অতঃপর_তুমি_আমি #লেখিকা:#ইশা_আহমেদ #পর্ব_৫

#অতঃপর_তুমি_আমি
#লেখিকা:#ইশা_আহমেদ
#পর্ব_৫

ওয়ামিয়া স্তব্ধ হয়ে শেহজাদের বুকে মাথা রেখে বসে আছে।তখন শেহজাদ তাকে ঝাপটে ধরেছিলো।এখনও সেভাবেই আছে।শেহজাদ এমন করবে কল্পনাতেও আনতে পারিনি ওয়ামিয়া।শেহজাদ বিড়বিড় করে বলছে,

‘আম্মু ফিরে আসো প্লিজ।আমার একা ভালো লাগছে।পারছি না আমি।কতগুলো বছর দেখি না তোমায়’

ওয়ামিয়ার চোখ জ্বলছে।তার শখের পুরুষ কষ্ট পাচ্ছে।এটা মেনে নিতে পারছে না।তার শেহজাদ ভাইকে গম্ভীর,শক্তপোক্ত,জেদীতেই মনায়।এমন ভাবে দেখতে ভালো লাগছে নাহ মোটেও।হঠাৎ করেই শেহজাদ ধাক্কা মারে ওয়ামিয়াকে।ওয়ামিয়া ঘাসের উপর ছিটকে পড়ে।শেহজাদের চোখে মুখে অনুতাপের ছাপ।কি করে ফেললো সে!অধিকার না থাকা শর্তেও ছুঁয়ে দিলো সে প্রেয়সীকে।ওয়ামিয়া হতভম্ব হয়ে এখনো তাকিয়ে আছে শেহজাদের দিকে।শেহজাদ অনুতাপের আগুনে দগ্ধ হচ্ছে।

বৃষ্টির ফোঁটা গুলো ছুঁয়ে দিচ্ছে দুজন মানব মানবীকে।ওয়ামিয়ার হুট করে কান্না পেলো।চোখ জ্বলছে।ওয়ামিয়া শেহজাদের দিকে তাকিয়ে অসহায় কন্ঠে বলল,

‘এমন করছেন কেনো শেহজাদ ভাই?মেনে নিন আমায়।আর কত!ভালোবাসি আপনায় আমি’

‘আমি বাসি না’

ওয়ামিয়া তাচ্ছিল্য হেসে বলল,,’আপনার চোখ বলছে ভালোবাসেন আপনি।তবে দূরত্ব কেনো এতো?’

‘তোমার সাথে আমার দূরত্বই যে লিখা।’

‘আপনি চাইলেই দূরত্ব ঘুচিয়ে দিতে পারেন।ভালোবাসতে পারেন আমায়!’

‘আমি চাই না’

অজিফা ইফাজকে মেসেজ করে আসতে বলেছে।ওয়ামিয়ার চোখের কার্নিশ বেয়ে অশ্রুকণাগুলো গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে।বৃষ্টির জন্য শেহজাদ বুঝতে পারছে না।বুঝতে পারলেও সে নিরুত্তর,র্নিলিপ্তই থাকতো।শেহজাদ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে,

‘দুঃখিত তোমায় আলিঙ্গন করার জন্য।আমায় ক্ষমা করো।ঘোরের মধ্যে ভুল হয়েছে’

‘থাক শেহজাদ ভাই ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন নেই।আমি জানি আপনি কখনো নিজ থেকে আমায় জড়িয়ে ধরবেন না।’

ইফাজ চলে এসেছে।শেহজাদের অবস্থা তেমন একটা সুবিধার না।জ্বর আসবে হয়তো।ইফাজ শেহজাদকে দেখে এক প্রকার দৌড়ে আসে শেহজাদের কাছে।শেহজাদ পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার প্রেয়সীর দিকে।এতো সুন্দর কেনো এই মেয়ে!স্নিগ্ধময়ী লাগছে।শুভ্ররঙা কলেজ ড্রেসে পবিত্র লাগছে শেহজাদের প্রেয়সীকে।মুগ্ধতা ভীর করছে চোখ জুড়ে।ইফাজ এসে শেহজাদের পাশে বসে উৎকন্ঠা সুরে বলে,

‘ভাই তুমি ঠিক আছো?বৃষ্টিতে কেনো ভিজছো?’

‘আমাকে বাড়িতে নিয়ে চলো ইফাজ’

ইফাজ এক পলক ওয়ামিয়ার দিকে তাকায়।মেয়েটা মলিন চোখে চেয়ে আছে তার প্রিয় মানুষের মুখের পানে।ইফাজ মাঝে মাঝে ভেবে পায় না।একটা মেয়ে এতোটা ভালোবাসতে পারে।যুগটা ছেড়ে যাওয়ার হলেও মেয়েটা হাজার অবহেলা,অনীহা থাকা সত্ত্বেও ভালোবেসে চলেছে তার শেহজাদ ভাইকে।ইফাজ বাইক নিয়ে এসেছে।সচারাচর কখনো বাইক নিয়ে বের হয় না।তবে আজকে শেহজাদের কাছে দ্রুত পৌঁছানোর জন্য বাইকে এসেছে।

‘ভাই উঠুন বাড়িতে যেতে হবে’

শেহজাদ উঠে দাঁড়ালো।ইফাজও উঠে দাঁড়ায়।শেহজাদ পরে যাওয়া ধরে।ইফাজ দ্রুত তাকে ধরে।ইফাজ বুঝে ফেলে শেহজাদের শরীর খারাপ।ওয়ামিয়া ও দাঁড়িয়ে পরেছে।প্রিয় মানুষের এমন অবস্থা সহ্য হচ্ছে না যে।শেহজাদকে ধরে সামনে এগোতে থাকে ইফাজ।ওয়ামিয়াও পিছু পিছু আসে।অনেক কষ্টে নিজে এবং শেহজাদকে বাইকে উঠায় ইফাজ।ওয়ামিয়া পেছন থেকে বলে উঠে,

‘ইফাজ ভাই খেয়াল রাইখেন উনার।একটু খবর জানতে চাইলে বইলেন’

‘ওয়ামিয়া তুমি বাড়ির পথে রওনা দাও এখনই।এখানে থাকাটা সেফ না।আমি তোমায় খবর জানাবো’

ইফাজ বাইক স্টার্ট দিতে যাওয়ার পূর্বে শেহজাদ বলে উঠে,

‘ইফাজ তোমার শার্টটা খুলে ওয়ামিয়াকে দাও’

ইফাজ বিনাবাক্যে তাই করলো।টিশার্টের উপরে থাকা শার্ট খুলে ওয়ামিয়ার হাতে দিলো।শেহজাদ ইফাজের কাঁধে মাথা ঠেকিয়েছে।অসুস্থ হয়েছে বোঝা যাচ্ছে।ইফাজ অনুরোধের স্বরে ওয়ামিয়াকে বলল,,,

‘বাসায় এখনই চলে যাও বোন।মাহিম ভাই জানলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।আবার অশান্তি শুরু হবে।চলে যাও এখনই এই মুহূর্তে’

ইফাজ শেহজাদকে নিয়ে চলে যায়।ওয়ামিয়া পলকহীন ভাবে তাকিয়ে থাকে যতক্ষণ না সীমানার বাইরে চলে যায়।অজিফা এসে দাঁড়ায় ওয়ামিয়ার পাশে।তার খারাপ লাগছে ওয়ামিয়ার জন্য।মেয়েটা তো আর কম দিন ধরে তাকে ভালোবাসে না।বুঝতে শিক্ষার পর থেকেই ভালোবাসে মেয়েটা শেহজাদকে।মাঝে কতকিছু হয়ে গেলো।শেষ হলো দুই পরিবারের হাসিখুশি থাকার কারণ।

‘মেহু বাড়ি চল।আর শার্টটা গায়ে জড়িয়ে নে।শেহজাদ ভাই এর জন্যই দিয়েছে।’

ওয়ামিয়া অজিফার কাছ থেকে তার কালো রঙের ওড়নাটা নিয়ে নিজের গায়ে জড়িয়ে নিলো ভালোভাবে।শার্টটা অজিফার হাতে দিয়ে বললো,

‘এটা তুই পড়ে নে।আমি শেহজাদ ভাই ব্যতীত অন্যকারো কিছু পরতে ইচ্ছুক না’

অজিফা শার্টটা জড়িয়ে নিলো।বাড়ির পথে রওনা হলো।ওয়ামিয়ার মনটা ভালো না।অজিফাও চুপ আছে।মেয়েটার সাথে কত কি ঘটলো।তবুও নিজেকে স্বাভাবিক করে রাখার যথা সম্ভব চেষ্টা করে।

*******

বাড়িতে ফিরতেই মায়া বেগম ভেজা অবস্থায় ওয়ামিয়াকে দেখে দৌড়ে গিয়ে গামছা নিয়ে এসে দ্রুত মাথা মুছে দেয়।ব্যাগ রাখতে বলে গোসল করতে পাঠান।ওয়ামিয়া গোসল সেরে বের হতেই মায়া বেগমকে বিছানায় বসে দেখতে পায়।চুলগুলো ভালোভাবে মুছে বারান্দায় গামছা মেলে দেয়।

‘আম্মা দেখি জ্বর এসেছে কিনা।জ্বর আসলে তো তোমার আব্বু আর ভাইজান বাড়ি মাথায় তুলবে।’

‘আম্মু আমি ঠিক আছি তো’

‘তুমি এখন খেয়ে জ্বরের ঔষধ খেয়ে নাও’

মায়া বেগম ভাত খাইয়ে দিলেন মেয়েকে নিজের হাতে।অতি আদরের কণ্যা তাদের।তাকে অবহেলায়,অযত্নে রাখা যায়।শেখ বাড়ির রাজকন্যা ওয়ামিয়া শেখ।বাপ ভাইয়ের জান।মায়া খাইয়ে দিয়ে চলে যান।মায়া বেগমকে অবশ্য বলে দিয়েছে ওয়ামিয়া সে ঘুমাবে।তাই এখন যেনো কেউ তাকে বিরক্ত না করে।ওয়ামিয়া দরজা আটকে পড়ার টেবিলে বসলো।লুকিয়ে রাখা ডাইরিটা সযত্নে খুলল।ডাইরিটা খুলে লিখতে বসলো,

“আজকে সে আমায় তার বুকে ঠাই দিয়েছে।যদিও তা কিছুক্ষনের জন্য।ঘোরের ভেতরে সে তার উষ্ণ আলিঙ্গনে আবদ্ধ করেছিলো আমায়।আমার অনুভূতিটা তখন কেমন ছিলো তা আমি লিখে বা বলে বোঝাতে পারবো নাহ।এমন অনুভূতির সাথে আমি প্রতিদিন পরিচিত হতে চাই।তবে সে আমায় সেই অধিকার দেয়নি।”

আমার শখের পুরুষ,আমার শেহজাদ ভাই~

ভালোবাসি পাথর মানব🖤

ওয়ামিয়া ডাইরিটা বন্ধ করে রাখলো।সযত্নে তুলে রাখলো আগের জায়গায়।ডাইরিটাতে সে তার শেহজাদ ভাইয়ের প্রতি অনুভূতি ব্যক্ত করে লিখে প্রতিদিন।ভালোবাসা অদ্ভুত সুন্দর!কাউকে ভালো রাখে তো কাউকে বাজে ভাবে শেষ করে দেয়।ওয়ামিয়ার অবস্থা ভয়ানক।সে ভয়ানক ভাবে ভালোবাসা নামক জিনিসে মিশে গিয়েছে।

*******

গভীর রাত।শেহজাদের জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে।পাশেই ইফাজ আর মুনতাসিব খান।শেহজাদ জ্বরের ঘোরে শেহতাজ শেখ আর ওয়ামিয়ার নাম নিচ্ছে।মুনতাসিব কিছুক্ষণ থেকে চলে যান।ছেলের অবস্থা সহ্য করতে পারছেন না।ছেলের মনের অবস্থা খুব ভালো করেই জানেন তিনি।ওয়ামিয়া মেহেনাজ!ছেলে যে তাকে বদ্ধ উন্মাদের মতো ভালোবাসে তা সম্পর্কে তিনি অবগত।মেয়েটা ও ভালোবাসে সে ও তার জানা।

কি করবে সে!ছেলের ভালো থাকার জন্য ওয়ামিয়াকে প্রয়োজন।মুনতাসিব খান ভালো করেই জানেন ছেলে পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে ওয়ামিয়াকে গ্রহন করবে না।শেহজাদ শিকার না করলেও বুঝতে পারছে যে শেহজাদের মনের অবস্থা তেমন ভালো না।কি করবে ভেবে পাচ্ছেন না।

ইফাজ বসে আছে শেহজাদের রুমে।রুমে সে খুব বেশি আসেনি।যখনই এসেছে অন্ধকারই ছিলো।তবে আজ সে রুমটা দেখছে।ছোট্ট শেহজাদ বাচ্চা ওয়ামিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।আর ওয়ামিয়া তার কি এসব খেয়াল আছে সে তো নিজের মতো হাসছে।এমন একটা ছবি বিছনার পাশের টেবিলে রাখা।খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছে শেহজাদ।

‘ভাই তুমি ভালোবাসো তাকে তবুও কেনো মানছো না।আমি যতটুকু মামাকে চিনি সে তোমার খুশির জন্য সব করতে পারে।তাহলে ছোট্ট মেয়েটাকে কষ্ট দিচ্ছো।’

‘আমি তোমাকে ভালোবাসি প্রেয়সী,ভীষণ ভালোবাসি!’

ইফাজ হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বলে,

‘আপনাকে বোঝা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।আপনি তো আপনিই।শেহজাদ ইমতিয়াজ খানকে বোঝার সাধ্যি আমার নেই’

‘কবে পাবো তোমায়!তোমার কান্নারত মুখশ্রী দেখলে বুকটা ধক করে উঠে।মনে হয় সোজা এগিয়ে গিয়ে নিজের বক্ষে আটকে রাখি’

ইফাজ দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ফেললো।কি বলবে সে!দুজন দুজনকে পাগলের মতো ভালোবেসেও কষ্ট পাচ্ছে।যদি একতরফা ভালোবাসা হতো তাহলে সে নিজের মনকে কিছু বুঝিয়ে বুঝ দিতে পারতো।কিন্তু এখানে দুজনই ভালোবাসে।ইফাজ এসব চিন্তা বাদ দিলো।শেহজাদ এতো সময় জ্বরের ঘোরে এগুলো বলছিলো।ইফাজ সেবা করতে থাকে নিজের সাধ্য মতো।

#চলবে ইনশাআল্লাহ,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here