মায়াবন_বিহারিনী🖤 #পর্ব_০৩,০৪ #আফিয়া_আফরিন

#মায়াবন_বিহারিনী🖤
#পর্ব_০৩,০৪
#আফিয়া_আফরিন
০৩

আজ সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। তাও ঝিরিঝিরি টাইপের বৃষ্টি। থামার কোন নাম গন্ধ নেই।

মায়ার বৃষ্টি খুব পছন্দ। বৃষ্টি পড়লেই পাগল হয়ে যায় বৃষ্টিতে ভেজার জন্য। কিন্তু কিছুদিন আগেই জ্বর থেকে উঠলো, তার মধ্যে মায়ের কড়া বারণ আছে এই ভয়েই বৃষ্টিতে ভেজা হচ্ছে না।
ড্রয়িং রুমে সবাই বসে বসে আড্ডা দিচ্ছে।

জাহানারা বেগম এসে বললেন, “তোরা দুপুরে কে কি খাবি রে? এই বৃষ্টির দিনে কি রান্না করবো বল?”

কেউ কিছু বলার আগে মিমো বলে উঠলো, “আমি বৃষ্টির দিনে শুধু মাত্র খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা হবে। তাছাড়া আর কোন কথা নেই।”
তারপর বাকি সবার দিকে তাকিয়ে বলল, “সবাই আমার যুক্তির পক্ষে মতামত প্রদান করো, বন্ধুরা।”

সবাই হেসে বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ! হয়ে যাক।”

জাহানারা বেগম রান্নাঘরে ঢুকতেই মায়া এসে বলল, “মা আমার একটা অনুরোধ রাখবে প্লিজ?”

“হ্যাঁ বলে ফেল। তোর পছন্দের কিছু রান্না করতে হবে?”

“না। তুমি কি আমাকে ভালোবাসো মা?”

“এ আবার কেমন ধরনের প্রশ্ন? ভালোবাসবো না কি জন্য?”

“তাহলে প্লিজ আমার বৃষ্টিতে ভিজতে যাওয়ার পারমিশন দাও!”
অনুনয় করে বলল মায়া।

জাহানারা বেগম মায়ার ধরে বললো, “ওরে পাজি মেয়ে, আমায় ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে?”

“না মা। প্লিজ প্লিজ। আমরা সবাই একসাথে আছি। একটু ভিজি!”

“আচ্ছা যা, তবে একটুই কিন্তু ভিজবি!”

“ওকে, ওকে।”
বলে মায়া তার মাকে দুটো চুমু দিয়ে নাচতে নাচতে ড্রইং রুমে এসে মিমো কে বললো, “চল বৃষ্টিতে ভিজি।”
তারপর নীলার দিকে তাকিয়ে বলল, “নীলা আপু চলো তুমিও।”

মিমো আর নীলা চলে যেতেই মায়া ইমন কে বললো, “তুমি যাবা না?”

ইমন ম্যাগাজিন পড়ছিল তখন। মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “কই?”

“ছাদে। বৃষ্টি হচ্ছে। ভিজি চলো।”

“না না। আমি এসবে নেই। তোদের সব থাকলে তোরাই ভেজ। মাঝখান থেকে আমারে নিয়ে টানাটানি করিস না। আর সবচেয়ে বড় কথা বৃষ্টি পানিতে আমার এলার্জি আছে!”

“ওই! বৃষ্টির পানিতে কারো কখনো এলার্জি থাকে নাকি? এইটা একটা কথা হলো?”

“কারো না থাকলেও আমার আছে। আমার বৃষ্টিতে ভেজা হবে না।”

“তো থাকুক। একদিন এলার্জির সমস্যা হলে কিছু হবে না। আসো না প্লিজ! আমি এত করে বলছি। আবার কবে না কবে একসাথে হওয়ার সুযোগ পাবো!”

ইমন আশেপাশে তাকিয়ে মায়াকে হাত ধরে টেনে পাশে বসালো। বললো, “তুই আর আমি হলে আলাদা একটা কথা ছিল। ওই দুইটা বান্দরকেও তো পাঠিয়ে দিলি ভিজার জন্য।”

“তাতে কি হইছে? আসো না প্লিজ!”

ইমন মায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো, “আমাদের বিয়ে হোক, তারপর প্রতি রাতে এরকম বৃষ্টিতে ভিজবো। দরকার হলে আমাদের বাচ্চাকাচ্চাকেও সাথে নিব। আজ আমায় ছাড়, প্লিজ।”

“শখ কত? বিয়ের পর মনে হয় বৃষ্টি প্রতি রাতে এসে তোমার জন্য অপেক্ষা করবে? বিয়ে হলো না এখন ও, বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে আসছে? গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল! চলো তো।”

অবশেষে মায়ার জেদের কাছে হার মেনে নিলো ইমন।
.
.
.
বৃষ্টি বোধ হয় খুব আবেগী ধাঁচের একটা জিনিস। ইমনের বৃষ্টি জিনিসটা কোন কালেই পছন্দ ছিল না। ছোটবেলায় একবার তার একটা ইম্পরট্যান্ট ফুটবল টুর্নামেন্ট বৃষ্টির কারণে মিস হয়ে গিয়েছিল, তারপর থেকেই বৃষ্টির প্রতি তার চরম ক্ষোভ!
কিন্তু মায়া একেবারে উল্টো। বৃষ্টি নামলেই পাগল হয়ে যায় ভেজার জন্য। শুধু নিজে যে ভিজবে তা নয়, আশেপাশের সকলকে নাকানি চুবানি খাওয়াবেই। আর স্পেশালি ইমন পাশে থাকলে তো কথাই নেই। ইমন কে ওর সাথে ভেজাই লাগবে।

আজকেও শুধুমাত্র মায়ার মন রক্ষার্থে এসেছে বৃষ্টিতে ভেজার জন্য। অবশ্য মায়া পাশে থাকলে বৃষ্টিকে খুব একটা খারাপ লাগে না। বরং ভালই লাগে। বৃষ্টির সাথে সাথে ওর ভেতরের হৃদয়টাকেও ছুঁয়ে দেওয়া যায়।

এমনই ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে নীলা হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেলো। মায়া কিছুক্ষণ আগে থেকে ব্যাপারটা খেয়াল করছিল, এভাবে কেউ কি করে পড়ে যেতে পারে? একটু খেয়াল করে দেখলে, একটা নাদান শিশুও তো বুঝবে এটা ইচ্ছে করে পড়ে যাওয়া ছিল।

পরক্ষণেই ব্যাপারটা ঝেড়ে ফেলল মায়া। আবার সন্দেহ করছে। বিষয়টা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে নিলার দিকে এগিয়ে এলো সে। ইমন আর মিমোও এলো।

নীলা কোমরে হাত দিয়ে আহাজারি করতে করতে বলল, “বাবারে বাবা, কোমরটা শেষ আমার।”

মিমো আর মায়া তার হাত ধরে উঠাতে গেলে, বারবার ব্যর্থ হচ্ছিলো।

নীলা বলল, “আমি উঠতে পারছি না। হাঁটতে ও পারবো না বোধহয়। পায়ে, কোমরে ব্যথা লাগছে।”

মায়া আর মিমো অসহায় চোখে মুখে একে অপরের দিকে তাকালো।

নীলা বললো, “তোমরা আমায় কোলে তুলে একটু ঘরে রেখে আসো প্লিজ!”

মিমো বললো, “আমরা কেমনে তোমায় কোলে তুলি?”

নীলা তাকালো ইমনের দিকে। উপায়অন্তর না পেয়ে ইমন নীলাকে কোলে তুলে নিলো। নীলা কি করলো? সুন্দর করে ইমনের গলা জড়িয়ে ধরলো দুহাতে!

ইমন মায়া আর মিমোর দিকে তাকিয়ে বললো, “তোরাও আয়।”

মায়া বলল, “তুমি যাও নীলা আপুকে নিয়ে। আমরা কিছুক্ষণ পর আসছি।”

ইমন ওকে নিয়ে নিচে নেমে গেল। বাড়ি ঢুকে ড্রইং রুমে কাউকে দেখতে পেল না।
নীলাকে নিয়ে মায়ার রুমে ঢুকে খাটের উপর বসিয়ে দিয়ে বলল, “ঠিক আছিস এখন তুই?”

“হ্যাঁ মোটামুটি। কিন্তু পায়ে প্রচুর ব্যথা।”

“দেখে শুনে হাঁটাচলা করতে পারিস না। আমরাও তো ছিলাম ওখানে, তোর মত কেউ কি পড়ে গেছি নাকি?”
ধমকে বলল ইমন।

নীলা কিছু না বলে নিজের পা একহাতে মালিশ করতে লাগলো।

ইমন বললো, “থাক তুই। আমি মীমো কে পাঠিয়ে দিচ্ছি। ও এসে পা মালিশ করে দেবে নি।”

ইমন চলে যেতে নীলে নীলা বলে, “কি দরকার ওদের বিরক্ত করে? মিমো আর মায়া আনন্দ করছে। অযথা ওদের দেখে লাভ নাই।”

“তাহলে মাকে বলি?”

“আরে কি যে বলো? কাকি কে কেন বলবে? ব্যাপারটা খারাপ দেখায় না? আচ্ছা তুমি তো এখানেই আছো। তুমি করে দিলেই তো পারো।”

ইমন বিস্ময়ের সাথে বলল, “আমি?”

“হ্যাঁ তুমি। দিলে কি পাপ হবে তোমার? নাকি গার্লফ্রেন্ড রাগ করবে? এমন কিছু হলে দরকার নেই।”

ইমন মুখ গোমরা করে বলল, “না এমন কোন ব্যাপার না।”

তারপর পাশের ড্রয়ার থেকে মুভ স্প্রে নিয়ে, নীলার পায়ে স্প্রে করতেই মায়া আর হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকলো। মিমো ঘরে ঢুকেই সোজা বাথরুমে চলে গেল কাপড় চেঞ্জ করতে।
মায়া ইমনকে দেখে থমকে গেল। হাতের শিউলি ফুল গুলো ড্রয়ারের উপর রেখে বলল, “নীলা আপু কি পায়েও ব্যথা পাইছো?”

“হ্যাঁ গো।”

“তাহলে এসব স্প্রে দিয়ে হবে না। গরম কিছুর ছ্যাঁক দেওয়া দরকার।”
তারপর ইমনের দিকে তাকিয়ে বলল,”তুমি ওঠো। নিজের কাপড়-চোপড় পাল্টে নাও। আমি দেখছি ব্যাপারটা।”

ইমন উঠে চলে গেল।

ইমন চলে যাওয়ার পর মায়া নীলার পাশে বসে বলল, “ভেজা কাপড়ে বসে থাকবে? কাপড় কি নিজে নিজেই চেঞ্জ করতে পারবে?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ পারবো।”

“আচ্ছা আমি তোমার কাপড় দিয়ে যাচ্ছি। তুমি চেঞ্জ করে নাও। আমি তেল গরম করে নিয়ে আসি।”

মায়া নীলাকে কাপড় দিয়ে, নিজেও চেঞ্জ করে রান্না ঘরের দিকে যেতে নিলেই ইমন তাকে টেনে গেস্ট রুমে নিয়ে আসে।

দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে বলে, “কই যাচ্ছিস?”

“জাহান্নামের চৌরাস্তায় যাচ্ছি আমি!” মায়া রেগে বললো।

“যাহ বাবা, এমন ফায়ার হয়ে আছিস কেন? কি হইছে?”

“এভাবে টেনে আনলে কেন আমায়? যদি কেউ দেখে ফেলতো?”

“দেখলে দেখতো।”

“আর তুমি এখনো ভিজে কাপড় চেঞ্জ করো নি কেন? তোমার সাথে সাথে আমাকেও ভিজিয়ে দিচ্ছো।”

“মেলায় এত যত্নআত্তি করছিস। আর আমি কি ফেলনা নাকি? নীলাকে দেখে এবার আমার হিংসা হচ্ছে। নীলার মত আমারও হাত-পা ভেঙে বিছানায় পড়ে থাকা লাগবে। তাও যদি এই মহারানী একটু নজর দেয় আমার দিকে, আমি ধন্য!”

“আমি যাচ্ছিলাম নীলা আপুর জন্য তেল গরম করতে। তার পায়ে মালিশ করে দিতে হবে। এখন মনে হচ্ছে তেল গরম করে তোমার বুক চিরে সোজা হৃদপিন্ডের মধ্যে মালিশ করে দেওয়া দরকার।”

“বুক চিরে তুই বুকের মধ্যে ঢুকে যা না!”

“আচ্ছা। এখন ছাড়ো আমাকে।”

“না ছাড়বো না। সব সময় এত এদিক ওদিক ছোটাছুটি কিসের তোর? আমার সাথে একটু থাকতে পারিস না। মাঝেমধ্যে বুকটা একদম খালি খালি লাগে জানিস?”

“উফ কেউ দেখে ফেললে কি হবে বলতো? সব সময় তো রোমান্টিক মুডে থাকো কেন? আমার তো মাঝে মাঝে ভয় হয়। জানিনা আমাদের ব্যাপারটা কে কিভাবে নেবে?”

“সোজা ভাবেই নিবে। তোর স্বভাবে বোধ হয় অতিরিক্ত টেনশন করা নামক জিনিসটা মিশে আছে, তাই না?”

” হ্যাঁ, হবে হয়তো। এখন ছাড়ো।”

“আচ্ছা আগে একটা চুমু দে, তারপর!”

“আচ্ছা ছাড়ো। তারপরে দিচ্ছি।”

ইমন মায়াকে ছেড়ে দিয়ে বললো, “নে ছাড়লাম। এখন দে।”

মায়া দৌড়ে রুমের বাইরে বের হয়ে বললো, “দেবো না, দেবো না।”
বলেই দৌড় মারলো।

ইমন পেছন থেকে বললো, “মনে রাখলাম। আজকে দিলি না, সব সুদে আসলে উসুল করব আমি!”
.
.

চলবে…….

[ কার্টেসি ছাড়া কপি করা নিষেধ ]

#মায়াবন_বিহারিনী🖤
#পর্ব_০৪
#আফিয়া_আফরিন

নীলা বেলকনিতে ঠেস দিয়ে বসে আছে। সে ইমনকে ভালোবাসে। মারাত্মক রকমের ভালোবাসে। ভালোবাসাটা শুধুমাত্র আজকালের নয়। আরো বছরখানেক আগের। নীলা আর ইমন সম্পর্কে চাচাতো ভাই বোন। সেই সূত্রে তাদের বাসায় যাওয়া আসা প্রায় লেগেই থাকতো। নীলা শুধু প্রতিমুহূর্তে অপেক্ষার প্রহর ঘুমতো ইমন এর সাথে এক পলক দেখা হওয়ার। তার অতৃপ্ত চোখ দুটি শুধু ইমনকে খুঁজে বেড়াতো।
ইমনের সাথে ছোটবেলা থেকেই নীলার মিল মহব্বত খুব ভালোই ছিল। ঝগড়া হতো শুধু মায়ার সাথে। সেই সময় মায়া ওরাও ঢাকায় থাকতো।
ইমন ছিল খুব দুষ্টু ধাঁচের। ইমনদের বাড়ির পেছনদিকে ছোটখাটো একটা গ্রাম জাতীয় এলাকা ছিল। গরুর খাওয়ার জন্য সেখানে স্তুপ স্তুপ করে রাখা খড় ছিলো।
ইমন সেই খড় দিয়ে বাসা বানাতো।
মায়া আর নীলা গিয়ে চুপি চুপি সেই খড়ে আগুন লাগিয়ে দিয়ে আসতো। প্রায় সবাই তারা এ কাজ করতে করতে একদিন ইমনের নজরে পড়ে গেল।
পরে ইমন দুজনকে বেঁধে রেখেছিলো।
.
এভাবেই মজার ছলে ছোটবেলাটা কেটেছিল। এই মজা করতে করতে কোন ফাঁকে জানি নীলার ভালো লেগে যায় ইমনকে। সেই ভালোলাগা আস্তে আস্তে ভালোবাসার রূপান্তরিত হতে থাকে।

অতীতের কথা গুলো মনে পড়তে দুচোখ বেয়ে অশ্রু কণা গড়িয়ে পড়লো। নীলা সেদিন ছাদে ইমনকে দেখেছিল মায়া কে চুমু খেতে। ব্যাপারটা সে মানতে পারছে না এখনো। ইমন আর মায়ার একটু বাড়াবাড়ি রকমের সম্পর্ক! এটা কি সে এতদিন স্বাভাবিকভাবে দেখলেও, এখন একেবারে কনফার্ম তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে!
সেদিন রাতটা পুরোটাই কেটেছে তার চোখের পানিতে। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা করার ঠান্ডা মাথায় করতে হবে।
সেই কথা মাথায় রেখেই গতদিন ছাদে পড়ে যাওয়ার নাটক করেছিল। ইমনকে যে করেই হোক, মায়ের কাছ থেকে সরাতেই হবে; এটা বর্তমানে তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নীলা উঠে গিয়ে চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে ইমনের রুমের দিকে এগুলো। রান্নাঘরে একবার উঁকি দিয়ে দেখল, মায়া চা বানাচ্ছে।

ইমনের রুমে গিয়ে দরজা নক করে বললো, “ভিতরে আসবো?”

এমন শোয়া থেকে উঠে বসে বললো, “আয়। পারমিশন নেওয়ার কি আছে?”

নীলা ভিতরে এসে বসতেই ইমন বললো, “কি ব্যাপার কিছু বলবি?”

“কেন? কিছু বলা ছাড়া এমনি এমনি কি তোমার ঘরে আসা যাবেনা, নাকি?”

“নাহ না। আমি সেভাবে বলি নাই। তা তোর পায়ের কি অবস্থা? ব্যথা কমছে?”

“হ্যাঁ। এখন ঠিক আছি। আচ্ছা আমরা ঢাকায় কবে ফিরব?”

“কিছুদিন দেরি হবে। তোর নাকি বগুড়া শহর ঘুরে দেখার এত ইচ্ছা? তো ফিরে যাওয়ার কথা বলছিস যে?”

“না মানে। এটা তো তোমার মামার বাড়ি। উনারা আবার কি নাকি মনে করেন? আমি তো আর সরাসরি ভাবে তাদের আত্মীয়ের মধ্যে পড়ি না।”

“পাগল তুই? মামা-মামী সম্পর্কে এমন ধারনা মাথায় ও আনিস না। তারা কখনোই এমন কিছু মনে করবে না। তারা মায়াকে যে চোখে দেখে, আমাকে মিমোকে কিংবা তোকেও সেই চোখেই দেখে। তাই এখানে থাকতে আনকমফোর্টেবল ফিল করার কোন প্রয়োজন নেই!”

ইমন কথা বলার সময় নীলা খেয়াল করলো, ইমনের গলায় কেমন আচরের মত দাগ। নীলা ইমনের কাছে এগিয়ে এসে গলায় হাত রেখে বললো, “এটা কিসের দাগ?”

অস্বস্তিতে পড়ে গেল ইমন। মায়ার নখের দাগ এইটা। কিন্তু সেইটা অস্বস্তির কারণ নয়, নীলার এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে স্পর্শটাই কেমন জানি লাগছে!

ইমন কোন মতে বলল, “কি জানি?”

“কি জানি আবার কি? এরকম বাঘ ভাল্লুকের মতো আচর কে দিছে? জখম হয়ে গেছে।”

“হয়েছে তো হয়েছেই। এখন সর তুই।”

ওই সময় মায়া ইমন এর জন্য চা বানিয়ে নিয়ে আসছিল। নীলাকে এক হাত ইমনের বুকে, আরেক হাত তার গলায় দেখে থতমত খেয়ে গেলো। দৃশ্যটা দেখে অজানা আশঙ্কা তার বুকে বিধঁলো। মায়াকে দেখে নীলা সরে বসলো।

মায়া ইমন এর হাতে চা দিয়ে বললো, “নীলা আপু তুমি এখানে জানলে তো আরেক কাপ চা নিয়ে আসতাম। বসো তুমি, আমি চা নিয়ে আসছি। ভাই বোনে চা খেতে খেতে গল্প করো।”

মায়া চলে যেতেই নীলা ইমনকে বললো, “কি ব্যাপার তুমি এমন ডাউন মেরে গেলে কেন? সবাই এই সেই কাজে ব্যস্ত বলে তোমার সাথে আড্ডা দিতে এলাম, তুমিও দেখি চুপচাপ।”

ইমন নীলার কথায় পাত্তা না দিয়ে, চায়ের কাপ রেখে ঘর থেকে বের হলো।
মায়া চা নিয়ে ইমনের রুমের দিকেই আসছিলো। পথিমধ্যে ধাক্কা খেয়ে চায়ের কাপ পড়ে গেলো। কাপ ভেঙ্গে কাঁচ ঢুকলো মায়ার পায়ে। সাথে সাথে গরম চাও ছলকে পরলো।
পা থেকে সামান্য রক্ত বের হচ্ছিলো। ইমন তৎক্ষণাৎ মায়াকে পাজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়ে ঘরে গেলো। মায়া কিছু বললো না। শুধুমাত্র চোখটা ভিজতে শুরু করলো অশ্রুতে।

ইমন ওকে বসিয়ে দিয়ে ফার্স্ট এইড বক্স এনে পা ব্যান্ডেজ করে দিতে লাগলো।

তারপর মায়ার দিকে তাকিয়ে বললো, “পা কি বেশি ব্যথা করছে?”

মায়া কোন কথা না বলে সোজা ইমনের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো।
বাড়িতে আপাতত সে ইমন আর নীলা ব্যতীত আর কেউ নাই দেখে এই দুঃসাহস টা দেখাতে পারলো।

ইমন ওর মাথায় হাত দিয়ে বললো, “কি হইসে তোর? কাঁদছিস কেন এইভাবে?”

মায়া কোন কথা বললো না। শুধু মাত্র বিড়াল ছানার মত চুপটি করে ইমনের বুকে পড়ে রইলো অনেকক্ষণ পর্যন্ত। ইমন সর্বক্ষণ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো।

পরিশেষে ইমন ওর মুখটা তুলে দুহাতে নিয়ে আহ্লাদি কণ্ঠে বললো, “কি হয়েছে তোর?”

“কিছু হয়নি। শুধুমাত্র তোমাকে জড়িয়ে ধরে থাকতে ইচ্ছা হয়েছিল ভীষণ!”

“তা থাক। আমি কি মানা করছি? কিন্তু কাঁদছিলি কেন? পা কি ব্যথা করছে?”

“মানসিক ব্যথা শারীরিক ব্যথাকে হারাতেও সক্ষম। মনের দিক থেকেও কিছু ব্যথা থাকে। একটা ব্যাপারে খুব খারাপ লাগছিলো, তাই!”

“আচ্ছা, কোন ব্যাপার?”

“সবকিছু তোমার জানতে হবে কেন? এই ব্যাপারটা আপাতত তোমার না জানলেও চলবে।”

“আচ্ছা তাহলে আমায় ছাড়!”

“কেন? ছাড়বো কেন?”

“যাকে সবকিছু জানতে হবে, তার কাছে যা।”

“কালকে সবকিছু জানতে হবে না। তুমি চুপচাপ বসে থাকো। কতদিন পর একটু শান্তি পেলাম। আসলে সব খারাপের মধ্যেই কিছু না কিছু ভালো লুকিয়ে থাকে।”

“আচ্ছা আমি যদি খুব ভুল না করে থাকি, তুই একটু আগে নীলার সেই ব্যাপারটা নিয়ে মন খারাপ করে আছিস তাই না?”

“হু।”

“এটা নিয়ে মন খারাপ করার কিছু নাই। দেখ তুই আমার গলায় কিভাবে নখের আঁচড় বসিয়ে দিয়েছিস। এটা দেখেই প্রশ্ন করছিলো।”

“শুধু তো গলায় আচর বসিয়েছি। এখন একেবারে সারা গায়ে বসিয়ে দিব। ওর এত কিসের দরকার আরেকজনের গলায়/গায়ে হাত দিয়ে ন্যাকামি করার?”

“আচ্ছা এখানে ন্যাকামির কি হলো?”

“তোমার চোখে কি কিছুই পড়ে না? অবশ্য পড়বে কিভাবে?”

“আমার চোখে কিছু পড়ে না, সেটা বুঝলাম। ‘অবশ্য পড়বে কিভাবে’ এই কথাটার মানে বুঝলাম না?”

“না বুঝলে নাই।”

“তুই বুঝিয়ে দে?”

“ঠ্যাকা পড়ছে আমার?”

“তো ছাড়। যে বোঝাতে পারবে তার কাছে যাই।” ফাজলামি করে বললো ইমন।

মায়া ইমনকে ছেড়ে দিয়ে বললো, “কে সে?”

“কে সে?”

“আছে একজন।”

“আচ্ছা বলো, কে?”

“বলা যাবে না। পার্সোনাল ব্যাপার।”

“আচ্ছা। বলবা না তো?”

“নাহ।”

“একটা চুলও যদি রাখছি, তোমার মাথার।”

এ কথা বলেই মায়া ইমন এর চুল খামছে ধরলো। ইমন ওকে থামালো না। শুধুমাত্র এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মায়ার দিকে। মায়া একটু অস্বস্তি বোধ করে ইমনের চুল ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে নিলে, ইমন তার হাত ধরে টেনে কোলে বসালো। তারপর চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ অদ্ভুত দৃষ্টিতে। মায়ার শরীরের মিষ্টি একটা ঘ্রাণ অনুভব করছিলো।

দরজার আড়াল থেকে নীলা অনেকক্ষণ যাবত খেয়াল করছিলো সবই। এই মিলন দৃশ্য তার চোখে সহ্য হচ্ছে না। সরে গেল ওখান থেকে। মায়ার উপর তার প্রচন্ড রাগ হচ্ছে। দ্রুত ঢাকা ফিরতে হবে, যেকোনো বাহানা দিয়ে। ইমন এখানে থাকলে ওদেরকে আলাদা করা কখনোই সম্ভব হবে না।

নীলা মনে মনে ক্ষোভের সাথে বলে উঠলো, “মায়ার মধ্যে কি এমন আছে, যা আমার মধ্যে নেই?”
.
.
.
.
.

চলবে………

[কার্টেসি ছাড়া কপি করা নিষেধ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here