মধ্যাহ্নে_মাস্টারমশাই (২য় খন্ড),১৩,১৪

#মধ্যাহ্নে_মাস্টারমশাই (২য় খন্ড),১৩,১৪
#মম_সাহা
পর্বঃ তেরো

নিজের ঘরের বিছানাতে নেতিয়ে আছে ছুটন্ত তিস্তা। সময়টা ঠিক ভরসন্ধ্যা। বাড়ির পাশে বাতাবিলেবু গাছটা থেকে লেবুর কড়া সুবাস আসছে। জোনাকির ডাকও ভেসে আসছে দূর হতে। কিন্তু তিস্তার মস্তিষ্ক অব্দি যাচ্ছে না কিছুই।তার শরীরের কাপড় বদলানো হয়েছে আগেই। মাথার কাছে বৃদ্ধ লাতিকা অনবরত তালপাতার হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছে। তনয়া খাটের কোণায় দাঁড়িয়ে আছে।

তখন মেয়েকে এমন অবস্থায় দেখে প্রথমে মনে অনাকাঙ্খিত, ভয়ঙ্কর ভাবনা এলেও পরক্ষণেই মেয়েকে আকড়ে ধরতেই তার ভাবনা বদলে গেলো। মেয়েটা’র শরীরে প্রাণ আছে। গ্রামের মানুষের সাহায্যে তাকে বাড়ি নিয়ে এসেছে। তখনও জ্ঞান ছিলো না। পানি দিয়ে শরীর ধুঁয়ে পড়নের জামাকাপড় বদলে দিয়েছে।

গ্রামে তেমন কোনো ভালো ডাক্তার নেই। সবাই যখন বেশ উৎকণ্ঠিত মেয়েটার সাথে কী হয়েছে জানার জন্য তখনই একজন দেখলো শহর থেকে মোড়লদের গাড়ি এসেছে। সবাই হৈ হৈ করে ছুটলো মোড়লদের বাড়ি। কারণ শহর থেকে গাড়ি এলে মাহিনই আসে। এতদিন সে গ্রামে ছিলো না। মাঝে মাঝে ছুটিতে আসে।

সবাই ছুটে গেলো মাহিনের কাছে। তিস্তার ব্যাপারে সব জানাতেই মাহিন ছুটে এলো।

বেশ কতক্ষণ তিস্তাকে পর্যবেক্ষণ করলো মাহিন। তনয়া তখনও ঠাঁই দাঁড়িয়ে। মাহিন ধীরে উঠে বাহিরে চলে গেলো।

মাহিনের পিছে পিছে তনয়াও বের হলো। লতিকা বেগম নাতনির শরীরে হাত বুলিয়ে বাতাস করে যাচ্ছেন। ভেতর থেকে কান্না’রা দলক পাকিয়ে আসছে। তার ছটফটে নাতনির এ কী হলো! কার কুনজর পড়লো এমন পাখির উপর! কী ভয়ঙ্কর পরিণতি হবে মেয়েটার?

গ্রামবাসী তখন উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার যা ভাবছে তা সঠিক কিনা সে কথাটা ডাক্তারের মুখ থেকে শোনার জন্য।

মাহিন বের হতেই নেপাল ঠাকুর এগিয়ে এলেন। এ একটা মানুষের মনে চাঞ্চল্যকর খবর শোনার উৎকন্ঠা নেই। বরং সে মেয়েটার শরীরের অবস্থা জানার জন্য আগ্রহী।

মাহিনের কাছে গিয়ে নেপাল ঠাকুল হাত জোড় করে বললেন,
-‘আমাদের মেয়েটা’র কী খবর ডাক্তার? কোনো বড় সমস্যা হইলো নাকি? সদরে নিতে হইবো?’

মাহিনের মুখে তখন রাজ্যের আমবস্যা। সে কোনোরকমে বললো,
-‘না আর সদরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। একটু পরই হুঁশ ফিরবে।’

এবার গ্রামের মুরব্বিরা এগিয়ে এলেন। একজন চাঁপা হুঁশিয়ারি স্বরে বললেন,
-‘কী দেখলেন ডাক্তার সাব? মাইয়াটা’র সতিত্ব নাই তাই না?’

সবাই যেনো এ প্রশ্নটারই অপেক্ষায় ছিলো। উন্মুখ হয়ে চেয়ে রইলো উত্তরের আশায়। তনয়া বেগমও তাকালো মাহিনের দিকে। মাহিন কতক্ষণ চুপ রয়। একদম নিরবতায় কেটে যায় কতক্ষণ। তারপর ছোট্ট শ্বাস ফেলে বলে,
-‘আপনারা এ ব্যাপার পুলিশদের জানান নি? তারা তদন্ত করছে তো ঠিক ভাবে? এভাবে তিন তিনটা মেয়ের সতিত্ব কারা নষ্ট করলো? তাও তো তিস্তা বেঁচে ফিরেছে কিন্তু বাকিদের তো মেরে ফেলেছে।’

ডাক্তারের প্রশ্নেই যে ছিলো গ্রামবাসীর উত্তর তা আর বুঝতে বাকি রইলো না কারো। তনয়া ধপ করে বসে পড়ে ফ্লোরে। তার দুনিয়াটা যেনো আঁধার করে আসে। উঠানের খাটে বসে থাকা আমান শেখ ডুকরে কেঁদে উঠে। নিমিষেই এক দারুণ ঝড় বয়ে যায়। সবাই হা হুতাশ করে কতক্ষণ। মহিলাদের মাঝে কয়েকজন ছুটে এসে তনয়াকে বাতাস করে, স্বান্তনা দেয়। পুরুষেরা আমান শেখকে ভরসা দেয়। মাহিন গটগট পায়ে চলে যায় সেখান থেকে।

সন্ধ্যা টা কেটে যায় ভয়ঙ্কর সত্য মানতে না পারার গুঞ্জনে।

_____

তিস্তা বিছানার পাশে জানালাটা’র দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে আছে। তার জ্ঞান ফিরেছে প্রায় দশ, পনেরো মিনিট হবে। এখন প্রায় মধ্যরাত। কেউ তার আশেপাশে নেই। হারিকেনের আলো জ্বলছে ছোট্ট বসার টুলের উপর। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে তার। এতদিন পর নিজেকে নিজের বিছানায় দেখে বেশ অবাক হয় সে। অতঃপর মনে পড়ে আজকে ভোরের ঘটনা। সে ঐ বন্ধ ঘরটার থেকে পালিয়ে সোহাগ চাচাদের কাছারি বাড়ির সামনে এসে জ্ঞান হারায়। তারপর কী হয়েছিলো কিছুই মনে নেই তার।

জানালার বাহির হতে ভেসে আসছে জোনাকির ডাক। দু একটা জোনাকি ঘরে ঢুকছে। তাদের জ্বল জ্বল আলোখানা তিস্তার মন ভরিয়ে দিচ্ছে।

তিস্তার বড্ড ইচ্ছে করছে একটু ছুঁয়ে দিতে তাদের কিন্তু সে ধরছে না। থাক,ওরাও একটু নিজেদের মতন উড়ুক। বাহিরের থেকে ভেসে আসা লেবুর ঘ্রাণটা তিস্তা শুষে নিলো ক্ষাণিকটা। কতদিন পর আবারও নিজের নীড়ে ফিরে এসেছে সে। গত পাঁচদিন যাবত একটা ঘরে নাক, চোখ,মুখ বন্ধ করে তাকে ফেলে রেখেছিলো। এমন অবস্থায় তো মনে হয়েছিলো মরেই যাবে সে। কিন্তু অবশেষে মুক্তি পাবে কে জানতো!

তিস্তা ছোট্ট শ্বাস ফেলে। মাস্টারমশাই এর কথা মনে পড়ে ভীষণ। এই রাত, এই আধাঁর একদিন মাস্টারমশাই ঘুঁচিয়ে দিয়েছিলো তার আবদারে।

তখন সময়টা ছিলো শরৎকাল। তিস্তাকে তখন প্রায় মাস্টারমশাই বাড়ি অব্দি পৌঁছে দিতো। সেদিনও পৌঁছে দিচ্ছিলো। শুধু তিস্তা না, সাথে আরও ছেলেমেয়ে প্রায়ই থাকতো। সেদিনও ছিলো। তিস্তা, ভ্রমরী,বকুল, রাসেল, সোহেল আরও অনেকে।

আঁধারের পথখানায় মাস্টারমশাই নিজের টর্চ লাইট টার আলো দিয়ে আধাঁরটা কিছুটা হালকা করার প্রয়াস চালিয়ে হাঁটছে গ্রামের পথ দিয়ে। তিস্তার তো চরম দুরন্তপনা। সে ছুটতে ছুটতে,লাফাতে লাফাতে হাঁটছে। হঠাৎ বাঁশবাগানের সাথে দিয়ে আসার সময় এক ঝাঁক জোনাকিপোকা জ্বল জ্বল আলো দিয়ে পুরো পথটা যেনো আলোকিত করে দিলো।

তিস্তার বরাবরই স্বভাব জোনকি দেখলেই হাতের মুঠোয় চেঁপে ধরা। তার মনে হয় আকাশের মস্ত বড় চাঁদ তার মুঠোয়। সেই অভ্যাসবশত জোনাকি ধরার প্রয়াসে সে একটু লাফ দিতেই ছিটকে পড়ে রাস্তা থেকে পাশের ছোট্ট গর্তটায়। ভীষণ ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠে। সবাই বেশ ভয় পেয়ে গেছিলো।

মাস্টারমশাই ডানে বামে না দেখে তিস্তার কাছে এসেই ঠাস করে চড় বসিয়ে দেয় তার গালে। তিস্তা ব্যাথা ভুলে আহম্মক হয়ে তাকিয়ে রয়৷ মাস্টারমশাই তাকে মেরেছে সে কথাটা মস্তিষ্কে পৌঁছাতেই ছিটকে আসে কান্নার দল। যেই ঠোঁট ভেঙে সে কান্নায় মনোনিবেশ করবে তখনই তাকে অবাক করে দিয়ে মাস্টারমশাই বাম গালে আরেকটা চড় বসিয়ে দেয়।

এবার যেনো অতি বিষ্ময়ে কান্না গুলোও আটকে যায় কোথাও। মাস্টারমশাই তিস্তাকে পাঁজাকোলে তুলে ধমকাতে ধমকাতে বললো,
-‘মন তো চাচ্ছে আরও চারটা চড় বসাই তোর গালে। শান্তি দিবি না আমায়? একটুর জন্য আমার জানটাই বের হতে নিচ্ছিলো। কী দরকার ছিলো অন্ধকারে লাফ দেওয়ার?’

তিস্তা হা হয়ে তাকিয়ে থাকে। পরক্ষণেই মাস্টারমশাই এর ধমক শুনে হুঁশ ফিরতেই কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললো,
-‘আমি তো জোনাকিরে ধরতে গিয়েছিলাম। কে জানতো পরে যাবো!’

তিস্তার এহেন বোঁকামার্কা কথা শুনে প্লাবন আরও ক্ষাণিকটা বকে দেয়।

পায়ে বেশ ব্যাথা পাওয়ায় পরেরদিন পুরোটা সময় ঘরে বসিয়ে কাটায় সে। রাত তখন দশটা কি এগারোটা। সবে খাবার খেয়ে তিস্তা ঘুমাতে এসেছিলো। হঠাৎ জানলার কাছে একটা জ্বলতে থাকা কাঁচের বয়াম দেখে চমকে উঠে। আরেকটু ভালো করে দৃষ্টি দিতেই দেখে হাসি হাসি মুখ করে সাদা পাঞ্জাবি খানা পরে দাঁড়িয়ে আছে তার মাস্টারমশাই। তিস্তা অবাকে হা হয়ে যায়। ছোটবেলা থেকেই তার ভয়ডর ততটা নেই তাই সে ভয় পায় নি প্রথমেই।

মাস্টারমশাই’কে দেখে তিস্তা দ্রুত ছুটে গেলো খাটে। মাস্টারমশাই তখন জানালা ধরে বাহিরের দিকটায় দাঁড়িয়ে। তিস্তাকে ছুটতে দেখে চোখ রাঙিয়ে সাবধান করে।

তিস্তা উত্তেজিত কণ্ঠে বললো,
-‘আপনি এত রাতে এখানে!’

জোনাকির আলোয় চোখে পড়ে মাস্টারমশাই এর মিষ্টি হাসি। মিষ্টি হেসে সে বললো,
-‘তোর জন্য কিছু সুখ কুড়িয়েছি। এই যে, বয়ামে বন্দি করে এনেছি। এগুলোর জন্য ই তো কাল ব্যাথা পেলি।তাই এনে দিলাম।’

তিস্তা খাটে থাকা বয়ামটা আকড়ে ধরলো। খুশি যেনো তার ধরে না। এতগুলা জোনাকি তো সে কখনোই একসাথে ধরতে পারে না। মাস্টারমশাই তাকে কত গুলো জোনাকি দিলো! কত ভালো মাস্টারমশাই টা।

প্লাবন তিস্তার বাঁধনহারা খুশি দেখে জানালার লম্বা শিকের ফাঁকাটা দিয়ে নিজের হাতটা এগিয়ে তিস্তার মাথায় আদুরে, স্নেহের হাত বুলালো। কিছুক্ষণ তাকিয়ে অদ্ভুত কণ্ঠে বললো,
-‘কবে বড় হবি? তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যা না।’

কথাটা বোধগম্য হয় নি তিস্তার। সে তখন তার জোনাকি দেখায় ব্যস্ত। সেই মধ্য রাতের মধ্যাহ্নে মাস্টারমশাই এর বিমোহিত কণ্ঠের ছোট্ট বাক্যের অর্থ বুঝিনি অবুঝ তিস্তা। কিন্তু আজ বুজছে সেই আকুতি মাখা বাক্যের তাৎপর্য। আজ বড়ও হয়েছে। কিন্তু কোথায় সে মাস্টারমশাই? যার জন্য বড় তিস্তার বুকের বা’পাশ খালি লাগে, কোথায় সে? মধ্যরাতের সে সুখ বিক্রেতা পুরুষ আজ এক আকাশ বিষন্নতা দিয়ে কোথায় গেলো?

এসব ভাবনার মাঝে নিজের শরীর ভীষণ ধাক্কা অনুভব করে। দৃষ্টি ফিরিয়ে দেখে তার মা দাঁড়িয়ে আছে ভাতের থালা নিয়ে। কতদিন পর মাকে দেখলো।

তিস্তা তৎক্ষনাৎ মাকে জড়িয়ে ধরলো। এতদিনের কান্না ঝড়িয়ে দিলো ভীষণ ভাবে। তনয়া মেয়ের মাথায় হাত বুলালো। মেয়েটা কাঁদছে কেনো! তবে কী খারাপ ঘটনা গুলো মনে করে কাঁদছে?

তনয়া ভাতের থালাটা খাটে রেখে স্বান্তনার স্বরে বললো,
-‘কাঁদছো কেনো? কিচ্ছু হয় নি। ভাগ্যে যা ছিলো তা হয়েছে। তুমি এর জন্য নিজেকে দোষ দিও না। ওরা তোমার সাথে যা সর্বনাশ করেছে তার বিচার হবে।’

মায়ের কথায় তিস্তা অবাক হয়। সর্বনাশ করেছে! আটকে রাখাটাই কী সর্বনাশ? তিস্তা অবুঝ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
-‘কী সর্বনাশ মা? আটকে রেখেছে যে?’

তনয়া অবাক হলো। মেয়েটা কেমন প্রশ্ন করছে! পাগল হলো নাকি? কী সর্বনাশ ও কী বুঝে না!

বাহির থেকে দাদী ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বললো,
-‘তোর সতীত্ব ছিঁইড়া খাইছে জানোয়ারের মতন। এর চাইয়া বড় সর্বনাশ হয়!’

দাদীর কথায় তিস্তা জেনো আকাশ থেকে পরলো। অবাক কণ্ঠে বললো,
-‘ওরা তো আমায় কিছু করে নি,যুবতী!’

#চলবে

#মধ্যাহ্নে_মাস্টারমশাই (২য় খন্ড)
#মম_সাহা

পর্বঃ চৌদ্দ

শীতল রাত। আধাঁর ঘেরা চারপাশে। বড় রাজকীয় বাড়িটার, ঠিক পেছনের দিকের ছোট্ট বাগানের দিকে দাঁড়িয়ে আছে প্লাবণ। সে কিছুই করতে পারছে না। তার হাত পা শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে যেনো কেউ। এই মুহুর্তে তার বসে থাকার সময় নেই তবুও দম খিঁচে বসে থাকতে হচ্ছে। কেমন আছে তার ছোট্ট তিস্তা? প্রায় একমাস তো হতে চললো,তাদের প্রেমের নির্বাসনের। মেয়েটা যা দুষ্টু,শরীরের ঠিকমতন খেয়াল রাখে তো! নাকি, মাস্টারমশাই এর বিরহে মেয়েটা থম মেরে গেছে? ভালো আছে মেয়েটা! আচ্ছা, হরপ্রসাদ যদি এর মাঝে গ্রামে গিয়ে তাদের বিয়ের কথা বলে দেয়, তখন? মেয়েটা যে মানতে পারবে না। মাস্টারমশাইকে’ই নিয়ে তো তার সব অনুভূতি’র সৃষ্টি। কিশোরী মনের আধিপত্য বিস্তার করে মাস্টারমশাই। সে মাস্টারমশাই এর কাছ থেকে এমন প্রতারণা সামলে উঠতে পারবে তো মেয়েটা?

প্লাবণ থমকায়। এসব যে সে আজ ভাবছে, তেমনটা না। প্রতিদিনই তিস্তার ভাবনায় তার ঘুম,খাওয়া আর হয় না। এ খবর তো জানবে না তিস্তা, কেবল জানবে, তার মাস্টারমশাই তাকে বাজে ভাবে ঠকিয়েছে। প্লাবনের মনে পড়ে গ্রামের প্রথম দিনের কথা। কাঠফাটা রোদ্দুরে সে দেখেছিলো প্রথম তিস্তার মুখ। ছোট্ট কিশোরী হাঁটু থেকে আরেকটু নিচ অব্দি একটা গাঢ়ো হলুদ রঙের ফ্রক পড়ে ক্ষেতের মাঝ দিয়ে দু’হাত ছড়িয়ে দৌড়ে যাচ্ছে। তার যেনো কোনো পিছুটান নেই। ঘর্মাক্ত লাল মুখখানা।ছোট ছোট চুল গুলো ঘাঁড় অব্দি বেণী। সে কিশোেী মুখে কী মায়া যে সে দেখেছিলো সেদিন, সে জানে না। কেবল এতটুকু জানে, এরপর আর কারও মুখ তাকে টানে নি। মায়া আসে না। মেয়েটা কেমন আষ্টেপৃষ্টে রেখেছে তাকে। এ মায়া বুঝি ছাড়ানো যায়!

মধুসখী’র পাড়ে,দুজনের কত স্মৃতি। এসব কী আদৌও ভুলা যায়! তিস্তার বিরহে, হঠাৎ করেই মাস্টারমশাই এর সব খালিখালি লাগছে। প্রিয় সানুষটাকে একবার দেখতে চাওয়ার তৃষ্ণা, পৃথিবীর সব তৃষ্ণা’কে হার মানায়।

প্লাবন চোখ বন্ধ করে। তার ব্যাথা গলায় সুর হয়ে আসে। চোখের কোণে ভেসে উঠে তিস্তা৷ খিলখিল হাসি। সেই হাসি প্লাবনের গলায় তাল দেয়। প্লাবন আনমনেই গেয়ে উঠে,
-‘উষ্ণ দুপুরে, দেখিয়াছি তারে, মায়া লাগাইয়াছে সে,,
আমি তিস্তার ঢেউয়ে তাকে দেখি,হৃদয়ে বাসা বাঁধিয়াছে যে,,,’

গানের সুরে ভেসে গেলো সবটুকু আকুলতা। নিজেকে শোপে দিলো প্রণয়ীনির কাঠগাঁড়ায়। মনের জ্বলন্ত লেলিহান শিখা ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে। কিন্তু তা বেশিক্ষণ হলো না। ডাক পরলো তার। সুরে ভাঁটা পড়লো। ছন্দ কেটে গেলো সুরের।

একটু একটু করে সঞ্চয় করা শীতলতা নিমিষেই রাগে পরিণত হলো। বিরক্তে কুঁচকে গেলো কপালের ভ্রু জোড়া। সে মেয়েদের সম্মান করে বলে এখনো এ মেয়েটাকে সহ্য করছে। আর নাহয় কবেই পুঁতে ফেলতো মাটিতে।

প্লাবনকে চুপ হতে দেখে বিষাদিনী এগিয়ে গেলো। পড়নের নীল রাঙা শাড়িটার আঁচল ঘাঁড়ের উপর যত্ন করে উঠিয়ে, রিনরিনে মেয়ে কণ্ঠে বললো,
-‘মাস্টারমশাই, প্রেমের পরিণতি সুখকর নাহলে বড্ড কষ্ট মেলে তাই না?’

অনেকদিন পর,ঠিক কতদিন পর এ ডাকটা শুনলো,প্লাবন? আটাশ দিন বোধহয়। ঠিক আটাশ দিন না, হরপ্রসাদও তো সেদিন একবার ডেকেছিলো। কিন্তু এখন, ভুল জায়গায়, অপছন্দের পাত্রী থেকে এমন ডাক আশা করে নি প্লাবন। এত পছন্দের ডাকটাও, ভীষণ বিষাক্ত মনে হলো।

চোয়াল শক্ত হলো প্লাবনের। মেয়েটার সাথে আর ভালো আচরণ করা যাবে না। অনেক তো হলো। প্লাবন বিরক্তি’র সুরে বললো,
-‘সেটা আপনি জেনে কী করবেন, বিষাদিনী? আপনি তো কেবল বিষাদ ছড়াতে জানেন। এতটুকুই আপনি জেনে রাখুন।’

প্লাবনের উত্তরে বিষাদিনী হাসে। মনে মনে নিজের ভাগ্যকে ধিক্কার দিয়ে বলে,
-‘দেখলি তো, বিষাদিনী! তুই তোর বিষাদমাখা মন নিয়ে বিষাদ’ই ছড়িয়ে গেলি। জীবন বুঝি এমন বৃথাই গেলো তোর?’

বিষাদিনী’র মন উত্তর দেয় নি। সে যে পরিপূর্ণ বিরহে আচ্ছন্ন।

হঠাৎ প্লাবন আর বিষাদিনী ছাড়াও আরেকজনের গলার স্বর পাওয়া গেলো। আশালতা,প্লাবনের মা এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। বিষাদিনী’র মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে গদগদ হয়ে বললো,
-‘বাহ্ রে মা,আমার ছেলেটা দেখছি আজকাল তোমার সাথেই থাকে। একদিন ঠিকই বুঝবে ও, ওর মা ওর জন্য ভুল সিদ্ধান্ত নেই নি।’

প্লাবনের শক্ত চোয়াল আরও শক্ত হলো। তাচ্ছিল্য হেসে বললো,
-‘সন্তানের জীবন থেকে দীর্ঘস্থায়ী ভাবে সুখ কেড়ে নিয়ে, কোন সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আমি সত্যিই জানিনা। আর আমি জানতেও চাই না। নিজের অবস্থানকে দুর্বলতা বানিয়ে আরেকজনকে সে দুর্বলতা দেখিয়ে কোনো স্বার্থ হাসিলের মানে আমার মস্তিষ্কে বোধগম্য হয় না।’

আশালতা নিজের ছেলে কথায় ভিষণ ভাবে অপমানিত বোধ করলেন। প্লাবণ গটগট পায়ে চলে গেলো সে জায়গা থেকে। পরিস্থিতি অন্য দিকে ঘুরলে বিষাদিনী যদি রাজি নাহয়! সে ভেবে আশালতা তাড়াতাড়ি বিষাদিনী’র কাছে যায়। বিনীতভাবে বলে,
-‘তুমিই পারবে সবটা ঠিক করতে। আমার ছেলেকে সঠিক পথে নিয়ে এসো।’

বিষাদিনী ভরসা মাখা কণ্ঠে বললো,
-‘বিশ্বাস রাখুন,আমি সব ঠিক করে দিবো।’

আশালতা স্বস্তির শ্বাস ফেলে। এ মেয়েটাকে একটু ভালো জায়গায় নিতে না পারলে সে যে মরেও শান্তি পাবে না। মেয়েটাকে ভালো রাখার কথা দিয়েছিলো যে।

__

বিষাদিনী তাদের বাড়ি’র লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস নিয়ে বসেছে। সে বড্ড রবীন্দ্র প্রেমী। রবীন্দ্রনাথ এর এমন কোনো বই নেই যেটা তার কাছে নেই,এমন কোনো গান নেই যেটা সে জানেনা। তার জীবনের দু’টি পুরুষের প্রতি সে দুর্বল। এক, তার বিষাদ ঢেলে দেওয়া প্রেমিক আর দুই,তার বিষাদ দূর করা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

হঠাৎ তার সামনের টেবিলের উপর কিছু রাখার শব্দ হলো। দৃষ্টি দিতেই দেখলো, কফির কাপ। বাংলায় এখনো তেমন কফির চলাচল নেই। বাহিরদেশ থেকেই আনাতে হয়। তার ভীষণ পছন্দ বিধায়, বাহির দেশ থেকে এসব আনানো হয়।

বিষাদিনী কফির কাপটাতে চুমুক দেওয়ার সময় তাদের বাড়ির অল্পবয়সী ঝি’টা আমতা আমতা শুরু করলো। বিষাদিনী খেয়াল করলো সেই ভাব। কফির কাপে আরামদায়ক এক চুমুক দিয়ে,কাপটা আবার আগের জায়গায় রাখলো। গম্ভীর কণ্ঠে মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলো,
-‘কিরে সরলা? কিছু বলবি?’

সরলা যেনো এমন একটা প্রশ্নেরই অপেক্ষায় ছিলো। সে দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বললো,
-‘দিদিমণি, আপনারে একটা কথা বলিতে চাই।’
-‘বলিয়া ফেলুন।’

কথাটা বলেই ফিক করে হাসে বিষাদিনী। সরলা মেয়েটা তার ছোট। কথা বার্তায় একটু শুদ্ধতা বেশি। পশ্চিমবাংলা’র কোনো গ্রাম থেকে এসেছে। খেয়াল নেই তার, গ্রামের নামটা। বাড়িতে এমন কত গুলোই ঝি,কেয়ারটেকার আছে। সবার নাম-ই বড় কষ্ট করে মনে রাখে সে।

কতক্ষণ আমতা-আমতা করে অবশেষে সরলা বললো,
-‘আপনার বাবা বলিতেছে,পেটের সন্তানটা নষ্ট করিয়া দিতে। কিন্তু আমি রাখিতে চাইতেছি। আপনি একটু বুঝিয়ে বলিয়েন তাকে।’

এমন উদ্ভট কথায় সামন্য হোঁচট খেলেও,নিজেকে সামলে নেয় বিষাদিনী। এ আর নতুন কী! এমন কত-শত ঘটনা ঘটে আসছে। বাবা’র কী চরিত্র বলে কিছু আছে নাকি? কেবল টাকার সাম্রাজ্য আছে বলেই এখনো শুদ্ধ পুরুষ হয়ে বেঁচে আছে। আর মা! তার কথা নাহয় বাদই দেওয়া যাক। স্বামী-স্ত্রী’র চরিত্রের “চ” ও নেই। বিলাসিতার নামে কতগুলো নষ্টামো ছাড়া কিছু কী হয়!

এমন অদ্ভুত কত আবদার’ই বিষাদিনী’কে শুনতে হয়। আগে ভীষণ খারাপ লাগলেও,এখন লাগে না। সয়ে গেছে শরীরে সবটা।

বিষাদিনী ধীরে সুস্থে কফিটা শেষ করলো। স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো,
-‘সামান্য টাকার জন্য, শরীরটা না বিকালেও পারতি।’
-‘মা-বাবা টাকার জন্য অনেক চাঁপ দেয়। আমাদের মতন মানুষের যে পেট চালানোর আগেই,পিঠে দ্বায়িত্ব চাপিয়া দেয়।’

বিষাদিনী ছোট্ট শ্বাস ফেলে বললো,
-‘এ পাপ রেখেও বা কী করবি? এর চেয়ে ফেলে দে। ভালো জায়গায় বিয়ে দিয়ে দিবে ঐ লোক। মানে আমার বাবা, বিশাল চৌধুরী।’
-‘আমার যে অনেক শখ, প্রথম সন্তানটি মানুষ করিবো।’
-‘তবে,পাপের সন্তান কেনো গর্ভে ধরতে গেলি? লাভ নেই এসব বলে। এর চেয়ে ঐ লোক যেমন চায়, তেমন কর। তোরই লাভ। তোরাও না টাকার জন্য কী যে করিস!’

সরলা মাথা নিচু করে বললো,
-‘আপনার তো অনেক টাকা আছে,তাই বুঝিতে পারিবেন না আমাদের অসহায়ত্ব। আপনারা তো অনেক সুখেই থাকিতেছেন ।’

বিষাদিনী আর কিছু বলে না। কিছুক্ষণ মৌণ রয়। তাচ্ছিল্য হাসে মনে মনে।
-‘অনেক সুখে আছে! টাকা থাকলেই কী সুখী! কই, সে তো সুখী হতে পারছে না। এমন নরকে থাকলে কেইবা সুখী হতে পারে?’

নিজের প্রশ্ন নিজের মাঝেই রাখে সে। হঠাৎ অদ্ভুত স্বরে বলে,
-‘সরলা,তোর সাথে যে বিশাল চৌধুরী অন্যায় করলো,তার বিচার চাইবি না? চল, আমরা বড় পুলিশ অফিসারদের সাহায্য নিবো। আমার বাবা’র কেচ্ছা কাহিনী ছড়িয়ে দিবো। যাবি?’

ভীতু সরলা কেঁপে উঠে। দু হাতে না না করে বলে,
-‘কখনোই না, দিদিমণি। আমি বরং বাচ্চাটা নষ্ট করিয়া ফেলবো, তবুও ঐ ভেজালে যাবো।’

বিষাদিনী সরলাকে বুঝানোর চেষ্টা করে। ভীতু সরলা। ছুটে বের হয়ে যায়। পরক্ষণেই বিষাদিনী’র গালে শক্ত চড় পড়ে। বিষাদিনী অবাক হয়ে তাকাতেই দেখলো ছোট হাতা যুক্ত বক্ষবন্ধনী’র সাথে, পাতলা মসলিন শাড়ি পড়া তার তথাকথিত “মা” নামক মহিলা।

বিষাদিনী যেনো থাপ্পড়টা গায়েই মাখলো না। আরাম করে নরম কেদারায় বশে, আয়েসি ভঙ্গিতে বললো,
-‘আরে, মিসেস রঞ্জিতা? লাইব্রেরী’তে পা রেখেছেন কোনো? ইশ,আমার লাইব্রেরী টা অপবিত্র করে দিলেন।’

তার সামনে অতি সুন্দরী মহিলা ফুঁসে ওঠে বললেন,
-‘খাইয়ে, খাইয়ে,একটা কালসাপ পুষছি। শীগ্রই তোমাকে বিদায় করবো। এ বাড়িতে থেকেই নিজের বাবার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করো? অকৃতজ্ঞ মেয়ে।’

বিষাদিনী উত্তর দেয়না। মানুষকে উত্তর দেওয়া যায়, অন্যকিছুকে না। নিজের মনে তীব্র ঘৃণা জন্ম নেয়। এ কেমন ভাগ্য তার!

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here