মায়াবন_বিহারিনী🖤 #পর্ব_১৫ও১৬

#মায়াবন_বিহারিনী🖤
#পর্ব_১৫ও১৬
#আফিয়া_আফরিন

মায়ার মুখে চলে যাওয়ার কথা শুনে স্বাভাবিকভাবেই সুহাদা জামান বেশ অবাক হলেন। মিমোও অবাক হলো। এমন কি ইমন ও অবাক হল। খুশি হল নীলা।

সুহাদা মায়াকে করা ধমক দিয়ে বললেন, ” কি কথা বলছিস তুই? চলে যাবি মানে কি? আর ইমনের সাথে সকাল সকাল কি হইছে তোর?”
তারপর ইমনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কি সমস্যা কি তোর? সকাল সকাল কি নাটক শুরু করছিস? দেবোনা কানের নিচে একটা থাপ্পড়!”

ইমন মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, “কিছু হয় নাই।”

মায়া বলল, ” ফুপি কিছু হোক বা না হোক, আমার ভালো লাগছে না। আমাকে আটকিও না প্লিজ। তাছাড়া মা ও ফোন করে বললো কবে আসবি? অনেকদিন হলো তো এখানে আসছি।”

“তাতে কি হয়েছে? তোর এখনই চলে যেতে হবে কেন?”

“প্লিজ না করোনা ফুপি। তোমার পায়ে পড়ি আমি। এখানে থাকলে আমার দম আটকে আসবে। যা নিত্য নতুন নাটক দেখছি আমি।”

“কবে যেতে চাচ্ছিস?”

“আজই এবং এক্ষুনি।”

সুহাদা অবাক হয়ে বললেন, “কী?”

“হ্যাঁ প্লিজ। আমি একা যেতে পারবো।”

“ইমন থাকতে তুই একা কেন যাবি? ও দিয়ে আসবে তোকে।”

“যাবোনা আমি তোমার ছেলের সাথে।”

ইমন বলল, “আমিও যাবো না ওকে দিয়ে আসতে। আমার এত ঠ্যাকা কিসের?”

“কি শুরু করলি তোরা দুইজন মিলে? আর শোন মায়া, আজকে যাওয়া লাগবে না। কাল যাবি। তোর ফুপা আসুক, সে এসে পারমিশন দেক। এভাবে না বলে চলে গেলে আমাকে বকবে দেখিস!”

“আমি ফুপার সাথে কথা বলে নিব। তুমি না করো না প্লিজ।”

এবার সুহাদা সামান্য রাগ করলেন। মেয়েটা আসলোই কতদিন পর, তাও ইমনের সাথে রাগারাগি করে আবার চলে যেতে চাইছে।

রাগ ঝাড়লেন তিনি ইমনের উপর।
“যা ইমন, গিয়ে দেখ টিকেট পাস কিনা? টিকেট পেলে ওকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসবি। খবরদার আমার মুখের উপর না বলবি না। থাপড়িয়ে দাঁত ফেলে দিব। যা মায়া তুই তোর কাপড়-চোপড় গুছিয়ে নে। তোর আর থাকতে হবে না। চলে যা। আর কোনদিনও আসার দরকার নেই।”
কড়া গলায় তিনি কথাগুলো বলে চলে গেলেন। উপস্থিত সবাই বুঝলো তিনি অসম্ভব রাগ করেছেন।
মায়ের এরকম রূপ দেখে ইমন ও আর কিছু বলার সাহস পেল না। সে উঠে গেল, টিকেটের ব্যবস্থা করতে।
সকাল বা দুপুরের টিকিট পাওয়া গেল না। দুটো টিকিট পাওয়া গেল সন্ধ্যা সাতটার পর।

বিকেল নাগাদ মায়া সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ইমনের সাথে স্ট্যান্ডে চলে এলো। যাওয়ার আগে নীলা সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলো, ” চিন্তা করো না। তোমার আর ইমনের সম্পর্ক অতি শীঘ্রই আবার ঠিক হয়ে যাবে।”

“যে সম্পর্কে ফাটল ধরে গেছে, সে সম্পর্ক বোধহয় পুনরায় জোড়া না লাগানোই ভালো হবে। তাতে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও, বিশ্বাস জিনিসটা হারিয়ে যায়।”

“তবুও তোমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসো। তোমাদের মিল হোক এটাই কামনা করি।”

“তোমার কামনা দিয়ে কি আসে যায়? তুমি ভালো কামনা করলেও, যা ভাগ্যে লেখা আছে তাই হবে। আর খারাপটা করলেও তাই। তার চেয়ে ভালো হবে তুমি বরং নিজেকে নিয়ে ভাবো। আমাকে নিয়ে ভাবার মত অনেক মানুষ আছে। তোমার না ভাবলেও চলবে।”
.
.
.
“ঘুমিয়ে পড়েছিস?”

“উহু।”

“তুই যে এভাবে বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিবি কই আমাকে জানাস নি তো?”

“এমনিতেই। মা বারবার বলছিল, কবে আসবি? কবে আসবি? তাই ভাবলাম এবার ফিরেই যাই।”

“তো আমাকে আগে জানাস নি কেন?”

মায়া ইমনের ঘাড় থেকে মাথা তুলে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ” সারপ্রাইজ ছিল!”

“ঘোড়ার ডিম!”

গাড়ি চলছে আপন গতিতে। নিস্তব্ধ রাতকে পেছনে ফেলে সাই সাই গতিতে এগিয়ে চলছে। মায়া জানালা খুলে আশেপাশের দৃশ্য গুলো দেখছিল। রাতটা কি নিস্তব্ধ! এমন রাত হঠাৎ দেখলে মন কেমন যেন আনমনা হয়ে যায়। সমস্ত দুঃখেরা এসে অজান্তেই ভর করে। রাতটাকে ভীষণ রহস্যময় লাগছে। চারিদিকে ভীষণ কালো নয়, ধোয়া ধোয়া রঙের।
মায়া ইমনের দিকে তাকালো। অজান্তেই চোখের কোনে জলভর করলো। মাত্র কিছুক্ষণের ব্যবধানে ইমনের থেকে সে কত দূরে চলে যাবে। আবার দেখা হবে কিন্তু কবে তার কোন ঠিক ঠিকানা নাই।
বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
.
.
ইমন আর মায়া বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত প্রায় একটা বাজল। আমজাদ সাহেব আর জাহানারা বেগম জেগেই ছিল। মায়া তাদের সকালে ফোন করে জানিয়েছিল, সে আসবে।
তাই মেয়ের অপেক্ষায় তারা ঘুমাতে যান নি। জেগেই ছিলেন। মায়া আর ইমন বাসায় এসে খাওয়া-দাওয়া করলো। তারপর কিছুক্ষণ গল্প গুজব করে, ঘুমাতে যেতে যেতে রাত প্রায় তিনটা বাজলো।

সকাল আটটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে ইমন ফিরে যাওয়ার জন্য তোরজোর আরম্ভ করলো। মামা মামি কারো কথা গায়ে মাখলো না। এমনকি মায়ার কথাও না।

ওরা যেতে মানা করলেও ইমন বলল, “আমার ইম্পরট্যান্ট ক্লাস আছে কাল। ক্লাস মিস দেওয়াই যাবে না।”

মায়া বললো, “রাতের অথবা বিকালের গাড়িতে তো যেতে পারো। এখন একটু রেস্ট করো।”

“না আর কি রেস্ট করবো?”

ইমন আর কারো কথা শুনলো না। কেউ আর কথা বাড়ালোও না। সকাল এগারোটা নাগাদ সে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলো। যাওয়ার আগে মায়া তাকে বিভিন্ন উপদেশমূলক বাণী শুনিয়ে দিল।

“নীলা আপুর থেকে সব সময় দূরে দূরে থাকবে।”

“আচ্ছা। তারপর?”

“সব সময় নিজের খেয়াল রাখবে।”

“আচ্ছা। তারপর?”

“নীলা আপুকে আমাদের ব্যাপারে কোন কথা বলবে না।”

“আচ্ছা। তারপর?”

মায়া বিরক্ত হয়ে বলল, “কি তারপর তারপর শুরু করছ? দেখে শুনে সাবধানে যাবা কেমন?”

“আচ্ছা। তুই মন খারাপ করিস না। ইনশাআল্লাহ খুব শীঘ্রই আমাদের দেখা হবে।”

“হুমম।”

মায়া মুখে বললো, সে মন খারাপ করবে না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ঠিকই পাহাড় সমান কষ্ট হচ্ছে। আহা! এই মানুষটাকে যদি এই মুহূর্তে থেকেই সারা জীবনের জন্য নিজের কাছে রেখে দেওয়া যেত!
বিমুর্ত পাথরের ন্যায় মায়া ইমনকে বিদায় দিলো। মনে হচ্ছে কেউ বুকের উপর ভারী পাথর চাপা দিয়ে দিয়েছে।

ইমন চলে গেছে ঘন্টাখানেক হয়ে গেছে। তবুও তার মন খারাপ এখনো কমে নাই। ক্ষণে ক্ষণেই তার চোখের কোণে অশ্রু জমছে।
.
.
বিকেল দিকে সুহাদা জামান যখন মেয়েকে নিয়ে গল্প করছিলেন, নীলা তখন পাশের ঘরে ঘুমাচ্ছিল।
মিমো সুযোগ বুঝে মাকে বলল, “মা নীলা আপু কিন্তু খুব বাড়াবাড়ি করতেছে।”

“কি করছে?”

“ভাইয়া আর মায়া আপুর সম্পর্কের মধ্যে অলরেডি যে গ্যাঞ্জাম লাগছে, সেটার মুলে ওই আছে।”

“কি বলিস?”

“হ্যাঁ তুমি একটু সাবধান করে দাও তো নীলা আপুকে। মায়া আপু ভদ্রতার খাতিরে কিছু বলতে পারছে না। আর ভাইয়া তো খামখেয়ালী টাইপের মানুষ, সে বোধহয় কখনোই কিছু বলবেনা।”

“আমি বললে কি হবে? ইমনের তো কিছু বলা উচিত। এটা ঠিক যে ও খাপ ছাড়া, কিন্তু রাগ উঠলে ছাড়বে না নীলাকে।”

“সে ভাইয়া যা খুশি করুক। কিন্তু তুমি ওকে একটু বলে দিও। নীলা আপু তো জানেই ওরা দুজন দুজনকে ভালোবাসে। তাহলে এমন করার কোন মানে আছে তুমিই বলো?”

সুহাদা জামান চিন্তিত মুখে বললেন, “তোর কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে ওদের খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেওয়া উচিত। মায়া তো ইমন এর সাথে ঝগড়া করে চলে গেল। একবার যদি বিয়ে দেওয়া যায় তাহলে, এ সমস্যাগুলো এড়ানো সম্ভব হবে।”

“নীলা আপু এখনো পড়ে আছে কেন এ বাড়িতে?”

“এটা ওর চাচার বাড়ি। ওকে চলে যেতে বলি কিভাবে? তা ও থাকুক, সমস্যা নাই। কিন্তু তোর কথাগুলো ভাবাচ্ছে আমায়।”

“মা আমি চাই ভাইয়া আর মায়া আপুর মিল হোক। অনেক বছর থেকে দুজন দুজনকে ভালোবাসে। এই ভালোবাসাটা যেন পূর্ণতা পায়।”

সুহাদা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
এমন সময় নীলা ঘরে ঢুকলো। চেহারায় তার কেমন জানি প্রশান্তির ছাপ। হাসি হাসি মুখে এসে পাশে বসলো।

হুট করে কি মনে হল তার কে জানে? বলে উঠলো, “কাকি তোমায় একটা কথা বলতাম?”

“বল।”

“আমি ইমন কে ভালবাসি।” নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল নীলা।

অবাক হলেন সুহাদা জামান। অবাক হলো মিমো। নীলা যে এরকম কিছু বলবে ধারণার বাইরে ছিল। তার মানে ওদের আশঙ্কাই সত্যি হলো।
নীলার উপর প্রচন্ড রাগ হলো তার।

“পাগল হয়ে গেছিস নীলা? তুই জানিস না ইমন আর মায়ার কথা? তারপরও কোন আক্কেলে এসব কথা বলছিস?”

“কাউকে ভালবাসলে সেই কথা বলার জন্য আক্কেল লাগে না কাকী!”

“অবশ্যই লাগে। তুই জানিস না ওদের ব্যাপারে?”

এমন সময় সুহাদা জামান এর ফোনে আননোন নাম্বারে একটা ফোন এলো। তিনি ফোন ধরেই হতবাক হয়ে গেলেন। ইমন অ্যাক্সিডেন্ট করেছে।
.
.
.
সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু সাভারে এসে বিপত্তি বাঁধলো। উল্টো দিক থেকে একটা মাইক্রোবাস বেপরোয়া ভাবে আসছিল। ড্রাইভার ও তার সামলাতে পারে নাই। আহত সবাইকেই হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এই খবরটা মায়ার কানে পৌঁছাতেও দেরি হয়নি। তৎক্ষণাৎ তারা বগুড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।
মায়া তো ইতিমধ্যে কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে। সাথে সাথে সে প্রচন্ড সাহসের একটা কাজও করে ফেলল।

আমজাদ সাহেবের সামনে গিয়ে বললো, “বাবা আমি ইমন কে ভালবাসি।”

তিনি কিছুক্ষণ নির্বাক রইলেন। তারপর বললেন, “বুঝলাম না।”

“আমি ইমনকে ভালোবাসি।”

তিনি শুকনো গলায় বললেন, “আচ্ছা। কিন্তু তুই কাঁদছিস কেন? কিছু হবে না ইমনের। আমরা যাচ্ছি তো।”

মায়া বোধ হয় তার বাবার এমন উত্তর আশা করে নাই। তাই বেশ অবাক হলো।

ইমনের মাথায় আঘাতটা খুব বাজেভাবেই পেয়েছিল। ডক্টর অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, ” অপারেশন সাকসেসফুল। জ্ঞান ফিরে আসতে একটু সময় লাগবে। পেশেন্টের কন্ডিশন আগে থেকে অনেকটা ভালো। তবে আমরা তার স্মৃতিশক্তির ব্যাপারে কোন আশা দিতে পারছি না।”

সুহাদা সমস্ত ব্যাপারটায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে আছেন। তাকে সবদিক ভাবতে হচ্ছে। কোনো কথাই মাথা থেকে সরাতে পারছেন না। ইমনের এখন এই অবস্থা, তার সুস্থতার কথা ভাবা লাগতেছে। অন্যদিকে ইমন মায়ার সম্পর্কের মধ্যে নীলার আগমনের দিকটাও তাকে বেশ উত্যক্ত করছে।

রাতে মায়ারা ঢাকা পৌঁছানোর একটু আগে আগেই ইমনের জ্ঞান ফিরলো। ডাক্তারদের আশঙ্কা মিথ্যা হল। সে এখন বেশ সুস্থ রয়েছে। ডাক্তারদের আশংকা যে সত্যি হয় নাই, এই জন্য সবাই আল্লাহর কাছে হাজার কোটি শুকরিয়া জানাচ্ছে।

মায়া রা ঢাকা পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত একটা বাজলো। ইমন সুস্থ আছে শুনে সে শান্ত হলো। সুহাদা জামান তাদের বাড়িতে যেতে বললেন এবং জানালেন আজকের রাতটা হাসপাতালে থাকবেন তিনি।

মায়া মাঝখানে বাধঁ সেধে বলল, ” তুমি চলে যাও ফুপি। আমি আছি। আজকের রাতটা আমি থাকবো এখানে। মা-বাবা আসছে, তার মধ্যে ফুপাও আছে। তুমি তাদের সকলকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যাও। তারা সবাই ভীষণ ক্লান্ত।”

সুহাদা আর রা করলেন না। মায়ার কথা মেনে নিলেন। মায়ার থাকার কথা শুনে নীলা জানালো, সেও থাকতে চায়।

সুহাদা তাকে কড়া ধমক দিয়ে বললেন, “খবরদার, এই রাত বিরাতে নাটক করবি না? এমনিতেই তুই বেশি বাড়াবাড়ি করছিস। এরপর যদি তোকে কোনো কাহিনী করতে দেখি, থাপড়িয়ে দাঁত ভেঙ্গে দেব।”

নীলা আর কিছু বলার সাহস পেলো না। চুপি চুপি চলে এলো।

বাড়ি ফিরে আর কারো তেমন ঘুম হলো না। সুহাদা জামান মিমো আর নীলাকে ঘরে পাঠিয়ে কিছু আলোচনা করবেন, বলে ঠিক করলেন।
ইমন যেহেতু এখন ভালো আছে, তাই আতঙ্কের বদলে একধরনের স্বস্তি ভর করছে সবার চোখে মুখে।

সুহাদা সবার সামনে এসে বললেন, ” তোমাদের সবার সাথে আমার একটা আলোচনা রয়েছে।”

জামান সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, “এই রাতের বেলায় আবার কিসের আলাপ আলোচনা? যা কথা বলার সকালে বললেই হবে।”

“কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।”

“আচ্ছা বলো।”

সুহাদা সোফায় বসে বললেন, “তোমরা কে কে মায়া আর ইমনের সম্পর্কের কথা জানো?”

জাহানারা বেগম আর জামান সাহেব অবাক হলেন। আমজাদ সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, “আমি জানি। মায়া আমাকে সকালে জানিয়েছিল।”

“তুমি আমাকে কেনো জানাওনি? কবে থেকে ওদের এ সম্পর্ক?” জাহানারা বললেন।

সুহাদা বললেন, “অনেক বছর আগে থেকে ওদের সম্পর্ক। আমি নিজেও জানতাম না। কিছু দিন আগে জানলাম। তোমাদের কি কোনো আপত্তি আছে এ সম্পর্ক নিয়ে?”

জাহানারা বললেন, “আপত্তির কথা আগেই আসছে কেনো? আমার মেইন কথা হলো, আমার মেয়ে প্রেম করছে আর আমিই জানতে পারলাম না। তাও আবার ইমনের সাথে! এতো কাছে পিঠে থেকেও আমরা আভাস পেলাম না।”

আমজাদ সাহেব বললেন, “মায়া নিজের ভালোমন্দের দিক টা নিজেই খুঁজে নিয়েছে। আপত্তি থাকার কোনো প্রশ্নই উঠে না।”

সুহাদা জামান সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি চুপ করে আছো কেন? তুমিও নিজের মতামত দাও।”

“আমারও কোনো আপত্তি নাই।”

“আল্লাহামদুলিল্লাহ। কারো কোনো আপত্তি নাই জেনে খুশি হলাম। আমি ঘরের মেয়ে কে ঘরে নিয়ে আসতে চাই একেবারে জন্য।”

জাহানারা বেগম অবাক হয়ে বললেন, “এত তাড়াতাড়ি কেন? ওরা এখনো বাচ্চা।”

“বাচ্চা কিভাবে হয়? একটা ২০ বছরের মেয়ে আরেকটা ২৩ বছরের ছেলে কখনোই বাচ্চা হতে পারে না। যথেষ্ট ম্যাচিউরিটি আছে ওদের মধ্যে। আর এখানে একটা সমস্যা আছে বলেই আমি এত তাড়াতাড়ি বিয়ের কথা তুললাম। যাতে ওদের মাঝে পরবর্তীতে কোন সমস্যা না হয়। অনেকদিন ধরে দুজনের সম্পর্ক। আমি চাই এই সম্পর্কটা পূর্ণতা পাক।”

“কি সমস্যা আছে?”

“নীলা। নীলা ইমনকে ভালোবাসে। এই নিয়ে মায়া আর ইমনের মধ্যে বেশ কথা কাটাকাটি, ঝগড়া ঝামেলা হয়ে গেছে।”

এবার বেশ অবাক হলেন জামান সাহেব। বললেন, ” নীলা কেন এসবের মধ্যে ঢুকছে?”

“নীলা কেনো এসবের মধ্য ঢুকছে, তা আমি কি করে বলি? ইমনের অ্যাক্সিডেন্টের কিছুক্ষণ আগে ও আমার এসে বলল ও নাকি ইমনকে ভালোবাসে। অথচ ও কিন্তু জানে ইমন মায়ার সম্পর্কের কথা। ”

জাহানারা বললেন, “বিয়ে দিলে যে নীলা ওদের মধ্যে কোন সমস্যা সৃষ্টি করবে না তার গ্যারান্টি কে দিবে?”

“বিয়ের পরের ব্যাপার আলাদা, আর বিয়ের আগের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা। আশা করি তোমাকে এ ব্যাপারে আর কিছু বোঝাতে হবে না।”

আমজাদ সাহেব বললেন, “আচ্ছা যেটা ভালো বোঝো তোমরা সেটাই কর। সবদিক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিও। একদিক বাঁচাতে গিয়ে আরেক দিক ঠেলে ফেললে তো আর হবে না।”
.
.
.
ইমন ঘুমে বিভোর। নার্স কিছুক্ষণ আগেই তাকে একটা ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে গেছে। মায়া ওর পাশে একটা চেয়ার টেনে হেলান দিয়ে বসে আছে। বুকের উপর থেকে ভারী একটা পাথর নেমে গেছে। ইমনের অ্যাক্সিডেন্টের খবর শুনে যে কি পাগল পাগল অবস্থা হয়েছিল। আল্লাহ ভাগ্যিস মুখ তুলে তাকিয়ে ছিল, না হলে কি যে হতো? ভাবতে যেমন গায়ে কাঁটা দেয়। মায়া এসব ভাবতে ভাবতেই একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।

ভোরের আলো জানালা ভেদ করে কেবিন রুমে ঢুকে পড়েছে। সারা ঘর আলোয় আলোকিত। ইমনের চোখে মুখে আলো আছড়ে পড়তেই ঘুমটা আকস্মিক ভেঙে গেল। চোখ মেলে মায়াকে দেখল পাশে বসে। তাকে দেখে হাসি ফুটে উঠলো ইমনের মুখে।

ইমন উঠে বসে খাটে হেলান দিল। তখনই মায়ার ঘুমটাও আলগা হয়ে গেল। সে চোখ খুলে দেখে ইমন বসে আছে।

প্রথম কথাটি মায়াই বললো, “কেমন আছো এখন?”

“তুই সামনে বসে আছিস, আমি খারাপ থাকতে পারি বল?”

“আমার কথা তুমি আর বলোই না। আমার জন্যই তোমার এই অবস্থা হল।”

“বলছে তোকে? এক্সিডেন্ট এর উপর কারো কোন হাত থাকে?”

“এক্সিডেন্ট এর উপর কারো কোন হাত নেই ঠিক। কিন্তু আমাকে দিতে না গেলে তোমার এই অবস্থা তো হতো না।”

“ভালোই হয়েছে এই অবস্থা হয়েছে। না হলে কি তোকে দেখতে পেতাম বল? যাইহোক কখন আসলি আবার?”

“রাতেই। একটার দিকে।”

“মা কোথায়? মামা মামি আসছে তোর সাথে?”

“হ্যাঁ আসছে। সবাই বাসায় আছে।”

“ওহ।”

বারোটার দিকে মিমো এলো দেখা করতে। দুপুরের পর ইমনকে রিলিজ দেওয়া হবে। এর মধ্যে হাসপাতালে আর কেউ এলোনা। ইমনের ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত লাগলো। বারবার মনে হল, “আর কেউ আসুক বা না আসুক মা কেন এলো না?”

মিমো কে ডেকে জিজ্ঞেস করল, “মা আসবে না?”

“না আসবে না।”

“কেন? কি হইছে?”

“কি হবে আবার? এমনিতেই আসবে না। মা এখন ব্যস্ত রয়েছে।”

“কিসের ব্যস্ত রয়েছে যে আমার জন্য টাইম নাই!”

“তোমার জন্য যে টাইম থাকতেই হবে, এমনকি কোন কথা আছে ভাইয়া?”

মায়ার আর ইমন মিমোর কথা বলার ধরনে বেশ অবাক হলো। মায়া কিছু বলতে গেলেও এ
ইমন তাকে থামিয়ে দিল।

দুপুরের কিছুক্ষণ পর বাড়ি ফিরল ইমন। বাড়ি এসেই মায়া আর ইমন বেশ অবাক। বাড়িতে কেমন সাজ সাজ একটা ধব্নী পড়ে গেছে। কিন্তু কিসের এত আয়োজন, সেটাই বুঝতে পারছে না তারা। মায়া নীলাকে দেখলো, এক কোনায় মুখ অন্ধকার করে চুপটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মায়া মাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কি হচ্ছে মা আজকে?”
তিনি উত্তর দিলেন না।

অবশেষে বেশ কিছুক্ষণ পর জাহানারা বেগম ইমন আর মায়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আজ তোদের বিয়ে!”
.
.
.
.

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here