প্রেম_ফাল্গুন #পর্ব_৩৬

#প্রেম_ফাল্গুন
#পর্ব_৩৬
#নিশাত_জাহান_নিশি

হ্যাঁ সূচক সম্মতি জানিয়ে ববি প্রস্থান নিলো। সাহেরা খাতুনের থেকে বিদায় নিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে ববি রওনা হয়ে গেলো।

রাত ১১ টা। ঘুম থেকে হুড়মুড়িয়ে উঠেই লিলি ভয়ার্ত চোখে দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালো। ঘন্টার কাটা টিকটিক শব্দে ১১ টায় পৌঁছালো। বুকটা ও অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল লিলির। কপাল থেকে শুরু করে গলা অব্দি পুরো অবয়ব জুড়ে ধরধরিয়ে ঘাম ঝড়ছে লিলির। অবিরত শুকনো ঢোক গিলে লিলি মিহি দৃষ্টিতে শব্দ যুক্ত ব্যালকনীর দরজাটায় তাকালো। বৈরী বাতাসের প্রভাবে ব্যালকনীর দরজাটা কটকট শব্দে বেসামালভাবে এদিক ওদিক হচ্ছে। আদ্র বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে রুমের প্রতিটা আনাচে-কানাচে। হিম শীতল ঠান্ডায় লিলির সর্বাঙ্গ অকস্মাৎ কেঁপে উঠল। হাঁটু ভাজ করে লিলি সিল্ক শাড়ির আঁচলটা দিয়ে কাঁধ অব্দি পুরো হাত জোড়া ঢেকে নিলো। বেডের ডান পাশে থাকা জানালার থাই গ্লাসে জড়ানো পোলাপী রঙ্গের বাহারী ফুলের পর্দাটা ও ব্যালকনীর দরজা দিয়ে হুড়মুড়িয়ে আসা বাতাসের তান্ডবে উন্মুক্ত ভাবে উড়ছে। সেই পর্দার একটা অংশ লিলির কানের লতিতে এসে বারি খাচ্ছে!

বুকের অসহ্য ধুকপুকানি সহ্য করতে না পেরে লিলি বসা থেকে উঠে বুকে হাত দিয়ে রুমের লাইটটা অন করল। কাঁপা শরীরে ধীর পায়ে হেঁটে সে বালিশের তলা থেকে ফোনটা বের করে ববির নাম্বারে ডায়াল করল। প্রথম রিং অবলীলায় বেজে গেলো। ওপাশ থেকে ববি কলটা রিসিভ করে নি। দ্বিতীয় বার ট্রাই করতেই তৎক্ষনাৎ ববি কলটা রিসিভ করল। উত্তেজিত হয়ে লিলি গলা জড়ানো স্বরে উর্ধ্ব আওয়াজে বলল,,

“এই কোথায় আপনি? কোথায় আপনি?”

ববি বেশ ব্যস্ত স্বরে বলল,,

“এইতো, বাড়ির কাছাকাছি। ঝড়, বৃষ্টির জন্য একটু দেরি হয়ে গেলো। প্লিজ বি কুল লিলি। আই উইল ব্যাক ইন ফাইভ মিনিটস!”

ববির গলার আওয়াজের চেয়ে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের আওয়াজটাই বেশি বাজছে লিলির কানে। অস্পষ্ট ভাবে কিছুটা ভেঙ্গে আসছে ববির মুখ থেকে নিঃসৃত সবক’টা শব্দের আওয়াজ। নিজেকে স্থির করে লিলি চোখ বুজে শান্ত স্বরে বলল,,

“আস্তে ধীরে ড্রাইভ করে আসুন। তাড়াহুড়ো করার কোনো প্রয়োজন নেই। ড্রাইভ করার সময় ফোনে কথা বলতে নেই। কলটা কাটুন।”

ববি মৃদ্যু হেসে বলল,,

“লাভ ইউ বউ।”

লিলি প্রতিত্তুরে কিছু না বলেই কলটা কেটে দিলো। ফুঁফিয়ে কেঁদে লিলি চুপটি করে পড়ার টেবিলে চেয়ারটা টেনে বসে পড়ল। ভয় জমেছে তার মনে। সাথে অপরিমেয় বিষাদের ছায়া ও। বৃষ্টি শুধু স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে কষ্ট কমাতেই পারে না, বরং বাড়াতে ও পারে। নিঃসন্দেহে ভয়, ভীতি মনে ধরিয়ে দিতে পারে। দুর্ঘনটার ভয়ে জনজীবনকে গ্রাস করতে পারে!

তন্মধ্যেই রুমের দরজায় ঠকঠক করে শব্দ হলো। কান্না থামিয়ে লিলি চোখের জল মুছে দরজার খিলটা খুলে দিলো। সাহেরা খাতুন হুড়মুড়িয়ে রুমের ভেতর প্রবেশ করে লিলির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্ন স্বরে ক্রমাগত প্রশ্ন ছুড়ে বললেন,,

“বাইরে তো খুব ঝড়, বৃষ্টি হচ্ছে লিলি। ববি এখনো ফিরল না কেনো? ববিকে কল করেছিলে? কোথায় আছে আমার ছেলেটা?”

লিলি জোরপূর্বক হেসে সাহেরা খাতুনের ডান হাতটা শক্ত করে ধরে শান্তনা পূর্বক স্বরে বলল,,

“আপনার ছেলে আসছে আম্মু। হয়তো চলে ও এসেছে৷ দেখবেন, একটু পরেই কলিং বেল বেজে উঠবে। দয়া করে আপনি দুঃশ্চিন্তা করবেন না আম্মু, অতো ব্যস্ত ও হবেন না। আপনার ছেলে ভালো আছে, সুস্থ আছে, সেইফে আছে।”

সাহেরা খাতুনকে বুঝিয়ে শুনিয়ে লিলি জোর পূর্বক উনাকে ঘুম পাড়িয়ে দিলো। মনে প্রবল ভয়, আতঙ্ক, উদ্বিগ্নতা নিয়ে লিলি সাহেরা খাতুনের রুম থেকে প্রস্থান নিতেই কলিং বেল বেজে উঠল। ফট করে সদর দরজার দিকে সম্ভাবনাময় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে লিলি দৌঁড়ে গিয়ে সশব্দে সদর দরজাটা খুলে দিলো। ববি সিক্ত শরীরে মুচকি হেসে লিলির দিকে তাকিয়ে আছে। সমস্ত শরীর তার ঝমঝম বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। চুল বেয়ে সূক্ষ্ম জলের চলমান ফোঁটা গুলো প্রবাহিত হচ্ছে দেহের প্রতিটা অঙ্গে প্রতঙ্গে। শুকনো মুখে অফিসের ব্যাগটা নিবার্ক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লিলির হাতে ধরিয়ে ববি পা থেকে সু জোড়া খুলছে আর ব্যতিব্যস্ত স্বরে বলছে,,

“কি প্লাবন শুরু হলো। মানব জীবন জনাজীর্ণ হয়ে উঠছে। বর্ষা রাণীর তেজর্শিনী রূপ সত্যিই মানা যাচ্ছে না!”

লিলি দীর্ঘ একটা স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে ববিকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে গলা জড়ানো স্বরে বলল,,

“কেনো এতো টেনশানে রাখলেন আমায় বলুন তো? দম বন্ধ হয়ে আসছিলো আমার। অজানা ভয়ে বুকটা কাঁপছিলো। আম্মু তো আরো বেশি টেনশান করছিলেন। একটু আগেই আম্মুকে জোর করে ঘুম পাড়িয়ে এলাম।”

লিলির মাথায় অসংখ্য চুমো খেয়ে ববি নরম স্বরে বলল,,

“এতো ভয় পাওয়ার কি ছিলো লিলি? আমার মতো এমন লক্ষাধিক কর্মঠ পুরুষ এই প্রাকৃতিক ঝড়, বৃষ্টিকে উপেক্ষা করেই নিজের কর্মস্থলে যাচ্ছে এবং পরিবারের দো’আয়, আল্লাহ্ র মেহেরবানীতে ধীরে, সুস্থে, নিরাপদে বাড়ি ফিরে আসছে। আল্লাহ্ র উপর ভরসা রাখতে হয় বুঝলে? এভাবে ঘাবড়ে গেলে আল্লাহ্ র উপর আস্থা রাখলে কই বলো?”

লিলি অশ্রুসিক্ত চোখে ববির দিকে তাকালো। কপাল কুঁচকে ববি লিলির চোখের কার্ণিশে জমে থাকা অশ্রুকণা গুলো মুছে দিয়ে কর্কশ স্বরে বলল,,

“ডোন্ট ক্রাইং ওকে? হিম্মত রাখবে হবে। এতো ছোট কলিজার হলে ভবিষ্যতে এতো বড় বড় ধাক্কা গুলো সামলাবে কিভাবে? দায়িত্ববোধ গুলো অনায়াসে পালন করবে কিভাবে? কতো দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার আছে তোমার। মন- মানসিকতা এবং সাহসিকতা এই দুটোকেই প্রশ্বস্ত করতে হবে। কোনো টান পোড়নে ভুগলে হবে না।”

লিলি মলিন হাসল। অফিসের ব্যাগ হাতে নিয়ে বেড রুমে প্রবেশ করল। ববি ভেজা সু জোড়া হাতে নিয়ে সরাসরি ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষনের মধ্যে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে ববি লিলিকে নিয়ে রাতের ডিনার কমপ্লিট করল। সাহেরা খাতুনকে ঘুমন্ত অবস্থায় এক পলক দেখে ববি পুনরায় বেড রুমে প্রবেশ করল।

রাত ১২ টা। ক্লান্তির কারণে ববি আজ লিলিকে গাইড করতে পারে নি। বিছানায় উবুড় হয়ে শুয়ে ববি ওয়াশরুম থেকে সদ্য বের হয়ে আসা লিলিকে উদ্দেশ্য করে ভ্রু উঁচিয়ে সন্দিহান স্বরে বলল,,

“আই থিংক লিলি, তুমি একটা জিনিস ভুলে গেছ!”

লিলি কপাল কুঁচকে জিগ্যাসু স্বরে বলল,,

“কি?”

ববি শোয়া থেকে উঠে বিছানায় আসাম পেতে বসল। চরম আশ্চর্যিত হয়ে লিলির দিকে তাকিয়ে বলল,,

“সিরিয়াসলি লিলি? তুমি সত্যিই ভুলে গেছো?”

অনেক ভাবনা চিন্তার পর লিলি বাঁকা হেসে ববির মুখের সামনে হাত পেতে ভ্রু নাচিয়ে বলল,,

“কদম গুচ্ছ কোথায় হুম?”

ববি ভাবশূণ্য হয়ে বেডের কার্ণিশে মাথা ঠেকিয়ে পা দুলিয়ে বলল,,

“উহুহু। ভুলে গেছি৷ এতো কিছু মনে থাকে নাকি?”

লিলি তেড়ে এসে ববির গলা চেঁপে ধরে তেজর্শিনী স্বরে বলল,,

“কি বললেন? ভুলে গেছেন আপনি?”

গলা থেকে লিলির হাতটা ছাড়িয়ে ববি লিলির থুতনী চেঁপে ধরে রুক্ষ স্বরে বলল,,

“মেরে ফেলতে চাও আমাকে? সামান্য কদম ফুলের জন্য?”

লিলি আধো স্বরে বললেন,,

“আপনি বলেছিলেন, কদম নিয়েই বাড়ি ফিরবেন!”

ববি মোহিত হয়ে মুহূর্তের মধ্যে লিলির গোলাপী ঠোঁট জোড়া দখল করে অস্পষ্ট স্বরে বলল,,

“কদম নিয়েই বাড়ি ফিরেছি। জানো এই ফুলের জন্য কতোটা হেনস্তা হতে হয়েছে? ঝড়, বৃষ্টি ঠেলে গাড়ি নিয়ে সাভারের প্রতিটা ফ্লাওয়ার শপ ঘুড়ে অবশেষে কদম গুচ্ছের দেখা মিলেছে। আর আজ এর জন্যই বাড়িতে ফিরতে ১১ টা প্লাস বেজে গেলো, ঝড়, বৃষ্টিতে সিক্ত হয়ে বাড়ি ফিরতে হলো।”

লিলি প্রেমসিক্ত দৃষ্টিতে ববির দুচোখে তাকালো। মৃদ্যু হেসে ববির ঠোঁট জোড়া তীব্রভাবে দখল করে লিলি চোখ জোড়া বুজে নিলো৷ কিছুক্ষন পর লিলিকে ছেড়ে ববি ভেজা ঠোঁট জোড়া মুছে লিলির দিকে তাকিয়ে বলল,,

“অফিসের ব্যাগটা নিয়ে এসো।”

লিলি মৃদ্যু হেসে দৌঁড়ে আলমারি থেকে অফিস ব্যাগটা নামিয়ে ববির মুখোমুখি বসল। উত্তেজিত হয়ে লিলি ব্যাগের চেইনটা খুলতেই গুচ্ছভরা কদম ফুল দেখতে গেলো। চোখ বুজে লিলি নাক টেনে কদম ফুলের ঘ্রাণ নিয়ে মাতাল করা স্বরে বলল,,

“কতো বছর পর কদম ফুলের ঘ্রাণ নিলাম। গ্রামে থাকতে তো রোজই এই বর্ষার মৌসুমে কতো শতো কদম গুচ্ছ যে খোঁপায় গুজেছি তার কোনো ইয়ত্তা নেই।”

হেচকা টানে ববি লিলিকে তার সামনে বসিয়ে দিলো। লিলির পিঠের পেছনটায় বসে ববি ছোঁ মেরে লিলির হাত থেকে কদম গুচ্ছ ছিনিয়ে লিলির খোঁপায় গুজে দিয়ে মুগ্ধিত স্বরে বলল,,

“নাও পার্ফেক্ট৷ গুচ্ছভর্তি কালো খোঁপায় এক গুচ্ছ কদম ফুল। অভিভূত আমি, অভিষিক্ত আমি, তোমার সোজা শাপ্টা এই হৃদয় ভুলানো সাজে!”

লিলি লজ্জা রাঙ্গা হাসি দিলো। চোখে আসক্তি নিয়ে ববি লিলির ঘাঁড়ে মুখ ডুবিয়ে ছোট ছোট চুমোতে লিলিকে ভরিয়ে দিচ্ছিলো। কম্পিত স্বরে লিলি মাথা নিচু করে ছোট আওয়াজে ববিকে উদ্দেশ্য করে বলল,,

“ববি?”

ববি ঘোর লাগা স্বরে বলল,,

“হুম?”

“আপনার কাছে একটা আবদার ছিলো!”

“বলো?”

“আমি গ্রামে যেতে চাই। শুধু আমি না, পরিবারের সবাইকে নিয়ে যেতে চাই। মেহের ভাবী, আয়রা আপু সবাইকে নিয়ে। আম্মু, আব্বু খুব রিকুয়েস্ট করছেন আমায়, একবার আপনাদের নিয়ে গ্রামে যেতে।”

ফট করে লিলির ঘাঁড় থেকে মুখ উঠিয়ে ববি কর্কশ স্বরে বলল,,

“আবার তুমি বায়না ধরছ লিলি? আবার গ্রামে যেতে চাইছ?”

লিলি পিছু ঘুড়ে কান্না জড়িত স্বরে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে ববির দিকে তাকিয়ে বলল,,

“বায়না কিসের ববি? আমার কি ইচ্ছে জাগে না? নিজের বাপের বাড়ি যেতে? বাবা-মায়ের সাথে পর্যাপ্ত সময় কাটাতে? তাদের সাথে কয়েকটা রাত একসঙ্গে থেকে আসতে? কয়েকটা সুন্দর মুহূর্ত কাটিয়ে আসতে? তাদের দুচোখ ভরে দেখে আসতে, নিজের জন্মস্থানকে একবার কাছ থেকে দেখে আসতে?”

ববি চোয়াল শক্ত করে লিলির থুতনী চেঁপে ধরে বলল,,

“রিফাত আছে ঐ গ্রামে। ঐ স্ক্রাউন্ডেল রিফাত আছে, যে তোর ক্ষতি করতে চায়। তুই বার বার ভুলে যাস কেনো?”

“রিফাত তো এখন বিবাহিত ববি। ঘরে সুন্দুরী বউ আছে। অন্তত আমার তো মনে হয না ঘরে এতো সুন্দুরি বউ থাকতে রিফাত আমার দিকে চোখ তুলে তাকাবে, আমার কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করবে।”

“ঘরে হাজার সুন্দুরী বউ থাকলে ও লুচু স্বভাবের লোকদের ছুকছুকানি কমে না। রিফাতের ও কমে নি। তোমাকে দেখলেই সে আবার তোমার ক্ষতি করতে চাইবে।”

“আপনি তো আমার সাথে থাকবেন ববি। রিফাত আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”

লিলির থুতনীটা ছেড়ে ববি তেজী স্বরে বলল,,

“নতুন জব আমার। একটা স্বনামধন্য ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যানেজার আমি! তোমার কি মনে হয়? আমি চাইলেই দায়িত্ব কর্তব্য ভুলে তোমার সাথে কয়েকদিনের জন্য তোমার বাপের বাড়ি যেতে পারি?”

লিলি এবার হেচকি তুলে কেঁদে দিলো। কান্নাসিক্ত স্বরে লিলি চোখ তুলে ববির দিকে তাকিয়ে বলল,,

“আম্মু, আব্বু খুব রিকুয়েস্ট করছিলেন। একবার গ্রামে যেতে, আপনার পুরো পরিবার নিয়ে। বিয়ের চার বছর হতে চলল অথচ, এই পর্যন্ত একবার ও আপনাদের কাউকেই হাত ধোঁয়াতে পারে নি আমার পরিবার। মেয়েকে এক নজর দেখার জন্য নিজেরাই নির্লজ্জের মতো তিন থেকে চার বার এসে আপনাদের বাড়িতে থেকে গেছে, খেয়ে গেছে। আপনিই বলুন না? আমার বাবা-মায়ের কি আত্নসম্মান বোধ নেই? তাদের কি আশা থাকতে পারে না একবার মেয়ের শ্বশুড় বাড়ির লোকদের খাওয়ানোর? তৃপ্তি ভরে মেয়ের জামাইয়ের সেবা, যত্ন করার? আদর আপ্যায়ন করার?”

ববির রাগ শিথিল হয়ে এলো। লিলির অশ্রুসিক্ত চোখে ববির বড্ড এলার্জি। কিছুতেই লিলির চোখের জল সে সহ্য করতে পারে না। নরম হয়ে ববি হেচকা টানে লিলিকে বুকের পাজরের সাথে মিশিয়ে কোমল স্বরে বলল,,

“কাঁদতে হবে না। অনেক হয়েছে। আমি দেখছি কি করা যায়।”

দম নিয়ে ববি পুনরায় জিগ্যাসু স্বরে বলল,,

“আচ্ছা তুমিই বলো, আমার পুরো পরিবার যদি গ্রামে যায়, তখন এতো লোকদের তোমরা থাকার জায়গা দিবে কোথায়? এতো দূরের পথ মিনিমাম ধরো আমাদের ২ থেকে ৩ দিন তো থাকতেই হবে। এই দুটো রুমে এতো লোককে তোমরা জায়গা দিতে পারবে?”

লিলি মাথা উঠিয়ে উৎসুক দৃষ্টিতে ববির দিকে চেয়ে বলল,,

“আমাদের বড় পুকুরের পাড় যে ১ করা জমিটা ছিলো? কিছু দিন হলো আব্বু সেই জমিটা বিক্রি করে দিয়েছেন। সেই টাকা দিয়ে আমাদের বাড়িতে আরো দুটো রুম বাড়ানোর চিন্তা করেছেন। আপনারা সবাই যদি নড়াইল যেতে রাজি হোন, তাহলে আব্বুকে জানালে আব্বু কাল, পরশুর মধ্যেই বাড়ির কাজ ধরবেন। শুধুমাএ আপনাদের জন্যই আব্বু জমিটা বিক্রি করে রুম বাড়াতে চাইছেন। ওখানে গেলে যেনো আপনাদের থাকা, খাওয়ায় কোনো অসুবিধে না হয়! আব্বু তো স্ব-চক্ষে দেখে গেছেন আপনাদের অবস্থা! আপনারা যে আমাদের গ্রামীণ পরিবেশে গেলে নিজেদের ঠিকভাবে খাপ খাওয়াতে পারবেন না, থাকতে, চলতে পারবেন না, সেই জন্যই আব্বু এই উদ্যোগ নিয়েছেন! আপনাদের কম্পোর্টেবল ফিল করানোর জন্যই আসলে বাড়িতে একটু পরিবর্তন আনতে চাইছেন।”

ববি মৃদ্যু হেসে বলল,,

“দেট’স গ্রেট। অন্তত আপু তোমাদের দিকে কোনো আঙ্গুল তুলতে পারবেন না। তোমাদের ছোট করতে পারবেন না। আপুর কুচুটে স্বভাবটা এবার দমেই যাবে।”

চোখের জল মুছে লিলি ভীষণ প্রফুল্লিত হয়ে ডেস্কের উপর থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে খুব ব্যতিব্যস্ত হয়ে ফোনে স্ক্রলিং করে ববিকে বলল,,

“দাঁড়ান, এক্ষনি আমি আব্বুকে কল করে খবরটা জানিয়ে দিচ্ছি। যতো দ্রুত সম্ভব বাড়ির কাজ ধরতে বলছি।”

লিলির হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে ববি তেড়ে উঠে বলল,,

“ক’টা বাজে এখন দেখেছ? এই রাত দুপুরে তুমি আব্বুকে কল করে অযথা টেনশান বাড়াতে চাইছ?”

লিলি মুখটা ভাড় করে বলল,,

“তাও ঠিক!”

বাঁকা হেসে ববি লিলিকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শুয়ে পড়ল। লিলির গাঁয়ের উপর উঠে ববি চোখ বুজে লিলির ঘাঁড়ে মুখ ডুবিয়ে জিগ্যাসু স্বরে বলল,,

“আব্বুর বিকাশ নাম্বার আছে?”

“লিলি কম্পিত স্বরে বলল,,

“হুম আছে।”

লিলি পুনরায় কৌতুহলী হয়ে বলল,,

“কেনো?”

লিলির ঘাঁড়ের কাছটায় ছোট একটা বাইট বসিয়ে ববি চোখ তুলে লিলির দিকে তাকিয়ে বলল,,

“আব্বুর বিকাশ নাম্বারে কিছু টাকা পাঠাবো তাই!”

লিলি কপাল কুঁচকে বলল,,

“মানে?”

“মানে খুব সিম্পল। আব্বুর জমি বিক্রির টাকা সহ আমার কিছু টাকা একএ করে ২ টো রুমের সাথে আরো ১ টা বাড়াতে হবে তাই!”

লিলি অবাক স্বরে বলল,,

“দুটো রুম বাড়ালে হবে না?”

“না হবে না। শ্বশুড় বাড়ি গিয়ে ও আমি আমার বউকে ছাড়া কারো সাথে রুম শেয়ার করে থাকতে পারব না। তাছাড়া এমনিতেও রুম আরো একটা বাড়ানো দরকার। কারণ, আমরা যখন নড়াইল যাবো তখন নিশ্চয়ই একা যাবো না, গোটা পরিবার নিয়ে যাবো। আপুর শ্বশুড় বাড়ির সবাই ও যাবে। হয়তো জুবায়ের আঙ্কেলের পরিবার ও যাবেন। একটা ট্রিপের মতো হবে। তখন যেনো থাকার কোনো অসুবিধে বা কষ্ট না হয় সে দিকটাই ভাবছি। শ্বশুড় বাড়ির জামাই হিসেবে এই দিকটা ভাবা আমার কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে।”

“ববি প্লিজ। শ্বশুড় বাড়ির কোনো দিক নিয়ে আপনার ভাবতে হবে না। জামাইয়ের কোনো দায়িত্ব ও আপনাকে পালন করতে হবে না। এমনিতেই আপনি অনেক করছেন আমার জন্য। বছরের পর বছর আমার পড়ালেখার খরচ চালিয়ে আসছেন। হয়তো ভবিষ্যতে ও চালাবেন। কতো টাকা খসে যাচ্ছে আপনার বলুন তো? এদিকে তো আপনি জব পাওয়ার পর থেকেই আলাদা ফ্ল্যাট কেনার জন্য টাকা রিজার্ভ করছেন। আমি চাই না সেই ফ্ল্যাট কেনার টাকা থেকে আপনি আমার পরিবারের জন্য আর একটা টাকা ও খরচ করুন।”

ববি কটমট চোখে বলল,,

“তোমার কমান্ড অনুযায়ী আমি চলব না ওকে? কথাটা ভালো করে মাথায় ঢুকিয়ে রাখো। আমার যা ভালো মনে হবে এবং ঠিক মনে হবে আমি অবশ্যই তাই করব। কারো কমান্ডে চলব না আমি! প্রয়োজনে তুমি আমার কমান্ডে চলবে। আমি যা আদেশ করব তুমি ঠিক তাই শুনবে এবং তাই করবে। যেমন, এখন আমি আদেশ করব চুপ করতে। তুমি একদম চুপ হয়ে যাবে, একদম চুপ।”

লিলি ঠোঁট উল্টে বলল,,

“এজ ইউর উইশ।”

পরমুহূর্তে লিলি পুনরায় উদ্বিগ্ন স্বরে বলল,,

“আচ্ছা? মামুকে রাজি করাবেন কিভাবে? নড়াইল যেতে তো মামুর কড়া নিষেধ আছে! তাছাড়া হেমা আপু ও হয়তো রাজি হবেন না!”

“সেই দায়িত্ব আমার ওকে? তোমাকে অসব নিয়ে ভাবতে হবে না। সবদিক আমি ম্যানেজ করে নিবো।”

লিলি মৃদ্যু হেসে ববির দিকে তাকালো। ববি দুষ্টু হেসে লিলির ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো। লিলিকে আবারো আপন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। ববির দেহ এবং মন প্রখর রোমাঞ্চে ভরে আছে। সেই প্রখর রোমাঞ্চের বশবর্তী হয়েই ববি লিলিকে রোমাঞ্চতায় ভরিয়ে দিচ্ছে। ঝমঝম শব্দে বৃষ্টি রাণী সমগ্র ধরিনীকে দাপিয়ে রেখেছে। বিজলি রাণী কিছুক্ষণ পর পর তীক্ষ্ণ ভাবে গর্জে উঠছে৷ ঝড়ো হাওয়ায় থাই গ্লাসে ছিটকে পড়ছে অবাধ্য বৃষ্টির ফোঁটারা। সেই ছুঁয়ে পড়া ফোঁটাদের মতোই ববির ভালোবাসা ছুঁয়ে ছুঁয়ে পড়ছে!

,
,

দীর্ঘ দু বছর পর।
লিলির ফোর্থ ইয়ার ফাইনাল এক্সামের প্রিপারেশন চলছে খুব তোড়জোড়ে। এই তো এক্সামের ৩ মাস আগেই লিলি তার শ্বশুড় বাড়ির সবাইকে নিয়ে সাথে জুবায়ের আহমেদের পরিবারকে নিয়ে ও তৃতীয় বারের মতো নড়াইল থেকে ঘুড়ে এসেছে। মেহেরের পুরো পরিবার, আয়রার আনুমানিক ২ বছরের ছেলে “তীব্র” সহ আয়রার শ্বশুড়, শ্বাশুড়ী, ননাশ এবং ননাশের হাজবেন্ড। এবার অবশ্য খায়রুল আহমেদ ও তাদের সাথে গিয়েছিলেন। উনার যাওয়ার একমাএ কারণ ছিলো, “গয়না এবং কুমকুম।” দু আমেরিকা ফেরত মেয়েদের বাহানাতেই বাধ্য হয়ে উনার নড়াইলে যেতে হয়েছিলো। টানা ৩ দিন ওখানে বেড়াতে হয়েছিলো। গ্রামীণ পরিবেশের সাথে খাঁপ খাওয়াতে হয়েছিলো। মন থেকে লিলির পরিবারকে মানতে ও হয়েছিলো।

২ মাস পূর্বেই গয়না এবং কুমকুম তাদের ছেলে, মেয়ে এবং হাজবেন্ডদের নিয়ে আমেরিকা ব্যাক করেছে। গয়নার ৩ বছরের মেয়েটার নাম হলো “জারা।” কুমকুমের ৫ বছরের ছেলেটার নাম হলো “জুবান” এবং ২ বছরের মেয়েটার নাম হলো “জিদনি।” পুরো পরিবারের সাথে ভীষণ হৈ-হুল্লোড়ে এক মাস কাটিয়ে গেছে তারা। নড়াইল গিয়ে ও তারা লিলির পরিবারের সাথে প্রতিটা মুহূর্ত খুব এন্জ্ঞয় করেছে। নদীতে মাছ ধরেছে, হাওর বাওড়ে সাঁতার কেটেছে, মাটির চুলোয় রান্না করেছে, ঘন্টার পর ঘন্টা গ্রামের মেঠো পথ ধরে হেঁটেছে। ধান ক্ষেতের চিকন লাইল ধরে এক পায়ে হেঁটেছে, গ্রামের মেলায় ঘুড়তে গিয়েছে, হাওয়াই মিঠাই খেয়েছে, রোড সাইডের ফুচকা খেয়েছে, লিলির মায়ের হাতের বিশেষ স্বাদযুক্ত নানা ধরনের পিঠা পুলি, ক্ষীর, পায়েস খেয়েছে। মোদ্দা কথা, ধনী, গরীবের বৈষম্য ভুলে লিলির পরিবারকে আপন করে নিয়েছে।

রিফাত বিশেষ কোনো ক্ষতি করতে পারে নি লিলির। এমনকি লিলির বাড়ির আশেপাশে ও ঘেঁষতে পারে নি। ববি সারাক্ষন রিফাতকে চোখে, চোখে রেখেছে। যতোবারই রিফাত ছেলে ফেলে নিয়ে লিলিদের বাড়ির কাছে ঘেঁষতে চেয়েছিলো ববি ততোবারই ঢাকার পুলিশ, র‌্যাব, এমপিদের ভয় দেখিয়ে রিফাতকে দমিয়ে রেখেছিলো। সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় হলো নিজের এলাকায় থেকে ও রিফাত সত্যি সত্যিই ভয় পেয়ে গিয়েছিলো!

_______________________________________

লিলির ফোর্থ ইয়ার ফাইনাল এক্সামের মাএ ১৫ দিন বাকি আছে। আজকাল লিলি এবং ববি খুব ডিস্টার্বড হয়ে আছে। নিদারুন হতাশায় ভুগছে দুজনই। ব্যর্থতায় জনাজীর্ণ হয়ে লিলি যথেষ্ট ধ্যান দিতে পারছে না লেখাপড়ায়। কন্সেন্ট্রেশন ব্রেক হচ্ছে। ওদিকে ববির কর্মজীবনে ও তার শারীরিক অক্ষমতার প্রভাব পড়ছে দারুনভাবে। কিছুতেই সে কাজে মন দিতে পারছে না। বাবা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাকে তিলে তিলে ডিপ্রেশানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মানসিকভাবে ব্রেক ডাউন করছে।

সাহেরা খাতুন ও এখন লিলির আশেপাশে ঘেঁষতে চান না। লিলির থেকে যথেষ্ট দূরে থাকছেন, মাঝে মাঝে খুব খড়তড় ভাষায় ও কথা বলছেন, চট করে রেগে যাচ্ছেন, লিলির লেখাপড়া নিয়ে ও খোঁটা দিচ্ছেন। হেমার সাথে মিলে লিলিকে বিভিন্নভাবে অপদস্ত করার চেষ্টায় অটল আছেন। উনার এই আকস্মিক পরিবর্তন, তুখাড় রেগে যাওয়া এবং প্রচন্ড বিরক্তির একমাএ কারণ হলো লিলির প্রেগনেন্সি নিয়ে! লিলি এখনো সাহেরা খাতুনের কথা রাখতে পারে নি। দু বছর ধরে চেষ্টা করে ও সাহেরা খাতুনকে একটা নাতি বা নাতনীর মুখ দেখাতে পারে নি!

#চলবে….?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here