প্রিয়_অভিমান🥀🥀প্রথম অংশ

প্রিয়_অভিমান🥀🥀প্রথম অংশ
#ফাবিহা_নওশীন

|অন্তিম পর্ব|
||

ফালাক ডাক্তারের চেম্বারে বসে আছে। লাস্ট কয়েক মাস যাবৎ সাইকিয়াট্রিস্টের আন্ডারে আছে। কিছু মানসিক সমস্যায় ভুগছে। ও দৃষ্টি নত করে শান্ত ভঙ্গিতে ডাক্তারের বিপরীত চেয়ারে বসে আছে। ডাক্তার নাকের ডগায় চশমা রেখে রিপোর্ট দেখছে। ওর পাশে সোহান চিন্তিত ভঙ্গিতে ডাক্তারের দিকে চেয়ে আছে। অপর দিকে ফালাক ভাবলেশহীন। ডাক্তার চশমা খুলে রিপোর্ট থেকে চোখ সরিয়ে ওদের দিকে তাকাল। সোহান নড়েচড়ে বসল। অতি আগ্রহের সহিত অপেক্ষা করছে ডাক্তার কি বলে শোনার জন্য।

ডাক্তার হাসিমুখে বলল,
“মাশাল্লাহ। অনেক ইম্প্রুভ করেছো ফালাক। একদম সুস্থ হয়ে গেছো। আর কিছু মেডিসিন নিবে পাশাপাশি ইন্সট্রাকশনগুলো মেনে চলবে একদম ফিট হয়ে যাবে। আমি নতুন মেডিসিন লিখে দিচ্ছি।”
ডাক্তার মেডিসিন লিখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সোহান ফালাকের দিকে তাকাল। ফালাক একি রকম আছে।

ফালাক হেঁটে চলেছে সোহান ওর পেছনে পেছনে হাঁটছে। হাতের প্রেসক্রিপশন দেখছে।
“আরে ভাই আমার সুস্থ হয়ে গেছিস তুই।”

ফালাক গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“তাতে কি? আবার অসুস্থ হয়ে পড়ব। যতদিন রুহানিকে খুঁজে না পাচ্ছি সুস্থ আমি হবো না।”

ফালাকের কথা শুনে সোহানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। হটাৎ করেই বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এল।

.

রুহানি হসপিটালের বেডে নিস্তেজ দেহে লেপ্টে আছে। চোখের নিচে মোটা করে কালি পড়েছে। সামনে কিছু চুল এঁকেবেঁকে পড়ে আছে। চোখ জোড়া বন্ধ। মুখ জুড়ে বিষন্নতা ঘিরে আছে। অসুস্থতার ছাপ স্পষ্ট। ভেজা পাপড়িগুলো শুকিয়ে এসেছে। রুহানি ধীরে ধীরে চোখ মেলল। জানালার সাদা পর্দা গুলো উড়ছে। ওর চোখজোড়া কাউকে খুঁজছে।

শুকনো কন্ঠে ডাকল,
“আন্টি! আন্টি!”

মাঝ বয়সী এক ভদ্রমহিলা দৌড়ে ভেতরে ঢুকল। তারপর রুহানির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“কি মা? কিছু লাগবে তোমার?”

রুহানি আলতো হেসে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“হ্যাঁ। অনেক তো করলে আমার জন্য। আরেকটু করবে?”

“হ্যাঁ বলো মা কি করতে হবে?”

“সেটা পরে বলছি। আগে আমার মোবাইলটা দেও। একটা কল করতে হবে।”

মধ্যবয়সী মহিলা ব্যাগ থেকে ওর ফোন বের করে দিল। রুহানি ডান হাত ধীরে ধীরে তুলে হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিল। তারপর অনেকটা সময় লাগিয়ে একটা নাম্বার তুলল।

নুশার সামনে এনগেজমেন্ট। কাজিনের সাথে শপিংয়ে ব্যস্ত। এরি মাঝে ফোন বেজে উঠল। হাতের ব্যাগগুলো কাজিনের হাতে দিয়ে ফোন রিসিভ করল। ফোন রিসিভ করে হ্যালো বলার পরেও কোনো সাড়াশব্দ নেই। নুশা আবারো হ্যালো বলল। কিন্তু কেউ জবাব দিচ্ছে না। বিরক্ত হয়ে নাম্বারের দিকে তাকাল। কানে নিয়ে স্পষ্ট কারো নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পেল। রেগে গিয়ে কিছু বলতে যাবে তখনই শীতল একটা কন্ঠস্বর বলল,
“নুশা,আমি রুহানি।”

নুশা যেন হটাৎ করেই সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলল। কথা বলতে পারছে না। এই একটা কন্ঠস্বর শোনার জন্য কতগুলো মাস অপেক্ষা করেছে। আজ সেই কাঙ্খিত ফোনকল এসেছে। ওর চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। নুশা মেঝেতে বসে পড়ল। তারপর শব্দ করে কাঁদতে লাগল। ওর কাজিন ওকে এভাবে বসে পড়তে আর কাঁদতে দেখে ভয় পেয়ে গেল।
“রুহানি তুই কোথায় আছিস? কেমন আছিস? কোথায় ছিলি এতদিন?”

“সব বলছি। আগে কান্না থামা। সবার কি খবর?”

নুশা অভিমান নিয়ে বলল,
“যেমন রেখে গিয়েছিস। তুই এমন একটা কাজ কি করে করলি রুহানি? আমি তোর বন্ধু আমাকেও তুই তোর সমস্যাগুলো শেয়ার করিস নি। কেন বলিস নি? আংকেল আন্টি আমাকে দেখলেই কাঁদে তাই এখন আর যাইনা তাদের খোঁজ নিতে। যেমনই হোক,যাই হোক বাবা-মা তো। তাদের তো জ্বলবেই। তুই চলে যাওয়ার পর ফালাক ভাই একাই কেসটা লড়েছে। তদন্তে অনেক কিছু বেড়িয়ে এসেছে। তোর মামা যে মেইন কালপিট সেটা প্রমাণ হয়েছে। তার জেল জরিমানা হয়। আর এতে করে তোদের কোম্পানি মানে আংকেল বড় এমাউন্টের ক্ষতিপূরণ পায় তোর মামার কাছ থেকে। সে টাকা দিয়ে ব্যবসাটা নতুন করে দাঁড় করিয়েছে। বাড়ি কিনেছে। উনারা ফালাক ভাইয়ার কাছে মাফও চেয়েছে। ভাইয়া কি করবে বড়রা মাফ চাইলে তো ফিরিয়ে দিতে পারেন না তাই মাফ করে দিয়েছে। জানিনা মন থেকে করেছে কি-না তবে সব কিছুই আগের মতো হয়ে গেছে শুধু তুই নেই।”

রুহানি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আমতা আমতা করে বলল,
“ফালাক কেমন আছে?”

ফালাকের কথা শুনে নুশা চুপ করে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“দুদিন আগে ফোন করেছিলাম শুনলাম এখন ভালো আছেন। কিন্তু মাঝখানে অনেক অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। খুব পাগলামি করতো। অনেক ট্রিটমেন্ট করেছেন। লাস্ট কয়েক মাস যাবৎ সাইকিয়াট্রিস্টের অধীনে আছেন। শুনলাম আগের চেয়ে অনেকটাই সুস্থ।”

রুহানি চোখের পানি মুছে নিল। তারপর নিজেকে শক্ত করার জন্য, মনটা অন্য দিকে ঘোরানোর জন্য বলল,
“রুহান কি করছে আজকাল?”

“ও পড়াশোনা করছে। আন্টি বিজনেস দেখছেন আর আংকেলের অবস্থা তো জানিসই। তবে তারও উন্নত চিকিৎসা চলছে।”

রুহানির সব শুনে ভালো লাগল। ওর মামার উচিত বিচার হয়েছে। শুধু মাঝখান থেকে ওদের এতকিছু সহ্য করতে হলো। আজ এই দিন দেখতে হলো।

রুহানির রনকের কথা মনে পড়ল।
“এই শোন রনকের কি খবর? কি করছে?”

রুহানি যেন হটাৎ করেই অসুস্থ শরীরে হারানো শক্তি ফিরে পেল। এটা আসলে শরীরের নয়, মনের শক্তি।
নুশা উত্তর দিল,
“আছে ওই আগের মতোই। পড়াশোনা, টিউশনি এই করে এগিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নের পথে। মাঝেমধ্যে এক সাথে বসে কথা বলি। তোর কথা বলে, মন খারাপ করে, আপসোস করে।”

“আচ্ছা ওকেও সাথে নিয়ে আসিস। আমাকে দেখতে আসবি তো তোরা?”

নুশা অবাক হয়ে বলল,
“দেখতে আসব মানে? তুই কোথায় আছিস বল আমরা নিয়ে আসব। তোকে আনতে যাব, দেখতে কেন?”

“ওই একি কথা। রনককে নিয়ে আসিস। আমি চট্রগ্রাম আছি। একটা হসপিটালে।”
হসপিটালের কথা শুনে নুশা চমকে উঠল। রুহানি হসপিটালে কি করছে,অসুস্থ নয়তো নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

নুশা বিচলিত হয়ে বলল,
“হসপিটাল? হসপিটাল কেন? তোর কি হয়েছে? অসুস্থ?”

“এত চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই৷ একটু অসুস্থ। দোয়া করিস। আর তাড়াতাড়ি চলে আয়। সবাইকে খুব মনে পড়ছে।”

“আসব। আমি এখন আংকেল আন্টিকে জানাই। উনারা খুব খুশি হবেন। আমার যে কি খুশি লাগছে রুহানি তোকে বলে বুঝাতে পারব না।”

রুহানি আলতো হাসল। নুশা ওর হাসির শব্দ পেল।
রুহানি অনুরোধের সুরে বলল,
“ফালাককে সবার আগে জানাবি। এখুনি জানা আর যত দ্রুত সম্ভব আমার কাছে আসতে বল। ওকে আমার খুব দরকার।”

“আচ্ছা ঠিক আছে। ফালাক ভাইয়া অনেক কষ্টে ছিল৷ উনি নিজেকেই এর জন্য দায়ী ভাবতো। উনার মুখের দিকে তাকাতে পারতাম না। তোকে পাওয়া গেছে জানলে খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়বেন।”

“আচ্ছা, ওকে এখুনি ফোন কর। আমি রাখছি।”

রুহানি ফোন রেখে দিল। গলা শুকিয়ে এসেছে।
“আন্টি একটু পানি দেও।”

মাঝবয়েসী মহিলাটি এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে ওর কথা শুনছিল। চোখের পানি মুছে উঠে গিয়ে পানি এনে দিল রুহানিকে। রুহানি পানি খেয়ে বলল,
“আন্টি ফালাক আসবে। ফালাক আমার হাসব্যান্ড। যদি আমার কিছু হয়ে যায়,ওর সাথে দেখা না কর‍তে পারি তাহলে ওর আমানত ওর হাতে তুলে দিও।”
রুহানি ঘনঘন শ্বাস নিচ্ছে। আর প্রার্থনা করছে,
“আল্লাহ আমাকে শক্তি দেও। তুমি সব সময় আমার পাশে থেকেছো, শক্তি দিয়েছো। আমাকে শক্তি দেও হারিয়ে দিও না।”

ওর তথাকথিত আন্টি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“তোমার কিছু হবে না মা। তুমি সুস্থ হয়ে যাবে। তোমার স্বামীর সাথে তোমার দেখা হবে, কথা হবে, মান-অভিমান ভুলে আবারও সংসার করবে। তোমার বাবা-মাও আসবে। সবাই আসবে।”

“আবারও দেখা হবে আমাদের
অচেনা নতুন এক শহরে
কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে।”

(কারেন্ট ছিল না। ফোন চার্জ করে এটুকু লিখলাম। নয়তো আজই শেষ করে দিতাম)

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here