বিনি_সুতোয়_গাঁথা 💙,পর্ব_০৯

বিনি_সুতোয়_গাঁথা 💙,পর্ব_০৯
লেখক_ঈশান_আহমেদ

ভাইয়া আমার পাশে এসে বসল।আমার কাঁধে হাত দিয়ে বলল,

আমি সবটা জানি।

ভাইয়া আমি বুঝলাম নাহ্।তুই কিসের কথা বলছিস?(আমি)

হাহাহা!কিসের কথা বলব আবার আমি তো মজা করছিলাম।(ভাইয়া)

মানে?(আমি)

আসলে আমি বিয়ের পরে থেকে খেয়াল করছি তুই নিধিকাকে এড়িয়ে চলিস।কিন্তু এটার কারণ কি?(ভাইয়া)

আরে ভাইয়া বুঝো না কেন নতুন ভাবি।একটু লজ্জা লাগে আরকি!(আমি)

আর কত মিথ্যা বলব।তবে না ভাইয়ার সবটা জানা উচিত।সত্যটা লুকানো ঠিক নাহ্।এখনি ভাইয়াকে সবটা বলে দিব নাকি!নাহ্ থাক কয়দিন পরে বলি।

ভাইয়া উঠে চলে গেল।আমি রুমের দিকে যাচ্ছিলাম আর রিধিকা রুম থেকে বের হচ্ছিল দুজনে ধাক্কা খেলাম।রিধিকা পড়ে যাচ্ছিল আমি ওর এক হাত টেনে ধরলাম।

কি অবস্থা রিধিকা?খাওয়া-দাওয়া করো না নাকি?মনে তো হয় শরীরে জোরই নাই।(আমি)

আপনার যা একটা শরীর।ধাক্কা খেলেই আমি তাল সামলাতে পারি না!এটা তো আমার দোষ না আপনার শরীরের দোষ।(রিধিকা)

ওহ্ আচ্ছা সব ছেড়ে এখন আমার শরীরের দোষ?(আমি)

অবিয়াসলি,আপনার বডিটা কমান নাহলে আমার হাড্ডি-গুড্ডি সব ভেঙে যাবে ধাক্কা খেয়েই।(রিধিকা)

আমি রিধিকাকে টান দিয়ে আমার কাছে আনলাম।রিধিকা চুপ হয়ে আছে।আমি বুঝি না আমার কাছে থাকলে ও এমন চুপ হয়ে যায় কেন!

তুমি কোন ঔষধ খেয়ে এমন চিকন প্রাণী হয়েছো সেটা আমাকে লিখে দিও।আমি সেটা খেয়েই তোমার মতো পাটকাঠি হয়ে যাবো।ঠিক আছে!(আমি)

রিধিকা আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নিচে চলে গেল।ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হাসছি।মেয়েটাকে রাগাতে ভালোই লাগে আবার ওর সাথে রাগ দেখাতেও ভালো লাগে।

রিধিকা যেতেই নিধিকা আমার সামনে এসে দাঁড়ালো।

কি হয়েছে?(আমি)

রিধিকার সাথে কি নিয়ে এতো হাসাহাসি করছিলে?(নিধিকা)

সেটা আপনি জেনে কি করবেন?(আমি)

এতো হাসাহাসি করার কি আছে!তাও আবার করিডোরে দাঁড়িয়ে?(নিধিকা)

আমরা বর-বউ।আমরা যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে হাসাহাসি,দুষ্টামি আর হ্যাঁ রোমাঞ্চও করতে পারি।এটা তো আপনার দেখার বিষয় নাহ্ ভাবি।(আমি)

নিধিকার সামনে থেকে রুমে চলে আসলাম।নিধিকা একভাবে দাঁড়িয়ে আছে।রুমে এসে বসে আছি।হঠাৎ করে ভাইয়া জোরে জোরে বাড়ির সবাইকে ডাকছে।আর দেরি না করে আমি নিচে গেলাম।গিয়ে দেখি রিধিকা আর ভাইয়া পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।বাবা-মাও চলে এসেছে।আনহি আর নিধিকা নিচে আসল।

বাহ্ নিধিকা বাহ্!খুব তো ভালোই নাটক করতে পারো।আমার ভাইয়ের জীবনটা নষ্ট করে আমাকে বিয়ে করেছো।লজ্জা করে না তোমার!(ভাইয়া)

মানে কি বলছো তুমি?(নিধিকা)

ভাইয়া তারপরে সম্পূর্ণ ঘটনা সবাইকে বলল।আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি।নিধিকার দিকে তাকিয়ে দেখি ওর চোখে জল।

আমার বুঝতে বাকি নেই রিধিকা ভাইয়াকে সবটা বলে দিয়েছে।তবে সে এটা কেন করব!যাক একদিন না একদিন তো ভাইয়া সবটা জানতোই!রিধিকা জানিয়ে ঠিকই করেছে।

ওহ্ আচ্ছা।সব দোষটা আমার ঘাড়ে দিয়ে দিলে!আমি নাটক করেছি তাই না!আর তুমি যে আমাকে ব্লাকমেইল করে বিয়ে করেছো তাতে কিছু যায় আসে না!(নিধিকা)

ভাইয়া চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।আমরা সবাই নিধিকার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।

আপু এমন একটা কাজ করেও তুমি কথা বলছো কি করে!(রিধিকা)

রিধু আগে সবটা শোন তাহলে বুঝবি।(নিধিকা)

না তুমি কিছু বলবে নাহ্।(ভাইয়া)

আজকে তো আমি বলবই।শুধুমাত্র তোমার জন্য আমি আজকে সবার কাছে খারাপ।তুমি আমাকে কিছু জানাতে দেও নাই।তুমি আমাকে ভালো বানাতে চেয়েছিলে কিন্তু সেই আমি ঠিকই সবার চোখে ঘৃণিত।(নিধিকা)

নিধিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল।

একদিন রাতের বেলা।বাড়ি ফিরতে বেশ দেরি হয়ে গেছিল এক বান্ধবীর জন্মদিনের কারণে।তখন মনে হয় আনুমানিক ১০ টা বাজে।শীতের সময় রাস্তাঘাট সব ফাঁকা।অনেকটা ভয় লাগছিল কিন্তু কি আর করার বাড়িতে তো যাওয়াই লাগবে।হঠাৎ করে দুইটা ছেলে এসে আমাকে টেনে ধরে।আমি ছাড়ানোর অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু পারছিলাম নাহ্।যতই হোক দুইটা ছেলের সাথে কখনোই একটা মেয়ে পারবে নাহ্।আমার মুখে রুমাল চেপে ধরে আমাকে অজ্ঞান করে ফেলে।আর জ্ঞান ফিরতে আমার আর বুঝতে বাকি থাকে না যে আমাকে ধর্ষণ করা হয়েছে।অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটা শুরু করলাম।ঠিকভাবে হাঁটতেও পারছিলাম নাহ্।তখন আমার সামনে একটা গাড়ি এসে দাঁড়ায় সেই গাড়িতে আর কেউ না আয়ান ছিল।আয়ান গাড়ি থেকে নেমে এসে আমার সামনে দাঁড়াল।

কি হয়েছে আপনার?(ভাইয়া)

আমি চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম।এতোটাই লজ্জা লাগছিল যে কথাও বলতে পারছিলাম নাহ্।

আপনার সাথে কি..আই মিন..(ভাইয়া)

আপনি যা ভাবছেন সেটাই।আমি রেপড হয়েছি।(নিধিকা)

ও মাই গড!আপনি আমার সাথে চলুন।(ভাইয়া)

আমি আয়ানের সাথে যেতে চাই না।এক প্রকার জোর করে আয়ান আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।ডাক্তাররা চিকিৎসা করে।আমি নিশা(নিধিকার বান্ধবী)-কে ফোন করে বলি।বাড়িতে যেন বলে দেয় আমি ওর সাথে হোস্টেলে আছি।ভার্সিটিতে একটা কাজ আছে কয়েকদিন থাকা লাগবে।দশ দিন পরে আমি মোটামুটি সুস্থ হয়ে যাই।তখন আয়ান এসে আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়।প্রথমে আমি কিছুতেই রাজি হয়নি।কিন্তু ও যখন আমাকে বলল,যে সে আমার ধর্ষণ হওয়ার কথা মিডিয়াতে জানাবে তখন আমার মুখের ভাষা হারিয়ে গিয়েছিল।সমাজের কথা ভেবে চুপ থাকতে হয়েছিল।বিশেষ করে আমার বাবা-মা যদি জানে তাহলে তারা আর বাঁচবে নাহ্।তখন থেকেই আমি আরাভের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দি।অনেক কষ্ট পেয়েছি তবে কিছু করার ছিল না।যতই হোক আমি তো একটা ধর্ষিতা।আরাভ কি আমাকে মেনে নিবে!একটা মানুষ কতটা ভালো হলে একজন ধর্ষিতাকে বিয়ে করতে চায়।এই ভেবে আয়ানের প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে যায়।তবে আমি আরাভকে আজও ভা…….

এইকথা বলে নিধিকা থেমে যায়।নিধিকার চোখে জল ভর্তি।বাড়ির সবারও এক অবস্থা।ভাইয়া এসে নিধিকাকে জড়িয়ে ধরে।আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে।ইচ্ছে করছে নিধিকাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে।তবে না এটা ঠিক না সে আমার ভাবি হয়।আর যাইহোক এই সম্পর্ক তো ভুলতে পারব নাহ্।

আম্মু গিয়ে নিধিকাকে জড়িয়ে ধরে।রিধিকাও আম্মুর সাথে জড়িয়ে ধরে।

মা রে তোকে কত ভুল বুঝেছি আমাকে মাফ করে দিস মা!(মা)

মা কি যে বলেন আপনি।(নিধিকা)

ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল নিধিকা।

আপু প্লিজ আমার উপর রাগ করে থকিস নাহ্।আমিও তোকে ভুল বুঝেছি।আর জিজুকে সবটা বলে দিয়েছি।(রিধিকা)

ধূর পাগলি একটা।তুই আমার একমাত্র বোন।তোকে আমি কি করে ভুল বুঝবো!আর তুই যা করেছিস ভালো করেছিস।এই বোঝা আমার আর সহ্য হচ্ছিল নাহ্।সবাইকে সবটা বলতে পেড়ে আমি অনেক খুশি।বাড়িতে গেলে আম্মু-আব্বুকেও সবটা বলে আসব।(নিধিকা)

হঠাৎ বাবা গিয়ে ভাইয়ার গালে একটা চড় মারল।

তুই একটা মেয়েকে রক্ষা না করে তাকে গিয়ে বলিস সব মিডিয়াতে জানিয়ে দিবি!তোকে আমি এই শিক্ষা দিয়েছি?(বাবা)

আসলে বাবা নিধিকাকে আমি প্রথম একটা কফি শপে দেখেছিলাম।আমি তখন থেকে ও কে ভালোবেসে ফেলি।আর তখন যখন ও কে ওই অবস্থায় দেখি তখন আমার মাথা ঠিক ছিল না।আমি ও কে বিয়ের প্রস্তাব দিলে ও রাজি হয় না।যার ফলে আমি নিধিকাকে ওই কথা বলতে বাধ্য হয়েছিলাম।আর বিশ্বাস করো বাবা আমি যদি আগে জানতাম নিধিকা আরাভকে ভালোবাসতো জীবনেও আমি এমন করতাম নাহ্।(ভাইয়া)

আর আরাভ আমি সেদিন তোমাকে মিথ্যা বলেছিলাম।বিয়ের আগে কখনোই আমি তোমাদের বাড়িতে আসি নাই।আমি বিয়ের দিনই প্রথম জেনেছিলাম যে তুমি আয়ানের ছোট ভাই।আয়ান তোমাকে ইশারায় দেখিয়ে বলেছিল।(নিধিকা)

কথাগুলো বলে নিধিকা নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।আমি গিয়ে ওর হাত দুটো ধরে বললাম,

আই এম সরি নিধিকা না মানে ভাবি।তবে হ্যাঁ আমি এখন আর তোমাকে আপনি বলব নাহ্।আর মায়াবীনি ভাবি বলে ডাকব।আর শোনো আমাদের মাঝে আগে যা ছিল সেটা অতীত।তুমি বর্তমানে আমার ভাইয়ের স্ত্রী।সো তুমি কিন্তু আমার একমাত্র ভাবি।(আমি)

হুম দেবর জি।আর আপনি আমার একমাত্র দেবর।(নিধিকা)

দুজনে হেসে দিলাম।দুজনের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।দুজনের মনে কতো কথা ঘুরে বেড়াচ্ছে কিন্তু বলার দিনটা এখন আর নেই।

ভাই প্লিজ আমাকে মাফ করে দে।আমি সত্যি আগে এইসব জানতাম নাহ্।তুই আর নিধিকা যে একে অপরকে ভালোবাসিস।তুই চাইলে নিধিকাকে….(ভাইয়া)

আমি ভাইয়ার কথা থামিয়ে দিয়ে বললাম,

ভাইয়া যা বলেছো আর না।এখন আমি একা নেই।আমার স্ত্রী আছে।এটা কোনভাবেই সম্ভব না।রিধিকা তো কোন দোষ করে নাই।আমি কখনোই রিধিকাকে ছাড়তে পারব নাহ্।আর ক্ষমার কথা বলছো!তোমার ক্ষমা চাওয়ার কোন মানেই নেই।তুমি মায়াবীনির সবচেয়ে কঠিন সময় তার পাশে ছিলে।এটাই আমার কাছে অনেক।ইনশাআল্লাহ তোমরা অনেক সুখী হবে।(আমি)

আমি রুমে চলে আসলাম।খুব কান্না পাচ্ছে আবার ভালোও লাগছে।যাক আমি যাকে ভালোবেসেছিলাম সে তো ভুল ছিল নাহ্!সে আসলেই আমাকে ভালোবাসতো।না জেনে কত কি না বলেছি মেয়েটাকে।আল্লাহ আমাকে মাফ করো।

রিধিকা রুমে এসে চুপচাপ বসে আছে।

রিধিকা কিছু বলবে?(আমি)

না মানে আপনি রাতে খাবেন না?(রিধিকা)

তুমি কি এটা বলতেই এসেছো?(আমি)

না মানে আরেকটা কথাও ছিল।(রিধিকা)

হুম বলো।(আমি)

আচ্ছা আপুকে তো মায়াবীনি ডাকেন!আমাকে কি কোন নাম দেওয়া যায় নাহ্।(রিধিকা)

রিধিকার কথায় মুচকি হাসি দিলাম।

তোমার জন্য তো চিকন প্রাণীই ঠিক আছে।(আমি)

ধূর এগুলো না।অন্যরকম।(রিধিকা)

এখন মাথায় আসছে নাহ্।পরে বলব নে।(আমি)

খেতে আসুন।(রিধিকা)

রিধিকা মুখটা কালো করে নিচে চলে গেল।

এভাবে পাঁচ দিন কেটে গেল।আজকে সকালে ভাইয়া আর ভাবি আমার শ্বশুরবাড়ি গিয়েছে মানে ভাইয়ার শ্বশুরবাড়ি।ধ্যাত ভাইয়া আর আমার শ্বশুরবাড়ি তো একই।এখন নিধিকার সাথে আমার সম্পর্কটা অনেক স্বাভাবিক হয়ে গেছে।এখন বর্তমানে আমরা একটা হ্যাপি ফ্যামিলি সব মিলিয়ে।

তবে রিধিকার আচরণ ইদানীং ঠিক লাগছে নাহ্।কেমন জানি অন্যরকম ভাব।কেমন জানি একটা গন্ধ পাচ্ছি!এটা কি তবে………..(থাক আর বলব নাহ্)

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here