অপর প্রান্তে,পর্ব-০৩

অপর প্রান্তে,পর্ব-০৩
লেখাঃ হাবিবুর রহমান হাবিব

“তুমি কোন দলের? তোমার মায়ের নাকি ভাইয়ের?”

মেয়েটার প্রশ্ন শুনে সোমা হাসলো। সোমা বললো,
— ধরে নিন আমি সুবিধা পার্টি। একেক সময় একেক দলের সাপোর্ট নিই। যদিও বেশিরভাগ সময় মায়ের সাপোর্টেই থাকি, তবে মাঝে মাঝে ভাইয়ার সাপোর্টে যেতে হয়। যেমন গত বছর আমার কলেজে এডমিশনের সময় ভাইয়া তার কেলেঙ্কারির টাকা দিয়ে আমার এডমিশন ফি দিয়েছিলো। এতে আমি অমত করিনি, মাকেও জানাই নি বিষয়টা। কারন লেখাপড়া থামাতে চাইনি। আমার হাতের ফোনটাও ভাইয়ার কেলেঙ্কারির গিফট। কি আর করার, ফোন দেখে লোভ সামলাতে পারিনি তাই গিফটটা নিয়ে নিয়েছি। এরকম আরো কয়েকবার ভাইয়ার কেলেঙ্কারির সাপোর্ট নিয়েছি আমি। একদিকে ভাইয়ার কান্ডকারখানা দেখে খুব মেজাজ খারাপ হয় আমার, অন্যদিকে ভাইয়া আমার খুব প্রিয়।

মেয়েটা,
–তুমিতো দেখছি দুইমুখো সাপ। লেখাপড়ার বিষয়টা না হয় মেনে নেয়ার মতো, কিন্তু কেলেঙ্কারির ফোন নেয়া একদমই উচিত হয়নি তোমার।

সোমা মুচকি হেসে বললো,
–শখের জিনিস ফিরিয়ে দেয়া যায়না আপু।

মেয়েটার মাথায় এখন একটা প্লান ঘুরছে। এখন ওর প্লান হলো, যেভাবেই হোক সোমাকে নিজের বসে এনে ল্যাপটপটা নিয়ে বাসা থেকে বের হওয়া। চিন্তা করছে, কিভাবে সোমার সাথে খাতির জমানো যায়।
———
চারদিন পর হাসপাতাল থেকে মাকে নিয়ে ফিরলো নিবির। এ কয়দিন মায়ের সাথেই হাসপাতালে ছিলো ও। শুধু মাঝে মাঝে সোমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করতো ল্যাপটপ ঠিকমত আছে কিনা। নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রতিদিন সকালে একবার আর রাতে একবার ফোন করতো সোমাকে। সকালে ফোন করে নিশ্চিত হতো,’ মেয়েটা পালিয়ে যায় নি তো?’ আর রাতে ফোন করে নিশ্চিত হতো,’ মেইনগেটে তালা লাগিয়েছিস? আবার চেক কর। ‘

মেয়েটা চেয়েছিলো সোমাকে বসে এনে বাসা থেকে ল্যাপটপ নিয়ে বেরিয়ে যেতে। কিন্তু তা আর হলো না। সোমা খুব সহজেই মিশতে পারে। মেয়েটা ভূয়া খাতির জমাতে গিয়ে উলটো সোমার সাথে একপ্রকার সখ্যতার বাধনে বেধে যায়। সোমার সাথে মিশতে ও কথা বলতে এখন বেশ ভালো লাগে মেয়েটার। সোমার বলা অদ্ভুত সব কৌতুক আর আজগুবি কথাবার্তা শুনে মেয়েটা প্রায়সময়ই হাসিতে একাকার হয়ে যায়। সারাদিন সোমার সাথে এক ঘরে থাকতে থাকতে সোমাকে অনেকটা নিজের ছোট বোনের মতো মনে হয় মেয়েটার। সোমাও মেয়েটাকে আপনির বদলে তুমি করে বলে। মেয়েটার বাসা থেকে বেড়িয়ে না যাওয়ার আরেকটা বড় কারন হলো, ওর ধারনা বাবা নিশ্চয়ই পুলিশে খবর দিয়েছে। ওর হারানো বিজ্ঞপ্তিও ও শুনেছে মাইকে। তাই ভাবলো, এখন বাসা থেকে না বেড়োনোই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

অন্যদিকে সোমা খেয়াল করেছে, মেয়েটার মুখে সবসময় একধরনের বিষাদভাব ছেয়ে আছে। সোমা অনেকবার মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করেছে,”আপু, তুমি কি কোনো কারনে আপসেট?” মেয়েটা “কিছু না” বলে প্রশ্নটা এড়িয়ে যায়। সোমা মেয়েটার বাড়ি পালানোর কারন জানতে চাইলেও মেয়েটা কিছু না বলে মুখ গম্ভীর করে চুপ করে থাকে। নাম জানতে চাইলে মেয়েটা বলে,”নাম জেনে কি করবে? আমাকে আপু বললেই তো পারো।”
———–
নিবিরের মা এখন মোটামুটি সুস্থ। নিবির মাকে বিছানায় শুয়িয়ে সকালের নাস্তা করে বাসা থেকে বেরোনোর সময় সোমা পিছন থেকে ডাক দিয়ে বললো,
–ভাইয়া, চারদিন ধরে কলেজে যাচ্ছি না। তুই কি চাস আমি বাসায় পাহাড়া দেয়ার জন্য একমাস কলেজ মিস দিই! দু-মাস পর আমার পরীক্ষা। আমি আর কলেজ মিস দিতে পারবো না।

–বলিস কি! দুই মাস পরেই পরীক্ষা তোর!! হায় হায়, এখন কি করি তাহলে?

–তোর এতো চিন্তা করতে হবে না। আপুর উপর আমার বিশ্বাস আছে। আমি না থাকলেও উনি ল্যাপটপ নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যাবে না আমি নিশ্চিত।

–তোর কি মাথা ঠিক আছে!? যে নিজের বাসা থেকে পালাতে পারে, তোর কি মনে হয় তার কাছে ল্যাপটপ নিয়ে পালানো কোনো ব্যাপার!

মেয়েটা পাশের রুম থেকে বেরিয়ে এসে নিবিরের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললো,
–ও কাল থেকে কলেজে যাবে, এটাই ফাইনাল। কেমন ভাই আপনি যে নিজের বোনের লেখাপড়া নিয়ে অবহেলা করেন! আপনার যখন ল্যাপটপ নিয়ে এতোই দুশ্চিন্তা সেজন্য বলছি আপনার পেরেশানি ঝাড়ার উপায় একটা আছে। সোমা কলেজে যাওয়ার আগে প্রতিদিন মেইন দরজা বাইরে দিয়ে তালা দিয়ে যাবে। ব্যাস, প্রবলেম সল্ভড।

নিবির ভারী গলায় বললো,
–এইযে শুনুন.. আমার বোনের লেখাপড়া নিয়ে চিন্তা আমার থেকে আপনার বেশি না। সবকিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি করা কি আপনার মুদ্রাদোষ নাকি! আপনার আলতু-ফালতু ডায়লগ আপনার কাছেই রাখুন।… যদিও আপনার আইডিয়াটা খারাপ না। কাল থেকে তাহলে তাই হবে।

সোমা নিবিরকে ধমকের সুরে বললো,
–ভাইয়া..কি বলছিস এসব!? তুই কিন্তু বাড়াবাড়ির সব লিমিট ছাড়িয়ে যাচ্ছিস।

নিবির,
–আইডিয়া তো ওনারই।তাহলে তুই আমাকে ধমকাচ্ছিস কেন!?

মেয়েটা আর কোনো কথা না বলে নিবিরের মায়ের রুমে ঢুকলো। ঢুকে নিবিরের মায়ের হাত ধরে হাতের পালস চেক করা শুরু করলো। নিবির বাড়ির বাইরে বেড়িয়ে যাওয়ার সময় কি যেন ভেবে আবার ভিতরে ঢুকলো।ও মায়ের রুমের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মেয়েটাকে মায়ের পাশে দেখে বেশ অবাক হলো। কিছুক্ষন মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থেকে নিবির বললো,
–এইযে শুনুন, কিছু কি লাগবে আপনার? কোনো দরকারি জিনিস? ব্যাটারি, খাতা-কলম কিংবা অন্য যেকোনো কিছু?আমি বাজারে যাচ্ছি, কিছু লাগলে বলতে পারেন।

মেয়েটা কোনো জবাব না দিয়ে চুপ করে রইলো। নিবির বলল,
–আমি সোমার কাছে কিছু টাকা দিয়ে যাচ্ছি। কিছু লাগলে আপনি ওর কাছে বলতে পারেন। আমি তাহলে চললাম।

নিবির রুম থেকে বেরোনোর সময় আবার থেমে পিছে ফিরে মেয়েটাকে বললো,
–আচ্ছা আপনার নামটা কি বলুন তো? বার বার ‘এইযে এইযে’ করে ডাকতে ভাল লাগে না আমার।

সোমা,
–হ্যা আপু প্লিজ, তোমার নামটা কি বলো। নাম বললে কি কিছু ক্ষয় হয়ে যাবে নাকি!

নিবিরের মাও মুচকি হেসে মেয়েটাকে বললো,
–হ্যা মা তোমার নামটা কি বলোতো? আমাদের বাসার একমাসের মেহমান তুমি, তোমার নামটা কি জানার অধিকার নেই আমাদের?

সবাই একপ্রকার আগ্রহ নিয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা কিছুক্ষন চুপ থেকে বললো, “রুমি।”

নিবির হেসে বললো,
–যাক..অন্তত কিছু রহস্য তো উদ্ধার করা গেলো।
————

“> রুমির সামনে ওর চাচাতো ভাই, যে ওর ওড়না ফেলে দিয়ে থ্রিপিচ আকড়ে ধরে টেনে ছিড়ে ফেলার চেষ্টা করছে। রুমি প্রানপন চেষ্টা করছে নিজেকে ছাড়ানোর। কিন্তু পারছে না। কারন ওর চাচাতো ভাই রাকিবের সাথে আরো দুইজন বন্ধু, যারা রুমির হাত পা চেপে ধরে আছে। রুমি স্কুলের এক নির্জন কক্ষে এ পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে। রাকিব রুমির মুখ চেপে ধরে জগন্য আচরন করা চালিয়ে যাচ্ছে। রুমির হাতে একটা কলম। কলমের নিপ খুলে রুমি বলপেনের সিস রাকিবের এক বন্ধুর হাতে সজোরে ঢুকিয়ে দিলো। রাকিবের বন্ধুটা বিকট চিৎকার দিয়ে রুমির হাত ছেড়ে দিলো। রুমি সঙ্গে সঙ্গে বলপেনের সিসটা রাকিবের কাধে ঢুকিয়ে দেয়। এরপর রাকিবের ঘাড়ে সজোরে কামড় দিয়ে ওকে ধাক্কা দিয়ে পাশে ফেলে দেয়। রাকিবের আরেক বন্ধুর গালে রুমি তীব্র ভাবে নখের আচড় দিলে সে রুমির পা ছেড়ে দেয়।সাথে সাথে রুমি সজোরে ছেলেটার মুখে লাথি দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে যায়। রুমি দৌড়াতে থাকে, পিছে ফিরে দেখে রাকিবও ওর পিছে দৌড়াচ্ছে…<” রুমি চিৎকার করে ঘুম থেকে জেগে ওঠে। সারা শরীর ঘামে ভিজে একাকার। দুঃস্বপ্নটা আবার দেখেছে ও। তবে এটাকে শুধু দুঃস্বপ্ন বললে ভুল হবে। কেননা এটা রুমির জীবনে বাস্তবে ঘটে যাওয়া ঘটনা যেটার বোঝা ও বছরের পর বছর বয়ে চলছে নিজের মনে। সোমা পাশের রুম থেকে দৌড়ে এসে বাতি জ্বালিয়ে বললো, --কি হয়েছে আপু! এভাবে ঘামছো কেন!? খারাপ কোনো স্বপ্ন দেখেছো? রুমি, --(ফুপাতে ফুপাতে) পানি...পানি... আমাকে পানি দাও। সোমা একগ্লাস পানি নিয়ে আসলে রুমি একশ্বাসে পুরোটা পান করে জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে লাগলো। সোমা রুমির মাথায় হাত বুলাতে লাগলো। কিছুক্ষন খাটে বসে চোখ বুজে থেকে রুমি বললো, --সোমা, আজ আমার সাথে ঘুমাতে পারবে? সোমা আজ রাত রুমির সাথেই ঘুমালো। কিন্তু রুমির চোখে ঘুম নেই। ঐ ভয়াবহ স্মৃতিগুলো ওর চোখের সামনে ভাসছে। ---------- পরের দিন রাত এগারোটায় পড়া শেষ করে সোমা পাশের রুম থেকে উকি দিয়ে দেখছে রুমি ল্যাপটপে কাজ করছে। প্রতিদিনের মতো সোমা দূর থেকে ল্যাপটপের স্ক্রিনে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। স্ক্রিনে নানা রঙের ডিজাইন ভাসছে যেটা দেখতে সোমার দারুন লাগে। সোমা মুগ্ধ হয়ে ভাবে, এতো সুন্দর সুন্দর ডিজাইন রুমি আপু কিভাবে করে! আজ রাতেও রুমি ঐ দুঃস্বপ্নটা দেখে চিৎকার করে ঘুম থেকে জেগে ওঠে। সোমা পাশের রুম থেকে দৌড়ে এসে বাতি জ্বালিয়ে রুমির সামনে আসলে রুমি সোমার কোমড় জড়িয়ে ধরে কাপতে থাকে। সোমা রুমির অবস্থা দেখে দিশেহারা প্রায়। কি করবে বুঝতে পারছে না। সোমা, --আপু, পানি এনে দেবো। রুমি, --(কাপা কাপা গলায়) ঐ পিচাশটা আমার পিছা ছাড়ছে না। কি করবো আমি, কি করলে জানোয়ারটা আমার জীবন থেকে মুছে যাবে? রুমি কথা বলেই ফুপিয়ে কাদতে লাগলো। সোমা চিন্তিত গলায় বললো, --কি হয়েছে আপু! কিসের পিচাশ!? কালকের দুঃস্বপ্নটা কি আবার দেখেছো? রুমি, --(ক্রন্দন গলায়) হ্যা। ঐ রাকিব জানোয়ারটা আমার জীবন গিলে খাচ্ছে। সোমা, --রাকিব কে!? কার কথা বলছো আপু? রুমি চুপ করে থাকলো। ওর চোখ দিয়ে অঝোড়ে অশ্রু ঝড়ছে। সোমা ক্ষীন গলায় বললো, --আপু.. তুমি কি সবসময়ই নিজেকে এভাবে গুটিয়ে রাখবে? নিজের মনের কথা গুলো কাউকেই শেয়ার করবে না? নিজেকে এভাবে আড়াল করলে তোমার কষ্টগুলো আরো বাড়বে।আমাকে কি ইকটুও বিশ্বাস হয় না তোমার!? তুমি কি ইকটুও আপন ভাবো না আমাকে? প্লিজ, আমাকে বলো রাকিব কে? রুমি, --(কঠিন গলায়) ও হলো সেই জানোয়ার, যার কারনে বাধ্য হয়ে নিজের বাসা থেকে পালিয়েছি আমি। চলবে...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here