তরঙ্গিনী (পর্ব-১৫) #আরশিয়া_জান্নাত

#তরঙ্গিনী (পর্ব-১৫)

#আরশিয়া_জান্নাত

সূর্যের মৃদু আলো চোখে পড়তেই ঘুম ভাঙে আরাফের। বুকের উপর রেবাকে পেয়ে পরম শান্তিতে মন ভরে যায়। গতকাল রাতটা তার কাছে অসম্ভব সুন্দর স্বপ্নের চেয়ে কম ছিল না। রেবার মাথায় হাত বুলিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বলে, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ রেবা! আমার সহস্র বছরের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য।
রেবা আরো আদুরে হয়ে তার বুকে মিশে যায়। তার গলায় মুখ ডুবিয়ে বলে, আপনি সবসময় এতো ফর্মালিটিস মেইনটেইন করেন কেন বলুন তো?

আমার মনে হয় না এতে দোষের কিছু আছে, নূন্যতম ভদ্রতা দেখানোই যায়।

হুহ। কত ফিলোসফি আপনার!

আপনার ঘুমভাঙা গলাতো ভারি সুন্দর! কেমন মাতাল করা টাইপ।।

রেবা মুখ উচিয়ে আরাফের নাক টেনে বলল, আমার বরটার কাছে আমার সবকিছুই সুন্দর। সে আমার অসুন্দর কিছুই পায় না।

যা সুন্দর লাগে তাকে সুন্দর বলার সাহস আমার আছে। এতে লোকে যা ইচ্ছে বলুক,

বৌ পাগল বললেও সমস্যা নেই?

ঐটা বললে আরো প্রাউড ফিল করবো।

তাই বুঝি?

হুম ঠিক তাই।

রেবা উঠে চুল ঝেড়ে খোপা করতে লাগলো। আরাফ ওর হাত থামিয়ে পেছন‌ থেকে জড়িয়ে ধরলো, চুলে নাক ডুবিয়ে নেশাতুর কন্ঠে বলল, আজকে না উঠলে হয় না?

অফিস যাবেন না?

আরাফ রেবার কাধে গাঢ় চুমু একে বলল, আমার তো ইচ্ছে করছে আর কোথাও‌ না গিয়ে সারাদিন আপনার সংস্পর্শে থাকি।

রেবা আরাফের বুকে হেলান দিয়ে বলল, আরাফ আপনি আমায় তুমি করে সম্বোধন করতে পারেন।

নাহ। আমি আপনাকে আপনিই বলবো।

কেন?

আপনি করে বললে আপন-ই মনে হয়। আপনি আমার খুব বিশেষ মানুষ, এই বলে সম্বোধন করলে একটা সম্মান, একটা বিশেষত্ব প্রকাশ পায়। সবাই তো বৌকে তুমিই বলে আমি নাহয় আপনিই বললাম?

সবসময় ইউনিক হবার প্রচেষ্টা!

অবশ্যই। একটা জিনিস খেয়াল করেছেন?

কি?

আমি কিন্তু ঠিকই গেস করেছিলাম, আপনি স্বামীসোহাগী,,,,

রেবা মুখ ঢেকে বলল, আপনি একদম অসভ্য!

হাহ! বৌয়ের কাছে সভ্য হয়ে থাকলে বাবা হওয়া লাগবে না,,

রেবা শাওয়ারের জন্য কাপড় নিয়ে বলল, হুম ভালোই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন, সাত বাচ্চার বাবা হওয়া যার লক্ষ্য তার সঙ্গে এই নিয়ে তর্ক করার সাধ্যি আমার নেই!

এই রেবা ওয়েট।

কি?

একা শাওয়ারে যাবেন না,

মানে?

মানে হলো আমিও যাবো।

অসম্ভব! না,,

আরাফ ততক্ষণে ওর পাশ গলিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।


পাখির কলকাকলীর শব্দে চারপাশ চঞ্চল হয়ে উঠেছে। বিকেলের এই সময়টা রেবা পুকুর ঘাটে কাটালেও আজ‌ বেলকনীতে বসে আছে। এখানে বসে দূরের মাঠে ছেলেদের খেলা দেখা যায়, সবাই কত হৈ চৈ করছে, কেউ বা বন্ধুদের সঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছে। এসব দেখতে মন্দ লাগছে না। জীবন নিয়ে ভাবতে না চাইলেও মানুষের মানসপটে সবকিছুই উকিঝুকি মারে।

বিগত কয়েক মাসে তার জীবনটা কত সুন্দর রঙিন হয়েই না সেজেছে। আরাফ রেবাকে পাগলের মতো ভালোবাসে এতে রেবার কোনো সন্দেহ নেই। যেই মানুষটা প্রতিটি স্পর্শে আবেগাপ্লুত হয়ে চোখের জল ফেলতে পারে তার মনের কথা বুঝতে আর বাকি কি?

আরাফের মতো জীবনসঙ্গী পাওয়াটা রেবার কাছে অসম্ভব কল্পনা ব্যতীত কিছুই না। মাঝেমধ্যে জীবন আমাদের এতো দ্রুত এগিয়ে নেয় আমরা বুঝতে পারিনা হচ্ছেটা কি!

পুরুষ মানুষের যত্ন মারাত্মক রকমের সুন্দর। এই যত্ন যে পেয়েছে সেই জানে, তারা তাদের প্রিয় মানুষকে পরম যত্নে আগলে রাখতে কত কিই না করে। স্বামী হিসেবে, বাবা হিসেবে, ভাই হিসেবে একেকবার একেক সম্পর্কে তারা এমন সব দৃষ্টান্ত রেখে যায় যা আসলেই সংজ্ঞায়িত করার মতো না।

আবার মেয়েদের একটা বিশেষ যন্ত্র আছে, যা দ্বারা এরা খুব সহজেই টের পায় স্পর্শের উদ্দেশ্য। আসল কেয়ার কোনটা, আর লৌকিকতা কোনটা। গল্প উপন্যাস পড়ে বা নাটক সিনেমা দেখে আজকাল একটা ট্রেন্ড শো হয় হাত ধরে রাস্তা পার করা, বা’পাশে রাখা, খাওয়ার সময় মুছিয়ে দেওয়া, সময়ে সময়ে ফোন‌করে খোঁজ নেওয়া সহ কত কি!
এসব দিয়ে যদি ভালোবাসা মাপা হয় তবে ধোঁকা খাওয়ার চান্স অনেক বেশি। কারণ প্রতারকরা মেয়েদের ফ্যান্টাসি অনুযায়ী খুব নিপুণ অভিনেতা হয়।

কোনটা সহজাত আর কোনটা কেবলই ইম্প্রেস করার উদ্দেশ্যে করা এইটুকু বোঝার মতো এডাল্ট রেবা হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার ঝুলি খুলে রেবা নানাভাবে আরাফকে ঝাঁকিয়ে দেখেছে।
বুঝেও‌ না বোঝা, জেগেও ঘুমিয়ে থাকাসহ আরো কত কি! আরাফ সবসময় তাকে আলগোছে ছুঁয়েছে, হয়তো তার মনের মাঝে থাকা তীব্র আকাঙ্ক্ষা রুখে রেবাকে বুকে রেখেই শান্ত থেকেছে। রেবার সামনের চেয়ে পেছনেই বেশি যত্ন করেছে, খেয়াল রেখেছে। তার প্রতিটা পদক্ষেপ রেবার ভালো থাকাকে ঘিরে।
আরাফ রাগী মানুষ এটা সে ফেইস না করলেও অন্যন্য সবার কাছে শুনেছে তার রাগের নমুনা। রুহি বলে, ভাবী আসার পর থেকে ভাইয়ের সব রাগ নিভে গেছে।

অথচ পুরুষরা নিজের স্ত্রীর সামনে আসল রুপ দেখায়, একজন পুরুষের চারিত্রিক সার্টিফিকেট দেওয়ার একমাত্র মানুষ হলো তার স্ত্রী! এখন পর্যন্ত আরাফের মাঝে এমন কিছু রেবা দেখেনি যাতে খরাপ মানুষ বলা যায়।
এইসব অবজার্ভেশন যেমন তাকে মুগ্ধ হতে বাধ্য করেছে, তেমনি শঙ্কিত করেছে।
রেবার মন কি এ দোটানার মাঝে সহজে প্রেমে পড়তো? যে একবার ধোঁকা খায়, মানুষ চিনতে ভুল করে, সে সহজে কাউকে বিশ্বাস করতে পারেনা। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ জন্মেই যায়। মনে হয় পৃথিবীর সবাই বুঝি সেই বিশেষ মানুষটার মতোই নির্মম ছদ্মবেশী! রেবাও তো এমনটাই ভাবতো। আরাফকে নিয়েও কম খারাপ ভাবেনি। নতুন নতুন বিয়ে হলে নতুন মানুষকে কতই না ভিন্ন মনে হয়, তার সান্নিধ্য স্বর্গীয় লাগে। একে অপরকে জানার তীব্র কৌতুহল থাকে। বছর যত যায় সব পুরনো হতে শুরু করে।

কিন্তু তার ভুল ভেঙেছে, আরাফকে সে যতোই দেখছে ততোই ভালোলাগা বাড়ছে। সে আরাফকে প্রথম কবুল করেছে সম্মানীয় ব্যক্তি হিসেবে। শ্রদ্ধার আসনে যে থাকে সে যেন তেন হয় না। মেয়েদের মনে এই আসন হাসিল করা সহজ নয়। এখন রেবা শুধু মন থেকে চায়, তার ধারণা ভুল প্রমাণ না হোক। আরাফ সবসময়ই এমন থাকুক।
চিন্তার রেশ‌ ধরে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা পেরিয়ে যাচ্ছে টেরই পেল না রেবা। ঘরে এসে আলো জ্বালিয়ে মাগরিবের নামায পড়ে কোরআন শরীফ খুলে বসলো। মনটাকে শান্ত করতে এর চেয়ে বড় পথ্য কি আর আছে?

অফিস থেকে ফিরে আরাফ রুমে না এসে স্টাডিতে ঢুকলো। কিসব কাগজপত্র ঘেটে কলে কথা বললো অনেকক্ষণ। রেবা চা নিয়ে যখন ঢুকলো দেখে আরাফ চোখ বুজে কপাল চেপে বসে আছে।
এজন্যই জনাব আজ রুমে যায় নি!

আরাফের যখন অফিসকেন্দ্রীক মনমেজাজ খারাপ থাকে সে ঘরে যায় না। স্টাডিতে বসে মাথা ঠান্ডা করে ফুরফুরে অবস্থায় রেবার মুখোমুখি হয়।

রেবা চায়ের কাপটা রেখে আরাফের কপালে হাত রাখলো, আরাফ চমকে বলল, আপনি এখানে?

রেবা তার চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে দুহাতে কপাল চেপে বলল, আমি আপনার সুখ দুঃখের সঙ্গী জানেন? আমাকে কেবল ভালো মেজাজটা দেখান, খারাপটা দেখানোতে সমস্যা কি?

আরাফ মৃদু হাসলো। হাসিমুখে রেবাকে কাছে টেনে বলল, রেবা জানেন আমার বাবা সারাদিন অফিসে বিজি থাকতো, বেশিরভাগ রাত করে বাসায় ফিরতো। আমরা তখন বাবার অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়তাম। বাবা তো বড় ছেলে ছিলেন, চাচ্চুরাও হাল ধরার মতো হয়নি, তাই উনার উপর চাপ ছিল অনেক। সেই চাপের প্রভাব পড়তো আমার মায়ের উপর। আমি যতবার তার জন্য বহু কষ্টে জেগে থেকেছি ততবার দেখেছি বাবার খিটখিটে রুপ। বাবা অযথাই রাগ করতেন, বকা দিতেন। অবশ্য আমার মা ওসব তোয়াক্কা করতেন না, হয়তো বাবা পরবর্তীতে সেটা পুষিয়ে নিতে পারতো বলে। সকালে আমরা বাবার ফুরফুরে রূপ দেখে স্বস্তি পেতাম। ধীরে ধীরে বড় হয়ে বুঝলাম এসবে বাবার কোনো হাত নেই। আসলে বাইরের জগৎটা ভীষণ কঠিন। এখানে টিকে থাকতে অনেক চিন্তাভাবনা করতে হয়। নানান টেনশন মাথায় নিয়ে ঘুরতে হয়। আপনি খুব সফট হার্টেড তাই
আমি চাই না আপনাকে সেই প্রভাবটা দেখাতে। ঢাকায় সবাই আছেন বলে আমি অনায়াসে যতোটা গুছিয়ে চলতে পেরেছি এখানে একা হাতে সামলাতে ততোটাই হিমশিম খাচ্ছি। আমি পরিপক্ক নই এখনো শিখছি। আপনি অবশ্যই আমার সুখ দুঃখের সঙ্গী হবেন, তবে আমার খারাপ ব্যবহারের স্বীকার হবেন না। ইনশাআল্লাহ!

আমি তার গলা জড়িয়ে বললাম, স্বস্তির জায়গা ভেবে জিরিয়ে নিতে তো পারেন,

জিরোই তো! আপনি হয়তো জানেন না আপনাকে দেখে কতো দিন আমি শান্ত হয়েছি। আপনার আশেপাশে থেকে ক্লান্তি মুছেছি।

রেবা চুপচাপ তার বুকে মাথা রেখে বসে রইলো, যেন খুব মন দিয়ে আরাফের পার্লস রেট গুণছে।

আরাফ মনে মনে বলল, যে চাকরির অহঙ্কারে তৌকির আপনাকে চূর্ণবিচূর্ণ করেছে, সেই চাকরিটা না খাওয়া পর্যন্ত আমি স্থির হবো না রেবা। যদিও আমার তাকে থ্যাঙ্কস বলা উচিত। সে ছেড়ে গিয়েছিলো বলেই তো আমি আপনার মতো হীরেকে নিজের করতে পেরেছি। তবে এই প্রতিশোধটা হবে আপনার চোখের পানির জন্য। আপনাকে করা অপমানের জন্য!

চলবে,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here