অসম পর্ব ৭,০৮,০৯

অসম
পর্ব ৭,০৮,০৯
কলমে লিপিকা
০৭

রাত ১২টা। সেন্ট গ্রে হসপিটালের ১১২ নাম্বার রুমের সামনে আজও বসে আছে নিতু। অনুপম নিতুর দিকে গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। আগের মতো নিপাট পরিপাটি বেশভুসা চেহারার কোথাও কোন রিংকেল নেই। অতন্ত যত্নে গড়া সুবিন্যস্ত চেহারায় পরে আছে কেবল চিন্তার ছাপ।
অনুপমের ভিতরটা কি অদ্ভুতভাবে নারা দিয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে হেটে নিতুর কাছাকাছি এসে দড়ালো আস্তে করে বলল – কেমন আছ?
নিতু চোখ মেলে অনুপমের দিকে তাকিয়ে একটু সরে বসলো।এই নিঃশব্দ অভিবাদন সাদরে গ্রহণ করে পাশে বসে পরলো। দু’হাতে মুখ ঘসে চুলগুলো টেনে পিছনে নিয়ে বলল – আমি জাতাম আবার তোমার দেখা পাব।
এবারেও নিতু চুপ করে রইল। উত্তর না পেয়ে নিতুর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। অস্ফুট ভাবে বলল – চলে যাব
নিতু অনুপমের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকালো।কাঁচাপাকা ফ্রেন্চ কাট দাড়ি। চুলেও পাক ধরেছে। বিষন্ন চোখ। যে চোখে আজও নিতুরই ছবি। নিতু চোখ নামিয়ে নিল।
অনুপম আবার বলল – কথা বলছো না যে, রাগ নাকি অভিমান
হঠাৎ করে নিতুর পায়ের কাছে হাটু গেরে বসে পরলো। দুহাত জোর করে বলল – সরি!
নিতু তটস্থ ভঙ্গিতে আশেপাশে তাকালো।আস্তে করে বলল – উঠ
অনুপম উঠে বারান্দার রেলিঙে দুহাত দুদিকে ভর দিয়ে চেয়ে রইলো আকাশের দিকে।
নিতু বলল- ভুল সময়ে কেন বারবার ভুল দরজায় কড়া নাড়
– মানুষটা যে ভুল ঠিকানায় রয়ে গেছে
অনুপমের কথা শুনে নিতুর ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে গেল দশ বছর আগে যেমন গিয়েছিল।
অনুপম আবার বলল – কেমন করে পারলে আমাকে এমন একটা জীবন দিতে! যে আমি তোমাকে একটা দিন না দেখে থাকতে পারিনি তাকে এত বড় শাস্তি।
– আমি জানিনা সাদাত তোমাকে কিভাবে ম্যানেজ করেছে বাট আমি চাচ্ছিলাম সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে
– আমি তোমার সমস্যা? তুমি জান আমি কি করেছি, পগল হয়ে গিয়েছিলাম, ব্যাংককের রাস্তায় রাস্তায় উদভ্রান্তের মতো হেটেছি।খাওয়া ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল আমার, পার্কের বেঞ্চে দিনের পর দিন রাতের পর কাটিয়েছি।তোমার ঐ ম্যাসেজটা না এলে আজ হয়তো এখানে আমাকে দেখতে পেতে না
– ম্যাসেজ? আমিতো কোন ম্যাসেজ পাঠাইনি
অনুপম হেসে দিল।নিতুর কাছে এসে ওর মুখটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল -কেন মিথ্যে বলা, আমি জানি তুমি আমায় ভালবাস, নিতুকে শক্ত করে জরিয়ে ধরে বলল- বহুবার তোমার ঐ নাম্বারে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করেছি, পারিনি, আদুরে কন্ঠে বলল-সরি!
এমন আকস্মিক ঘটনায় নিতু অপ্রস্তত হয়ে পরলো, ঘোর কেটে গেলে দৃঢ় কন্ঠে বলল-ছারো আমায়
অনুপম নিতুকে ছেড়ে দিয়ে দুহাত ভাজ করে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। তারপর বলল- কফি খাবে, বহু বছর কফি খাওয়া হয় না
আর চোখে নিতু অনুপমের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল-সত্যিইতো বহু বছর কফি খাওয়া হয় না, বই পড়া হয় না প্রিয় অভ্যাসগুলো কেমন করে এত অপ্রিয় হয়ে গেল – ঘরে যাও অনুপম, নিশ্চয় তোমার জন্য কেউ অপেক্ষা করছে

চলবে

অসম
পর্ব ৮
কলমে লিপিকা
ঘরে যাও অনুপম, নিশ্চয় তোমার জন্য কেউ অপেক্ষা করছে
অনুপম হেসে দিল – নিতু
-হুঁ
– এইযে তিন দিন ধরে তুমি এখানে আছ একবারও কি আমাকে দেখতে ইচ্ছে হয়নি।
– আমি সাদাতকে নিয়ে ভীষণ টেনশন করছি
অনুপম মনে মনে বলল-যে মানুষটা আমাকে তোমার কাছ থেকে সরিয়ে দিতে চাইছিল আজ পৃথিবী তাকে সরিয়ে দেয়ার চিন্তা করছে।মুখে বলল- আমি আছি তো
– ও আমাকে আর ছেলেকে নিয়ে যতটা কনশাস নিজের বেলায় ততখানিই নেগলিজেবল।কোন প্রবলেমের মুখোমুখি কোনদিন হতে দেয়নি, সবকিছু নিজে হ্যান্ডেল করেছে, অথচ দেখ আজ আমি একটা আস্ত টেনশনের গোডাউন নিয়ে বসে আছি,বিত্ত, বৈভব, পাওয়ার সবকিছু কতটা মেকি
-আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করবো
– এখানে চেষ্টার কিছু নেই, আমি জানি ওর অবস্থা, শেষের দিনগুলতে যাতে কষ্ট কম হয় সেটাই আমি চাইছি। থেমে আবার বলল পৃথিবীতে এত ডক্টর এত হসপিটাল থাকতে তোমার কাছে কেন এসেছে জান?
অনুপম ভ্রু কুঞ্চিত করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিতুর দিকে তাকালো
– ক্ষমা করে দাও ওকে, প্লীজ!

আরও একটা নতুন সকাল শুরু। আজকে সাদাতের শরীরটা অন্যসব দিনের চেয়ে খারাপ। কিন্তু নিতুকে বুঝতে দিতে চায় না নিতুর হাতটা সদাত নিজের গালের সাথে চেপে ধরে বলল- এখানে আসার পর আমার ঘুম নেই
– এটা কেমন কথা
– চল দেশে চলে যাই,নিজের ঘরে নিজের বিছানায় তোমাকে জরিয়ে ধরে একটা লম্বা ঘুম দিব,মনে আছে নেশাল আর আমি তোমার সঙ্গে ঘুমানোর জন্য কি করতাম
নিতু হেসে দিল
-আমাদের সেই ছোট্ট ছেলেটা এখন কত বড় হয়ে গিয়েছে, এস.এস.গ্রুপের সমস্ত দায়িত্ব তার কাঁধে,তোমার মনে আছে নিতু তোমার যখন লেবার পেইন হল তুমি চিৎকার করে কান্না করছিলে আর আমি লেবার রুমের বাইরে নার্স ডক্টরের চোদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছিলাম, মা এসে বলল বাবু তুই এত হাদা কেনরে, আমি মাকে বললাম মা তুমি বুঝতে পারছো না ওরা নিতুকে কষ্ট দিচ্ছে, আমি সবকটাকে পুলিশে দিব বলেই মাকে জরিয়ে ধরে কেঁদে দিলাম।
– আর সেই থেকে মীরা তোমাকে বউ পাগলা বলে ক্ষ্যাপাতো
সাদাত হোঃহো করে হেসে উঠলো। নিতুর চোখটা ভিজে এল, এই প্রানবন্ত হাসিটা আর কখনো দেখতে পাবে না।

দরজা ঠেলে অনুপম আর মেরিলিনা ঢুকলো।
অনুপম সাদাতকে বলল – কি অবস্থা
– ভালো
– ভালোই হল তোমাদেরকে একসাথে পেয়ে গেলাম, সাদাতের পালস্ চেক করতে করতে বলল- কাল থেকে আপনার কেমো শুরু করতে চাচ্ছি
– তুমি যেটা ভালো মনে কর
অনুপম আর চোখে দেখলো সাদাত ওর বাহাত দিয়ে নিতুর ডান হাত ধরে আছে, অনুপম বলল – আপনার বাহাতটা দিন
তারপর মেরিলিনার দিকে তাকিয়ে বলল চেক হিজ ব্লাডপ্রেশার
সাদাত বলল – অনুপম তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে, সময় হবে?
-আজকে হবে না আমি ভীষণ বিজি
– কেমো শুরু হবার আগে তোমার সঙ্গে আমার কথা বলা প্রয়োজন
অনুপম মেরিলিনাকে বলল ইউ মে গো নাউ
– ওকে স্যার
নিতু বলল আমিও যাই তোমারা কথা বল
বেডের সাইডে রাখা চেয়ার টেনে বসতে বসতে অনুপম বলল – বলুন
– কেমো কেন দিতে চাচ্ছ, যে স্টেজে আছি কেমো কি কোন কাজে দিবে
– চেষ্টা করতে তো পারি
– দশ বছর আগে আমি তোমার সঙ্গে একটা অন্যায় করেছি যদিও আমার কাছে সেটা কখনোই অন্যায় মনে হয় না তারপরও মনের ভেতর একটা অসস্তি কাজ করছে, এই অসস্তি নিয়ে আমি মরতে চাই না
– অসস্তির কিছু নেই, আমি হলেও হয়তো এটাই করতাম
– তুমি মোটেই এটা করতে না, তারপর হেসে বলল তুমি আমাকে শুট করে দিতে
– কেন এমন মনে হল
– আমার বউয়ের হাতটা পর্যন্ত তুমি ধরতে দিতে চাও না, একটু থেমে বলল আমি কখনও চাইনি তোমার মতো ব্রিলিয়ান্ট ডক্টর পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাক,তুমি আর তোমার ভালবাসা দুটোকেই আমি রেসপেক্ট করি
চলবে

অসম
পর্ব ৯
কলমে লিপিকা

প্রথম কেমোটা শরীর নিতে পারলেও দ্বিতীয় কেমোতে সাদাত ভীষণ সিক হয়ে পরলো। শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল, পালস্ রেট নেমে এসেছে। নেশাল তার বিশাল বাহিনী নিয়ে তার পাপা আর মাম্মার কাছে চলে এসেছে।
নিতু কিছুতেই স্থির থাকতে পারছে না একবার বসছে তো আর একবার হাটছে,কখনও আই.সি.ইউ রুমের সামনে যাচ্ছে আবার কখনও নেশালকে বলছে “তোর পাপা ভীষণ সেলফিশ ” এবার তোর পাপার পাশ নিয়ে কথা বলছিস তো আমি তোকে দেখে নিব
নেশাল বলল- মাম্মা চল আমরা হোটেলে যাই,তোমার রেস্ট দরকার
– হিপোক্রেট, তোর পাপার মতো হিপক্রেট আর একটা নেই, সেলফিশ একটা, লাস্ট ট্রেনের টিকিটটা একাই কেটে নিল,অথচ দেখ আমাকে ছারা কোনদিন কোথাও যেত না, সেলফিশ, জঘন্য লোক বলেই ঢুকরে কেঁদে উঠলো
নেশালের চোখও ভিজে উঠেছে, সে তার মাম্মাকে এক হাতে জরিয়ে ধরে বলল- পাপা সেলফিশ নয় মাম্মা, তুমি পাপার সাথে চলে গেলে আমি কেমন করে থাকবো

অদূরে দাঁড়িয়ে আছে শোয়েব। এস.এস গ্রুপের একজন বিশ্বস্ত প্রতিনিধি,নেশাল তার মাম্মাকে জরিয়ে ধরে শোয়েবের দিকে তাকালো
শোয়েব কাছে এসে বলল- জ্বি স্যার
-অনুপম আঙ্কেল, কুইক
শোয়েব যা বোঝার বুঝে গেল, তার ইনটেলিজেন্সি আর বিশ্বস্তার কারণে এস.এস গ্রুপে তার অবস্থান এত দৃঢ়

দশ মিনিটের মধ্যে অনুপম চলে এলো, তাকে একটা ক্লাস নিয়ে পাঠানো হয়েছে এখন জাস্ট উগরে দেয়া
অনুপম বলল – কি নেশাল এত রাত হয়ে গিয়েছে এখনো এখানে
– মাম্মা যেতে চাইছে না, দুরাত ধরে টোটালি ঘুম নেই মাম্মার
অনুপম বলল -নিতু আমিতো আই.সি.ইউ থেকে মাত্র এলাম মি.সাদাত ভালো আছেন, আশা করি খুব শীগ্রই কেবিনে দিয়ে দিব, নেশাল তোমার মাম্মাকে হোটেলে নিয়ে যাও
নিতু বলল -আমি এত দূরে যাব না, সাদাত যদি আমাকে খোঁজে
অনুপম বলল – ওকে ফাইন, নেশাল এখান থেকে আমার বাসা ওনলি টেন মিনিটস তুমি তোমার মাম্মাকে নিয়ে আমার ওখানে রেস্ট নিতে পার
নেশাল বলল-ফ্যান্টাসটিক! মাম্মা তুমি আঙ্কেলের সঙ্গে চলে যাও
– তুমিও চল, অনুপম বলল
– আমি যাব না, তারপর নিতুকে বলল মাম্মা জান তোমাকে কত পঁচা দেখাচ্ছে, পাপা কিন্তু এরকম অগোছালো একদম পছন্দ করে না,আমিও দেখে অভস্ত নই, প্লীজ নিজেকে সামলে
নাও
নিতু ওর হাতটা বারিয়ে নেশালের গালটা ছুঁয়ে দিল

নিতু আর অনুপম চলে যাবার পর শোয়েব বলল- কাজটা কি ঠিক হলো স্যার
মুখ গম্ভীর করে নেশাল বলল- মাম্মার রিফ্রেশ দরকার

রাত দশটা
অনুপম ওর ফ্ল্যাটের লক্ খুলে সুইচ অন করে আলো জ্বলে নিতুকে বলল “এস”
বেডরুমে গিয়ে একপলক চোখ বুলিয়ে নিল বাথরুমটাও চেক করে নিল অনুপম, নিতু অনুপমের ঘরের দেয়াল গুনতে লাগলো যেন এটাই মুখ্য উদ্দেশ্য, অনুপম নিতুকে টাওয়াল এগিয়ে দিয়ে বলল একটা হট শাওয়ার নিয়ে নাও ভালো লাগবে
কাবার্ড খুলে অনুপম বলল এখান থেকে যেটা তোমার পছন্দ পরতে পার
নিতু কাবার্ডের দিকে তাকিয়ে দেখলো বেশ কিছু থ্রিপিস অনুপমকে উদ্দেশ্য করে নিতু বলল এগুলো তোমার বউয়ের
অনুপম আনমনে বলল-হুঁ
– ঘরে নেই, দেখছি না যে
– তুমি দেখতে চাও
নিতু হেসে বলল অবশ্যই দেখতে চাই
-জেলাস ফিল হবে না?
-মোটেই না
-আমার বউকে দেখতে হলে তোমার চোখ বন্ধ করে আমার সঙ্গে আসতে হবে
– খুব সুন্দরী বুঝি
– তাতো জানিনা তবে প্রতি মুহূর্তে তার প্রেমে পরি
– তাহলেতো দেখতেই হয় বলে চোখ বন্ধ করে ফেললো।

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here