অতঃপর_তুমি_আমি #লেখিকা:#ইশা_আহমেদ #পর্ব_১১

#অতঃপর_তুমি_আমি
#লেখিকা:#ইশা_আহমেদ
#পর্ব_১১

এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে তিন দিন হলো।ওয়ামিয়া ভীষণ ব্যস্ত ছিলো এই কয়েকদিন।পড়ালেখার ভেতরই ডুবে ছিলো।পরীক্ষা মোটামুটি ভালোই হয়েছে।আজ ভাইয়ের বিয়ে।তাড়াতাড়িই হচ্ছে বিয়েটা।হুমায়ন শেখ দেরি করতে চাইছেন না।মাহিম মুখে না বললেও মনে মনে ঠিকই চাইছিলো বিয়েটা তাড়াতাড়ি হয় যেনো।ওয়ামিয়ার দেখা হয়নি সেদিনের পর থেকে শেহজাদের সাথে।তবে প্রতিটা সময় ছটফট করেছে ওয়ামিয়া এক নজর ভালোবাসার মানুষটাকে দেখবে বলে।তবে ভাগ্য হয়নি।

সুন্দর করে সেজেছে ওয়ামিয়া।সাধারণ সাজগোছ তবে এতেই মারাত্মক লাগছে তাকে।মায়া বেগম মেয়েকে দেখে বলে,

‘মাশাআল্লাহ আমার মেয়েকে ভীষণ সুন্দর লাগছে’

সবাই মিলে গোছগাছ করে বের হয় রামিশাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে।ওয়ামিয়া মাহিমের সাথে বসেছে।আর সবাই অন্য গাড়িতে আসছে।খুব সাধারণ সাদামাটা ভাবে বিয়েটা হচ্ছে।রামিশাদের বাড়ির সামনে গাড়ি থামে।গাড়ি থেকে নামতেই সবাই ঘিরে ধরে।মেয়েরা গেট ধরতে দাড়িয়েছে।দুষ্ট মিষ্টি ঝগড়া করলো সবাই।ওয়ামিয়া দেখছিলো দাঁড়িয়ে।সবাই ভেতরে ঢুকে।

ওয়ামিয়া রামিশার কাছে যায়।রামিশা নিজের রুমে বউ সেজে বসে আছে।ওয়ামিয়া মুচকি হেসে বসে পাশে।মুখটা উঁচু করে বলে,

‘মাশাআল্লাহ খুব সুন্দর লাগছে তোমাকে ভাবি’

রামিশা লজ্জা পায়।এরপর কাজি আসেন।কাজি বিয়ে পরিয়ে চলে যান।রামিশা আর মাহিমকে এক জায়গায় বসানো হয়।রামিশা আড় চোোএখন খাওয়া দাওয়ার পালা।বেচারি রামিশা খেতেই পারিনি লজ্জায়।মাহিম বিষয়টা খেয়াল করেছে।তবে কি বলবে সে কিছুই বলতে পারছে না।বিদায়ের সময় হয়ে যায়।রামিশা ভীষণ কাঁদছে।কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গিয়েছে।মাহিম সামলানোর চেষ্টা করছে।গাড়িতে বসানো হয় রামিশাকে।ওয়ামিয়া একপাশে বসে।আর সামনে রামিশাদের একটা কাজিন বেসেছে।

********

বউ দেখতে অনেক মানুষ এসেছে।রামিশা বসার ঘরে সোফায় বসে আছে।বেচারির অবস্থা ভীষণ খারাপ।মায়া বেগম বুঝতে পেরে ওয়ামিয়াকে দিয়ে ঘরে পাঠিয়ে দেয় রামিশাকে।ওয়ামিয়া রামিশাকে একটা ফুলে সজ্জিত রুমে নিয়ে আসে।রামিশাকে বসিয়ে দিয়ে চলে যায়।

মাহিম রুমে ঢোকার জন্য আসতেই অবাক হয়।সামনে তার কয়েকজন কাজওন,বন্ধু আর ওয়ামিয়া দাড়ানো।সবাই দাঁত কেলাচ্ছে মাহিমের দিকে তাকিয়ে।মাহিম ভ্রু কুঁচকে তাকায়।ওয়ামিয়া দাঁত কেলিয়ে বলে,

‘ভাইজান টাকা দাও,নাহলে বউ পাবে না।মানে রুমে ঢুকতে পারবে না’

‘টাকা!টাকা কেনো দেবো তোদের।আমার রুম আমার বউ তো টাকা কেনো আমি দেবো’

মাহিমের এক বন্ধু উজান বলে,

‘মামা বউ তোর রুম তোর ঠিক আছে তবে রুমটা কষ্ট করে সাজিয়েছি আমরা সবাই মিলে’

অনেক ক্ষন কথা কাটাকাটি করে শেষমেশ মাহিম হেরে যায়।টাকা দিয়ে বিদায় করে।দরজা খুলে রুমে প্রবেশ করে।রামিশা নড়েচড়ে বসে।ভয়ে বুক ধুকপুক করছে।একদিনই কথা হয়েছে তার।আর আজ দেখা হলো।মাহিম এসে দাঁড়ায় বিছানার সামনে।রামিশা ধীরে ধীরে উঠে সালাম করে মাহিমকে।মাহিম পা ছোঁয়ার আগেই আটকে দেয়।দুই বাহু ধরে বলে,

‘পা ছুঁয়ে সালাম করার প্রয়োজন নেই।তুমি যাও ফ্রেশ হয়ে আসো’

রামিশা ফ্রেশ হতে যায় একটা সুতি শাড়ি নিয়ে।শাড়ি পরে বের হতেই দেখে মাহিম শেরওয়ানি খুলে রেখে টিশার্ট আর ট্রাউজার পরেছে।রামিশাকে দেখে বলে,

‘চলো দুজন নফল নামাজ আদায় করি নতুন জীবনে পা রাখার জন্য’

রামিশা মাথা নাড়ায়।দুজন নামাজ পরে।নামাজ শেষে মাহিম সব কিছু গুছিয়ে রামিশার কাছে আসে।রামিশা ভয় পেয়ে যায়।তবে আজকেই কি সে স্বামীর অধিকার চাইবে তার কাছে।কিন্তু সে তো প্রস্তুত ও না।মাহিম রামিশার মুখের ভাব দেখেই বুঝে ফেলে।হালকা হেসে বলে,

‘ভয় পেয়ো না তোমার অনুমতি ব্যাতীত স্পর্শ করবো না।’

রামিশা একটু শান্তি পায়।পরমুহূর্তেই মাহিম ডান হাতটা চেপে ধরে।কেঁপে উঠে রামিশা।মাহিম তাকে বারান্দায় এনে একটা চেয়ারে বসিয়ে নিজেও সামনের চেয়ারে বসে পরে।আকাশে চাঁদটা জ্বলজ্বল করছে।মাহিম নরম কন্ঠে বলে,

‘ভয় পেয়ো না।তোমাকে আমি হুটহাট স্পর্শ করবোই তবে তোমার সম্মতি ছাড়া অন্য কিছু করবো না।স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করো’

‘জি আমি চেষ্টা করবো’

মাহিম একটা ব্যাগ বের করলো।রামিশা মাথা নিচু করে বসে আছে।এখন ভয় লাগছে না তবে লজ্জা লাগছে সত্যি বলতে।মাহিম বলে,

‘তোমার হাতটা একটু সামনে বাড়াও তো’

রামিশা বিনা বাক্যে হাতটা বাড়িয়ে দেয়।হাত বাড়াতেই মাহিম একটা চুড়ি পরিয়ে দেয় রামিশাকে।চুড়িটা ভীষণ সুন্দর।রামিশার হাতে মানিয়েছে ও।রামিশা বিষ্মিত হয়।সে বিষ্ময়কর কন্ঠে বলে,

‘এটা কেনো দিলেন এগুলোর তো প্রয়োজন ছিলো না’

‘অবশ্যই ছিলো মিসেস শেখ।এটা আপনার জন্য’

রামিশা আর কি বলবে কিছু বলতে পারে না বেচারি।রামিশাকে রুমে নিয়ে মাহিম একটা প্লেট হাতে দিয়ে বলে,

‘খেয়ে নাও এগুলো।তখনতো ভালো করে খেতে পারোনি’

‘আপনি খেয়াল করেছেন?’

বিষ্মিত কন্ঠে বলে রামিশা।মাহিম হেসে বলে,

‘তুমি আমার বউ রামিশা তোমার সব দিক খেয়াল রাখা আমার দায়িত্ব’

রামিশা খুশি হয়।লোকটা তার এতো কেয়ার করছে।ইতস্তত করে খেয়ে নেয়।মাহিম তত সময় বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলো।সে বুঝতে পেরেছে মেয়েটা তার সামনে খেতে পারবে না।তাই এখানে দাঁড়িয়ে আছে।রামিশার খাওয়া শেষ হলে দুজন কিছুক্ষণ গল্প করে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে।এরপর শুয়ে পরে।রামিশা বেশ খানিকটা দূরত্ব নিয়ে শুয়ে পরেছে।

******

পরপর দুইটা থাপ্পড় মারলো মাহিম ওয়ামিয়াকে।ওয়ামিয়া ছিটকে মেঝেতে পরলো।মাথায় ব্যাথা পেয়েছে প্রচুর।ঠোঁট কেটে র*ক্ত পরছে।মায়া বেগম দৌড়ে আসলেন।কিছু বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি।কি এমন হয়েছে যে মাহিম নিজের প্রানপ্রিয় বোনের গায়ে হাত তুলছে।রামিশা জড়সড় হয়ে এক পাশে দাড়িয়ে আছে।বিয়ের ১৫ দিন হয়েছে তবে মাহিমকে সে এভাবে রাগতে দেখেনি।আজ প্রথম দেখছে।মায়া বেগম এসে ওয়ামিয়াকে তুলে বলেন,

‘কি হয়েছে তোমার মাহিম এভাবে ওয়ামিয়ার গায়ে হাত তুলছো কেনো?’

‘আম্মু ও কি করে বেরাচ্ছে শুনো ওর কাছে’

‘কি করেছে ওয়ামিয়া?’

‘ও শেহজাদের সাথে দেখা করে বেড়ায়’

কথাটা শোনা মাত্রই আঁটকে ওঠে মায়া বেগম।এই ভয়টাই সে পাচ্ছিল।এটা হবারই ছিলো।শেহজাদ ওয়ামিয়া দু’জন দু’জনার।ছোট থেকেই দেখেছে সে শেহজাদকে কতটা আকুল হয়ে থাকে ওয়ামিয়ার জন্য।ওয়ামিয়া কাঁদছে।মায়া বেগম শক্ত গলায় বলেন,

‘ওয়ামিয়া মাহিম যা বলছে তা কি সত্য’

ওয়ামিয়া নিজের মুখেও কাঠিন্যের চাপ আনলো।সে ভালোবাসে শেহজাদকে।এটাই সত্যি।ভালো যখন বেসেছে।শিকার তো সে করতেই পারবে।যদি সৎ সাহসই না থাকে শিকার করার তাহলে কেমন ভালোবাসলো সে।ওয়ামিয়াও শক্ত গলায় বলল,,

‘হ্যাঁ আমি তাকে ভালোবাসি।সেও বাসে হয়তো।তবে আমায় গ্রহন করছে না।তবে যাই হোক না কেনো আমি তাকে ভালোবাসি’

‘মেহেনাজ’

মাহিম হুংকার ছাড়লো।রাগে ফোসফোস করছে।রামিশা কিছুই বুঝতে পারছে না।সে চুপচাপ এক কোনে দাড়িয়ে আছে।তবে ওয়ামিয়া আগের ন্যায় স্বাভাবিক।যেই ছেলেটা আগে নিজের বেস্টফ্রেন্ডকে ছাড়া চলতে পারতো না এখন তার নাম শুনলেই রেগে যায়।সময় কত কিছুই না করে।সময়ের পরিবর্তনে সব কিছুই পাল্টে যায়।মায়া বেগম অবাক হয়ে দেখছে ওয়ামিয়াকে।এটা কি সেই আদুরে ওয়ামিয়া।নাহ আজকে তাকে ছোট লাগছে না শক্তপোক্ত মুখ,কঠোর চোয়াল।ওয়ামিয়া সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে,

‘ভাইজান চিল্লাবে না।আমি সত্য বলতে ভালোবাসি।আমি সত্যি বলছি আমি ভালোবাসি শেহজাদ ভাইকে।আর হ্যাঁ তাকে ছাড়া বিয়েও করবো না কাউকে।’

‘আম্মু ওকে আমার সামনে থেকে সরাও।কিছু একটা করে বসবো।শেষে কি না শেহজাদ!’

‘কেনো ভাইজান আমি তো অন্য কাউকে ভালোবাসি নি তোমার বেস্টফ্রেন্ড এবং ফুপাতো ভাইকে ভালোবেসেছি।’

‘মেহেনাজ সে এখন আমার কিছুই না তুই সামনে থেকে সর’

ওয়ামিয়া রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দেয়।মাহিম রেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।মায়া বেগম ফোন করেন দ্রুত স্বামীকে।হুমায়ন শেখ এখন স্কুলে।এই দুপুরে অবশ্য সে বাড়িতে থাকেনও না।রামিশা ও নিজের রুমে চলে যায়।এই কয়েকদিন বেশ কাটছিলো তার।মাহিম বন্ধুর মতো আচরণ করে।আর ওয়ামিয়ার সাথে গল্প করে।সাথে অজিফাও যোগ দেয়।মায়া বেগম তার সাথে ভীষণ ভালো ব্যবহার করেছে।সে সত্যি মুগ্ধ হয়েছে সবার আচরণে।তবে বুঝতে পেরেছে পরিবারে কিছু একটা আছে।

*******

‘ভাই মাহিম ভাই সব জানতে পেরেছেন?’

শেহজাদ আঁতকে উঠলো।প্রেয়সী ঠিক আছে তোহ!মাহিমকে সে চেনে এতো সহজে ছাড়বে না সে ওয়ামিয়াকে।নিশ্চয়ই মেরেছে।শেহজাদ ভেতরে ভেতরে ছটফট করে যাচ্ছে।তবুও শান্ত সুরে ইফাজকে বলল,

‘মাহিম কিভাবে জানলো’

‘ভাই গ্রামের একজন নাকি দেখেছি আপনাকে আর ওয়ামিয়াকে একসাথে’

‘ইফাজ দ্রুত বের করো কে করেছে এই কাজ’

ইফাজ মাথা নাড়িয়ে বেরিয়ে যায়।তবে পেছনে ফিরলে দেখতে পারতো একজন হিংস্র বাঘকে।প্রেয়সীর জন্য বুঝি কেউ এতো পাগল হয়।হ্যাঁ ভালোবাসলে সবই সম্ভব।সময় এসেছে প্রেয়সীকে নিজের করার।শেহজাদ মেঘলা আকাশে পানে চেয়ে মনে মনে বলল,

‘ভালোবাসি প্রেয়সী!আমি উন্মাদ তোমাতে।তুমিই আমার নেশা।একমাত্র নেশা’

#চলবে ইনশাআল্লাহ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here