অপ্রেমের গল্পটা যেভাবে শেষ হয়েছিলো #শেষ পর্ব

#অপ্রেমের গল্পটা যেভাবে শেষ হয়েছিলো
#শেষ পর্ব

শিশির বাবার সঙ্গে পার্কে বসে আছে। দুজনের মধ্যে দূরত্ব এক হাত সমান। শিশিরের বাবা গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“এটাই তোমার শেষ সিদ্ধান্ত। ”

“হুম।”

“তোমার মা, বিন্তী, তুষার এদের কাউকে জানাতে চাইছ না?”

“না। আমি পরে সবাইকে বুঝিয়ে বলব।”

“তুমি কী আমাদের থেকে পালাতে চাইছো শিশির? তোমার সত্যিই মনে হয় আমরা তোমাকে ভালোবাসি না।”

শিশির বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“বাবা এখন আর সেটা মনে হয় না। আমি আমার সমস্যা গুলো কাটিয়ে উঠতে চাই। তোমাদের সঙ্গে থেকে সেগুলো সম্ভব না।”

“আমরা তোমাকে সাহায্য করব। এতোদিন তোমার পাশে না থাকতে পারলেও এখন থাকব। আমাদের কী আরেকবার ভরসা করা যায় না?”

শিশির বাবার হাত ধরে বলল,

“আমি তোমাদের ভরসা হতে চাই বাবা। তোমার, মায়ের, আর…

শিশির কথাটা শেষ করলো না। একটু চুপ থেকে আবারও বলল,

“বাবা আজ সারাদিন নিজের মতো ঘুরেফিরে একটা বিষয় উপলব্ধি করেছি। আমার দেখা জীবন টা আসল জীবন না। এর বাইরেও আরেকটা জীবন আছে। গাড়ি ছেড়ে রিকশায় চড়তে আমার আজ ভালো লাগলেও রোজ রোজ ভালো লাগবে না। ফুটপাতে কিছুসময় হেটেই পা ব্যথা হয়ে গেছে। আমি আসলে আরাম আয়েশে অভ্যস্ত। তোমাদের সঙ্গে থাকলে এগুলো ছেড়ে নিজের উপর ডিপেন্ড হতে হয়তো কোনোদিনও পারব না।”

শিশিরের বাবা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

“আমার যা কিছু সব তোমাদেরই শিশির। তোমাদের ভবিষ্যৎ ভেবেই কিন্তু দিন রাত খেটেছি। ”

“আমি জানি বাবা। সেসব অস্বীকার করছি না। তোমার সাহায্য তো নিচ্ছি ই। তোমার সাহায্য নিয়ে আমি নিজের জন্য কিছু করতে চাই। সবচেয়ে বড় কথা হলো আমি নিজেই নিজের ভরসা হতে চাই।”

“বেশ! তাহলে কী করবে?”

“বাবা আমি হোটেল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে দেশের বাইরে পড়তে চাই। বাড়িতে জানাবো যে তিন মাসের ট্যুরে যাচ্ছি। এই তিন মাসে তুমি সব ব্যবস্থা করে দেবে। পড়া শেষ করে আমি ফিরে আসব। আমি কিন্তু তোমার সাহায্য নিচ্ছি। কারণ আমার নিজের কোনো জোর নেই।”

শিশিরের বাবা আস্তে করে বলল,

“তোমার মা খুব কষ্ট পাবে।”

“আমি ফিরে আসার পর আমাকে দেখে খুব খুশি হবে। ”

“আর বিন্তী?”

শিশির চোখ নামিয়ে নিলো। কিছু বলল না।

“বিন্তীকে অন্তত তোমার জানানো উচিত। ”

“সময় মতো নিশ্চয়ই জানাবো। ”

পার্ক থেকে বেরিয়ে শিশির গাড়িতে উঠলো। পাশে বাবা বসে আছেন। এক হাত দিয়ে শিশির কে ধরে আছেন। শিশিরের চোখ ঝাপসা হয়ে আছে। গাড়ির কাঁচগুলো ঝাপসা লাগছে। শহরের বিলবোর্ড, হেডিং সব কেমন ঝাপসা। আহা মায়া! শিশিরের এতো খারাপ লাগছে। ঘন্টার পর ঘন্টা জ্যামে থেকে এই শহরের গুষ্টি উদ্ধার করেছে কতো! অথচ আজ এতো খারাপ লাগছে। শিশিরের আসলে কার জন্য খারাপ লাগছে! শহর নাকি শহরের মানুষগুলোর জন্য।

***
বিন্তী ফিরেছে খুব ভোরে। শিশির তখন ঘুমিয়ে ছিলো। বিন্তী খানিকক্ষন অপেক্ষা করে অন্য ঘরে ঘুমিয়ে গেছে। সারা রাতের জার্নি আর ক্লান্তিতে দু’চোখ আর মেলে রাখতে পারে নি। ঘুম ভাঙার পর শুনলো শিশির বেরিয়ে গেছে। ফোন টাও বাড়ি রেখে গেছে। সারাদিনে আর ফেরার নাম নেই। বিন্তী সারা দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা অপেক্ষা করলো। এই অপেক্ষার যন্ত্রণা যে কতো ভয়ানক!

শিশির ফিরলো রাতে। বিন্তী ঘরেই ছিলো। শিশির কে দেখে দাঁড়িয়ে বলল,

“সারাদিন কোথায় ছিলে?”

শিশির একদম অন্যরকম গলায় বলল,

“কেমন আছ বিন্তী?”

বিন্তী সেকথার জবাব না দিয়ে বলল,

“আমি আজ সকালে ফিরেছি শিশির।”

“হ্যাঁ জানি। ”

“জেনেও এতো দেরি করে ফিরলে? ”

“সকালে যেহেতু ফিরেছো তখন রাতে এলে পাব। এটা ভেবে আর তাড়া দেখাই নি। ”

বিন্তী চুপ করে রইলো। শিশির অন্যরকম গলায় কথা বলছে। বিন্তী ভেবেছিল শিশির আগের মতো কয়েক দফা ঝগড়া করবে। কিন্তু সেসব কিচ্ছু না। বিন্তী অভিমানী গলায় বলল,

“তুমি এবার আমাকে আনতে গেলে না কেন?”

“তুমি নিজের ইচ্ছেতে গেছো। আমি আনতে যাব কেন?”

“আমি তো নিজের ইচ্ছেয় আগেও যেতাম। তখন তো আনতে যেতে।”

“তখন ভুল করেছি। আসলে আমি তো একটু পাগল টাইপ। তুমি তো জানোই।”

বিন্তী থেমে গেল। এই ছেলেটা এভাবে কেন কথা বলছে!

শিশির বলল,

“আমি কয়েকমাসের জন্য দেশের বাইরে যাচ্ছি বুঝলে। দুই তিন দিনের মধ্যেই যাব। যাবার আগে তোমাকে ফোন করতাম। ”

বিন্তী চমকে উঠে বলল,

“দেশের বাইরে কোথায়? কেন?”

“ইন্ডিয়া দিয়ে শুরু করবো। বোরিং লাইফ আর ভালো লাগছে না। তাই ট্যুর ফুর দিয়ে বাবার টাকার শ্রাদ্ধ করব আর কী।”

শিশির কথাটা বলে হাসলো। বিন্তী হ্যাঁ, না কিছু বলল না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো।

***
বিন্তী শিরিনের কাছে গিয়ে বলল,

“মা শিশির নাকি ট্যুরে যাচ্ছে?”

“হ্যাঁ শুনলাম।”

“ও কী আমার উপর রেগে যাচ্ছে?”

“সে আমি কী জানি! ”

“আপনি একটু জিজ্ঞেস করেন না?”

শিরিন হেসে বলল, বিন্তী স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক টা একান্ত দুজনের হওয়া উচিত। রাগ, অভিমান, ভালোবাসা সবটুকু দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। সব সম্পর্কে স্পেস দরকার। তোমার আর শিশিরের সম্পর্কে আমি যেমন ঢুকব না তেমনি আমাদের মা ছেলের সম্পর্কেও তুমি ঢুকবে না। ঢোকা উচিত না। এতেই সম্পর্ক ভালো থাকে।

বিন্তী বলল,

“আপনিও আমার উপর রেগে আছেন?”

“রাগ থেকে কথাগুলো বলছি না। আজ অবধি তোমাদের কোনো ব্যাপারে আমি কিন্তু কিছু বলিনি। শিশিরের বাবা অনেকবার বলতে বললেও আমি বলিনি। কারণ তোমরা দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ে। সেখানে শাশুড়ি কিংবা মা হিসেবে আমার কিছু বলা ঠিক না। এক বিছানায় পাশাপাশি শুয়েও তোমাদের দাম্পত্য জীবন আর দশ টা ছেলেমেয়ের মতো কেন নয় এই প্রশ্ন কখনো করিনি আর ভবিষ্যতেও করব না। ”

বিন্তী নরম গলায় বলল,

“ওই দিন রেগে বাড়ি ছেড়ে যাওয়া আমার একদম উচিত হয় নি। আপনারা সেজন্য রেগে আছেন। ”

“ওইদিন বাড়ি ছেড়ে গিয়ে তুমি একটা ব্যাপার বুঝিয়ে দিয়েছো যে এই বাড়িটা এখনো তোমার হয়ে ওঠে নি। ঝগড়া, মান, অভিমান তো সবারই হয়। বাবা ছেলে, ভাই বোন, মা ছেলে সবার হয়। তেমনি স্বামী স্ত্রীরও হয়। এটা সংসারের নিয়ম। তাই বলে বাড়ি ছেড়ে যাওয়া কোনো সমাধান না। এই বাড়ি যতটা শিশিরের ততোটা তো তোমারও। রাগ হলে সেটা বাড়িতে থেকে দেখাও। বাড়ির বাইরে কেন যেতে হবে!

বিন্তীর মুখ দেখে শিরিনের মায়া হলো। এতোগুলো কথা বিন্তীকে না বলেও পারছিল না। শিরিন বিন্তীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“যা ই হোক এরপর আর বাড়ি ছেড়ে যাবে না। শ্বশুর বাড়ি, বাপের বাড়ি বলে কোনো কথা নেই। তুমি যে বাড়িটায় থাকো সেটা তোমার বাড়ি। নিজের বাড়ির সবগুলো মানুষ তো আর এক হয় না। হাতের পাঁচ আঙুলের মতোই আলাদা আলাদা। সেসব বুঝতে হবে।”

বিন্তী নিঃশব্দে কাঁদছে। বলল, আমি এই কথাগুলো মনে রাখব মা।

***
শিশিরের আজ চলে যাবার দিন। বিন্তী বেশ বুঝতে পারছে যে শিশিরের মনে পাহাড় সমান অভিমান জমে আছে। আগের মতো কথা বলে না। যা জিজ্ঞেস করে তার বাইরে কিছু জিজ্ঞেসও করে না। গত রাতে বিন্তী শিশিরের ব্যাগ গুছিয়ে দিতে দিতে বলল,

“এতো দিন আমাদের সবাই কে ছেড়ে থাকবে খারাপ লাগবে না?”

“সারাদিন তো ঘুরেফিরে বেড়াব। অতো খারাপ লাগবে না।”

বিন্তী হাসলো। বলল,

“আমার কিন্তু ভীষণ খারাপ লাগবে।”

শিশির এক পলক বিন্তীকে দেখে বলল,

“প্রথম প্রথম লাগবে। তারপর সয়ে যাবে। ব্যস্ত হয়ে গেলে আর খারাপ লাগবে না।”

“ব্যস্ত কিভাবে হবো?”

“চাকরি করবে বলছিলে না….

“তুমি কিন্তু চাইছিলে না…..

” আরে ধ্যাৎ! আমার আবার চাওয়া! আমার মতো পাগল ছাগলের কথায় তুমি কবে গুরুত্ব দিয়েছিলে!”

সামান্য একটা কথা অথচ এই কথার মধ্যেই আক্ষেপ লুকিয়ে আছে। সত্যিই তো কবে শিশিরের কথায় বিন্তী গুরুত্ব দিয়েছিল। মনে মনে বলল,

“এরপর দেব শিশির।”

রাতে শেষ বারের মতো দুজন পাশাপাশি ঘুমালো। বিন্তী বলল,

“আমি যদি তোমার বুকে মাথা রাখি তাহলে কী তোমার অসুবিধে হবে?”

শিশির আমতা আমতা করে বলল,

“ঘুম হবে না সম্ভবত। ”

“চলেই তো যাচ্ছো। একরাত নাহয় না ঘুমালে!”

শিশির কিছু বলল না। বিন্তী এসে শিশিরের বুকে মাথা রাখলো। শিশির খানিক বাদে বিন্তীর চোখের জলের স্পর্শ পেল। তবুও চুপ করে রইলো। একটা নির্ঘুম রাত কাটিয়ে দিলো দুজন মিলে।

***
যাবার আগে বিন্তী শিশির কে বলল,

“ভালো থেকো।”

“তুমিও। ”

“আমি তোমাকে প্রতিদিন ফোন করব।”

“তোমার করার দরকার নেই। আমি করব। ”

“আমি অপেক্ষায় থাকব।”

শিশির মৃদু হেসে বলল,

“নিজের খেয়াল রেখো।”

বিন্তী এগিয়ে এসে শিশির কে জড়িয়ে ধরলো। শিশিরও ধরলো আলতো করে। বিন্তী কানে কানে বলল,

“পাগল শিশির কেই আমার বেশী ভালো লাগতো। বুঝতে বড্ড দেরি করে ফেললাম গো।”

শিশির একটাও কথা বলল না। মনে মনে বলল,

“আল্লাহ আমাকে আরেকটু ধৈর্য্য দাও।”

***
বিন্তী এয়ারপোর্টে যায় নি। তুষার, শিরিন আর শিশিরের বাবা গেছে। তুষার শিশিরের একটা হাত ধরে বলল,

“তোকে খুব মিস করব।”

শিশির হাসলো। তুষার বলল,

“তুই করবি না?”

“হু।”

“তুই কী আমার উপর রেগে আছিস? ”

“তোকে সেদিন ওইভাবে মারার পরও তুই একটু রাগলি না। আমি কিভাবে রেগে থাকি! ”

তুষার হেসে বলল, তোর তো মারা জায়েজ আছে। একশ বার মারবি।

শিশিরও হেসে ফেলল।

এয়ারপোর্টে এসে শিরিন শিশির কে একা ডেকে নিয়ে বলল,

“তুই অনেক দিনের জন্য যাচ্ছিস না?”

“বাবা তোমাকে বলে দিয়েছে?”

শিরিন বলল, আমার একটুও কষ্ট হচ্ছে না। একজন নতুন শিশিরের অপেক্ষায় থাকব। তাড়াতাড়ি ফিরিস।

শিশির মা’কে জড়িয়ে ধরলো। শিরিন সত্যিই কাঁদছে না। শিশির কাঁদছে ফুপিয়ে ফুপিয়ে। অনেক দিন বাদে শিশির এভাবে কাঁদলো।

শিশির চোখ মুছতে মুছতে বলল,

“সাবধানে থেকো মা। তুমি কিন্তু একটু বেশী ভালো মহিলা। অনেকেই তোমার জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যায়। একটু সাবধানে জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখো। ”

শিরিন হেসে বলল,

“তোর রেখে যাওয়া সবচেয়ে দামী জিনিস আমি মাথায় করে রাখব। কেউ চুরি করে নিতে পারবে না।”

শিশির কাঁদতে কাঁদতেই হেসে ফেলল।

***

সন্ধ্যে নেমেছে অনেকক্ষন। বিন্তী বিছানায় শুয়ে ছিলো। শিশির যে জায়গায় ঘুমায় সেখানে এখনো ওর গন্ধ লেগে আছে। ছেলেটা’কে ও শিক্ষা দিতে চেয়েছিল উল্টো ও’কেই শিক্ষা দিয়ে চলে গেল। বিন্তী বিছানা ছেড়ে উঠে ডায়েরির খোঁজ করতে গেল। ওই ডায়েরিতে অপ্রেমের গল্পের শুরু টা আছে। শেষ টা কবে লেখা হবে কে জানে!

বিন্তী ডায়েরি খুঁজে পেল না। তন্ন তন্ন করে সারা ঘর খুঁজেও ডায়েরি পাওয়া গেল না। শিশির নিয়ে গেছে। ডায়েরি খুঁজে না পেয়েই বিন্তী সব টা বুঝে ফেলল। বিন্তী দু’হাতে মুখ ডেকে কেঁদে উঠলো। ততক্ষণে শিরিন রাও সবাই এসে গেছে। শিরিন এসে বিন্তীকে জড়িয়ে ধরতেই বিন্তী বলল,

“মা শিশির আমাকে এতো বড় শাস্তি কেন দিলো! আমার ডায়েরিও নিয়ে গেছে।”

শিরিন নিজেও কাঁদতে লাগলো। বলল,

“তোমার ধৈর্যের পরীক্ষা দেবার পালা। ধৈর্য্য ধরো।”

বিন্তী ব্যকুল হয়ে কাঁদতে লাগলো।

***
ডায়েরি ভর্তি শিশিরের সব কথা লেখা। খুটিনাটি সব। অপ্রেমের গল্পের শুরুটা তো বিন্তী লিখেছিল। শেষ টা কী শিশির লিখতে পারবে!

….সমাপ্ত….

1 COMMENT

  1. এভাবে শেষ কেন করলেন। সিজন ২কি আসবে??যদি আসে তাহলে আরলি দিয়েন প্লিজ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here