পূর্ণিমা সন্ধ্যায়,পর্ব-১৫,১৬

পূর্ণিমা সন্ধ্যায়,পর্ব-১৫,১৬
Tithee Sarker
পর্ব-১৫

শক্তির এমন আচরণে অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে যায় রক্তিম। তবে সে বুঝতে পারে যে শক্তির মনে গভীর ভাবে দাগ কেটেছে কালকের ঘটনা।নয়তো যে শক্তি তার দিকে চোখ তুলে পর্যন্ত তাকায় না,সে এমন ব্যবহার করতে পারতো না।

এদিকে কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে ফেলে শক্তি। তবুও বলতেই থাকে সে,
“আমায় কি মনে করেন আপনি!আমার কোনো ফিলিংস নাই।আমার কষ্ট হয় না।কী দোষ ছিলো আমার? ”
বলতে বলতে শক্তি নিচে লুটিয়ে পড়ে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দু’হাতে নিজের চুল টেনে ধরে রক্তিম। কেনো জানি না শক্তির এই অবস্থার জন্য নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে।
হঠাৎ করেই শক্তিকে জড়িয়ে ধরে রক্তিম। আর এক নাগাড়ে বলতে থাকে,

“সরি,শক্তি। ভেরি সরি। তুই তো জানিস,এমন কিছু দেখলে আমার মাথা গরম হয়ে যায়,আমি নিজের মধ্যে থাকি না।আমি তো তোকে অনেক ভালোবাসি। অনেক,অনেক,অনেক।

খানিকক্ষণ পর রক্তিম বুঝতে পারে শক্তি নিরুত্তাপ। তার কথার কোনো প্রভাব কি শক্তির উপর পড়ছে না।অন্য সময় ওকে জড়িয়ে ধরলে ওর অনুভূতি বুঝতে পারে রক্তিম। শক্তির লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া, অনুভূতির তাড়নায় কেঁপে ওঠা,শক্তির শরীরের উষ্ণতা সব কিছু স্পর্শ করে তাকে।কিন্তু আজ মনে হচ্ছে শক্তি এই জগতেই নেই।

” এই শক্তি, বল না,তুই জানিস না আমি তোকে ভালোবাসি? ”

শক্তি ধীর কন্ঠে বলে,

“ভালোবাসা আর বিশ্বাস একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ।যেখানে বিশ্বাস নেই সেখানে ভালোবাসাও ক্ষীণ। আচ্ছা, যারা সারাজীবন মানুষের বিশ্বাস বজায় রাখে তাদের তোমরা লয়েল বলো,আর যারা ভালোবাসা সত্বেও বিশ্বাস করে না তাদের কি বলবে?বিশ্বাস ভাঙা যদি অপরাধ হয়,সঠিক মানুষকে বিশ্বাস না করা টাও কি অপরাধ নয়?”

রক্তিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

“কবিতা শুনবি শক্তি? ”

এই বলে শক্তির উত্তরের অপেক্ষা না করেই দরাজ গলায় আবৃত্তি শুরু করে,

এই মূহুর্তে যে কাঁদলো তাকে কান্না থেকে মুক্তি দেবার

কোনো মন্ত্রই আমি জানি না –

সমস্ত পৃথিবীময় যেন ছড়িয়ে আছে আলগা অভিমান

কে কাকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেয়

কে হাসি মুখের ভেতরে ছুরি শানায়

তার কোনো ইতিহাস যেন কেউ কখনো না লেখে!

ভালোবাসার মধ্যেই শুয়ে থাকে সবচেয়ে বেশি ভুল

প্রতিটি পল-অনুপলকে সন্দেহ হয়,সত্যি তো?

শরীরের কাছে শরীর, আলিঙ্গনের মধ্যে তার নরম বুক

কী মধুর, কী সুন্দর, কী তীব্র যন্ত্রণা!

সেই সময়েও নিশ্বাসের ক্ষীণ শব্দ শুনে শুনে মনে হয়

কার জন্য? আমারই তো

কিছুতেই কেউ কখনো বোঝে না,সে পুরোপুরি আমার।

~সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।

শক্তি নির্নিমেষে তাকিয়ে থাকে রক্তিমের দিকে। রক্তিমকে ঈশ্বর সব গুণই দিয়েছেন। ওর আবৃত্তির গলা বরাবরই বেশিরকমের ভালো।

শক্তি ছোট্ট করে বললো,

“এতো সন্দেহ নিয়ে জীবন চলে না,বুঝলেন।”

“প্রমিস,আর এমন করবো না।আর কি শুরু করেছিস?এমনিতে তো বকে বকেও আপনি বলাতে পারি না।আজ আপনি বলছিস কেনো?”

“মানুষ নিজের কাছের মানুষদের তুমি করে বলে,আর অপরিচিতদের আপনি।আজ আপনি আমার কাছে অপরিচিত। ”

এই বলে শক্তি চলে যেতে চাইলে রক্তিম ওর দুটো হাত ধরে বলে,

“সরি বললাম তো।”

এই দেখ কান ধরছি।এই বলে সত্যি সত্যিই দু’কান ধরে মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে রক্তিম।

ওর এই বাচ্চামিতে শক্তি না হেসে থাকতে পারে না।

নিচ থেকে জয়ার আওয়াজে শক্তির ধ্যান ভাঙে,

“শক্তি, মারে,খেতে আয়।ভাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে তো।রাত কী কম হয়েছে?”

শক্তি মাঝে মাঝে জয়াকে দেখে অবাক হয়।একটা মানুষ এতোটা ভালো কি করে হতে পারে? শক্তির জন্যই তো রক্তিমকে তার বাবার এতো কথা শুনতে হয়।অন্য কোনো মা হলে,শক্তিকে কখনোই কেউ মেনে নিতো না।

————————————

আজ রিদ্ধি আর অর্ক এসেছে,দ্বিরাগমন করতে।বিয়ের পর বউয়ের দ্বিতীয়বার শশুড়বাড়ি যাওয়াকেই দ্বিরাগমন বলে।আর এরজন্যই আগে বাপের বাড়ি আসতে হয়।রিদ্ধির সাথে রুশা,মুন্নিরাও ফিরে এসেছে।

জয়া ঘটা করে মেয়ে জামাইকে বরণ করে ঘরে তুলছে।কিন্তু ভেতরে ঢোকার আগে শক্তি এসে ওদের পথ আটকে দাঁড়ায়। কোমরে হাত দিয়ে, চোখ পাকিয়ে বলে,

“এই যে নতুন জিজু,বিয়ের দিন বেঁচে গেছিলেন বলে,আজ কিন্তু কোনো ছাড়াছাড়ি নেই।টাকা বের করেন।”

অর্ক ইনোসেন্ট মার্কা ফেস নিয়ে বলে,

“আমার কি দোষ বলো শালিকা,আমি তো টাকা নিয়ে গেটে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তুমিই এলে না।”

“তো কি হইসে এখন দেন। পুরা নয় হাজার দিবেন।”

“নয় কেনো দশই চাইতে।”

“কথা সত্য, আসলে তিন জনের জন্য তিন হাজার করে নয় হাজার চেয়েছিলাম। আপনি যখন দিতে চাইছেন তো দশই দিন।”

অর্ক অসহায় ভাবে রিদ্ধির দিকে তাকায়। রিদ্ধি কিছু বলার আগেই শক্তি ওর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে,

“টাকা না দিলে কিন্তু সব কেলেংকারী ফাঁস করে দেবো।তখন বুঝবে কেমন লাগে!!!”

অগত্যা গুনে গুনে দশ হাজার টাকা শোধ করে ওদের ঘরে ঢুকতে হলো।

(চলবে)

#পূর্ণিমা সন্ধ্যায়
পর্ব-১৬

বাড়ির পরিবেশ থমথমে।সবার মুখেই মোটামুটি চিন্তার ছাপ।কারণ এইমাত্র রক্তিমের ছোট মামা খবর দিয়েছেন যে শান্ত এক্সিডেন্ট করেছে। আর খুব বাজে ভাবে আহত হয়েছে সে।ছোট মামার কথায় যা বোঝা গেলো যে শান্ত বাইক নিয়ে গেছিলো বাজারে। বাজার থেকে বেরিয়ে ফাঁকা রাস্তায় উঠতেই পেছন থেকে একটা হায়েস টাইপ গাড়ি এসে ওর বাইকে ধাক্কা দেয়। আর শান্ত বাইক থেকে ছিটকে পড়ে রাস্তায়। শুধু এই পর্যন্তই শেষ নয়,শান্ত আগের ঘটনার রেশ কাটিয়ে উঠার আগেই কোথা থেকে একটা বাইক এসে ওর হাতের ওপর দিয়ে চলে যায়।
প্রথম আঘাতটা কম হলেও দ্বিতীয় আঘাতটাই ওকে কাবু করেছে বেশি। হাতের অবস্থা ভালো না। হসপিটালাইজড করা হয়েছে।

সব শুনে শক্তি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।সে শান্তকে অপছন্দ করে ঠিকই,কিন্তু তার এমন পরিণতিও মন থেকে মেনে নিতে পারছেনা।

এদিকে মুন্নি আর জয়ার একপ্রস্থ কান্নাকাটি হয়ে গেছে।যতই খারাপ হোক!ভাই,ভাইপো বলে কথা।তার এমন অবস্থা শুনে যে কেউই ভেঙে পড়বে।

এতো কিছুর মাঝে রক্তিম বাড়ি নেই।যা কিনা শক্তির সন্দেহের কারণ।

রিদ্ধি জয়াকে বোঝাচ্ছে যে কেঁদে তো লাভ নেই।কিন্তু জয়ার কান্না থামছেই না।যতই ওইদিন কথা শোনাক শান্তকে,তার একটা মাত্র ভাইপো।ছোট থেকে তো খুব আদরই করতো।এবার রিদ্ধি বলে,

“ঠিক আছে।এখানে এভাবে না কেঁদে তুমি আর মুন্নি বেরিয়ে পরো।সবে তো বেলা দু’টো। এখন রওনা দিলে সন্ধ্যার আগেই পৌঁছে যাবে। ”

রিদ্ধির কথা শুনে জয়া বলে,

“কি বলিস এসব তুই?নতুন জামাইকে বাড়িতে রেখে আমি বাপের বাড়ি চলে যাবো?”

“তাহলে শুধু শুধু কান্নাকাটি করে আর শরীর খারাপ করো না।”
আবার মুন্নির দিকে তাকিয়ে বলে,

“মুন্নি, তুই কি যাবি?তাহলে গোছগাছ করে নে।”

এরই মধ্যে বাড়িতে রক্তিমের প্রবেশ আর সাথে আছে পিয়া।ও রিদ্ধির সাথে আর শক্তির সাথে দেখা করতে এসেছে।

শক্তি একনজর রক্তিমের দিকে তাকিয়ে দেখলো ওর মেজাজ পুরোই ফুরফুরে। দেখে মনে হচ্ছে রোজকার চেয়ে একটু বেশিই খুশী।রক্তিমের এই হাবভাব দেখে শক্তি ভ্রূ কুঁচকে ফেলে।নিশ্চয়ই রক্তিম জানে এক্সিডেন্টের ব্যাপারে।ওর অজানা থাকার কথা নয়।কেননা,ওর মামাবাড়ি তো এখান থেকে বেশি দূর নয়।বাইকে করে গেলে বড়োজোর চল্লিশ মিনিটের মতো লাগে।

“কেমন আছো,রিদ্ধি আপু?”

পিয়ার আওয়াজে শক্তির হুশ ফেরে।এই মেয়েটা কথায় কথায় চিন্তায় ডুবে যায়।

“ভালো আছি রে!তোর কি অবস্থা? ”

“আর অবস্থা! কয়দিন পরই তো ইয়ার চেঞ্জ এক্সাম। কিছুই তো প্রিপারেশন হয়নি।”

“কিরে,শক্তি। কিছুই তো বললি না যে তোদের পরীক্ষা?”

জিজ্ঞেস করে রিদ্ধি।

কিন্তু কোথায় শক্তি। ও তো আগেই মুন্নির সাথে উপরে চলে এসেছে।

এবার জয়া বলে রক্তিমকে,

“বাবাই,ও বাবাই।একটু মুন্নিকে গিয়ে দিয়ে আয় না।মেয়েটা কখন থেকে কাঁদছে। ”

রক্তিম চোখ মুখ শক্ত করে জবাব দেয়,

“বাবাকে বলো গিয়ে দিয়ে আসতে।তোমার ওই ভাইপোর আশেপাশে যাওয়ার ইচ্ছে আমার নেই।”

বলেই ধপাধপ সিড়ি ভেঙে উপরে চলে আসে।

———————————–

সন্ধ্যার পর বাড়িটা মোটামুটি শুনশান হয়ে যায়।মুন্নিকে নিয়ে পীযূষ বাবু বেরিয়ে পরেছিলো সন্ধ্যার আগেই।এতোক্ষণে মনে হয় পৌঁছেও গেছে।রিদ্ধি, অর্ক,শক্তি, রুশা ওদের রুমে বসে আছে।সবাই কম বেশি কথাবার্তা বললেও শক্তি একদম চুপ।কতো কথা জানার আছে তার রিদ্ধির থেকে কিন্তু কোনো গল্পেরই তালমিল পাচ্ছে না।বারবার শুধু এটাই মনে হচ্ছে একাজের পেছনে রক্তিম নেই তো?

“ইশ,,মুন্নিটাকে খুব মিস করছি।শান্তটা আর এক্সিডেন্ট করার দিন পেলো না?”

“ছিহ্,রিদ্ধি দি,এসব কি কথা?ও তোমার ভাই।”

“সত্যি রে শক্তি, আমার কোনোরকমই লাগছে না ওর জন্য।বরং দেখ ওর জন্যই আমার আজকের দিনটা মাটি হলো।ভাগ্যিশ জোড় খোলার অনুষ্ঠানটা আগেই হয়ে গেছিলো।”

রিদ্ধির কথার মাঝেই রুমে ঢোকে রক্তিম।এসেই ধপ করে শক্তির পাশে শুয়ে পড়ে।রক্তিমের এহেনো আচরণে শক্তি তড়াক করে দাঁড়িয়ে যায়।

রক্তিম ওর দিকে না তাকিয়েই বলে,

“এক কাপ চা করে আন তো।চা নিয়ে আমার রুমে যাবি।”

এরই মাঝে অর্ক বলে,

“এতো ঠিক না শালাবাবু। চা খেলে সবাই খাবো,তুমি একা কেনো?”

“তোমার বউকে বলো চা করে দিতে। এই হাতের চা শুধু আমার জন্য রিজার্ভ। তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেনো?যা।”

শক্তিকে বলে রক্তিম।

—————————

শক্তি রক্তিমের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে দেখে রক্তিম চেয়ারে বসে কিছু একটা করছে।হয়তো প্র্যাকটিকেল।রক্তিম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে বিধায় প্রচুর প্র্যাকটিকাল করতে হয়।আর সামনেই ওর মাস্টার্সের পরীক্ষা।

শক্তি গলা খাকরি দিয়ে রুমে ঢোকে।চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বলে,

“কাজটা আপনি করেছেন তাই,না?”

“হুম,করেছি।”
রক্তিমের অকপট স্বীকারোক্তি।

শক্তি তো শুধু অনুমান করেছিলো।এটা যে সত্যি তা সে ভাবেনি।

“আপনি বুঝতে পারছেন,আপনি কি করেছেন? কেনো করলেন এটা?”

“যা করেছি বেশ করেছি।এর জন্য আমার কোনো দুঃখ নেই।”

রক্তিমের নির্লিপ্ত কন্ঠ।

“আপনি একদম ঠিক করেননি।”

এবার রক্তিম বসা থেকে দাঁড়িয়ে উঠে।শক্তির দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,

“ভুলটা কি করেছি?আর তোর এতো গায়ে লাগছে কেনো?”

শক্তির গালে স্লাইড করতে করতে বলে রক্তিম।

“একদম উল্টাপাল্টা কথা বলবেন না।গায়ে লাগার কি আছে?কিন্তু আজ যদি উনি মারা যেতেন?”

“যাতে না মরে এভাবেই মেরেছি।মারার জন্য মারলে তুই তো আবার ওর জন্য হা হুতাশ করেই মরে যেতিস। ”

এবার চোখ মুখে কঠিন ভাব এনে বলে রক্তিম,

“ও আমার জিনিসে খারাপ নজর দিয়েছে। আমার প্রাণভোমরায় হাত দিতে চেয়েছে।তুই কি ভাবলি,দু’টো চড় থাপ্পড় দিয়ে ওকে ছেড়ে দেবো?নেভার!”

শক্তি ছোট্ট একটা নিশ্বাস ছেড়ে বলে,

“আর আমি যদি কোনোদিন বলি যে আপনাকে ভালোবাসি না?”

মুচকি হেসে বলে রক্তিম,

“ওটাই হবে তোর জীবনের শেষ দিন।এজ ওয়েল এজ মাইন।”

এই বলে শক্তির কপালে একটা চুমু দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায় রক্তিম।

“কি ভয়ংকর রে বাবা!”

ভাবে শক্তি।

(চলবে)
Tithee Sarker

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here