অপ্রেমের গল্পটা যেভাবে শুরু হয়েছিলো #পর্ব-৫,৬

#অপ্রেমের গল্পটা যেভাবে শুরু হয়েছিলো
#পর্ব-৫,৬
#সাবিকুন নাহার নিপা
পর্ব-৫

পথে যেতে যেতে বিন্তী আর তুষার গল্প করতে করতে গেল। তুষার প্রথমে একটু আড়ষ্টভাবে কথা বললেও খানিক বাদে মন খুলে কথা বলল। বিন্তীও হাসিমুখে তুষারের সঙ্গে কথা বলতে লাগলো।

দুজনেই নরমাল কথাবার্তা বলছে। পড়াশোনা, পছন্দের মুভি জনরা এসব। শিশির একটা কথাও বলল না কিন্তু কান খাড়া করে সব শুনলো। বিন্তী এতো কথা বলতে পারে দেখে অবাকও হলো। এই মেয়ে চ্যাটাং চ্যাটাং কথা ছাড়াও ভালো কথা যে জানে সেটা ওর ধারণা ছিলো না।

জ্যামে আটকে থেকে শেষমেস শপিংমলে পৌছালো। লিফটে ওঠার আগে বিন্তী জানালো যে লিফটে উঠতে ভয় লাগে।

শিশির বলল,

“এখানে লিফট ছাড়া আর অপশন নেই। তোমার শ্বশুর প্রধানমন্ত্রী না যে লিফট তুলে দিবে। ”

বিন্তীও কাটা কাটা গলায় জবাব দিলো,

“আমার শ্বশুরের ছেলেদের মধ্যে কেউ হাত ধরলেই হবে। লিফট না ওঠালেও চলবে। ”

তুষার সামনে এগিয়ে গিয়ে হেসে বলল,

“তোকে বলেছে। আমাকে না। ”

শিশির আর কথা বাড়ালো না। বিন্তীর কাছে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো। বিন্তীও বিনা বাক্যব্যয়ে শিশিরের হাত ধরলো আলতো করে।

একজন আরেকজনকে এই প্রথম স্পর্শ করা। পরিস্থিতি ভিন্ন হলে মুহুর্তটা হয়তো অন্যরকম হতে পারতো। সম্পর্কের সমীকরণ কিরকম হবে কারোরই জানা নেই। হয়তো এই মুহুর্ত টা কারোরই মনে রইলো না।

প্রথম সিড়িতে পা রেখেই বিন্তী শিশিরের হাত টা খামচে ধরলো। মাঝারি সাইজের নখের আচড় লাগলে শিশির একটু বিরক্ত হলো বটে তবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। অল্প কিছু সময়! ওই সময়টুকু বিন্তী হাত শক্ত করেই ধরে থাকলো। নিজের অজান্তেই শিশিরের হাত টা ভরসায় পরিনত হলো।

প্রথমে ওরা গেল শাড়ির দোকানে। তুষার বলল,

“ভাবী আমরা বাইরে থাকি। তুমি যাও। মহিলাদের দোকানে আমাদের যাওয়া ঠিক হবে না। ”

বিন্তী বলল,

“তোমরাও চলো। আমি একা একা কখনো শপিংমলে আসিনি। ”

অতঃপর দুজনেই বিন্তীর সঙ্গে গেল। বিন্তী শাড়ি বাছাবাছি করছিল। কোনো রঙ ই ঠিকঠাক পছন্দ করতে পারছে না। শিশির বিরক্ত হয়ে দেখছে শুধু, কিছু বলছে না। পাব্লিক প্লেসে এর সঙ্গে যত কম কথা বলা যায় ততই ভালো। কারণ কথা হজম করা এই মেয়ের ধাতে নেই। মুখ ছুটিয়ে কখন কী বেফাঁস কথা বলে ফেলে।

বিন্তীর শাড়ি বাছাবাছি দেখে তুষার বলল,

“ভাবী যেগুলো ভালো লাগছে নিয়ে নাও। তোমার শ্বশুর কিন্তু বউমার ব্যপারে একদম দিল খোলা। ক্যাশ টাকা না দিয়ে কার্ড দিয়ে দিয়েছে। তাই যা মন চায় নিয়ে নাও। ”

শিশির পাশেই ছিলো। তীর্যক হেসে বলল,

“যাহ! এবার তো একদম ফতুর করে ছাড়বে। মেয়েরা শপিং এর সময় বাপের টাকা ছাড় দিলেও অন্যদের ছাড় দেয় না। পরের টাকায় এরা দোকানশুদ্ধও কিনে ফেলতে পারে। ”

শিশির কথাগুলো একটু জোরে বলার কারণে বিন্তীর কানেও গেল। বিন্তী চুপ করে রইলো। তুষার বলল,

“চুপ কর তো। ”

“অভিজ্ঞতা আছে ব্রো। চুপ থাকার কিছু নেই। ”

তুষার শিশির কে কিছু বলল না আর। বিন্তী বলল,

“তোমাদের কিছু কেনার থাকলে কিনে ফেলো। আমার হয়ে গেলে আমি ফোন করব। ”

তুষার ভেবে দেখলো সেটাই ভালো হয়। শাড়ি কিনতে বিন্তী যে সময় লাগাচ্ছে, এরপর ওরা আর কিছু কেনার সময় পাবে না। তাই বিন্তীকে একা রেখে ওরা চলে গেল।

***
শিশির চার, পাঁচটা দোকান ঘুরে টিশার্ট, জুতা, সানগ্লাস কিনলো। এরপর তুষার আবার ঘুরে ঘুরে কিনলো। দুইঘন্টা পর ওরা শাড়ির দোকানের সামনে এসে দাঁড়াতেই দেখতে পেল বিন্তী দাঁড়িয়ে আছে। হাতে দুটো ব্যাগ। তুষার জিজ্ঞেস করলো,

“ভাবী হয়ে গেছে?”

“হু অনেকক্ষন আগে। ”

“তাহলে ফোন করলে না যে?”

বিন্তী হেসে বলল,

“তোমাদের কারোর ফোন নাম্বার তো আমার কাছে নেই। ”

দুজনেই মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। সত্যিই তো, বিন্তীর ফোন নাম্বার টা ওদের কাছে থাকা উচিত ছিলো। তুষার বলল,

“সরি ভাবী। একদম মনে ছিলো না।”

“আমারও মনে ছিলো না। সরি। ”

শিশির কোনো কথাই বলল না। ওর দৃষ্টি বিন্তীর হাতের দিকে নিবদ্ধ। মোটে দুটো ব্যাগ! এতেই কেনাকাটা শেষ! কিন্তু কোনো প্রশ্নও করলো না।

রেস্টুরেন্টে গেলে সেখানেও বিন্তী কফি ছাড়া কিছু খেল না। কিন্তু দুই ভাই গান্ডে পিন্ডে গিলল৷

ফেরার সময় তুষার গাড়ি চালাতে চাইলেও শিশির দিলো না। তুষার এবারও বিন্তীর পাশে বসলো। কিন্তু এবার আর গল্প জমলো না তেমন। টুকটাক একটা দুটো কথার পর পর ই বিন্তী চুপ হয়ে যেত।

****
শিরিন অবাক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“মোটে তিনটে শাড়ি কিনেছ? আর কিচ্ছু না?”

বিন্তী হাসলো। বলল,

“আমার তো টুকটাক সব জিনিসই আছে। ”

“সে কী কথা! সেগুলো বিয়ের আগের। বিয়ের পর তো শ্বশুরবাড়ির জিনিসপত্র ব্যবহার করতে হয়। ”

“ওসব আসলে মিথ চাচী। আমার যেহেতু আছে তাই শুধু শুধু কিনে পয়সা নষ্ট করতে ইচ্ছে হয় নি। ”

“পয়সা নষ্টের কথা আসছে কেন? তোমার সঙ্গে যদি আগে থেকে কথাবার্তা হয়ে বিয়ে হতো তাহলে আমরা তো সব দিতাম ই। ”

“থাক। আমার আপাতত আর কিছু লাগবে না। লাগলে চেয়ে নেব। ”

শিরিনের ব্যাপার টা একদম ভালো লাগলো না। মেয়েটা বাপের বাড়ি যাবে, সেখানে লোকজন আসবে শ্বশুরবাড়ি থেকে কী দিলো দেখতে। তখন কী ওদের সম্মান থাকবে। সবাই তো ভাববেই যে লোক দেখানো ভালোমানুষ। বিন্তীর উপর প্রচন্ডরকম বিরক্ত হলো।

****
শিশির শুয়ে শুয়ে মোবাইলে গেম খেলছিল। গত দুই তিন দিনে ওর উপর ঘূর্নিঝড়, টর্নেডো সব বয়ে যাচ্ছে। আজ বিকেলে বিন্তীর বাবা আর ভাই এসেছিল। তাদের সামনে মুখে প্লাস্টিকের হাসি ঝুলিয়ে বসে থাকতে হলো। বিন্তীর মা একটু অসুস্থ বলে তারা রাতে আর থাকে নি। চলে যাবার পর শিশির স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যেন আপদ বিদায় হয়েছে।

রাতে খেয়েদেয়ে বিছানায় শুয়ে গেম খেলছিল। এরমধ্যে হন্তদন্ত হয়ে শিরিন এসে বলল,

“শিশির বিন্তীকে তুই কী বলেছিস?”

শিশির অবাক গলায় বলল,

“কিছু তো বলিই নি। আমি ওর সঙ্গে মেপে কথা বলি। ওই মেয়ে বেফাঁস কথা বলায় ওস্তাদ। ডেঞ্জারাস জিনিস। ”

“শপিংমলে শাড়ি কেনার সময় কী বলেছিস?”

শিশির এতক্ষনে ব্যাপার টা বুঝলো। বলল,

“এসে তোমাকে নালিশও করে ফেলেছে? যা শুনেছো সেটাই বলেছি৷ ”

“বিন্তী কিছু বলে নি। তুষার বলেছে। কী বলেছিস কেনাকাটা, টাকা পয়সা নিয়ে। ”

শিশির বিরক্ত গলায় বলল,

“আরে মা এতো জেরা কেন করছ? কী এমন বলেছি! বলেছি যে অন্যের পয়সা হাতে পেলে মেয়েরা দোকানশুদ্ধও কিনে ফেলে। নিজের টাকায় কেনার সময় হাত দিয়ে পয়সা বেরোয় না। ”

শিরিন আগে থেকেই রেগে ছিলো। এই কথা শুনে আরও রেগে গেল। বলল,

“তোর যে অনেক মেয়ে চেনা হয়ে গেছে তা তো জানতাম না। ”

শিশিরেরও এবার মেজাজ খারাপ হলো। বলল,

“কী শুরু করেছো মা? তোমরা আমাকে শান্তি দিবে না?”

“এক পাল্লায় সবাই কে মাপা ঠিক? তোর ভাষ্যমতে দুনিয়ার সব মেয়েই অমন। বিন্তীও তাই। তোর বাবার সঙ্গে আমার বিয়ে দিয়েছিল তার টাকা পয়সা, স্ট্যাবলিশড ক্যারিয়ার দেখে। এরপর তো তাহলে আমাকেও ওই সব মেয়েদের লিস্টে ফেলবি তাই তো?”

শিশির বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলো। শিরিন বলল,

“এক হাতের পাঁচ আঙুল সমান না। আর মানুষ হাড়িতে সেদ্ধ হওয়া চাল না যে একটা টিপে বাকীগুলোও জাজ করবি। পরিস্থিতি খারাপ বলে মেয়েটা বিপদে পড়েছে, তাই বলে যা খুশি বলে দিবি!”

শিশির চুপ করে রইলো। শিরিন আর কিছু বলল না, চলে গেল।

মা যাবার পর শিশিরের খানিকটা খারাপ লাগলো। বিন্তী সম্ভবত সেকারণে আর কিছু কিনে নি। এই ব্যাপার টা বুঝতে ওর এতো সময় লাগলো!

মায়ের কথাই ঠিক। বিন্তীকে ও কতটুকুই বা চিনে! দুদিনের কথাবার্তা আর আলাপে তো আর একজন কে জাজ করা যায় না।

***
পরদিন সকালে খাবার টেবিলে শিশির মা’কে বলল,

“মা আমি বিন্তীর সঙ্গে যাব। ”

বিন্তী আর তুষার দুজনেই অবাক হলো। শিশির চোরাচোখে একবার বিন্তীকে দেখলো। কালকের ঘটনার জন্য সরি বলা সম্ভব না। ইগোতে লাগবে। তবে সঙ্গে গেলে যদি একটু খেসারত দেয়া যায়।

চলবে….

#অপ্রেমের গল্পটা যেভাবে শুরু হয়েছিলো
#পর্ব-৬
খাওয়া দাওয়ার পর বিন্তী তুষারকে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“ব্যাপার টা কী হলো?”

“শিশির তোমার সঙ্গে যেতে চাইছে সেই ব্যাপার টা? ”

“হ্যাঁ। চাচা কী এক ডোজ দিয়েছে?”

“না। আমার মনে হয় একা বউকে পাঠাতে তোমার বরের খুব কষ্ট হচ্ছে তাই।”

বিন্তী বলল,

“ধ্যাৎ! অন্য কোনো ঝামেলা আছে। পেটে অন্য শয়তানি গুড়গুড় করছে। ”

“সে যাই হোক। তোমার সঙ্গে পারবে না। ”

বিন্তী চোখ সরু করে বলল,

“কমপ্লিমেন্টের জন্য থ্যাংকস। ”

***
পরদিন বিকালে দুজনের যাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। তুষারের যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও শিরিন যেতে দিলো না। গাড়ির পরিবর্তে ওদের ট্রেনে করে যাবার ব্যবস্থা করা হলো। শিরিন ভালো করে বুঝিয়ে দিলো যে দু’দিন যেন কমপক্ষে থাকে। আর শিশির যেন একটু রয়েসয়ে কথাবার্তা বলে।

কমলাপুর থেকে দুজন ট্রেনে উঠলো। ট্রেনে উঠেই শিশির মোবাইলে ব্যস্ত হয়ে গেল। বিন্তী একাই বসে আছে। পাশাপাশি দুজন বসে আছে কিন্তু কথাবার্তা হচ্ছে না। ট্রেন চলতে শুরু করলো। কিছু সময় এভাবেই কাটলো। একটা স্টেশনে ট্রেন থামতেই বিন্তী দুই প্যাকেট চিপস কিনলো। একটা নিজের জন্য রেখে অন্যটা শিশির কে দিলে শিশির নাক শিটকে বলল,

“আমি এগুলো খাই না। ”

“কেন? কম দাম বলে?”

“এসব টেস্টলেস জিনিসে অনিহা আছে।”

বিন্তী আর কথা বাড়ালো না। খেতে শুরু করলো। বিন্তীর খাওয়া দেখে শিশিরের মনে হলো ফিরিয়ে দেয়াটা ভুল হয়েছে। খেয়ে নিলেই হতো। লজ্জা, সংকোচে চাইতেও পারছে না।

পরের স্টেশনে ট্রেন থামলে শিশির উঠে দাঁড়ালো নামার জন্য। বিন্তী বলল,

“কোথায় যাচ্ছো?”

“কিছু খাবার আনতে। ”

“তাড়াতাড়ি এসো। ”

শিশির দাঁত বের করে বলল,

“না ওখানে থেকে যাব আরেকটা বিয়ে করার জন্য। ”

বিন্তী আর কিছু বলল না। শিশির নেমে গেল। কাছের দোকানগুলোতে ওর পছন্দের খাবার না পেয়ে প্ল্যাটফর্মের ভেতরের দিকে গেল। সেখানে লোকজন বেশী থাকায় একটু দেরি হলো। তখনই ঘটলো অঘটন। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। শিশির খাবারের প্যাকেট হাতে নিয়ে দৌড়ে এলেও ট্রেন ধরতে পারলো না। প্যাকেট হাতে নিয়েই ট্রেনের পিছনে দৌড়াচ্ছে৷ বিন্তী জানালা দিয়ে তাকিয়ে হাত নেড়ে ডাকছে। ট্রেন চলে গেল। শিশির কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ওর কাছে না আছে বিন্তীর ফোন নাম্বার, আর না আছে ফেসবুক আইডি।

শিশির প্ল্যাটফর্মে বসে পড়লো। কিছু কৌতুহলী লোকজন এসে এটা, ওটা প্রশ্ন করছে। তাদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানলো এটাই নাকি ওই রুটের লাস্ট ট্রেন। এরপর আর ট্রেন পাওয়া যাবে না। শিশিরের মাথা কাজ করছিল না। সেই সময় তুষার ফোন করলো।

শিশির ফোন তুলেই বলল,

“ভাই ট্রেন মিস করছি। ”

“হ্যাঁ শুনেছি। ভাবী ফোন করেছিল। ”

“এখন কী করব? ফিরে আসব?”

“কী বলছিস? ভাবী একা একা যাবে? ”

“লোকজন বলছে এটাই লাস্ট ট্রেন। ”

“তুই ভাবীর সঙ্গে কথা বল। ভাবীকে আমি তোর ফোন নাম্বার দিয়েছি। এক্ষুনি হয়তো ফোন করবে। ”

শিশির ফোন রাখার সঙ্গে সঙ্গেই বিন্তীর ফোন এলো। বিন্তী বলল,

“শিশির তুমি ঠিক আছ?”

“ঠিক না থাকার কী আছে? ট্রেন মিস করেছি বলে হাটুমুড়ে কাঁদতে বসে যাব!”

“বারবার বলেছিলাম যে তাড়াতাড়ি এসো। এসব স্টেশনে ট্রেন বেশীক্ষন থাকে না। ”

“জ্ঞান দিও না তো। ”

“আচ্ছা এখন কী করবে?”

“আমি বাড়ি ফিরে যাই। তুমি একা চলে যাও। ”

বিন্তী কঠিন গলায় বলল, না। এরপর যে ট্রেন আসবে সেটাতে উঠে নেক্সট স্টেশনে নামবে। আমি সেখানেই অপেক্ষা করব। আমি একা কোথাও যাব না। ”

শিশির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আচ্ছা।

ফোন রেখে শিশির ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে। কিছুক্ষন বাদে শিরিন ফোন করলো শিশির কে। তুষারের কাছে খবর যাওয়া মানে সারা পাড়া জানা। যেন মাইক নিয়ে সবাইকে বলে বেড়ায়।

শিশির ফোন তুলে ক্লান্ত গলায় বলল,

“হ্যালো। ”

“ট্রেনে উঠতে না উঠতেই তোর ক্ষিদে পেয়ে গেল? কী আক্কেল তোর। ”

শিশির অতিসন্তঃর্পনে দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে বলল,

“আমি কী জানতাম যে এভাবে ছেড়ে দিবে।”

“তুই নাকি অসভ্যের মতো ফিরে আসতে চাইছিস?”

“বিন্তীর সঙ্গে কথা হয়েছে। পরের স্টেশনে নেমে ও অপেক্ষা করবে। ”

“হ্যাঁ সেটাই কর। ভুলেও বাড়িতে আসবি না। ”

শিশির ফোন রেখে দিলো। এই বিন্তী মেয়েটার সঙ্গে বিয়ে হবার পর থেকে মুসিবত যেন পিছু ছাড়ছেই না। আস্ত মুসিবত কপালে জুটেছে আর কী চাই জীবনে।

***
ট্রেন এলো সন্ধ্যার পর। সেই ট্রেনে শিশির উঠলো। বসার জায়গা পেল না তাই দাঁড়িয়েই যেতে হলো। দুইঘন্টা পর নেক্সট স্টেশনে পৌছালো। বিন্তী দেখলো শিশির প্ল্যাটফর্মের দিকে আসছে। খাবারের প্যাকেট এখনো সঙ্গে আছে। বিন্তী হেসে ফেলল। শিশির বলল,

“আমার অবস্থা দেখে তোমার হাসি পাচ্ছে?”

“হ্যাঁ। ”

“বেশ তাহলে প্রাণ খুলেই হাসো৷ গড়াগড়ি খেতে খেতে হাসো। ”

বিন্তী শব্দ করে হেসে ফেলল। রাত নয়টা বেজে গেছে ইতিমধ্যে। শিশির বলল,

“এরপর কী করবে?”

“এখানেই রাত টা পার করে দিলেই হয়। ”

“তুমি আমার সঙ্গে ইয়ার্কি করছো?”

“না। ঘাড়ত্যাড়া লোকের সঙ্গে ইয়ার্কি করা যায় না। ”

শিশির কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। বিন্তী বলল,

“সাড়ে দশটায় বাস আছে। সেই বাস ধরতে হবে। ”

শিশির বিড়বিড় করে বলল,

“শালা বিয়েতে এতো জ্বালা আগে জানলে রাজীই হতাম না। তারচেয়ে ভিক্ষের থালা হাতে নিতে রাজী হওয়াই ভালো ছিলো। ”

বিন্তী হাসলো৷ দুজনেই বাস স্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিন্তী বলল,

“শিশির হাতে তো সময় আছে৷ ভালো করে খেয়েদেয়ে বাসে উঠো কেমন। মাঝ রাস্তায় বাস থামলে তখন আবার নামতে যেও না। এতো টেনশন নিতে পারব না।”

শিশির সিদ্ধান্ত নিলো আজ রাতে ও না খেয়ে থাকবে। এই মেয়ে নাহলে কথা দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়েই মেরে ফেলবে।

শিশির বলল,

“আমার জন্য তোমাকে কেউ টেনশন করতে বলেছে? তুমি গেলেই পারতে!”

“আমি তোমার মতো স্বার্থপর নই। ”

শিশির অবাক গলায় বলল,

“আমি স্বার্থপর! ”

“তা নয়তো কী? আমি একা একা এতো পথ যাব আর তুমি বাড়ি ফিরে যাবে। এটা স্বার্থপরের কাজ না। ”

শিশির দাঁত কিড়মিড় করে বলল, হ্যাঁ আমিই তো স্বার্থপর। এইজন্যই তো বিয়ে করে উদ্ধার করেছিলাম।

“আমিতো না করেছিলাম। শুনলে না তো। এইজন্যই বড়দের কথা শুনতে হয়। ”

শিশির রাগী চোখে তাকালো। বিড়বিড় করে বলল,

“সেই ব্যটা খুব বাঁচা বেঁচে গেছে। মাঝখান দিয়ে আমি ফেঁসে গেলাম। ”

বিন্তী হঠাৎ অন্যরকম গলায় বলল,

“বাড়ি থেকে ফিরে তোমাকে আর আমার জন্য কিছুই করতে হবে না। তুমি তোমার মতো, আর আমি আমার মতো। কথা দিচ্ছি যে আর কপাল চাপড়াতে হবে না। ”

“এই তুমি এতো কথা বলো কেন? শুনেছিলাম তো খুব ভালো মেয়ে!”

বিন্তী ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“তাই?”

“হ্যাঁ। ভালো মেয়ে, ভালো মেয়ে করেই তো সবাই মুখে ফেনা তুলে ফেলল। আর আমিও নাচতে নাচতে বিয়েতে রাজি হলাম। ”

“আমি তো শুনেছি ভিক্ষের থালা হাতে নিতে পারবে না বলে রাজী হয়েছো। ”

শিশির চুপ করে রইলো। এই মেয়ের সঙ্গে কথায় পারবে না। কথা দিয়ে পরাস্ত করার জন্য বিদেশ থেকে পিএইচডি করে এসেছে শিওর।

বিন্তী বলল,

“শিশির তুমি নিজে কী খুব ভালো ছেলে?”

“মানে?”

“মানে আমি শুনেছি যে যেমন তার সঙ্গে জুটেও তেমন। আমি খারাপ হলে লজিক্যালি তুমিও খারাপ। ”

“তোমার সঙ্গে আসাই ভুল হয়েছে। উফ!”

“আর একটা কথা বলেই মিউট হয়ে যাব। তুমি যদি ভালো হতে তবে আমিও তোমার সঙ্গে ভালো হবার চেষ্টা করতাম। তুমি খারাপ তাই আমিও খারাপ। ”

শিশির মনে মনে বলল, তুই আর ভালো! তুই তো আস্ত ডাইনি। না ডাইনিরাও তোকে দেখলে লজ্জায় আত্মহত্যা করবে। তুই তার চেয়েও খারাপ। তোকে শায়েস্তা করার অস্ত্র আমার কাছে আছে। পাগলা কুত্তা লেলিয়ে দেব। কেঁদেও কুল পাবি না। পাগলা কুত্তার চেয়েও খারাপ জিনিস ঝুম্পাকে দিয়ে তোকে যদি শায়েস্তা না করিয়েছি তাহলে আমি নিজের নাম বদলে রাখব।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here