অতঃপর_তুমি_আমি #লেখিকা:#ইশা_আহমেদ #পর্ব_৬

#অতঃপর_তুমি_আমি
#লেখিকা:#ইশা_আহমেদ
#পর্ব_৬

শেহজাদের সুস্থ হতে বেশ কয়েকদিন লেগেছে।ইফাজ এবং শেহজাদের ফুপুমনি মেহবুবা খানের সেবা যত্নে সুস্থ হয়েছে শেহজাদ।ইফাজ সারা সময় শেহজাদের সাথে ছিলো।শেহজাদ বেশ বিরক্ত ইফাজের কাজে।ছেলেটা এতো চিপকে থাকছে তার সাথে।এমন তো মনে হয় প্রেমিক প্রেমিকা যুগলও চিপকে থাকে না।শেহজাদ শরীরচর্চা করার জন্য ছাদে এসেছে।এখানেও ইফাজ হাজির।বসে বসে বাদাম খাচ্ছে ছাদের এক কোনে।

‘ইফাজ তোমার কি কোনো কাজ নেই?’

ইফাজ অবাক হয়ে শেহজাদকে বললো,

‘কেনো ভাই’

‘এই যে সারাক্ষণ পিছে লেগে আছো।বিরক্ত লাগছে আমার।আমাকে একাও একটু থাকতে দাও’

‘না না ভাই তোমাকে একা রাখা যাবে না।আবার জ্বর আসলে।তখন কি করবো বলো তো।এমনিতেও এতগুলো দিন এই জ্বরে ভুগলে।আমি রিস্ক নিতে চাই না’

‘ইফাজ আমার জ্বর যদি আসেও তুই কি তা আটকে রাখতে পারবি’

‘ভাই তা না পারলেও তোমাকে রুমে নিয়ে গিয়ে সেবা তো করতে পারবো’

‘তুই একটা যা তা’

শেহজাদ নেমে গেলো ছাদ থেকে।শেহজাদ যেতেই হু হা করে হেসে উঠলো ইফাজ।শেহজাদ তখনই ইফাজকে তুই বলে যখন সে রেগে যায় ইফাজের উপর।শেহজাদকে রাগাতে ভীষণ ভালো লাগে ইফাজের।তাই তো কখনো উল্টাপাল্টা কাজ বা কথা বলে শেহজাদকে রাগিয়ে দেয়।ইফাজও নিচে নেমে আসে।খাবার টেবিলে বসে পরেছে সবাই ততক্ষণে।মেহবুবা খান খাবার দিচ্ছে সবাইকে।

‘এতো সময় কোথায় ছিলি বসে পড়’

‘আম্মু শেহজাদ ভাইয়ের সেবা করতে ব্যস্ত ছিলাম’

ইফাজ টেবিলে বসতে বসতে কথাটা বলে।শেহজাদ চোয়াল শক্ত করে তাকায় ইফাজের দিকে।ইফাজ বোকা বোকা হাসি দেয়।মুনতাসিব খান নিজের মতো খেয়ে চলেছেন।মেহবুবা খান ছেলের কান টেনে বলে,

‘ফাজিল ছেলে বড় ভাইয়ের সাথে দুষ্টমি করিস লজ্জা লাগে না।’

‘আম্মু ব্যাথা লাগছে ছাড়ো ছাড়ো।ভাইয়ের সাথে দুষ্টমি কোথায় করছি ভাইকে রক্ষা করাই আমার দায়িত্ব’

‘তোমার কি মনে হয় ইফাজ আমি নিজেকে রক্ষা করতে পারি না’

‘ভাই আমি তা কখন বললাম।তুমি নিজেকে রক্ষা করতে পারলেও,তোমাকে রক্ষা করা আমার দায়িত্ব’

ছেলের কথা শুনে গর্বে ভরে উঠলো মেহবুবা খানের মন।মেহবুবা খানের স্বামী মারা গিয়েছে দুবছর হলো।তখন থেকেই এখানে থাকে সে।শ্বশুর বাড়ির লোকজন যে খারাপ তা নয়।এখানে থাকার কারণ শেহজাদ!ছেলেকে সে বড্ড ভালোবাসে।ভীষণ ভালোবাসে।ইফাজকে আর শেহজাদকে কখনো দুই চোখে দেখেনি।শেহতাজ শেখ থাকতে বাড়িটা আনন্দ উল্লাসে মেতে থাকত।আর এখন!সে না থাকলে হয়তো বাড়িটা আর বাড়িই থাকতো না।

‘ফুপুমনি কি হলো কি ভাবছো তুমি’

মেহবুবা খানের ঘোর কাটে।চোখের পানি শাড়ির আচল দিয়ে মুছে ফেলেন।এরপর শেহজাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।শেহজাদকে নিজের হাতে খাইয়ে দিচ্ছেন মেহবুবা।শেহজাদ মায়ের কথা মনে পরে।নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে।

‘আব্বু তুই আজ বের হবি না।আজকেও একটু বিশ্রাম নে।কাল থেকে নির্বাচনের কাজ শুরু হবে,লোকজন আসবে।সেগুলো তো তোকেই দেখতে হবে।আজ না হয় থাক।’

‘মেহবুবা ঠিক বলেছে শেহজাদ আজ তুমি বাড়িতেই থাকো।বের হওয়ার প্রয়োজন নেই।’

শেহজাদ কিছু একটা ভেবে দীর্ঘ একটা শ্বাস নিয়ে বলে,

‘ঠিক আছে আজ বাড়িতেই থাকবো’

মুনতাসিব খান খুশি হন।ইফাজ জানে ভাই আজ কাজে কেনো যাচ্ছে না।নিশ্চয়ই খাল পাড়ে যাবে।ওয়ামিয়া যে প্রতিদিন থাকে সেখানে শেহজাদের অপেক্ষায়।শেহজাদের ভালোবাসা,শেহজাদের কাজ কিছুই বুঝে উঠতে পারে না ইফাজ।অবশ্য বুঝে তার লাভ ও নেই। দেখা যাবে শেহজাদকে বুঝতে গেলে সেই পাগল হয়ে যাবে।

********

‘এই যে ইফাজ সাহেব!কি খবর আপনার’

অজিফা মেসেজটা ইফাজকে দিয়ে লজ্জায় রাঙা হচ্ছে।ওয়ামিয়া বসে বিরক্ত হচ্ছে অজিফার কান্ড দেখে।এতো রং ডং মানুষ কিভাবে করে তা বুঝে উঠতে পারে না ওয়ামিয়া।অজিফা আর সে কলেজের ক্যান্টিনে বসে আছে।ক্লাস বোরিং লাগার কারণে করছে না।ওপর পাশ থেকে রিপ্লাই আসলো,

‘আলহামদুলিল্লাহ ভালো।আপনার?

মেসেজ দেখে অজিফার চোখ দুটো বড়বড় হয়ে যায়।ইফাজ তাকে রিপ্লাই দিয়েছে।ওয়ামিয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অজিফার কাজবাজ পর্যবেক্ষণ করছে।অজিফা ঘোর কাটিয়ে উঠে আবারও মেসেজ দেয়,

‘আলহামদুলিল্লাহ ভালো।আ….সলে ওয়ামিয়া একটু কথা বলতে চেয়েছিলো’

‘শেহজাদ ভাই এখন নিজের রুমে অজিফা।তার সাথে কথা বলা সম্ভব নয়।তার রুমে হুটহাট প্রবেশ করার অনুমতি নেই’

মেসেজটা অজিফা ওয়ামিয়াকে দেখায়।ওয়ামিয়া চোখ ছলছল করে উঠে।মানুষটাকে কতদিন দেখে না।কেমন আছে,কি অবস্থা কে জানে!অজিফা ওয়ামিয়ার মনের অবস্থা বুঝতে পারে।এ কয়েকদিন নিজ চোখে দেখেছে ওয়ামিয়ার ছটফটানি।এক পলক তাকে দেখার জন্য কতটা ছটফট করেছে ওয়ামিয়া।মাঝরাতে তাকে ফোন দিয়েও কেঁদেছে।

‘আপনি একটু দেখুন না কিছু করতে পারেন কি না।ওয়ামিয়াকে তো চিনেনই।ওর অবস্থা তেমন ভালো না’

ইফাজ দিশেহারা হয়ে যায়।কি করবে সে!ওয়ামিয়াকে সে যতটুকু চেনে তাতে সে জানে মেয়েটা শেহজাদের অসুস্থতায় নিজেই না খেয়ে,ঘুমিয়ে নিজের অবস্থা বেহাল করেছে।ছোট বেলা থেকে দেখছে।সবই জানা তার।ইফাজ কিছুক্ষণ ভেবে টাইপ করলো,

‘আজকে বিকালে নিয়ে এসো খাল পাড়ে ওয়ামিয়াকে।আমি নিয়ে যাবো শেহজাদ ভাইকে সেখানে।হ্যাঁ অবশ্যই বোরকা পরে আসবে দু’জনই।’

মেসেজটা দেখা মাত্র ওয়ামিয়ার মনটা আনন্দে ভরে উঠলো।পাক্কা ৫ দিন পর দেখা হবে তাদের।তার শেহজাদ ভাইয়ের কি অবস্থা কে জানে!কতগুলো দিন পরে দেখবে।অজিফা তো চিন্তা করেই নিয়েছে বোরকা পরলেও আজ খুব সুন্দর করে সাজবে।ইফাজও যে আসবে সাথে।লজ্জায় রাঙা হচ্ছে অজিফা আর একা একাই হাসছে।

********

‘মাহিম বয়স তো তোমার কম হলো না।এখন বিয়েটা করে নাও।ব্যবসাও সামলাচ্ছ ভালোভাবে।তাহলে আর কি এখন বিয়েটা করে নাও’

শেখ পরিবারের সবাই একসাথে খেতে বসেছে।ওয়ামিয়া খুশি মনে খাচ্ছিল আব্বুর কথা শুনে আনন্দিত হলো ভীষণ।মাহিমের ভ্রু কুচকে যায়।বিয়ে!সে বিয়ে করতে চায় না।যদি বউ আসার পর তার আব্বু আম্মু এবং তার বোনের সাথে খারাপ ব্যবহার করে।সে সহ্য করতে পারবে না কখনোই।

‘আব্বু তোমার মাথায় হঠাৎ এই চিন্তা আসলো কেনো?’

‘বয়স তো অনেক হলো এখন তো বিয়ে করা উচিত’

‘আমার বয়স মাত্র ২৮ আব্বু।আহামরি কিছু না।এখন বিয়ে না করলে মরে যাবো না’

‘বিয়ে না করার একটা সঠিক কারণ বলতে পারলে আমি তোমার বিয়ের কথা মুখেও আনবো না’

মাহিম চুপ হয়ে যায়।আসলেই তো বিয়ে না করার তো কোনো কারণ নেই।যা আছে তা নিতান্তই সাধারণ বিষয়।ছেলেকে চুপ থাকতে দেখে মৃদু হাসেন হুমায়ন শেখ।

‘আমি মেয়ে দেখছি।ভালো,দায়িত্বশীল,সুশীল মেয়ে পেলেই বিয়ে করতে হবে তোমায়’

‘আব্বু….’

‘আমি এ ব্যাপারে আর কথা বাড়াতে চাই না’

হুমায়ন শেখ উঠে যান।খাওয়া শেষ তার।মাহিম হতভম্ব হয়ে বসে আছে।ওয়ামিয়া ভাইজানের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছে।মায়া বেগম স্বামীর পিছু পিছু ছুটলেন।

‘ভাইজান খেয়ে নাও।এভাবে থম মেরে না থেকে’

কথাটা বলেই ওয়ামিয়া উঠে যায়।মাহিম স্বাভাবিক হয়।বিয়ে নামক ভয়ংকর জিনিসে তার এলার্জি।বিয়ে করতে হবে শুনেই ভালো লাগছে না।হুমায়ন শেখও এক কথার মানুষ।ওয়ামিয়া লুকিয়ে ভাইয়ের কান্ড দেখে মিটমিট করে হাসছে।

******

ইফাজ শেহজাদকে নিয়ে বেরিয়েছে।শেহজাদ বেরোতেই চাইছিলো না।তবে অনেক কষ্টে বের করেছে।খাল পাড়ের দিকে আসতেই শেহজাদের চোখ পরে গাছের গুড়ির উপর বসে থাকা দুটোর মেয়ের উপর।যারা দুজন কালো বোরকা নিকাবে আবৃত হয়ে বসে আছে।একজন ফোনে ব্যস্ত আরেকজন এদিকেই তাকিয়ে আছে।শেহজাদ ওই চোখ জোড়ার মালিককে চিনে।তার প্রেয়সী!আজ আবার কেনো?শেহজাদ বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকায় ইফাজের পানে।ততক্ষনে ইফাজ দূরে সরে গিয়েছে।

শেহজাদ এগিয়ে যায়।ওয়ামিয়া উঠে দাঁড়ায়।শেহজাদ এগিয়ে আসে ওয়ামিয়া কাছাকাছি।চোয়াল শক্ত,মুখ গম্ভীর।ওয়ামিয়া ভয় পায় আজ কি তাকে শেহজাদ কড়া কথা শোনাবে?সে তো মানতে পারবে না তার শেহজাদ ভাইয়ের কাছ থেকে কড়া কথা।

#চলবে ইনশাআল্লাহ,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here