অপ্রেমের গল্পটা যেভাবে শুরু হয়েছিলো #পর্ব-২১,২২

#অপ্রেমের গল্পটা যেভাবে শুরু হয়েছিলো
#পর্ব-২১,২২
#সাবিকুন নাহার নিপা
পর্ব-২১

বিন্তী বাড়িতেই রইলো। বাকীরা শিশির কে ছাড়ানোর জন্য গেলেও বিন্তী গেল না। মিশুক শিশিরের অনেক দিনের বন্ধু। শিশিরের রাগের সঙ্গে পরিচিত আছে বলেই হয়তো থানায় আর অভিযোগ করলো না। বলল, ওদের কথা কাটাকাটি হয়েছে বলে শিশির ও’কে মেরেছে।

এ যাত্রায় শিশির বাড়ি ফিরলো। জেল হাজতে আর থাকতে হলো না। মারামারির পরও ওর হেলদোল নেই। একদম শক্ত মুখে বসে আছে। শিশিরের বাবা ছেলের কোনো ব্যাপারেই তেমন কথা বলেন না। নিজের মতোই ছেড়ে দিয়েছে। নিজের মতো ছেড়ে দেবার ফল হিসেবেই বোধহয় আজকের দিন টা দেখতে হলো।

বাড়ি ফিরে শিশিরের বাবা কোনো প্রশ্ন উত্তর পর্বে না গিয়েই শিশির কে কয়েকটা থাপ্পড় মারলো। শিশির শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মারার পর শিরিনের উদ্দেশ্যে শিশিরের বাবা বললেন,

“ও যেন এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। আমি আর একটা পয়সাও ওর পিছনে খরচ করতে রাজি নই। ”

বাকীরা কেউ কোনো কথা বলল না। সবাই ই আজ বিরক্ত ওর কাজের জন্য। বিন্তী এতক্ষন চুপ করে থাকলেও এবার বলল,

“চাচা আমার কিছু কথা আছে। ঘুরিয়ে পেচিয়ে বলার চেয়ে সরাসরিই বলি, আমি আর শিশিরের সঙ্গে থাকতে চাই না।”

সবাই ই অবাক হলো। সবচেয়ে বেশী অবাক হলো শিশির। বিন্তী এইরকম গলায় এর আগে কখনো কথা বলেনি। বিন্তী আবারও বলল,

“আপনার ছেলে শুধু অসভ্য, বর্বর ই না। বদ্ধ উন্মাদ ও পাগল। ছোট ছোট ব্যাপার নিয়ে যে বিরাট ইস্যু তৈরী করে সে সুস্থ মানুষ না। স্যরি টু সে, আপনাদের শুনতে খারাপ লাগলেও এটা সত্যি। আমার পক্ষে ওর সঙ্গে থাকা সম্ভব না। ”

শিশিরের বাবা, মা দুজনেই মাথানিচু করে বিন্তীর কথা শুনলো। তুষার বলল,

“ভাবী মাথা ঠান্ডা করো।”

“আমার মাথা যথেষ্ট ঠান্ডা আছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে এতো কিছুর পরও আমার মাথা ঠান্ডা আছে। তোমার ভাইয়ের মতো আমার অল্পে মাথা গরম হয়ও না।”

শিশিরের বাবা বললেন,

“তোমাকে আর কিছু বলারও নেই বিন্তী। যা ভালো বোঝো করো। আমি তোমাকে কোনো অনুরোধও করব না। পারলে আমাকে মাফ করে দিও। ”

বিন্তী শিশির কে বলল,

“শিশির তোমার কাউন্সিলিং এর দরকার। তুমি আসলেই অসুস্থ। তোমার অসুখ টা তোমার জন্য তো বটেই, সবার জন্যই ক্ষতিকর। ব্যাপার টা ভেবে দেখো।”

কথাগুলো বলে বিন্তী চলে গেল৷ শিশির নিজের পক্ষে একটা কথাও বলতে এলো না আজ। চুপচাপ শুনলো।

বিন্তী আজ আবার গেস্ট রুমে থাকতে এসেছে। শিশিরের ঘরে থাকার আর ইচ্ছেই নেই। পারলে এক্ষুনি বেরিয়ে যেত। রাত বলে সেটাও করতে পারছে না। একটা মানুষ সত্যিই কী এতো টা অবুঝ হয়! নাকি পুরোটাই শয়তানি! এই বয়সী একটা ছেলেকে অবুঝ বলে দোষ এড়ানো টা স্রেফ হাস্যকর। ওর বাবা, মায়ের কাছে সেটা মনে হলেও বিন্তীর কাছে তা মনে হয় না। একটা সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বিন্তী তো খানিকটা হলেও চেষ্টা করেছিল! কিন্তু ও কী করেছে! ঝামেলা, ঝগড়াঝাটি ছাড়া আর কিছুই না। অন্যদের মতো বিন্তীও ভেবেছিল আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক হবার বদলে পরিস্থিতি বিগড়ে যেতে শুরু করেছে। এইভাবে আসলে সম্পর্ক হয় না। এমন সম্পর্কে বিন্তী থাকতেও চায় না। অনেক হয়েছে, আর না। এবার দুজনের পথ আলাদা হয়ে যাওয়াই ভালো। শিশির থাকুক ওর মতো। জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না, বিন্তীরও থাকবে না। হয়তো শিশিরেরও থাকবে না।

***
শিরিন কথা বলতে এলো বিন্তীর সঙ্গে। বিন্তীকে বলল,

“জানি আজ যা হয়েছে তাতে তুমি খুব রেগে গেছো। সেটা হওয়া উচিত। কিন্তু রেগে ভুল ডিসিশন নিও না বিন্তী। ”

বিন্তী স্বাভাবিক গলায় বলল,

“আপনি শিশির কে কেন এতো প্রশ্রয় দেন আন্টি?”

শিরিন চুপ করে রইলো। বিন্তী আবারও বলল,

“ওর ভুলগুলো প্রশ্রয় দেন বলেই এগুলো ও বেশী করে। আপনারা শক্ত হচ্ছেন না কেন জানিনা। তবে আমি আর ও’কে প্রশ্রয় দিতে পারছি না।”

“ও যাই করুক, তোমার জন্য ওর ভালোবাসা কিন্তু সত্যি। তুমি কী সেটা সত্যিই বুঝে উঠতে পারো নি।”

“ওর ভালোবাসাও ওর মতো ভয়ংকর চাচী। ও চাইছে আমি সারাক্ষণ ওর সঙ্গেই থাকি। কোথাও কারোর সঙ্গে দুটো কথা যেন না বলি। এগুলো কী ভয়ংকর না! ”

শিরিন আবারও চুপ করে রইলো। বিন্তী বলল,

“একটা ব্যাপার সিরিয়াসলি ভাববেন প্লিজ। ওর কাউন্সিলিং করান। ওর অসুখ টা সাড়ানো দরকার। নাহলে আশেপাশের সবাই কে অসুস্থ করে ফেলবে।”

শিরিন আর কথা বাড়ালো না। বিন্তী চলে গেল পরদিন সকালে। শিশিরের সঙ্গে কথাও বলল না ভালো করে। শিশিরও চুপচাপ আছে। কোনো ঝামেলা কিংবা তর্কবিতর্ক টোট্যালি বন্ধ করে দিলো।

বিন্তী বাড়ি ফিরে যাবার পর হাজারো প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে লাগলো। শিশিরের ঘটনা কিছু বলল না। শুধু বলল যে কয়েকটা দিন থেকেই চলে যাবে। বাড়ি ফেরার পর থেকে খুব খারাপ লাগতে শুরু করলো। শিশির এরকম কেন! খুব বেশী ভালো না হোক একটু স্বাভাবিক তো হতে পারতো!

***
ওদিকে শিশির আগের মতোই চুপচাপ। ঘর থেকে বেরোয় কম। কথাও বলে কম। শিরিন বলেছিল,

“বিন্তী কে আনতে যাবি না। রেগে চলে গেছে। তুই গেলেই ফিরে আসবে। ”

শিশির গিটার নিয়ে বসেছিল। সেদিকে মনোযোগ রেখেই বলল,

“আমি অসুস্থ মানুষ। ও’কে আনতে গেলেই কী আসবে!’

“দোষ তো তোর ই। ”

“আচ্ছা।”

“অন্তত একটা ফোন কর। ফোন করে বল যে এমন ভুল আর করবি না। ”

শিশির চুপ করে থাকে। আর কোনো কথা বলে না। ”

শিরিন বিন্তীকে ফোন করবে ভেবেও করলো না। বিন্তীও এবার খুব রেগে গেছে। এখন ভালো কথাও ওর কাছে খারাপ মনে হবে। তুষার হঠাৎ বলল,

“মা শিশির কে একবার সত্যি সত্যি সাইক্রিয়াটিস্ট এর কাছে নেয়া যায় না!”

“ও কী যেতে রাজী হবে?”

“ভাবীর কথা বললে রাজী হবে।”

শিরিন শিশির কে মিথ্যে করে বলল,

“তোর বউ হয়েছে তোর মতোই। একই মাটি দিয়া আল্লাহ বানিয়েছে। কী জেদ! তুই যদি কাউন্সিলিং করাতে রাজী হোস তাহলে আসবে বলেছে।”

শিশির হ্যাঁ, না কিছু না বললেও মা, ভাইয়ের চাপে রাজী হলো।

***
সাইকোলজিস্ট এর চেম্বারে শিশির ঢুকেছে অনেকক্ষন। বাইরে বসে আছে শিরিন আর তুষার। তুষার মা’কে বলছে,

“মা এতো টেনশন করছ কেন! সব ঠিক হয়ে যাবে।”

“সব আমার জন্য বুঝলি। আমিই ছেলেটাকে ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারলাম না। যখন যা চেয়েছে তাই তো করেছি। তবুও এমন কেন হলো বলতো!”

তুষার কিছু বলল না। শিরিন আবারও বলল,

“বিন্তী ওর জীবনে আসার পর ই এমন হয়েছে। আগে তো এমন ছিলো না।”

“শিশির ভাবী কে নিয়ে ইনসিকিউরড মা। সেজন্য এতো কান্ড করেছে। ভাবী বাড়ি গেছে ভালো করেছে। এবার ও শিক্ষা পাবে দেখো। ভাবী যেন একমাসেও না ফেরে।”

শিরিন মনে মনে বলল, বিন্তী একমাসে না ফিরলে শিশিরের কী হবে! যে ছেলে দুদিন থাকতে পারে না, সে একমাস কী করে থাকবে!

চলবে…

#অপ্রেমের গল্পটা যেভাবে শুরু হয়েছিলো
#পর্ব-২২
সাইকোলজিস্ট এর কাছে গিয়ে শিশির একদম চুপ করে রইলো। ভাবখানা এমন যে ও মূক ও বধির। যা প্রশ্ন করছে তার উত্তর দেবার বদলে ফোস ফোস করে নিঃশ্বাস ফেলে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে। সাইকোলজিস্ট ভদ্রমহিলা একটুও বিরক্ত হচ্ছে না। বরং একটার পর একটা প্রশ্ন করে চলছে। শিশিরও কোনো জবাব না দিয়ে বসে আছে। ও আসলে দেখতে চায় যে মহিলা ঠিক কী করে! সাইকোলজিস্ট সম্পর্কে ওর তেমন আইডিয়া নেই। মুভিতে দেখেছে কিন্তু সামনাসামনি এই প্রথম। শিশির ভেবে রেখেছে প্রশ্নের উত্তর তো দূরে থাক একটা কাশিও দেবে না। বিন্তী কোথাকার কোন প্রেসিডেন্টের মেয়ে যে তার কথায় কাউন্সিলিং করাতে হবে। কাউন্সিলিং ফাউন্সিলিং কিচ্ছু করাবে না। ও পাগলই থাকবে। এরপর পাবনা যাবে, সেখানে গিয়ে পাগলা গারদে থাকবে। প্রয়োজনে মাথা কামিয়ে পাগল সেজে থাকবে। ওই বিন্তীর ফেরার দরকার নেই। ও ভালো মানুষ একা একা থাকুক। ওর শিশিরের সঙ্গে থাকার দরকার নেই।

সাইকোলজিস্ট ভদ্রমহিলার নাম রওশন আরা। রওশন আরা শিশির কে প্রশ্ন করা থামিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ও’কে যেতেও বলছে না। শিশির যে ইচ্ছে করে ব্যাপার টা করছে সেটা বুঝতে পেরে আর কিছু বলছে না। অপেক্ষা করছে শিশিরের কথা বলবার। শিশির নিজেও একসময় ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলল। উশখুশ করতে লাগলো উঠে যাবার জন্য। এক কাপ চা খেতে পারলে ভালো হতো। ভদ্রমহিলা ছাড়ছে না কেন সেটাও বুঝতে পারছে না। এর কী আর রোগী নেই নাকি! মনে হয় বেশী নামকাম নেই। নাহলে ওর পেছনে তো অলরেডি পয়তাল্লিশ মিনিট নষ্ট করে ফেলেছে।

শিশিরের ছটফটানি দেখেও রওশন আরা কিছু বলছেন না। শিশির একসময় মুখ খুলল। বলল,

“আমি এক কাপ চা খেয়ে আসি!”

“আপনাকে এখানে চা এনে দেয়া হবে। এখান থেকে বেরোতে পারবেন না।”

“আপনার আর কোনো পেশেন্ট নেই?”

“কেন!”

“আমাকে এখনো ছাড়ছেন না যে!”

“আপনার গার্ডিয়ান অনেক গুলো টাকা অলরেডি পে করেছে। অথচ আপনার সমস্যা না শুনেই ছেড়ে দেব!”

শিশির উদাস গলায় বলল,

“আমার কোনো সমস্যা নেই।”

“সমস্যা না থাকলে এখানে কেন এলেন?”

“আমি আসিনি। আমাকে আনা হয়েছে।”

“তাহলে চলে যেতে চাইছেন?”

“হ্যাঁ। ”

“কিন্তু এখন যেতে পারবেন না। আপনার সমস্যা শোনার জন্য আমি টাইম হিসেব করে টাকা নিয়েছি। সেই টাইম টা এখানে বসে থাকতে হবে।”

শিশির বিরক্ত গলায় বলল,

“এতক্ষন বসে কী করব!”

“চা, কফি খেতে পারেন।”

শিশিরের জন্য চা আনানো হলো। শিশির বিরস মুখে চায়ের কাপে চুমুক দিলো। কতক্ষন এই রুমে বসে থাকতে হয় কে জানে!

রওশন আরা বললেন, তুমি কী বিরক্ত হচ্ছো?

“জি।”

“তোমাকে তুমি করে বললাম কারণ এখন তো তুমি আমার পেশেন্ট না। ”

শিশির বলল,

“আচ্ছা। ”

“তুমি কী আমার সঙ্গে গল্প করবে? তাহলে বিরক্তভাব কমবে।”

শিশির হেসে ফেলল। বলল,

“আপনার ধৈর্য্য দেখে অবাক হচ্ছি সিরিয়াসলি! এতো পোলাইটলি কথা বলছেন কী করে!”

“তুমি মনে হয় খুব রাগী তাই না। এইজন্য আমাকে রাগানোর চেষ্টা করছিলে। কিন্তু আমি সহজে রাগী না। তাই তোমার চেষ্টা ব্যর্থ হলো। ”

শিশির কিছু বলল না। রওশন আরা বলল,

“তোমার প্রিয় রঙ কী শিশির?”

“আমার প্রিয় রঙ জেনে আপনি কী করবেন?”

“কোনো একটা টপিক তো লাগবে গল্প করতে….

শিশির থামিয়ে দিয়ে বলল,

“শুনুন আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি সুস্থ মানুষ। যারা আমাকে এখানে পাঠিয়েছে তাদের সমস্যা আছে। আপনি তাদের ট্রিটমেন্ট করুন প্লিজ। আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করলেও উত্তর দিবো না। ”

“কারা পাঠিয়েছে তোমাকে?”

“আসল নাটের গুরু ওই বিন্তী, ফাজিল মেয়েটা।”

“বিন্তী তোমার ওয়াইফ?”

“আনফরচুনেটলি।”

“আনফরচুনেটলি কেন?”

“আপনার এখানে বসে বসে কোমড় ব্যথা হচ্ছে যার জন্য তাকে আনফরচুনেট না বলে ফরচুনেট বলব!”

রওশন আরা হেসে ফেলল। বলল,

“তুমি তো ভারী মজার! কিন্তু শুনলাম তোমার নাকি অনেক রাগ। কোনো কারণ ছাড়াই রেগে যাও?”

“কারণ ছাড়া কেউ কখনো রাগে!”

“এক্সাক্টলি! কারণ ছাড়া কিছু হয় না। তাহারা কেন এতো রেগে যাও! ”

শিশির খানিকক্ষন চুপ করে রইলো। তারপর বলল,

“হিপোক্রেসি সহ্য হয় না আমার। ”

“বেশ! তাহলে এসব মানুষ কে এড়িয়ে চললেই হয়।”

“ক’জন কে এড়িয়ে চলব! যেদিকে তাকাই সবাই ই তো ভন্ডের দল। ”

“সবাই? ”

“হ্যাঁ। ”

“এই কারনে কী তুমি নিজেকে গুটিয়ে রাখো?”

“আমি নিজের মতো থাকতে ভালোবাসি। ”

“একা থেকে কী করো?”

“সবাই যা করে। গান শুনি, টিভি দেখি, মুভি দেখি।”

“আর বন্ধুরা?”

“আছে কয়েকজন স্বার্থপর গোছের লোকজন। মাঝেমধ্যে ভালো, মন্দ খাবার জন্য ওদের আমায় দরকার।”

“শুধু ওদের দরকারেই তুমি ওদের সঙ্গে মেশো? তোমার কোনো দরকার নেই?”

শিশির একটু ভেবে বলল, আমারও দরকার আছে।

“আর তোমার বাড়ির লোক? তুমি কী তাদের উপরও বিরক্ত? ”

“হ্যাঁ। ”

“কেন তারা কী করেছে?”

শিশির চুপ করে থাকে। কিছু বলে না। রওশন আরা আবারও জিজ্ঞেস করে,

“তুমি কার উপর বিরক্ত হও না? কাকে পছন্দ করো?”

“মা। আর…

“বিন্তী?”

শিশির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, হ্যাঁ।

এই দুজনের উপর বিরক্ত হও না কেন?”

“জানিনা। আমার আর কথা বলতে ভালো লাগছে না।”

“আচ্ছা। কিন্তু তুমি তোমার বাবা আর ভাইয়ের উপর বিরক্ত কেন!”

শিশির চুপ করে থাকে। রওশন আরা আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। শিশির সম্ভবত এই টপিকে আর কথা বলতে চাইছে না। শিশির সময় দেখলো। বিরক্ত গলায় বলল,

“আর কতক্ষন বসে থাকতে হবে?”

রওশন আরা সেকথার জবাব না দিয়ে বলল,

“তোমাকে লাস্ট একটা প্রশ্ন করতে চাই শিশির। আর বিরক্ত করব না। তুমি নিজেও জানো তোমার সমস্যা আছে। তাহলে কেন সমস্যা থেকে বেরোতে চাইছো না?”

শিশির বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,

“ধরে নিন এই সমস্যা টা আমার খুব ভালো লাগে তাই।”

“এটা কিন্তু লজিক্যাল উত্তর না।”

শিশির চোখ নামিয়ে নিলো। চায়ের কাপের চা’টুকু অনেকক্ষন আগে ঠান্ডা হয়ে গেছে। তবুও চুমুক দিলো। তারপর বড় করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

“আমার সমস্যা শুনবেন? আমার সমস্যা হলো আমি কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না। ছোট থেকেই এই সমস্যা। এই সমস্যা নিয়েই বড় হচ্ছি, বুড়ো হবো একদিন মরেও যাব। বিন্তী, মা, বাবা, তুষার এদের কাউকেই আমার বিশ্বাস হয় না। ”

“এটার কারণ কী?”

“অনেক কারণ আছে। সেই কারণগুলো আমি খুঁজে বের করেছি। যেমন বাবার কথা বলি, বাবা খুবই আদর্শবান একদম মানুষ। আমি জানিনা ব্যাপার টা কতো টা সত্যি। ব্যবসায়ী মানুষ তার অনেক টাকা পয়সা। অনেক দান, খয়রাত দেন। আত্মীয়দেরও অনেক সাহায্য করে। এই মানুষ টা বিপদে পড়া এক পরিবারকে বাঁচিয়েছে। তাদের বিয়ে ভেঙে যাওয়া মেয়েকে নিজের ছেলের সঙ্গে বিয়েও দিয়েছে। বিষয় টার মধ্যে মহানুভবতা লুকিয়ে আছে তাই না! তবুও তার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র রেসপেক্ট আসে না। কেন জানেন? কারণ বাবা এই পরিবার কে বাঁচানোর নাম করে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করেছে। সে জানে তার ছেলে ওই মেয়েটার জন্য ঠিক না। মেয়েটা আরও ভালো ছেলে ডিজার্ভ করে। কিন্তু বিয়েটা কেন দিলো! কারণ বিয়ে ভেঙে যাওয়া মেয়েটা অসহায়। এই অবস্থায় সে যদি ছেলের সঙ্গে মেয়েটার বিয়ে দেয় তাহলে মেয়েটা শ্বশুরবাড়ি নত হয়ে থাকবে। ছেলেটার যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন করবে না। ব্যাপার টা এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতো। অযোগ্য ছেলের জন্য যোগ্য বউও পাওয়া গেল। আর মহানও হওয়া গেল। ”

“তুমি কেন বিন্তীকে বিয়ে করতে রাজী হলে? তুমি চাইলে তো প্রতিবাদ করতে পারতে? এই ব্যাপার টা নাও ঘটতে পারতো। ”

“আমার চাওয়ায় কী আসে যায়! আমার বাবা যা চায় তাই ই হয়। সেটা যেকোনো মূল্যেই করে থাকে।”

“তোমার বাবার উপর তোমার অনেক রাগ মনে হচ্ছে। এবার বলো মায়ের উপর রাগের কারণ কী?”

“মায়ের উপর স্পেসিফিক কোনো রাগ নেই। মা অনেক কিছু মেনে নেয়। তার পছন্দ না হলেও মেনে নেয়। এসব কারনেই রাগ হয়। আমার নিজের জীবনে আমার সিদ্ধান্ত না খেটে অন্যের সিদ্ধান্ত কেন খাটবে!”

“আচ্ছা। বিন্তীকে তুমি ভালোবাসো?”

“হ্যাঁ। তবে বিন্তী বাসে না। ও এমনিতে ভালো মেয়ে।”

“বিন্তী ভালো কেন?”

“বিন্তীর সঙ্গে অনেকদিন থাকা হলো। তাতে মনে হলো বিন্তী ভালো। কেন ভালো তা জানিনা। ”

“তুমি কী বিন্তীকে নিয়ে ইনসিকিউরড? ”

শিশির খানিকক্ষন চুপ করে থেকে বলল, হ্যাঁ।

“ঠিক কী কারনে তুমি ইনসিকিউরড?”

শিশির চুপ করে রইলো। রওশন আরা বললেন,

“তুমি চাইলে এই আলোচনা বন্ধ করতে পারি। নেক্সট ডে বাকীটা শুনব। ”

শিশির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“আর একদিন এসে ভ্যজর ভ্যজর করতে ভালো লাগবে না হয়তো। আর যা যা প্রশ্ন আছে করে ফেলুন। আজই সব উত্তর দিয়ে যাব। ”

****
শিশির বেরিয়ে এলো অনেকক্ষন পর। শিরিন আর তুষার এতক্ষন বসেছিল। শিশির বেরিয়ে এসে হাই তুলতে তুলতে মা’কে বলল,

“যাও। এখন তোমাকে ডাকছে। ”

শিরিন উঠে ভেতরে গেল। রওশন আরা শিরিন কে বলল,

“আপনি বসুন। ”

শিরিন বসতে বসতে বলল,

“কী বুঝলেন? ”

“এখনো পুরোপুরি কিছু বুঝিনি। শুধুমাত্র সমস্যা টা শুনলাম। এই সমস্যাগুলো তো আর একদিনে হয় নি। অনেক বছর লেগেছে। ছোট থেকে এই সমস্যাগুলো নিয়েই বড় হয়েছে। আপনারা সেটা বুঝতেও পারেন নি। আমি এক এক করে বলছি।

প্রথমে আসি পড়াশোনার ব্যাপার টা নিয়ে। বাঙালি বাবা মায়েরা চায় তাদের ছেলেমেয়েরা প্রতি পরীক্ষায় ফার্স্ট হোক। কোনো বাবা মা চায় না তার ছেলে সেকেন্ড কিংবা থার্ড হোক। অথচ ফার্স্ট যে হয় সে যেমন ব্রিলিয়ান্ট তেমনি বাকী দুজনও ব্রিলিয়ান্ট। কিন্তু মাথায় করে রাখা হয় যার র‍্যাঙ্ক আগে তাকে। আপনার ছেলে শিশির কখনোই পড়াশোনা সর্বস্ব জীবন চায় নি। কিন্তু আপনারা চেয়েছেন ছেলে শুধুই পড়াশোনা করুক। সমস্যা টার শুরু টা এখান থেকেই। পরীক্ষায় যে মার্কস ই পেতো আপনারা তাতে সন্তুষ্ট হতেন না। একসময় ওর মনে হলো যে কোনো কিছুতেই আপনাদের সন্তুষ্ট করা ওর পক্ষে সম্ভব না। ও ওর মতো ভালো করার করলেও তাতে লাভের লাভ কিছু হচ্ছে না। তারচেয়ে কিছু না করে বকা কিংবা মার খাওয়া ভালো।

দ্বিতীয় সমস্যা হলো শিশিরের মানুষের প্রতি অবিশ্বাস। ওর বাবার অনেক টাকা আছে বলে সবাই ওর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করছে এরকম এক বদ্ধমূল ধারণার কারনে বাইরের কারোর সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব হয় নি। আপনাদের আত্মীয়দের মধ্যে এই ব্যাপার টা দেখেছে। ওর বাবার টাকা আছে বলে আত্মীয়দের কাছে ওদের গুরুত্ব বেশী। টাকা যাদের কম আছে তাদের গুরুত্ব কম এই ব্যাপার গুলো ও খেয়াল করেছে বলে সবাইকে ফেক মনে হয়।

এর পরে শিশিরের ইনসিকিউরিটি ব্যাপার টা নিয়ে বলি। আপনার দুই ছেলের বয়সের পার্থক্য কম। ছোট বেলায় ভাই বোন দের মধ্যে যা হয়। এক জনের জিনিস অন্যজন নিলে বাবা মায়েরা বড় সন্তান কে বলে স্যাক্রিফাইজ করতে। ছোটজন কে দিয়ে দিতে। বড় হবার পরও এই ব্যাপার থেকে যায়। ছোট সবসময় বড় ‘র জিনিসপত্র কেড়ে নেয়। ব্যাপার টা স্বাভাবিক। কিন্তু শিশুমনে এটা প্রভাব ফেলে যে ও আমার ভাগের সব জিনিস কেড়ে নিচ্ছে, তাহলে এভাবেই নিতে থাকবে। এই ব্যাপারগুলো থেকেই ইনসিকিউরিটি আসে।

শিরিন অবাক হয়ে শুনছে। রওশন আরা বললেন,

“আপনাকে যে কথাগুলো বললাম সেগুলো সবই ছোট ছোট ঘটনা। মানসিক সমস্যা গুলো আসলে একদিনে হয়। একটু একটু করেই হয়। আপনার ছেলের এই ছোট ছোট সমস্যা গুলো থেকেই কিন্তু এগুলো হয়েছে। তাছাড়া আপনারা শিশির কে যেমন দেখেন ও কিন্তু তেমন না। আপনারা দেখেন ও ঘরে থাকে, কোনো কাজ করে না, পড়াশোনা করে না। বিন্দাস লাইফ কাটায়। আদতে তা নয়। শিশির পুরোপুরি নিঃসঙ্গ একজন মানুষ। একটু খেয়াল করে দেখবেন, শিশির মুভি দেখে, গান শোনে, সব টাই কিন্তু একা একা। এমনকি ওর সবচেয়ে পছন্দের জায়গা হলো ওর বেডরুম। নিজের কিছু বলার মতো ওর কেউ নেই। ও পুরোপুরি একা। এই একাকিত্ব কাটাতে অনেক মেয়েদের সঙ্গে মিশেছে ঠিকই কিন্তু ওর অবিশ্বাস করার স্বভাবের কারণে কিংবা অন্য কারনে কারো সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে নি।

শিরিন নরম গলায় বলল,

“এভাবে তো কখনো আমরা ভেবে দেখিনি। ”

“শিশিরের এখনকার সমস্যার কারণ টা বলি। এরজন্য পুরোপুরি আপনারা দায়ী। বিন্তীর সঙ্গে বিয়ে হবার শুরু থেকে আপনারা বলেছেন বিন্তী ওর যোগ্য নয়। শুরুতে কথাটা আমলে না নিলেও যখন থেকে ও বিন্তীকে ভালোবাসতে শুরু করলো তখন থেকে ওর ভয় হলো। বিন্তী যদি সেই কারনে ও’কে ছেড়ে দেয়। এই ভয় থেকেই ও চাইতো বিন্তী কারোর সঙ্গে না মিশুক। কেউ যদি বিন্তীকে বুদ্ধি দেয়। কিংবা বিন্তী নিজ যোগ্যতায় এগিয়ে গিয়ে ও’কে ভুলে যায়। নিজের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস তো ছিলোই তারসঙ্গে এই ভয় যুক্ত হলো। আপনার ছেলে এই ভয়ে রাতের পর রাত ঘুমাতেও পারতো না। এমনকি আত্মহত্যার কথা পর্যন্ত ভেবেছে। কতোটা ভয়ংকর ভাবতে পারছেন!

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here