প্রিয়_অভিমান🥀🥀পর্ব~২

প্রিয়_অভিমান🥀🥀পর্ব~২
#ফাবিহা_নওশীন
||

রুহানি চুইংগাম চিবাতে চিবাতে দু’হাতে কাঁধের ব্যাগের বেল্ট ধরে ভার্সিটির ভেতরে ঢুকল। ঢুকেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। ফালাক গাড়ি থেকে নামছে। রুহানি দ্রুত আড়ালে লুকিয়ে গেল। লুকিয়ে ফালাককে দেখছে। ফালাক গাড়ি থেকে নেমে চাবি হাতে ক্যাম্পাসের দিকে যাচ্ছে। রুহানি বের হয়ে গাড়ির দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে কিছু একটা ভাবল। তারপর ব্যাগ থেকে একটা পিন বের করে গাড়ির চাকায় বসিয়ে দিল। কিন্তু পিন বেশি গভীরে যাচ্ছে না। সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে পিন ঢুকালো। তারপর আবারও কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ভালো মেয়ের মতো বন্ধুদের সাথে যোগ দিতে গেল।

ফালাক ক্লাস রুমের সামনে যেতেই দু’জন ছেলে এগিয়ে এল ওর দিকে। হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দিল।
একজন হাত বাড়িয়ে বলল,
“হ্যালো আমি শুভ।”

ফালাক ভ্রু কুঁচকে শুভকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিল। ফালাক সহজে কারো সাথে বন্ধুত্ব করে না। মানুষের সাথে কম মিশে। কিন্তু ভার্সিটিতে নতুন। কাউকে চিনে না তাই কিছু মানুষের সাথে পরিচয় হওয়া আবশ্যক।

ফালাক হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আমি জুনায়েদ ফালাক। আমাকে ফালাক বলে ডাকতে পারো।”

ফালাক, শুভ আর সোহানের সাথে পরিচয় পর্ব সেরে এক সাথে ক্লাস রুমে গেল। ক্লাস শেষে বাইরে বসে ওরা নিজেদের সম্পর্কে বলার পাশাপাশি ভার্সিটির নানা বিষয় নিয়ে কথা বলছে।

রুহানি ওর গ্যাংয়ের সাথে কেন্টিনে যাচ্ছে। ঝুঁটি করা চুল খুলে ছেড়ে দিল। তারপর মাথা নাড়িয়ে চুলগুলো ভালো ভাবে ছাড়িয়ে নিয়ে হাত দিয়ে চুল ঠিক করে নিল। ওর মাথায় যেন পোকারা কামড়াচ্ছে। কিছু একটা না করা পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছে না। ফালাক মাঠে ওর নতুন বন্ধুদের সাথে গল্প করছে। দুজনের চোখাচোখি হলো। রুহানি পানির বোতল বের করে এক ঢুক পানি পান করল। তারপর চোখ গেল এক মেয়ের দিকে।

.
সোহান বলল,
“এই ভার্সিটিতে না এলে জানতাম না মেয়েদের আচরণ এমন হয়। ভুল বললাম ও কোনো মেয়ে না। মেয়েরা এমন হয় না, পুরাই গুন্ডি। কাউকে শান্তি দেয় না। যা খুশি করে বেড়াচ্ছে।”

ফালাক হাত দিয়ে চুলে ব্রাশ করতে করতে বলল,
“আমাকে টার্গেট করেছিল উলটা পাগল বানিয়ে ছেড়েছি।”

শুভ আর সোহান ওর কথা শুনে চমকে গেল। বিস্ময় দৃষ্টি নিয়ে নড়েচড়ে বসে বলল,
“টার্গেট মানে?”

ফালাক বারান্দার দিকে যেতে যেতে বলল,
“যা করে তা-ই।”

ফালাক বারান্দার দিকে চলে গেল। শুভ আর সোহান কিছুই বুঝতে পারল না। ফালাক দোতলার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। রেলিঙে হাত রেখে নিচের দিকে ঝুঁকে আছে। একটা মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটার দিকে একবার দৃষ্টি দিয়ে আবারও নিচের দিকে তাকাল। মেয়েটা তখনও দাঁড়িয়ে আছে। ফালাকের মনে হচ্ছে কিছু বলবে। কিন্তু কি বলবে, আর কেই-বা মেয়েটা?
ফালাক সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মেয়েটার দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দিল। মেয়েটা কাচুমাচু করছে। মনে হচ্ছে কিছু বলতে চায়। কিন্তু কি বলতে চায়? আর এমনই বা করছে কেন?
মেয়েটা ফালাকের দিকে তাকাল। তারপর আবার দৃষ্টি নামিয়ে নিল। বাম হাতে ডান হাতের আঙুল ঘষছে।
“আমি আপনাকে কিছু বলতে চাই।”

ফালাক গম্ভীরমুখে বলল,
‘হ্যা, বলো।”

মেয়েটা আবারও কাচুমাচু করছে। হটাৎ চোখ বন্ধ করে নিল। চোখ বন্ধ করে বলল,
“আই লাভ ইউ।”

ফালাক বিস্ময়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে। মেয়েটা তখনও চোখ বন্ধ করে আছে। মনে হচ্ছে কেউ ওর মাথায় পিস্তল ধরে জোরপূর্বক বলিয়েছে।

“এই মেয়ে চোখ খোল।” ফালাকের গম্ভীর কন্ঠস্বর শুনে পিলে চমকে যাচ্ছে।
ফালাক আবারও বলল,
“চোখ খোল।”

মেয়েটা ধীরে ধীরে চোখ খুলে নিল। কিন্তু ফালাকের দিকে তাকাল না। দৃষ্টি নত করে রেখেছে।
“কে পাঠিয়েছে তোমাকে?”

ফালাকের কথা শুনে চোখ তুলে তাকাল। তারপর ফুপাতে ফুপাতে বলল,
“একটা দল। ওরা আমাকে টাস্ক দিয়েছে আপনাকে প্রপোজ করার। বিশ্বাস করুন আমি এ-সব বলতে চাই নি।”

ফালাক শান্তনা দিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমি বুঝতে পেরেছি। একটা কাজ করো তোমার হাত দেও।”

মেয়েটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল ফালাকের কথা শুনে তারপর ভয়ে ভয়ে হাত দিল। ফালাক কলম বের করে ওর হাতে একটা নাম্বার লিখে দিয়ে বলল,
“ওদের দেখাবে আর বলবে আমি তোমাকে আমার নাম্বার দিয়েছি। আশা করি ছেড়ে দিবে। ভয় পেও না।”

মেয়েটা চলে গেল। ফালাক শিওর এই কাজটা রুহানির। একটা মেয়েকে হয়রানি করছে আর পাশাপাশি ওকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে। রুহানিকে ও সোজা করে ছাড়বে।

রুহানি বন্ধুদের সাথে অপেক্ষা করছে। মেয়েটা কাচুমাচু হয়ে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রুহানি ওর সামনে এসে দাঁড়াল। মেয়েটা হাত বাড়িয়ে বলল,
“আমাকে নাম্বার দিয়েছে।”

রুহানি চমকে গেল। তারপর হাতের দিকে চেয়ে ফোন নাম্বার দেখে বলল,
“দেখেছিস কি ধড়িবাজ ছেলে! একটা মেয়ে প্রপোজ করল আর তাকে নিজের নাম্বার দিয়ে দিল। থার্ডক্লাশ ছ্যাচড়া।”

নুশা মেয়েটার হাত দেখে নাম্বারটা টুকে নিল।
“নাম্বার পেয়েছি। এইবার মজা হবে।”

মেয়েটাকে বিদায় করে দিল। মেয়েটা হাফ ছেড়ে বাঁচল।

~রুহানি ইন্ডাস্ট্রি~
রুহানির বাবার সাথে রুহানির মামার ব্যাপক তর্ক হচ্ছে।
“আমি দুধ-কলা দিয়ে তোর মতো কালসাপ পুষছি। আমি তোর বোনের জামাই ভুলে গেছিস?”
রুহানির বাবা ক্ষিপ্ত হয়ে রুহানির মামাকে বলল।

রুহানির মামা দাঁতে দাঁত চেপে উত্তর দিল,
“আপনিও তো ভুলে গেছেন আমি আপনার স্ত্রীর একমাত্র ছোট ভাই। আপনি ভুললে দোষ নেই। আমি ভুললেই দোষ। নিজের বেলায় ষোল আনা আর বাকি সবাই ফাও?”

রুহানির বাবা চেঁচিয়ে বলল,
“সাহেদ!! এর ফল ভালো হবে না।”

সাহেদ আঙুল তুলে বলল,
“এর ফল আসলেই ভালো হবে না। আপনার শেষ না দেখে আমি স্থির হয়ে বসব না। আপনার এত অহংকার! আপনার এই অহংকার আমি মাটির সাথে মিশিয়ে দেব। সব ধ্বংস করে দেব।”

“বের হয়ে যা তুই আমার চোখের সামনে থেকে।”

“আপনার ধ্বংসের কারণ সাহেদ হবে মনে রাখবেন।”

“আরে যা যা। তোর মতো পুঁটি মাছ আমার করবে কি? তুই কি করতে পারিস আমার জানা আছে।”

সাহেদ ফুসফুস করতে করতে চলে গেল। রুহানির বাবা টেবিলের উপর থেকে পানিভর্তি গ্লাস নিয়ে একবারেই পুরোটা শেষ করে দিল। গ্লাস রেখে কপালে হাত দিল। কপালে তার চিন্তার রেখা ফুটে উঠেছে। নিজের শালক বেইমানি করতে শুরু করেছে।

ফালাক ফোনে কথা বলছে,
“হ্যা, সব রেডি রাখুন। আমি পনেরো মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাব। সময় মতো জয়েন করব চিন্তা করবেন না।”

অপর পাশ থেকে বলল,
“স্যার, আপনি পারবেন তো?”

ফালাক আশ্বস্তের সুরে বলল,
“হ্যা অবশ্যই পারব। পারতে হবে। নয়তো কোম্পানির অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। বাবা এমনি অসুস্থ। তার টেনশন বাড়াতে চাই না।”

“ওকে স্যার।”

ফালাক ফোন কেটে দিল। দ্রুত গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিল। কিন্তু গাড়ি আগাচ্ছে না। ফালাক বারবার ট্রাই করেও পারছে না। ওকে দ্রুত যেতে হবে। কিন্তু এই গাড়ির কি হলো। ফালাক গাড়ি থেকে নেমে চেক করল। একটা চাকা হেলে আছে। আর চাকার গায়ে একটা পিন গাঁথা। ফালাক টান দিয়ে পিন বের করল।
তারপর বিড়বিড় করে বলল,
“রুহানি!”

ফালাক উঠে দাঁড়াল। রাগে শরীর ফেটে যাচ্ছে। হাতের মুঠো শক্ত করে বলল,
“রুহানি, যদি আমি সময় মতো পৌছাতে না পারি তবে যে আমি কি করব নিজেও জানি না। তোমাকে অনেক ছাড় দিয়েছি আর না। শুধু আজ আমার বিন্দুমাত্র ক্ষতি হোক তারপর তুমি দেখবে ফালাক কি করতে পারে।”

ফালাকের হাতে সময় নেই। ট্যাক্সি বুক করে যেতেও সময় লেগে যাবে। অফিসে পৌছাতে দেরি হয়ে যাবে।

শুভ দূর থেকে ফালাককে চিন্তিত দেখে সামনে এসে বলল,
“কোনো সমস্যা? ”

ফালাক শুভের দিকে চেয়ে বলল,
“আমার খুব জরুরী একটা কাজ পড়ে গেছে। পনেরো মিনিটের মধ্যে যেতে হবে কিন্তু কেউ একজন গাড়ির চাকার হাওয়া ছেড়ে দিয়েছে।”

শুভ সেদিকে তাকাল। চাকার অবস্থা খুবই খারাপ।
“ডোন্ট ওরি, আমার সাথে গাড়ি আছে। কোথায় যাবে বলো।”

“ধন্যবাদ শুভ। আমি ড্রাইভ করছি। তুমি তাড়াতাড়ি উঠ।”

ওরা গাড়িতে উঠে বসে। ফালাক স্পিডে গাড়ি চালাতে লাগলো।
“যাচ্ছো কোথায়?” শুভ আবার প্রশ্ন করল।

ফালাক সামনে দৃষ্টি রেখে বলল,
“অফিসে যাচ্ছি। গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিং আছে।”

শুভ ফালাকের কথা শুনে বলল,
“অফিস!”

ফালাক মুচকি হেসে বলল,
“বাবা হটাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ে তারপর সব দায়িত্ব আমার উপর বর্তায়। মূলত এই জন্যই এই ভার্সিটিতে এডমিশন নিয়েছি। যাতে অফিসে যেতে পারি। অফিস থেকে এই ভার্সিটিটাই সামনে। আমার আগের ভার্সিটিটা অফিসের উল্টো দিকে। অনেক দূর হয়ে যায় তাই আর কি।”

শুভ হালকা হেসে বলল,
“বুঝতে পেরেছি। বেস্ট অফ লাক।”

রুহানির ক্লাস টেস্টের খাতা ওর চোখের সামনে ধরে রেখেছে স্যার।
“এই তোমার টেস্টের মার্ক? ছয় পেয়েছো। ছিহ!”

রুহানি মাথা নিচু করে রেখেছে। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। এতগুলো মানুষের সামনে এভাবে না বললে হতো না। মনে মনে স্যারের চৌদ্দ গোষ্ঠি উদ্ধার করছে।

“কি হলো রুহানি? টেল মি। ঠিক আছে এই খাতা তোমার বাবার কাছে যাবে।”

রুহানি স্যারের কথা শুনে বলল,
“নো নো স্যার। এটা করবেন না। তাহলে বাবা আমার পড়াশোনা বন্ধ করে দেবে। প্লিজ স্যার আমার এত বড় ক্ষতি করবেন না। আমি আজ থেকে মন দিয়ে পড়ব। সত্যি বলছি। ” (কিছুটা ড্রামা করে)

স্যার ওর ড্রামায় ফেসে গিয়ে বলল,
“ঠিক আছে। তবে নেক্সট টাইম ছাড়াছাড়ি হবে না। মনে থাকবে?”

“জি স্যার একশো পার্সেন্ট মনে থাকবে।”

রুহানি পুরো ক্লাসের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বসে পড়ল।
বিড়বিড় করে বলল,
“আমার বাপও আমাকে পড়াতে বসাতে পারবে না। আর আজ থেকে না-কি পড়ব আমি! হুহ!”

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here