূল বিষয়বস্তুটা ধরা যায় না।
আর আমি গল্পের মূল বিষয়বস্তুটাতে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ নামক জিনিসটাকে তুলে ধরতে চাইছি।
আপনাদের কাছে একটা অনুরোধ থাকলো, আপনারা গল্পটা কি রকম চাচ্ছেন? সেটা আমায় কাইন্ডলি জানান। ধন্যবাদ সবাইকে। ভালোবাসা অবিরাম।]

[কার্টেসী ছাড়া কপি করা নিষেধ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here